গল্পটা মধ্য যুগের। যখন বিভক্ত বঙ্গ ভূমিকে শাসন করতো দিল্লি সালতানাত। বিভক্ত অঞ্চল গুলোই দ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠে। স্বপ্ন দেখে স্বাধীন সালতানাত হওয়ার। গল্পের নায়ক এক তুর্কী বীর। ইতিহাস যাকে চিনেছে বঙ্গভূমির প্রকৃত নায়ক নায়ক হিসেবে। এই বঙ্গের মাটিততে জন্ম না নিয়েও তিনি ধারণ করেছিলেন এই মায়ামাটির সোদা গন্ধ, এর স্পর্শ। গল্পটি সেই সুলতানের যার মানব স্বত্তাকে অনেকটা অনালোচনায় রেখে দেয়া হয়েছিল। গল্পটা সেই মানুষটির প্রেম, ভালোবাসার - এই বঙ্গভুমিকে আপন করে নেয়ার। এই গল্পে প্রেম আছে, আছে রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ, আর্তনাদ, আছে ছলনা, কূটনীতি, কাম, মোহ আর দ্রোহের।একজন সাধারণ সৈন্য থেকে অসাধারণ সুলতান হয়ে ওঠার গল্প- যার সাহস ও বীরত্ব ইতিহাসকে বাধ্যকরে শত শত বছর পরেও আলোচনায় রাখার। তার সুদূর চিন্তায় আর বীরত্বে কেঁপেছিলো দিল্লি। তার নাম শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। মধ্যযুগের স্বাধীন এক সালতানাত। যা প্রসারিত হয়েছিলো বিহার, পাটনা, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, উরিষ্যা ও কাঠমুন্ডু পর্যন্ত। গল্পটা এই বাংলার, যা স্বাধীন সালতানাত হয়েছিলো প্রায় সাতশো বছর আগে। সেই মধ্য যুগে, একটি পূর্ণ সালতানাত হয়ে - যার নাম, সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ।
❛বাংলার ইতিহাস সমৃদ্ধ। এখানে বড় বড় সাম্রাজ্যের শাসন হলেও বাংলা ছিল আপন মাধুর্যে ভরপুর। এজন্যই তুর্কি থেকে মোঘল, পর্তুগিজ কিংবা ডাচ বা ইংরেজদের চোখ ছিল এই বাংলায়। এই বাংলার নদী, মাছে-ভাতে বাঙালির মধ্যে ছিল নিবিড় এক আকর্ষণ। বাংলাকে বলা হতো সোনার খনি। মাটি খুঁড়ে কাঁচা সোনা পাওয়া না গেলেও এই বাংলার সমৃদ্ধি ছিল অসীম।❜
দিল্লির মসনদে তখন তুর্কি বংশ শাসন করছে। সময়টা ১৩৩৫ সাল। সুলতান মুহাম্মদ তুঘলক দিল্লি শাসন করছেন। খাজা নিজাম উদ্দিন আউলিয়া গত হয়েছেন তাও দশক পেরিয়ে গেছে। কিন্তু তুঘলক সেখানে দেখা করতে যাননি। উল্টো নিরাপত্তার খাতিরে রাজধানী দিল্লি থেকে স্থানান্তর করে নিয়েছেন নতুন নাম ❛দৌতলাবাদ❜ নামক জায়গায়। দিল্লির সাথে দূরত্ব তার পৃথিবী থেকে সূর্যের সমানই বলা যায়! দিল্লির দায়িত্ব তাই পড়ে সুলতানের চাচাতো ভাই শাহজাদা ফিরোজ শাহের উপর। এর আগেই তুঘলক বঙ্গকে তিনটি ভাগে ভাগ করে তিনজন শাসনকর্তা সহ ছোট রাজ্যগুলোর জন্য সামন্ত রাজা ঠিক করে দিয়েছেন। এভাবেই চলছে। দিল্লির দরবারে এসেছেন সামন্ত রাজা শিখাই স্যানাল। তার উদ্দেশ্য ভিন্ন। কিন্তু ছোট পদক্ষেপে বড় চালের দিকে এগোচ্ছেন তিনি। সেই ছোট পদক্ষেপের একটি হলো দিল্লির দরবারে ❛মল্লযু দ্ধ❜ আয়োজন। স্যানালের পক্ষ থেকে একজন এবং ফিরোজ শাহের পক্ষ থেকে আলী মোবারককে দায়িত্ব দেয়া হলো একজন মল্ল যো দ্ধা