১৮০০ শতকের এক পূর্ণিমার রাতে আকাশ আচমকা মেঘে ঢেকে যায়, শেষরাতে বৃষ্টি হয় খুব। সেই প্রবল বৃষ্টির রাতে বিষ্ণুরায়ের জমিদারমহলে এক ভীতিকর অধ্যায়ের সূচনা হয়... তার গল্পই, তাহার বাড়ি অন্য কোথাও।
হরর প্রেমীদের জন্য মাস্ট রিড। হরর প্রেমী না হইলেও মাস্ট রিড। এই বছরের ওয়ান অফ দ্যা বেস্ট বই নি:সন্দেহে। অনেক দিন পরে হরর পড়ে মজা পেলাম। পরের পর্ব কি আসবে? আশায় রইলাম।
অল্প পরিসরে গা ছমছমে একটা ক্রিয়েচার হরর গল্প। দু'টো সময়রেখায় কাহিনী এগিয়েছে৷ একটা বর্তমান সময়ে, আরেকটা আঠারো শতকে। শেষে গিয়ে এক বিন্দুতে মিলেছে প্লট দু'টো। এই অংশটুকুতেই লেখকের মূল পরীক্ষা ছিল, যা তিনি উতরে গেছেন। উপভোগ্য।
সবথেকে বড় ভয় হল অজানার ভয়। এই বইয়ের গল্প গ্রাম্য পরিবেশে, এক অজানা ক্রিয়েচারকে নিয়েই গড়ে উঠেছে। নিশিকোলপি নামক এই অদ্ভুত দর্শন সত্তা মানুষকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। কাহিনী এগিয়েছে দুটো টাইমলাইনে। সবমিলিয়ে গল্প খারাপ না। লেখনশৈলী দারুণ, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই টেনে নিয়ে যাবে পাঠককে ইউ লেখনশৈলী। কিন্তু গল্প এগিয়েছে একটু ধীর গতিতে, সেটা সমস্যা না, তবে বোঝা যাচ্ছিল এর পর কি হবে। অতীত সময়কালটা বরং বেশি ভালো লেগেছে। সাসপেন্স ছিল, রহস্য ছিল। বর্তমান কালে চরিত্রের ব্যক্তিগত ঘনঘটাই বেশি, চরিত্রের অতিরিক্ত বেশি বোঝার ফল তাকে পেতে হয়েছে। গল্পের এন্ডিংটা সুন্দরভাবে টেনেছেন লেখক। নিশিকোলপির উত্থান সম্পর্কে সংক্ষেপে বলেছেন।
একটা বিষয়: বর্তমানকালের চরিত্র সুনন্দা ভদ্র পুরো বইয়েই হিন্দু, কিন্তু ৯৪ পৃষ্ঠায় আজান হওয়ার পর নামাজ পড়ে ভাত খেলো কেন ঠিক বুঝলাম না!
অতিপ্রাকৃত জনরার লেখা পড়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই পাঠকের কিছু চাহিদা থাকে। পাঠক এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হতে চায় যেখানে পাঠকের মনে ভয়-ভীতির জন্ম নেবে, পাঠক গল্পের পরতে-পরতে অত্যাশ্চর্য-অব্যাখ্যাত সব বিষয়ের সম্মুখীন হবে এবং গল্পের কোনো এক পর্যায়ে এমন চমকপ্রদ কোনো ঘটনার কাছে গিয়ে পৌঁছাবে যে, পাঠক অভিভূত হয়ে যাবে। দুঃখের বিষয় মনোয়ারুল ইসলামের অতিপ্রাকৃত জনরার বই ‘তাহার বাড়ি অন্য কোথাও’ পড়ে এধরনের কোন অনুভূতিই হয়নি। একইরকম অনুভূতিহীন অবস্থা হয়েছিল লেখকের ইতোমধ্যে বিখ্যাত হয়ে যাওয়া অতিপ্রাকৃত জনরার উপন্যাস ‘বকুল ফুল ট্রিলজি’ পড়েও। তবে, মূল বিষয় অন্য জায়গায়। এসব অনুভূতির বিষয় দূরে রেখে যদি লেখকের লেখা নিয়ে কথা বলি, তাহলে প্রথমেই যে দিকটা খুব চোখে লাগে তা হলো, লেখকের লেখায় অনেক অসঙ্গতি থেকে যায়। ‘বকুল ফুল’ পড়তে গিয়েও যেমন বেশ কিছু অসঙ্গতির সম্মুখীন হয়েছিলাম, ‘তাহার বাড়ি অন্য কোথাও’ পড়তে গিয়েও একই অবস্থা হয়েছে। ফলে বইটা পড়ে বেশ হতাশ হয়েছি।
প্রথমে গল্পটি সম্পর্কে একটু ধারণা দেই— ঢাকার মেয়ে সুনন্দা ভদ্রা সরকারি ব্যাংকের চাকরির সুবাদে কুমারী নামক এক অজপাড়াগাঁয়ে গেছে, একা বাস করছে জনমানবহীন একটা পুরাতন বাড়িতে। এই বাড়িটি ছিল মূলত এক জমিদার বাড়ি। দেশভাগের আগ অবধি সেখানে জমিদার পরিবারের বসবাস ছিল। ১৮০০ সালে এই জমিদারির পত্তন হয় জমিদার বিষ্ণু রায়ের মাধ্যমে। বিষ্ণু রায়ের নাম থেকেই গ্রামের নাম হয় বিষ্ণুপুর, দেশভাগের পর গ্রামের নাম পালটে হয় কুমারী। তো এই বিষ্ণুপুর বা কুমারী গ্রামে—প্রথমে জমিদার বিষ্ণু রায়ের সময়ে, এরপর তাঁর নাতি অনুপ রায় ও বর্তমানের সুনন্দা—এই তিনটি ভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া অতিপ্রাকৃত কিছু ঘটনা নিয়েই এগিয়েছে ‘তাহার বাড়ি অন্য কোথাও’ উপন্যাসের কাহিনি। প্রথমত, কাহিনিতে কোনো নতুনত্ব নেই, নেই জটিলতা বা চমকপ্রদ কোনো বিষয়; বইজুড়ে ভয় জাগাতে পারে এমন অনেক ঘটনা লেখক উল্লেখ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু লেখকের দোষেই হোক অথবা চর্বিত-চর্বণের কারণেই হোক, পাঠক হিসেবে আমার বিন্দুমাত্র ভয় লাগেনি, কোন উৎকণ্ঠা জাগেনি, ভয়ের উৎস নিয়ে জাগেনি আগ্রহ। লেখকের বর্ণনাও পানসে লেগেছে। ধীরলয়ের অতিবর্ণনা ও ব্যাখ্যার ভারে এবং প্রয়োজন ছাড়া কিছু শাখার-প্রশাখার জন্য—শুধু গল্পের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু গল্পে কোনরকম বিশেষত্ব যোগ হয়নি।
এবার আসি অসঙ্গতির প্রসঙ্গে। কয়েকটি অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে— ১. লেখক লিখলেন, ‘বিষ্ণুপুরের জমিদারি টিকেছিল আড়াই শ বছর। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই আস্তে আস্তে কঙ্কাল বেরিয়ে যাচ্ছিল, সেটা একেবারেই শেষ হয়ে গেল ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর।’—এখানে দুটো ভুল আছে। প্রথমত, কথাটা উনবিংশ শতাব্দী হবে না, হবে বিংশ শতাব্দী। উনবিংশ শতাব্দী মানে ১৮০১-১৯০০ সাল অবধি সময়কে বোঝায়, আর বিংশ শতাব্দী বলতে ১৯০১-২০০০ সাল পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। যদি উনবিংশ শতাব্দীর শুরতে (১৮০০ সালের শুরুতে) একটা জমিদারির কঙ্কাল বের হতে শুরু করে, তা শেষ হতে নিশ্চয় দেড়শ বছর লাগবে না। দ্বিতীয় ভুল হলো, জমিদারি আড়াই শ বছর টিকেছিল না, টিকেছিল দেড় শ বছর। গল্পের শেষেই তার উল্লেখ আছে। জমিদারির পত্তন হয়েছিল ১৮০০ সালের শুরুর দিকে, ১৯৪৭ সালে অবধি সেই জমিদারি টিকেছিল। ফলে বোঝাই যাচ্ছে একই লাইনে লেখক দুটো বড়ো ভুল করে ফেললেন। এই ভুল ধরার জন্য শেষ অবধি যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, একটু মাথা খাটালেই বুঝে ফেলা সম্ভব। কারণ, মাত্র চার প্রজন্মের জমিদারির বয়স আড়াই শ বছর হয় না।
২. কাকতালীয়ভাবে জমিদারপত্নী অনুরাধা দেবী একাই তিন জায়গায় তিনটি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন। ১৮৮৫ সালে এরকম অজপাড়াগাঁয়ের একজন মহিলার মুখে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করানো লেখকের অমনোযোগের পরিচয় বহন করে। তিনি এক জায়গায় জমিদারকে বলছেন, ‘আজ রেস্ট করুন’; এক জায়গায় বলছেন, ‘গেটের প্রহরীরা’; আরেক জায়গায় বললেন, ‘পাঁচ-ছয় মিনিট হবেই।’ রেস্টের জায়গায় আরাম বা বিশ্রাম, গেটের স্থলে দ্বার ও মিনিটের জায়গায় কিছুক্ষণ ব্যবহার করলেই হতো। যদিও সে কালে সময়ের এককের ক্ষেত্রে প্রহর, মূহুর্ত, দণ্ড, পল প্রভৃতি ব্যবহার করা হলেও, এই পাঁচ-ছয় মিনিট সময়কে কিছুক্ষণ বলে চালিয়ে দেওয়াই উত্তম। এর বাইরে এক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, জমিদারপত্নী জমিদারকে ‘বাবু’ সম্বোধন করছেন। হাল আমলে অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে বাবু সম্বোধন করলেও কিংবা সেকালে গোমস্তা থেকে চাকর-বাকরেরা জমিদারকে ‘বাবু-বাবু’ করলেও, সে সময়ে স্বামীকে কোন নারী বাবু বলতেন না। আবার অনুরাধা কখনও জমিদারকে তুমি করে সম্বোধন করছেন, কখনও আপনি করে। স্বামীকে আপনি-তুমি দুই-ই বলা যায়; কিন্তু এক্ষেত্রে লেখক যদি বিষয়টা পরিষ্কার করতেন যে, অনুরাধা তাঁর স্বামীকে একেক সময় একেকভাবে সম্বোধন করেন, তাহলে বিষয়টা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যেত। ব্যাখ্যা না থাকায় এটাকে লেখকের ভুল বলেই ধ��ে নিতে হচ্ছে।
৩. পুরোহিত গোপাল ঠাকুরের সাথে জমিদার অনুপ রায়ের কথোপকথনে অনুপ রায় বলছেন, ‘...লোক পাঠিয়ে ভিন গাঁ থেকে (আপনাকে ডেকে) নিয়ে আসতাম না।’ কথা হচ্ছে, পুরোহিত গোপাল ঠাকুর যিনি কিনা জমিদার বাড়ি সংলগ্ন মন্দিরের তলকুঠিরিতে যুগের পর যুগ ধরে বসবাস করছেন, জমিদারের জ্বরের সময় যিনি জোড়া পাঁঠা বলি দিলেন, মাত্র দুদিন পরেই তাকে আবার ভিন গাঁ থেকে ডেকে আনতে হবে কেন? গোপাল ঠাকুরকে তো ভিন গাঁয়ে যেতেও দেখা যায় না।
৪. গ্রামে সরকারি ব্যাংকের নতুন শাখার বয়স মাত্র দুই বছর হবে, সেই ব্যাংকের ম্যানেজার কী কারণে বিশ বছর ধরে এই গ্রামে বাড়ি করে বাস করছে তার কারণ অস্পষ্ট। লেখক লিখলনে— ‘এই গ্রামে তিনি আছেন বিশ বছর ধরে। এই বিশ বছরেও কোনো ঝামেলা হতে তিনি দেখেননি। তাই, এখানে বাড়ি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন’—বাড়ি করার কারণটা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু বিশ বছর ধরে এই অজপাড়াগাঁইয়ে তিনি করেছেন টা কী? ম্যানেজারের মুখ দিয়ে সুনন্দাকে কেবল ঐ তথ্যগুলো জানানোর জন্যই ম্যানেজারকে বিশ বছর ধরে ইলেকট্রিসিটি বিহীন এই গ্রামে বসবাস না করালেই লেখক ভালো করতেন।
