বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পুরো পাকিস্তানের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব ফরেস্ট ছিলেন ইউসুফ এস আহমেদ। বুঝতেই পারছেন তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক সমৃদ্ধ। ৮০ থেকে ১০০ বছর আগের ব্রিটিশ শাসনাধীন বেঙ্গল প্রভিন্সের অরণ্য ও বন্য প্রাণীর অসাধারণ এক চিত্র ফুটে উঠেছে উইথ দ্য ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস অব বেঙ্গলে।
কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলে বুনো হাতির সঙ্গে টক্কর দিতে গিয়ে কখনো কখনো লেখক পৌঁছে যান মৃত্যুর খুব কাছে। সুন্দরবন, কাসালং ও ডুয়ার্সের অরণ্যে মুখোমুখি হয়েছেন প্রবল পরাক্রমশালী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের।
কখনো লেখকের সঙ্গে নিজেকে আবিষ্কার করবেন মধুপুরের বনে চিতাবাঘ কিংবা বক্সার অরণ্যে গন্ডারের সামনে। শিউরে উঠবেন কুমির, অজগর, হাতি এবং বাঘের মানুষ শিকারি হয়ে ওঠার বিবরণ পড়ে। সব মিলিয়ে পুরানো দিনের অরণ্যে অসাধারণ ও সুখপাঠ্য এক ভ্রমণের আমন্ত্রণ।
যদি জানতাম ‘দুই বাংলার অরণ্যে এক বন কর্মকর্তার রোমাঞ্চকর অভিযান’ মানে শুধুই শিকারের গল্প, তাহলে বই কেনা ও পড়া থেকে বিরত থাকতাম। শিকারের বর্ণনা পড়ে একটুও রোমাঞ্চিত হইনি। বরং এত এত প্রাণী হত্যার নির্মম কাহিনী খুব পীড়াদায়ক ছিল আমার জন্য। মানুষের জানমাল রক্ষার কথাটা স্রেফ অছিলা, কয়েক জায়গার বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় আসল হলো শখ বা নেশা, ট্রফি বা স্মারক অথবা কেবলই বিনোদন।
যারা শিকারকাহিনী পড়তে পছন্দ করেন তাদের বইটি ভালো লাগতে পারে। আবার এ বিষয়ের বইপত্র বেশ কিছু পড়া থাকলে ভালো লাগার সম্ভাবনা কম। কারণ খুব চমকপ্রদ কিছু পাওয়া যাবে না। এত ঘটা করে বের করার মতো কিছু ছিল না এ বই।
বইটাকে একটা দিনলিপি বলা চলে। লেখক তার শিকার কাহিনীর সংশ্লিষ্ট বিষয়বস্তুর আশপাশ দিয়ে ঘেঁষার চেষ্টাই করেন নি বরং সরাসরি হাজির হয়ে গেছেন প্রাণীদের সামনে। আর ধামধাম করে ট্রিগার চেপে প্রাণী দের শিকারের বর্ণনা ও সেই প্রাণীদের চামড়া দিয়ে স্ত্রীর প্রসাধনী বানানোর কেচ্ছা খুবই দম্ভের সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বাংলা সাহিত্যে শিকার বা বন বিষয়ক বইপত্রের স্বর্ণযুগ ধরা যায় ব্রিটিশ পিরিয়ডকে। দেশীয় জমিদারদের কাছে শিকার ছিল রয়েল গেইম। এই রয়েল গেইমে তাদের "কীর্তি" কে অমর করে রাখতে অনেকেই সেসময় বন্দুকের সাথে কলমচর্চা করেছেন। একই সময় ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট ডিভিশন বা জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে যোগ দেওয়া ভারতীয়রা তাদের লেখায় তুলে এনেছেন সেসময়কার বনের খবর। অবাধ শিকার আর জনসংখ্যার চাপ এরপর এই ধারার সাহিত্য ও বন্যপ্রাণ দুইয়েরই দফারফা করেছে।
ইউসুফ এস আহমেদ ১৯২৫ সাল নাগাদ ইম্পেরিয়াল ফরেস্ট সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৫২ সালে পুরো পাকিস্তানের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব ফরেস্ট হন। চাকরির সুবাদে সুন্দরবন, ভাওয়াল, চট্টগ্রাম, সিলেটে আর বক্সা অভয়ারণ্যে (আলিপুরদুয়ার) কাটানো সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়েই "উইথ দ্য ওয়াইল্ড এনিমেলস অব বেঙ্গল"। অবশ্য অভিজ্ঞতার বড়টা জুড়েই শিকারের গল্পই। একজন ফরেস্ট অফিসার যে এভাবে বন্যপ্রাণ শিকারে মেতে থাকতে পারে তা এই বই হাতে না ভাবনায় আনতে পারতাম না। লেখক কালানুযায়ী বইকে ভাগ না করে এগিয়েছেন প্রাণী অনুযায়ী ভাগ করে। প্রতিটা ভাগের শুরুতে ভিন্ন-ভিন্ন এলাকায় কিভাবে প্রাণিগুলো শিকার করা হয় আর সেসময় প্রাণিগুলোর আচরণ কেমন থাকে তার এক পূঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা বইটার একটা ভালো দিক। শিকারের মধ্যে প্রাধন্য পেয়েছে মূলত বাঘ আর হাতি।
কোন লেখা যখন অনেক বছর স্মৃতি হাতড়ে লেখা হয় তখন এর মান কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ ঘটনার আনুষাঙ্গিক প্রেক্ষাপট অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে যায়। ইউসুফ এস আহমেদের লেখাটি প্রকাশিত হয় মৃত্যুর তিনবছর আগে। তাই, তার ঘটনার বর্ণনা থেকে বনের নৈসর্গিকতা বা শিকারের রোমহর্ষকতা অনেকটা ফিকে হয়ে গিয়েছে। কোথাও তা বন্দুকের মতোই কর্কশ। তাও সেইসময়কার বনের খবর জানার সুযোগ একমাত্র এই বইগুলোই।
বইটা আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগের বাংলাদেশের জঙ্গলকে জানতে ও বুঝতে হলে এই বই এর বিকল্প নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামে হাতি খেদার বর্ণনা কিংবা সুন্দরবনের মানুষখেকো বাঘের গল্প রোমাঞ্চিত করেছে। কখনো কখনো অকারণে প্রাণী হত্যা মনে কষ্ট দিলেও ওই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বইটি রোমাঞ্চপ্রেমীদের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী যারা ভালোবাসেন তাদের পড়া উচিত বলে মনে করি। বইটিতে পুরনো দিনের চমৎকার কিছু ছবি এবং সুন্দর কিছু ইলাস্ট্রেশনও নজর কেড়েছে।
উপভোগ্য। লেখকের কর্মরত সময়ের শিকার কাহিনি। তবে অনুবাদকের লেখা ভূমিকা পড়ে আশা করেছিলাম শিকার কাহিনির পাশাপাশি লেখকের জঙ্গলে কাটানো রোহমর্ষক অভিজ্ঞতাও স্থান পাবে। এদিক দিয়ে হতাশ। শিকার কাহিনি ভালো লাগলে পড়তে পারেন, অন্যথায় দরকার নেই।