Jump to ratings and reviews
Rate this book

বাংলাদেশি ড্রিম

Rate this book
যারা আমেরিকায় বসবাস করে, তারা “আমেরিকান ড্রিম” অর্জনের পেছনে ছোটে। তারা চায় একটা বাড়ি, গাড়ি, স্বাস্থ্যসুবিধা সহ সকল মৌলিক নাগরিক সুবিধা। কিন্তু “বাংলাদেশি ড্রিম”, সেটা আবার কী? এরকম কোনো শব্দবন্ধ শোনা যায় না। তবে একজন বাংলাদেশী নাগরিক যদি ভয়হীনভাবে তার গড় আয়ুটা যাপন করে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে, তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে সে “বাংলাদেশি ড্রিম” অর্জন করেছে?কিন্তু যে দেশে পদে পদে এত মৃত্যু, এত ভয়, সেখানে এই স্বপ্নটা বাস্তবায়িত করা দুঃসাধ্য নয় কি? মৃত্যুকে তো এড়ানো যায় না, কিন্তু ভয়হীন হওয়া যায় যদি?এই উপাখ্যানের চরিত্রগুলির কাছে সেটাই “বাংলাদেশি ড্রিম”।

240 pages, Unknown Binding

Published February 3, 2025

1 person is currently reading
33 people want to read

About the author

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
2 (13%)
4 stars
11 (73%)
3 stars
2 (13%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,667 reviews430 followers
February 22, 2025
৩.৫/৫

এদেশে আমাদের আজন্ম সঙ্গী ভয়; মত প্রকাশে ভয়, চলতে ফিরতে ভয়, পাড়ার মাস্তানদের ভয়, রাজনৈতিক নেতাদের ভয়, মেয়ে বড় হয়ে গেলে ভয়- ভয়ের শেষ নেই।মানুষজন আর ভয় পাচ্ছে না, নির্ভীকতার সাথে মাথা উঁচু করে জীবনযাপন করছে -এমনটা হলে কেমন হতো? এই ভয়ভীতিহীন অবস্থাকেই লেখক উল্লেখ করেছেন "বাংলাদেশি ড্রিম " হিসেবে। সামষ্টিকভাবে এর চাইতে বড় স্বপ্ন তো আর হয় না! শুরু হয়েছে বোন মালতিকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় কাজলকে প্রহারের ঘটনা দিয়ে। এরপর আমরা দেখি, পাড়া- মহল্লা- বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গন থেকে শুরু করে সারাদেশে এক অভূতপূর্ব জাগরণ। সবাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে, ভয় কাউকে দমিয়ে রাখতে পারছে না - এ অবস্থা শাসকদের জন্য অপ্রীতিকর। জাঁ আনুইয়ের "আন্তিগোনে" নাটকে রাজা ক্রেয়নের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় আন্তিগোনে। ক্রেয়ন তাকে দমিয়ে রাখতে চায় কিন্তু আন্তিগোনের আবেগ ও বিদ্রোহ বিশুদ্ধ। সে পরিণাম মানে না, ধারও ধারে না।আর এই পরিস্থিতি ক্রেয়নের জন্য চরম বিপর্যয়কর। কারণ ভয়ই তার অস্ত্র, যে ভয় পায় না তাকে সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তারুণ্যের আবেগ ক্রেয়ন মোকাবেলা করে আন্তিগোনের জীবন কেড়ে নিয়ে। এ উপন্যাসেও আমরা দেখি অত্যাচারী রাজার মতোই দেশের কর্তারা ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছে না,তাদের মনে একটাই প্রশ্ন  - "কীভাবে এদের ভয় ভাঙলো?" হাসান মাহবুব সুনির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্র রাখেননি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত, কবি, নৈশক্লাবের গায়িকা, ভার্সিটির তরুণ, পুলিশ কর্মকর্তা - সবাই কাহিনিতে গুরুত্ববহ। এই "একবার মরে ভুলে গেছে আজ মৃত্যুর ভয় তারা" অবস্থা থেকে শাসকদের পালটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, আবার গুটিয়ে যাওয়া, আবার রুখে দাঁড়ানো - সর্বোপরি, জ্বলন্ত এক প্রশ্ন - "অর্জন করার পর সেই স্বাধীনতা রক্ষা করবে তো বিপ্লবী মানুষ? নাকি তারাও হয়ে উঠবে আরেক ফ্র‍্যাংকেনস্টাইন?" লেখক অবশ্য আবছা ইঙ্গিত দিয়ে থেমে যান।কারণ শেষ বলে কিছু নেই এ খেলায়। 
 কিছু জায়গায় ঘটনা অতিরিক্ত নাটকীয় মনে হয়, মনে হয় হাসান মাহবুব আরেকটু সংযত হতে পারতেন, কম রাখতে পারতেন চরিত্র। তবু, সবটা মিলিয়ে, এই অস্থির সময়ে "বাংলাদেশি ড্রিম" প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যবাহী লেখা।
Profile Image for Enamul Reza.
Author 5 books177 followers
February 25, 2025
ক্ষমতার সবচেয়ে বড় অস্ত্র কী, আমরা সবাই জানি। ভয়। যারা ক্ষমতাবান, ক্ষমতাহীনের উপর তারা ভয় দিয়েই প্রতিষ্ঠা করে কর্তৃত্ব। কিন্তু যদি এমন হতো, ক্ষমতাহীন মানুষেরা, যাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে কিংবা ঠেকেই আছে অনন্তকাল ধরে – তারা অকস্মাৎ একদিন টের পায় যে আর ভয় লাগছে না, মরতে ভয় লাগছে না, নিপীড়িত লাঞ্ছিত হতে ভয় লাগছে না, ভয় লাগছে না অস্ত্রের মুখেও বা কারও শাসানি রক্তচোখকেও, কেমন হবে?
হাসান মাহবুব তার উপন্যাস বাংলাদেশি ড্রিম – এ এই থিমটিকেই উপজীব্য করেছেন।

