ডক্টর জেড রহসম্যয়, একাকি আর বিচ্ছিন্ন একজন মানুষ। জগতের সব বিষয়ে তার অপার কৌতুহল। ভক্তরা তাকে সবজান্তা হিসেবে দেখে। পাঁচ শ’ বছরের পুরনো একটি পেইন্টিংয়ের তত্ত্বতালাশ করতে হবে তাকে। কাজটা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। ঢাকা থেকে রোমে পা দিয়েই ডক্টর মুখোমুখি হলো অপ্রত্যাশিত ঘটনার। অপার কৌতুহল তাকে তাকে পরিচালিত করলো বরাবরের মতোই, আর যে সত্যটা আবিষ্কার করলো তা যেমন কৌতুহলোদ্দীপক তেমনি বিস্ময়কর। শেষ পর্যন্ত ডক্টর জেডের সঙ্গে পাঠকও চমৎকার একটি ভ্রমণের সঙ্গি হবে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ভিন্ন ধরণের একটি চরিত্র আর্ট ডিটেক্টিভ ডক্টর জেড এবং ‘দা ভিঞ্চি ক্লাব’ গল্পে।
MOHAMMAD NAZIM UDDIN (Bengali: মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন) is a writer and Translator of more than 26 novels..His original works are NEMESIS, CONTRACT, NEXUS, CONFESSION,JAAL, 1952: nichok kono number noy, KARACHI, RABINDRANATH EKHANE KOKHONO KHETE ASENNI and KEU KEU KATHA RAKHE. These six Thriller novels are highly acclaimed by the readers.
ডক্টর জেড, একজন নিভৃতচারী মধ্যবয়সী মানুষ। পারিবারিক সম্পত্তির কারণে অর্থনৈতিকভাবে বেশ সচ্ছল হলেও তিনি একাকী ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেন। বহু বিষয়ে তার অগাধ পাণ্ডিত্য, বিশেষ করে ইতিহাস, চিত্রকলা এবং রেনেসাঁ যুগের শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে তার জ্ঞান অসাধারণ। পরিচিতি বিমুখ হলেও যারা তাকে জানে, তারা তাকে সবজান্তা হিসেবে দেখে এবং গভীরভাবে সম্মান করে।
তবে শুধু জ্ঞানী নন, তিনি নিজেও একজন শিল্পী, শিল্প সমঝদার এবং দক্ষ চিত্র বিশ্লেষক। বিশ্বখ্যাত লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কাজের অনুরাগী। আন্তর্জাতিক মহলে তার মতো বেশ কিছু অনুরাগী ও গবেষকদের সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘দা ভিঞ্চি ক্লাব’—যার মূল লক্ষ্য দা ভিঞ্চির শিল্প ও বিজ্ঞানকে আরও গভীরভাবে বোঝা।
তবে তার নিস্তরঙ্গ জীবন বদলে যায়, যখন দা ভিঞ্চির আঁকা দাবি করা চিত্রকর্ম ‘হলি বেবিস’-এর সত্যতা যাচাই করতে তাকে রোমে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রায় ৫০০ বছর পুরনো এই ছবির আর্ট অ্যাট্রিবিউট করার পাশাপাশি ডক্টর জেডের কাছে আসে তার বহুদিনের স্বপ্ন দা ভিঞ্চির বিশ্ববিখ্যাত চিত্র মোনালিসা বিশ্লেষণ করার সুযোগও। যাতে করে মোনালিসা সম্পর্কিত তার বহুদিনের থিওরি প্রমাণ করার সুযোগ পান তিনি।
এই কাজ করতে তিনি নেমে পড়েন চিত্রকলার ইতিহাসের বড় বড় প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে। জানা যায় ভিন্নরকম আঙ্গিকের কৌতূহলোদ্দীপক সব তথ্য। দা ভিঞ্চি ক্লাব পাঠকদের নিয়ে যাবে শিল্প ইতিহাসের এক বুদ্ধিদীপ্ত যাত্রায়, যেখানে মানব সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জীবনী, তার শিল্প এবং সেটার বিস্ময়কর ইতিহাস একই সূত্রে গাঁথা।
দা ভিঞ্চি ক্লাব থেকে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের অন্যান্য বইয়ের মতো আগাগোড়া থ্রিল, টানটান উত্তেজনা আর নাটকীয় কাহিনী আশা করলে হতাশ হতে হবে। আদতে একে থ্রিলার বলা যায় না, ছোট একটা অংশ বাদ দিলে গল্পে কোনো অপরাধও নেই (যা আছে তাও কিছু নয়)। লেখক মূলত ফিকশনের মোড়কে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, তার জীবনী আর রেনেঁসা যুগে তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ (বিশেষ করে মোনালিসা) নিয়ে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং আইডিয়া শেয়ার করতে চেয়েছেন।
গল্পে যে তথ্যগুলো এসেছে, সেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং আর আগ্রহ জাগানিয়া। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় ব্রাউনিয়ান ধারার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব না থাকলেও সেগুলোকে বেশ চমকপ্রদ বলা যায়। কতটুকু সত্য জানা নেই, তবে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বেশ ডিটেইল আর অনেকগুলো ছবির সাহায্যে সেগুলো প্রকাশ করায় অবিশ্বাস্য মনে হবে না। আর লেখকের দক্ষ হাতের প্রাঞ্জল গদ্যের কারণে তা পড়তেও খারাপ লাগে না। সেইসাথে অল্প হলেও ইতালির বর্ণনাগুলো বেশ সুন্দর হয়েছে।
সেইসাথে শিল্প থেকে শুরু করে আরও নানান বিষয়ে লেখক তার চিন্তাভাবনাকে তুলে ধরেছেন গল্পে। কিছু ক্ষেত্রে তা বেশ ভালো হলেও অনেক জায়গায় সেটা আরোপিত লেগেছে। আজকালকার পডকাস্ট শো গুলোতে যেভাবে গভীর ভাব প্রকাশ করার জন্য অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে আলোচনা শুরু করে, অনেকটা সেরকমই। আর লেখক যেহেতু সর্বোপরি ফিকশনই লিখেছেন, সেই হিসেবে বইটা অনেক ক্ষেত্রে খুবই দূর্বল। ম্যাড়মেড়ে কাহিনী, নিস্তেজ সব চরিত্র আর তথ্য দিয়ে ভরপুর কাঠামোবিহীন ঘটনাবিন্যাসের জন্য এই বইয়ের বেশিরভাগ অংশই বোরিং। আর ডক্টর জেডের সাথে ওরিয়ানা চরিত্রটার রসায়ন বেশ উদ্ভট লেগেছে।
যদিও লাস্টে মোনালিসা চিত্রের কাহিনীটা ভালো হয়েছে বিধায় বইটা শেষ পর্যন্ত ভালো ইম্প্রেশন দিতে পারে। চরিত্রগুলোর চরিত্রায়নও কিছুটা ভালো হয় গল্পের শেষে এসে (ওরিয়ানা বাদে)। সবমিলিয়ে বইটা পড়তে খারাপ লাগে নি। যেহেতু এইধরনের লেখা আগে কখনো পড়া হয় নি। তবে থ্রিলার জনরায় লেখকের খ্যাতির জন্যে অথবা আর্ট ডিটেক্টিভ প্রচারণা শুনে থ্রিলার হিসেবে এই বইটা থেকে ন্যূনতম আশা রাখলেও হতাশ হতে হবে।
দা ভিঞ্চি ক্লাব বইটা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন লিখেছেন বেশ সময় নিয়ে৷ যত্নের সাথে সাজিয়েছেন আর্ট, আর্ট অ্যাট্রিবিউশন, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি নিয়ে লেখা তথ্যগুলো। খানিকটা কল্পনার মিশেলে লেখা বইটা তাই পড়া শুরু করেছিলাম ডকু-ফিকশন হিসেবে।
না, কোনো রিভিউতে কেউ এটাকে ডকু ফিকশন বলেনি। আমি নিজেই এই জনরা ধরে নিয়েছি রিভিউগুলো পড়ে।
রিভিউগুলোতে একটা অভিযোগ ছিল "থ্রিলার সম্রাটের বইয়ে থ্রিলার এলিমেন্ট নেই। একটা নন ফিকশন বই লিখেছেন লেখক। ইনফো ডাম্পিং করেছেন, প্রচন্ড বোরিং আর স্লো একটা বই। শুধু তথ্যই দিয়ে গেছেন একের পর এক।"
অভিযোগগুলো মাথায় রেখেই পড়তে বসেছিলাম দা ভিঞ্চি ক্লাব। পাঠক হিসেবে আমি অন্যান্য জনরার বই পড়লেও নিজেকে থ্রিলার-পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
থ্রিলার বইয়ের ক্ষেত্রে আমার প্রধাণ প্রিফারেন্স হলো গতিময়তা। ফাস্ট পেসড থ্রিলার না হলে বই আমি বন্ধ করে দেই। শুরু করেও শেষ করতে পারিনি, এরকম থ্রিলার বইয়ের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়।
দ্বিতীয়ত, থ্রিলার বইয়ের লিখনশৈলী পছন্দ না হলে, ওইটাও আমি বন্ধ করে রাখি।
এতগুলো অভিযোগ মাথায় নিয়েও কেন ভিঞ্চি ক্লাব বইটা পড়লাম, শেষ করলাম দুই দিনে, দুই বসায়; সেটা আলোচনা করার আগে বইটার ফ্ল্যাপ দেখে নেই:
ডক্টর জেড রহসম্যয়, একাকি আর বিচ্ছিন্ন একজন মানুষ। জগতের সব বিষয়ে তার অপার কৌতুহল। ভক্তরা তাকে সবজান্তা হিসেবে দেখে। পাঁচ শ’ বছরের পুরনো একটি পেইন্টিংয়ের তত্ত্বতালাশ করতে হবে তাকে। কাজটা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। ঢাকা থেকে রোমে পা দিয়েই ডক্টর মুখোমুখি হলো অপ্রত্যাশিত ঘটনার। অপার কৌতুহল তাকে তাকে পরিচালিত করলো বরাবরের মতোই, আর যে সত্যটা আবিষ্কার করলো তা যেমন কৌতুহলোদ্দীপক তেমনি বিস্ময়কর। শেষ পর্যন্ত ডক্টর জেডের সঙ্গে পাঠকও চমৎকার একটি ভ্রমণের সঙ্গি হবে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের ভিন্ন ধরণের একটি চরিত্র আর্ট ডিটেক্টিভ ডক্টর জেড এবং ‘দা ভিঞ্চি ক্লাব’ গল্পে।
° পাঠপ্রতিক্রিয়া:
আর্টের দুনিয়াটা বড় আজব। ভিঞ্চি, পিকাসো, ভ্যান গগের একেকটা চিত্রকর্ম নাকি কোটি কোটি ডলারে বিক্রি হয়। এই দামের পিছনে রয়েছে শিল্পীর বহু বছরের সাধনা, নিজের সিগনেচার স্টাইল, দুষ্প্রাপ্য কোনো রং বা প্লার্টফর্মের ব্যবহার। সেই সময়ের কোনো রাজ কিংবা অভিজাত পরিবারে জায়গা পায় চিত্রটি, সেখান থেকে কোনো আর্ট কালেক্টর কিংবা ডিলার হয়ে চিত্রকর্মটি যখন নিলামে ওঠে তখন তার দাম হয় কোটি ডলার।
এই কোটি ডলারের পিছনে আরেকটা বড় ফ্যাক্টর আছে, অ্যাট্রিবিউশন।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বা সেই সময়ের আর্টিস্টরা নিজেদের কিছু চিত্রকর্মের কিছু অংশের ভার ছেড়ে দিতেন শিষ্যদের উপরে। আবার কখনো বিক্রি করার উদ্দ্যেশ্যে শিষ্যদের দিয়ে কপি করাতেন চিত্রকর্ম। এটা বাদেও শিষ্যরা কখনো নিজেরাই গোপনে হুবহু কপি করে ফেলতো গুরুর চিত্রকর্ম।
কাজেই একটি আর্ট ভিঞ্চি নিজেই এঁকেছেন কি না, বা তার কোনো শিষ্য এঁকেছেন কি না সেটা যাচাই হওয়া দরকার নিলামের আগে। এই যাচাই হয়ে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টাই আর্ট অ্যাট্রি���িউশন, যেটা ছাড়া নিলামে ওই চিত্রকর্মের দাম হাজার ডলারেও কেউ কিনবে না।
ডক্টর জেড এরকম একটা চিত্রকর্মের অ্যাট্রিবিউশনের কাজ পেয়েছেন। না তিনি স্বীকৃতি দেবার কেউ না। কোনো আর্টের অ্যাট্রিবিউশন তখনই হবে যখন প্রসিদ্ধ কোনো শিল্প বোদ্ধা বা প্রতিষ্ঠান সেটাকে স্বীকৃতি দেবে।
ডক্টর জেড নেমেছেন ভিঞ্চির সদ্য আবিষ্কৃত 'হলি বেবি' নামের চিত্রকর্মটির অ্যাট্রিবিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষীসাবুদ জোগাড় করতে।
বইটায় থ্রিলারের এলিমেন্ট আসলেই নেই। একটা ছোট্ট ডাকাতির ঘটনা ঘটে, তা বাদে আর কিছু নেই। কিন্তু থ্রিলার লাভার আমি তবুও বইটা পড়ে গেলাম কেন?
