বৃষ্টিটা নেমেছিল ফেরার সময়। ওরা কুঁড়ে ছেড়ে আধ মাতাল অবস্থায় হেঁটেছিল আরো খানিক। ফেরার সময় বৃষ্টি নামল ঝিরঝির করে। তার মধ্যেই হেঁটে এসেছিল রাস্তা অবধি। দাঁড়িয়েছিল বন্ধ চায়ের দোকানের সামনে। সুমনার মনে হয়েছিল সময় ধীর হয়ে গেছে। ততক্ষণে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে কিন্তু ওর মনে হচ্ছিল বৃষ্টি পড়ছে ধীর লয়ে। যেমন ধীর লয়ে রাজীবের অ্যাডামস অ্যাপল হয়ে নামছিল একফোঁটা ঘাম কিংবা বৃষ্টির জল। তারপর দুজনের ঠোঁট একত্র হয়েছিল অনিবার্যভাবে। কিন্তু সুমনা চোখ বোজেনি। সে চোখ ভরে দেখছিল চারপাশটা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কেমন করে পাতায় টপ করে পড়ছে, চায়ের দোকানের খড় চুইয়ে নামছে জল, সব সে দেখেছিল খুব মন দিয়ে। রাজীবের গালের এক পাশে কিছু জায়গায় দাঁড়ি কম হয়। বড় থাকলে বোঝা যায় না। শেভ করা অবস্থায়ও বোঝার কথা না। কিন্তু আধো অন্ধকারে সেখানেই হাত বোলায় সুমনা। ঘাড়ের কাছে একটা পুরনো আঘাতের চিহ্ন আছে। কেমন করে হয়েছিল, বলে না রাজীব। দ্বিতীয় চুমু খেতে গিয়ে সেখানেও হাত বুলিয়ে দেয় সুমনা। বৃষ্টির ছাঁট আসছে তখন একটু একটু। ফেরার সময় রাজীব কথা বলেনি। বলেছিল সুমনা। ঠিক স্কুল ছাড়ার পরপর প্রেমে পড়া কিশোরী মেয়েটার মতো কলকল করে কথা বলেছিল সে। রাজীব হাসিমুখে শুনেছিল তার কথা। মনে হচ্ছিল বলা আর শোনা শেষ হবে না। অটোরিকশার বাইরে তখনো ঝরছিল বৃষ্টি।
খুব স্বাভাবিক একটা দৃশ্য দিয়ে গল্পের শুরু টা হয়। সুমনা অপেক্ষা করছে তার বান্ধবী'র জন্য। বৃষ্টি কারণে তাদের দেখা হতে বিলম্ব হয়। বৃষ্টি তে আটকে পড়া সুমনার মনে পড়ে বিভিন্ন কথা,ঘটনা। শুরু টা এমনই।
সুমনা থাকে সিলেটে যেখানে বৃষ্টি পরিচিত মানুষের মত,ক্ষণে ক্ষণে মিলে দেখা। অন্যদিকে জারিফ থাকে ঢাকায়। বৃষ্টি আর জারিফের সম্পর্ক অদ্ভুত রকমের। জারিফ থাকলে বৃষ্টি আসে না। ফলে জারিফের দেখা হয় না বৃষ্টি। অথচ সে হণ্যে হয়ে ঘুরে বৃষ্টির আশায়।
কেমন অদ্ভুত শোনাচ্ছে না কথাগুলো? গল্পটা আসলেই অদ্ভুত। ভীষণ অন্য রকম। প্রেমের গল্পের নামে কাতুকুতু মার্কা গল্পের বাজারে,❝ অবিরাম বৃষ্টির শহরে ❞ এর মত ভালো বই গুলো হারিয়ে যায়। অথচ দরকার এই গল্পগুলোই।
প্রেম আসলে আসে আত্মার আনন্দ। অসুখী এই শহরে আমরা অমৃতসম আনন্দময় প্রেমের দেখা ক'জন পাই? ক'জন পাই সে মানুষটাকে,যে আসলে পুরো জীবনটা হতে পারত বৃষ্টির মত স্নিগ্ধ, শিশির মাখা শিউলির মত পবিত্র। আমরা অনেকে পাই,যে প্রেম আমরা খুঁজে চলেছি। কিন্তু অনেকেই আবার পাই না। যারা আনন্দসম এই প্রেমের দেখা পায় না,তারা সারাটা জীবন ভর শুধু খুঁজে চলে প্রেমের তরী..
