অভিশপ্ত এক স্মৃতি গেঁথে আছে ফরহাদের জীবনে, ছোটবেলায় পৈতৃক বাড়িতে পিশাচের আদলে তৈরি একটি মূর্তি দেখেছিল ফরহাদ। এরপর এক রহস্যময় অসুস্থতা তাকে গ্রাস করে, বাধ্য হয়ে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। দীর্ঘ ১৯ বছর পর, অতীতকে পেছনে ফেলে পৈতৃক বাড়িতে ফিরে এলো সে, দেখা হলো ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সুহাসিনীর সঙ্গে। নীল চোখ, ঘন কালো কোঁকড়া চুলের এক অসাধারণ সুন্দরী রহস্যময়ী নারী। দেখা মাত্র স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার ছোট ভাই রিয়াদ একজন মানসিক প্রতিবন্ধী! এমন অপরূপী নারী তাকে বিয়ে করল কেন?! কিছুদিনের মধ্যেই ফরহাদ বুঝতে পারে সুহাসিনী যেন তাকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে, তার চোখের দৃষ্টি চুম্বুকের মতন কাছে টানছে। নিজের অজান্তেই সুহাসিনীকে ভয়ংকর একটি উদ্দেশ্য হাসিলের সুযোগ করে দেয় সে। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় যাত্রার, যা ফরহাদের অতীতের চেয়েও ভীতিকর। এক্সরিসম ও ডেমোনলজি নিয়ে লেখা সাহিল রহমানের উপন্যাস তুক পাঠককে নিয়ে যাবে লৌকিকতার সীমানার বাইরে।
রিভিউয়ার হিসেবে আমার যাত্রা বেশিদিনের নয়, কিন্তু পাঠক হিসেবে বইকে আপন করে নিয়েছি প্রায় ২৪ বছর। এটি তর্ক করার মত বিশাল কোন যোগ্যতা নয়, তবুও বলছি; পাঠক হিসেবে আমার দুই দশকের অভিজ্ঞতায় ‘তুক’ বইটির মত এরকম বিদঘুটে বই খুব একটা পাইনি।
লেখক নবাগত, এটি তাঁর ৪র্থ বই প্রভৃতি কারনে চেষ্টা করেছি যথেষ্ট উদারভাবে সবকিছু বিচার করতে। কিন্তু সত্যি বলতে, বইটির কিছু অ্যাসপেক্ট এতই অপরিপক্ব যে রিভিউতে উল্লেখ করতেই হচ্ছে। সাথে রয়েছে কিছু ভিত্তিহীন তথ্য। এক এক করে বলি -
বইয়ের শুরুটা কৌতুহল জাগানিয়া। ফরহাদ নামে এক ব্যক্তি একটি রহস্যময় পরিবারে বিলং করেন। তার বাবা মৃত, ভাই মানসিক প্রতিবন্ধী আর মা অস্বাভাবিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত, যা বাহির থেকে কালো জাদু বলে মনে হয়। তার মায়ের অনেক মুরিদ আছে আর পুরো গ্রামই তাকে সমীহ করে, এমনকি পুলিশও। ফরহাদ ছোটবেলায় তার বাড়ির এক কুঠুরিতে বিকট