৫. একটি জিনে ধরা মেয়ে ও জিন ছাড়ানোর ঘটনা লেখক বর্ণনা করতে ব্যয় করেছেন প্রায় ছয়টি পৃষ্ঠা। সুনন্দা তখন ক্লাস নাইনে পড়ে, শহরে বড়ো হওয়া মেয়ে দাদার বাড়ি গেছে ঘুরতে। তো পাশের বাড়ির মেয়ে আনোয়ারার জিন ধরেছে, মৌলবি আসবে জিন ছাড়াতে। এই পুরো জিন ছাড়ানো ও তার আগের ঘটনা পাঠককে জানানোর জন্য লেখক শহরের একটা মেয়েকে আনোয়ারার বাড়িতে সারাদিন রেখে দিলেন। কারণ, এই অংশটা লেখক বর্ণনা করেছেন সুনন্দার স্মৃতি থেকে, সেটা বর্ণনা করার জন্যই সুনন্দাকে সারাদিন ধরে এই জিনে ধরা মেয়ের বাড়িতে থাকতে হলো। প্রথমত, জিনে ধরেছে বা জিন ছাড়ানো হবে এমন বাড়িতে এরকম অবিবাহিত একটা মেয়ের অবস্থান করাটা স্বাভাবিক নয়, এরকম বাড়িতে মেয়েরা এম্নিতেই যায় না, গেলেও অন্তত জিন ছাড়ানোর সময়ে থাকবে না; তার উপরে শহরের একটা নবম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে এভাবে সারাদিন ধরে জিন ছাড়ানো দেখবে, এটা মানা যায় না, যতই পাশের বাড়ি হোক। তবে এরকম ঘটনা ঘটা একেবারে অসম্ভব নয়, ফলে এটুকু মেনে নিলেও একটা বড়ো ভুল চোখ এড়ায় না—ঘটনার এক পর্যায়ে আমরা দেখি যে, আনোয়ারার হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। এই বাঁধা অবস্থাতেও একবার আমরা দেখব যে, সে হাতের ইশারায় সুনন্দাকে ডাকছে! আরেক জায়গায় দেখব সে তার মায়ের হাত থেকে মিষ্টির বাটি কেড়ে নিয়ে গপাগপ মিষ্টি খাচ্ছে। এই দুইটি কাজের পূর্বে আনোয়ারার হাতের বাঁধন খুলে দেবার কোন নমুনা কিন্তু আমরা দেখতে পাই না। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো—জিনে ধরা ও জিনে ধরা ছাড়ানোর এই ছয় পৃষ্ঠার বর্ণনা মূল গল্পের আবহে কোন বিশেষত্ব যোগ করে না, বরং পাঠকের বিরক্তি উদ্রেক করা ছাড়া অন্য কোন কাজে এসেছে বলে মনে হয় না। এখানেই শেষ নয়। একটি স্বপ্ন দৃশ্যে সুনন্দার সাথে তার মৃত বান্ধবী শীলার দেখা হয়। এই স্বপ্ন দৃশ্য ও শীলার মৃত্যুর বর্ণনার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রায় সাত পৃষ্ঠা। সত্যি বলতে, এই অংশটুকু পরিপূর্ণ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, কেবল বইয়ের আকার বৃদ্ধি করা ছাড়া এই অংশটুকুর বিশেষ কোন প্রভাব গল্পে ছিল না। একটি উপন্যাসে মূল ঘটনার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক অনেক উপগল্প-তস্যগল্প থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার জন্য কতটুকু কথা ও পৃষ্ঠা খরচ করা মানানসই সেটা লেখকের মাথায় রাখা উচিত।
৬. সুনন্দা ভদ্রা হিন্দু, কিন্তু অনেক জায়গাতেই বোঝা যায় না যে, সে আসলে হিন্দু না মুসলিম। যেমন, তার বাবার নাম রফিক ঠাকুর, ঠাকুরটুকু বাদ দিয়ে লেখক যখন তাকে রফিক সাহেব বলে সম্বোধন করেছেন, তখন তাকে আর হিন্দু মানুষ বলে মনে হয়নি। আবার সুনন্দার প্রেমিকের নাম সাবিত। সাবিতের মুসলিম হবার চান্সই বেশি। প্রেমিক মুসলিম হলে তা নিয়ে তাদের সম্পর্কের মধ্যে কিছুটা জটিলতা দেখানো যেত। আবার দেখা যায় সুনন্দা জিনেও বিশ্বাস করে। একটি জিনে ধরার ঘটনা দেখেই একজন হিন্দু জিনে বিশ্বাস করে ফেলবে বলে আমার মনে হয় না। আমার পরিচিত কোন হিন্দু জিনে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। হিন্দু-মুসলিম জটিলতার বাইরেও একটি ছোট ভুল আছে—এক দৃশ্যে দেখা যায় সুনন্দা সময় নিয়ে তুলসী তলায় সন্ধ্যা পূজা করছে। তুলসী তলায় সন্ধ্যা পূজা করা হয় না, পূজা ঠাকুর ঘরে করতে হয়। তুলসী তলায় কেবল সন্ধ্যাবাতি দেবার নিয়ম।
এবার একটু প্রকাশনা নিয়ে কথা বলা উচিত। অন্যধারা থেকে প্রকাশিত ৩০০ টাকা মূল্যের ১৬০ পৃষ্ঠার বইটির প্রোডাকশন খুব ভালো—তবে বানানের বিষয়টি ব্যতীত। সুন্দর মলাট, ভালো বাঁধাই ও ঠিকঠাক কাগজে ঠিকঠাক প্রিন্ট হলেও, বইটি ভুল বানানে ভরা। দায়টা প্রুফ রিডারের কাঁধেই যায়। প্রুফ রিডার প্রকৃতই যদি প্রুফ রিডার হতেন এবং তিনি যদি মোটামুটি মানের বই পড়ুয়াও হতেন, তাহলে কেবল ভুল বানান নয়, যেসকল অসঙ্গতির কথা আমি বললাম, এগুলোও তাঁর চোখ এড়িয়ে যেত না। তবে প্রকাশকও এর জন্য সমান দায়ী। অন্যধারা থেকে প্রকাশিত লেখকের বকুল ফুল ট্রিলজিতেও ছিল অসংখ্য ভুল বানান। এত বানান ভুল মানা যায় না। এর দায় কিছুটা লেখকের ওপরেও বর্তায়।
লেখক মনোয়ারুল ইসলামের লেখার ক্ষমতা আছে, প্রায় বিশটির মতো বই প্রকাশ করে সে ক্ষমতার প্রমাণ তিনি ইতোমধ্যেই দিয়েছেন। কিন্তু লেখার মানের দিকে লেখকের আরেকটু সচেতন হওয়া দরকার। এই ধরনের অসঙ্গতি পরিহার করতে না পারলে যেকোন গল্পই মানহীন হয়ে যেতে বাধ্য। এক্ষেত্রে লেখকের উচিত হবে, প্রতি বই মেলাতেই বই বের করার এবং একই মেলাতে একাধিক বই বের করার প্রবণতা থেকে দূরে সরে আসা। একইসাথে বই প্রকাশের অন্তত মাসখানেক আগে বইয়ের কাজ সম্পূর্ণ করা, কাছের কিছু সমালোচনা করতে পারে এমন পাঠককে দিয়ে বইটি পড়ানো।
লেখক মনোয়ারুল ইসলামের সাথে আমার যেটুকু পরিচয় আছে, তাতে মনে হয়েছে মানুষ হিসাবে তিনি খুবই আন্তরিক, নিরহংকারী এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ফলে আমি তাঁকে বেশ পছন্দ করি এবং চাই লেখক হিসাবে তাঁর উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি। আর তাই একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে তাঁর বইয়ের খোলামেলা সমালোচনা করতে দ্বিধা বোধ করিনি। আশা করি লেখক এই সমালোচনাটাকে সহজে গ্রহণ করবেন। লেখকের প্রতি শুভকামনা রইল।
১৮০০ শতকের শুরুর দিকের কথা। বিষ্ণু রায়ের জমিদারির তখন মাত্রই পত্তন হয়েছে। মানুষের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে জমিদারের শৌর্য আর প্রতাপের সৌধ দিনকে দিন উঁচু হয়ে উঠছে... এমনই একসময়ে আশ্বিনী পূর্ণিমার রাতে আচমকাই আকাশ মেঘে ঢেকে যায়, শেষরাতে বৃষ্টি হয় খুব। সেই প্রবল বৃষ্টির রাতে জমিদারমহলে এক ভয়ানক অধ্যায়ের সূচনা হয়... তার গল্পই, তাহার বাড়ি অন্য কোথাও। ----------------------- তাহার বাড়ি অন্য কোথাও" বইটার প্রচ্ছদে যে আজব দর্শন এক প্রাণীর ছবি আছে তাকে ঘিরেই গল্প। ভয়ের কুয়াশায় ঘিরে যেনো মন মস্তিষ্ক বরফ শীতল করে বইটায় ধরে রাখে। - তিন সময়ের ঘটনা নিয়ে লেখা বইটা। বর্তমান, বর্তমানের ভয়ের ইতিহাস অতীত, অতীতের ভয়ের সূচনার আরো একটা অন্য অতীত।
কুমারী নামের গ্রামটায় এক আজব প্রাণীর আগমন ঘটে হঠাৎ করেই। অদ্ভুত দেখতে সেই অদ্ভুত দর্শন প্রাণী। অতিপ্রাকৃত সেই প্রাণীটা মানুষের মতো দেখতে হলেও ঠিক মানুষ না। অন্য ক���ছু, যাদের মৃত্যু নেই। তারা বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর। বিকটদর্শন সেই প্রাণীটা মানুষ এমন রূপে মেরে ফেলে দেখলেই গা গুলোয়, ভয়ে আতঙ্কে গা হিম হয়ে আসে। বরফ শীতল গা, দুর্গন্ধে ভরা প্রাণীটার দৈহিক গড়ন, চলার ধরনেই সহজ সরল মানুষেরা ভয়ে জমে যায় যেন।
বইটা পড়তে একটুও বিরক্ত লাগে নি। পুরোটা বই জুড়েই সেই প্রাণীটা আসলেই কি,কোথায় থেকে সে এলো, আর তার বাড়িই বা কোথায় এসব প্রশ্ন তাড়িয়ে বেরিয়েছে। একটার পর একটা পৃষ্ঠা পড়ে গিয়েছি কোনো বিরক্তি ছাড়াই। বর্তমান, অতীতের মিশেলে দারুন একটা বই। সাসপেন্স ছিলো পুরো বই জুড়েই।
তবে একটা দিকে লেখকের অন্য আরেকটা বইয়ের সাথে কোথাও একটা কমন পরে গেছে🫠 অদ্ভুত আঁধার এক বইটার সাথে মিল পেয়েছি এই বইটায়। তবে সব মিলিয়ে দারুণ একটা জার্নি ছিলো।
ভয়ের জগতে বিচরণ করতে যাদের ভালো লাগে, হরর জনরা যাদের পছন্দ তারা গোগ্রাসে মন মস্তিষ্ক ভরে খেতে পারবেন বইটা। আর যারা হরর জনরা খুব একটা পড়েন না তারাও পড়ে বইটাকে খারাপ বলতে পারবেন না।
মনোয়ারুল ইসলামের আধিভৌতিক জনরার বইয়ের ভক্ত আমি সেই ২০১৯ সাল থেকে। লেখকের বকুল ফুল ট্রিলজি, নয়নতারা, নয়ন তাহারে পায়না দেখিতে বইগুলো যে আমার কত্ত প্রিয়! মাত্রই পড়ে শেষ করলাম লেখকের ২০২৫ সালে প্রকাশিত হরর থ্রিলার 'তাহার বাড়ি অন্য কোথাও' বইটি।
বইটির প্লট তিনটি সময়কালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে; বর্তমান, ১৮৮৫ সাল এবং ১৮০০ সালের ঘটনা। বর্তমান সময়ের কাহিনীতে দেখা যায় সুনন্দা নামের ঢাকা শহরে বড় হওয়া এক তরুনী সরকারি ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার সুবাদে কর্মসূত্রে এসেছে কুমারী গ্রামে। কুমারী গ্রামে এসে ভাড়া নেয় এক প্রাচীন বাড়ি। কিন্তু বাড়িটিতে থাকতে গিয়ে ভূতে অবিশ্বাসী সুনন্দা অনুভব করে অস্বাভাবিক অনেক কিছুর। এদিকে ১৮৮৫ সালের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় বিষ্ণুপুর গ্রামের মনু মুন্সিকে যে কিনা অদ্ভুত কিছু দেখে ভয়ে অস্থির হয়; পুরো পরিবার লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এই সময় পাশে দাঁড়ায় জমিদার অনুপ রায়। কিন্তু জমিদার এবং তার কাছের মানুষেরাও জড়িয়ে পড়ে অজান্তেই বিপদের মুখে। কাহিনী ঘুরে যায় আবার অতীতে ১৮০০ সালের দিকে যেখানে লিংক রয়েছে ১৮৮৫ সাল এবং বর্তমানের।
গল্পের প্লট বেশ ভালো ছিলো কিন্তু শেষের দিকে কাহিনির ব্যপ্তী আরেকটু বাড়ানো যেতো। তবে ১৬০ পৃষ্ঠার মধ্যে তিনটা সময়কে সমন্বিত বেশ ভালো ভাবেই করা হয়েছে। ভৌতিক ব্যাপার বেশ কম লেগেছে তবে সুন্দর লেখনীশৈলীর জন্য পড়ে আরাম লেগেছে। তবে কিঞ্চিৎ বানান ভুলের কারণে পড়তে গিয়ে বিরক্তির উদ্রেক হচ্ছিলো।
বইয়ের প্রোডাকশন খুব ভালো ছিলো। প্রচ্ছদখানাও সুন্দর হয়েছে। শীতের রাতে উপভোগ করার জন্য বইখানা রেকমেন্ডেড।
এক নজরে: বইয়ের নাম: তাহার বাড়ি অন্য কোথাও লেখক: মনোয়ারুল ইসলাম পৃষ্ঠা: ১৬০ প্রকাশনা: অন্যধারা জনরা: আধিভৌতিক থ্রিলার প্রচ্ছদ: মানব গোলদার মুদ্রিত মূল্য: ৩০০ টাকা প্রথম প্রকাশ: ২০২৫
কাহিনী সংক্ষেপঃ সরকারি ব্যাংকে চাকরি পেল সুনন্দা ভদ্রা নামের এক তরুণী। পোস্টিংয়ের জন্য তাকে আসতে হল বাংলাদেশের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম ‘কুমারী’তে। পটে আঁকা ছবির মত মনোরম, রূপকথার রাজ্যের মত শান্ত গ্রাম কুমারী। এসে মন-প্রাণ সব জুড়িয়ে গেল সুনন্দার। কিন্তু রূপকথার গল্পেও তো দৈত্য-দানো থাকে। তেমনি এ গ্রামের উপরেও যে নিকষ কালো, অজানা কোন শক্তির প্রভাব ছিল, তা কী সুনন্দা জানত? কী ছিল সুনন্দার ভাগ্যে? ১৮৮৮ সালে কী ঘটেছিল সেই গ্রামে?