বইটা আর্ট এবং আর্ট অ্যাট্রিবিউশন নিয়ে যেসব টেস্ট করা হয়, অনেকটা প্যাথোলজি ল্যাবের মতো, সেরকম বেশ কিছু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিশদ বর্ণনা আছে৷ এই জায়গায় একটু এক ঘেয়ে লেগেছে বটে।
তবে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সম্পর্কিত ইনফরমেশন গুলো বেশ ইন্টারেসটিং এবং থ্রিলিং লেগেছে আমার কাছে। সাথে মোনালিসা নিয়ে একটা ছোট্ট টুইস্ট আছে, সেটাও ভালো লেগেছে।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচাইতে রহস্যময় এবং চর্চিত সেলিব্রেটি। তাকে নিয়ে অনেক কানাঘুষা শোনা যায়৷ লেখক কনস্পিরেসি থিওরির দিকে যাননি। ফ্যাক্ট বেজড ইনফরমেশন গুলো পরিবেশন করেছেন। এইগুলো আমার কাছে বেশ ইন্টারেসটিং লেগেছে।
এখানে আরেকটা বিষয় উল্লেখ করতে হয়, এই ইনফরমেশনগুলো পরিবেশনের মধ্যে লেখক একরকম সাসপেন্স ক্রিয়েট করতে পেরেছেন। কাজেই বইটা যতটা বোরিং হিসেবে বলা হয়েছে রিভিউগুলোতে, ততটা বোরিং লাগেনি আমার কাছে।
° কিছুটা সমালোচনার জায়গা আছে বইটাতে। ডক্টর জেড চরিত্রটি নিয়ে।
একজন ব্যক্তি একাধারে অত্যধিক জ্ঞানী, প্রখর অবজারভেশন, নিজের ইমোশন এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেসিয়াল এক্সপ্রেশনের উপরে কন্ট্রোল, বিভিন্ন জায়গায় পাওয়ারফুল ব্যক্তিদের সাথে পরিচয়; সবমিলিয়ে এরকম "ওয়ান ম্যান আর্মি" টাইপ ক্যারেক্টার আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগে না।
দ্বিতীয়ত, ডক্টর জেড অ্যাট্রিবিউশনের সাক্ষীসাবুদ জোগাড় করতে বিভিন্ন এক্সপার্টের দ্বারস্থ হন। যারা চিত্রকর্মটি ভিঞ্চির কি না সেটা সম্পর্কে প্রমানাদি দেবেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও দেখা যায় উক্ত এক্সপার্টের থেকে ডক্টর জেড বেশি জ্ঞান রাখেন বা তার সমতুল্য। এই বিষয়টা দৃষ্টিকটু লেগেছে।
বইটার নামের প্রতি সুবিচার করে বইটাতে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বহাল তবিয়তেই আছেন। আর আছেন ডক্টর জেড। এই দুই চরিত্র বাদে আর কোনো চরিত্রের সেরকম কোনো ভূমিকা বা উপস্থিতি নেই। প্রভাববিস্তার করতে পারেনি আরকি।
বইয়ের প্লট, এক্সিকিউশন, ক্যারেক্টারাইজেশন সবকিছু মিলিয়ে আমার রেটিং: ৩.৫/৫
পড়তে বেশ সময় লেগে গেল। মাঝখানে অবশ্য একঘেয়েমিতে পেয়ে বসেছিল খানিকটা। আশা ছিল ড্যান ব্রাউনের মতো থ্রিলার ঘরানার কিছু পাব। কন্সপিরেসি থাকবে। কিন্তু নাজিম ভাই এবার ভিন্ন পথে হেটেছেন। রোমাঞ্চকর কিছু ছিল না তেমন। তবুও লিওনার্দোকে নিয়ে পড়তে সবসময় মজাই লাগে। নাজিম ভাই লিখেছেনও বেশ। পাঠকদেরও মন্দ লাগবে না আশা করি। একটু ভিন্ন কিছুর স্বাদ পাবেন এই আরকি।
চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা, যদি না পড় ধরা — যাহা চুরি, তাহাই শিল্প সমাজে কপি বলে বিবেচিত হয়। নকল বলি বা কপি, একদিক দিয়ে তা চুরি-ই। তবে এই কপি বা চুরি, একপ্রকার বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। নিজের না, অন্যের যোগ্যতা বা ক্ষমতা কিংবা প্রতিভা অনুসরণ করে কোনো কিছু কপি করাকে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ না বলে উপায় আছে?
চিত্রশিল্প জগতে এই কাজ খুব নিখুঁতভাবে হয়। এত বেশি নিখুঁত হয়ে ওঠে নকল, যে খালি চোখে পার্থক্য বোঝার উপায় নেই। এর জন্য হতে হয় বিশেষজ্ঞ।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির নাম আমরা সবাই শুনেছি, শুনেছি তার বিখ্যাত মোনালিসা’র কথা। কিন্তু কে এই মোনালিসা? এই নিয়ে তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। কথিত আছে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি একটি মোনালিসা আঁকেননি। এঁকেছেন বহু। এতকাল সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন ছিল। একাধিক মোনালিসা পাওয়া গেলেও সবগুলোই কি লিওনার্দোর আঁকা?
বিখ্যাত চিত্রশিল্পী, যাঁর তুলির ছোঁয়াতে বদলে গিয়েছে চিত্রশিল্পের ভবিষ্যত, যিনি রচনা করেছেন নতুন রেনেসাঁ, তার কর্ম কপি করে রাতারাতি অর্থ-প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ হওয়া সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে অনেক উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে আসল ও নকলের পার্থক্য বুঝে ফেলা সম্ভব। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কাজগুলো মূল্যায়নের জন্য, সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য গড়ে উঠেছে একটি সংস্থা — দা ভিঞ্চি ক্লাব।
◾কাহিনি সংক্ষেপ :
ডক্টর জেড একাকী মানুষ। নিজের চারিপাশে এক রহস্যের দেয়াল তুলে রাখে। যে দেয়াল কাছের মানুষও ভেদ করতে পারে না। নির্লিপ্ত মুখভঙ্গিতে কোনো আবেগের ছিটেফোঁটা থাকে না। প্রবল জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এই ডক্টর জেড। সকল বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান। বিশেষ করে আর্ট বিষয়ে তিনি একজন অনুসন্ধানী। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কিংবা তার শিল্পকর্মের প্রতি অনুরাগী। মোনালিসার সঠিক অনুসন্ধানে পার করছেন নিজের একান্ত সময়। “দা ভিঞ্চি ক্লাব”-এর একজন সদস্য, যার এবার ডাক পড়েছে রোমে। একটি নতুন চিত্রকল্প পাওয়া গিয়েছে। সেটা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কি না, খুঁজে বের করার দায়িত্ব তার। সাথে আছে আরেক বিশেষজ্ঞ ফরাসী লুই পাসকাল।
যে চিত্রকল্পটি পাওয়া গিয়েছে, তাকে হলি বেবিস নামে আখ্যায়িত করা হয়। যেখানে দেখা যায় দুই শিশু একে অপরকে চুম্বন করছে। যে ধনকুবেরের কাছে চিত্রকর্মটি পাওয়া গিয়েছে, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে ছবিটি পেয়েছেন। পৈতৃক সূত্রে না, পরিবারহীন এক মামার মৃত্যুর পর ভাগ্নে সব স্থাবর সম্পত্তির মালিক বনে যান। তিনি সত্যিই বের করতে চান, ছবিটি আসলেই লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এঁকেছেন? যদি তা-ই হয়, তবে এর বাজার মূল্য কয়েকশত মিলিয়ন ডলার।
লুই পাসকেল একজন আর্ট বিশ্লেষক। তিনি নতুন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন, যা দিয়ে একটি চিত্রের ময়নাতদন্ত করা যায়। অনেকদিনের স্বপ্ন তার পূরণ হতে চলেছে। লুভর মিউজিয়ামে থাকা বিখ্যাত মোনালিসাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য রোমাঞ্চিত লুই। তার সাথে যুক্ত হয়েছে ডক্টর জেড। হলি বেবিসের উপর তদন্ত চলছে। অ্যাট্রিবিউশনের মতো জটিল প্রক্রিয়ায় বের করা হচ্ছে চিত্রকর্মটি আসলে কার?
ডক্টর জেডের বুদ্ধি ও মেধা, লুই পাসকালের প্রযুক্তি নির্ভর তদন্ত, দুইজনের বিচার-বিচক্ষণতা — সব মিলিয়ে এমন এক সত্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, তাকে নতুন রূপে আবিষ্কারের চমক হজম করা সম্ভব হবে তো? মোনালিসার জনপ্রিয়তা হয়তো এখানে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে!
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছিল, উঠছে, এবং ভবিষ্যতেও উঠবে — কে এই মোনালিসা? পাঠক, প্রস্তুত তো এই সত্য জানতে?
◾পাঠ প্রতিক্রিয়া :
ডক্টর জেডের কথা আমি প্রথম শুনেছিলাম “নেমেসিস” বইতে। হয়তো তখনই লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন কল্পনায় এমন এক চরিত্র অঙ্কনের রূপরেখা তৈরি করেছেন। প্রথম বই থেকে উনিশতম বই, ডক্টর জেড এবার পূর্ণতা পেয়েছে। সামনে এসেছে পাঠকের। নতুন আরেক চরিত্র হয়তো পাঠকের মন কেড়ে নিতে প্রস���তুত।
কেমন লাগল “দা ভিঞ্চি ক্লাব”? — এই প্রশ্ন করা হলে, একটি দ্বিধায় পড়তে হয়। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের অনেক বই আছে ভীষণ পছন্দের, খুব প্রিয়। তারপরও নিজ দায়িত্বে একটা কথা বলতে চায়, তর্কসাপেক্ষে “দা ভিঞ্চি ক্লাব” হয়তো লেখকের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে জায়গা করে নিবে। “কেউ কেউ কথা রাখে” বাদ দিলে, আমার কাছে এখন পর্যন্ত এই বইটিকে সেরা মনে হয়েছে।
তার কারণ বইটির প্লট, কলেবরের বিস্তৃতি। আর্ট ডিএকটিভ বিষয়ক বই এর আগে পড়া হয়নি। আর্ট বিষয়ক তথ্যের সমাহার ছিল বইটি। চিত্রশিল্পে বিখ্যাত চিত্রকরদের আর্ট নকল বা কপি করার রেওয়াজ বহু পুরোনো। অসাধু ব্যবসায়ীরা সেগুলোকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করে। শৌখিন মানুষেরা, অভিজাত শ্রেণী তাদের ড্রয়িংরুমে সেগুলো ঝুলিয়ে অতিথিদের চমকে দেওয়ার চেষ্টা করে। হয়তো দাম দিয়ে বিখ্যাত কোনো চিত্রশিল্পীর ছবি কেনার পর তারা জানতেও পারে না, সেটা আসলে বর্তমান কোনো অখ্যাত কারো আঁকা নকল। যখন জানতে পারে, মাথায় হাত দেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
সেই কারণে অ্যাট্রিবিউশন প্রক্রিয়া অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। যার প্রতিটি ধাপে ধাপে মিলিয়ে দেখা হয়, ছবি আসলে কত বছরের পুরোনো। যেই শিল্পীর আঁকা দাবি করা হচ্ছে, তার পূর্বের কোনো আঁকার সাথে কতটা মিল আছে। কখনও দেখা হয় ফিঙ্গারপ্রিন্ট। কিন্তু পাঁচশ বছর আগের কারো ফিঙ্গার প্রিন্ট খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। তাছাড়া প্রতিটি শিল্পীর এক ধরনের সিগনেচার ছোঁয়া থাকে। সেটারও মিল দেখা হয়।
এই বিশাল ও জটিল প্রক্রিয়া লেখক তুলে এনেছেন খুবই সাবলীলভাবে। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা এমনিতেই সাবলীল, লেখার গতিও মানানসই। এত জটিল বিষয় পাঠকের তিনি বোঝার জন্য তিনি খুব সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। যদিও শুরুর দিকে কিছু বিষয় মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল। সবটা যে বুঝেছি, এমন দাবি আমি করব না। তবে আমার না বোঝা দ্বিধাগুলো দূর করেছে বইয়ে থাকা ছবিগুলো।
বইতে প্রচুর পরিমাণে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এ জাতীয় বইয়ে এমন ছবির প্রয়োজন নেই। তবে আমার মনে হয়েছে, আর্টের মতো জটিল বিষয়ের তদন্ত প্রক্রিয়া কেমন হতে পারে, কীভাবে মিলগুলো খুঁজে বের করা হয়, সেটার দৃশ্যমান অনুভূতির জন্য ছবিগুলো প্রয়োজন ছিল।
বইটির সবচেয়ে দারুণ বিষয় ছিল, লেখক ইতালি, বেলজিয়াম থেকে পাঠককে ঘুরিয়ে এনেছেন। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা এমনিতেই পড়তে ভালো লাগে। তার বর্ণনায় ইউরোপের একাংশ থেকে ঘুরে আসা দারুণ এক অভিজ্ঞতা। অল্প কথায় কতকিছু যে বুঝিয়ে দেওয়া যায়! তাছাড়া আর্ট সম্পর্কিত অনেক কিছুই জানতে পেরেছে বইটির মাধ্যমে। রেনেসাঁ যুগে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, তার সমসাময়িক আর্টিস্ট কিংবা শিষ্য, সেই সময়কালে আর্টে ব্যবহার্য জিনিসপত্র সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
গল্পটি করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঠিক আগের সময়ের। বইয়ের শেষদিকে সেই সময়ের অনুভূতি, পরিস্থিতি খুব স্বল্প ভাষায় লেখক ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন। লেখকের বর্ণনা ও সংলাপের প্রতি আমি বরাবরই মুগ্ধ। কোনো অতিরঞ্জিত ব্যাপার থাকে না। যতটা থাকা দরকার ততটাই যেন তিনি লিপিবদ্ধ করেন। এখানে বেশ কিছু ইটালিয়ান শব্দ সংলাপে এনেছেন। যদিও শুরুর দিকে তার অনেক কিছুই বুঝছিলাম না। পরে বেশকিছু ইটালিয়ান শিবড মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। সংলাপের এই সাবলীলতা বেশ মনে ধরেছে।
সেই সাথে লেখকের লেখা উঠে আসে দেশ, সমাজ বা বিশ্বের অসঙ্গতি, অনাচার, অরাজকতা। যা লেখক নিজ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বর্ণনা করেন, প্রতিবাদের ভাষায় লিখে থাকেন। গল্পের মধ্য দিয়ে বুঝি দেন তার ভাবনাচিন্তাগুলো। সেগুলো হয়তো তারই মতো লাখো জনতার ভাবনার প্রতিচ্ছবি।
“দা ভিঞ্চি ক্লাব” বইটা আমার ব্যতিক্রম লেগেছে তিনটা কারণে। আর এই তিনটি কারণেই বইটি আমার ভীষন ভালো লেগেছে। লেখক হতো প্রথাগত কিছু লেখার বিরোধী থেকেই ভিন্ন কিছু উপহার দিতে চেয়েছেন। সেই তিনটি কারণ হলো —
এক. বাংলাদেশী থ্রিলারের ক্ষেত্রে একটা বিষয় খুব বেশি পরিলক্ষিত হয় — শুরুতে কোনো একজন খুন হবে, সেই খুনিকে খুঁজতে হয়ে বিশাল কিছু বেরিয়ে আসব। “দা ভিঞ্চি ক্লাব” বইটিতে এমন কিছু ছিল না। এমনকি খুনের কোনো বিষয় লেখক সামনে আসেনি। খুন বর্জিত কোনো থ্রিলার শেষ কবে পড়েছি বা আদৌ পড়া হয়েছে কি না মনে করতে পারি না।
দুই. প্রথাগত থ্রিলারের মতো টানটান উত্তেজনা এখানে অনুপস্থিত। তারপরও আগ্রহ জাগিয়ে রাখতে পেরেছেন লেখক। তথ্যের অসংখ্য সমাহার ছিল বইটিতে। যদিও লেখক অতিরিক্ত ইনফো ডাম্পিং এখানে করেননি। আমার মনে হয়েছে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই এখানে ছিল।