নির্বাচনের। আলী মোবারক তার অতীতের ঋণ শোধ করতে আর নিজের কৃতজ্ঞতার জন্য ছুটলো সাকাস্তানের ভূমিতে। যেখানে অতীতে সে হারিয়েছিল তার ভালোবাসা আর যেজন্য ত্যাগ স্বীকার করেছিল তার দুধ ভাই। সাকাস্তানে গিয়ে মল্ল যো দ্ধা হিসেবে সে ঠিক করলো তার আরেক দুধ ভাই ইলিয়াসকে। ইলিয়াস, যার স্বপ্ন অনেক বড়। জাতে তুর্কি এই পুরুষ চায় নিজেকে বড় আসনে দেখতে। সেই বড় আসনের ছোট পদক্ষেপ হয়তো শুরু হলো মল্ল যো দ্ধা হিসেবে দিল্লি গমন। ইতিহাসের পাতায় সামনে লেখা হবে এক বীরের নাম। দিল্লিতে মল্ল কসরতে তার প্রতিপক্ষ রূপাই। জাতে বঙ্গের এই পুরুষ শক্তি সমর্থে যে কারো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ইলিয়াসের সাথে তার হলো একেবারে উত্তেজনায় পূর্ণ এক মল্ল যু দ্ধ। ফলাফল ইলিয়াসের পক্ষে না গেলেও দিল্লিতে থাকবার ব্যবস্থা হয়ে গেল। হলো রূপাইয়ের সাথে বন্ধুত্বও। এদিকে রূপাইকে স্যানাল দিল্লিতে ফিরোজের কাছাকাছি রেখেছে। তার আছে এক দুরভিসন্ধি। ইলিয়াস ফিরোজের বাহিনীতে স্থান পেয়েছে। এগিয়ে যাচ্ছে তার স্বপ্নের দিকে। যদিও দিল্লি এখনো বহুদূর। তবুও... নিজের স্বপ্নের শুরু না হতেই সেখানে বসন্তের দোলা হিসেবে এসে গেল এক নারী। যার নাম হুসনে আরা সার্সি। শাহজাদা ফিরোজের দ্বিতীয় বিবি। নিশ্চিত বিপদ জেনেও এই সম্পর্কে সে এগিয়ে যায়। তবে শাহজাদার বিবির সাথে সম্পর্ক করলে সেটা যে সুমধুর হবে না সেটা অনভিজ্ঞ ইলিয়াস বুঝতে পারেনি। ফলাফলে তাকে রাতের আঁধারেই পালিয়ে যেতে হয়। নিজের পদ হারিয়ে বঙ্গদেশে আসতে হয় আলী মোবারককেও। জীবনের প্রথম প্রণয়েই এভাবে ধোঁকা খেয়ে ইলিয়াস ফিরে আসে আপন ভূমিতে। মাতাকে নিয়ে হজ্জ পালন করে। সংসারী হয়, বিয়ে করে সাদিকাকে। কিন্তু মনে যার জয়ের নেশা, পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সে কী করে থিতু হয় সংসারে? মহাকাল তো চায় না সেটা। তাই আবার সে ফিরে আসে পথ পেরিয়ে এই বঙ্গে। সঙ্গে তার সন্তান সম্ভবা বিবি সাদেকা। আবার দেখা পায় আলী মোবাররকের। ভাইকে সে ফিরিয়ে দেয় না। কাজ পায় কদর খানের দলে। জানতে পারে বাংলায় হয়েছে পরিবর্তন। আগের শাসককে সরিয়ে বাংলায় স্বাধীন সুলতান হিসেবে আসীন হয়েছে এককালের ফখড়া। যার নাম এখন সুলতান ফখরুদ্দিন শাহ্! ফখরুদ্দিনকে দেখে নিতেই কদর খানের কথায় আলী মোবারক ইলিয়াস এবং গাজীকে তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠায়। সেখানে গিয়ে ইলিয়াস দেখা পায় তার বন্ধু রুপাইয়ের। ঘটনাক্রমে রূপাইয়ের সাথে ইলিয়াস বাংলার এই নতুন সুলতানের দল হয়ে যু দ্ধে নামে সামন্ত রাজা প্রতাপের। উদ্ধার করে রূপাইের ভালোবাসা ফুলিকে। ফিরে যায় সে আবার কদর খানের কাছে। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে নতুন অভিজ্ঞতা পুঁজি নিয়ে তারা ফখরুদ্দিনের বিরুদ্ধে ময়দানে নামে। এভাবেই ঘাত প্রতিঘাতে কেটে যায় সময়। ইলিয়াস সিকান্দার নামের পুত্রের পিতা হয়। এক ময়দানে বন্ধু রূপাইয়ের বিপক্ষে মুখোমুখি হয়। নিয়তির পরিহাসে প্রাণ হারায় রূপাই। এখানেই শুরু হয় আরেক অধ্যায়। স্বামীর সাথে সহম রণে যাওয়া থেকে বাঁচাতে ফুলিকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করে ইলিয়াস। ফুলি হয় ফুলমতি। কিন্তু তার ভালোবাসার বিবি সাদেকা এবং সদ্যোজাত সন্তানের কী হবে? এরমাঝেই আলী মোবারক আলাদা করে নিজেকে সুলতান হিসেবে ঘোষণা করে। কদরের নির্মম প্রাণনাশ, ইয়াহিয়ার প্রয়াণ আর ধীরে ধীরে ইলিয়াসের বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তার ফলাফল হিসেবে বঙ্গের একপ্রান্তের সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত হয় ইলিয়াস। নাম হয় শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্। তবে নিজের এই সুলতান হওয়ার পিছে তার জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল দ্বিতীয়া বিবি ফুলমতির হাত। জ্ঞানে, প্রজ্ঞায় পূর্ণ এই নারী তাকে ধীরে ধীরে আকৃষ্ট করে। তার বুদ্ধি, সমর জ্ঞান, আর কূটনীতি ইলিয়াসকে স্বাধীন বঙ্গের সুলতান হিসেবে অধিষ্ঠিত করতে বিশাল ভূমিকা রাখে। ফুলমতির সাথে যত ঘনিষ্ঠ হতে থাকে ততই দূরত্ব বাড়তে থাকে প্রথমা বিবি সাদেকার সাথে। এই কি নিয়তি? যে সাদেকা নিজের ভূমি ছেড়ে স্বামীর জন্য নিজের সব সপে দিলো সেই আজ অবহেলিত। এভাবে কি থাকা যায় একত্রে? সাদেকা নিজের পথ দেখলো। ইলিয়াস মসনদের বৃদ্ধিতে এতই বিভোর যে সময় পেলনা বিবির চলে যাওয়া আটকাতে। এদিকে দুধ ভাই আলীর সাথে তার আসন্ন যু দ্ধ এড়াতে চায় সে। কিন্তু ভেতরে চালছে কেউ কোনো কূটচাল। সে কে? নানা ঝামেলা পেরিয়ে ফখরুদ্দিনের সাথে মিত্রতা হয় ইলিয়াসের। আর ওদিকে প্রাণ হারায় আলী। ইতিহাস ইলিয়াসকে তকমা দেয় ভাই হ ত্যাকারী হিসেবে। আদতে সে নির্দোষ। কূটচালের সন্ধান পায়, আর সেটা অন্দরেই। আলাদা করে দেয় সেই কূটচালিনিকে। সময় বয়ে যায় আবার একত্র হয় সাদিকা এবং ইলিয়াস। স্বাধীন বঙ্গ ঘোষণা করে ইলিয়াস নাম দেয়, ❛সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ❜। শুরু হয় এক অনন্য ইতিহাস। নিজের রাজ্য সীমানা বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে বঙ্গের পরিধি। জাতে তুর্কি হয়েও বাংলার মাটি তাকে টানে। এরমধ্যেই খবর আসে দিল্লি মসনদে বসেছেন শাহাজাদা ফিরোজ। আবার এক আসন্ন দ্বৈরথের হাতছানি। কিন্তু ইলিয়াস এবার অভিজ্ঞ, প্রস্তুত, শক্তিতে সক্ষম সেই সাথে আছে কিছুটা অহংকার। দিল্লির মসনদে বসার এক সুযোগ এসেছে। কিন্তু পারবে কি? নাকি স্রষ্টার পরিকল্পনা ভিন্ন? তিনটা স্বপ্ন, তিনটা ব্যাখ্যা আর নিজের অভিজ্ঞতা সব নিয়েই স্বাধীন বাংলার সুলতান যাত্রা করলেন এক নতুন পথে। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে। যে গড়েছিলেন স্বাধীন সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ❞ নিসর্গ মেরাজ চৌধুরীর ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস। যার পটভূমি বাংলার স্বাধীন এক সুলতান। ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়তে আমার বেশ লাগে। অতীতের ঘটনাবহুল সময়গুলোর বর্ণনায় না দেখা অতীতকে কল্পনার মাধ্যমে দেখা যায়, উপভোগ করা যায়। ঐতিহাসিক উপন্যাসে সত্য আর কল্পনা মিশে ইতিহাসকে নতুন করে দেখতে সাহায্য করে। লেখকের লেখা এই উপন্যাসের পটভূমি আমাদের বঙ্গ। বঙ্গ সবসময়ই বাইরের মানুষের আকর্ষণীয় বস্তু ছিল। বাংলার ইতিহাসে এসেছে অনেক রাজা, মহারাজা, সুলতান। ভোগ করেছে অনেক��র শাসন। তারই এক টুকরো ইতিহাস ছিল ১৩৩৫ সালের ঘটনা। যার উপজীব্য এই উপন্যাস। লেখকের বর্ণনাভঙ্গি বেশ সুন্দর। সেই সাথে ইতিহাসের গলি ঘুপচির ���থা লেখক দলিল এবং কল্পনার আঁচরে এঁকেছেন সুন্দরভাবে। অবাঙালি হয়েও বাংলার প্রতি টান থেকে তুর্কি এক ব্যক্তির বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে আহরণের যাত্রাটা লেখক উপন্যাসে এনেছেন নিপুণভাবে। চারটি পর্বে (দিল্লি, লক্ষিণাবতী, সপ্তগ্রাম, বাঙ্গালাহ) এবং ২০ টি অধ্যায়ে লেখক ইলিয়াস শাহের বাংলাকে স্বাধীন রাজ্যে পরিণত করার ইতিহাস এসেছে। বলাই বাহুল্য ইতিহাস থেকে আশ্রিত যেহেতু, সেহেতু একে মূল ইতিহাসের বিকল্প ভাবা সমীচীন নয়। লেখক ইতিহাসের দস্তাবেজের সাথে নিজের কল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। ঐতিহাসিক চরিত্রের সাথে স্থান পেয়েছে কাল্পনিক চরিত্র। যদিও লেখকের ভাষ্যে মূল ইতিহাসকে পরিবর্তন করা হয়নি। শেষে গ্রন্থপঞ্জিও উল্লেখ করে দিয়েছেন। আমার কাছে ১৭৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি বেশ সুখপাঠ্য লেগেছে। চারটি পর্বের প্রতিটিতেই স্থান পেয়েছিল ভিন্ন বিষয় কিন্তু লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। অনভিজ্ঞ এক মল্ল যো দ্ধা থেকে সময় পেরিয়ে নিজের বিচার বুদ্ধি এবং রমণীর কল্যাণে নিজেকে স্বাধীন সালতানাতের একজন সুলতান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন সে ইতিহাস ছিল অনবদ্য। এখানে ফুলমতি তথা ইতিহাস যাকে ফুলয়ারি বেগম নামে চেনে তার অবদান অনস্বীকার্য। কথায় আছে, ❛নারীর কারণে সবি হয় নারীর কারণে পুরুষ বড় হয় জগতে নারীর কারণে, ধ্বংস হয়ে যায় আবার ঐ নারীর কারণে নারীর কারণে হায় রে নারীর কারণে❜ এই পংক্তিগুলো ইলিয়াসের জীবনে ফুলমতির অবদান নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে।