শহুরে মধ্যবিত্ত একটি পরিবার – যাদের দিন চলে যায় নিরুদ্বেগ, অর্থের প্রাচুর্য্য নেই, সংকটও নেই, তাদের স্বপ্ন জীবনের সাজানো লক্ষ্যগুলো অর্জন করে স্বাভাবিক সাধারণ ও নিরাপদ জীবন কাটিয়ে দেওয়া। কিন্তু ঘটনাচক্রে এলাকার একদল ক্ষমতাবান তরুণের লালসার কেন্দ্র হতে হয় এই পরিবারের কন্যা মালতীকে। আর এই সূত্রেই মালতীর ভাই কাজল নিপীড়নের শিকার হয়, প্রচণ্ড মার খেয়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। এমন যে কোমায় চলে যাওয়ার দশা হয় ছেলেটির।

এই পরিবারটিই মূলত উপন্যাসের ভরকেন্দ্র। পাশাপাশি চলে একজন উড়নচণ্ডী লেখক শফিকের অভিযান, যে প্রেমে পড়ে এক বারের গায়িকা পামেলার। ক্ষমতার দাপট ও দুঃশাসনের বিপরীতে ভয়হীনতা নামক গণচেতনার যে জাগরণ উপন্যাসে আমরা দেখি, তা থেকে উৎপন্ন এনার্কির বেজমেন্ট হিসেবেও শফিককে ধরে নেয়া যায়।

ক্ষমতাসীন সরকারি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে একটি সাদামাটা পরিবার কিভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে বা টিকে থাকার সংগ্রাম করবে – এই সমান্তরাল লাইনের সঙ্গে যোগ দেয় উপন্যাসের মূল থিম: ধর্ষণের উদ্দেশ্যে মালতীকে অপহরণ করতে যখন দুষ্কৃতিকারীরা সংঘবদ্ধভাবে এগিয়ে আসে দিনে দুপুরে – একদম ভুতুড়ে বাস্তবতার মতো আমরা দেখি যে এক ফল বিক্রেতা তার ছুরি নিয়ে এগিয়ে আসছে, ফোন ফ্যাক্সের দোকান থেকে ছুটে আসছে দোকানী, বাজার করে ঘরে ফেরা সুখী মধ্যবয়সী লোকটাও সন্ত্রাসীদের পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়েছে আচমকা। আর সেখানেই আসে জাগরণটা – অসংখ্য লোকের গণধোলাইয়ে মারা পড়ে ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী, যে ছিল মালতীকে অপহরণ ও ধর্ষণপরিকল্পনার মূল হোতা। এখান থেকেই দেখা যায়, ভয় ঢুকে গেছে ক্ষমতাবানদের মনে – আর নিপীড়িতরা হয়ে গেছে ভয়মুক্ত।

উপন্যাসিক হাসান মাহবুব যেন এই পরিস্থিতিরই অপেক্ষা করছিলেন এতক্ষণ। কারণ এখানেই তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধরণ, তাদের নিপীড়নের কৌশল, পাওয়ার গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতা, গুম, টর্চার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড – আমাদের এই অতিচেনা বিষয়গুলো আশ্চর্য দক্ষতায় ডিল করতে থাকেন। তুলে আনেন এর ভিতর ও বাহিরের রূপ, সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে এসবের প্রভাব।

আবিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী শাহানা, পুত্রকন্যা কাজল ও মালতী, লেখক শফিক ও গায়িকা পামেলা – এরা কেউই আর ব্যক্তি চরিত্রের আদল পায় না, হয়ে ওঠে ভয়, ভয়হীনতা, এনার্কি, দুঃশাসন নামক থিমগুলোর এক্সপ্লোরেশনের একেকটা টুলস।