❝রঙমিলান্তি❞ পড়ার দীর্ঘ দিন পর মাহমুদুর রহমানের লেখা আবার পড়লাম। দারুণ লেগেছে। লেখক সাহেব চমৎকার একজন পাঠক। তার লেখার প্রতিটি পরতে, তার নিবিড় পড়াশোনার ছাপ স্পষ্ট। ❝ অবিরাম বৃষ্টির শহরে ❞ দারুণ একটা নভেলা। দুঃখের বিষয় এটা পড়া শেষ! এবার ❝পঞ্চ কন্যা❞ পড়ার অপেক্ষা। তবে সেটা রয়ে সয়ে পড়ব,কারণ পড়ে ফেলললই তো শেষ!
এই বইয়ের প্রধান চরিত্র হচ্ছে বৃষ্টি। পুরোটা বই জুড়েই অঝোর ধারায় সে ঝড়েছে। কখনো রাস্তায়, কখনো জানালার কাচে, কখনো গাড়ির ছাদে বা গাছের পাতায়, কখনো ছাতায় বা রেইনকোটে আর কখনো মানুষের গায়ে-মাথায়। বইয়ের নাম একদম সার্থক! বইয়ের দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র দুটো - সুমনা আর জারিফ- জীবনে সফল বা অসফল সে গল্প সাইডে রেখে যেটা বেশি চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে এদের দুজনের মধ্যেই এক রকমের বিষন্নতা রয়েছে, অনেকের মধ্যে থেকেও এরা একা। এরা নিজেকে খুঁজে বেড়ায়। এককালের হারানো প্রেম এরা কেউই ফিরে চায় না, যা গেছে তা গেছে। চায় শুধু নিজেকে ফিরে পেতে, খুঁজে পেতে। আমরা কি নিজেকে খুঁজে পাই কখনো? বা নিজের ছায়া আছে এমন কারো দেখা কি মেলে একজীবনে না কি বৈপরিত্যেই কাটিয়ে দিতে হয় এক জনম! প্রচ্ছদটা ভীষণ সুন্দর। বৃষ্টির বর্ণনাগুলো মনোরম। কোন চরিত্র যখন ছাতা নিয়ে হেঁটে যায় তার সাথে নিজেকে রিলেট করতে পারি। এটা আমার খুবই প্রিয়। বৃষ্টি নামলে ছাতা নিয়ে বের হয়ে পড়া- কাজে নয়, অকাজে হাঁটা। তবে বইয়ের মাঝে হুটহাট করে কিছু চরিত্র চলে আসছে বৃষ্টিতে ঘুরছে আবার কয়েক পৃষ্ঠা পর হারিয়েও যাচ্ছে। চরিত্রগুলোর পায়ের তলার মাটি তেমন শক্ত নয়। পাঠক তাদের সাথে দুইপা হাঁটবে, গুটগুট করে গল্পের ছলে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড জানবে, তাদের সাথে নিজেকে রিলেট করবে সেই স্বস্তিটা পাওয়া গেল না। তার কারণ হয়তো বইয়ের ছোট্ট কলেবর। আরো বড় করে, বিশদ করে উপন্যাস আশা করছি লেখকের কাছে।
মাহমুদুর রহমানের ছোট্ট একটা নভেলা অবিরাম বৃষ্টির শহরে। অনেকগুলো চরিত্রকে একত্র করেছেন লেখক। তবে এদের কেউই মূল চরিত্র না, মূল চরিত্র হচ্ছে বৃষ্টি। বৃষ্টি কারো কাছে ভালোবাসার প্রতীক, কারো কাছে বিরহের। কেউ সবসময় বৃষ্টির দেখা পায়, কাউকে ধরা দেয় না বৃষ্টি। এভাবেই চরিত্রগুলোর ছোট ছোট দৃশ্যপট নিয়ে এগোতে থাকে কাহিনী, সব কিছুতে একটা কমন জিনিস হল বৃষ্টি। কাহিনী বলতে গেলে এই খণ্ডচিত্রগুলোই, বড় পরিসরে কিছু দাঁড় করেননি লেখক, তবে সবকিছু বৃষ্টি দিয়ে পোট্রে করাটা ভালো লেগেছে। লেখার ধরনও সাবলীল। আরামে পড়া যায়। সুমনা চরিত্রটা ভালো ছিল। লেখকের বড় পরিসরে রোমান্টিক কিছু পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