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ গল্পের প্রারম্ভিকায় ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ন কোন ঘটনা, ব্যাকস্টোরি কিংবা আপাতদৃষ্টিতে দুর্বোধ্য কোন কবিতা, সংকেত বা সংলাপ দিয়ে লেখকেরা পাঠকদের ক্লু দেন, যাকে বলা হয় Subtle Foreshadowing, পরে সেই ক্লুয়ের উপর ভিত্তি করে পাঠকদের চমক দেওয়া হয়। কেইগো হিগাশিনোর ‘দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স’ থেকে শুরু করে তাকরিম ফুয়াদের ‘জুগু বুড়ি’, থ্রিলার থেকে হরর সবখানেই এই চর্চা বিদ্যমান। কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদেই যে এতবড় প্লট টুইস্ট দেওয়া যায়, মনোয়ারুল ইসলামের ‘তাহার বাড়ি অন্য কোথাও’ না পড়লে জানা হত কী না সন্দেহ। পাঠক, মনোয়ারুল ইসলামের ‘হরর ইউনিভার্সে’ স্বাগতম।
প্রকৃতিতে এমন কিছু রহস্য থাকে, যার কোন ব্যাখ্যা হয়না। যুগে যুগে কিছু দুঃসাহসী মানুষ সেগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজতে চেষ্টা করে। কেউ হারিয়ে যায়, কেউ নতুন রহস্য আবিষ্কার করে আবার কেউ নিজেই পরিণত হয় রহস্যে। তা সত্ত্বেও, প্রকৃতি তার স্বাভাবিক নিয়মে রহস্যগুলো আগলে রাখে, ভেদ হতে দেয়না। এমনই বেশকিছু রহস্য ঘীরে রয়েছে কুমারী গ্রামকে। কুমারী নামের পিছনেও রয়েছে আরেক রহস্য, যা বইয়ের একেবারে শেষভাগে পাঠক ভেদ করতে পারবেন। আর এই রহস্যের সাথে জড়িয়ে রয়েছে এক প্রাচীন জমিদার বংশ।
হরর জনরার ভেতর আবার নানা সাব-জনরা আছে। যেমন, বডি হরর, আবহভিত্তিক (Atmospheric) হরর, গথিক হরর, সাইকোলজিক্যাল হরর, কসমিক হরর ইত্যাদি। কসমিক হররের মধ্যে আবার সুপরিচিত এক জনরা আছে যার নাম লাভক্র্যাফটিয়ান হরর। তো সবমিলিয়ে বলতে গেলে, হররের একাধিক জনরা বেশ মুন্সিয়ানার সাথে মিক্স করেছেন লেখক। আবহভিত্তিক ভয় দিয়ে শুরু করে, গা ছমছমে অতিপ্রাকৃতের অবতারণা, সেখান থেকে রহস্য ঘনীভূত হওয়া, অজানা বিপদ, ভ য়া ল সত্ত্বা এবং সবশেষে কসমিক এলিমেন্টে শিফট করার মধ্য দিয়ে বইটি শেষ হয়েছে। শেষভাগে কিছুটা সিক্যুয়েলের আভাসও আছে। বইটি অতীত এবং বর্তমান - দু'টি আলাদা সময়রেখায় লেখা। অতীতকালে দেখানো হয়েছে কারণ আর বর্তমানে দেখানো হয়েছে তার ফলাফল। আর প্রধান চরিত্র সুনন্দা ভদ্রার মধ্যেও কিছু রহস্য আছে, যা এ পর্বে খোলাসা হয়নি। হয়ত সিক্যুয়েলে তার সম্পর্কে আলোকপাত করবেন লেখক। সবমিলিয়ে, হাড়হীম করা এক্সট্রিম হরর না হলেও তাহার বাড়ি অন্য কোথাও বইটি রহস্য ও ভয়ের একাধিক ফ্লেভারযুক্ত একটি সুস্বাদু কোর্স।
ভয়ের বই সচরাচর পড়া হয়না, সেই বইমেলার সময় সংগ্রহ করেছিলাম। অবশেষে পড়েই ফেললাম দিনের আলোয় তাই বোধহয় ভয়-টয় ওতোটাও লাগলো না... তবে প্রুফ রিডিং এ আরেকটু নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ভয়ের গল্প পড়ার সময় একটা ফিফটি ফিফটি সম্ভাবনা থাকে গল্পটা ভালো লাগার অথবা না লাগার। থ্রীলার একেবারেই সাদামাটা না হলে মোটামুটি সব গল্পই আমার ভালোই লাগে। আর সামাজিক উপন্যাস লেখা হয় সমাজে কোনো ম্যাসেজ দেয়ার জন্য অথবা অনেকে নিজের জন্যও লেখে। মূলত ভয়ের গল্পের খুব বড় ভক্ত আমি না। ভয়ের গল্পগুলা দেখা যায় শুরু হতে হতে দেড়শো পৃষ্টা নাই। বিরক্তিকরই লাগে। অনেক গল্প তো পড়ার পর মনে হয় সময় নষ্ট। আমার কাছে এই জনরাটাই এমন লাগে।
তারপর "তাহার বাড়ি অন্য কোথাও..." আমার মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে কি, কোনো গ্রামে চলে যাব, কোনো স্কুলে পড়াবো ছোটো ছোটো বাচ্চাদের। বেতন কম হোক। শুধু খাওয়া আর মাসে কয়েকটা বই কেনা যায় এরকম বেতন পেলেই খুশি হয়ে যেতাম আমি। ঢাকা শহরের এই অসহ্যকর জ্যামে প্রায়ই শহর ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছা হয় আমার। কিন্ত কখনো ইচ্ছা হয় না দেশ ছাড়তে। কোন দেশে আছে আরেকটা বাংলাবাজার বা নীলক্ষেত? যাক এগুলা আলগা আলাপ, আমার নিজের আরকি। মূল গল্পটা শুরু হয় এরকমই একজন আমাদের মতো যে পড়ালেখার পাট চুকিয়ে একটা সরকারী চাকরি পেয়ে যায়, কিন্ত গ্রামে...
গ্রামটা চমৎকার। এই গ্রামের সবাই ভালো! শুধু বর্তমান সময়ে না বরং এই গ্রাম সবসময়ই ভালো মানুষের বাস। জমিদার থেকে হালের কেয়ারটেকার সবাই ভালো মানুষ। এরকম গ্রামে একা একটা মেয়ে গিয়ে উঠে একটা বাড়িতে। রহস্য শুরু এখান থেকেই..
বাড়ি, জমিদার বাড়ির গেস্টহাউজ বলা যায়। মূল জমিদার বাড়ির ধ্বংসস্তুপের পাশেই মেয়েটা থাকা শুরু করলো। মেয়েটার সাথে আমার স্বভাবেরও মিল পেলাম। একবার টিএসসির কোন গাছে পেরেক মারা পোস্টার দেখে সাথে সাথে পেরেকটা টেনেটুনে বের করে ফেলেছিলাম। গাছ কেন কষ্ট পাবে? এরকমই চিন্তা করেছিলো গল্পের মূল চরিত্র।
বলা যায়.. গল্পটার চিন্তাভাবনা সুন্দর। আছে একজন জমিদারের গল্প যে সবসময় চায় প্রজারা সুখে থাকুক। আর আছে সুনন্দা যে চায় বাবা সুস্থ থাকুক, ভালো থাকুক প্রেমিক, যদি শিলাও ভালো থাকতো...
শিলা? আমরা হুমায়ুন আহমেদের গল্পে দেখি না? লেখক হঠাৎই একটা কিছু ঘটায় ফেলে যা না ঘটলেই হয়তো বইটা ১০/১০ হতো? তেমনই একটা গল্প শিলার এখানে। লেখকরা সম্ভবত গল্প ব্যালেন্স করতেই এরকম করে। আমরা খুব কম গল্প পড়েই বলতে পারি, "একটা গল্প পুরাটাই এত সুন্দর কেমনে হয় ভাই?" কোনো লেখকই এই কাজটা করে না।
পুরোটা গল্প পড়তে আমার কয়েকবার বিরক্ত লাগার কথা, কারণ আমি এই জনরা তেমন একটা পড়ি না। কিন্ত এই বইটা পড়তে আমার একবারও বিরক্ত লাগেনি! বরং সামনে কি হয় জানার জন্য পড়েই গেছি। আমার তো সবসময়ই পুকুর-পানিটানি এসব ভয় লাগে, ধারেকাছে যাই না। এজন্যই হয়তো টানা পড়েগেছি বইটা।
তিনটা টাইমলাইনে চলা গল্পটা বলতে গেলে মনে হয় খুব ছোট হয়েগেছে। বর্তমান আর অতীত ঠিকঠাক কিন্ত অতীতের অতীত একদমই কম কথায় শেষ। মনে হচ্ছে পাঠকরা কোনোকিছু থেকে বঞ্চিত করা হলো। বাংলাদেশি যারা বর্তমানে যেসব লেখা বের হচ্ছে, খুব কম গল্পই পড়ার পর আমার মনে হয় "গল্পটা আরও বড় হতেই পারতো"
আরও একটা কথা, এরপর কি হবে? দুই দুইবার তো জমিদাররা ব্যবস্থা করেছে কিন্ত এখন?!