চেহারার এক মূর্তি দেখে প্রচন্ড ভয় পান এবং গৃহত্যাগ করেন। ১৯ বছর পর সেই গৃহে ফিরে এসে ভয়ানক এক বিপদের সম্মুখীন হন তিনি। এটুকু পড়ে মনে হতে পারে যে কাহিনী খুব ইন্ট্রিগিং। ফরহাদের গল্পটা মন্দ ছিল না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফরহাদের গল্পের সমাপ্তি হয় ৩৭ পৃষ্ঠায়। এরপর পুরো বইয়ের গল্প একরকম ভেঙ্গে পড়ে। হুট করেই কাহিনী এগোতে থাকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে। কে প্রধান চরিত্র, কাহিনী কোনদিকে যাচ্ছে এসব বোঝা দুরূহ হয়ে পড়ে। বইটি কলেবরে আরও বড় হলে এ বিষয়টি এড়ানো যেত হয়ত। ১৭৫ পৃষ্ঠার মধ্যে অতীত-বর্তমান, দেশ-বিদেশ এতকিছু কভার করতে যেয়ে লেখক কোনখানেই ফোকাস দিতে পারেননি। ফলে গল্প হয়েছে বড্ড তাড়াহুড়োময়। প্লট টুইস্টগুলোও বড্ড এলোমেলো। তথ্য-উপাত্ত বা প্রমাণের বদলে লেখক টুইস্ট দিয়েছেন অচেনা চরিত্রের জবানিতে, ফলে সেগুলো তেমন ইমপ্যাক্টফুল হয়নি
একটি বইয়ের ফ্ল্যাপে কী থাকে? ভিতরের কাহিনী সম্পর্কে সামান্য ধারনা তাই তো? যাতে পাঠক সেটুকু পড়ে আকৃষ্ট হয়। এজন্যে অনেক লেখক ফ্ল্যাপের লেখাটিকে নানাভাবে রসালো করে তোলেন। অনেকে বইয়ের চুম্বক অংশের কিছু লাইন সরাসরি বা সামান্য পরিবর্তনসাপেক্ষে ফ্ল্যাপে তুলে দেন। কিন্তু ফ্ল্যাপে যা লেখা, তা যদি বইয়ের কাহিনীর সাথে না মেলে, তখন বিষয়টি কীভাবে নেওয়া উচিত? ফ্ল্যাপে ফরহাদের কাহিনীর সারসংক্ষেপ দেওয়া, যা পড়ে মনে হতে পারে যে, ফরহাদই প্রধান চরিত্র। কিন্তু ৩৭ পৃষ্ঠায় ফ্ল্যাপে উল্লিখিত কাহিনী শেষ হওয়ার পর ফরহাদ হয়ে পড়ে গৌণ ব্যক্তি, সাইড ক্যারেক্টার।
ফরহাদের গল্পেও বেশ উদ্ভট ভুল রয়েছে। ৯ পৃষ্ঠায় ফরহাদের জবানিতে লেখা, “বাড়ির নিচতলায় একটি ঘর আছে, ঘরটাকে আমি লাল ঘর বলতাম, ওই ঘরের দরজাটা ছিল লাল রঙের।” অথচ ৬২ পৃষ্ঠায় বলা আছে, “সুহারের মূর্তি একটি ঘরে রাখা ছিল। মূর্তিটাকে লুকিয়ে রাখতে আজমাল নিজে এই ঘরটা তৈরী করেছিলেন।” একটি ভয়ংকর প্রেতমূর্তিকে যে ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, সে ঘরটির কথা ফরহাদ শৈশব থেকেই জানে। কী ধরনের গোপন জায়গা যার কথা একটা বাচ্চাও জানে?