বৃষ্টির রাতেই ছোট্ট নভেলাটা পড়া হলো, হয়তো এমন এক রাতে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম বলেই ভালো লাগাটা একটু বেশি ছিলো। বিষন্নও লেগেছে মাঝেমাঝে। এতো ছোট্ট একটা গল্পে এতগুলো চরিত্র, কখন আসছে, কখন চলে যাচ্ছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না, বোঝার প্রয়োজনও নেই। শুধু ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টি, এই তো জরুরি খবর।
বৃষ্টিময় বইটায় পুরো ঢাকা শহর ঘুরলাম। যারা ঢাকার বৃষ্টিতে রাস্তায় হাটেন নি তাদেরও বইটা ভালো লাগবে এই আশা করি। ইচ্ছে করবে চলে যেতে হাতির ঝিল কিংবা রমনা,শাহবাগ ফুলের দোকানগুলোতে কিংবা টিএসসির চায়ের দোকানে বৃষ্টির ফোটা মিশিয়ে চা খেতে। কিন্ত আপনার কেউ নেই, যার সাথে আপনি হাটবেন, এটাই তো বিষন্নতা? আমারও তাই।
বৃষ্টির থেকে লুকিয়ে কতবার দৌড়ে গিয়েছি ক্লাসে, কতবার বাসের জানালায় মাথা লাগিয়ে বৃষ্টি ছোয়ার বৃথা চেষ্টা করেছি, কিন্ত ভিজিনি তবে বৃষ্টি ধরা দিয়েছে আমাকে বারবার। ক্লাস শেষে বৃষ্টিতে ভিজে যেতে ইচ্ছে করে তোমার সাথে অনেক কিন্ত তোমারও ভিজে চুপসে যাওয়ার ভয়, আর আমারও কোন ভয় জানিনা। বইটা পড়ে যার সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করবে তাকেই মনে হয় আমরা ভালোবাসি:(
বই: অবিরাম বৃষ্টির শহরে লেখক: মাহমুদুর রহমান ধরণ: সমসাময়িক উপন্যাসিকা (ছোট উপন্যাস) প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২৫ প্রকাশক: অধ্যায় প্রকাশনী মুদ্রিত মূল্য: ২৫০/-
⭐ ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.২/৫.০
আমরা সবাই-ই কমবেশি বৃষ্টিতে ভিজেছি। তবে বৃষ্টি সবসময় সবার জন্য রোমান্টিক অনুভূতি বয়ে নিয়ে আসে না। কারো কারো জন্য এই বৃষ্টি হয়ে উঠে স্মৃতিচারণের মুহূর্ত, বিষাদময় অনুভূতির ক্ষণ। লেখক মাহমুদুর রহমানের সমসাময়িক উপন্যাস "অবিরাম বৃষ্টি শহরে" - তে তেমনি কিছু মানুষের বিষাদময় অতীতের স্মৃতিচারণ ও বর্তমান জীবনের কিছু কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যার বেশিরভাগই ঘটে বা ঘটেছিল বৃষ্টিস্নাত দিনে। তবে "অবিরাম বৃষ্টির শহরে" বইটিকে উপন্যাস না বলে উপন্যাসিকা বলাই শ্রেয়। ৯৫ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসিকাটিতে আমাদের মতোই কিছু সাধারণ মানুষের জীবনের কিছু ছোট ছোট কিন্তু অত্যন্ত স্পর্শকাতর কিছু মুহূর্তের গল্প লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