বাংলাদেশি ড্রিমের ভাষা অভিনব নয় – বরং সরলতামুখী, সংযত, এবং সুপাঠ্য। এমনকি এর বিষয়বস্তুও অভিনব কিছু নয়, তবু কেন পাঠান্তে বইটিকে আমাদের সময়ের এক জরুরি উপাখ্যান বলে দিতে ইচ্ছা করে? করে, কারণ উপন্যাসে বর্ণিত বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের মানুষের সরাসরি বসবাস - অন্তত গত দুই যুগ ধরে তো বটেই। ঠিক সেই একই কারণে আমি দেখতে পাই যে এ বই সেইসব চেনা কথাই এত গুছিয়ে নিয়ে বলে – যা আমরা অনেক সময় বলতে চেয়েও পারি না। এটা যে এক ডিস্টোপিয়া, আর এখানে যে কোনো সময় যে কোনো ঘটনা চেনা বাস্তবতার মাত্রাকে ছাপিয়ে যেতে পারে – সেটি উপলব্ধি করলে বোঝা যায় এ বইয়ের নাটকীয় অংশগুলোও আসলে ডিস্টোপিয়ার সেই চিরায়ত সূত্র আর ‘হোয়াট ইফ’ -কেই খোঁচা মেরে চলে। শেষ অব্দি এক চরম নৈরাশ্যের জগতে উপন্যাসটি আমাদের আশা জাগিয়ে তুলতেও বিস্ময়করভাবে সফল হয়।

তাই স্মরণীয় চরিত্র, ব্যক্তির আত্মআবিষ্কার ও আখ্যানে বৈচিত্র্যমুখীতার অনুসন্ধান না করে বাংলাদেশি ড্রিম বরং সরাসরি সামষ্টিকতামুখী এক সামাজিক চেহারা লাভ করে - বিশিষ্ট হয়ে ওঠে এর থিম এবং আশাবাদের জন্যও।
Profile Image for Adham Alif.
335 reviews81 followers
March 2, 2025
৩.৫/৫
ভয় হচ্ছে শাসকশ্রেণীর সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। এই অস্ত্রটা কাজ না করলে তারা প্রথমে চিন্তিত এবং পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে পড়ে। নির্ভীক প্রজাদের দিয়ে ইচ্ছেমতোন সবকিছু করানো যায়না। তাই সবকিছুর স্বার্থেই সর্বদা ভয়ের রাজত্ব কায়েম রাখা আবশ্যক। অপরদিকে ভয়ের জগতে বাস করতে করতে জনসাধারণের ব্যাক্তিত্বের সত্ত্বা ক্রমশ হারিয়ে বসতে থাকে। সেই ব্যাক্তিত্বকে পুনরুদ্ধার করার একটা আকাঙ্ক্ষা স্বভাবতই জন্ম নেই। তাই বাংলাদেশি ড্রিম হলো নির্ভীক এক জীবনের প্রত্যাশা।

উপন্যাসের একপাশে দেখা মিলে সেই শ্রেণীর যারা ভয় দেখানো�� মাধ্যমেই টিকে আছে। এই দলে পাড়ার খুদে মাস্তান, ওসি, ডিবি, কমিশনার থেকে মন্ত্রী সবাই আছেন। তাদের বিপরীতে যথারীতে ভয় পেতে যারা অভ্যস্ত সেই ��াধারণ আমজনতা। যাদের কাজ হচ্ছে অন্যায় দেখেও সহ্য করে নেয়া। কিন্তু বাস্তবিকতা হচ্ছে সমাজে এমন একটা দল সর্বদাই থাকে যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনা ঠিকই কিন্তু মেনেও নেয় না। উপযুক্ত মুহূর্তে এরা ফেটে পড়ে স্ফুলিঙ্গের মতো। উপন্যাসে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অসম লড়াই দেখার বন্দোবস্ত করেছেন লেখক।

উপন্যাসে চরিত্রগুলোকে আলাদা করে খুব বেশি জায়গা দেয়া হয়নি। তার বদলে ক্রমাগত ঘটে যাওয়া মারপিট, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, অপহরণ, রেপ থ্রেট, নেশাপানি, টর্চারসেলের ঘটনাগুলোই মূখ্য। চরিত্রগুলোকে ব্যবহার করা হয়েছে এসব অন্যায়ের উপাদান হিসেবে।

লেখক বাংলাদেশের ভয়ের ত্রাসের যে জগৎটা দেখাতে চেয়েছেন সে সম্পর্কে মোটামুটি সবাই অবগত। অপরাধগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বলে কয়েকজন অপরাধীকে দিয়েই বেশ অনেকটুকু এলাকা ঘুরিয়ে আনতে পেরেছেন। কিন্তু পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো বাস্তবিক আলোকে লেখা হলেও ঘটনাগুলো বাস্তবকে অতোটা ছুতে পারছেনা। অন্তত প্রথম অধ্যায়টা যেভাবে শুরু হয়েছিলো পুরো গল্পতে সে ভাবটা থাকেনি।
Profile Image for Mahbub Mayukh Rishad.
57 reviews15 followers
February 20, 2025
হাসান মাহবুব এর উপন্যাস বাংলাদেশি ড্রিমে মূল কোনো চরিত্র নাই। মূল চরিত্র এখানে একটা অনুভূতি। সেই অনুভূতির নাম ভয়।

