অন্তত দুই হাজার বছর ধরে চট্টগ্রাম একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। খ্রিস্টপূর্ব যুগে এই অঞ্চলের আর কোনো বন্দর বহির্বিশ্বে এতটা পরিচিত ছিল না। কিন্তু চট্টগ্রামের পরিচিত ইতিহাসের আড়ালে এখনো লুকিয়ে আছে বহু অজানা-অশ্রুতপূর্ব চাঞ্চল্যকর ঘটনা। চারশ বছর আগে চট্টগ্রামের এক নৌবহর সুদূর মালদ্বীপ আক্রমণ করে সেখানকার রাজাকে হত্যা করেছিল, এ তথ্য অনেকেরই জানা নেই।
নামের সঙ্গে "চেনা চট্টগ্রামের অচেনা ইতিহাস" লেখা আছে বিধায় এতে শুধু খণ্ডিত ও চিত্তাকর্ষক (কিন্তু তুলনামূলকভাবে অগুরুত্বপূর্ণ) কিছু ঘটনা আছে বলে আন্দাজ করেছিলাম। খণ্ডিত (এই ধারণাটা ঠিক আছে), অগুরুত্বপূর্ণ (একেবারেই নয়।) চট্টগ্রামের সদরঘাট থেকে ১৭টা কামান চুরি হয় ১৮১১ সালে। এর সঙ্গে জড়িত ইঙ্গ-বার্মা যুদ্ধ আর আরাকানিদের স্বাধীন হওয়ার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টার গল্প।চট্টগ্রাম শহরে কফি বাগান করে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার অসফল প্রয়াস অজানা ছিলো, অজানা ছিলো মালদ্বীপের বাঙালি রাণি কানোবিবির ইতিহাস। ফ্রাঁসোয়া পাইরার্ডের চোখে চট্টগ্রামের বিবরণ বেশ কৌতূহলজনক। তিনি জানিয়েছেন, পূর্ব ভারতীয় অঞ্চলে এতো জিনিসের প্রাচুর্য আর কোথাও ছিলো না। দাসদের নাকি পাওয়া যেতো সবচেয়ে সস্তায়, মন্দিরে থাকতো সাদা হাতি, বিভিন্ন ধর্মের মানুষজন শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতো। চাকমা রাজবাড়ির মুসলমান রাজা আর ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের বাংলা বিজয়ের ইতিহাস পড়ে আনন্দ পেয়েছি। তবে বইয়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায় "ভিলেজ অব চিটাগং : পেনসিলে আঁকা শহরের গল্প" যা একটি ডকু ফিকশন। ১৮৩৭ সালে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ তাদের খাজনা চারগুণ বাড়ানোর প্রতিবাদে বিদ্রোহ করে ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে এবং সফলও হয়। এ ইতিহাস যেমন জমজমাট তেমনই অনুপ্রেরণাদায়ী ( চমৎকার সিনেমা বানানো সম্ভব পুরো গল্পটা নিয়ে।) রবীন্দ্রনাথ ও কেদারনাথকে নিয়ে অধ্যায়, মুন্নী বেগম ও হিরাম কক্সের ডায়েরি অধ্যায়গুলো সুলিখিত হলেও এ বইতে না-ও থাকতে পারতো। সব মিলিয়ে, "চিৎ -তৌৎ- গং"(আর যুদ্ধ নয়) হারুন রশীদের আরেকটি পরিশ্রমলব্ধ সুপাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থ।
( প্রকাশনীগুলো ফন্ট অহেতুক বড় রেখে পৃষ্ঠাসংখ্যা বৃদ্ধি করে বইয়ের দাম বাড়াচ্ছে ইচ্ছেমতো।কতোদিন আর আমাদের বই কেনার সামর্থ্য থাকবে জানি না।)
কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা যেগুলোর সাথে কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রাম। কিছু ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে, কয়েকটা আবার এমনি গল্পের মতো, পাশাপাশি দুয়েকটা হাইপোথিসিসও চোখে পড়ল। হারুন রশীদের উপস্থাপন ভঙ্গিমার কারণে সেগুলো আনন্দের সাথেই পড়ে ফেলা গেল।
পরিচিত জায়গা, চেনা গলি কিন্তু অজানা সব ইতিহাস। চট্টগ্রামের মানুষ হওয়ায় সব জায়গায় গুলোই কম বেশী পরিচিত, যাওয়াও হয়েছে মোটামুটি সব কয়টাতেই কিন্তু এইসব সাধারণ জায়গার পিছনে যে লুকানো ইতিহাস রয়েছে সেটা কখনোই মনে আসে নি। চট্টগ্রাম কে বলা হয় "বার আউলিয়ার শহর" কিন্তু সেই বার আউলিয়ার একজন "বদর পীর" যার সাথে এসেছিল আরও ১১জন আউলিয়া সেই পীর সম্পর্কে আমি কিছুই জানতামই না।পাথরঘাটা খুব চেনা গলি রাস্তা ঘাট, এই এলাকার সাথে ইংরেজ আমলের অনেক ইতিহাস জড়িত কিন্তু কখনোই মাথায় আসে নি এই পাথরঘাটার নামকরণ টা আসলে কিভাবে হয়েছিল! চট্টগ্রামে কফি চাষ,চাকমা মুসলমান রাজার কাহিনী পড়ে যেমন অবাক হয়েছি ঠিক তেমনি চমকপ্রদ হয়েছি ডকু ফিকশন "ভিলেজ অব চিটাগং ১৮৩৭: পেনসিলে আঁকা শহরের গল্প" পড়ে,এইরকম টান টান উত্তেজনাকর একটা ঘটনা যা চট্টগ্রামের মানুষের গর্ব,ঐতিহ্য আরও কয়েকশ গুন বাড়িয়ে দেয় অথচ এই বই পড়ার আগে জানতামই না।রীতিমতো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে মতন ইতিহাস! কিছু টা খন্ডিত আবার কিছুটা অনুমেয় এমন অনেক তথ্য নির্ভর বই টা যেন আমার নিজের শহর কে আবার নতুন করে নতুন ভাবে মেলে ধরলো।পড়তে পড়তে লজ্জা হচ্ছিল ইশ! নিজের শহর সম্পর্কেই জানি না ভেবে আবার মন খারাপ হচ্ছিল এক প্রবল সম্ভাবনাময় এক অঞ্চলের বর্তমান দশা ভেবে।কিন্তু পড়া শেষে এক অজানা ভালো লাগা আর গর্বও হয়েছে। লেখক কে ধন্যবাদ আমাদের শহর যে কত অসাধারণ ইতিহাস বহন করে দাঁড়িয়ে আছে সেটা আবারও মনে করিয়ে দেয়ার জন্য,যে ইতিহাস শুধু মাত্র চট্টগ্রাম শহরের না যার সাথে জড়িয়ে আছে আরাকান,বার্মা,মালদ্বীপ এবং আরও নানা কিছু।
চিৎ-তৌৎ-গং। বাংলায় যার মানে দাঁড়ায় আর যুদ্ধ নয়। প্রাচীন আরাকানি শব্দ। চট্টগ্রাম শব্দের সাথে প্রচুর মিল দেখা যাচ্ছে না? চট্টগ্রামের নামকরণের সাথে প্রাচীন যে কয়েকটি সূত্রের কথা ধারণা করা হয়, চিৎ-তৌৎ-গং তার মধ্যে অন্যতম।
চট্রগ্রামের ইতিহাস দু একশো বছরের পুরনো নয়। কমপক্ষে হাজার দুয়েক বছর ধরেই চট্টগ্রামের নাম জড়িয়ে আছে পৃথিবীর বাণিজ্যিক এবং সামরিক পরিসরে। সুজলা সুফলা বাংলার অন্যতম প্রধান এই জায়গার গুরুত্ব সারা বিশ্বেই ছিল। সেই চট্টগ্রামের খন্ড বিখন্ড কিছু চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে লেখা চিৎ-তৌৎ-গং।