গল্পের শুরুতেই পাঠকের সাক্ষাৎ হবে 'সুমনা' নামক চরিত্রটির সাথে। সুমনার বাড়ি চট্টগ্রামে হলেও উচ্চশিক্ষার জন্যে তাকে সিলেটে অবস্থান করতে হচ্ছিল। সুমনার চোখ দিয়ে লেখক পাঠককে সিলেটের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরে বেড়ানোর অনুভূতি কিছুটা হলেও অনুভব করার সুযোগ করে দিয়েছেন। সুমনা বৃষ্টি প্রিয় একজন তরুণী। সে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসলেও, এই বৃষ্টিই কোনো কোনো সময় তার জন্য বিষাদময় হয়ে যায়। অতীতের কিছু বৃষ্টিস্নাত স্মৃতি তার বর্তমান বিষন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এরপর পাঠক পরিচিত হবেন 'জারিফ' নামক চরিত্রটির সাথে। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে মাঝেমধ্যে ঝরে পড়া অনাকাঙ্খিত বৃষ্টির সৌন্দর্য জারিফের জন্য বেশিরভাগ সময়ই বিষন্নতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জারিফ স্বেচ্ছায় বৃষ্টিতে ভিজতে চাইলেও কোনো এক অজানা কারণে বৃষ্টি তাকে ধরা দেয় না। তাই দূর থেকেই জারিফকে বৃষ্টির সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয়।
সুমনা ও জারিফ ছাড়াও পাঠক এই বইটিতে রাকিব, সিয়াম, রিমি, রাজীব, সৌম্য, বীথি, সেলিম ও সামিয়ার মতো কিছু অসাধারণ চরিত্রের দেখা পাবেন। এই চরিত্রগুলোর জীবনে ঘটা বৃষ্টিকে ঘিরে বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্মৃতিচারণের গল্প রয়েছে এই বইটিতে। যদিও এই চরিত্রগুলো সম্পর্কে খুব বেশি কিছু লেখক বলেননি, তবুও গল্পে তাদের এই ক্ষণিকের আগমন গল্পের আমেজটাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে সাহায্য করেছে।
ব্যক্তিগত অভিমত: "অবিরাম বৃষ্টির শহরে" বইটি আমাকে একইসাথে ভালো লাগা ও বিষন্নতার অনুভূতি দিয়েছে। লেখক মাহমুদুর রহমান তাঁর ইতিহাস ও পৌরাণিক চরিত্র সম্পর্কিত গ্রন্থাদির জন্যে জনপ্রিয় হলেও, "অবিরাম বৃষ্টির শহরে" বইটি তাঁর রচিত অন্যান্য বইগুলোর জননার থেকে ভিন্ন। বইটিতে কোনো একক নায়ক বা নায়িকা নেই। 'বৃষ্টি' - ই এই গল্পটির প্রধান চরিত্র। আর এই বৃষ্টিকে ঘিরেই কয়েকজন সাধারণ মানুষের জীবনে ঘটা কিছু স্মরণীয় মুহূর্তের গল্প লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন এই বইটিতে।