রহস্যময় লাল ঘরে ফরহাদ কীভাবে ঢুকেছিল সেটা নিয়েও রয়েছে বিরাট এক প্লটহোল। অতীতের জবানিতে লেখা ফরহাদ সামান্য ধাক্কা দিয়েই দরজা খুলেছিল, অথচ পরে যেয়ে দেখানো হয়েছে যে ফরহাদ রহস্যময় প্রতীক, সংকেত এগুলো অজানা ক্রমে সাজিয়ে দরজাটা খুলেছে। সরাসরি বইয়ের লেখাগুলো কোট করে দিচ্ছি। ৬৯ পৃষ্ঠায় এই লাল ঘর সম্পর্কে বলা হয়েছে, “দরজার ঠিক কেন্দ্রে ঝুলে আছে রহস্যময় তালাটি, ধাতব রহস্যময় প্রতীক গুলো সেখানে সাপের মতো খোদাই করা আছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই দরজাটা খোলার জন্য জটিল এই প্রতীক গুলোর সুনির্দিষ্ট অক্ষরগুলোকে স্পর্শ করতে হবে, তারপর দরজার মধ্যে অবস্থিত পেঁচানো ধাতবটির প্রতীক গুলোকে অজানা ক্রমে সাজাতে হবে।” ৭০ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে যে, “তন্ময় হয়ে দরজার প্রতীক গুলোকে সাজাতে শুরু করেছে ফরহাদ।” অথচ ৯ পৃষ্ঠায় ফরহাদের জবানিতে বলা, “আমি দরজার দিকে ঘুরে তাকালাম, কিছুক্ষণ দরজার সামনে দারিয়ে থাকলাম, ছোট হাত দুটো দিয়ে দরজায় সামান্য ধাক্কা দিলাম, খুলে গেল দরজাটা, আমি ঘরটায় প্রবেশ করলাম।” এটা কী ধরনের অসামঞ্জস্যতা! এতে কাহিনীর কনসিস্টেন্সি ব্রেক হয়েছে কী না? উপরন্তু বানান ভুল, দাঁড়িয়ে শব্দটিকে লেখা হয়েছে দারিয়ে। প্রতীকগুলো শব্দে অপ্রয়োজনীয় স্পেসিং, লেখা হয়েছে প্রতীক গুলো।
১৫ পৃষ্ঠায় বলা, “রিয়াদ আর সুহাসিনীর নি ষ্প্রা ণ দেহ পাশাপাশি টানটান হয়ে পড়ে আছে।” ২০ পৃষ্ঠায়ও একইকথা বলা, “একদম নিষ্প্রাণ, ঠান্ডা শরীর।” কিন্তু এটা কীভাবে হত, পরে আর কোন প্রেতশাসক কেন এটা করেনি, আলা নামের ওই ব্যক্তিও কেন সুহাসিনীর উপর এটা প্রয়োগ করেনি এসবের কোন ব্যাখ্যা দেওয়া নেই।
৬০ পৃষ্ঠায় বলা, “প্রতিমাসে আজমালের পরিচিত বিজ্ঞ কয়েকজন প্রেতশাসক এই ঘরটাকে পর্যবেক্ষণ করতে এখানে আসতেন, মাসের কোন এক রবিবারে তারা হাজির হতেন।” তাহলে প্রশ্ন জাগে, ফরহাদের মা মনাইকা মারা যাবার পর সেখানে উপস্থিত সদস্য আলা কেন সাহায্যের জন্য কাউকে ডাকেনি। আরও প্রশ্ন, মনাইকা ছিল বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রেতশাসকদলের একমাত্র হাকিম, যাকে অনেকেই মান্য করত। তো হাকিম মারা যাবার পর তার মুরিদেরা কেউ খোঁজ নিতে আসেনি কেন? প্রশ্ন এখানেই শেষ না। ফরহাদ ৩৪মাস সুহাসিনীর সঙ্গে ওই বাড়িতে কাটিয়েছিল, এতগুলো দিন ওই প্রেতশাসকদের কেউ বাড়িটার ছায়াও মাড়ায়নি? কিন্তু, দুই যুগ পর যখন মূর্তিটা উদ্ধার হল, তখনই প্রেতশাসকদের টনক নড়ে গেল। What a story!