তিন. কোনো দামী বস্তু নিয়ে তদন্ত করতে গেলে দেখা যায়, একদল পিছনে লেগে থাকে। তারা যে করেই হোক চুরি করে নিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর। এখানে সেই বিষয় ছিল না। লেখক আর্ট ডিটেকটিভ মানে, আর্ট বিষয়ক তদন্তেই জোর দিয়েছেন। অতিরঞ্জিত কিছু এনে ভারিক্কি দেওয়ার চেষ্টা করেননি। যদিও এমন এক ঘটনা ছিল, সেটা ভিন্ন কারণে। তার ব্যাখ্যা লেখক পরবর্তীতে দিয়েছেন।
শেষটা নিয়ে যদি বলতে হয়, লেখক একটা ওপেন এন্ডিং রেখেছেন। হয়তো এখানে পাঠকদের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি দেখা যাবে। শেষে মাথা ঘোরানো টুইস্ট তো ছিল না। তবে যারা আর্ট বা এই জাতীয় বিষয়ে আগ্রহী তাদের জন্য শেষের চমক সত্যিই মাথা ঘোরানো। প্রথাগত থ্রিলারের বাইরে গিয়ে এখানে লেখক ব্যতিক্রমভাবে উপস্থাপন করেছেন। লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে নিয়ে অনেক কাজ করা যাবে, সেই আভাস লেখক রেখেছেন। অনুমিতভাবেই বলা যায়, এটা একটি সিরিজ হতে চলেছে। সেটা শেষের আভাসের কারণে যেমন বলা যায়, তেমনই “দা ভিঞ্চি ক্লাব”-এর সদস্যদের না থাকার কারণেও বলা যায়। হয়তো পরবর্তীতে সিরিজের বিভিন্ন বইয়ে একে একে সবাই উপস্থিত হবে গুরুত্ব সহকারে।
◾চরিত্র :
এই জাতীয় বইয়ে গল্পের পাশাপাশি চরিত্র গঠন অনেকবেশি গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। ডক্টর জেডকে শুরুর দিকে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। তবে গল্পের এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ডক্তরের স্বভাব চরিত্র বেশ ভালই ফুটে উঠলেও তার অতীতের ঘটনা আড়ালে থেকে গিয়েছিল। এক সময় ভাবছিলাম, হয়তো এখানে সেই বিষয় আড়ালে রেখে পরবর্তী কোনো বইয়ে খোলসা করে হবে। যদিও শেষে লেখক বিষয়টার মীমাংসা করেছেন অতীতের কথা এনে। আর এখানে ডক্টর জেড কেন নিজেকে আড়াল করে রাখে তার যুৎসই কারণ পাওয়া যায়।
একাকী নিজেকে এক দুর্ভেদ্য দেয়ালের আড়ালে আলাদা করে রাখার কারণে ডক্তরকে গম্ভীর মনে হলেও সে বেশ আমুদে। বন্ধুদের সাথে হাসি তামাশা মেতে উঠে। তবে যতই আড়ালে থাকা হোক না কেন, নারীর কাছে সেই দুর্ভেদ্য দেয়াল একসময় না একসময় ভেঙে পড়ে।
এই গল্পে একজন নারী আছে — ওরিয়ানা। তাকে লেখক আনছেন নারী থাকলে শোভা বর্ধিত হি সেই কারণে। মূল কাহিনির সাথে মেয়েটার যোগসূত্র নেই। এছাড়া কিছু সন্দেহের বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার কারণেও মেয়েটির আবির্ভাব। এখানে একটু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলি। কোনো অ্যাপার্টমেন্টে নারী ও পুরুষ একই অ্যাপার্টমেন্টে কিছু সময় থাকলে যে কোনো লেখকই কিছুটা ১৮+ ছোঁয়া দিতে চাইবে। কিন্তু মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন সেই চেষ্টা করেননি। এতে করে ডক্টর জেডের প্রতি সম্মান অনেকটাই বেড়ে গেছে। লেখককেও ধন্যবাদ অপ্রয়োজনে ১৮+ না আমার জন্য। ভালোবাসা, ভালো লাগা অনুভবের বিষয়। সেই অনুভূতি লেখক ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। ওরিয়ানার মায়া ও সরলতা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।
তাছাড়া লুই পাসকেল, আর্ট ডিলার ডেসমন্ড, আর্টের মালিক মার্কাস তাদের জায়গা থেকে বেশ ভালো ভ��মিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। সবাইকে ঠিকঠাক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষে এসে মার্কাসের অভিব্যক্তি দেখাতে পারলে ভালো হতো।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ না থেকেও আছেন। তিনি লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। দুর্দান্তভাবে তাকে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। পুরো যাত্রা ছিল লিওনার্দোর সাথে। তার ইতিহাস, মা-বাবা, গ্রাম, আর্টের কমিশন পাওয়া, কী কী আর্ট করেছে, তার শিষ্যদের বিষয়ে বর্ণনা, বিভিন্ন আর্টের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, চমকে দেওয়া মোনালিসার ইতিহাস ছিল বইটির প্রাণ। উপন্যাস বরাবরই কাল্পনিক। এখানে অবশ্য সত্যটা খোঁজার চেষ্টা না করার অনুরোধ রইলো। বাকিটা পাঠকের উপর।
◾বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
বাতিঘর প্রকাশনীর বইয়ে বানান ভুলের পরিমাণ কম, সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিছু ছাপার ভুল ছিল যদিও। সেটা পরিমাণে আগের চেয়ে অনেক কম। তবে ন/ণ, ই-কার/ঈ-কার, কি/কী এর ভুল কিছু জায়গায় ছিল। হয়তো আরো কমে আসবে এই ভুলগুলো। বানান ভুল ছাড়া বই পড়া তৃপ্তিদায়ক।
এছাড়া বাঁধাইও আগের চেয়ে প্রতিনিয়ত উন্নত হচ্ছে। প্রচ্ছদ বেশ ভালো লেগেছে। বইটার পুরো ঘটনা যেন প্রচ্ছদে উন্মুক্ত হয়ে উঠেছে। আগেই বলেছি বইয়ের মাঝে মাঝে কিছু ছবি ছিল, যা অনেক জটিল বিষয় বুঝতে সাহায্য করেছে। অবশ্য কিছু ছবি না থাকলে ক্ষতি হতো না।
◾পরিশেষে, লেখক এখানে ব্রাউনিয়ান সিনড্রোমের কথা বলেছেন। এই সিনড্রোমের কারণেই হয়তো দেশীয় বেশিরভাগ থ্রিলারে গুপ্তসংঘের আবির্ভাব হয়। “দা ভিঞ্চি ক্লাব” বইটিতে কোন গুপ্তসংঘ ছিল না। বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ খুব বেশি প্রয়োজন। এমন এক কাজ বাংলা সাহিত্যে হতে পারে, সেটা বিশ্ববাসীর জানা উচিত। বইটি ভালো, না খারাপ সেটা বিচার করবে অন্যরা। আমার কাছে তৃপ্তিদায়ক। এক ব্যতিক্রম ভালো লাগার উপন্যাস — দা ভিঞ্চি ক্লাব।
◾বই : দা ভিঞ্চি ক্লাব ◾লেখক : মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ◾প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী ◾পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৬৮ ◾মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা ◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৮/৫
প্রথমেই বলি, সামগ্রিকভাবে বইটি আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের লেখা দ্য ভিঞ্চি ক্লাব মূলত একজন ভিন্নধর্মী চরিত্রকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যায়—ডক্টর জেড। তিনি একজন আর্ট ডিটেক্টিভ, যার জ্ঞান শুধু আর্টেই সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি ও গবেষণার নানা দিকেও তিনি সমানভাবে পারদর্শী।
বইয়ের কাহিনি আবর্তিত হয় ইতালীয় রেনেসাঁসের কিংবদন্তি শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির একটি চিত্রকর্ম The Holy Infants–কে ঘিরে। বইয়ে দেখানো হয় ছবিটি বহু বছর আগে আবিষ্কৃত হলেও এর প্রকৃত অ্যাট্রিবিউশন কখনোই সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ ছবিটি সত্যিই দা ভিঞ্চির আঁকা কি না—তা নিশ্চিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সংক্ষেপে, অ্যাট্রিবিউশন বলতে বোঝায় কোনো শিল্পকর্মের প্রকৃত স্রষ্টাকে প্রমাণসহ শনাক্ত করা। এটি একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া যেখানে শিল্পকর্মের ইতিহাস, উপাদান, শৈলী, উৎস এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বিশদভাবে যাচাই করা হয়। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিল্পকর্মের স্বত্বাধিকার এবং নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
এই চিত্রকর্মটি আসলেই দা ভিঞ্চির আঁকা কিনা, নাকি উচ্চমানের কোনো কপি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ছবির মালিক ডক্টর জেডকে ডাকেন। সেই অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করেই পুরো বইটি এগিয়ে যায়। গল্পের সঙ্গে সঙ্গে পাঠক জানতে পারেন দা ভিঞ্চির জীবন, তাঁর কাজের ধরণ, এমনকি তাঁর বিখ্যাত শিল্পকর্ম মোনালিসা নিয়েও বিভিন্ন মতামত ও বিশ্লেষণ।
সব মিলিয়ে বইটি ভিঞ্চিকে ঘিরে নির্মিত হলেও এটি একটি ফিকশন। ব্যক্তিগতভাবে আর্ট ও ইতিহাস নিয়ে আমার আগ্রহ থাকায় বইটি আমার ভালো লেগেছে। তবে যারা শুধুমাত্র থ্রিলার ভেবে বইটি পড়তে শুরু করবেন, তারা হয়তো হতাশ হবেন। কারণ মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন মানেই থ্রিলার, কিন্তু এই বইটি সেই পরিচিত ধারা থেকে কিছুটা আলাদা। যদিও আমি নিজে সাধারণত ঘরানা দেখে বই পড়ি না বরং বিষয়বস্তুর প্রতি আগ্রহই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধরনের তথ্যনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক বই লেখা যে কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। লেখককে অসংখ্য রেফারেন্স ঘেঁটে নিজের বিশ্লেষণ দাঁড় করাতে হয়েছে। সাধারণত এমন বই ধীরগতির হয়ে যায়, যদি তথ্যের প্রয়োগ ঠিকভাবে না করা হয়। কিন্তু আমার কাছে বইটি বেশ দ্রুতগতির লেগেছে লেখকের অন্যান্য বইয়ের মতোই। একটানা পড়ে যেতে পেরেছি। যদিও কিছু রিভিউতে বইটিকে স্লো বলা হয়েছে, সেটি হয়তো অনেকের আগ্রহের তারতম্যের কারণেই। আবার একেকজনের কাছে একেক বই একেকরকম লাগাটাই স্বাভাবিক।
বইয়ের ভেতরে দা ভিঞ্চির বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক শিল্পকর্মের ছবি দেওয়া হয়েছে, যা বেশ ভালো লেগেছে। তবে আফসোস থেকে যায় এই আর্টগুলো যদি আলাদা, উন্নত মানের কাগজে ছাপা হতো, তাহলে ব্যাপারটা আরও সুন্দর হতে পারত। যদিও সেক্ষেত্রে বইয়ের দাম যে অনেক বেড়ে যেত, সেটাও অস্বীকার করা যায় না।
সবশেষে বলতে গেলে, যারা আর্ট, দা ভিঞ্চি কিংবা শিল্পকর্মের রহস্য নিয়ে আগ্রহী, তাদের জন্য দ্য ভিঞ্চি ক্লাব নিঃসন্দেহে একটি সুপারিশযোগ্য বই। একই সঙ্গে লেখকের কাছ থেকে ভবিষ্যতে এমন আরও ভিন্নধর্মী ও এক্সপেরিমেন্টাল লেখার প্রত্যাশা থাকল।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও তার কাজকে কেন্দ্র করে লেখা এই থ্রিলারের প্লটটি অসাধারণ। এই বইয়ের ব্যাপারে ভাল দিক বলতে গেলে কেবল এটাই। নাজিম উদ্দিন যে বেশ অনেক পড়াশোনা করেছেন তা বোঝা যায়। অনেক তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, জোর করে। কোনো ঘটনাকে ডিটেইলসে লেখা হয়নি, অধ্যায়গুলো ছোট ছোট। চরিত্রায়নও সুবিধাজনক বলা যায় না।
হলি বেবিস নামের একটা পেইন্টিং পাওয়া গিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এটা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-র হারানো পেইন্টিং গুলোর একটা। তবে সেটা প্রমাণ করতে হবে। এর জন্য আর্ট- অ্যাট্রিবিউশন নামক পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হবে পেইন্টিংটাকে। আর সেই পরীক্ষার জন্যই ডাক পড়ল ডক্টর জেড এর।
একটা বই পাঠকের কাছে কেমন লাগবে তার অনেকটাই নির্ভর করে সেই পাঠক কী ধরণের এক্সপেক্টেশন নিয়ে বইটা পড়া শুরু করেছে তার উপর। এক্সপেক্টেশন ফুলফিল না হলে আশাহত হওয়া তাই স্বাভাবিক। আমারও বইটা নিয়ে এই অবস্থাই হয়েছে। দেখুন লেখকের নাম মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, উনাকে আমাদের দেশের থ্রিলার সম্রাট ডাকা হয়। তাই অবধারিতভাবেই উনার বইয়ে "থ্রিল" খুঁজতে যাব আমি।
কিন্তু এই বইটা মোটেও থ্রিলার নয়। ইনফ্যাক্ট ফিকশনের খোলসে এটাকে একটা নন ফিকশন আখ্যায়িত করা যায় সহজেই। এই বইতে কোনো গল্প নেই। আসলেই নেই। ওই উপরে যেটুকু লিখেছি এরপর বাকি পুরোটা স্রেফ তথ্য। এখন সেই তথ্য জানার আগ্রহ আপনার কতটা তার উপর নির্ভর করে এই বই আপনার ভালো লাগবে কি না!
আর্ট অ্যাট্রিবিউশন
হলি বেবিস নামের এই পেইন্টিংটা আসলেই মায়েস্ত্রোর আঁকা কি না সেটার জন্য কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নীরিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে পেইন্টিংটাকে। বইয়ের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে এই পরীক্ষা নীরিক্ষার বর্ণনা। লেখক চেষ্টা করেছেন সর্বোচ্চ সহজবোধ্য ভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে। সমস্যা হচ্ছে, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে বিষয়গুলো থাকলে আর অসুবিধা হয় না। কিন্তু টানা তথ্যের পর তথ্য পড়তে যথেষ্টই বিরক্ত লেগেছে আমার। বিশেষ করে যেহেতু এই বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ বা ধারণা কোনোটাই নেই।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি
বইয়ের বড় একটা অংশ ইনফ্যাক্ট গোটা বইটাকে লিওনার্দো ভিঞ্চির জীবনী হিসাবে দাবী করলে অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। ড. জেডকে খুব বেশি জায়গায় ঘুরাঘুরি করাননি লেখক। এই ল্যাবে লুই পাসকেলের কাছে যাচ্ছেন, তো আবার বান্ধবী ওরিয়ানার কাছে। এই দুই জায়গাতেই কোনো ঘটনা নাই, যা আছে স্রেফ এবং স্রেফ লিওনার্দো ভিঞ্চির জন্ম থেকে শুরু করে তার পুরো জীবনী। রেনেসাঁ যুগের এই অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষটা সম্পর্কে যাদে�� জানার আগ্রহ আছে তারা মোটামুটি এই ব্যাপারে বিশারদ হয়ে যাবেন বইটা পড়লে। সমস্যা হলো এর অনেকটা অংশ Assassins Creed নামক গেম খেলার কারনে আমি আগে থেকেই জানতাম।
মোনালিসা রহস্য!