আমার কাছে উপন্যাসের শুরুর ভাগ বেশ গতিশীল লেগেছে। এরপর মাঝের দিকে একটু ঝিমিয়ে গিয়েছিল। তবে বাঙ্গালাহ পর্বে এসে যেন লেখক লেখার পুরোনো গতি এবং ধরে রাখার শক্তি ফিরে পেয়েছিলেন। শেষের অংশটুকু চমকপ্রদ, ঘটনাবহুল এবং উপভোগ্য ছিল। শেষটা বেশ সুন্দর ছিল। পরবর্তী ঘটনার সাথে শেষের ছোট আলাপ এবং অতীতের রূপরেখা গুলো এক সুতোয় এসে মিলেছিল। এজন্য বেশ লেগেছে। বাংলার স্বাধীন ইতিহাসের শুরু এবং এর স্বর্ণালী অতীতের এক টুকরো জানতে এই উপন্যাসটি দারুণ অভিজ্ঞতা দিবে। ঘুরিয়ে আনবে বঙ্গের মাঠে ঘাটে। স্বাদ দিবে ফেলে আসা সময়ের।
চরিত্র:
ঐতিহাসিক চরিত্র গুলোই এখানে মুখ্য ছিল। সেখানে অবশ্যই প্রধান সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্। তাকে লেখক ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে নিজ গুন এবং কল্পনার মিশ্রণে দারুণভাবে তৈরি করেছেন। তার সবকিছুই যে আমার পড়তে গিয়ে ভালো লাগছিল এমন নয়। কখনো খুবই অপরিপক্ব আচরণ ছিল তো কখনো সে মুগ্ধ করেছে। ফুলমতি এই উপন্যাসের অন্যতম প্রভাবক। মাঝের দিকে তাকে আমার বেশ বিরক্ত লাগছিল। কিন্তু আবার মনে হচ্ছিল সে যা করেছে খুব কি ভুল ছিল? তবে তার বিচক্ষণতা, জ্ঞান প্রশংসার দাবিদার। রূপাইকে খুব দারুণ লেগেছিল।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইটির প্রচ্ছদ আমার বেশ ভালো লেগেছে। পড়ার সময় সম্পাদনার ঘাটতি নজরে এসেছে। একটা সুন্দর লেখা পড়ার অভিজ্ঞতা আরো ভালো হয় যদি সেখানে ভুলের পরিমাণ সহনীয় মাত্রায় হয়। এখানে ভুলের পরিমাণ মোটামুটি ভালোই ছিল। আরেকটু নজর দিয়ে দেখলে এই ভুলগুলো এড়ানো যেত। যেমন, যেখানে মহল লেখার কথা সেখানে হয়েছে মহলে, ছাড়বে কে হয়েছে ছড়াবে বা ছড়িয়ে জাতীয় কিছু। দরবার হয়েছিল দরকার, শব্দ সম্পূর্ণ ছিল না। কি এবং কী এর ব্যবহারে ভুল ছিল। পরবর্তী মুদ্রণে এই ব্যাপারগুলো লক্ষ্য রাখলে পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতা আরো ভালো হবে।
❛আমাদের সোনালী ইতিহাস আছে। এই ইতিহাস আমাদের ঐতিহ্য বহন করে। যুগে যুগে কালে কালে এই ইতিহাস আমাদের জানায় আমাদের পূর্বপুরুষের কীর্তি।❜
#পাঠচক্র_রিভিউয়ার্স ২০২৫ রিভিউ বিষয়: বই রিভিউ: ৫৪ বই: সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ লেখক: নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী প্রকাশনী: উপকথা প্রচ্ছদ: মাইশা তাবাসসুম জনরা: ঐতিহাসিক
এটাকে ননফিকশন জঁরার বইয়ের সাথে সাথে ফিকশন বলা যায় কি? গল্প ছলে উঠে এসেছে, বাঙ্গালার বুকে সালতানাত প্রতিষ্ঠা করা এক তুর্কী বীরের গল্প।
তাঁর জন্ম সেই বাঙ্গালাতে ছিল না। কিন্তু বাঙ্গালার মাটি, হাওয়া আর জলে- বাতাসে এমন কিছু আছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। সেই মোহের টানেই হাজী ইলিয়াস শাহ্ হয়ে ওঠেন স্বাধীন বাঙ্গালার প্রথম সুলতান, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্। গড়ে তুলেছেন, স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছিল বাঙ্গালাহ।