লেখনীর সবচেয়ে বড় ত্রুটি যেটা মনে হয়েছে, ঘটনার বর্ণনা আর চরিত্রের সংলাপ; এ দুইয়ের মধ্যে যে সামঞ্জস্য থাকা উচিত, তা অনুপস্থিত। একজন চরিত্রের মনোলগ আর ঘটনার ন্যারেশন, এগুলো মিলেমিশে একাকার। পরের প্যারায়ই ঘটনার মাঝখানে হঠাৎ শুরু হয়েছে সংলাপ। ৪৮ পৃষ্ঠায় ঘটনা এমনভাবে শুরু হয়েছে, যেন গল্পের ইনভিজিবল ন্যারেটর অতীতের স্মৃতিচারণের ভঙ্গিতে সেসব বলে যাচ্ছে। পরের পৃষ্ঠায় হঠাৎ সেই ন্যারেশনের মাঝেই শুরু হয়েছে ব্রুনো এদ্রোগার নামে এক চরিত্রের সংলাপ। ৫৭ পৃষ্ঠায় আবার গল্পের মাঝখানে পরিবর্তন হয়েছে Tense. পুরো ন্যারেশন অতীত কালে বর্ণনা করে শেষ প্যারায় চলমান বর্তমান বা Present Continuous Tense এ ঘটনা বলা হয়েছে। একই সমস্যা রিপিট হয়েছে ৬৩ পৃষ্ঠায়ও। অতীতকালের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে বর্তমান কালের বয়ানে। আবার, ১৫৬ পৃষ্ঠায় আরিফ নামে একজন সাইড ক্যারেক্টারের পার্সোনাল মনোলগে ঘটনা দেখানো হয়েছে, অথচ ওই অংশের গল্প যখন শুরু হয়েছে তখন আরিফ ছিল থার্ড পার্সন। পরের পৃষ্ঠায়ই আরিফ আবারও থার্ড পার্সন হয়েছে এবং ঘটনার ন্যারেশন শেষ হবার আগেই শুরু হয়েছে সংলাপ। এগুলো আগে-পরেও অনেকবার হয়েছে।
“সুহারের পৃথিবীতে অবস্থান মানে, পৃথিবীর শেষ।’’ বৃদ্ধ হাকিম নিজে মুখে বলেছে ১২৩ পৃষ্ঠায়। ১৩১ পৃষ্ঠায়, ‘অজানা আতঙ্কে ঈসালের বুক কেঁপে উঠেছে’, ‘১৪০ পৃষ্ঠায় মাহাভিরানের হাতের শাবল মাটিতে পড়ে গেছে’। অর্থাৎ, সুহারের আগমন মানেই অতিভয়ানক কিছু। তাহলে তো সারাপৃথিবীর সমস্ত প্রেতশাসকদের একত্রে ব্যবস্থা নেবার কথা। গল্পের ব্যাকস্টোরিতে বলা আছে যে, প্রেতশাসকেরা সারা পৃথিবীতেই এক সঙ্গোপন ভাতৃসংঘ তৈরী করে রেখেছে, সবখানে তাদের শাখা আছে। তাহলে, ফরহাদের পৈতৃক বাড়িতে “আলখেল্লা পরিহিত কয়েকজন” লোককে দেখা গেল কেন? পুরো পৃথিবী ধ্বংস হতে বসেছে আর মাত্র কয়েকজন এসেছে সেটা সামাল দিতে! ভারতীয় প্রেতশাসক মাহাভিরান আর পাকিস্তানি প্রেতশাসক ঈশাল ব্যতীত আর কোন বিদেশির কথা উল্লেখ নেই। ১৫২ পৃষ্ঠায় বলা আছে যে, ঢাকায় অবস্থান করছে ৬জন প্রেতশাসক। এত কম সংখ্যক লোক কেন? আমেরিকা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের মহাক্ষমতাধর প্রেতশাসকেরা কই? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, সব ঘটনার শুরু যে জার্মানি থেকে, সেখানকার প্রেতশাসকেরা অনুপস্থিত কেন? এই গুপ্তসংঘের আচরণ বড্ড দায়সারা, বলতেই হচ্ছে। ফরহাদের মা মনাইকা মারা গেল, তখন কেউ খোঁজই নিতে এলোনা। জার্মানিতে ফরহাদের বউ মারিয়া মারা গেল তাও কোন প্রেতশাসক অস্বাভাবিকতা দেখে ইনভেস্টিগেট করলোনা। দুই যুগ পর, যখন পৃথিবীই ধ্বংস হতে চলেছে তখনও তাদের সেরকম এক্টিভিটি নেই, এদের সমস্যাটা কী! এরা কী নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়?