বইয়ে যে ছিটেফোঁটা রহস্য বলুন বা উত্তেজনা বলুন, তা আছে বিখ্যাত এই ছবিটাকে ঘিরে। না না, এমন ভাববেন না যে এক জায়গা থেকে ছুটে অন্য জায়গায় গিয়ে সূত্র খুঁজে খুঁজে কোনো রহস্যের সমাধান করা হয়েছে। ওই এক জায়গাতে বসেই একের পর থিয়োরি দেয়া হয়েছে পেইন্টিং এ থাকা রহস্যময় নারী কে নিয়ে? শেষ পর্যন্ত একটা তত্ত্ব অবশ্য লেখক দাঁড় করিয়েছেন। তবে তা যতটা না বিশেষজ্ঞদের ধারণা তারচেয়ে বেশি বরং লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন বলে মনে হয়েছে।
এই তো! এরপর বই শেষ!! পুরো বইটাকে আর্ট বিষয়ক একটা প্রবন্ধ বলা যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই গতিতে বই এগিয়ে চলে। আর সেটাকে "ঘুম গতি" বলা যেতে পারে। সত্যি বলতে আমার কাছে মনে হইছে আমি কোনো ক্লাসে ইতিহাসের পাঠ্যবই পড়তেছি। হিস্টোরিক্যাল ফিকশনের ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও বইটা আমাকে একদমই টানতে পারেনি। লেখক চেষ্টাই করেননি গল্পে কোনো গতি আনতে। উনি শুধু আর্ট বিষয়ক উনার সকল জ্ঞান জানাতে চেয়েছেন। যাদের এই জ্ঞান জানার আগ্রহ নাই, তাদের কাছে গোটা বইটাকে ইনফো ডাম্পিং বলে মনে হতে পারে। সাথে জুড়ে দিয়েছেন নিজস্ব কিছু ফিলোসফিক্যাল ধ্যান ধারণা। টিপিক্যাল নাজিম উদ্দিন লিখনশৈলীর ছিঁটেফোঁটাও ছিল না বইয়ে। কারেক্টারাইজেশন এত দূর্বল বলার মতো না। এমনকি মূল চরিত্র ডক্টর জেডকেও ঠিকঠাক উপস্থাপন করা হয়নি। শুরুতে তার অসংখ্য গুণাবলির ব্যাপারে ধারণা দেয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত সে একজন ইতিহাসের লেকচারার হিসাবেই থেকে যায়৷ আসলে গল্প বা চরিত্রায়ন নয়, উনার ফোকাস ছিল সম্ভবত আর্টের ব্যাপারে পাঠককে উদ্ভুদ্ধ করা।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৪/১০ (আর্ট নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই। এ ব্যাপারে আমাকে মুরুক্ষু কিংবা ক্ষ্যাত টাইপ বলা যেতে পারে। লিওনার্দোর জীবনী আর মোনালিসা নিয়ে দেয়া বিভিন্ন তত্ত্বের কারনে এইটুকু রেটিং। তবে যাদের এইসব বিষয় নিয়ে আরো বেশি আগ্রহ আছে, আমার ধারণা তাদের বইটা বেশ ভালো লাগতে পারে)
থ্রিলার সম্রাটের বহুল প্রতিক্ষিত কাজগুলোর মধ্যে 'দা ভিঞ্চি ক্লাব' অন্যতম হলেও বইটাকে কোন দিক দিয়েই থ্রিলার বলাটা সমীচীন হবে না। আর্ট এট্রিবিউশন, আর্ট ডিটেকটিভ ঘিরেই গল্পটা সাজানো।
মোনালিসার হাসির রহস্য উদঘাটন করতে আজও ছুটছে শিল্পবোদ্ধারা, উপন্যাসের ডক্টর জেডও ছুটেছেন। সেই যাত্রায় উঠে এসেছে মোনালিসা এবং মায়েস্ত্রো লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জীবন ও শিল্পকলা নিয়ে জানা-অজানা ইতিহাস। লেখকের কল্পনায় সেই ইতিহাস হয়তো কিছুটা অল্টারনেট হিস্ট্রিও হয়ে থাকতে পারে, শিল্পজগৎ নিয়ে অজ্ঞতার কারনে সঠিক-ভুল যাচাই করাটা সম্ভব হয়নি৷ সব মিলে সুখপাঠ্য।
একদম হতাশ। নাজিম ভাইয়ের একটা বই হাতে নিয়ে আমার বারবার ঘুম পাবে আমি তা কখন ভাবিনি। এই গল্পটাকে কোনো ভাবেই থ্রিলার বলার উপায় নেই, তবুও বাংলাবাজার বুকস, বইনগর থেকে শুরু করে সবাই বইটাকে 'থ্রিলার' বলেই মারকেট করেছে এবং বিক্রি করেছে, সাথে লেখকও এই ভুল শুধরে দেয়নি। পুরো ৩৬০ পৃষ্ঠার গল্পের ইন্টারেস্টিং পার্ট টুকু ছিল মাত্র ১৫-২০ পৃষ্ঠায় বলা লিওনার্দোর জীবনী, যা হয়ত আমি অনলাইনেই পড়তে পারতাম। নাজিম ভাই পর পর দু-বছর হতাশ করলেন, গত বছর 'কসমজাহি' ছিল একদমই অখাদ্য, আর এবার এটা যে কি তা আমার জানা নেই। অবশেষে বুঝলাম, নাজিম ভাইয়ের বইও প্রি-অর্ডার করা বন্ধ করে দিতে হবে।
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন মানেই থ্রিলার এইটা মাথায় যেন সেট হয়ে গিয়েছে। এই বইটা পড়ার সময়েও সেই সেটআপই কাজ করছিল। কিন্তু কিছুটা আগানোর পরই টের পেলাম এটা আসলে থ্রিলার না, বলা যায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জীবনী ও কর্ম নিয়ে ফিকশন স্টাইলের বই।
দা ভিঞ্চি সাহেবের বিরাট ফ্যান আমি। ছোটবেলায় বিটিভিতে মোনালিসার ছবিতে রাতের বেলা আত্মা আসে টাইপের কাহিনী নিয়ে একটা নাটক দেখার মাধ্যমে মোনালিসা আর দা ভিঞ্চির সাথে পরিচয়। এরপর পাড়ার বড় আপুর বাংলা বইতে ভিঞ্চিকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। এরপর নেট জমানায় উনাকে নিয়ে বেশ ঘাটাঘাটি করেছি।
ড্যান ব্রাউন সেই আগ্রহে আরেকটা সলতে যোগ করে দিয়েছিলেন। দা ভিঞ্চির শিল্পকর্মের যে ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন সেগুলো বেশ আগ্রহজাগানিয়া ছিল। মোনালিসা, লাস্ট সাপার এগুলোর ছবি দেখলে এইসব থিওরি মাথায় পাক খায়।
নাজিম ভাইয়ের এই বই থ্রিলার হিসেবে পড়া শুরু করলেও পরে দেখা গেল বইটা আসলে দা ভিঞ্চিকে নিয়ে, পাশে পাশে আছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিশেষজ্ঞ বাঙালি ভদ্রলোক ডক্টর জেডের কাহিনি। বলাই বাহুল্য ভিঞ্চির শিল্পকর্মের আরেকটা নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন লেখক। এই ব্যাপারটা দারুণ ইনজয় করেছি।
আমার ধারণা নাজিমভাই নিজেও দা ভিঞ্চির বিরাট ফ্যান। এই বই পড়লে বোঝা যায় তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেছেন দা ভিঞ্চি, পেইন্টিং ও পেইন্টিং সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে।
বইতে লুই পাসকাল নামক এক ফ্রেঞ্চম্যান আর ইটালির এক মেয়ে ওরিয়ানার সাথে ডক্টর জেডের আলাপচারিতার মাধ্যমে দা ভিঞ্চি সংক্রান্ত ব্যাপারাদি উঠে আসে। বলাই বাহুল্য সবকিছুর বক্তা আমাদের ডক্টর জেড। এইখানে আমার একটু খটকা লেগেছে। ফ্রান্সের একজন মানুষ যার কর্মক্ষেত্র আর্ট-ওয়ার্ল্ড আর ইটালির ওরিয়ানাও ছবি আঁকে। তো ডক্টর জেড দা ভিঞ্চি বা মোনালিসা বা লাস্ট সাপার বা অন্য যা কিছুই বলেন না কেন দেখা যায় এই দুজন তার বিন্দু বিসর্গও আগে জানতো না। এইটা মানা যায় না। কিছু ইনফো এদের ডায়লগে আসলে ভালো হতো।
এই দুজনের বিস্ময় ও হ্যাঁ হ্যাঁ করা দেখে মনে হয়েছে এরা দুজনই সদ্য আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়া স্টুডেন্ট যেখানে ডক্টর জেড হচ্ছেন প্রফেসর। যাই বলেন এ দুজন মুগ্ধ হয়ে যায়।
পরিশেষে বলি বইটা পড়তে ভালো লেগেছে। প্রচ্ছদটা সুন্দর হয়েছে, বইয়ের বাঁধাইও চমৎকার। বইয়ের মাঝখানে আরাম করে খোলা যায়।
আর্ট নিয়ে যাদের ব্যাপক আগ্রহ কেবল তাদেরই ভাল্লাগবে বোধ করি। আমার কাছে মোটামুটি লেগেছে যদিও জনরা ভিন্ন ধাঁচের। তবে যেভাবে ফলাও করে থ্রিলার ফিকশন বলে প্রচার প্রসার চালানো হয়েছে তা সত্যিই বেমানান ঠেকছে। মার্কেটিং করতে হলে সঠিক টাই করা উচিত নতুবা পাঠক আশাহত হয়।
অন্যরকম একটা বই। অন্যরকম একটা এক্সপেরিয়েন্স। মনে হচ্ছিল লেখক ইতা���ি ঘুরতে গেছে। সেই ঘুরার ফাঁকে ফাঁকে কিছু ক্যাজুয়াল কাজকর্ম করছে, শহর ঘুরছে, ইতালীয় বান্ধবীর সাথে বসে কফি খাচ্ছে। আর তার এক্সপেরিয়েন্স গুলো লিপিবদ্ধ করছে। এ অংশটুকু মোটামুটি ভালোই ফিল দেয়। সেই সাথে আর্ট এর বিভিন্ন খুঁটিনাটি, এট্রিবিউশনের বিভিন্ন ধাপ এগুলো মোটামুটি ইন্টারেস্টিং লাগে, খারাপ না আরকি। কিন্তু সমস্যাটা হয় বইটা শেষে দিয়ে অনেক স্ট্রেচি। ফোনে আসে ৫০ পৃষ্ঠা কম করা যেত। আর এই ধরনের লেখা অনেক টাইট-ক্রিস্প হতে হয় এবং লেখার গুণগত মানটাও বাড়াতে হয়। যেহেতু এটা কোন থ্রিলার না এই গল্পের সাথে পাঠকের জুরে রাখার জন্য ভাষার কারুকার্যতা টাও ওইরকমই হতে হয়। সেই জিনিসটা মিসিং। তো ওভারঅল একটা অন্যরকম এক্সপেরিয়েন্স এর জন্য ঠিক আছে। কিন্তু নাজিম ভাই এর থেকে আরও অনেক এক্সপেক্টেশন ছিল যেহেতু উনি এই ফিল্ডে পাকা খেলোয়াড়।
Author তার writing stereotype থেকে বের হতে পারেন নি. For example : Protagonist bastard ✅, genius ✅ Bangladeshi হয়েও internationally famous ✅ ছোটো ছোটো চ্যাপ্টার ✅
এক গাদা ইনফরমেশন ডাম্পিং এবং mediocre plot নিয়ে আরেকটি বই মেলা কাঁপানো বই এইটা. নতুন কিন্তু জানতে পারবেন পুরাতন Leonardo da vinchi কে নিয়ে. Unnecessary Italian লেখা গুলো অনেক bothersome ছিল বলতেই হয়.
আমার কাছে এইটা একটা disappointment. Author এর আরেকটি "কেউ কেউ কথা রাখে" এর অপেক্ষায়
টিপিকাল নাজিম উদ্দিন ফ্লেবার বিহীন বই। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়ত রবার্ট ল্যাংডন স্টাইলের বই হবে। লিওনার্দো এর ছবি থেকে ক্লু বের করে করে আগাবে। কিন্তু না! অনেক, অনেক বেশি ইনফর্মেশন, অনেক বেশি! শেষটা সুন্দর অনেক।।।
❛জগতের অনেকগুলো রহস্যের মধ্যে আর্ট কিংবা শিল্প তথা চিত্রশিল্প অন্যতম। রংতুলির রংয়ের খেলায় কিংবা স্কেচের আঁচরে তৈরি হয় নানা ছবি। যার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে মানুষ কাটিয়ে দেয় যুগের পর যুগ। শিল্পীমনের খেয়ালই একমাত্র জানে সে ব্যাখ্যা। বছর পেরিয়ে শততে গড়ায় সেইসাথে বাড়তে থাকে শিল্পীর আঁকা ছবির রহস্য। এই যেমন, মোনালিসার সেই রহস্যময় হাসির পিছে কত মিথ জড়িয়ে আছে। আর এই রহস্যের কিনারা করতে পাঁচশ বছর পরেও চলে আসছে নানা তর্ক বিতর্ক। চলবে আরো অজানা সময় পর্যন্ত।❜ আর্ট নিয়ে যেমন মানুষের কৌতূহল আছে তেমন এই আর্টের আছে বিশাল বাজার। যেখানেই টাকা পয়সার আনাগোনা সেখানেই আছে এক নাম্বারী বা দুই নাম্বারীর উপস্থিতি। সুপ্রাচীন কোনো আর্ট মানেই এর বাজারমূল্য আকাশচুম্বী। ফায়দা নিতে অনেকেই চুরি কিংবা সুন্দর করে বললে ❛কপি❜ করে ফেলে বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলো। কপি হলেও দেখা যায় সেসব আসলের কাছাকাছি কিংবা বিজ্ঞ চোখ ছাড়া ঠাওর করা যায়না। চুরি করলেও তাকে একেবারে ❛স্টিল লাইক অ্যান আর্টিস্ট❜ স্টাইলে করা হয়। এসব সূক্ষ্ম ব্যাপার ধরতেই হয়তো ❛আর্ট ডিটেকটিভ❜ টার্মের কিংবা এ ধরনের পেশার আবির্ভাব।
গোয়েন্দা মানেই শার্লক, ফেলুদার মতো কেউ কে রহস্যের কিনারা করে। সেখানে মূল থাকে অপরাধ, খু ন ইত্যাদি। তবে শিল্পের আসল নকল বের করারও গোয়েন্দা থাকে? ফুড ডিটেকটিভ পযর্ন্ত আছে। সেখানে আর্ট ডিটেকটিভ তো থাকতেই পারে! এই যেমন আমাদের ডক্টর জেড!
