এসআই জামাল সাহেব তাঁর ছেলে রাজুকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। দেশে হঠাৎ করে যা সব শুরু হয়েছে, তাতে রাজুকে বাইরে একা ছাড়ার সাহস তাঁর হচ্ছে না। কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে হঠাৎ করেই সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। লাখ লাখ তরুণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে রাজুও যোগ দিয়েছে সেই আন্দোলনে।
উত্তাল হয়ে উঠেছে সারা দেশ। জুলাই, ২০২৪-এর মধ্যভাগ। কুতুবখালি মাদ্রাসার ছাত্ররাও যোগ দিলো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চলমান সেই আন্দোলনে। এই মাদ্রাসার এক দরিদ্র ছাত্র জহির। আন্দোলনে যোগ না দিয়েও জহির যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। কিভাবে? মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হুজুর তাঁর এই নিখোঁজ ছাত্রের খোঁজ বের করতে গিয়ে নিজেও পড়ে গেলেন আরেক বিপদে।
কোথা থেকে যেন হেলমেট পরা একদল লোক এসে বেধড়ক মারতে শুরু করলো অর্ণবকে। প্রায় আধমরা অবস্থায় ওর স্থান হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে। কিন্তু সেখানেও চলছে দক্ষযজ্ঞ। সরকারি পেটোয়া বাহিনী সেখানে ভর্তি আহত ছাত্র-ছাত্রীদের পেটাচ্ছে নির্বিচারে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালের ওই চৌহদ্দিতে অর্ণব এমন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলো, যা জীবন সম্পর্কে ওর পুরো দৃষ্টিভঙ্গিটাই পাল্টে দিলো।
ডিবি প্রধান হাসান রশিদ তার কার্যালয়ে খুলে বসেছে ভাতের হোটেল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ধরে-বেঁধে এনে মিডিয়ার সামনে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ওদিকে অজ্ঞাত বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। পরবর্তীতে সেই অজ্ঞাত বন্দিশালাগুলোকে মানুষ ডেকেছে আয়নাঘর নামে। সেই আয়নাঘরেও ডিবি প্রধান রশিদ মাঝে মাঝে যায়। নির্যাতন করে বন্দিদের।
"শেখ হাসিনা পালায় না" বলার ঠিক দশ দিনের মাথায় পালানোর সমস্ত যোগাড়যন্ত্র হয়ে গেলো স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। হাজার হাজার লাশ পড়ছে। রক্তে ভিজে থাকা রাজপথ শুকানোর ফুরসত পাচ্ছে না। কিন্তু তাঁর মন খারাপ। স্বজন হারানোর বেদনা তিনি বোঝেন। এটা যে কেন এই দেশের সাধারণ মানুষ বোঝে না, সেটা নিয়ে শেখ হাসিনা খুবই হতাশ। চৌদ্দটা বিশেষ সুটকেস নিয়ে তিনি রেডি হয়ে আছেন। সুটকেসগুলো ঠিকমতো প্লেনে উঠবে তো?