চিৎ-তৌৎ-গং শুধু চট্টগ্রামেই আটকে থাকেনি। চট্টগ্রামের সঙ্গে এক টিকেটে ঘুরে আসা যাবে মালদ্বীপ, বার্মা, আরাকান, এমনকী সেই সূদুর জার্মানেও। বিভিন্ন স্থানের ঘটনা এখানে উল্লেখ হলেও সমস্ত ঘটনার চাবিকাঠি খুঁজে পাওয়া যাবে এই চট্টগ্রামেই। যেমন ধরুন বাঙালি এক তরুণী ঘটনাক্রমে মালদ্বীপের রাণির আসনে বসেছিলেন, জানতেন? যারা মনে করেন ফোন, ওয়াইফাই, ইন্টারনেট এসে পুরুষ মানুষের স্বভাব চরিত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্যে দুঃসংবাদ আছে এই অধ্যায়ে। ঠিক তেমনি সুন্দরী হলে সাতখুন যে মাফ পাওয়া যায়, সেই আদিকাল থেকে বর্তমানেও এই নিয়ম প্রচলিত আছে সেটাও জানা যাবে। থাক, মজা করে কাজ নাই। চলেন কফি খেয়ে আসি। চট্টগ্রামে একসময় কফি চাষ হত, সেই ইতিহাস জেনে ভালোও লাগল দুঃখও লাগল। এখন এই অধমদের কফি খেতে হলে কিডনী খুলে দেয়া লাগে। চট্টগ্রামের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে জার্মান নৌবাহিনী গঠিত হওয়ার ইতিহাস। জার্মান নৌবহরের প্রধান জাহাজই ছিল চট্টগ্রামে তৈরী। পড়তে পড়তেই জানা যাবে, সেই চট্টগ্রাম ক্লাব যার দরজায় লেখা ছিল ‘Dogs and Indians are not allowed' সেই ক্লাব সৃষ্টির ইতিহাস।
ছোট ছোট বেশ কয়েকটা অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে চট্টগ্রামের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা নানা ইতিহাস। কোনোটা হয়ত আমরা জানি, কোনোটা জানা ছিল না। ঝরঝরে লেখার ফলে জানা থাক বা না থাক পড়তে একেবারেই বিরক্তি আসে না। নন ফিকশন মানেই যে ভীষণ কঠিন কঠিন সব শব্দ বা খটমটে বাক্যের আধিক্য থাকতে হবে এমন একটা ধারণা প্রচলিত হয়ে আছে লেখক সেই রাস্তায় না হেঁটে যথেষ্ঠ সহজ সরল প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণনা করে গিয়েছেন। এই জন্যে আমি লেখককে সাধুবাদ জানাব। তবে দুয়েক জায়গায় সরাসরি অনুবাদ করার ফলেই কিছুটা কাঠিন্য চলে এসেছে। সরাসরি অনুবাদ না করে নিজের ভাষায় লিখলেই সম্ভবত এরকম মনে হত না। সেটাও ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। সালের এদিক ওদিক হয়েছে এক আধ জায়গায়। আশা করি পরের মুদ্রণে শুধরে নেয়া হবে।
ভদ্রলোকের অনূদিত থাংলিয়ানা পড়ে ভীষণ ভালো লেগেছিল। চিৎ-তৌৎ-গং পড়েও ভালো লাগার একটা রেশ রয়ে গেল। যারা ইতিহাসের বই পড়তে পছন্দ করেন এই বইটাও তাদের ভালো লাগার কথা।
চিৎ-তৌৎ-গং চেনা চট্টগ্রামের অচেনা ইতিহাস হারুন রশীদ কথাপ্রকাশ
রাঙামাটিতে চাকমাদের রাজবাড়িতে গেছেন কখনো? গেলে নিশ্চয়ই দেখার কথা রাজবাড়ীর সামনের চত্বরে রাখা ফতে খাঁ নামক কামানটি। এই ফতে খাঁ কিন্তু চাকমাদেরই এক রাজার নাম। ভাবুন তো একবার চাকমাদের নামের যে নিজস্ব তাদের প্যাটান রয়েছে তার বাইরে গিয়ে এই ফতে খাঁ নামক লোকটি কীভাবে রাজা হয়েছিলো!