বইটিতে চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে বৃষ্টিকে ঘিরে মানবমনে তৈরি হওয়া বিভিন্ন রকমের মিশ্র অনুভূতির যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন সেটি সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এছাড়াও লেখক আমাদের যান্ত্রিক ঢাকার বাস্তবিক বর্ণনার পাশপাশি সিলেটের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের যে অসাধারণ ও সাবলীল বর্ণনা দিয়েছেন, সেটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। গল্পের শেষটা প্রত্যাশিত ছিলো। তবে লেখকের গল্প বলার গতিটা একটু ধীর মনে হয়েছে। এছাড়াও কাহিনীর কোনো কোনো জায়গায় বেশ কিছু বানান ভুল ছিলো যেগুলো কোনো কোনো পাঠকের ভালো নাও লাগতে পারে। তবে গল্পের প্লট, চরিত্র চিত্রণ এবং বাকি সবকিছু মিলিয়ে বইটি ব্যক্তিগতভাবে বেশ ভালো লেগেছে। আর বৃষ্টি প্রিয় মানুষ হওয়া বোধ হয় বইটি ভালো লাগার অন্যতম কারণ।
লেখক গল্পটা ওপেন এন্ডিং রেখে দিয়েছেন। জারিফ আর সুমনার পরিণতি প্রচ্ছদের হলুদ শাড়ি আর সাদা পাঞ্জাবি পরা মানুষ দুটোর মতোই। মাঝে কিছুটা দূরত্ব। এটার দৈর্ঘ্য কমবে না বাড়বে বলা মুশকিল। ধরে নিচ্ছি কমবে।
বৃষ্টি নিয়েই পুরো বই। পাতার পর পাতা অবিরাম বৃষ্টি পরেছে কালো বর্ণের উপর। মাঝে মাঝে বললে ভুল হবে, বেশিরভাগ সময়ই বিরক্তিকর লেগেছে। অতিরিক্ত টানাটানি না করে সরল একটা গল্প হলেও পারতো। তবে থিম টা দারুণ অবশ্যই। বৃষ্টিটা কিছু জায়গায় মেটাফোর হিসেবেও ব্যবহার করেছেন লেখক তবে অতিরিক্ত ব্যবহার ক্লিশে করে তুলেছে।
দুটো শহর। ঢাকা আর সিলেট। ঢাকার জায়গা গুলো নিয়েই ডিটেইলসে বৃষ্টির বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। সিলেটের গুলো আনপপুলার। অনেকগুলো চরিত্র। কোনো নির্দিষ্ট করে আবর্তিত হয় নাই প্লট। এটাও প্রশংসা করতে হবে। চরিত্র বেশি থাকলে সেগুলোর সাথে আপাত পরস্পর সম্পর্ক ঠিক রাখতে গিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলার একটা প্রবণতা থাকে। লেখক উতরে গিয়েছেন।
বইটা ৯৬ পেইজের। আমার মনে হয়েছে লেখক আরো কাটছাঁট করতে পারতেন। কিছু কিছু বর্ণনার খুব দরকার ছিল না। ৯৬ পেইজ এমনিতেই কম তবুও আমার মনে হয়েছে আরো কিছু কম হলে৷ উপভোগ্য হতো।
প্রতিটা বইয়েই বিশেষ করে ফিকশনে লেখকের কিছু উপলব্ধি চরিত্রের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই। সেগুলো ভালো লেগেছে। বইয়ের কিছু কিছু লাইন খুবি ভালো লেগেছে। বিশেষ করে ৭,১২ তম অধ্যায়। সামিয়া শাবিপ্রবির অংশটা কিংবা আমাদের ছোটবেলার বৃষ্টি যে আর নাই সেই উপলব্ধি সুমনার মাধ্যমে। এরকম ছোট ছোট কিছু অংশ খুব ভালো লেগেছে। বইটা শুরু করেছিলাম ঈদের দিন, শেষ করেছি ঈদের তৃতীয় দিন। এটাই মূলত কারণ রেটিংস কিছু কম দেয়ার।
এই বইয়ের প্রধান চরিত্র হলো বৃষ্টি। পুরো বইজুড়ে কখনো রাস্তায়, জানালার কাঁচে, গাড়ির ছাদে, গাছের পাতায় কিংবা মানুষের গায়ে ঝরেছে। বইয়ের নাম তাই একদম সার্থক। দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র বিষণ্নতা—যা সুমনা ও জারিফের জীবনে গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। অনেক মানুষের মাঝেও তাদের একাকীত্ব অনুভব করা যায়।