ভয় কী? মানুষ কেন ভয় পায়? কাকে ভয় পায়? মানুষ ভয় পায় ক্ষমতাকে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ক্ষমতাবান মানুষদেরকে। মানুষ ভয় পায় নিজের অক্ষমতাকে। মানুষ চায় কোনোক্রমে গন্ডগোল এড়িয়ে নিজের জীবনটাকে চুপচাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু কী হবে মানুষ যদি হঠাৎ ভয় পেতে ভুলে যায়? আর কিছু হারানোর নয় ভেবে এগিয়ে আসে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে? সেই প্রতিবাদ একক নয়, সামষ্টিকভাবে পুরো সমাজে যদি ছায়া ফেলে তাহলে কেমন দেখাবে সেই সমাজ?

হাসান মাহবুব আমাদের সেরকমই একটা গল্প উপহার দিয়েছেন আমাদের ঘটনার পর ঘটনার মাধ্যমে। আমরা জানি এসব হয়, আমরা জানি তারপরও পড়তে ভালো লাগে লেখকের ভাষার ওপর অনায়াস দখলের কারণে। কোথাও বিন্দুমাত্র বিরক্তির উদ্রেক না করে পাতার পর পাতা চেনা গল্প বলে যাওয়া শক্তির পরিচয় বটে।

লেখক খুব সুচারুভাবে ভয়হীনতার প্রতীক হিসেবে ডেকে আনেন একটা পাখিকে। যে পাখিকে শহরের সকলেই দেখে, আবার হারিয়েও যায়। পাখিটি হারিয়ে যাওয়ার সাথে আবার ভয় ফিরে আসে। শুরু হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের নোংরা নিয়ন্ত্রণ। পাখিটি আবার ফিরে আসে, ফিরে আসা ভয়হীনতা সহিংস ভাব নিয়ে। শেষটা মেলোড্রাটিক হয়ে যায় খানিকটা বেশিই, তারপরও মানুষের জয়ের গল্প পড়তে ভালও লাগে। যদিও আমরা জানি কোনো জয় দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

প্রকাশক: জ্ঞানকোষ
Profile Image for নিলয় দেবনাথ .
14 reviews11 followers
April 28, 2025
রেটিং (৩.৭/৫)

