কিছু বছর ধরে সায়েন্স ফিকশন বিষয়ক লেখালেখি পড়ছি। মৌলিক ও বিদেশি ভাষায় অনুবাদ সব ধরনের লেখার সাথে কম বেশি পরিচিত হয়েছি।ভালোই লাগছে।সম্প্রতি বিদেশি উপন্যাস 'Rain Born' এর বাংলা অনুবাদ 'বৃষ্টিজাতক' পড়লাম। এটি একটি ডিস্টোপিয়ান সায়েন্স ফিকশন।
চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয় অতিবৃষ্টির পর সমগ্র পৃথিবীর মানচিত্র বদলে গেছে। মানুষ এখন কিছু দ্বীপে সমুদ্রে ও জাহাজেই জীবন কাটায়।জীবন- যাপন, ব্যবসা বাণিজ্য , আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে জল অথবা সমুদ্রের ভূমিকাই যেন প্রধান। বহু বছর ধরে জলের সাথে সরাসরি জীবন জীবিকার সম্পর্কে থাকার ফলে অনেক মানুষের শারীরিক গঠনে এসেছে জিনগত অভিযোজন। খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন ।
এই নতুন পৃথিবীতে ধর্ম ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানেও বদল হয়েছে ।এই নতুন ধর্মের নাম পরিত্রাতা। এর মধ্যে রয়েছে প্রধান, শিষ্য ইত্যাদি নানাবিধ পদাধিকারী যাদের মাধ্যমে জীবন ধারনের রীতিনীতি ,বানিজ্য, নানারকম প্রথা, নিয়ম ,পাপের প্রায়শ্চিত্ত, শাস্তি ও বিধিনিষেধ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নির্ধারণ করা হয়। ধীরে ধীরে এদের মধ্যে একটা বড়ো অংশ নিজেদের মুনাফার জন্য সমগ্ৰ সমাজ ব্যবস্থা ও শাষন ব্যবস্থাকে ধর্মের নানা রকম নিয়মের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রন করতে চায়। তৈরী হয় ষড়যন্ত্রের চিত্রনাট্য। তবু এর মধ্যেও হার্মাজ, টাইরাড, ডালিয়া, লিলি, নারিভানের মতো কিছু এমন মানুষ থাকে যারা ক্ষমতা সীমিত হলেও এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সমুদ্রে বিভিন্ন দ্বীপ ও জাহাজের মধ্যে অনৈতিক কার্যকলাপ ও দুর্নীতি বন্ধ করতে চায়। এই পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম এই উপন্যাসের মূল ভিত্তি বলা যেতে পারে।
যদি এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় পৃথিবীতে হয় তাহলে কি ধরনের ভয়ংকর পরিস্থিতি হতে পারে ও কিভাবে মানুষ ও অন্যান্য জীব সেই প্রতিকূলতা ধীরে ধীরে কাটিয়ে একটি নতুন ইকোসিস্টেম তৈরী করে তার একটি পরিষ্কার ও বাস্তবসম্মত চিত্রের বর্ননা এই উপন্যাসে রয়েছে।পাশাপাশি ভালোবাসা, মানবিকতা, প্রতিহিংসা , ক্ষোভ, হিংসা এই আবেগ ও অনুভূতিগুলি বিভিন্ন চরিত্রগুলির মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিপর্যয় পরবর্তী প্রচলিত ধর্ম সংক্রান্ত বিশ্বাস , অন্ধবিশ্বাস ও মিথ অবশেষে নানা রকম ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে প্রকৃত সত্য ও জ্ঞানের সন্ধান উপন্যাসের এই অংশগুলি চিন্তা উদ্রেককারী বলে মনে হয়েছে। তবে লিলির পরিনতির জন্য খুব খারাপ লাগে।