ডক্টর জেড এক রহস্যময়, একাকী আর বিচ্ছিন্ন একজন মানুষ। জিনিয়াস বলতে প্রচলিত সংজ্ঞায় যা বুঝায় তিনি তাই। সব বিষয়ে তার অদম্য কৌতূহল। সেই সাথে জ্ঞানও অনেক। এজন্যই লোকে তাকে বলে সবজান্তা। রহস্যময়, জ্ঞানী এই লোক শিল্পের সমঝদার। তার আগ্রহের মূল লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং তার চিত্রকর্ম। তিনি এমন একটি ক্লাবের সদস্য যার নাম, ❛দা ভিঞ্চি ক্লাব❜। যাদের মূল উদ্দেশ্য ভিঞ্চির করা চিত্রগুলোর হদিশ করা আদতেই এই শিল্পীর আঁকা কি না সেটা যাচাই আর সেগুলো সংগ্রহ করে একটা জাদুঘর তৈরি করা। সেইসাথে রহস্যময় ভিঞ্চির জীবনের অজানা দিকগুলোও জানা। কেননা অসম্ভব মেধাবী এই শিল্পী তার পুরো জীবনকে এক রহস্যের ভারী চাদরে লেপ্টে রেখেছেন। এত এত বছর পরেও তিনি এক রহস্য, মিথ। তিনি হয়তো বিশ্বাস করতেন, ❛Privacy is something you can sell, but you can't buy it back.❜ এজন্যই নিজের বিশ্বাস, জীবন আর মতামতকে একান্তই ব্যক্তিগত করে রেখেছিলেন। যার কিনার মেলেনি আজও।
সালটা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দিক। জেডের মোবাইলে একটি কল এলো। তার আগ্রহের এবং সন্দেহের একটি বিষয় নিয়ে গবেষণার সুযোগ এসে গেছে। ফোনটি তাকে করেছিল ফরাসী বন্ধু লুই পাসকেল। তিনি তৈরি হবেন রোমযাত্রার জন্যে। তবে এরমধ্যেই আরেকটি ফোনকল এলো। কলের ওপাশে তার বন্ধুস্থানীয় আর্ট ডিলার রিগবি। তাকে নিয়োগ দিয়েছে পাঁচশ বছরের পুরোনো এক পেইন্টিংয়ের তত্ত্বতালাশ করতে। রিগবি আর্ট ডিলার হলেও আর দশটা পয়সালোভী ব্যবসায়ীর মতো না। সেও ভিঞ্চি ক্লাবের একজন সদস্য এবং আর্ট নিয়ে তার জ্ঞান হিংসা করার মতোই। তো আমাদের জেড ব্যাগপত্তর গুছিয়ে রওনা হয়ে গেলেন রোমের উদ্দেশ্যে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এক রহস্যময় চিত্র ❛হলি বেবিস❜। এটি শেষবার কিনেছিলেন যিনি তার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছেন একজন ধন কুবের। ১৯৭৮ সালে পুনরায় লোকচক্ষুর সামনে আসা এই বাচ্চাদ্বয়ের পেইন্টিং নিয়ে তৎকালীন মালিক তার নিজের জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন। কারণ যদি প্রমাণ করা যায় এটা আসলেই মায়েস্ত্রার আঁকা তবে এর বাজারমূল্য কেমন হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সময় পেরিয়ে তার ভাগ্নি এর মালিক হোন এবং শুরু করেন পেইন্টিংটি আদতেই ভিঞ্চির আঁকা নাকি তার খোঁজ। আর এখানেই আর্ট ডিটেকটিভ হিসেবে কাজ করেন আমাদের ডক্টর জেড। চিত্রকর্মটি বেশ নিরাপত্তার সহিত নির্দিষ্ট ল্যাবে নেয়ার পথে একটু ঝামেলা হয়ে গেলেও বেশ ভালোভাবেই সামাল দেয়া হয়। এখন এই বেবিস নিয়ে শুরু হবে ❛অ্যাট্রিবিউশন❜। আর্টের ভাষায় এর মাধ্যমে ছবির আসল নকল যাচাই হয় কতগুলো ধাপের মাধ্যমে। আর এই কাজটি করছেন ফরাসী লুই পাসকাল। তিনি একজন আর্ট বিশ্লেষক। ইমেজিং সিস্টেমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করে সুপ্রাচীন পেইন্টিংয়ের রং, তৈরির কাছাকাছি সময় ইত্যাদি বের করার দারুণ এক কৌশল আবিষ্কার করেছেন। বেবিরাও এই পদ্ধতিটির ধাপে ধাপে নিজেদের প্রমাণ করবে আদতেই এটা ভিঞ্চির আঁকা নাকি। ডক্টর জেড এই কাজে সাহায্য করছেন, সেইসাথে তালাশ করছেন পরবর্তী ধাপের। ঘুরে বেড়াচ্ছেন রোমের নানা জায়গায়। করছেন বেবিদের প্রভেইনেন্স। এই যাত্রায় তাকে একটু সঙ্গ দিচ্ছে ওরিয়ানা। আচ্ছা লুভরের লিসা কি আদতেই মোনা? এই প্রশ্ন একটা রহস্যের মতো। লুভর মিউজিয়ামে অতীত কাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই মোনালিসা নামক রহস্যময় হাসির ছবিটির কোটি দর্শকের নজর কেড়ে আসছে। আদতে এর রহস্য কি হাসিতেই? ডক্টর জেড আর লুই এই রহস্য নিয়েও কাজ করছেন। একদিকে চলছে বেবির হদিশ অন্যদিকে লুই এমন এক রহস্যের কিনার পেয়েছে যা প্রায় টলিয়ে দিতে পারে শত শত বছরের এক বিশ্বাসকে। আমরা যাকে জোকেন্দা তথা লিসা নামে জানি তার ভেতর যে লুকিয়ে আছে বা আমরা যাকে দেখতে পাই তারা আসলে কারা? ডক্টর জেড তার অপার জ্ঞান দিয়ে এমন এক সত্যের মুখোমুখি হলেন যা আলোড়ন সৃষ্টি করবে। তবে এর মাঝেই বিশ্ব জুড়ে তাণ্ডব দেখালো মহামারী করোনা। সবাই থমকে গেল। তবে কি রহস্যের কিনার হবে? বেবিস কি এঁকেছিলেন স্বয়ং লিওনার্দো? আর আদতেই কি ❛মোনা কিন্তু লিসা নয়❜?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝দা ভিঞ্চি ক্লাব❞ মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা ভিন্নধর্মী একটি আর্ট ডিটেকটিভ ঘরনার উপন্যাস। এমন ধাঁচের লেখা এই প্রথমবার পড়া হলো। প্রচলিত অর্থে গোয়েন্দা কাহিনি কিংবা থ্রিলার বলতে যা বুঝায় এই উপন্যাসটি এর ব্যতিক্রম। লেখকের অনেকদিনের আকাঙ্ক্ষার ফল এই উপন্যাস। উপন্যাসে লেখক আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বেগ-বা স্টার্ড দুনিয়ার একজন চরিত্র ডক্টর জেডের সাথে। যার উপস্থিতি ছিল ❛নেমেসিস❜ উপন্যাসে খুব স্বল্প পরিসরে। এবার তিনি মূল হয়ে এসেছেন আপন দুনিয়ায়। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জীবন আগাগোড়া রহস্যে ঘেরা। রহস্য, মিথ, কনস্পিরেসি থিওরি আছে তার আঁকা চিত্রগুলো নিয়েও। এরমধ্যে বিখ্যাত ❛লাস্ট সাপার❜, ❛ভার্জিন অব দি রকস❜, ❛হলি বেবিস❜ আর অবশ্যই none other than ❛মোনালিসা❜। হারিয়ে গেছে শিল্পীর আঁকা অনেক চিত্রকর্ম। যেগুলো উদ্ধার হয়েছে সেগুলো নিয়েও আছে অনেক রহস্য। আদতেই স্বয়ং শিল্পীর আঁকা না উন্নতমানের কপি কিংবা তার শিষ্যদের আঁকা কি না এই নিয়ে তত্ত্বের অভাব নেই। অভাব নেই বইয়ের। এক মোনালিসা নিয়েই বই আছে অনেক। লেখক উপন্যাসে এই একই রহস্যকে সত্য দস্তাবেজ আর কল্পনার মিশেলে মিলিয়ে লিখেছেন। নাজিম উদ্দিনকে আমরা চিনি থ্রিলার লেখক হিসেবে। যার অতি দ্রুত গতির লেখা আর ক্ষণে ক্ষণে দেয়া রহস্যের মোচড়, টুইস্ট টার্ন পড়ে আমরা অভ্যস্ত। তবে এখানে লেখক বলা যায় নিজের চেনা পরিচিত খোলস থেকে বেরিয়ে ভিন্ন এক গল্পের তৈরি করেছেন। যেখানে ক্ষণে ক্ষণে আপনার চোয়াল ঝুলে যাবে না। কী হয় কী হয় ভাব নেই আবার কিছুক্ষণ পরপর লা শও পড়ছে না। ইতিহাসের দলিল, ভিঞ্চিকে নিয়ে হওয়া গবেষণা এবং ভিঞ্চিবিদদের নানা ইতিহাসকে লেখক নিজের মতো করে গল্পের মধ্যে এনেছেন। অনেকগুলো সত্যের সাথে আপন কল্পনা মিশিয়েছেন। কখনো পড়তে গেলে মনে হতেই পারে এটি ফিকশনের আড়ালে একটি নন ফিকশন বই। তবে সবকিছুই যে নির্জলা সত্য সেটা ভেবে নিলে দায় নিজের। লেখকের লেখা এমনিতেই যথেষ্ঠ দ্রুত গতির। সেইসাথে ইতিহাসের এমন এক রহস্য নিয়ে লেখক গল্প বলেছেন যা আমার মতো ইতিহাসপ্রেমী, রহস্য পছন্দ করা পাঠকের কাছে ভালো লেগেছে। ভাবতেই কেমন লাগে বিখ্যাত কোনো চিত্রকর্ম যেখানে মিশে আছে স্বয়ং কিংবদন্তিতুল্য এক আঁকিয়ের স্পর্শ। লেখকের বর্ণনায় ভিঞ্চি যেন বাস্তব হয়ে উঠে এসেছিল। সেইসাথে ভ্রমণ হয়ে গেছিল রোম, বেলজিয়ামের অলিগলিতে, কস্তির বস্তিতে। আর্ট নিয়ে এত বিশদ আলোচনা, আর্ট ডিটেকটিভের বিভিন্ন টার্ম নিয়ে লেখক ধারনা দিয়েছেন। ব্যবহার করেছেন অনেকগুলো ছবি। আমার কাছে মনে হয়েছে ছবিগুলো ব্যবহারের কারণে আর্ট নিয়ে নোভিশ হয়েও ব্যাখ্যাগুলো বুঝতে সুবিধা হয়েছে। কিছু ছবি রিপিট ছিল, আর অল্প কিছু ছবি মনে হয়েছে না দিলেও হতো, তবে সেগুলো বিরক্তির পর্যায়ে যায়নি। পুরো উপন্যাসে খুব খুবই স্বল্প পরিমাণে ছিল বাংলাদেশের উপস্থিতি। পুরোটাই আবর্তিত হয়েছে ভিনদেশে। একমাত্র জেড ব্যতীত সকলেই বিদেশী। তাই সেখানে বিদেশী ভাষার পরিমাণ বেশি থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। যদিও সংলাপের ক্ষেত্রে লেখক খুব বেশি ইংরেজীর সাহায্য নেননি। তবে ইতালির ভাষার প্রয়োগ ছিল। Yes, no, very good (উদাহরণস্বরূপ) ধরনের শব্দ উক্ত ভাষায় ব্যবহার হয়েছিল। যেহেতু ঐ ভাষা জানিনা বিধায় পড়তে শুরুতে একটু সমস্যা হয়েছিল। তবে সামনে এগোতে এগোতে সেগুলোর অর্থ আপনাই বুঝে গিয়েছিলাম। তাই সমস্যা হয়নি। আমার মনে হয় এখানে পাঠক যদি দেশী ভাব খুঁজতে যায় তবে সে নিশ্চিতভাবেই হতাশ হবেন। কারণ আদ্যোপান্ত বিদেশের মাটিতে হওয়া ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই দেশী ভাব বিরাজ করবে না। লেখক যথেষ্ঠ পড়াশোনা করেই নেমেছেন এই লেখায় সেটা প্রতি পৃষ্ঠার বিপুল তথ্যই প্রমাণ করে। এত তথ্য পড়তে গিয়ে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। অল্পবিস্তর ধারনা থাকলেও সেটা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। শেষটা চমকে যাওয়ার মতো হলেও উপন্যাস পড়তে পড়তে ঐ রহস্যটুকু আঁচ করা গেছে। তবুও শেষটা লেখক করেছেন দারুণভাবে। শেষটায় এসে আপনি সত্যি মিথ্যার এক অদ্ভুত দোলাচলে ভুগবেন। মোনালিসা যে রহস্যের আঁধার সেই রহস্যের মধ্যে একটু আলোর ঝলকানিতে সন্দেহ হতেই পারে। কারণ এই চিত্রকর্ম নিয়ে কন্সপিরেসি থিওরি আর উপন্যাস পড়ে আমরা অনেকেই ব্রাউনিয় সিন্ড্রোমে আক্রান্ত। এখানে লেখক ❛লাস্ট সাপার❜ নিয়ে মাঝের দিকে এমন একটা তথ্য খোলাসা করেছেন যেটা আমি একসময় আসলেই সত্য ভেবেছিলাম (আমার জ্ঞানের স্বল্পতা অবশ্যই)। এছাড়াও লেখক উপন্যাসের মাধ্যমে সমাজের কিছু অসঙ্গতি, অস্থিতিশীল কাজকারবার এবং নিখাঁদ কিন্তু তিতা সত্যকে উপস্থাপন করেছেন। আমার কাছে সবথেকে ইন্টারেস্টিং লেগেছে শেলফি শিকারিদের কবলের ব্যাপারটা। তিক্ত হলেও আসলে সত্য ছিল। ডক্টর জেড কি আবার ফিরে আসবেন দীর্ঘ লকডাউন কাটিয়ে? নতুন কোনো রহস্যের ব্যবচ্ছেদ কিংবা অ্যাট্রিবিউশন পাবো কি আমরা তার থেকে?