সুন্দর একটা উপন্যাস।
৪.৫/৫💫
(কোনো রিভিউ নয়, কেবলমাত্র পড়ার পরের চিন্তা ভাবনা)
This entire review has been hidden because of spoilers.
হরর জনরা হচ্ছে আমার সবচাইতে পছন্দের জনরাগুলার মধ্যে অন্যতম। 'তাহার বাড়ি অন্য কোথাও' বইটার প্রচ্ছদ দেখেই পড়ার ইচ্ছে জাগে। শুরু করলাম পড়া। ১৬০ পৃষ্ঠার বই শেষ-ও করলাম।
সুনন্দা নামের এক মেয়ের চাকরি হয় এক সরকারি ব্যাংকে। চাকরির সুবাদে তাকে আসতে হয় 'কুমারী' নামক এক গ্রামে। গ্রামটায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া খুব কঠিন। কারণও আছে। গ্রাম বলতেও তো একদমই অজপাড়া গ্রাম। অনেক বলেকয়ে একটা বাড়ি পাওয়া যায়। বাড়ি তো আর এহেন বাড়ি নয়। সে বিশাল এক বাড়ি। এতো বড় বাড়িতে একা মেয়ে থাকাও শক্ত ব্যাপার। তবে, তার কাছে আপাতত এর চাইতে আর ভালো অপশন ছিলো না। তাই সুনন্দা সানন্দেই রাজি হয়ে যায়। বাড়িটার এক অস্বাভাবিক বিষয় হচ্ছে, খুব বেশি ঠান্ডা। শীতকালে ঠান্ডা থাকবে সেইটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যেকোনো জায়গার চাইতে এই বাড়িতে যেনো অতিরিক্ত বেশিই ঠান্ডা লাগে। থাকা শুরু হবার পর থেকেই অনেক গালগল্প আসতে শুরু করে সুনন্দার কানে। সেগুলা কি সত্যি? কোনো বিপদে পড়তে যাচ্ছে না তো সুনন্দা? জানতে হলে পড়তে হবে বইটা। আর হ্যাঁ, এই বইয়ের একটা ব্যাকস্টোরিও আছে। সেইটা আমি বললাম না। অতীত আর বর্তমান এক সুঁতোতেই গেঁথে এগিয়েছেন লেখক।
এবার বলি আমার কেমন লেগেছে সেই ব্যাপারে। গ্রাম্য পরিবেশে গল্প হওয়ায় গল্পটা একটু বেশি গা ছমছমে ফিল দেয়। দুটো টাইমলাইন মিলিয়ে গল্পটাও বেশ দারুণ। তবে, আমার কাছে শেষটা মনের মতো হয়নি। কেমন যেনো তাড়াহুড়ো করে শেষ করেছে বলে মনে হলো। সুনন্দার মতো চরিত্রের এরকম একটা এন্ডিং ভালো লাগেনি।
সবমিলিয়ে, এভারেজ লেগেছে আমার কাছে। তবে, প্লট চমৎকার। এই বিষয়ে সন্দেহ নেই। পড়তে পারেন। নাহলে, নিশিকোলাপি ধরতে আসবে কিন্তু!!
❛এমন অদ্ভুত দর্শন প্রাণী কেউ দেখেছে কি কোথাও? দেখবে কী করে? তাহার বাড়ি যে অন্য কোথাও!❜
এই পৃথিবীতে ব্যাখ্যার বাইরে ঘটনার শেষ নেই। আমরা যার ব্যাখ্যা পাইনা, যে ঘটনা প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে বাঁধা দেয় তাকে আমরা অতিপ্রাকৃত হিসেবে নাম দেই। এই বিপুলা পৃথিবীর সব রহস্য উদ্ধার করার সাধ্যি তো আমাদের নেই।
আঠারোশ শতকের শেষ দিকের কথা। বিষ্ণুপুর জমিদারি চলছে দারুণভাবে। প্রজাপ্রেমী হিসেবে খ্যাত জমিদার অনুপ রায় প্রজাদের জন্য কাজ করছেন। সকলেই তাকে সম্মান করে। স্ত্রী অনুরাধাকে নিয়ে বেশ কাটছে সময়। তবে একটু কপালে ভাঁজের ব্যাপার বাড়ির কুয়ার জল দিনকে দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। স্ত্রী বন্ধ কুয়াটা পুনরায় খনন করতে চাইছে কিন্তু অনুপ রায়ের মত নেই। মাটি দিয়ে বন্ধ করা এই মুখ খোলা তার বংশে বারণ। কারণটা বলাও বারণ। স্ত্রীর তাই মুখ বেজার।
সময় পেরিয়ে বর্তমানে আসা যাক। সুনন্দা ব্যাংকে চাকরি পেয়েছে। পোস্টিং হয়েছে কুমারী নামের গ্রামে। মনে মনে যেমনটা চেয়েছিল তার পোস্টিং কোনো গ্রামে হোক, সে একা থাকবে। এখানে এসে গ্রামের দারুণ পরিবেশ বেশ লাগে তার। একটা বাসাও অফিসের পিয়নের সাহায্যে পেয়ে যায়। বাসা না বলে রাজবাড়ী বলা ভালো। এত বড় বাসা, চারদিকে গাছপালা, সবুজের মায়ায় ভর্তি। এত বড় বাড়িতে একলা থাকা বিশাল ব্যাপার। তবুও মানিয়েই যাচ্ছিল সুনন্দার। তবে একলা থাকা কদ্দিন ভালো লাগে। কিছুদিনের মধ্যেই আর ভালো লাগছিল না। কেমন একটা ভয় ভয় ভাব এসেছে। বাড়ির পিছন দিকটায় ছুটির দিন একটু ঘুরেছিল সে। আর এজন্যই রান্না করে মেয়েটা বানেসা অবাক হয়েছিল। মানা করেছিল যেতে। কিন্তু কেন? এই বাড়িটাই বা এমন অস্বাভাবিক ঠান্ডা কেন? ছাতিম গাছটা দেখে কেমন জীবন্ত লাগছিল। এমন গরম আবার জীবন্ত গাছ হয়? গাছে আবার পেরেক দেয়া। পেরেকগুলো কেমন ঠান্ডা। অদ্ভুত ব্যাপার। এদিকে কোত্থেকে একটা এক চোখ কানা কাক এসে হাজির হয়েছে। ভয়ানকভাবে ডাকে। একলা এই বাড়িতে আর না। তবে যাওয়ার আগে একটা কাজ করতে হবে।
আবার অতীতে ফিরে যাওয়া যাক। মনু ফজরের পরেই ঘাস কাটতে বেরিয়েছে গরুর জন্য। তবে আজকের দিনটা অন্যান্য দিনের মতো না। কেমন জানি লাগছে। কেউ কি আছে তার সাথে? পানিতে কী জানি একটা থপথপ করছে। এরকম একা এরপর অদ্ভুত এই শব্দ যেন কদিন আগে ঘটা ইদ্রিস আলীর ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয়। জমিতে কেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছিল তার খাওয়া দেহটা। কোনো মানুষ বা প্রাণী এমন করতে পারে? এই চিন্তা করতে করতে পানিতে সে যা দেখল তার ব্যাখ্যা নিজের কাছেই নেই। অন্যকে কী বিশ্বাস করাবে সে। ওদিকে মনুর বাড়ির কুকুর কালু সকাল থেকেই কেমন করে ডাকছে। অনুপ রায়ের জমিদারিতে আবার ঘন মেঘ দেখা দিচ্ছে তবে। না হয় একইভাবে ছমিরন তথা মনুর মাকে বন্ধ ঘরে কে ঠিক ইদ্রিসের ধরনেই খেয়ে ফেলবে?
আরো অতীতে চলে যাওয়া যায়। ১৮০০ সাল তখন। জমিদার বিষ্ণু রায়ের জমিদারিতে এমন ঘটনা ঘটলো যার ব্যাখ্যা নেই, যা জানবে না অন্য কেউ। তবে এই ঘটনা যুগের পর যুগ বয়ে বেড়াতে হবে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝তাহার বাড়ি অন্য কোথাও❞ মনোয়ারুল ইসলামের অতিপ্রাকৃত উপন্যাস। ১৬০ পৃষ্ঠার উপন্যাসটা অল্প সময়েই পড়ে নেয়া যায়। উপন্যাসের কাহিন�� এগিয়েছে মোট তিনটি সময়ে। অতীত, অতীতের অতীত আর বর্তমান। যেখানে প্রাধান্য ছিল অতীত আর বর্তমানের। শুরু থেকেই একটা অজানা ধোঁয়াশা দিয়েই এগিয়েছে গল্প। অতীতের কোনো ব্যাপার যা বর্তমানের মানুষ তেমন জানে না, শুনে এসেছে তাদের পূর্বপুরুষ থেকে। অতিপ্রাকৃত গল্পে যেমন থাকে তাই। তবে এখানে ভূতপ্রেতের ভয় থেকেও ভয় জাগানিয়া ছিল পরিবেশ। ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশের মাঝে একটু অতিপ্রাকৃত সত্তা�� উপস্থিতি বেশ দারুণ ছিল। বর্তমানের ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে চলেছে অতীত। তবে যেসব গল্প অতীত-বর্তমান মিশেল থাকে সেসব ক্ষেত্রে কেন জানি আমার কাছে মনে হয় অতীতটাই বেশ উজ্জ্বল, আকর্ষণীয় বা উপভোগ্য। এখানেও অতীতের ঘটনা বেশ দারুণ ছিল। বর্তমান সেখানে একটু মিইয়ে গেলেও গ্রাম্য পরিবেশের বর্ণনায় সেটা পুষিয়ে গেছে। লেখক কুমারী নামক গাঁয়ের জমিদারবাড়ির খুব সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। প্রকৃতির রূপের খেলা, সেইসাথে একটু ভয় ধরা আবহ বেশ দারুণ ছিল। বই আগাচ্ছিল কিন্তু সেই অদ্ভুত বর্ণনা পাওয়া সত্তার ঠিকুজি বুঝতে পারছিলাম না অথচ দেখছি বই ফুরিয়ে আসছে। তবে আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতেই যেন সে সম্পর্কে জানা গেল। শেষটা সুন্দর ছিল। তবে এক্ষেত্রে চাইলে কিছুটা লেখা বাড়তি থাকলে মোটেও বিরক্তি থাকতো না। উপন্যাসের শেষেই এসেছে দূরবর্তী অতীতের কথা। যা পুরো উপন্যাসের জট খুলতে সহায়ক ছিল। তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছিল। একদম গা ঠকঠক করে ভয় ধরানো না হলেও অতিপ্রাকৃত কিংবা ব্যাখ্যাতীত বর্ণনা দারুণ ছিল। শেষটা আমি আরেকটু ব্যাখ্যা কিংবা আরো কিছু পৃষ্ঠা আশা করেছিলাম। শেষের দিকের অতীতের বর্ণনায় কিছুটা তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করেছি। সময় নেয়া যেত। এছাড়া গ্রামের সাথে শহরের বর্ণনার পুরো ব্যাপারটা বেশ ছিল। ভালো লেগেছে সুনন্দার ঢাকার বাড়ির বর্ণনা। একইসাথে কুমারী গ্রামে ভাড়া নেয়া বাড়ির কথাও। তবে অতিপ্রাকৃত বইয়ের ক্ষেত্রে যা হয় একটা পুরোনো বাড়ি যেখানে কিছু ঘটনা আছে এমন বাড়িতে যখন কাঠমিস্ত্রি এলো সে এসেই নিঃসংকোচে কাজ করতে শুরু করলো ব্যাপারটা বেমানান। এখানেও লেখক কুকুর মে রে দিয়েছেন। আগের লেখা ক্রমিক খু নি ঘরনার বইগুলোতেও ব্যাখ্যা ছাড়া, কারণ ছাড়া কুকুর মা রার ব্যাপার ছিল।
চরিত্র:
সুনন্দা চরিত্রটা আমার বেশ লেগেছে। দুই বাড়ির পরিবেশের সাথেই কেমন করে যেন এক চরিত্রটা দারুণ মানিয়ে গেছে। অনুরাধা দেবীকে ভালো লেগেছে। জমিদার পত্নীর যেমন হওয়া উচিত তেমনই ছিলেন। একটু জেদ, অনেকটুকু মায়া, দায়িত্ববোধের মিশেল ছিলেন। অনুপ রায়কে বেশ লেগেছে। প্রজাপ্রেমী জমিদারের কথা পড়তে ভালো লাগে বেশ। ছমিরন চরিত্রটা আমার কাছে শক্তিশালী লেগেছে। বয়স, অভিজ্ঞতা, অনুভূতির প্রগাঢ়তা মিলিয়ে গ্রাম্য সহজ এই চরিত্রটাও কেমন যেন মুগ্ধ করা ছিল।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি। কিন্তু প্রচ্ছদের সাথে বইয়ের কাহিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভয়ংকর বা বলা যায় কিম্ভুতকিমাকার যে ছবিটা প্রচ্ছদে দেখা যায় সেটাই পুরো উপন্যাসের প্রাণ কিংবা.... বইতে বানানের ভুল ছিল বেশ। উড়ে কে কেন ওড়ে লেখা হলো বুঝলাম না। ইদানিং দেখি উঠে কে ওঠে, উড়ানো কে ওড়ানো এমন লিখে সেই ধারাবাহিকতায় তাই লেখা হলো নাকি কে জানে। অন্যধারার সম্পাদনায় আরো মনোযোগী হওয়া দরকার।
❛কিছু সত্তার বাস অজানা জগতে। সেখানে হয়তো তারা নিরীহ কেউ। কিন্তু পরিচিত জগতে এসে এরাই র ক্ত মাংসের প্রাণীর জন্য ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়। যার বাড়ি যেখানে না সেখানে কি সে মানানসই? তাহার বাড়ি অন্য কোথাও, কিন্তু কোথায়?❜
**"মনোয়ারুল ইসলামের "তাহার বাড়ি অন্য কোথাও" শুধু একটি বই নয়, বরং এক ধরনের অনুভূতি, এক আত্মঅনুসন্ধানের যাত্রা। বইটি কেনার সময় সৌভাগ্যবশত লেখকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, আর সুযোগ হাতছাড়া না করে তার অটোগ্রাফও নিয়ে নিলাম! তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার ছিল, তিনি স্বাক্ষর করার আগে আমার নাম জানতে চাইলেন এবং একবারে সঠিক বানানে লিখলেন—এটাই প্রথমবার হলো যে কেউ আমার নাম শুনে একদম ঠিকভাবে লিখেছেন!