বইয়ের প্রচ্ছদ বেশ সুন্দর, আর বৃষ্টির বর্ণনাগুলো সত্যিই মনোরম। গল্পটা পড়তে পড়তে সিলেট ও ঢাকার বৃষ্টিভেজা রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করে, কিংবা চায়ের দোকানে গিয়ে বৃষ্টি মিশিয়ে এক কাপ চা খেতে। কিন্তু সময় বা সুযোগ না থাকাটাও যেন বিষণ্নতা। গল্পের মাঝে হঠাৎ কিছু চরিত্র আসছে, বৃষ্টিতে ভিজছে আবার কয়েক পৃষ্ঠা পর চলেও যাচ্ছে। ক্ষনিকের অতিথি হলেও তাদের মাধ্যমে বৃষ্টি ও বিষন্নতাকে ভিন্ন রূপে পাওয়া যায়। বইটি আরেকটু বড় হলে আরও খুশি লাগত।
তবু বৃষ্টিকে ঘিরে মানুষের নানা অনুভূতির যে সুন্দর চিত্র লেখক এঁকেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ধীর, আবেগঘন গল্প যারা পছন্দ করেন, তাদের জন্য "অবিরাম বৃষ্টির শহরে" নিঃসন্দেহে একটি সুন্দর পাঠ।
এই বইয়ের মেইন চরিত্র বৃষ্টি। পড়া শুরু করার পর থেকে মূল চরিত্রগুলোকে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম, সাথে একটা গল্প খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু একটা সময় গিয়ে বুঝলাম, এই বইটি মূলত বৃষ্টিকে নিয়েই লেখা। একেকটা শহরে বৃষ্টি কিরকম, একেকটা সিচুয়েশনে বৃষ্টি কিরকম, মানুষের মনের উপর, কাজের উপর বৃষ্টি কি পরিমানে এফেক্ট ফেলে। এরকম আরো নানান কিছু নিয়েই বইটির গল্প এগিয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি বৃষ্টি পছন্দ করি। এই বইয়ে সিলেট শহর এবং ঢাকা শহরকে নিয়ে যা যা বলা হয়েছে, আমি সবকিছুই রিলেট করতে পেরেছি। সেই ব্যাপারটা আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু বারবার আমার পাঠক মন একটা গল্প খুঁজে পেতে চাইছিলো। যেটা আসলে খুব ছাড়া ছাড়া মনে হয়েছে। দুটো মূল চরিত্রকে কিছুটা বুঝতে পারলেও হুটহাট করে কিছু চরিত্র এলো গেলো, এটা খুব একটা ভাল লাগলো না। লেখকের বই আমি আগেও পড়েছি। লেখার ধরন বেশ সুন্দর। লেখকের জন্য শুভকামনা।
“সব জায়গায় বৃষ্টির রূপ এক হয় না। নদীর ওপরে বৃষ্টি এক রকম, পাহাড়ে আরেক রকম। নদীতে বৃষ্টি পড়লে ভিন্ন একটা সুর তৈরি হয়। পাহাড়ের বৃষ্টিতে সংগীত থাকে। আবার কখনো থাকে রহস্য। সমুদ্র তীরের বৃষ্টির তেমন কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। তবে এদের সবারই একটা সৌন্দর্য আছে।” কথাটি আলোচ্য বইয়ের অংশ। তবে কথাটা আসলেই সত্যি।