চরিত্র:
অবশ্যই ডক্টর জেড। লেখক তাকে উপস্থাপন করেছেন দারুণভাবে। শুরুতে সেও রহস্যের চাদরে নিজেকে ঢেকে রেখেছিল। ভাবছিলাম কে এই জেড? কেন তার নাম জেড? শেষে এসে তার অতীতও খোলাসা করেছেন যা এই চরিত্রকে পূর্ণভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। জেডের সাথে লেখক অতীতের এমন একটা ঘটনা জুড়ে দিয়েছেন সেটা প্রশংসনীয় ছিল।
ওরিয়ানা চরিত্রটা খুবই নির্মল এবং মায়াবতী (বিদেশিনীর ক্ষেত্রে মায়াবতী শব্দটা কি খাটে?)। তাকে নিয়ে একটু রহস্য করলেও পুরো চরিত্রটা খুবই সুন্দর ছিল। জেড এবং তার বোঝাপড়া দারুণ ছিল। এখানে একটা জিনিস খুব ভালো লেগেছে অযাচিত কোনো ১৮+ কিছু ছিল না। আগাগোড়া তথ্যবহুল বর্ণনা, চরিত্রদের সুন্দর বোঝাপড়াই ছিল মূল। ওরিয়ানার কোমল হৃদয় পাঠককে তার প্রতি ভালো লাগা তৈরি করবে।
লুই এবং রিগবি চরিত্রটা বেশ ছিল। মার্কাসকেও তার নিজের জায়গায় ভালো লেগেছে।
এখানে খোদ লিওনার্দোকেই কি একটা আলাদা চরিত্র হিসেবে ধরা যায়? লেখকের বর্ণনায়, জেডের ব্যাখ্যায় তার উপস্থিতিও তো বেশ ছিল।
একটু আলাদা কথা:
শুরুতেই বলেছি লেখক নাজিম উদ্দিনকে আমরা চিনি ধুম ধারাক্কা থ্রিলার লেখক হিসেবে। দ্রুত গতির বর্ণনা আর চোয়াল ঝুলিয়ে দেয়া থ্রিল বা চমক, একশন দৃশ্যের বর্ণনায় তিনি আমাদের কাছে পরিচিত। স্বাভাবিকভাবেই এই উপন্যাসেও পাঠক তাকে চিরচেনা রূপেই আশা করতে পারেন। আমার মনে হয়েছে এই চিরচেনা রূপের আশায় কেউ এই বই পড়তে গিয়ে নিশ্চিতভাবেই হতাশ হবেন। এখানে বলা যায় ভিন্ন এক লেখককে আবিষ্কার করবে পাঠক। আর সে আবিষ্কার কারো কাছে দারুণ লাগবে তো কারো কাছে বিরক্তির উদ্রেক করবে। বইটাতে আপনি জয়েন্টে জয়েন্টে থ্রিল পাবেন না কিংবা মিনিটে মিনিটে উত্তেজিত হবেন না। ইতিহাস, আর্ট নিয়ে আগ্রহ না থাকলে, টানা বর্ণনা পড়তে যদি আপনার ধৈর্যচ্যুতি ঘটে তো আপনি এই উপন্যাসকে অখাদ্য বলতেই পারেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি ইতিহাস, বর্ণনা পছন্দ করি। আর কোনোরকম পূর্বাশা ছাড়াই আমি উপন্যাসটা শুরু করেছি বলে আমার বেশ লেগেছে। লেখকের অন্যতম সেরা কাজ মনে হয়েছে। ভূমিকায় লেখক নিজেই বলেছেন এ ধরনের লেখা এই দেশে নতুন। একে গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও পাঠকের দুই তিনভাগ হয়ে যাওয়া খুব দোষের না। আমরা নতুন গ্রহণ করতে বরাবরই একটু দ্বিধায় ভুগি। আর সেইসাথে আমাদের মগজে আগেই আছে ভিঞ্চি নিয়ে কেউ কিছু লিখলো মানেই এইটা ব্রাউনের লেখার সস্তা কপি কিংবা ভাল��� কপি। ব্রাউনিয় সিন্ড্রোম এক কথায়। অনেকেই নাম এবং প্রচ্ছদ দেখে ভেবেছিল এটা আবার ❛ভিঞ্চি কোড❜ এর পরের পার্ট নাকি! লেখক ভূমিকাতেই সেটা খোলাসা করে দিয়েছেন। এবং এই উপন্যাস পড়ার পর লেখকের প্রোফাইল ঘেঁটে কোথাও এমন কথা উল্লেখ পাইনি। একে উক্ত উপন্যাসের সাথে তুলনা দিয়েছেন কিংবা সিকুয়েল হেনতেন বলেছেন এমন প্রমাণ পাইনি। আমার মনে হয় বাড়তি এই হাইপ সৃষ্টির দোষটা বুকশপগুলোকে দেয়া উচিত। ভিঞ্চি কোডের সাথে তুলনা কিংবা একে পুরোদস্তুর থ্রিলার বলে আখ্যা দেয়ার দায়ভার তাদের। এর থেকেই আমার মনে হয় পাঠকের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এই দায় আদতে লেখকের কিংবা প্রকাশনীর নাকি আমার জানা নেই। প্রচারে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে যায়। আমার মনে হয় যারা প্রচার করে তাদের এই বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। দিনশেষে বইও একটা পণ্য এবং পাঠক নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়েই সেটা সংগ্রহ করে। আমার লেখায় আমি লেখককে কিংবা কাউকে কোনোভাবেই তেল দেইনি। ইদানিং এমনিতেই ইফতারি তৈরিতে প্রচুর তেল খরচ হচ্ছে। বাড়তি তেল দেয়ার অবস্থা নেই।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রচ্ছদটা বইয়ের সাথে মানানসই। বাতিঘর তার চিরায়ত বাইন্ডিং এবং সম্পাদনা থেকে বেরিয়ে উন্নতি করছে। তবে সেই পথ আরো মসৃণ হলে আমাদের পাঠ অভিজ্ঞতা আরো ভালো হতো। একেবারে ফ্ল্যপেই বানান ভুল, প্রমাদ ছিল। ভেতরেও বেশ কিছু প্রমাদ, ভুল ছিল। সম্পাদনায় আরো একটু সময় দিলে পাঠকের জন্য সেটা স্বস্তির হবে। এছাড়াও আর্ট টার্ম কিছু আছে ব্যাখ্যা ছিল না। চাইলেই সেখানে ফুটনোট ব্যবহার করা যেত।
❛মোনালিসা তার রহস্য নিয়ে হেসে যাচ্ছে। সেই হাসির এই অর্থ আদৌ কি আমরা বুঝতে পেরেছি? নাকি মোনালিসা পুরোটাই একটা রহস্য? অতীতের ঐ সময়গুলোতে একটু ফিরে গিয়ে যদি দেখতে পারতাম নিজ কাজের ঘরে বসে ভিঞ্চি কী করে পরতে পরতে সাজিয়েছিলেন তার বিখ্যাত শিল্পগুলোকে! মোনালিসার কিংবা লাস্ট সাপারের মুগ্ধতার মাঝে কোন অজানা রহস্য লুকিয়ে রেখেছিলেন যদি জানতে পারতাম!❜
আমি আর্ট বা ছবি টবি তেমন একটা বুঝি না মানে কিছু মানুষ আছে না কোনো একটা পেন্টিং দেখেই এর মাহাত্ম্য বুঝে ফেলে বা এর পেছনে আর্টিস্টের ভিশন বা তার মেসেজ বুঝে যায়- আমি কোনো সময়ই তেমন মানুষ না। ভিঞ্চি ক্লাব বইটা আমি মূলত কিনেছি এইজন্যই কারণ এটা নাজিম উদ্দিনের লেখা। বেশ কিছুদিন পর ওনার কোনো লেখা পড়ে আমি শান্তি পেলাম। হ্যা,সবার আগে বলে নেই এটা অবশ্যই কোনো থ্রিলার বই না। বইটার মূল কাহিনীই লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং তার সব পেন্টিংস নিয়ে। পুরো বইটা খুবই ইনজয় করেছি, বেশ কিছু ইনফো ও জানলাম। আমার কাছে বরাবরই এমন বই ভালো লাগে যেটাতে আমি অনেক তথ্য জানবো তবে গল্পের আকারে। এটা ঠিক তেমনই একটা বই। মোনালিসাকে নিয়েও আমার খুব আগ্রহ ছিল। এটা নিয়েও জানতে পেরে বেশ মজা লাগলো।
প্রথমেই বলি,বইটা ফিকশনের আশ্রয়ে নন-ফিকশন বই!যাদের আর্ট,মোনালিসা,লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বা তার আঁকা ছবি নিয়ে আগ্রহ আছে তাদের ভালো লাগবে!কেন বইটাকে থ্রিলার বলে বিভিন্ন পেইজ চালিয়েছে আমি জানিনা!পুরো বইটাই ফিকশনের ওপর বেইজ করে একটা তথ্যবহুল বই!
শুরুতে আমি বোর হয়েছি খুব!ডক্টর জেড একজন একাকি মানুষ! কিন্তু বেশ কোয়ালিটিফুল একজন মানুষ! তার ভক্তরা মনে করে তিনি একজন সবজান্তা মানুষ! তার হঠাৎ ডাক পড়ে রোমে! ৫০০ বছরের পুরনো একটি পেইন্টিং এর এট্রিবিউশনের জন্য যেতে হবে যার আসল মালিক দাবি করছে ছবিটা লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ছবি!ছবিটির নাম " হলি বেবিস"!
আমি বইটাকে ৫ এ সাড়ে ৩ দিবো!কেন দিবো তা একটু আমার পার্সপেক্টিভ থেকে বলি!বইয়ে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এর জীবন সম্পর্কে কিছু বর্ণনা আছে যেটা আমি বেশ কৌতূহল নিয়ে পড়েছি!মোনালিসা রহস্যের কথা কে না জানে!সেই রহস্যের কিছু জট বইয়ে লেখক খুলেছেন!এছাড়া আর্ট অ্যাট্রিবিউশনের বেশ কিছু ধাপ বইয়ে বর্ণনা করা আছে যেটা অনেকটা প্যাথলজির বিভিন্ন টেস্টের মতো যেটা আমার পড়ে বেশ ভালো লেগেছে!এগুলোর পাশাপাশি আরো কিছু তথ্য ছিলো লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সম্পর্কে এবং তার অন্যান্য পেইন্টিং সম্পর্কে! যদিও আমি "থ্রিলার" ব্যাপারটা মাথায় নিয়ে শুরু করেছিলাম!কিন্তু বইটা শেষ করে মোটামুটি আমি হ্যাপী!তবে ইটালিয়ান(সম্ভবত) বিভিন্ন শব্দ নিয়ে আমার ঝামেলা হয়েছে পড়তে গিয়ে!