গল্পের শুরু হয় ১৩৩৫ সাল থেকে, গল্পের শেষ ১৩৫৪। আসলে গল্পের শেষ না, শুরু বলা যায়, তবে এই বইয়ের শেষ হয় এই সময়ে এসে। দুধ মা রাইদার কাছ থেকে কীভাবে সে মসনদে বসল, কীভাবে এক তুর্কী বীরের বীরত্ব ইতিহাসে লেখা হল? মানুষের জীবনের উত্থান-পতন, ভালোবাসা, চাহিদা, প্রিয়মানুষকে হারানো, কাম,লোভ, অহ*ম মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়, তারই এক ঝলকের দেখা পাবেন এখানে। র*ণ কৌশল, ষ*ড়।যন্ত্র, বুদ্ধি কিংবা হিসেব কষে চলার ভুল, কিংবা সামান্য সঠিক অথবা উপস্থিত সিদ্ধান্ত, পেছনে থাকা কোন বুদ্ধিদাতা, যাকে ইতিহাস মনে রাখেনি কিংবা রাখবার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাদেরই সামান্য ঝলক এই বইটা। হয়তো পড়ে মনে হবে, এখানে, কেবল তিনজন নারীর কথায় ঘুরে ফিরে এসেছে, তারায় সব, তাদের নিয়ে ক।মাউ।ক কোন গল্প ফাঁদা হয়েছে। আসলেই কী তাই? বিচক্ষণতা কি ইলিয়াস শাহের নিজের ছিল না? নিজের করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত সে করেনি? সে কেন বাঙ্গালাহ জয় করতে চেয়েছিল? সামান্য এক পাঁড় মা/তাল একদিন দিল্লীর সালতানাত দখল করেছিল, জানেন সে কে?
ইতিহাস যেমন অনেকের নাম মনে রাখে, তেমন করেই কেউ তাদের অস্তিত্ব মনে রাখে না, বা রাখতে চায় না। ওরা কিছু দাবীও করে না, হয়তো প্রাপ্য সম্মানটুকু ছাড়া, কিছুই চায় না তারা। তারা ইতিহাস হতে চায় না, তবুও ইতিহাসের অংশ। অনেক র/ক্ত, যু*দ্ধ, তলো_ইয়ারের ঝনঝনানি, ছুড়ে মারা ব*র্শার সাথে মিশে আছে বাঙ্গালাহ জয়ের গল্প। হয়তো সেদিন থেকেই একটু একটু করে জন্ম হচ্ছিল আমাদের এই দেশের ও।
বইটা বেশ তথ্যবহুল। লেখার ধরনও চমৎকার। প্রতিটি সময় মেপে মেপে লেখা। সমাজ বইয়ের গৎবাঁধা অল্প কিছু জ্ঞানের বাইরে, বেশ অনেক কিছু জানলাম। তবে বইটাতে আরো তথ্য আশা করেছিলাম। কিছুটা তাড়াহুড়ো করা বলে মনে হল। যদিও দিল্লী পর্ব, বাঙ্গালাহ পর্ব, সপ্তগ্রাম পর্ব দেয়া আছে, তবে, সেই সময়ের নাম আর বর্তমান কোন নাম, সেটা থাকলে স্পষ্ট হতো। সব মিলিয়ে প্রতি অধ্যায়ে আরো কিছু সময় দেয়া যেত। ম্যাপের ছবি দেয়া আছে, তবে সেটা স্পষ্ট না। যখন যুদ্ধের কথা বলা, আক্র*মণের কথা বলা, সেই সময়গুলোতে যদি ম্যাপ বা ছক এরকম কিছু দেয়া হত ভালো হত। বইটার প্রধান সমস্যা বানান ভুল আর সম্পাদনার অভাব। পড়তে গিয়ে বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে।
ছোটবেলায় সমাজ বইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা কমন বাক্য থাকতো শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রথম সমগ্র বাংলাকে একত্রিত করেন এবং শাহ-ই-বাঙ্গালাহ উপাধি গ্রহণ করেন।
লেখক 'নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী ' তার 'সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ' বইয়ে এই একটি বাক্যের পেছনের সমগ্রটাই তুলে এনেছেন। ইতিহাসবেত্তা হিসেবে নয়,গল্পের ঢঙে বলেছেন মধ্যযুগের বাংলার সেই সংগ্রামের ইতিহাস। রাজায় রাজায় যুদ্ধ,কূটনীতি, প্রেম-ভালোবাসা, প্রবঞ্চনা, বন্ধুত্ব -একজন রাজার উত্থান থেকে শুরু করে সবকিছুই ���েখক উপন্যাসের পাতায় বেশ সুনিপুণভাবে তুলে এনেছেন।