আমারও বৃষ্টি দারুণ পছন্দের। ফ্যাচফ্যাচে বৃষ্টি না। ঝোড়ো বাতাসে জড়িয়ে থাকা বৃষ্টি। তবে কি না আমি গল্পের জারিফের মত। বৃষ্টি আমার মাথাকে স্পর্শ করতে পারে না কখনো। আমি তাকে দূর থেকেই দেখি। বৃষ্টি এলেই আমিও সুমনার মত শ্রীকান্ত আচার্যের
🎵 আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ বৃষ্টি, তোমাকে দিলাম। 🎵
গানটা অনেকবার শুনি।
‘অবিরাম বৃষ্টির শহরে’ বইতে অনেক গুলো চরিত্র আছে। তাদের সবার জীবনের সাথে বৃষ্টির কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বৃষ্টি তাদের জীবনে নতুন নতুন আনন্দের মুহূর্ত যেমন তৈরি করে, তেমনি অনেক বিষাদের মুহূর্তেরও জন্ম দেয়। কেউ কেউ বৃষ্টিকে এড়িয়ে গেলেও বৃষ্টি তাদের পিছু ছাড়ে না। অথচ কেউ বৃষ্টিকে ধরতে চায়, বৃষ্টি তার নাগাল তাকে দিতে চায় না।
সুমনা সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার বড় ভাইয়ের মাধ্যমে পরিচয় ঘটে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের। সুমনার জীবন থেকে তার ভাই হারিয়ে গেলেও রেখে গেছে অনেক স্মৃতি, বকুল ফুল আর এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। বৃষ্টিতে সুমনা এসব স্মৃতি রোমন্থন করে বেড়ায়। সুমনা কবিতা প্রেমি, গান শোনে, বই পড়ে। প্রেমের প্রস্তাব অনেক আসে তার কাছে। ঝুলে থেকে থেকে একসময় তারাই সুমনার দারুণ বন্ধুতে পরিনত হয়। শার্ট, পেন্ট পড়া মেয়ে সুমনা। তাই তার মুখ থেকে কাব্যিক কোনো কথা বেরুলে তার বান্ধবীরা অবাক না হয়ে পারে না। সিলেট শহরের অবিরাম এই বৃষ্টি প্রথম প্রথম সুমনাকে জ্বালালেও কিছুদিনপর দারুণ ভাবে আলিঙ্গন করে নেয়। তাইতো যেদিন সুমনা এই শহরকে বিদায় জানায়, তখন পেছনে তাকিয়ে বৃষ্টিকে দেখে তার মনে হয় সুমনার বিরহে বুঝি শহরটি কাঁদছে।
জারিফ তার গ্রামের সংগ্রামী জীবন পার করে শহরে আজ প্রতিষ্ঠিত এক ব্যাক্তি। বহু কষ্টে লেখাপড়া শেষে পেশাগত জীবনেও আজ সে আকাশচুম্বী একজন। শূন্য থেকে একদম সুউচ্চতে উঠা জারিফের আজ কিসের অভাব? কিছুরই না। তবুও জারিফের অফিস ঘরের ঐ জানালার বাহিরে অবিরাম পড়তে থাকা বৃষ্টি দেখে মন কেমন করে উঠে। কতদিন হয়ে গেলো সে বৃষ্টির স্পর্শ পায় না। বৃষ্টি যেনো কোনো এক লাস্যময়ী রমনী যে হাতছানি দিয়ে জারিফকে ইশারা করে। কিন্তু জারিফ তাকে ধরতে গেলেই সে হারিয়ে যায় মেঘ পর্বতের আড়ালে। বৃষ্টির আশায় জারিফ ঘুরে বেড়ায় শহরের আনাচে কানাচে। কখনো সে বুড়িগঙ্গায় যায়, সেখান থেকে শাঁখারি বাজার। অথবা পল্টন থেকে ধানমন্ডি বা বনানী লেকের পাড় দিয়ে সে অবিরাম বৃষ্টির মতো হাটতে থেকে। তবু বৃষ্টি তাকে দেখা দেয় না।
সুমনা জারিফের মতো আরো অনেকের জীবনের স্মৃতি নিয়ে বৃষ্টি এমন লুকোচুরি করতে থাকে।
—-