একবার একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে ফটোগ্রাফি নিয়ে দারুণ একটা টিপস আমার ভালো লেগেছিলো। যেখানে একটা বিষয় দেখানো হয়েছিলো যে শুধু ক্যামেরায় ক্লিক মারতে পারলেই ভালো ফটোগ্রাফার হওয়া যায় না, বরং একজন ভালো ফটোগ্রাফার শুধু ছবিই তুলে না, সেই ছবিটার মাধ্যমে কোনো এক জীবন্ত মুহূর্তকেও ছবিতে বন্দি করে নেয়।
হঠাৎ এই ফটোগ্রাফির আলাপ বলার কারণ আছে, ফটোগ্রাফিতে যদি কোনো এক জীবন্ত মুহূর্তকে ধারণ করতে পারাটা দারুণ একটা ব্যাপার হয়, তাহলে একবার ভাবুন তো ঠিক একই কাজটা কোনো এক পেইন্টার তার আর্টের মাধ্যমে করতে পারলে ব্যাপারটা আরো কত দারুণ হবে! আর ঠিক এই কাজটাই করতে পারতেন বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। তাঁর বিশ্ব বিখ্যাত মোনালিসা কিংবা দ্য লাস্ট স্যাপার পেইন্টগুলো বিখ্যাত হয়ে উঠার অনেকগুলো কারণের একটা হলো ছবিগুলো শুধু ছবিই নয়, যেন কোনো এক মূহুর্তকেই লিওনার্দো তুলি দিয়ে ক্যানভাসে জীবন্ত বন্দি করে নিয়েছিলেন। যার কারণে মোনালিসার চোখের দিকে তাকালেও মনে হয়, চোখগুলো হাসছে। লাস্ট সাপারে প্রতিটা চরিত্রগুলোর চেহারায় খেলা করে বিস্ময়।
তাই তো ৫০০বছর পেরিয়ে গেলেও এসব ছবি আজও মুগ্ধ করে চলেছে আর্ট প্রেমিদের, আর ঠিক এই সময়ে এসে যদি শুনেন লিওনার্দোর আরো একটা আর্ট খুজে পাওয়া গেছে, ব্যাপারটা কেমন হয় বলেন তো? বিষয়টা একই সাথে যেমন চমকে দিবে, ঠিক আবার অনেকগুলো প্রশ্নও হাজির করে দিবে মানুষের মনে। যেখানে সন্দেহও দানা বাঁধালে তা দোষের হবে না, যেহেতু আগেও এসব বিখ্যাত শিল্পীদের আর্ট কপি হওয়ার আহরহ নজীর আছে। তাছাড়া সময়তো আর কম পেরিয়ে যায়নি।
জি হ্যা, ১৯৭৮সালের ক্রিসমাসের ঠিক আগে লন্ডনের এক অখ্যাত অকশন হাউজে নেদারল্যান্ড থেকে আসা দুই ভাই-বোন টু মারতে গিয়ে তাদের সাথে এমনটিই ঘটেছিলো। সেই অখ্যাত হাউজে এমনই একটি লিওনার্দোর পেইন্টিং আবিষ্কার করে বসেছিলো তারা, যার নাম হলি বেবিস। এতো বছর পর পেইন্টিং পাওয়া গেলেও সেটা যে লিওনার্দোরই পেইন্টিং তা অবশ্যই আগে প্রমাণ করতে হবে, কিন্তু তা প্রমাণ করার আগেই মারা গেলো ভাই রবার্ট, আর পেইন্টিংটা উত্তরাধিকার সূত্রে হাতে গিয়ে পড়লো ভাগ্নে মার্কাস মাজুরের হাতে।
মার্কাস মাজুরে এই পেইন্টিংটাই যে লিওনার্দোর তা প্রমাণের জন্য আর্ট অ্যট্রিবিউশনের দায়িত্ব তুলে দিলো আর্ট ডিলার ডেসমণ্ড রিগবির মাধ্যমে ডক্টর জেডের হাতে। ডক্টর জেডকে পেইন্টিংয়ের অতীত খুঁড়ে তার ইতিহাস আর প্রযুক্তিগত সকল পরীক্ষা নীরিক্ষা করে অ্যট্রিবিউশন এনে দিতে হবে দা ভিঞ্চি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর পিটার কেন্টের কাছ থেকে। একবার যদি প্রমাণ করা যায় পেইন্টিংটা লিওনার্দোর, তাহলে তার দাম দাঁড়াবে প্রায় চারশ বিলিয়নে।
ডক্টর জেড রহসম্যয়, একাকি আর বিচ্ছিন্ন একজন মানুষ। জগতের সব বিষয়ে তার অপার কৌতুহল। ভক্তরা তাকে সবজান্তা হিসেবে দেখে। পাঁচ শ' বছরের পুরনো একটি পেইন্টিংয়ের তত্ত্বতালাশ করতে হবে তাকে। কাজটা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবও বটে। ঢাকা থেকে রোমে পা দিয়েই ডক্টর মুখোমুখি হলো অপ্রত্যাশিত ঘটনার। অপার কৌতুহল তাকে পরিচালিত করলো বরাবরের মতোই, আর যে সত্যটা আবিষ্কার করলো তা যেমন কৌতূহলোদ্দীপক তেমনি বিস্ময়কর। সেই বিস্ময়কর আবিষ্কারের গল্প জানতে হলে পাঠক সঙ্গী হতে হবে দা ভিঞ্চি ক্লাবের সদস্য ডক্টর জেডের সাথে।
লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনকে পাঠক চিনে থ্রিলার সম্রাট হিসেবে। তাঁর বইয়ের সবটা জুড়েই থাকে টানটান উত্তেজনাকর অবস্থা, কিন্তু পাঠক অতীতের সেই থ্রিলের আশায় যদি এই বই হাতে নেন তাহলে আপনি পুরোপুরি হতাশ হবেন। দু'চারটা মনের ক্ষোভ ঝাড়লেও আশ্চর্য হবো না। কেন? আসেন তাহলে তা নিয়েই আলোচনা করা যাক।
বইটার প্রথমদিকে ডক্টর জেড, হারানো পেইন্টিং খুঁজে পাওয়া, ছিনতাইসহ বেশ কিছু ঘটনা আমার মনে একটা চিন্তাই এসেছিলো, আর তা হচ্ছে এবার সম্ভবত পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত ঘুরে ৫০০বছরের অতীত খুঁড়ে পেইন্টিংয়ের অতীত খুঁজে বের করবেন ডক্টর জেড, সাথে পিছন দিকে ধেয়ে আসবে ছবি হাতিয়ে নিতে চাওয়া কোনো পক্ষ। কিন্তু গল্প যতই এগিয়েছে ঠিক ততই এই চিন্তার আশপাশ দিয়ে লেখক গেলেও, বরাবর যে যাননি তা বুঝে গিয়েছিলাম।
গল্পের শুরুতে পেইন্টিংয়ের অ্যট্রিবিউশন নিয়ে মূল কাহিনি এগোবে মনে হলেও আমার মনে হয়েছে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি সেই পেইন্টিংকে সাইডে সরিয়ে নিজেই মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছিলো গল্পে। ফলে কাহিনি যতই এগিয়েছে ততই গল্পে লিওনার্দোর জীবনের দিনগুলোই স্থান পেয়েছে বইয়ে। সাথে তার শিল্পী জীবনের বিখ্যাত ছবিগুলোর পাশাপাশি আরো অখ্যাত ছবিগুলোরও পিছনের গল্প উঠে এসেছে ডক্টর জেডের বর্ণনায়। বিশেষ করে হলি বেবিসদের পাশাপাশি চমৎকার বিশ্লেষণ আছে তার চিত্রকর্ম মোনালিসার। আর শেষ পর্যন্ত যে হলি বেবিস পেইন্টিংটা পাওয়া গিয়েছিলো তার গল্প কিছুটা সাইডে সরে গেলেও একটা সমাধান ঠিকই আছে বলতে হয়। তবুও এই বিষয়টা সাইডে চলে যাওয়াটা শেষ পর্যন্ত ভালো লাগেনি। অবশ্য লিওনার্দোর জীবন কোনো সাদামাটা জীবনের মতো এগোয়নি, সেই জীবনের বৈচিত্র্যময় গল্পও উপভোগ্য লাগবে।
এক্ষেত্রে ডক্টর জেডকে আর্ট ডিটেকটিভ মনে হলেও আমার মনে হয়েছে তার এই পরিচয়টা ম্লান হয়ে গেছে গল্প যত এগিয়েছে ততই। গল্পে ডক্টর জেড যতটা না কাজ করেছেন তার চেয়ে বেশি বর্ণনা হয়েছে তাত্ত্বিক হিসেবে, এতে বই পড়লেই বুঝতে পারবেন লিওনার্দো নিয়ে ডক্টর জেড যেনো আগে থেকেই সব জেনে বসে আছেন। ফলে এ গল্পে ইতিহাস খোঁজার চেয়ে বলাটাই বেশি হয়েছে। এই জায়গায় দারুণ কাজ করে দেখিয়েছেন ইমেজ অ্যানালাইসিস করে দেখানো লুই পেসকেল। আর তাই এই গল্পকে আর্ট রিলেটেড ফিকশন বলা গেলেও থ্রিলার বলা যাবে না।
বইটির গল্প বর্ণনার দৃশ্যপট মোটাদাগে বললে দুটো, একটা লুই পেসকেলের ল্যাব আর অন্যটা ডক্টরের বান্ধবী ওরিয়ানার সঙ্গে। আর এই দুই জায়গাতেই ডক্টর আর তাদের কথোপকথনের মাধ্যমে লিওনার্দোকে তুলে এনেছেন লেখক, অনেকটা লকরুম গল্পের মতো। আর তাই লিওনার্দোকে নিয়ে যদি আপনার আগ্রহ থাকে তাহলে গল্প উপভোগ্য লাগবে আর যদি আর্ট কিংবা লিওনার্দো কোনোটাই আপনার আগ্রহের কেন্দ্রে না থাকে তাহলে বইটা হতাশ করবে।
তবে লেখকের একটা বিষয় অবশ্যই প্রশংসা করতে হয়, সাধারণত দেখা যায় অধিকাংশ লেখকই তাঁদের লেখনশৈলীতে সব বইয়েই একই বৃত্তে আবর্তিত হতে হতে গল্প বলেন, ফলে এসব বই একের পর এক টানা পড়লে মজাটা ঠিক পাওয়া যায় না। এই বইয়ের ক্ষেত্রে লেখক নাজিম উদ্দীন তার প্রচলিত ট্র্যাক থেকে বের হয়ে ভিন্ন ট্র্যাকে গল্প লেখার বিষয়টা আমার দারুণ উপভোগ্য লেগেছে। তবে লেখক কথোপকথনে কিছু কিছু জায়গায় যে ইতালিয়ান ভাষায় সংলাপ এনেছেন তার প্রথমদিকের গুলো আমি বুঝতে পারিনি, শেষদিকের গুলো ধারণা করে নিয়েছি কী বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্রেকেডে বাংলাটাও দিয়ে দিলে পাঠকদের উপকার হতো।
বই শেষ করে বলতে চাই গল্পটা আমার ভালো লেগেছে, ভালো লাগার সবচেয়ে বড়ো কারণ গল্প নয়, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির সম্পর্কে জানতে পারাটা। অনেক বছর আগে ড্যান ব্রাউনের দ্য ভিঞ্চি কোড আর অন্য এক লেখকের অ্যাম্বাররুম আমাকে আর্ট নিয়েও যে নানান মিস্ট্রি আছে তার গল্প জানিয়ে ছিলো, সেই পুরোনো অনূভুতি আবারও জাগ্রত করে দিয়েছে। বইটার প্রচ্ছদও বেশ পছন্দ হয়েছে, প্রোডাকশনের কথা বললে এবার মনে হলো বাতিঘরের গতানুগতিক প্রোডাকশনের থেকেও ভালো প্রোডাকশন, কাগজ দেওয়া হয়েছে বইটিতে।
There are three classes of people: those who see, those who see when they are shown, those who do not see.
Leonardo da Vinci
শিল্প মানবজাতির নিজকে প্রকাশ করবার এক সৃজনশীল মাধ্যম, এবং এ সকল মাধ্যমের মধ্য দিয়ে অঙ্কন বা চিত্রশিল্পকে এক অনন্য স্থান প্রদান করা হয়েছে। কারন ক্যানভাস কিংবা সাদা কাগজের উপর চালানো বাহারি রঙগুলো দিয়ে মানুষের কাল্পনিকতা কিংবা ফুটিয়ে তোলাকে সবথেকে বিদগ্ধ রূপ হিসেবে দৃশ্যমান হয়ে উঠে। আর সেই কাল্পনিকতার প্রতিফলন দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমা অতিক্রম করলেও মানুষের মনে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। যেভাবে আমায় নাড়া দিয়েছিল লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আকা বিখ্যাত "মোনালিসা"। কৈশোরে প্রথমবার কবে কিভাবে এই ছবিখানাকে দেখেছি তার কোনো স্মৃতি নেই। তবে এক অদ্ভুত অনুভুতির জন্ম দিয়েছিলো সেই রহস্যময় হাসি যা আজো আমার মধ্যে জীবন্ত রয়েছে। কোনো শিল্প কাউকে এভাবে নাড়া দিতে পারে তার বোধগম্যতা তখনো আমার হয় নি। কিন্তু ভিঞ্চি এভাবেই আমার মনে খুব সহজেই দাগ কেটে নিয়েছিলো, যেভাবে নরম কাদামাটিতে সহজে দাগ কাটা যায়। আর সেখান থেকেই আমার চিত্রশিল্পের উপর আগ্রহের সৃষ্টি। যেখানে কল্পনার আলো ছায়ার বিস্তৃতময় প্রতিফলন ঘটে।
আর সেই রহস্যময় মোনালিসাকে নিয়েই আমাদের গল্প ভিঞ্চি ক্লাব। ভিঞ্চি ক্লাবের প্রধান চরিত্র ডক্টর জেড, যাকে নিয়ে তুমুল আলোচোনা সমালোচোনা হয়েছে। মূলত নাজিম উদ্দিন স্যারের এই বইটি প্রকাশ হবার কথা ছিলো বেশ কিছু সময় আগেই। কিন্তু নানা কারনে এটি পিছিয়ে পচিশে বইমেলায় প্রকাশ হয়। বইটি হাত��� নিয়ে জল্পনা কল্পনা করা হলেও অবশেষে বইটি শেষ করতে পারি। বইটি শুরু করবার পর খুবই সংক্ষিপ্ত সময়, মোট দুই দিনে আমি এই ঢাউস সাইজের বইটিকে গোগ্রাসে গিলতে থাকি। প্রতিটি পেজ, প্রতিটি পাতা, প্রতিটি অধ্যায় আমাকে পরবর্তী পেজের জন্য চুম্বকের মত টেনে গিয়েছে।
আর্ট এট্রিবিউশনের মত এক জটিল বিষয় নিয়ে বেশ চমৎকারভাবে লিখে গেছেন এক থ্রিলার গল্প। তবে আমাদের থ্রিলার জগতের রাজা তার গতানুগতিক পিউর থ্রিলার থেকে কিছুটা ভিন্ন কাজ করেছেন। তবে এটি থ্রিলার নয় তা না, কিন্তু এটি থ্রিলারের স্বাদে তথ্যে ভরপুর একটি শিল্পের যাত্রাপালা। সুদীর্ঘ ইতিহাস, শিল্পের বর্ননা, দর্শন এমনকি রেফারেন্স ছবি, খুব গোছানো উপায়ে সবগুলো এলিমেন্ট দিয়ে একটা ভালো গল্প দাড় করিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে মনে হতে পারে গল্পের বুনন হয়ত তথ্যের উপর দিয়েই চালিয়ে দেয়া হয়েছে তবে আমি বলবো তা ভুল। কেননা এই বইটির জন্য লেখককে ভিঞ্চি সম্পর্কে, তার কাজ সম্পর্কে বেশ গভীরভাবে জ্ঞান রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি চিত্রশিল্প নিয়েও পরিষ্কার ধারনা রয়েছে যা গল্পে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে (আমি অবগত আছি লেখক চারুকলায় পড়াশোনা করেছেন তবুও রিভিউ লেখার খাতিরে বলা)। সব মিলিয়ে একটি চমৎকার হিস্টোরিকাল থ্রিলার হিসেবে উপভোগ্য একটি বই বলতে পারি।
তবে এক্ষেত্রে "থ্রিলার" বই হিসেবে এটি নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া আমার চোখে পড়েছে, এটিকে ঠিক থ্রিলার কিংবা টানটান উত্তেজনাপূর্ন বই বলতে চান না। তবে অনেক তথ্যবহুল একটি বই পড়া সহজ কোনো কাজ নয়। এই বছর ভিঞ্চিকে নিয়ে পড়াশোনা করায় আমার তার জীবন এবং কাজ সম্পর্কে ধারনা ছিলো, বইটি পড়তে কষ্ট কম হয়েছে। তবে বেশ কিছু নতুন তথ্য গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গল্পের মধ্যে একটা স্পার্ক কাজ করেছে, লেখকের লেখনি এবং বর্ননা এবং কাল্পনিকতা সবসময়ের মত আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাংলা থ্রিলারে এরকম আর্ট জার্নির বই খুব কমই পাওয়া যাবে, এবং আমার কাছে এই থ্রিলার বিশেষ স্থান পাবে। যার শিল্প, চিত্রশিল্প কিংবা ভিঞ্চি নিয়ে আগ্রহ আছে তার কাছে সুখপাঠ্য হবে।