ওপরে যা যা পড়লেন, সবই আপনাদের জানা। জুলাই বিপ্লবের সেই অস্থির সময়ের ক্ষতের দাগটা এতো সহজে আমাদের ভেতর থেকে হালকা হবে না। এই চেনাজানা গল্পগুলোই আবার নতুন করে আমাদেরকে শোনালেন লেখক আশীফ এন্তাজ রবি তাঁর 'ট্রেন টু ঢাকা' উপন্যাসে।
কাহিনির শুরুতে আশীফ এন্তাজ রবি একটা রেলস্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন মানুষের কথা অবতারণা করেছেন। এই মানুষগুলোর সাথে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে যা যা ঘটেছিলো, মূলত তাই এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। বইটা পড়ার সময় মনে হয়েছে, সেই অস্থির সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যেন আবার দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। কিন্তু এবার একটু বেশি কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছি। জুলাই আন্দোলনের সময় নিজের ভেতরে যে ক্রোধ অনুভূত হয়েছিলো, 'ট্রেন টু ঢাকা' পড়ার সময় সেটা আবারও টের পেয়েছি নিজের ভেতরে।
কিছু বই আছে যেগুলো নিঃসন্দেহে চমৎকার, কিন্তু দ্বিতীয়বার পড়ার সাহস হয় না। 'ট্রেন টু ঢাকা' আমার কাছে সেরকমই একটা বই। এটাকে জুলাই আন্দোলনের ছোটখাটো একটা প্রামাণ্য দলিল বললেও ভুল বলা হবে না আমার মতে। আশীফ এন্তাজ রবি তাঁর এই উপন্যাসের কিছু চরিত্রের নাম পরিবর্তন করেছেন, আবার কিছু চরিত্রের নাম অবিকৃতই রেখেছেন। তাঁর গল্প বলার ধরণ অনেকটা হুমায়ূন আহমেদের মতো। পড়তে গিয়ে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি।
"ফ্যাসিস্ট গেছে, কিন্তু সিস্টেম আগের মতোই রয়ে গেছে। এই সিস্টেম না বদলালে আবারও ফ্যাসিস্ট পয়দা হবে।"
লেখকের এই কথার সাথে কোন দ্বিমত নেই। সব মিলিয়ে 'ট্রেন টু ঢাকা' একটা চমৎকার হৃদয়স্পর্শী উপন্যাস। বইয়ের কয়েক জায়গায় এসআই জামালকে জব্বার লেখা আর ছোটখাটো কিছু টাইপিং মিসটেক ছাড়া তেমন কোন ভুলভ্রান্তি চোখে পড়েনি। সব্যসাচী মিস্ত্রির করা প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বইটার প্রোডাকশন ও কাগজের মান নিয়েও আমি সন্তুষ্ট।
আশীফ এন্তাজ রবি- নামটার সাথে আমার ছোটবেলার অনেক স্মৃতি জড়িত। সেই মেন্টস বাত্তি জ্বালাও এ উনার এবং রাজীব হাসানের কথা শোনার জন্য রাত জেগে থাকতাম; অবশ্যই লুকিয়ে কারণ বাসায় কেউ দেখলে ফোন আর নিজের হাতে থাকতো না। তখন এবিসির ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোডও করা যেত একেকটা পর্ব। আমার মনে আছে আমি অঙ্ক করতে করতে একই পর্ব বারবার শুনতে থাকতাম। ফেইসবুক একাউন্ট না থাকায় গুগল করে উনার একাউন্ট বের করে উনার লেখা পড়তাম। যখন জানলাম উনি বই লেখেন, আব্বুর কাছে ঘ্যানঘ্যান করে রকমারি থেকে উনার বই কিনেছিলাম, বইয়ের নাম "আমার আছে ফেসবুক।" তারপর একে একে উনার সব বই পড়েছি। আশীফ এন্তাজ রবির কথা এবং লেখা, আমি উভয়েরই ভক্ত। যখন জানলাম এই বইমেলায় "ট্রেন টু ঢাকা" আসছে, আমি প্রি অর্ডার করি। আমি জানতাম এই বই আমাকে হতাশ করবে না এবং করে নি। লেখক এখন আমেরিকায় থাকেন। কিন্তু তাও, উনার লেখা পড়ে মনে হচ্ছিলো উনি দেশে থেকেই সমস্ত জুলাই-আগস্ট মাস দেখেছেন। দুইটা বিষয় সবথেকে ইন্টারেস্টিং, এক, এপ্রোপ্রিয়েট সেন্স অফ হিউমারের ব্যবহার এবং, দুই, গল্পটা একপাক্ষিক না; যেভাবে সাধারণ মানুষ অসহায় ছিলেন, সেভাবে পুলিশও যে ছিলেন, এটা লেখক খুব ভালোভাবে দেখাতে পেরেছেন। গল্পের নন-লিনিয়ার স্ট্রাকচার একটা কি হয় কি হয় ব্যাপার এনে দিয়েছে। পরিশেষে, শেষটা একদম যেন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, একটা নিহিলিস্টিক বার্তা দিতে থাকে, যে সামনে এই দেশের কি হবে, আমরা কেউ জানিনা। আমার জন্য রেটিং ৫/৫। বইমেলা থেকে এই বইটা অবশ্যই কেনা উচিত।
জুলাইয়ের উপর লেখা উপন্যাস। তাই প্রতিটি প্লট, প্রতিটি রেফারেন্স খুবই তাজা, খুবই আপন। গল্প জুলাইয়ের বিভিন্ন অংশকে তুলে ধরে, কিন্তু হয়ত আরো বিস্তার লাভের সুযোগ ছিল। সারফেইস লেভেল দিয়েই লেখক হেটেছেন, খুব বেশি গভীরে যান নি। তবে পরিশেষে পড়ার জন্য খারাপ না। এক টানে সুন্দর করে পড়ে ফেলা যায়!