লেখক ‘মাহমুদুর রহমানের’ লেখা ‘অবিরাম বৃষ্টির শহরে’ বইটি পড়ে আমার মন পড়ন্ত বৃষ্টির পানির মতই স্নিগ্ধ শীতল হয়েছে। তবে কিছু আক্ষেপ কিছু খটকা থেকে গেল। যেমন গল্পে কিছু চরিত্র হুট করে এসে কিছুক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে আবার চলে গেছে। কিন্তু তারা কোথায় যে গেলো তার আর কোনো হদিস পেলাম না। এটা হলো খটকা। আর আক্ষেপ হচ্ছে গল্পটা এত ছোট কেন? যাক তারপরও বলবো ঠিকাছে, চলবে। তবে আগামীতে আরো ভালো ও বড় গল্প চাই। মাহমুদুর রহমান বর্তমান তরুণ লেখকদের একজন। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি বেশ কিছু অতি চমৎকার চমৎকার বই প্রকাশ করেছেন। আমি লেখকের প্রকাশিত বইয়ের মাঝে মোগলনামা ১, রাধেয়, শকুনি উবাচ, রঙমিলান্তি পড়েছি। প্রতিটাই চমৎকার ছিল। সেই আশাতেই এই চাওয়া।
‘অধ্যায় প্রকাশনী’ বইটি অতি চমৎকার প্রডাকশনে বইটি এবারের ২০২৫ এর বই মেলাতে প্রকাশ করে। বইটির প্রচ্ছদ ছিল খুবই নজরকাড়া। তবে বইতে অল্প কিছু বানান ভুল ছিল যা পড়তে সমস্যা তৈরী করে। বইটির মুদ্রিত মূল্য ২৫০ টাকা রাখা হয়। যা আমার কাছে বড্ড বেশি মনে হয়। এই দুটি সমস্যা ছাড়া বাদবাকি সব সুন্দর ছিলো
বৃষ্টি ভালো লাগে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। বৃষ্টিকে ঘিরে কতো কল্পনা থাকে মানুষের, কত কবি কবিতা লিখেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। বৃষ্টি একেক জনের কাছে একেক রকম। কারো কাছে রোমান্টিক, কারো কাছে বিরক্তিকর, কারো কাছে শুধুই বৃষ্টি।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বৃষ্টিপ্রেমী।
বইয়ের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে বৃষ্টিকে ঘিরেই। নামের সাথে যথার্থ মিল রেখেই বইয়ের নামকরণ করা হয়েছে। গল্পটাতে বেশ কিছু চরিত্রের আবির্ভাব থাকলেও মূলত সুমনা আর জারিফ হচ্ছে মূল চরিত্র। বইটা একক কোনো গল্প না। অনেকটা স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে ঘটনা প্রবাহ চলতে থাকে। বৃষ্টির সৌন্দর্যর পাশাপাশি এই স্মৃতিচারণাগুলো বিশণ্ণতার ছাপ রেখে যায়। বৃষ্টির প্রতি ফোটা যেনো জীবনের ঘটে যাওয়া কোনো স্মৃতির অংশ তুলে ধরছিলো।
মূলত বইয়ের নাম দেখেই বইটা কিনেছিলাম। প্রচ্ছদটাও দারুণ।
ছোট উপন্যাসিকা পড়তে চাইলে এটা অবশ্যই পড়ে দেখতে পারেন।
‘অবিরাম বৃষ্টির শহরে’ বইটা মাহমুদুর রহমানের লেখা। সম্ভব হলে হয়তো বইয়ের প্রতিটা লাইনেই বৃষ্টির আগমন ঘটতো। অসংখ্য বার বৃষ্টি আসার কথা বলা হয়েছে গল্পে। যা উপভোগের বিপরীতে বিরক্তি হয়ে চাপছিল ঘাড়ে। গল্পেও তেমন মজার কিছু পাইনি। তবে সবকিছুই ব্যক্তি পছন্দের উপর নির্ভরশীল।