১৫৪ পৃষ্ঠায় দেখানো হল, ঈশাল নামের এক প্রেতশাসক সাখায়েত নামের এক লোককে খুঁজছে। অথচ তার কাছাকাছিই সাখায়েত ছিল কিন্তু সে দেখেনি। ঈশালের কাছে সাখায়েতের ছবি নেই? মানলাম নেই, কিন্তু প্রেতশাসকেরা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হয়, বইয়ে দেখানো হয়েছে। মাহাভিরান নামের এক প্রেতশাসক হান্নানের সাইলেন্ট করা ফোনে কল আসলেও বুঝতে পারে আর ঈশাল সাখায়েতের পাশ দিয়ে হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেও বুঝতে পারেনা! অথচ কয়েক পৃষ্ঠা পরে ঈশাল সেই বাজারেই সাখায়েতকে দেখামাত্র চিনে ফেলে। ঈসাল নামটির বানানেরও কোন ছিরিছাঁদ নেই। নামটিকে কখনো লেখা হয়েছে ‘ঈশাল’ আবার কখনো ‘ঈসাল’।
কাহিনীর আরেক অপ্রয়োজনীয় চরিত্র হল হান্নান। এটা বলার কারন হল, হান্নানের মত আরও কিছু চরিত্র কাহিনীতে হুট করে এসে ফট করে হারিয়েও গেছে। ব্রুনো এদ্রোগার, আটলান ওঝান, হাকিমা, ইয়াসিন সাহেব, আর্কিওলজিস্ট আজাদ, ডাক্তার সুজাতা এরা সবাই কাহিনীর গৌণ চরিত্র। যাদের না আছে কোন গভীরতা, না আছে মনে রাখার মত কন্ট্রিবিউশন। অথচ, প্রায় বিনা কারনে হান্নান রয়ে গিয়েছে একেবারে এন্ডিং পর্যন্ত। ফাইনাল অপারেশনে তার মত সাধারন মানুষকে কেন সাথে রাখা হল এটারও কোন ব্যাখ্যা নেই। ১৫৬ পৃষ্ঠায় দেখানো হল, হঠাৎ ফরহাদের সাথে হান্নানের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে, অথচ তাদের দেখা হয়েছেই মাত্র একবার, প্রত্নতাত্ত্বিক ভবনে। ফরহাদের সাথে তার বন্ধুত্ব হবার মত পর্যাপ্ত স্ক্রিনটাইম কোথাও ছিলনা। ফরহাদ তার স্ত্রী হারানোর বেদনা শেয়ার করছে কিংবা হান্নান তার সন্তান হারানোর শোক শেয়ার করছে, এমন কিছুই গল্পে দেখানো হয়নি। তাহলে, দু'জনের মধ্যে বন্ডিংটা হল কীভাবে?
এন্ডিং টুইস্টটা আমার ছোট মাথায় ঢোকেনি। কাহিনীতে যেরকমটা দেখানো হয়, সাচির কথানুযায়ী ঈশাল ধারনা করেছিল যে, সুহারের ভেসেল আনাইয়ার গর্ভে যে সন্তান জন্মাবে সে হল ন র কে র সাতজন পি শা চ দে ব তা র একজন। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আনাইয়ার দেহকে পজেস (Possess) করার পর অরিজিনাল সুহার কেন বাচ্চাটাকে মারতে উদ্যত হল? বাচ্চাটা আসলে কে? ফরহাদের মুখের কথায় সুহার কেন ন র কে ঝাঁপ দিল? ফরহাদের হয়ত অলৌকিক শক্তি থাকতে পারে, লেখক বারকয়েক এরকম ক্লু দিয়েছেন। কিন্তু ফরহাদের ভেতর একটিবারের জন্যও সেরকম কোন শক্তি প্রকট হতে দেখা যায়নি। বিষয়টার একটা পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত ছিল কী না?