বইটিতে রহস্য, অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতা ও গভীর আত্মপরিচয়ের খোঁজের কথা লেখা আছে। পড়ার প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমাকে এক অজানা জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যেখানে জীবনের ধারা, পরিচয় ও শেকড় নিয়ে প্রশ্নগুলো নিজেই উঠে আসে।বইটি পড়ার সময় একেকবার একেক স্টরিলাইনে যেন শিফট হচ্ছিলাম,যেটায় একটু বিরক্তি লাগলেও পরবর্তীতে গল্পের মধ্যে রোমাঞ্চ খুঁজে পেয়েছি।১৫১ পৃষ্টায় হুট করে একটা টুইস্ট পেলাম,যেটা একদমই আশা করিনি....
লেখকের সাদামাটা ভাষায় কিন্তু গভীর ভাবনা ও অনুভূতির সমাহার আমাকে একদিকে মুগ্ধ করেছে, আবার অন্যদিকে চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে। এমন এক বই, যা শুধুমাত্র গল্প বলে না, বরং পাঠকের মনকে ছুঁয়ে যায়—এক অভিজ্ঞতার মতো।
তোমরাও যদি একটু ভৌতিক ও মনোমুগ্ধকর সাহিত্যপথে যাত্রা করতে চাও, তবে ‘তাহার বাড়ি অন্য কোথাও’ একবার পড়ে দেখো।বলা যায়না তাহার খোঁজ পেলেও পেতে পার....নিশিকোলাপি.....হাহাহা....**
⭐Rating:৪/ ৫
#বইপড়ি #রহস্য #ভৌতিক #মনোয়ারুল ইসলাম #BookReview
গ্রামের নাম কুমারী। সুনন্দা এখানে এসেছে চাকরি সূত্রে। শহরের মেয়ে সে। কিন্তু সরকারি চাকরি পাওয়া, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লোভ সামলাতে পারেনি।। তাই ঢাকা থেকে এই অজপাড়াগাঁয়ে চাকরির পাশাপাশি বসবাস করার চিন্তাতেই তার আগমন। সমস্যা হলো, গ্রামে ঐভাবে বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না। অনেকদিন ধরে পরিত্যক্ত একটি বাসার খোঁজ মিলল অবশেষে।
বাড়ির মালিক শহরে থাকে। সুনন্দার অফিসের পিয়ন-ই এর দেখাশোনা করে। তার এক কথাতে বাসায় থাকতে রাজি হয়ে যায় সুনন্দা।
বিশাল বাড়ি। এত বড় বাড়িতে একটা থাকতে পারবে তো সে? শঙ্কা জাগে। কখনোই ভীতু ছিল না সুনন্দা। তাই ভয় অতটা পায় না সে। শীতকালের এই সময়টায় ঠান্ডা থাকবে স্বাভাবিক। কিন্তু বাড়ির ভেতর অস্বাভাবিক ঠান্ডা। পানি যেন মনে হয় বরফের চেয়েও শীতল। কারণটা কী? বোঝা যায় না।
যে মূল বাড়িতে সুনন্দা থাকে, তার পেছনে পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি আছে। একটি কুয়ো আছে সেখানে, পরিত্যক্ত। একটা ছাতিম গাছের দেখা পাওয়া যায়। কেমন যেন অদ্ভুত, পিচ্ছিল। সেই গাছ বা আশেপাশের কোনো গেছে ফুল ধরে না। কেন? গাছের গায়ে বড় বড় পেরেক মারা! গাছেরও তো প্রাণ আছে। তাহলে কেন এভাবে পেরেক মারা থাকবে? কাঠমিস্ত্রি দিয়ে পেরেকগুলো খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় সুনন্দা। কিন্তু সে জানে না, এর পরিণতি কী হবে!
সে অনেক কাল আগের কথা। তখন এই তল্লাটে জমিদারি শাসন ছিল। জমিদার অনুপ রায়ের জমিদারি আমলে প্রজারা বেশ সুখে শান্তিতেই থাকত। প্রজাদের অনেক ভালোবাসতেন জমিদার। তাদের সুখ দুঃখের কথা চিন্তা করতেন। এমন সময় এক বিভীষিকা নেমে আসে তার জমিদারিতে।
ছয় মাস আগে ইদ্রিস মোল্লার ��াশ পাওয়া যায় নিজ জমিতে। কী বীভৎস সে লাশ! কোনো হিংস্র পশু যেন ছিঁড়ে খেয়ে ফেলেছে। ইদ্রিস মোল্লার খণ্ডবিখণ্ড হাত-পা বিহীন হয়ে যাওয়ার কারণ কী?
ছয় মাস পর এক শীতের সকালে মনু মুন্সী এমন কিছু দেখে যেটা তার বিশ্বাস হতে চায় না। হয়তো মনের কল্পনা, চোখে ভুল। কাউকে যে বলবে সে উপায়ও নেই। এমন কথা কে বিশ্বাস করবে? সবাই তাকে পাগল ঠাউড়াবে।
কাউকে না বলার কারণেই হয়তো এর মাশুল দিতে হলো। বৃদ্ধ মায়ের লাশ দেখে ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠে মনু। জমিদার অনুপ রায় সব জেনেছেন। তিনি চেষ্টা করছেন এই বিভীষিকা থামানোর। কিন্তু এত সহজে কি অদৃশ্য শক্তির সাথে পেরে ওঠা যায়? কিন্তু প্রজা অন্তঃপ্রাণ জমিদার যে শেষ চেষ্টা করবেই।
তারও অনেক বছর আগে এই পৃথিবী আলো করে কিছু একটার জন্ম হয়ে। আলো, না অন্ধকার? মানব শিশু, না অন্যকিছু। যুগযুগ ধরে প্রকৃতি তার রহস্য ধরে রাখে। এই রহস্যের স্রোতে ভেসে যায় অনেক কিছু। অতীত বা বর্তমান, কিংবা তারও প্রাচীন কোনো সময়… সব বাঁধা পড়ে এক সুতোতে!
◾পাঠ প্রতিক্রিয়া :
যে কয়জন লেখকের সবগুলো বই পড়ার অভিজ্ঞতা আছে, মনোয়ারুল ইসলাম তাদের মধ্যে অন্যতম। তাই লেখকের লেখার সাথে পরিচয় আমার বেশ ভালো। সেই পরিচয় থেকে একটা কথা বলা যায়, “তাহার বাড়ি অন্য কোথাও” লেখকের পরিণত লেখার মধ্যে একটি। প্রতিনিয়ত লেখকের লেখা উন্নতির ছাপ বেশ চোখে পড়ে।
“তাহার বাড়ি অন্য কোথাও” বইটির প্লট ইন্টারেস্টিং। লেখক ১৬০ পৃষ্ঠার মধ্যে যেসব কাহিনির সমন্বয় ঘটিয়েছেন, অনায়াসে তার ব্যাপ্তি আড়াইশ বা তিনশ পৃষ্ঠায় নেওয়া সম্ভব ছিল। লেখক তার লেখায় বাড়তি কিছুর অবতারণা করেন না। যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই বর্ণনা করেন। অত্যন্ত মেদহীন লেখা। এই বিষয়টা ভালো লাগে। তারপরও মনে হয় কিছু অংশে একটু বেশি বর্ণনার আশ্রয় নিলে ক্ষতি হয় না। পড়ে তৃপ্তি পাওয়া যায়।
“তাহার বাড়ি অন্য কোথাও” বইটি অতিপ্রাকৃত জনরার বই। এই জনরায় লেখক ভালো লিখেন। তার ছাপ এই বইতে ছিল। লেখক যেভাবে গল্পের বুনন করেছেন, এই বিষয়টা পছন্দ হয়েছে। দুইটি টাইমলাইন পাশাপাশি চলমান, বর্তমানে এই ধরনের লেখার আধিক্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে অতীতের ঘটনা বইটিতে গল্পের ভিত গড়ে দিয়েছে, আর বর্তমান যেন এর পরিণতি বহন করেছে।
অতিপ্রাকৃত জনরার বই বলেই খুব যে ভয়ের ঘটনা ছিল, বিষয়টা এমন না। আবার খুব বেশি থ্রিল আশা করলেও হতাশ হতে হবে। জীবনের এক চলমান প্রক্রিয়ায় অতিপ্রাকৃত বিষয়ের উপস্থিতি লেখকের লেখায় উপস্থিত ছিল। জোর করে আরোপিত কোনো বিষয় আনার চেষ্টা করেননি লেখক। প্রবাহমান ঘটনায় যা ঘটবে সেটাই বাস্তব সম্মত।
তবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে বা কীভাবে কী ঘটছে, তা বই পড়ার সময় আন্দাজ করা যাচ্ছিল। তারপরও আন্দাজের সাথে মিল না হয়, বা সত্যিই কি এমন ঘটবে কি না — এই উপলব্ধি লেখক ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।
লেখকের ভাষাশৈলী বা লিখনশৈলী খুব সাবলীল। তবে আমার মনে হয়েছে এই বইটি কিছুটা ধীর গতির। না-কি লেখকের লিখন পদ্ধতির গতি কমে গিয়েছে, কে জানে? আগে যেমন গল্পের প্রবাহ তরতরিয়ে এগিয়ে যেত, এখানে সেই বিষয়ের অনুপস্থিতি ছিল। লেখকের লেখায় একটি বিষয় আমার খুব ভালো লাগে। তিনি সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর উপর বেশ নজর দেন। প্রকৃতির সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়ের উপর নজর দেওয়ার কারণে তার বর্ণনা বেশ প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। যেমন, কোনো এক পরিস্থিতিতে পুকুর, নদী, গাছ, প্রকৃতির যেমন থাকা প্রয়োজন; সেই পরিস্থিতি লেখক ফুটিয়ে তুলেন।
বইটিতে আরেকটি বিষয় ভালো লেগেছে। গ্রাম্য মানুষের সংলাপে আঞ্চলিক টান ছিল। গ্রাম্য সংলাপ ও শহুরে সংলাপের পার্থক্য বইটিকে আরো উপভোগ্য করে তুলেছিল।
লেখকের সব বইয়ের সমাপ্তি হয় ক্লিফহ্যাঙ্গারের মধ্য দিয়ে। মনে হয়, লেখক চাইলেই এর সিক্যুয়েল করা সম্ভব। নতুন কোনো ঘটনার আবির্ভাব হওয়া সম্ভব। এখানেও ছিল। বর্তমান সময়ের শেষ পরিণতি এমন হবে আশা করিনি আর অতীতের সমাপ্তি বেশ তাড়াহুড়ো মনে হয়েছে। আরেকটু বিস্তারিত আর রয়েসয়ে এগোনো যেত। এখানে একটা ব্যতিক্রম বিষয় লক্ষ্য করেছি। প্রারম্ভিকা বা কাহিনির শুরু যেখান থেকে হয়, সেই বিষয়টা অন্যান্য লেখক বইয়ের শুরুতে দেওয়ার চেষ্টা করেন। “তাহার বাড়ি অন্য কোথাও” বইটিতে একেবারে শেষদিকে ছিল। ফলে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর একদম শেষে এসে পাওয়া গিয়েছে। এই ব্যতিক্রম বিষয়ের কারণে শেষটা ভালো লেগেছে।
তবে একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে খচখচ করছে। এই অংশটা স্পয়লার, চাইলে এড়িয়ে যেতে পারেন। যে অতিপ্রাকৃত সত্তার কথা বলা হয়েছে, সে কেন ও কীভাবে ৮৫ বছর পর ছাড়া পেল; সে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তার দিক দিয়ে ব্যাকস্টোরি প্রয়োজন ছিল এখানে। তবে যদি সিরিজ করার চিন্তা লেখকের থাকে, তাহলে হয়তো এই দিকে নজর দেওয়া যাবে।
আরেকটা বিষয়, লেখকের কুকুরের সাথে কোনো শত্রুতা আছে মনে হয়। অন্যান্য বইতে গুলি করে কুকুর মেরে ফেলার কাহিনি থাকে। এখানেও আছে, তবে ভিন্ন পন্থায়। ঠিক কী কারণে কুকুরের উপর আক্রোশ, কে জানে!