উপন্যাসের মূল নায়ক শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ। দিল্লীর সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের এক তুর্কি দেহরক্ষী থেকে সমগ্র বাংলার রাজা হবার পুরো জার্নিটা এই উপন্যাসে এসেছে। ইলিয়াস শাহের জীবনের নানা অধ্যায়গুলো জীবন্ত হয়ে উঠছিলো পুরো উপন্যাস জুড়ে। পার্শ্বচরিত্র হিসেবে আলাউদ্দিন আলী শাহ(ইলিয়াসের দুধ ভাই) কিংবা ফখরুদ্দিন মুবারাক শাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও দেখা গেছে। বিশেষ করে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের অধীনে ইলিয়াসের ত্রিপুরার রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধের বর্ণনা বেশ উপভোগ্য ছিলো। পরবর্তীতে ইলিয়াসের নিজস্ব রণকৌশল কিংবা নৌবাহিনী গঠন প্রক্রিয়ার সবই ছিলো উপভোগ্য।
ইলিয়াস শাহের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখা চরিত্র ছিলো ইলিয়াস শাহের দ্বিতীয় স্ত্রী ফুলমতি (ফুলয়ারি বেগম নামে পরিচিত)। উপন্যাসে লেখক ফুলমতিকে শক্তিশালী চরিত্র হিসেবেই স্থান দিয়েছেন। লেখক ইলিয়াসকে অসংখ্য যুদ্ধজয়ী অতিমানবীয় রাজা হিসেবে দেখাননি।বরং ইলিয়াসের মনের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলোকে ফুলমতির সাথে বিরোধের মাধ্যমে দেখিয়েছেন। যা ইলিয়াসকে মানবিক করে তুলেছে।
উপন্যাসে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার ব্যাপারগুলো বেশ দারুনভাবে এসেছে। শুরুতেই নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারের বর্ণনা, পরবর্তীতে ইলিয়াস শাহের সাথে হযরত আঁখি সিরাজ (র:) এর সাথে সাক্ষাৎ বেশ উপভোগ্য ছিলো।
লেখকের লেখনীতে বেশ যত্নের ছাপ ছিলো। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রাকৃতিক বর্ণনা কিংবা যেকোনো দৃশ্যকল্পের চিত্রায়ণ বেশ প্রাণবন্ত ছিলো।
উপন্যাসের শেষে একটা অপ্রত্যাশিত টুইস্ট ছিলো। যার সত্যতা আদৌ আছে কিনা আমার জানা নেই। তবে কল্পনায় তা ভাবতে আসলেই মন্দ লাগেনি।
বই: সালতানাত-ই-বাঙ্গালাহ লেখক : নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২৫ প্রচ্ছদ : মাইশা তাবাসসুম (এক কথায় লা-জওয়াব।খুবই প্রিমিয়াম একটা লুক এসেছে) প্রকাশনা : উপকথা প্রকাশন মুদ্রিত মূল্য: ৩৩৫ টাকা। পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৭৪ ব্যক্তিগত রেটিং: ৪/৫
সামান্য দুয়ার রক্ষক থেকে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের উত্থান এবং বাংলাকে দিল্লীর করতল থেকে মুক্ত করে স্বাধীন রাজ্যের ঘোষণা দেয়ার ঐতিহাসিক আখ্যান। গুড বাট বেটার হওয়ার অনেক স্কোপ ছিলো।