আশা করছি, এই প্লটের উপর এমন লেখা যেটা প্রতিটি অবস্থা, মানুষের প্রতিটি আবেগকে তুলে আনার চেষ্টা করবে, গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করবে৷
কয়েক বছর আগে প���রায় দুর্ঘটনাবশত নীলক্ষেত থেকে কেনা খুশবন্ত সিংয়ের লেখা “ট্রেন টু পাকিস্তান” ছিলো খুব সম্ভবত আমার পড়া প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পটভূমিতে রচিত উপন্যাসটা কলেবরে ছোট হলেও চরিত্রায়ন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের বিচারে নিঃসন্দেহে তুলনাহীন৷
আমার মতে একজন লেখকের অনেক বড় কৃতিত্ব হলো কম শব্দে অনেক গল্প বলতে পারা। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত “ট্রেন টু ঢাকা” উপন্যাসের লেখক আশীফ এন্তাজ রবিকেও এই কৃতিত্বটা দিতে হচ্ছে।
বিখ্যাত “ট্রেন টু পাকিস্তান” এর মতো “ট্রেন টু ঢাকা”ও ঐতিহাসিক/ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাস আর নাম ও ঐতিহাসিক গুরুত্বে রয়েছে মিল। গত বছরের Monsoon Revolution এর পটভূমিতে রচিত ছোট অথচ শক্তিশালী এই উপন্যাসটিতে দেখানো হয়েছে একদল ট্রেনযাত্রীকে যাদের জীবন আমূল পরিবর্তন করে দেয় '২৪ এর জুলাই-আগস্ট।
একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলাম, এবারের বইমেলায় জুলাই বিপ্লব নিয়ে বেরিয়েছে ৭০ টির মতো বই। সব সংগ্রহ করার মতো সময়, সামর্থ্য বা আগ্রহ কোনোটিই আসলে নেই। তবে সার্বিক পছন্দের তালিকায় উপরের দিকে থাকায় “ট্রেন টু ঢাকা” দিয়ে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
উপন্যাসটিকে ৩৬ দিনের যুগান্তকারী আন্দোলনের প্রামাণ্যচিত্র বললে বোধহয় খুব একটা ভুল হবে না। বিপ্লবের খুঁটিনাটি থেকে শুরু করে গত দেড় দশকের দুর্নীতি-অনিয়মকে সুদক্ষভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক।
ছোট উপন্যাসের মধ্যেও অনেকগুলো hard-hitting quote পেয়েছি। যেমন, আয়নাঘরে interrogation এর সময় উপন্যাসের এক চরিত্র বলেছে, “জীবিত মানুষের চেয়ে লাশের শক্তি অনেক বেশি৷ এখন আমাদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে সাঈদ। সে কিন্তু জীবিত নেতা না। একটা লাশ। লাশের নেতৃত্ব ভয়াবহ স্যার”।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস-আশ্রিত উপন্যাসের সংখ্যা কত, তা আমার জানা নেই। অজ্ঞতার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। তবে যতটুকু জানি না বুঝি, তাতে মনে হয় হুমায়ুন আহমেদের “দেয়াল” ও “জোছনা ও জননীর গল্প” উপরের দিকেই থাকার কথা৷