◾চরিত্র :
লেখকের চরিত্র গঠন একদম টপনচ হয়। দুর্দান্ত বললেও কম বলা হবে। গল্পে খুব বেশি চরিত্র ছিল না। সুনন্দাকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সেটা বেশ আকর্ষণীয়। দৃঢ় চরিত্র কিন্তু মায়াবী। অন্যদিকে কৌতূহলীও বটে।
বানেসা চরিত্রটিকেও বেশ জায়গা দিয়েছেন লেখক। তবে আতর আলী চরিত্রটিকে আরেকটু সময় দেওয়া যেত হয়তোবা। শুরু থেকে তার গুরুত্ব থাকলেও পরে এই ছিল না।
জমিদার অনুপ রায়কে বেশ মনে ধরেছে। জমিদার মানে অত্যাচারী, প্রজাদের শোষণ করাই যাদের একমাত্র ব্রত; এই ধারা থেকে লেখক বের হয়ে এসেছেন। প্রজাদের ভালোবাসা দিলে প্রজারা মাথায় তুলে রাখে, অনুপ রায় যেন তেমন জমিদারেরই প্রতিচ্ছবি। তার চিন্তায় কেবলই প্রজাদের সুখ।
জমিদারপত্নীর সাথে জমিদারের ভালোবাসার যে বন্ধন দেখানো হয়েছে, এই বিষয়টা ভালো লেগেছে। ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত। যেখানে এক অদৃশ্য শক্ত মমতার বন্ধন গড়ে ওঠে।
◾বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
অন্যধারার বইতে সম্পাদনাজনিত, প্রুফজনিত ত্রুটি বেশ ভালোই লক্ষ্য করা যায়। এখানেও অনেক ছাপার ভুল, বানান ভুল ছিল।
বইতে উড়ে শব্দটিকে প্রতিবার ওড়ে লেখা হয়েছে। এছাড়া কি/কী এর ভুল ব্যবহার ছিল অনেক জায়গায়। [উত্তর যদি হ্যাঁ/নাতে হয় — তবে কি ব্যবহার করা হয়। আর বাকি সব উত্তরের ক্ষেত্রে প্রশ্ন কী ব্যবহৃত হয়]
প্রচ্ছদ কেন যেন ভালো লাগেনি। বেশি ডার্ক হওয়ার কারণে ফুটে ওঠেনি। আরেকটু লাইট করা যেত।
◾পরিশেষে, প্রকৃতি নিজের রহস্য নিজেই আড়ালে রাখতে পছন্দ করে। কিছু ঘটনা ঘটার পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। হতে পারে সেটা ভালো, কিংবা খারাপ। পুরোনো ঘটনা না জেনে নিজের মতো করে তার পরিবর্তন করতে চাওয়া বা বদলে দেওয়ার চেষ্টা কতটা যৌক্তিক? হতে পারে ভালোর জন্যই করা। কিন্তু কখনও কখনও হিতে বিপরীত হয়। সংখ্যায় নগণ্য হলেও, ওই হিতে বিপরীত হওয়াই প্রাণনাশের কারণ হতে পারে।
◾বই : তাহার বাড়ি অন্য কোথাও ◾লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম ◾প্রকাশনী : অন্যধারা ◾পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৬০ ◾মুদ্রিত মূল্য : ৩০০ টাকা ◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.২/৫
১৮০০ শতকের শুরুর দিকের কথা। বিষ্ণু রায়ের জমিদারির তখন মাত্রই পত্তন হয়েছে। মানুষের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে জমিদারের শৌর্য আর প্রতাপের সৌধ দিনকে দিন উঁচু হয়ে উঠছে... এমনই একসময়ে আশ্বিনী পূর্ণিমার রাতে আচমকাই আকাশ মেঘে ঢেকে যায়, শেষরাতে বৃষ্টি হয় খুব। সেই প্রবল বৃষ্টির রাতে জমিদারমহলে এক ভয়ানক অধ্যায়ের সূচনা হয়... তার গল্পই, তাহার বাড়ি অন্য কোথাও।
পাঠ প্রক্রিয়া: গল্পটা মূলত এগিয়ে গেছে তিনটা টাইম লাইন ধরে বর্তমান, অতীত এবং অনেক পুরানো অতীত।। যেখানে প্রতিটা টাইমলাইন একে অন্যের সাথে খুব সুন্দর ভাবে যুক্ত, পড়ার সময় নিজের কাছে মনে হয়নি এই তিনটা টাইম লাইন একটা অন্যের সাথে জড়িয়ে গোলকধাদা তৈরী করেছে, গল্পের মূল কেন্দ্র বিন্দু হল কুমারী গ্রাম, যেখানে শহর থেকে এই গ্রামের ব্যাংকে নতুন চাকরীতে যোগ দিয়েছে সুনন্দা।। এবং তার থাকার জন্য জায়গা হয়েছে গ্রামের একটি বিশাল বাড়িতে, সেখানে তার সাথে ঘটতে থাকে নানা রকমের অপ্রাকৃতিক ঘটনা।। বর্তমান সময়ে যেমন আমরা দেখতে পায় কুমারী গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্য, এবং এই অপরূপ সৌন্দর্য্যের পিছনে লুকিয়ে আছে অতীতের কালো এবং ভয়ংকর হাঁড় হীম করা অধ্যায়।। কিন্তু এই ভয়ংকর অধ্যায়ের কোথা সূচনা হয়েছে সেটা জানতে হলে পড়তে হবে "তাহার বাড়ি অন্য কোথাও"।
লেখকের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হল, উনি অযথা পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ান না।। সোজাসাপটা গল্প বলতে ভালোবাসেন।। গতবছর বইমেলাতে তার লেখা হরর উপন্যাস " রক্তের জবা" পড়েছিলাম।। এবং এর আগেও তার সাইকোলজিক্যাল ক্রাইম থ্রিলার "মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স" পড়েছিলাম।। ওটাও ভালো লেগেছিল।। এবং তার লেখনীতে দিন দিন ধার বাড়ছে এটা তার নিয়মিত পাঠকরা ভালো ভাবেই বুঝতে পারছে।। অবশেষে চাইবো এইভাবে সুন্দর সুন্দর উপন্যাস উপহার দিতে থাকুক আমাদের।।
বইটা প্রথম হাতে নিয়েছিলাম রোজার ঈদের পরপর, ডিউটির প্যারায় সব স্টুডেন্ট আসার আগেই ছুটির মায়া কাটিয়ে হলে আছি আমরা কয়েকজন। রাতে রুমের লাইট নিভিয়ে ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে আয়েশ করে পড়তে শুরু করলাম। প্রথম কয়েক পেজ খুবই স্বাভাবিক গল্প, একটি মেয়ে নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে। কিন্তু কেমন জানি অস্বস্তি লাগছিলো, লোকাল রুমমেট থাকেই না বলা যায়, প্রফের সময়ও এরকম নির্জনতার অভিজ্ঞতা আছে, সবসময় অন্ধকার রুমেই ঘুম ভালো হয় আমার, এরকম রাত জেগে লাইটের আলোতে বই পড়াও নতুন কিছু না- তারপরও গা ছমছম ভাবটা কাটছিলো না।
শুধু মনে হচ্ছিলো আরেকজন কেউ আছে আশেপাশে।
আয়াতুল কুরসী পড়ে নিয়ে বাধ্য হয়ে উঠে বই চেঞ্জ করলাম।
তারপর আর চেষ্টা করি নি, এটা হলে বসে পড়ার। বাসায় এনেও সুযোগ হয় নি। সুযোগ মিলতেই এবারে সদ্ব্যবহার। পড়তে গিয়ে পুরোটা সময় কেমন একটা ভয়ের আবহ ঘিরে ছিলো, এজন্য কাহিনীর চেয়ে লেখকের বর্ণনা ই বোধহয় বেশি দায়ী।
বইমেলায় যখন কিনেছিলাম, অটোগ্রাফ নেওয়ার সময় লেখক বলেছিলেন ফিডব্যাক চান পাঠক থেকে। কাহিনি জোরালো না লাগলেও আবহ সৃষ্টি টা একদম পার্ফেক্ট হয়েছে, এর চেয়ে কম ভয় পেলে জমতো না, এর চেয়ে বেশি ভয় পেলে লাইট জ্বালিয়ে ঘুমানো শুরু করতে হতো।
প্রচ্ছদটাও দায়ী হতে পারে এই অস্বস্তিকর গা ছমছমে শীতল অনুভূতির জন্য, সেক্ষেত্রে ডিজাইনারের প্রশংসা করতেই হয়।
আমি হরর পড়ি কম, না পড়ার কারন ভয় লাগে (হাহা), এই বইটার অনেক হাইপ দেখলাম goodreads এবং ফেসবুকে সেটা দেখেই পড়া শুরু। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে বইটা overhype। পড়ার সময় কোন ভয় লাগে নাই, কাহিনী পুরানো সময়ের বেশি, বর্তমান সময়ে যাও আছে বর্ননা বেশি সেটাও যে খুব ভয়ে তা নাই, বর্তমান সময়ের কাহিনী একটু একঘেয়েমি লেগেছে। পড়ে দেখেন কেমন লাগে সবার সব কিছু ভালো লাগবে এমন কোন কারনও নাই।
“তাহার বাড়ি অন্য কোথাও” এক ধাক্কা জাগানো হরর-উপন্যাস যেখানে সাধারণ মানুষের মাঝে অদ্ভুত আতঙ্কের ধাওয়া শুরু হয়। এক অচেনা, ভয়ানক প্রাণী যে নিঃশব্দে গ্রামের জমিদার বাড়ির কুয়াতে বাসা বেঁধে নেয়। প্রথম দিক থেকে লেখক পাঠককে খুবই সচেতনভাবে, হিংস্র অনিশ্চয়তা ও অপঘাতের পূর্বাভাস তৈরি করেন। তখনো জানা হয়নি প্রাণীটির প্রকৃত রূপ বা উৎস কী। কাহিনিতে ধীরে ধীরে আবির্ভূত হয় বীভৎস ঘটনার রেখা। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, রাত্রে কানে বাজে এমন শব্দ যা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। পরে জানা যায় এই প্রাণী শুধু মানুষকে হত্যা করে না তা মানুষের শরীর-রাহিত করে, চিবিয়ে খায়, আর তার অপঘাতে থাকা চিহ্নগুলো সমাজে একেকটি নড়চড় সৃষ্টি করে।
প্রথমে বইটির কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়েছিলাম, কিন্তু তাতে মোটেও মনে হয়নি যে পুরো বইটা শেষ করতে পারব। যে আশা নিয়ে বইটি হাতে নিয়েছিলাম, কিছু পৃষ্ঠা পড়ার পর মনে হয়েছিল ভুল বই নিয়ে বসেছি। হতাশা এমন ছিল যে প্রায় ছয় মাস বইটি আর খোলেও দেখিনি।
কিন্তু কিছু দিন আগে আমাদের এখানে প্রচণ্ড শীত পড়ল। বাইরে তুষারপাত আর হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, মনে হল ঠিক এই সময়টাই হয়তো একটা হরর বই পড়ার জন্য সঠিক সময়। হঠাৎ চোখ গেল তাহার বাড়ি অন্য কোথাও বইটির দিকে। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বইটি খুলে পড়া শুরু করলাম।
আর তারপরই ধীরে ধীরে বুঝলাম, লেখকের আসল শক্তি কোথায়। যে গল্প প্রথমে আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল, লেখকের কলমের জাদু আমাকে আবার গল্পের ভিতরে টেনে নিয়ে গেল। একসময় মনে হলো, বইটি যেন নিজের হাতেই নিজেকে পৃষ্ঠা-পর-পৃষ্ঠা উল্টে নিতে বাধ্য করছে। দুই দিনে দুই বসাতে সম্পুর্ণ বই পড়া শেষ।
দুইদিন জ্বরে বিছানায় পড়ে থাকবার কারণে দিন দুনিয়ার খবর ছিলোনা আমার। আজকে কিছুটা লেখার মত শক্তি হয়েছে, ভাবলাম একটা রিভিউ লিখেই ফেলি। যাইহোক.....