উপন্যাসের কনসেপ্ট আমার বেশ ইন্টেরেষ্টিং মনে হয়েছে যা আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক।পরিবেশ দূষন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাব কি ভয়ংকর হতে পারে এই উপন্যাসের মাধ্যমে বোঝা যায়।
অনুবাদ সম্পর্কে আলাদা করে বলতেই হয়। ঝরঝরে ও গতিময় লেখা, একঘেয়ে বা কঠিন বলে মনে হয়নি। সহজ ও সাবলীল ভাবেই উপন্যাস এগিয়েছে। সামুদ্রিক জীবনের রোমাঞ্চকর সফরের বর্ননা বেশ ভালো লেগেছে।
উপন্যাসের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, নতুন প্রবর্তিত ধর্ম, দ্বীপ ও জাহাজের একটি তালিকা ও ম্যাপ দেওয়া রয়েছে যাতে পাঠকদের প্রথম থেকেই রিলেট করতে সুবিধা হয়। এটা খুব ভালো লেগেছে আমার। বিদেশি লেখা থেকে অনুবাদের ক্ষেত্রে এটা জরুরী । প্রচ্ছদ ও কভার থিম অনুযায়ী যথাযথ ও অভিনব। প্রতিটি অধ্যায়ে শুরুতে ছোট ছোট হেডপিস রয়েছে তবে কিছু পেজে অলংকরণ থাকলে ভালো হতো। যারা ডিসোটোপিয়ান ক্যাটাগরির সায়েন্স ফিকশন ভালো বাংলা অনুবাদ পড়তে চান তারা অবশ্যই পড়ুন 'বৃষ্টিজাতক'। নিঃসন্দেহে ভালো একটি কাজ।
ইরানের বিখ্যাত লেখিকা জোহা কাজেমির একটি ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস বাংলায় অনুবাদ করেছেন অনুষ্টুপ শেঠ । আমি খুব বেশি অনুবাদ পড়তে ভালো বাসিনা কিন্তু ইরানি সাহিত্য আমার খুব বেশি পড়া নেই, তাই এই বইটি সংগ্রহ করেছিলাম গত বছর। এটি Rain Born উপন্যাসের অনুবাদ।
এখানে লেখিকা এক ভবিষ্যতের পৃথিবীর চিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে পৃথিবীর জলস্তর অনেক ওপরে উঠে এসেছে। তাই প্রায় সব সমতল ভূমি চলে গ্যাছে জলের তলায়। শুধু অল্প কিছু পাহাড় জেগে আছে জলের ওপর। অনেক মৃত্যুর পর মানুষ এখন অধিকাংশ জাহাজে বাস করে, মাছ ধরা আর পুরনো ডুবে যাওয়া সভ্যতার মাল পত্র তুলে আনা এখন তাদের মূল পেশা। সেই জগতে ইরানের এক কোণে শুরু হয়েছে নতুন ধর্ম গোষ্ঠী, তাদের আপাত সদয় ব্যবহার ও কঠিন অনুশাসনের মধ্যে বাসা বেঁধেছে অপার দুর্নীতি। গল্পের নায়ক দূর্বলচিত্ত, এই ধর্ম মণ্ডলীর বাকিদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় ও শেষে ফিরে এসে প্রতিশোধ নিতে সক্ষম হয়। মাঝে ঘটে আরও জটিল ও ভয়ঙ্কর ঘটনামালা যা জানতে গেলে এই উপন্যাসটি পড়তে হবে।
গোটা উপন্যাসটি ঘটনার ঘনঘটায় ভরা। প্রতি পরিচ্ছেদে পাঠককে উৎকণ্ঠিত করে রাখে শেষে কি হবে জানার আকাঙ্ক্ষায়। প্রতিশোধ নেবার জায়গা টায় ষড়যন্ত্র কারীরা খুব সহজেই একবারে কুপোকাত হওয়া আমায় একটু হতাশ করেছে। বাকি জায়গা লেখনী টানটান।
আমার মনে হয়েছে বর্তমান বিস্তার কারি কিছু ধর্মের প্রচারকদের আচরণকে এখানে রূপকের মাধ্যমে সফল ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই যারা ডিস্টপিয়ান কল্পবিজ্ঞান বাংলায় পড়তে চান তাদের কাছে এটি অবশ্য পাঠ্য।