আমরা কখনোই ভয়হীন থাকতে পারি না, আমাদের সকল কিছুতেই ভয়! জীবন নাশের ভয়, নেতা-মাস্তানদের ভয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ভয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু কেমন হতো যদি সবাই ভয় পেতে ভুলে যেত, নিষ্ঠুর বাস্তবতা আর ফ্যান্টাসির মিশেলে হাসান মাহবুব তাঁর "বাংলাদেশি ড্রিম" উপন্যাসে চিত্রিত করেছেন এমন এক ভয়হীন বাংলাদেশের চিত্র যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা প্রত্যেক বাংলাদেশিই দেখি। কয়েকটি আলাদা গল্প একসাথে এগিয়েছে এই উপন্যাসে, গল্পগুলো একে অপরের থেকে ভিন্ন হলেও ভয়হীনভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার দিক থেকে এক সূত্রে গাঁথা। সবগুলো গল্পই যেন এক হয়ে এক ভয়হীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে। তবে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে আবিদুল ইসলামের পরিবারের গল্পটি, এটি ধরেই উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। লেখক শফিক এবং নৈশক্লাবের গায়িকা পামেলার মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক এইসব সংঘাত, নিষ্ঠুরতার মধ্যে দিয়েছে স্বস্তির আশ্রয়। গুম, খুন, ধর্ষণ, অন্যায়ের বিপরীতে বয়ে গেছে বিদ্রোহ, প্রেম ও একতা। তবে শেষের দিকটা জোরপূর্বক এবং নাটকীয় লেগেছে, গল্পগুলোর মধ্যে কোনোরকম সমন্বয়ের চেষ্টা করেননি লেখক, কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাব থেকে গেছে।
তাছাড়া লেখকের লেখনী খুবই সাবলীল, কোনো রকম অতিরঞ্জন নেয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় অবলীলায় বলে গেছেন। গালিগালাজের পরিমাণ কম হলেও সেগুলো আরও শীলিত হতে পারতো। তবে বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে "বাংলাদেশি ড্রিম" খুবই সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ লেখা এবং আরও মনোযোগের দাবি রাখে।
Profile Image for Imran Khan.
2 reviews1 follower
Read
February 19, 2025
দিন কয়েক আগে আমিই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম যে মানুষের বিজয়ের গল্প লিখতে পারলে ভালো হতো। তখনো "বাংলাদেশি ড্রিম" পড়িনি, জানতাম না যে হাসান ভাই মানুষের বিজয়ের গল্প লিখে ফেলেছেন।
মানুষের আদি এবং অকৃত্রিম একটি আবেগ হচ্ছে "ভয়"। এটা ক্ষমতাবানেরা জানে এবং মানুষের মগজকে ম্যানিপুলেট করে ভয় জাগিয়ে তাদেরকে বশে রাখে। ক্ষমতাবানদের খাদ্য হচ্ছে ক্ষমতাহীনদের ভয়। ভয়টাকে যদি উত্তরণ করা যায়, তাহলেই ক্ষমতাহীনেরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে আর ক্ষমতাবানেরা পেয়ে যায় "ভয়"। এই উপন্যাস এই ভয়ের গল্প বলে, এবং বলে ভয়কে উত্তরণ করা একদল মানুষের গল্প।
"বাংলাদেশি ড্রিম" একটি টানটান উপন্যাস। কোনো স্পয়লার দেব না, লিখব একেবারেই ব্যক্তিগত মতামত। আমেরিকান ড্রিমের একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই উপন্যাসকে দেখা যায় না। বাংলাদেশিদের দুই ধরনের "ড্রিম" এখানে দেখানো হয়েছে। প্রথমত: নিরাপত্তা। নিরাপদ থাকার জন্য চোখ বুজে থাকা। নানান অসঙ্গতির মধ্যে বাস করেও, এমনকি নিজে অবিচারের শিকার হয়েও ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক নিরাপত্তার খাতিরে চোখ বুজে থাকা এক ধরনের "বাংলাদেশি ড্রিম"। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা। যে কোনো উপায়ে হোক ক্ষমতা হস্তগত করা। এদেশে বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা যদি হাতে থাকে, তাহলে সবকিছুই হাতের নাগালে চলে আসে। সেই সাথে কিছু হীন স্বার্থ চরিতার্থ করা যায় শাস্তির কোনো ভয় ছাড়া।