হঠাৎ এই বইয়ে চাকমাদের আলাপ কেন আসছে তা নিশ্চয়ই ভাবছেন! চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাথে আসলে এই চাকমাদের কথাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৪১৯ সালের আগ পর্যন্ত চাকমারা আরাকানের কালাদান নদীর তীরবর্তী চাক্যেইধাও নামক স্থানে বসবাস করতো। কিন্তু ১৪১৯ সালে আরাকানদের আক্রমণের মুখে চাকমা রাজা তার রাজ্য চট্টগ্রামের আলিকদমে রাজধানী স্থাপন করেন, সেখান থেকে রাঙ্গুনিয়া হয়ে সর্বশেষ রাজবাড়ী স্থাপিত হয় রাঙামাটিতে। অবশ্য সেই রাজবাড়ীটা কাপ্তাই হ্রদে হারিয়ে গিয়েছে।
বর্তমান সময়ে আরকান রাজ্যর সহিংসতার কারণে আমাদের দেশে অনেক আরাকানী শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে এই কথা তো সবাই জানেন। কিন্তু এই আরাকানের সহিংসতা কিন্তু নতুন কোনো সমস্যা নয়, এই সহিংসতা চলে আসছে সেই কোম্পানি আমল থেকেই। সেই সময়েই অনেক আরাকানী শরণার্থীও বার্মিজদের অত্যাচারে চট্টগ্রাম সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছিলো, ১৮১১ সালের তাদেরই এক দল চট্টগ্রাম শহর থেকে ১৭টা কামান চুরি করে পলাতক আরাকান রাজার সন্তান খিয়েনবিয়েনের নেতৃত্বে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো আরাকান রাজ্যের বিরুদ্ধে, যার প্রভাব কোম্পানি শাসনে থাকা চট্টগ্রামেও পড়েছিলো। যার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলো এক ইংরেজও, নাম যার হিরাম কক্স। তার নামেই তো নাম হয়েছে কক্সবাজার জেলার।
এসব কিছুর মাঝেও চট্টগ্রামের ইতিহাসের এক অন্যতম অধ্যায় হয়ে রয়েছে 'মুন্নি বেগম'। না, বিখ্যাত কোনো নায়িকা কিংবা গায়িকা নয়, এমনকি মানুষ্যজাতিরও কেউ নয়। মুন্নী বেগম চট্টগ্রামের এক বিখ্যাত গন্ডারের নাম, যার আদি নিবাস রামুর জঙ্গলে হলেও তার ঠাঁই হয়েছিলো লন্ডনের চিড়িয়াখানায়। এতদূর পথ কীভাবে পাড়ি দিলো মুন্নী বেগম জানতে চান!
সবাই তো জানেনই চট্টগ্রামের চা বিশ্ব বিখ্যাত, কিন্তু জানেন কী কীভাবে গোড়াপত্তন হয়েছিলো এই চা চাষের! এটা জানেন কী যে একসময় চট্টগ্রামে চায়ের পাশাপাশি কফিরও চাষ হয়েছিলো! শুধু কী তাই, এই চায়ের হাত ধরেই কিন্তু চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছিলো আসম বেঙ্গল রেলওয়ের রাস্তা, আজকের সেই রেললাইন বাস্তবায়নের পিছনে কিন্তু এক বাঙালির অবদান ছিলো, জানেন সে কে! যার কথা ইতিহাস মনে রাখেনি। চট্টগ্রাম শুধু চায়ের জন্যই বিখ্যাত ছিলো তা নয়, এছাড়াও চট্টগ্রামেই তৈরি হওয়া জাহাজ বিশ্বের নানান প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছি, সমুদ্রে রাজত্বও করেছে।
এই যে কোম্পানিদের আমাদের দেশে দাপট, তাতে মানুষের মাথার ভিতরে গেঁথে গিয়েছিলো যে এই শ্বেতাঙ্গরা হলো শাসক, তারা সবসময়ই নেটিভদের শাসন করবে। সবাই কিন্তু তা মেনে নিলেও চট্টগ্রামের পটিয়ার হুলাইন অঞ্চলের কিছু মানুষ সেটা মেনে নিতে পারেনি, তাই তো কিছু লোক একত্রিত হয়ে আচ্ছা মতো ধোলাই করেছিলো কোম্পানির কিছু হর্তাকর্তাদের। যার পিছনেও কারণ ছিলো এক চাটগাঁইয়া যুবক আর বিদেশি নারীর। যাদের বন্ধুত্বের বন্ধন পাঠকেও মুগ্ধ করবে।