বেশ আগে ফেসবুকে আশীফ এন্তাজ রবির একটা লেখা পড়েছিলাম যেখানে তিনি লিখেছিলেন কীভাবে হুমায়ুন আহমেদের তুমুল জনপ্রিয়তা তার এবং অন্য লেখকদের “ভাত মেরে দিয়েছিলো”। রবি লিখেছিলেন, তার জীবনের লক্ষ্যই ছিলো হুমায়ুন আহমেদ হওয়া। কোনো ধরনের তুলনায় যাচ্ছি না, কিন্তু “ট্রেন টু ঢাকা” পড়ার সময় সত্যি সত্যি মনে হয়েছে হুমায়ুন জুলাই আন্দোলনের সময় বেঁচে থাকলে ঠিক এভাবেই লিখতেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আমি যতগুলো বই এখন পর্যন্ত পড়েছি, তার মধ্যে ‘ট্রেন টু ঢাকা’ নিঃসন্দেহে সবচেয়ে ভালো। লেখক আশীফ এন্তাজ রবি আমার পছন্দের একজন লেখক, এবং তাঁর লেখনীতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সুনিপুণ বর্ণনা দেখে আশ্চর্য হইনি।
বইটিতে হাসিনা সরকারের পতনের শুরু থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে মাদ্রাসার ছাত্রদের আন্দোলন, ডিবি হারুনের ভূমিকা, এফপির সাংবাদিক শফিক ভাইসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এবং ঘটনা নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে। লেখার ভঙ্গি টানটান এবং ঘটনাগুলো বাস্তবতার ছাপ রেখে চলে, যা পাঠককে একটানে বইটির সঙ্গে যুক্ত করে রাখে।
তবে যেহেতু বইটি 'মেলাতে' প্রকাশিত, তাই কিছু বানান ও তথ্যগত ভুল রয়ে গেছে। বিশেষ করে একটি তথ্য আমার দৃষ্টিতে ভুল লেগেছে—আবু সাঈদকে প্রথম শহীদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আমার যতটুকু মনে পড়ে, সঠিক নয়। আশা করবো, লেখক ভবিষ্যৎ সংস্করণে এই ধরনের ভুলগুলো সংশোধন করবেন।
সামগ্রিকভাবে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সাক্ষ্য বহনকারী চমৎকার বই, এবং যারা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে জানতে চান, তাঁদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
রবি ভাই ঠিক যেমন বলেছেন জুলাই আগস্টের গল্প যেনো মায়ের কাছে মামাবাড়ির গল্প। কিন্তু তারপর ও সব গল্প কি আমরা জানি? ট্রেন টু ঢাকা আমাদের গল্প, অস্তিত্বের গল্প আমাদের ঐক্যের গল্প। ট্রেন টু ঢাকা আগামী দিনের জন্য ইতিহাসে এক অন্যতম চিহ্ন হয়ে থাকবে।
আমরা যারা জুলাই আগস্টের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ যোদ্ধা তাদের অবদানের কিছু কথা তুলে ধরেছেন লেখক আশীফ এন্তাজ রবি। তার এই প্রচেষ্টার জন্য তাকে অসং্খ্য অভিবাদন ও ভালোবাসা।
নিজের গল্পের সাথে সবার গল্প জানতে আজই কিনে ফেলুন "ট্রেন টু ঢাকা"
আসিফ ভাইয়ের বই এর আমি বরাবরই ফ্যান। এই বই এর পটভূমি আমাদের সকলেরই আবেগের জায়গাটি আবার নাড়া দিয়েছে - গল্পের ছলে আসল জুলাই অভ্যূত্থান। আসিফ ভাই বইটি আরও হাতে সময় নিয়ে লিখলে আরো ভাল লাগত। বইটা আরো বিস্তৃত হওয়া দরকার ছিল।