একটি পরিবার ঘুরে দাঁড়ায় ধর্ষকদের বিরুদ্ধে; পরিবারটির সদস্যরা দরকার হলে ভেঙে যাবে, গুড়িয়ে যাবে, তবু মাথা নোয়াবে না। এক ধরনের অহিংস এবং অসহযোগ আন্দোলনই তাদেরকে করে তোলে সুপার-হিউম্যান্স। তাদের পাশে সাধারণ মানুষকেও দাঁড়াতে দেখা যায়। আয়নাঘরের অত্যাচারেও একজন সাধারণ মানুষ চাপিয়ে দেয়া অপরাধ স্বীকার করে না। অত্যাচারে প্রাণভিক্ষা চায় ঠিকই, কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের কোনো কাঙ্ক্ষিত জবাব দেয় না। তরুণ সমাজের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প আছে। উপন্যাসের শেষে রাজনৈতিক পাণ্ডাদের সাইজ করাটা বেশ আনন্দ দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্র রাজনীতির নামে যে কুৎসিত ক্ষমতাচর্চা আর নানান ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত টাকা এদিক সেদিক করার প্রবণতা বহুকাল ধরে প্রচলিত আছে, তার বেশ জ্বলন্ত চিত্র আছে। আমি নিজেও হলে থেকে পড়াশোনা করেছি, এ ধরনের দৃশ্য নিজেই দেখেছি।
কিছু কিছু জায়গা একটু মেলোড্রামাটিক মনে হয়েছে। চোখের সামনে অন্যায় দেখে সাধারণ মানুষ চুপ করে থাকে, এটাই স্বাভাবিক দৃশ্য। উপন্যাসে দেখা যায়, রাজনৈতিক পাণ্ডারা একটি সাধারণ মেয়েকে অপহরণ করতে চাইলে আশেপাশের মানুষ, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষেরা ছুটে আসে। সাধারণত দেশে কোনো বিপ্লব চলমান না থাকলে এরকম দৃশ্য দেখা যায় না। এই অংশটি পড়লে জর্জ অরওয়েলের 1984 উপন্যাসের একটি বাক্য মনে আসে: The only hope like in the proles. তবে অতটা মেলোড্রামাটিকও নয়। সম্প্রতি এক বিবাহিত দম্পতিকে কিশোর গ্যাং কুপিয়েছে। রিপোর্টে পড়লাম, এলাকাবাসীই গ্যাং-এর দুজনকে ধরে পুলিশে দিয়েছে। অথবা এইধরনের দৃশ্যগুলোকে একধরনের বার্তা হিসেবেও দেখা যায় যে সমাধান আসলে এখানে।
এই উপন্যাসের একটা খুব প্রতীকী ঘটনা হল একজন লেখক এবং একজন bar singer এর অদ্ভুত প্রেম। এই দুজনের দেখা হয় দূর থেকে। কথা না বলেও গায়িকা মেয়েটির মনে হয় ছেলেটি একজন কবি বা শিল্পী। শেষে বেশ অদ্ভুত এক পরিণতি পায় সেই প্রেম। এদের প্রেমকথা পড়তে গিয়ে আমার মনে পড়েছে পাবলো নেরুদার একটি কথা: If nothing saves us from death, at least love should save us from life.
কিছু দুর্বলতা সব উপন্যাসেই থাকে। এই উপন্যাস পড়ে কখনো কখনো মনে হয়েছে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার জন্য উন্মুখ। সবসময় তা না-ও হতে পারে। বিশেষ করে শেষের দিকে অত্যাচারিত একটি ছেলের পাশে যখন তার প্রতিবেশিরা এসে দাঁড়ায়, একটু বেশি মেলোড্রামা মনে হয়।
হাসান মাহবুবের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা। আমাকে টেনে নিয়েছে, কোথাও একঘেয়ে লাগেনি, যেখানে কিনা আমার নিজের লেখাও আমার কাছে কখনো একঘেয়ে লাগে। তার দ্বিতীয় শক্তি অসংখ্য চরিত্র একই সাথে চালিত করার দক্ষতা। চরিত্রের উপস্থিতি অল্প সময়ের জন্য হোক বা বেশি, প্রতিটি চরিত্রই উপন্যাসে কোনো না কোনো গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপন্যাসের অনেক ঘটনাই বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার প্রতিচ্ছবি বলে মনে হয়। আমরা এই দেশে বাস করে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে যেসব নৃশংসতা এবং অনাচারের মুখোমুখি হই এবং একসময় অভ্যস্ত হয়ে সুখের সন্ধান করে বেড়াই, সেগুলোই যেন থাপ্পড়ের মতো করে গালে এসে পড়ে এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে।
হাসান মাহবুব আমাদের সময়ের সাহসী কথাশিল্পী।
Profile Image for Bluish 1.0.
2 reviews1 follower
September 18, 2025
প্রতিবছর শ'য়ে শ'য়ে মানুষ আমেরিকা পাড়ি জমায়, 'আমেরিকান ড্রিম' এর পিছে ছুটে।
কিন্তু আমরা যারা বাংলাদেশে থাকি, আমাদের ড্রিমটা কী? বাংলাদেশি ড্রিম কী হতে পারে?