১৫৬ পৃষ্ঠায় আরিফ নামের মেডিক্যাল স্টুডেন্টকে উদ্দেশ্য করে লেখা, “সে দ্রুত ডায়বেটিস বিভাগের শেলফে থাকা ইনসুলিনের শিশিগুলোর কাছে চলে গেল।” হাসপাতালে এন্ডোক্রাইন বিভাগ থাকে, কিন্তু ডায়বেটিস বিভাগ আবার কী? আবার সেই বিভাগে শেলফের ভেতর কক্ষ তাপমাত্রায় বোতল বোতল ইনসুলিনও রাখা থাকে, আশ্চর্য! ফ্রিযে না রাখলে ইনসুলিন নষ্ট হয়ে যায়। যাকে বলা হয়, ডিন্যাচার্ড। পরের প্যারাতেই লেখা, “কিন্তু ক্লোরোফর্ম পাওয়া কঠিন, এখন আর এনেস্থেশিয়ায় এটা ব্যবহার হয় না, তবে গবেষণাগারে কিছু মজুদ আছে,”। ল্যাবে ক্লোরোফর্ম থাকতেই পারে, কিন্তু প্রশ্ন হল চুরি করতে হবে কেন? বাজার থেকেই তো কিনে নেওয়া যায়। লেখক কা লো জা দু, শ য় তা ন উ পা স না প্রভৃতি বিষয়ে গুগল থেকে ব্যাপক খোঁজাখুজি করেছেন অথচ এটা মিস করে গেছেন যে, ক্লোরোফর্ম অনেক ওষুধের দোকানেই পাওয়া যায়। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অনলাইন অর্ডারও করা যায়। আরিফ নামের এক দুশ্চরিত্র মেডিক্যাল স্টুডেন্ট কুকুরের খাবার কেনার জন্য ২০০০টাকা দিতে পারে কিন্তু ইনসুলিন আর ক্লোরোফর্মের মত সুপরিচিত ড্রাগ সে কিনতে পারেনা, চুরি করতে হয়। সে নাকি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, আশ্চর্য!
১৬৮ পৃষ্ঠায় লেখা, “আরিফ একজন ইন্টার্ন ডাক্তার, মেডিকেলের শেষ বছরের ছাত্র,” আশ্চর্য! একজন মানুষ কী একইসাথে ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট এবং ইন্টার্ন চিকিৎসক হতে পারে? এতবড় ভুল একজন লেখক কীভাবে করলেন! তিনি কী এই দুইয়ের মধ্যেকার পার্থক্য জানেন না!
পরিশেষে বলব, বইয়ের প্লট আহামরী খারাপ ছিলনা। কয়েক জায়গায় টুইস্টও অন পয়েন্ট ছিল। কিন্তু বইটি পড়তে যেয়ে বারবার এটাই মনে হয়েছে যে, লেখক গল্প সাজানোর সময় যা ভেবেছেন, যেসব সিনারিও কল্পনা করেছেন, তা প্রপার্লি এক্সিকিউট করতে পারেননি। আবার কাহিনীর স্বার্থে অনেকগুলো ঘটনা প্যারালালি দেখাতে যেয়ে তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট বিসর্জন দিতে হয়েছে। বইটি বড় হলে হয়ত এই সমস্যা কাটানো যেত। লেখকের পরবর্তী বইয়ের জন্য শুভকামনা, তবে এ বইকে কত রেটিং দেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান।
১৯ বছর পর নিজ বাড়িতে ফিরেছে ফরহাদ। প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত ফরহাদের এই বাড়িটা থেকে একদিন সে পালিয়ে গিয়েছিলো। পালানোর দিনে এমন ভয়ঙ্কর এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি সে হয়েছিলো, তা আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। অভিশপ্ত এই বাড়িতে এতো বছর পর কেন ফিরে এলো ফরহাদ?
সুহাসিনীকে দেখে যেন চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেলো ফরহাদ। নীল চোখের অসামান্য সুন্দরী এই মেয়েটা তার ছোট ভাই রিয়াদের স্ত্রী। কিন্তু এটা কি করে সম্ভব! রিয়াদ পুরোপুরি প্রতিবন্ধী একজন মানুষ। তার সাথে সুহাসিনীর মতো মেয়ের বিয়ে কিভাবে হলো, ভেবে পায় না ফরহাদ। এদিকে এই আগুন-সুন্দরীও যেন চোখের ইশারায় ফরহাদকে টানছে নিজের দিকে। ফরহাদ কি পারবে এই আহবান উপেক্ষা করতে?