ড্যান ব্রাউনের "দ্য ভিঞ্চি কোড" পড়ার পর থেকেই লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আমার কাছে এক রহস্যময় চরিত্র।আর্ট, পেইন্টিং এর প্রতি আগে থেকেই একটা আগ্রহ ছিল , ভিঞ্চি কোড পড়ার পর আর্টের সাথে সাথে আর্টিস্টের জীবনাদর্শ, ভাবনা আর ইতিহাস নিয়েও জানার আগ্রহ জন্মায় ছিলো ভেতরে। এই আগ্রহ থেকেই অনেক নেগেটিভ রিভিউ দেখলেও নাজিমউদ্দিনের ভিঞ্চি ক্লাব বইটা পড়তে নিই।
যেহেতু থ্রিলার হিসেবে বইটা পড়িনি, তাই সেরকম প্রত্যাশাও ছিল না। প্রত্যাশা অনুযায়ী ভিঞ্চিকে নিয়ে জানার আগ্রহ অনেকটাই পূরণ করেছে বইটা। আর্ট, পেইন্টিং, লিওনার্দোর জীবনের নানা দিক—এসব নিয়ে লেখকের উপস্থাপন ছিলো বেশ আকর্ষণীয়।
তবে ভিঞ্চিকে নিয়ে অংশটুকু ভালো লাগলেও, বইয়ের অন্যান্য দিকগুলো আমাকে খুব একটা টানতে পারেনি। বিশেষ করে— ডক্টর জেড চরিত্রটাকে লেখক এতটাই আইডিয়াল আর সবজান্তা করে তুলেছেন যে সেটা আমার জন্য হিতে বিপরীত হয়ে গেছে, চরিত্র টাকে বাস্তব মনে করতে পারিনি। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো, লেখক হয়তো নিজের কল্পিত স্বরূপকেই চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন ডক্টর জেডের মধ্যে।
বইয়ে দুইটা টুইস্ট ছিল। প্রথমটা "হলি বেবিস" নামের একটা পেইন্টিং নিয়ে, আরেকটা লিওনার্দোর বিখ্যাত শিল্পকর্ম মোনালিসা কে নিয়ে। কিন্তু দুটো টুইস্টই আমি আগেই অনুমান করে ফেলেছিলাম তাই সেরকম কোন ধাক্কা খাইনি। চরিত্রায়ন আর সংলাপও আমার কাছে দুর্বল মনে হয়েছে। কোন চরিত্রই আমার মনে তেমন ছাপ ফেলেনি। কেমন যেন কৃত্রিম , সাজানো আর মেকি মেকি লেগেছে কথোপকথন গুলো।
আর যেটা বেশ বিরক্ত লেগেছে —বইতে বেশ কিছু ইতালিয়ান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু কোথাও তার ব্যাখ্যা বা ফুটনোট নেই। এখন যে ইতালিয়ান ভাষা একদমই জানেনা তার জন্য পড়ার সময় ডিকশনারি দেখা বা ফোন থেকে দেখে নেয়াটা বিরক্ত লাগা স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে বললে—বইটা একটা দারুণ থ্রিলার হতে পারত। প্রেক্ষাপটে থ্রিলারের উপাদান ভালই ছিল, কিন্তু চরিত্রায়ন, সংলাপ আর উপস্থাপন দুর্বল ছিল বলেই শেষমেশ থ্রিলার হিসেবে বইটা আমার কাছে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে, ভিঞ্চিকে নিয়ে লেখক যেসব তথ্য দিয়েছেন, যেভাবে তার শিল্পচিন্তার নানা দিক তুলে ধরেছেন—সেই অংশটা আমার ভালো লেগেছে। অল্পতেই একটা পরিষ্কার প্রাথমিক ধারণা পেয়েছি ভিঞ্চি সম্পর্কে, আর্টের অ্যাট্রিবিউশন সম্পর্কে —আর তাতে বইটা পড়ে অতটাও খারাপ লাগেনি।
বই: দা ভিঞ্চি ক্লাব লেখক: মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন প্রকাশনী: বাতিঘর মূল্য: ৫৫০ টাকা।
দা ভিঞ্চি ক্লাব নিয়ে বেশি কথা আগবো না। অল্প কথায় শেষ করবো। প্রথমে বইয়ের ভালো দিক বলি। বাতিঘরের প্রোডাকশন কোয়ালিটি আগের থেকে ভাল হয়েছে। সুতরাং, দা ভিঞ্চি ক্লাবেরটাও ভাল হয়েছে। এবং বানান ভুলের পরিমানও কমেছে। গ্রাহ্য সীমার ভেতরে এসেছে।
এর বাইরে বাকি সবটাই খারাপ লাগা। বইয়ের ট্যাগে কোথাও "থ্রিলার" লেখা নেই। তাই অযথা থ্রিলারের সাথে সেটার সামঞ্জস্যতা খুঁজতে গেলাম না। যদি কেউ আগ্রহী হন তাদের জন্যে বলা - ডিটেক্টিভ আছে বইয়ে, কিন্তু থ্রিলের কোটা শুন্য বা হয়তো খুবই নগন্য।
বইয়ের শুরুতে লেখকের কথায় লেখক ক্লিয়ার করেছেন যে, ড্যান ব্রাউনের"দ্য দা ভিঞ্চি কোডের" মতো কিছু না। ওয়েল; বলা আর আদতে সেটার সঠিক প্রতিফলন হল কিনা সেটায় থেকে যায় অনেক পার্থক্য। মোহাম্মদ নাজিম উ্দ্দিনের "দা ভিঞ্চি ক্লাব" বইয়ে ব্রাউনিয়ান সিনড্রোমের কথা আছে। লেখক নিজেই সেটায় যে আক্রান্ত সেটা এবং সেটা এডভান্স স্টেজে, তা এই বইটার বেলা সত্যি। লিওনার্দো যেমন তার শিষ্যদের দিয়েও নানা আর্টের কাজ করাত, বা লিওনার্দোর আঁকা ছবির কপি কর নিতো তার শিষ্যরা - এখানে ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই লেগেছে। লেখা কপি না, স্টাইল বা থিম। লেখক কখনই ভিঞ্চি কোড বলুন আর ড্যান ব্রাউন বলুন - কোনটার ছায়া থেকেই বের হতে পারেনি সামান্য সময়ের জন্যে এই বইয়ের ক্ষেত্রে।
তার উপর প্যারার পরে প্যারা ইনফরমেশন ড্যাম্পিং একধরনের একাডেমিক আবহ এনে দিয়েছে পুরো লেখায়। সাথে অসংখ্য ছবি যেগুলোর অধিকাংশের প্রয়োজন ছিল না। শুধু শুধু অযাচিত ছবিগুলো এড করে বইয়ের পৃষ্ঠারও যেমন বৃদ্ধি, তেমনি বিরক্তির পারদটুকুতে আরও উষ্ণতা দেয়া। পুরো ব্যাপারটাই আসলে দাঁড়িয়ে গেছে এক ধরনের গিমিক (gimmick) বা লোক দেখানো ব্যাপার।
আমার জন্যে টাকা ও সময় দুটোই ওয়েস্ট। যদিও এর দায়ভার আমার। পড়ে দেখার সিদ্ধান্ত আমার ছিল। তবে, আমি কাউকে রিকমেন্ড করছি না।
লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। কিছু সৃষ্টি এমন হয়, যা স্রষ্টার চেয়েও বড় হয়ে ধরা দেয় মানজাতির কাছে। ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা যেন তেমন ই এক কাজ। পৃথিবীর যত মানুষ মোনালিসা পেইন্টিংয়ের কথা জানে, তার কিয়দংশই চিনে ভিঞ্চিকে। ���িক যেন শার্���ক হোমস-আর্থার কেনন ডায়াল কমপ্লেক্স। আর যারা চিনে ভিঞ্চি সাহেবকে, তারা জানেন, মোনালিসার চেয়েও কতো বেশী গুরুত্বপূর্ণ তিনি।
হুট করেই একজন দাবী করে বসলেন তার কাছে ভিঞ্চি সাহেবের এক পেইন্টিং আছে। প্রায় হাজার বছর পুরাতন পেইন্টিং। কিন্তু প্রমাণ? ছবিটা যে আসলেই ভিঞ্চি সাহেবের এটা প্রমাণের জন্য সে ব্যক্তি উঠেপড়েই লাগবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ ভিঞ্চির আঁকা প্রমাণ হলেই ছবির দাম বেড়ে হবে কয়েক হাজার গুণ।
আর এইযে প্রমাণ করার কঠিন কাজ, একেই বলা হয় অ্যাট্রিবিউশন। সেই অ্যাট্রিবিউশনের জের ধরেই ডক্টর জেডকে পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। সেই পথে ডক্টর জেড জানবেন অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছু। সাক্ষ্মী হবেন নতুন পরিস্থিতির। আবিষ্কার করবেন হাজার বছর পুরাতন পাগলের পাগলামীকে। এতে করেই, নিজের প্রিয় ভিঞ্চি সাহেব আর তাকে নিয়ে গড়ে ওঠা ভিঞ্চি ক্লাবের ওজন বাড়বে হয়তো আরো কয়েকগুণ।
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ক্রাইম থ্রিলারের বাহিরে এসে, নিজেকে ভেঙেচুরে, আর্ট নিয়ে এতো চমৎকার এক গবেষণাধর্মী থ্রিলার লিখে ফেলবেন, ভাবতেও পারিনি আমি। সময়ের সাথে যেন আরো বেশী পরিণত হচ্ছেন তিনি। আরো বেশী জ্ঞান সংরক্ষণ ও সরবরাহ করে আমাদের করছেন মুগ্ধ।
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন। আমাদেরকে আরো চমৎকার সব বই উপহার দেন।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: এর আগে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের যতগুলো বই পড়েছি, তার মধ্যে এই বইটাকে প্রচলিত নিয়মের চেয়ে অন্যরকম মনে হয়েছে। থ্রিলার মানে একশন থাকবে;মারমার, কাটকাট পরিস্থিতির মধ্যে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে চলে। এই কম রোমাঞ্চ ছিলো না। তবে প্রথাগত নিয়মে বাইরের কিছুটা একটা। নাজিম উদ্দিনের অন্য বইগুলো মতো এটাতেও একশন আর টুইস্ট খুব একটা কমতি ছিলো না। তবে ওই যে বললাম অন্যরকম একটা অনুভূতি অনুভব হয়েছে।
বইটার বিষয়বস্তু যেহেতু দা ভিঞ্চি, তার চিত্রকর্মকে ঘিরে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে, এসব সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান থাকার কারণে প্রথমদিকে কাহিনীর ভিতরে নিজেকে খুঁজে পেতে একটু সময় ব্যয় করতে হয়েছে। তবে যখন পুরোপুরি কাহিনীর ভিতরে প্রবেশ করে গেলাম তখন বই শেষ না করে উঠতে পারি।
প্রথমেই বলেছি বইটা পড়ার সময় অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করেছে। চিত্রকলার একশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে এমনটা হতে পারে। ভিঞ্চি সম্পর্কে, তার চিত্রকর্ম, তার জীবণযাত্রা সম্পর্কে চমকদার বেশকিছু তথ্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে। যা আমার কাছে এক কথার অসাধারণ গেছে। আমরা চোখের সামনে যা দেখি তা সম্পূর্ণ অন্যরকম কিছুও যে হতে পারে এই বই না পড়লে হয়তো জানতে পারতাম না।
"দা ভিঞ্চি ক্লাব" উপন্যাসটি মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, মূলত এর ব্যতিক্রমী প্লটের কারণে। এটি আর্ট ডিটেকটিভ থ্রিলার, যেখানে চিত্রশিল্পের নকল ও প্রতারণা নিয়ে বিস্তর আলোচনা রয়েছে। লেখক সাবলীল ভাষায় আর্ট যাচাই-বাছাইয়ের জটিল প্রক্রিয়া, চিত্রশিল্পীদের স্বকীয়তা এবং রেনেসাঁ যুগের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন।
ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় গল্পের আবহ তৈরি করা হয়েছে, যা পাঠককে এক ধরনের ভ্রমণের অনুভূতি দেয়। উপন্যাসে প্রচুর ছবি ব্যবহারের ফলে তদন্ত প্রক্রিয়াটি আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে। সংলাপে ইতালিয়ান শব্দ ব্যবহারের ফলে গল্পের মৌলিকতা বেড়েছে, যদিও শুরুতে কিছু শব্দ বুঝতে সমস্যা হতে পারে।
উপন্যাসটি থ্রিলারের সাধারণ কাঠামোর বাইরে গিয়ে আর্ট ও ইতিহাসের প্রতি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। লেখকের সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাও উঠে এসেছে। শেষাংশটি ওপেন এন্ডেড, যা সম্ভবত একটি সিরিজের ইঙ্গিত দেয়।
সব মিলিয়ে, এটি একটি ব্যতিক্রমী থ্রিলার, যা ইংরেজি অনুবাদ হলে আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছেও প্রশংসিত হতে পারে।
A well furnished book on Da Vinci. There are lots of informations, readers may get baffled or face problem to distinguish between pure fact and imagination of the writer, writer could have drawn a boundary regarding this in the preface. But over all an informative work, proves that the writer has gone through a hell lot of study and research before writing it, and it's been well paid off I suppose. Moreover the way writer has blended the fact and personal storyline in the book , it deserves a raise. Overall a good book to enrich knowledge on Vinci at the same time a good literary work.
টিপিকাল নাজিম উদ্দিনের থ্রিলার না, এই বইটা একটু আলাদা। আর্ট, বিশেষ করে ইতালিয়ান রেনেসাঁ যুগ নিয়ে আগ্রহ না থাকলে অনেকের কাছেই বেশ বিরক্তিকর লাগতে পারে। তবে আমার কাছে বইটা পড়তে পড়তে ছোটবেলার Assassin’s Creed 2 খেলার সময়টায় ফিরে যাওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছিল। সেই নস্টালজিক ভাইবের জন্যই হয়তো একটু বায়াসড রেটিং।
তবে ডক্টর জেডকে প্রায় সুপারহিউম্যান লেভেলের ক্ষমতা দেওয়ার পর সেগুলো পরবর্তীতে কোনও কাজে না লাগানোটা কিছুটা হতাশাজনক। এগুলো না থাকলেও গল্পের ফ্লো / আউটকামের কোনও পরিবর্তন আসত না মনে হয়। আর বাংলা হরফে লেখা ইতালিয়ান সংলাপ পড়তে কিছুটা খাপছাড়া।
এই বইটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দুইজন কে কেন্দ্র করে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আর রহস্যময় বাঙালি ব্যক্তিত্ব ডক্টর জেড! বইটি মূলত লিওনার্দো দা ভিঞ্চি কে নিয়েই।কাহিনী ঢাকায় শুরু হলেও বড় অংশ জুড়ে আছে ইতালি ও ইউরোপ। পুরো বই জুড়ে পেইন্টিং নিয়ে অনেক বিশদ আলোচনা করেছেন লেখক, তবে ইতালিয়ান শব্দ যেগুলো ব্যবহার করেছেন বাংলা অর্থ না থাকায় বিরক্ত লেগেছে অনেক সময়। চিত্রকলা জগতের অনেক কিছু বেশ সাবলীল ভাবেই উঠে এসেছে থ্রিলার।সম্রাট মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের কলমের। "আনপুটডাউনেবল" বই না এটি তবে উপভোগ্য।
ভেবেছিলাম 'মার মার কাট কাট' টাইপের কোনো থ্রিলার। সেরকম কোনো কিছুনা। যদিও পড়তে বোরিং লাগেনি। তবে অহেতুক ফ্রেঞ্চ ভাষার কিছু শব্দ বার বার ব্যবহার করার কারনে কিছুটা বিরক্তি এসেছে। অনেক নতুন তথ্য জানলাম 'লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি' সম্পর্কে। ৩.৫/৫ স্টার।