'মানুষের ৫টি মৌলিক অধিকার হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা' - হাইস্কুলে থাকতে সমাজ বা বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বই এ কষে কষে মুখস্ত করেছি আমরা সবাই। তখন এত কিছু মনে না হলেও বড় হতে হতে বুঝলাম, বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশের কপালে এই ৫ টা মৌলিক অধিকারও জোটে না। কত কত মানুষের জীবনের স্বপ্ন তিনবেলা পেট ভরে ভাত খেতে পাওয়া, নিরাপদ বাসস্থানে ঘুমানো, পরনের কাপড়টা পাওয়া। অনেকের কাছে শিক্ষা বা চিকিৎসা রীতিমত বিলাসিতা। নিরাপত্তার অভাব, চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই এর ভয়, মেয়ে হলে বাড়তি পাওয়া রেপ থ্রেট, রেপ ফিয়ার, অথবা রেপ। সাথে হ্যারাসমেন্ট তো ফেস করে নাই এমন মেয়ে দেশে নেই। কেমন হত যদি এসব ভয়কে জয় করতে পারতাম আমরা, হয়ে উঠতাম প্রতিবাদী, নিজেরাই রুখে দিতাম এসব অরাজকতা?! এমন দেশে যেন সবাই সুপারহিরো, নিজের মত, নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য।
বাংলাদেশের মানুষ যে পারে তা আমরা দেখেছি খুব বেশিদিন আগে নয়। তাও এমন বাংলাদেশের ড্রিম মনে হয় সবসময় লজিক্যাল।
এমন একটা বাংলাদেশের ড্রিমই লেখনীতে ফুলফিল করেছেন লেখক হাসান মাহবুব। ২০২৫ এর অমর একুশে বইমেলায় বেশ জনপ্রিয় হওয়া এই বইটি প্রকাশ করেছে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী। মুদ্রিত মূল্য ৫০০ টাকা মাত্র।
Profile Image for Suborna Mehrooz.
2 reviews
March 10, 2025
পরিবার..
পরিবার একটা সংগঠন, সমাজের বা রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক।
এই পরিবারকে নিয়েই যেমন একজন ইতালিয়ান বাবার রয়েছে আমেরিকান ড্রিম...হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের একটি ছোট্ট পরিবারকে নিয়ে আবিদুল ইসলামের ঠিক তেমনই রয়েছে একটি বাংলাদেশি ড্রিম।
বাংলাদেশি ড্রিম এ রয়েছে এমন একটি সুখী পরিবার যার প্রত্যেক সদস্যের থাকবে নিরাপত্তা, অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও থাকবে না অভাব, সাজানো গোছানো ঠিক যেন এককালের বাংলা সিনেমার কোন আদর্শ পরিবার।
তবে আদৌও কি তা সম্ভব???
"দ্য গডফাদার" উপন্যাসের শেষকৃত্যকারী ইতালিয়ান আমেরিগো বনাসেরার মতো কি আবিদুল ইসলামের বাংলাদেশি ড্রিম বাস্তবায়ন সম্ভব??
উপন্যাসের শুরুতেই একটি দুর্বল পরিবারের ব্যাখ্যা দেয় কাজল।যাতে নেই কোন শক্তিশালী বন্ধন,পরিবারের সদস্যরা নয় সাহসী।
মালতি কে ধ*র্ষণের চেষ্টায় উঠে পড়ে লাগে এলাকার বখাটে ছেলেরা,যার প্রতিরোধ করে তার ছোট ভাই কাজল।ফলশ্রুতিতে তাকে দিতে হয় চরম মূল্য।পুরো একবছর অসুস্থ হয়ে থাকে সে গুন্ডাবদমাশদের মারের চোটে।মুলত এর পর থেকেই জেগে উঠে মালতি ও তার পরিবার।ক্রমান্বয়ে একটি পরিবার থেকে তাদের এই সাহসীকতা,অন্যায় কে প্রতিরোধ করার দৃঢ় প্রচেষ্টা ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রে........বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে....রাস্তায়... সবখানেই লোকজন অন্যায়ের প্রতিরোধ শুরু করে...
তবে যখনই জনগণ সচেষ্ট হয়ে উঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সমাজের পা*চাটা, অন্যায়কারীদের এক দল তাদের থামিয়ে দিতে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়।
যে কারণে নিজ কন্যাকে ধ*র্ষণের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে সাহসী হয়ে উঠা পিতাকে যেতে হয় জেলে,সহ্য করতে হয় রিমান্ডের অকথ্য অত্যাচার...
ঠিক একই কারণে মৃত্যবরণ করে অনেকেই যেতে পারে না অফিসের কাজে...
আসলে তীব্র যন্ত্রণা আর বেদনার অনুভতিগুলো রাষ্ট্র বোঝে না,সমাজ বোঝে না,রাজনীতি বোঝে না।
শুধু বোঝে বেদনা আর অপ্রাপ্তির অপমান।শেকলের অন্তর্ভুক্ত মানুষগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বললো,"এসব একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। "
Profile Image for Tanzina Afrin.
13 reviews13 followers
February 21, 2025
সমসাময়িক বাস্তব আর প্রসঙ্গের এমন এক গল্প,যেখানে বাস্তবের উপর কখনো কখনো পরাবাস্তবের ছায়া পড়েছে,পাঠককে এদেশীয় বাস্তবতার প্রচণ্ড মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতেই কি?
সুবিস্তৃত অরাজকতার জালে আর্ষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো এই অঞ্চলের উপর দিয়ে উড়ে যাাওয়া সেই বিশাল ডানার সোনালী গলার পাখিটা কি আসলে ঈশ্বরের দেবদূত,নাকি ক্রমাগত পীড়নে জর্জরিত নাগরিক মস্তিষ্কগুলোর ম্যাস হ্যালুসিনেশন?
গল্পের মোটাদাগের ভাল মন্দ সব চরিত্রকে এই পাখি এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে,তবে কাজশেষেও সে হারিয়ে যায় নি।অথবা হয়তো তার কাজ কখনো শেষ হবার নয়।
হয়তো সে এসেছিল নবজাতকের নিষ্কলুষতা আর অভয় ডানায় নিয়ে এই অঞ্চলের পাপমোচন করতে।মানুষকে শেখাচ্ছিল কীভাবে নির্ভয়ে অসুরকে রুখে দিতে হয়।অথচ সে টের পেল না-এই অসুর-বধের খেলায় একসময় সুর আর অসুরের মাঝে আর সীমারেখা থাকে না...
অনন্তকাল ধরে চলে আসা এই খেলার মাঝেও জীবিকা প্রেম কাম কখনো থেমে থাকে না।সবকিছুকে সাদা/কালোর ছকে ফেলে নিজের প্রতিমুহূর্তের ক্রিয়াকলাপের ন্যায্যতা নির্ধারণের বদলে আমবা বেঁচে থাকি কোন এক 'অনুমেয় ঊষ্ণ অনুরাগে"...
Profile Image for Mahrin Ferdous.
Author 8 books208 followers
March 19, 2025
পৃথিবী এক রণক্ষেত্র, জীবন এক খেলার মাঠ—এমন কথাগুলো আমাদের চারপাশে ঘুরেফিরে আসে। কিন্তু যারা এ খেলার নিয়ম জানে না, যারা অস্ত্রহীন, প্রশিক্ষণবিহীন, তাদের জন্য এই রণক্ষেত্র কেমন? হাসান মাহবুব তাঁর বাংলাদেশি ড্রিম উপন্যাসে ঠিক এমনই এক দুর্বল, নিরীহ পরিবারের গল্প বলেছেন, যারা এই দানবীয় খেলায় নামতে বাধ্য হয়, অথচ কোনো প্রস্তুতি নেই তাদের। নেই যুদ্ধের জন্য কোনো প্রশিক্ষণ। তবু তারা ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে শুরু করে সাহস অর্জনের জার্নি। যেখানে আমাদের চিরপরিচিত সমাজব্যবস্থা এক ভয়াবহ শিকারি, আর সাধারণ মানুষ সেই শিকারের লক্ষ্যবস্তু।