৩০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্টে ঘটে যায় ভয়াবহ কিছু ঘটনা। সেই ঘটনার কারণেই একদল নারীর কাছে আবিস্কৃত হয় নরকের ভয়ঙ্কর পিশাচ সুহারের উপাসনালয়। পিশাচ সুহারের সাথে এই নারীদের একটা লিখিত চুক্তি হয়। যে চুক্তির শর্ত ঠিকঠাকমতো পালন করতে পারলে এই পৃথিবীর বুকে সশরীরে পা রাখতে পারবে পিশাচ সুহার৷
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এক অঞ্চল থেকে পাওয়া গেলো বীভৎস দর্শন একটা মূর্তি৷ সারা বিশ্বের প্রেতশাসকরা জানে, মূর্তিটা পিশাচ সুহারের। চারিদিকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেলো। এদিকে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের আরো কিছু দেশে অদ্ভুতভাবে মারা যেতে লাগলো নবজাতকরা। পিশাচ সুহারের উপাসক ডাইনরাও যেন বেপরোয়া হয়ে উঠলো কিছু রিচুয়াল পালনের জন্য। আর এসবের সাথে আবারও জড়িয়ে পড়লো ফরহাদ। শেষ কোথায় এই ভয়াবহ ঘটনাচক্রের?
সাহিল রহমানের সুপারন্যাচারাল থ্রিলার 'তুক' পড়তে গিয়ে আমি আবারও রিডার্স ব্লকের শিকার হতে যাচ্ছিলাম। প্রায় হয়েই গেছিলাম। 'তুক'-এর মূল প্লট চমৎকার। কিন্তু শুরু থেকে সাহিল রহমান এতো ভুল বানানের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন যে কাহিনিটা আমাকে টানতেই পারছিলো না। শুরুর ৩/৪ অধ্যায় পর্যন্ত গড়ে প্রত্যেক লাইনে একটা করে ভুল বানান পেয়েছি আমি৷ বাক্যগঠনেও ছিলো অনেক সমস্যা। এক পর্যায়ে এমনও মনে হয়েছে যে আর বোধহয় পড়তে পারবো না বইটা। অনেকটা নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করেই পড়া চালিয়ে গেছি।
ডেমনোলজি ও এক্সোরসিজম নিয়ে 'তুক' লেখা হয়েছে দাবী করা হলেও এক্সোরসিজম সম্পর্কিত তেমন কিছুই মূল কাহিনির মধ্যে পাইনি। পিশাচ সুহারকে নিয়ে ফরহাদের মায়ের কিছু নোট আর ডেমনদের সাথে সম্পর্কিত বাইবেলের কিছু শ্লোক ছিলো। এই ব্যাপারগুলো ভালো লেগেছে। 'তুক'-এত মাঝামাঝি পর্যন্ত এসে অবধি থিমটা ভালোই লাগছিলো। কিন্তু শেষাংশে এসে আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আর এআই জেনারেটেড পিকচারগুলো দিয়ে শুধু বইটাকে কলেবরে বৃদ্ধিই করা হয়েছে আমার মতে। আর কোন কাজ হয়নি। সব মিলিয়ে 'তুক' আমার কাছে একটা ফরগেটেবল সুপারন্যাচারাল থ্রিলার।
লেখক সাহিল রহমানের উচিৎ বানান ও বাক্যগঠন নিয়ে আরো মনোযোগী হওয়া। আমার বিশ্বাস, সিরিয়াসনেস থাকলে এই বাধাগুলো তিনি এক সময় কাটিয়ে উঠবেন। সব বাদ দিলে সুপারন্যাচারাল থ্রিলার হিসেবে 'তুক'-এর প্লট প্রশংসনীয়। ঠিক মতো এক্সিকিউট করতে পারলে বইটা অসাধারণ কিছু একটা হিসেবে দাঁড়াতো।
বাতিঘর প্রকাশনী বাংলাদেশের অন্যতম প্রথম শ্রেণীর প্রকাশনা সংস্থা। পাণ্ডুলিপি বাছাই ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাদের আরো মনোযোগ আশা করছি একজন পাঠক হিসেবে।