গল্প সংক্ষেপঃ " তাহার বাড়ি অন্য কোথাও" উপন্যাসও লেখকের অন্য অতিপ্রাকৃত উপন্যাসগুলোর মত কয়েকটি সময়কালে প্যারালালি চলতে থাকে। যেখানে আমরা বর্তমান, ১৮৮৫ এবং ১৮০০ শতকের একদম শুরুর সময়কালের ঘটনাপ্রবাহ দেখতে পাই।
উপন্যাসটি প্রাপ্তমনষ্কদের জন্য। শুরু> সুনন্দা ভদ্রা, আধুনিক যুগের স্বাবলম্বী সাহসী মেয়ে সরকারি চাকরির সুবাদে এক প্রত্যন্ত গ্রামে পোস্টিং হয়। শহরে নিজের বাবা-মা এবং প্রিয় মানুষকে ছেড়ে দেড়শ কিলোমিটার দূরে নিজের একাকীত্বকে সঙ্গী করে থাকতে শুরু করে অফিসের পিয়নের খুজে দেয়া একটি পুরনো বাড়িতে। অদ্ভুতরকম ঠান্ডা বাড়িটা। বাড়িটা কি ওকে কিছু বলতে চায়? হ���যাঁ চায় তো!
১৮৮৫ সাল, গ্রামের কৃষক মনু মুন্সী একদিন সকালে ধান কাটতে গিয়ে সম্মুখীন হয় এক বিভীষিকার।সেই ভয়ানক বিভীষিকা এই গ্রহের নয়। লোকে বলে এই মহাজাগতিক বিভীষিকাকে যে নিজের চোখে দেখে সে নাকি বাঁচেনা। ঠান্ডায় জমে যাওয়া মনু মুন্সীও ভয়ে সেদিন ঘেমে ভিজে গিয়েছিল। কী হবে মনু মুন্সীর? অন্যদিকে জমিদার অনুপ রায় এর বাড়ির কূপ এর পানি আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে। এভাবে কূপের পানি কমতে থাকায় তারা তাদের পুরনো কূপটা খনন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ছমিরন বেওয়া অন্ধ মানুষ। তার কুকুর কালো নাকি ভবিষ্যৎ বুঝতে পারে। ইদ্রিস মোল্লার আধখাওয়া দেহটা তার নিজের জমিতেই পড়ে ছিল। এই ঘটনার আগে ছমিরন বিবি বলেছিল, " কিছু একটা হইব, খুব খারাপ কিছু। " তার পোষ্য কালু নাকি সব টের পায়। কি টের পায়? খারাপ কিছু? মৃত্যু? কিন্তু কার?
জানতে হলে পড়তে হবে " তাহার বাড়ি অন্য কোথাও " বইটি।
প্রতিবছর লেখকের ১টা করে অতিপ্রাকৃত উপন্যাস বের হবে এবং সেই উপন্যাসের রিভিউ করতে গিয়ে আমি ১টা কথাই বলি যেন আমি আমার মায়ের মুখে বিভিন্ন কিংবদন্তি গল্প শুনছি। (পুষ্কুন্নিতে ডেগ থাকা, ভোগ নেয়া এই টাইপের গল্প) লেখককে সাধুবাদ যে তিনি হারিয়ে যাওয়া কিংবদন্তিগুলোকে জীবন্ত রাখছেন। (অবশ্যই যেকোনো কুসংস্কার এর পক্ষে লেখক বা আমি কেউই নই।)
এখনকার জেনারেশন যখন নানী-দাদীর মুখে ভূতের গল্প শোনা কি সেটা জানেনা। একদিন বই পড়ার মাধ্যমে তারা জানবে এসব। ভূতের গল্প আসলেই ভূতের গল্প অর্থাৎ সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া গল্প।
১৬০ পৃষ্ঠার বইটা মনের মধ্যে পদে পদে ভয়ের সৃষ্টি করলেও কিছু জায়গায় বারবার ঝুলে যাচ্ছিলো অধিক বর্ণনার দেয়ায়, যার কারণে ক্লাইম্যাক্সটা একটু ফিকে লাগছে। সুনন্দার পার্টগুলো আরও ছোট হতে পারতো।
আমি জানি লাভক্র্যাফটিয়ান হরর এভাবেই হুট করে শেষ হয়। তারপরও মনে হয় ক্লাইম্যাক্সটা আরেকটু ইন্টারেস্টিং হতে পারতো।
স্পেশাল নোট: জক্কু হাজীকে আবারো ফিরে পেয়ে ভালো লাগলো। জক্কু হাজি এভাবেই ফিরে আসুক বারবার।
কারেকশন : ২১পৃষ্ঠার প্রথম লাইনের ৮নং শব্দ গাঙ হবে (গ্রাম) লেখা হয়েছে। ৪০ পৃষ্ঠার ৪নং লাইনের ৪নং শব্দ দেরী হবে(দিরং) লেখা হয়েছে। (হতে পারে আঞ্চলিক)
সব মিলে বেশ উপভোগ্য উপন্যাস "তাহার বাড়ি অন্য কোথাও।" উপন্যাসের নামের সাথে উপন্যাসের মিল পাবেন একদম শেষের পাতায় শেষ শব্দটি পড়ে।
তাহার বাড়ি অন্য কোথাও মনোয়ারুল ইসলাম অন্যধারা বইছবি : আমি নিজেই, মডেল : আমার বউ রেটিং: ৫/৫ হ্যাপি রিডিং❤️
🔴বইঃ তাহার বাড়ি অন্য কোথাও 🟢লেখকঃ মনোয়ারুল ইসলাম 🔵প্রকাশনীঃ অন্যধারা
⭕ফ্ল্যাপ থেকেঃ ১৮০০ শতকের শুরুর দিকের কথা। বিষ্ণু রায়ের জমিদারির তখন মাত্রই পত্তন হয়েছে। মানুষের রক্ত পানি করা পরিশ্রমে জমিদারের শৌর্য আর প্রতাপের সৌধ দিনকে দিন উঁচু হয়ে উঠছে...এমনই এক সময়ে আশ্বিনী পূর্ণিমার রাতে আচমকাই আকাশ মেঘে ঢেকে যায়, শেষ রাতে বৃষ্টি হয় খুব।সেই প্রবল বৃষ্টির রাতে জমিদারমহলে এক ভয়ানক অধ্যায়ের সূচনা হয়...তার গল্পই,তাহার বাড়ি অন্য কোথাও।
🔺"I KNEW NOTHING BUT SHADOWS,AND I THOUGHT THEM TO BE REAL."🔻 ~OSCAR WILDE
⭕পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ সম্প্রতি পড়া শেষ হলো লেখক "মনোয়ারুল ইসলাম" ভাইয়ের এবারের বইমেলার নতুন বই "তাহার বাড়ি অন্য কোথাও"। বইটি মেলার প্রথমদিকেই রকমারি থেকে অর্ডার করে ফেলি, ভেবেছিলাম একরাতে পড়া শেষ করেই রিভিউ দিয়ে ফেলবো সবার আগে। কিন্ত বই হাতে পাওয়ার পরেই সমানে একের পর এক রিভিউ আশা শুরু করলো বইটা সম্পর্কে,তাই একটু দেরী করেই শুরু করলাম।🤭
যাই হোক গল্প শুরু হয় "সুনন্দা" নামের এক তরুণীকে নিয়ে। ভাগ্যক্রমে তার একটা সরকারি চাকরি হয়ে যায়,কিন্তু পোস্টিং হয় "কুমারী" নামের এক দূরবর্তী প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামে।এদিকে শহরে বেড়ে উঠা একটি মেয়ে গিয়ে উঠে শত বছরের পুরোনো এক বাড়িতে। যেই বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে ভয়ংকর কোনো অভিশাপ!! ১৮৮৫ সালের এক সকাল।শীতকাল। মনু মুন্সী নামের এক গেরস্ত লোক সকালে তার গরুর জন্য নিত্যদিনের মতো ঘাস কেটে আনতে যায়; সেখানে গিয়ে সে এক মূর্তিমান বিভীষিকার সম্মুখীন হয়। কিছুদিন পরে এক সকালে তার মা ছমিরন বেওয়ার ছিন্নভিন্ন বিভৎস লাশ পাওয়া যায় তার শয়নকক্ষে।যা কিছুদিন পূর্বে ঘটে যাওয়া ইদ্রিস মোল্লার হত্যাকান্ডের ঘটনা মনে করিয়ে দেয় গ্রামবাসী সকলকে। এদিকে জমিদার "অনুপ রায়" ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান।তবে কি এতকাল ধরে প্রচলিত কাহিনী টি সত্যি যা কালক্রমে এই জমিদার বংশে গোপন করে রাখা হয়েছে?? অনুপ রায়ের পিতামহ "বিষ্ণু রায়ের" আমলে কি ঘটেছিলো জমিদারমহলে!
গল্পের সাথে সুনন্দাই বা কিভাবে জড়িত?? কি হয় শেষ পর্যন্ত! গ্রামে কি নেমে আসে কালরাত্রি'র অভিশাপ নাকি ভয়ানক কোনো আদিম সত্ত্বার আবির্ভাব ঘটে;যাহার বাড়ি এই পৃথিবীতে নয় বরং অন্য কোথাও!!