এমন সব চট্টগ্রামকে ঘিরে নানান ঘটনা, ভৌগোলিক অবস্থা, ইতিহাস আর ব্যক্তিদের বর্ণনা নিয়েই সাজানো হারুন রশীদ এর লেখা চিৎ তৌৎ গং বইটা। চট্টগ্রামের বাসিন্দা বলেই হয়তো চট্টগ্রাম নিয়ে লেখা বই দেখলেই আমি ঝাপিয়ে পড়ি পড়ার জন্য। এই বইটাও সেই উদ্দেশ্যেই নিয়েছিলাম। বইটা পড়ে পুরোনো কিছু জানা ইতিহাসের সাথে নানান অজানা ইতিহাসের অধ্যায়ও জানা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের চট্টগ্রাম সফর, ইবনে বতুতা কিংবা ফ্রাঁসোয়া পাইরার্ডের চোখে দেখা সেই জঙ্গল আর পাহাড়ে আবৃত সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম নগরীর ইতিহাসের নানা অজানা অধ্যায় নিয়ে জানতে পেরে বইটা খুবই ভালো লেগেছে।
চট্টগ্রামকে বার আউলিয়ার শহর বলা হয় তা তো সবাই জানেন, কিন্তু কেন তা জানেন কী! এই বার আউলিয়ারা ঠিক কার নেতৃত্বে এই বাংলায় এসেছিলেন বলেন তো! সেই মহান সাধকের বর্ণনা আছে বইটিতে। যাকে নিয়ে এখনো কিংবদন্তি ঘুরেফিরে চট্টগ্রামের মানুষের মুখে। যাঁকে বলা হতো চট্টগ্রামের অভিভাবক, কোম্পানি থেকে শুরু করে সুদূর বার্মার রাজরাজারাও যাকে দেখতেন সম্মানের চোখে।
লেখক হারুন রশীদের বর্ণনা বেশ সাবলীল, তাছাড়া বইটিতে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থা, ব্যক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোটো ছোটো অধ্যায় আকারে বর্ণনা করায় পড়তে সময়ও তেমন লাগে না। বইটিতে কেবল বিরক্তিকর বর্ণনা লেগেছে দুটো জায়গায় তার একটা হলো চা চাষের পদ্ধতি পড়ে আর অন্যটা হলো চাকমা রাজা ফতে খাঁর কাহিনির পুনরাবৃত্তি দেখে। বইটার নামকরণ আমার কাছে একেবারে পারফেক্ট লেগেছে, এই নামের পিছনেও আছে আরেক ইতিহাস, যেখান থেকে ধারণা করা হয় আজকের চট্টগ্রাম শব্দের উদ্ভব ঘটেছে।
চট্টগ্রামের ইতিহাসকে জানার জন্য পুরোপুরি ভাবে উপযোগী বই বলা যায় না এই বইটি, তবে প্রাচীন এই শহরটিকে ঘিরে নানান ঐতিহাসিক ঘটনা উপভোগ করার জন্য বইটি বেশ সহায়ক হবে। যা ইতিহাসকে হয়তো পুরোপুরি ধারণ করতে না পারলেও চট্টগ্রাম শহরের প্রাচীন আভিজাত্য নিয়ে একটা ধারণা তৈরি করে দিবে।
বইটি যদিও ভালো কনটেন্টের তারপরও প্রকাশক কথাপ্রকাশ নিয়ে কিছু বলা দরকার। বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৩০, এই ২৩০ পৃষ্ঠার চারপাশে আবার অতিরিক্ত মার্জিন রাখা হয়েছে, এই জোচ্চুরিটা না করলে পৃষ্ঠা সংখ্যা আরো কমে যেতো। মার্জিন দেখে মনে হয়েছে ক্রাউন সাইজের সেটআপ করা বই স্বাভাবিক সাইজে প্রিন্ট করে প্রকাশ করা হয়েছে। এদিকে দামও (৬০০টাকা) আমার কাছে অতিরিক্ত মনে হয়েছে। যদি এ দুটো বিষয় গায়ে না লাগে তাহলে চট্টগ্রামের অতীতের নানা জানা অজানা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে বইটি পাঠক নিতে পারেন।