ফলে, পাঠক এখানে হয়ে ওঠে সেই পুরনো, সরল দর্শক, যে মনেপ্রাণে চায় এই দুর্বল দলটা এবার জিতে যাক। রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবানদের প্রবল থাবা এড়িয়ে তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। এরপর সারা দেশকে মনে করিয়ে দিক—বিপরীত স্রোতেও জয়ের গল্প থাকে। আর ঠিক এ কারণেই, কাজল ও মালতীর পরিবারের সাহস অর্জনের যাত্রা আমাদেরও তীব্রভাবে দেখতে ইচ্ছে করে। আমরাও চাই সমস্ত অন্যায় ও নির্মমতার বিরুদ্ধে কেউ নির্ভয়ে, অবিচল দাঁড়িয়ে ন্যায়ের কথা বলুক। উপন্যাসের শেষ পর্যায়ে সেই আকাঙ্ক্ষাই, চরম নির্যাতনের মাঝে দৃঢ় ও বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন আবিদুল ইসলাম—

"আমার বাঁচতে ইচ্ছা করতেছে। ব্যথা থেকে মুক্তি পাইতে ইচ্ছা করতেছে। কিন্তু যখন প্রশ্ন করবেন, কিছু একটা ঘটে যাবে। আমি...আর ভয় পাব না।"

এটি তখন শুধু একটি চরিত্রের সংলাপ না, বরং সকল নিপীড়িত মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশি ড্রিম-এ ছিনতাই, ডাকাতি, ইভ-টিজিং, ধর্ষণ, লুটপাট, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম, গুম, নিপীড়ন, যৌনতাসহ—বহুকিছু আছে! এইসব কিছুর পাশপাশি হাসান মাহবুব লিখেছেন, রাষ্ট্র ও সাধারণ মানুষের এক অসম লড়াইয়ের গল্প। এমন এক অস্থির সময়ের কথা বলেছেন, যা আমাদের চিরচেনা কিন্তু সেই প্রেক্ষাপট থেকে আমরা মুক্তি পেতে চাই। উপন্যাসে তিনি দেখিয়েছেন, চোখের সামনে অন্যায় দেখে পথচারী, চায়ের দোকানি, ফল বিক্রেতারা ছুটে আসে, অথচ আইনপ্রশাসন নিশ্চুপ হয়ে থাকে। অস্থির সময়ে প্রতিদিনের এই চেনা অন্যায় যখন শব্দের জগতে উঠে আসে, অনেকেরই গা শিউরে ওঠে, বোধ জর্জরিত হয়। কিন্তু সাহিত্যের শক্তি এখানেই—বাস্তবের অসহায়ত্বকে ছাপিয়ে এখানে প্রতিবাদ ও সংহতি বারবার মাথা তুলে দাঁড়ায়। উন্মুক্ত আকাশে উড়তে থাকে ভয় মুছে ফেলার এক অলীক পাখি। ফলে, উপন্যাসের কিছু অংশ নাটকীয় মনে হলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় ভয়কে জয় করার আনন্দটুকু। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসী উচ্চারণটুকু, যা হয়তো বাস্তবে দেখা যায় না, কিন্তু গল্পের জগতে আমাদের শিহরিত করে। এই উপন্যাসের সবচেয়ে কোমল দিক ছিল খেয়ালি লেখক শফিক ও নাইটক্লাবের গায়িকা পামেলার দূরবর্তী প্রেম। তাদের সম্পর্ক যেন সংগ্রামের ভেতর এক নিঃশব্দ আশ্রয়, যা মনে করিয়ে দিয়েছে সংকটের মাঝেও আছে রঙ, আছে নির্মল ভালোবাসা।

পুরো উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, হাসান মাহবুবের ভাষা। পাঠকদের তিনি গল্পটি বলেছেন ভারী সহজাত ও মোলায়েম ভাষায়। কোনো অতিরঞ্জন নেই, নেই জোর করে কিছু প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। বরং সামাজিক নিপীড়নের বিপরীতে উঠে দাঁড়ানো, বুক চিতিয়ে বেঁচে থাকার, ভয়কে জয় করার এক সুরেলা গানই তিনি গেয়েছেন গোটা বইটা জুড়ে।

আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সাহসের গল্পকে তুলে ধরার এই 'বাংলাদেশি ড্রিম' ভালো লাগলো পড়তে। হাসান মাহবুবের আগামী উপন্যাসের জন্য শুভকামনা।
Displaying 1 - 10 of 10 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.