🟪আপাতদৃষ্টিতে কাহিনী পর্যালোচনা করতে গেলে হয়ত মনে হবে খুব কমন একটা প্লট। তবে লেখকের প্লট তৈরী, বাচনভঙ্গি এবং লেখনশৈলীর সুনিপুণতায় সত্যিই মুগ্ধ হতে হয়েছে। যা পাঠক শেষ পর্যন্ত না পড়লে বুঝতে পারবেন না। এই উপন্যাসে তিনটি টাইমলাইনে গল্প বলা হয়েছে-অতীত,তার অতীত আর বর্তমান মিলেমিশে এখানে একাকার হয়ে গেছে। 🕳️ ১৬০ পৃষ্ঠার এই ছোটো কলেবরের উপন্যাসটি হয়ত একবসায় পড়ে শেষ করে ফেলতে পারেন। আর আবহাওয়া যদি এখনকার মতো ঠান্ডা, বাইরে বৃষ্টিবৃষ্টি ভাব থাকে, তাহলে তো আর কোনো কথাই নেই! সবশেষে,যারা হরর পড়তে পছন্দ করেন অবশ্যই তাদেরকে একবার হলেও পড়ে দেখার জন্য সাজেস্ট করবো। রেকমেন্ডেড।✅
সুনন্দা। বাবা মা নিয়ে ছোট্ট সুন্দর সংসারে থাকা একজন মেয়ে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, গ্র্যাজুয়েশনের পরে সরকারি ব্যাংকে চাকরি হয়। পোস্টিং হয় কুমারী নদীর কোল ঘেষা ছোট্ট সুন্দর একটি গ্রামে, নদীর নামে যে গ্রামের নাম কুমারী। তার পরিবার যদিও একা একজন মেয়েকে চাকরির জন্য গ্রামে পাঠাতে বেশ উদ্বিগ্ন ছিল, কিন্তু মেয়ের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে রাজি হয়৷ যেহেতু ছোট্ট একটি গ্রাম, থাকার জায়গার অভাব কারন যারা সেখানে থাকেন তারা স্থানীয়। ভাড়া দিয়ে থাকার মানুষ সে গ্রামে নেই। রয়েছে প্রকান্ড এক বাড়ি, কেমন যেন এক মহলের মতন যে বাড়িতে বাড়ির মালিক থাকে না। সেখানেই ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে সুনন্দা। কখনো একাকী জীবন তার থাকা হয়নি, কিন্তু এই গ্রামের নির্জনতা তাকে ঘিরে ফেলে। সেই সাথে রয়েছে বাড়িটির অদ্ভুত এক নির্জন কথা। তার মনে হয় বাড়িটি কিছু বলতে চায়, বাড়িটির আশেপাশে কেমন যেন এক রহস্যঘেরা। কি সেই রহস্য? কেনোই বা গ্রামের মানুষ এই বাড়িটিকে এড়িয়ে চলে? কোনো অভিশাপে অভিশপ্ত বাড়িটি নাকি সব কিছুই গ্রামের সহজ সরল মানুষের ভ্রান্ত কুসংস্কার?
অতীত সময়।
সময়টা ১৮০০ সাল। বিষ্ণুপুর গ্রামের জমিদার অনুপ রায়, গ্রামের প্রজাদের প্রতি নিবেদিত প্রাণ, সুখ দু:খে সর্বদা পাশে থাকা এক মানুষ। কিন্তু হঠাৎ করে এই সুখী গ্রামে নেমে আসে অন্ধকারের কালো থাবা, একে একে নৃশংস ও ভয়াবহ মৃত্যু দেখতে থাকে গ্রামের বাসিন্দারা৷ কে রয়েছে এই বিভৎস মৃত্যুর পেছনে? কোনো ভয়াবহ জঙলী জানোয়ার নাকি অপার্থিব কোনো শক্তি যার অস্তিত্ব জানে না পৃথিবী।
বর্তমানের মাঝে কি আসছে অতীতের কোনো কালো ছায়া? সুনন্দার সাথে কি ঘটল? জমিদার অনুপ রায় কি পেরেছিলেন তার গ্রামকে অভিশপ্ততা থেকে মুক্তি দিতে?
° অনেকদিন পরে গ্রাম বাংলা নিয়ে একটি ভৌতিক কাহিনী পড়লাম, যেখানে চিরায়ত উপন্যাসের ভৌতিক কাহিনীর মতন ক্ল্যাসিক একটা ভাইব ছিল, গ্রামের পরিবেশ নিয়ে সুন্দর বর্ননা ছিল। ক্ল্যাসিক হররে যেমন খুব বেশি ভয়ের কাহিনী থাকে না কিন্তু অদ্ভুত একটা ভয়ের উপাদান থাকে এই উপন্যাসের কাহিনীতেও তা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় অসঙ্গতি লক্ষনীয়। যেমনঃ কাহিনীর একটি চরিত্র সুনন্দা এক যাকে দেখা যায় তুলসী গাছে পানি দিতে, আবার কিছুক্ষন পরেই তাকে দেখা যাচ্ছে নামাজ পড়তে। অবশ্য এটা অসঙ্গতি নাকি সামনে এই কাহিনী নিয়ে আরো বিস্তৃত পরিকল্পনা লেখক মনোয়ার ভাইয়ের আছে তা জানি না। খুব বেশি ভয়ের না হলেও গ্রামীণ পরিবেশে একটা গা ছমছমে আবহ পেতে পড়তে পারেন 'তাহার বাড়ি অন্য কোথাও'।
এবছরের প্রথম হরর বা অতিপ্রাকৃত বই পড়ে শেষ করলাম। বইয়ের প্রথম দিকের অংশ যখন পড়তেছিলাম তখন তেমন আহামরি কিছু মনে হয় নি। তবে আস্তে আস্তে শেষের দিকে এগিয়ে আসছিলাম তখনই আস্তে আস্তে ভয়টা লাগা শুরু হয়। বই পড়লে অন্তরআত্মা কেঁপে যাবে, ভয়ে আপনার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাবে এমনটা কিন্তু না; তবে এই লেখক লেখনীর মাধ্যমে পাঠকের মনে যেভাবে ভয়ের সঞ্চার করতে চেয়েছেন সেটা অনেক ভালো। আগে যেটা বলেছি, প্রথমদিকে মনে হচ্ছিলো সাধারণ একটা হরর বই, কিন্তু পরবর্তীতে যখন লেখক ধীরে ধীরে কাহিনীতে একটা কাঠামো দাঁড় করাতে শুরু করবেন তখন পাঠকের ভয় লাগাটা শুরু হবে। পড়তে পড়তে পাঠকের মনে গা ছমছমে একটা অনুভূতির সৃষ্টি হবে। যারা অতিপ্রাকৃত বিষয়বস্তু পছন্দ করে, তাদের অবশ্যই বইটা ভালো লাগবে।
মূলত পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই ভয় লাগাটা শুরু হয়; লেখকের লেখনী প্রাঞ্জল। এছাড়া বইটা রাতের দিকে আমি পড়ছিলাম, রাত বেশী হয়ে গেলেও বই শেষ করা ছাড়া উঠতে ইচ্ছা করছিলো না, কোনো একটা আকর্ষণে বইয়ের সাথে যেন আটকে ছিলাম। এখানেই হয়তো একজন লেখকের সফলতা। আমার পড়া মনোয়ারুল ইসলামের প্রথম বই এটি, সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে গেলে খুব ভালো লেগেছে। তবে বইয়ের অতীতের অতীত অংশটা আরেকটু বড় করে লিখলে, আরেকটু রোমাঞ্চের সৃষ্টি করলে আরো বেশী লাগতো।
এক বসাতেই পড়ে ফেলার মতো বই। কিন্তু আমি পারিনি, যেহেতু আমার একাডেমিক + অন্যান্য কাজও ছিল। যেহেতু হরর জনরার বই, লেখক তা ভালো করেই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। পড়ার সময় ভয়ের আবহটা বেশ ভালোই তৈরি হয়েছিল। দুটো টাইমলাইন জুড়ে গল্পটা বেশ ভালোই এগিয়েছে। শুরু থেকেই গল্পটির পিক ভালোই ধরেছিল। কোথাও স্লো মনে হয়নি বা মনে হয়নি যে, এই বিষয়গুলো অহেতুক। আরও একটি বিষয় ভালো লেগেছে যে গল্পটিকে টেনে হিঁচড়ে বড়ো করেনি।
আচ্ছা, এবার একটু যে বিষয়গুলোর দিকে নজর পড়েছে,তা একটু বলি:
~৯৪ পৃ: বলা আছে সুনন্দা আজান হলে নামাজ পড়ে ভাত খেয়ে মাধুকরী বইটা নিয়ে শুয়েছিল।আবার ১ম পৃ ওর নাম সুনন্দা ভদ্রা। তার মানে ও হিন্দু। আবার ওর বাবার নাম রফিক ঠাকুর। হিন্দুদের কিন্তু বাবার টাইটেল এর সাথে সন্তানদের টাইটেলের মিল থাকে যদি না ব্যতিক্রম কোনো কিছু হয়ে থাকে।
~ ৩৬ পৃ. বলা আছে ইদ্রিস মোল্লা জমি দেখতে আসার পর আর বাড়ি ফেরেনি। আবার ৭১ পৃ. ইদ্রিস আলী রাতের বেলা পেশাব করতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। এখন কি এই ইদ্রিস মোল্লা এবং ইদ্রিস আলী আলাদা ব্যক্তি?
এছাড়াও বেশকিছু ছোটখাটো বানান ভুল চোখে পড়েছে। এইতো, আর তেমন কোনো সমস্যা চোখে লাগেনি। এসব ভুলগুলো বাদে পুরো বইকে ভালোই লেগেছে বেশ।
এতো এতো বইয়ের ভিড়ে এই একটা বই এক বসায় পড়ে শেষ করে ফেলার মতো,যদিও আমি ২ বসায় শেষ করেছি। এবারের বই মেলায় যতগুলো বই কিনেছি কোনোটাই এরকম মনে ধরে নাই বা কন্টিনিউ পড়ে যাবার মতো ধৈর্য আসে নাই আমার অন্য গুলো পড়ে। কিন্তু এইটা! এতো সুন্দর করে একেকটা প্লট লিখা হয়েছে। দারুন লেখনী! হরর জনরার মধ্যে আমার পড়া ওয়ান অফ দা বেস্ট বই এটা। যারা হরর,থ্রিলার,রহস্য সবকিছুর মিশ্রণ চান তারা পড়তে পারেন বই টা। "অদ্ভুত আঁধার এক" এবং "তাহার বাড়ি অন্য কোথাও" দুইটি বইই দারুন। তবে এইটা বেশিইই ভালো লেগেছে।
বইটার প্লট ভালো আছে।ফ্লুয়েন্টলি পড়া যায়,এইটা একটা plus point কারণ পড়ে শান্তি পাওয়া যায়। বইটা slow না,বেশ speedy।
কিন্তু কিছু minor (can be major depending on perspective) issues আছে। বইয়ের character-এর গুলোর dialogue কোনো কোনো জায়গায় out of space লেগেছে,বানান ভুল আছে কিছু(probably প্রকাশকের দোষ)। উপন্যাসের Ending-টা rushed লেগেছে,আমার মতে আরেকটু ধীরগতি হলে সম্ভবত আরো ভালো হতো।
অতি প্রাকৃত বিষয়ক বই বেশি পড়া হয় না। তো ভাবলাম গত বছরের বইমেলায় প্রকাশিত হওয়া বইটি পড়লাম। সত্যি বলতে ভয় পাওয়ার মতো বই আমার কাছে এটা এতটা মনে হয়নি, মানে যতটা এক্সপেক্ট করেছিলাম ততটা নয়। বর্তমান অতীত ও তার অতীতের সংমিশ্রণে এই গল্পটি। যেখানে অদ্ভুত দেখতে একটি প্রাণীর গল্প বলা হয়। যার প্রধান খাদ্য মানুষের মাংস। আর এই প্রাণীর গল্পে প্রথম বার সূচনা ঘটে ১৮৮৫ সালে জমিদার বাড়ির এক কুমারী দাসীর গর্ভধারণ দ্বারা।