খুব ভালো একটা প্লটের এই অবস্থা দেখলে খারাপই লাগে। সবকিছু হুটহাট করে চলছিল। একের পর এক ঘটনা ঘটেছিল যার আগে বিন্দুমাত্র বিল্ডাপ নেই। লেখকের প্রথম বইটা বেশ গোছানো ছিল। এই বইয়ের প্লট নিয়ে লেখক যদি আরো ধীরে সুস্থে এগোতেন তাহলে খুবই ভালো একটা বই পেতাম আমরা। আশা করি সামনে লেখক ধীরেসুস্থে সবকিছু গুছিয়ে এনে দারুণ কিছু দিবেন আমাদের। লেখকের ঐন্দ্রজালিক পড়ার সাজেশন রইল।
উপন্যাসটির প্লট খুবই সুন্দর ছিল, লেখকের কাহিনী বর্ণনা এমন ছিল যে আমার মনে হচ্ছিল আমি পুরোটাই নিজে চোখে দেখেছি। এক রকম অস্থিরতা কাজ করছিল বইটা পড়ার সময় যে কি হবে এর পরে। সুন্দর ভাবে ইতি টেনেছেন।বইটা পড়ার পর আরও জানতে ইচ্ছে করছে ডেমনোলজি নিয়ে।
খুব ছোট করে রিভিউ দিলে বলব, এটি ভিন্নধরনের কাজ। বইটি হরর জনরার হলেও এখানে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তা চিরাচরিত ভৌতিক উপাদানের মতো নয়। বইটি পড়ার সময় আমার Hereditary এবং Constantine সিনেমার কথা মনে পড়েছে। এই ধরনের সিনেমাগুলোতে যেমন একটি ডেমনের নিজস্ব পূর্ব ইতিহাস থাকে, তেমনি লেখক ‘সুহার’ নামকরণে একটি ডেমনকে তৈরি করেছেন, শুধু নামে নয়, বরং তার নিজস্ব একটি ব্যাকস্টোরি রয়েছে।
প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, হয়তো ‘সুহার’ নামে কোনো ডেমন আগে থেকেই এক্সিস্ট করে। পরে গুগল করে দেখলাম, এমন কিছু নেই। লেখকের এই মৌলিক সৃষ্টি আমার কাছে চমৎকার লেগেছে।
সুহারের পৃথিবীতে আগমনের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তার উপাসনাকারীরা বেছে নিয়েছে একটি নির্দিষ্ট দিন, সেটা হল জিশুর মৃত্যুদিবস। কেন তারা জিশুর মৃত্যুর দিনটিকে বেছে নিয়েছে? কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে প্রেতশাসকেরা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে। ছুটে যায় বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে সুহারের মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল। ধীরে ধীরে রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে।
গল্পের প্লট ইউনিক এবং বিশদ, তবে প্লটের তুলনায় গল্পের আকার ছোট। ডেমন ‘সুহার’ ও প্রেতশাসক এই দুটো বিষয়ে আরও বিস্তৃত বর্ণনা, আলোচনা ও ঘটনাপ্রবাহ প্রয়োজন ছিল।
গল্পের মধ্যে একটি ব্রেইনস্টর্মিং উপাদান কাজ করেছে। লেখকের প্রতি আহ্বান থাকবে, এই ধরনের নতুন ও ভিন্নধর্মী গল্প আরও উপহার দেবেন।
I barely made it through 30 pages before my soul started leaking out of my eyes. Can already tell it's the worst f***ing book of my life. Didn’t know it was possible to kill brain cells through words.
This is my second time sharing my overview. It's an awesome book that I love to read. The only thing that needs to improve is spelling mistakes. Hopefully, this one will be taken care of by the Publication.