চট্টগ্রাম, আমার আবাস থেকে বহু দূরে। তবুও পাহাড়ি অঞ্চল, মগ, আরাকানের সাথে যোগসাজশ আর সবুজ সব মিলিয়ে কর্ণফুলীর তীরের এই বন্দর-শহরটির উপর সবসময়ই এক অমোঘ আকর্ষণ কাজ করে। মেডিকেলে পড়াকালীন বন্ধুদের অধিকাংশই ছিল চাটগাঁইয়া। চট্টগ্রাম আর সিলেটের আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্য গর্ব করার মতো। তবে দুই অঞ্চলের ভাষা ভীষণই আলাদা। তখন ওদের কাছে শুনে শুনে বেশ বুঝতাম, এখন চর্চার অভাবে হারিয়ে গেছে। হারুন রশীদের লেখা আমার খুব ভালো লাগে। তাঁর বিষয়বৈচিত্র্য এবং লেখার সাবলীলতাই এর কারণ। চিৎ-তৌৎ-গং পড়ার পর তাই বাতিঘরে উপনিবেশ চট্টগ্রামটা এনে রাখারও আর্জি জানিয়ে রাখলাম। চিৎ-তৌৎ-গং শব্দটা প্রাচীন আরাকানি। এর অর্থ 'আর যুদ্ধ নয়।' চমৎকার একটা বার্তা দিয়ে শুরু হওয়া বইটা আমাদের চেনা চট্টগ্রামের অচেনা ইতিহাসে ডুব দেওয়ার সূচনা ঘটায়। আস্তে আস্তে চমকপ্রদ সব ঘটনা জানতে থাকি আর ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মালদ্বীপের সাথে চট্টগ্রামের বাণিজ্য সম্পর্ক, মালদ্বীপের ���াজার বাঙালি রানী আর ফরাসি নাবিক ফ্রাসোয়াঁ পাইরার্ডের দু:সাহসী কলম। একটা জিনিস বুঝলাম যে বাঙালিরা স্বভাবতই অস্থির, শঠ আর অসৎ। নয়তো বিদেশী সমস্ত পরিব্রাজকদের লেখাতেই এই বিষয়টি উঠে আসত না। ভিলেজ অব চিটাগং এর ডকু ফিকশনটা দুর্দান্ত লাগল। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট এর অন্যায় কর চাপিয়ে দেয়া, নেটিভদের প্রতিবাদ এবং চিত্রশিল্পী জেনি মেমের সাথে স্থানীয় বিপ্লবী আজহারের মিষ্টি আন্তরিক সম্পর্কের সাথে পৌষের কুয়াশাঘেরা সকাল চমৎকার একটা অনুভূতি দেয়। ফতে খাঁ নামে কামানের ইতিহাস জানতে গিয়ে চাকমা রাজাদের ইতিহাসও চলে আসে টুকটাক। অবাক লাগে। কাপ্তাই হৃদে বিশাল চাকমা রাজভবনটি তলিয়ে গেছে, নয়তো দেখতে যেতাম। এমন আরো নানা ঘটনার সাথে যুক্ত হয়েছে হিরাম কক্সের দিনলিপির নির্বাচিত অংশের অনুবাদ৷ সেখানে এসেছে মুন্নী বেগম নামে দুর্লভ গণ্ডারের গল্প, চিটাগাং ক্লাব স্থাপনের গল্প, প্রথম চা বাগানের শহরে বিশাল কফি বাগানের গল্প। অতীতে সুখময় একটা বিচরণ শেষে অস্থির বর্তমানে ফিরতে ভালো লাগে না। মনে হয়, বইয়ের মাধ্যমে অতীতচারণই বর্তমানে মানসিক শান্তি অর্জনের একমাত্র উপায়।
চকবাজারে নানার বাড়ী আর হুলাইন পার হলেই দাদার বাড়ি, বড় হয়েছি চন্দনপুরা, পাথরঘাটা আর আন্দরকিল্লার রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আর পড়েছি লাল বিল্ডিং অলা চট্টগ্রাম কলেজে, চেরাগী পাহাড়ের কোনার খৃষ্টান স্কিলে আর খেলেছি প্যারেড মাঠ , পাহাড়ের উপর পর্তুগীজ দূর্গ আর ওয়ার সেমেট্রির উলটা পাশের চট্টেশ্বরী রোড়ে। তাই যখন এই বই পড়ছি, তখন মনে হচ্ছে আমি আমার পূর্বসুরীদের দেখছি। চটুল ভাষায় লেখক বর্ননা করেছেন চট্টগ্রামের বিদ্রোহী রুপ, যোদ্ধা রুপ, কারিগরী সক্ষমতার রুপ বা রোহিংগাদের আশ্রয়দাতা হিসেবে রুপ। যেহেতু অপ্রকাশিত ইতিহাস তাই সূত্রগুলো দূর্বল।
কেনার আগে ভেবেছিলাম বইটা মনে হয় চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে। পড়ার শুরু করে বুঝলাম এইটা চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে সেটা ঠিক আছে কিন্তু খন্ড খন্ড ইতিহাসের কিছু টুকরো নিয়ে লেখা বইটা। অনেকটা চট্টগ্রাম নিয়ে কোন ব্লগ কে বই আকারে প্রকাশ। কিন্তু পড়তে অনেক ভালো লেগছে। এইটা যেনে অবাক হয়েছি যে একটা সময় চট্টগ্রামে গন্ডার ছিল