যদি স্মৃতি প্রতারণা করত আর পৃথিবী ফিরে যেত আরও আদিম সময়ে; সাড়ে চৌদ্দ’শ বছর আগে। নবিজির দেখা পাওয়ার আশা পেলে আমি নিঃসংকোচে হাটে মাঠে বিক্রি হতে রাজি আরব আর অনারব— যতো খুশি আমার বুকের ওপর তুলে দিক শক্ত পাথর। নবিজির আলিঙ্গন পেলে বুকে উহুদ পাহাড় উঠে গেলেও ক্ষতি নেই।
আরিফ আজাদ একজন জীবন্ত আলোকবর্তিকা - লেখক আরিফ আজাদকে বর্ণনা করতে গিয়ে একথাই বলেছেন ডঃ শামসুল আরেফিন। গার্ডিয়ান প্রকাশনী আরিফ আজাদের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছে, “তিনি বিশ্বাস নিয়ে লেখেন, অবিশ্বাসের আয়না চূর্ণবিচুর্ণ করেন।” আরিফ আজাদ এর বই মানেই একুশে বইমেলায় বেস্ট সেলার, এতটাই জনপ্রিয় এ লেখক। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে সবচেয়ে আলোড়ন তোলা লেখকদের একজন আরিফ আজাদ।
১৯৯০ সালের ৭ই জানুয়ারি চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া এ লেখক মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে চট্টগ্রাম জিলা স্কুলে। একটি সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।
লেখালেখির ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আরিফ আজাদ এর বই সমূহ পাঠক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তার প্রথম বই ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ ২০১৭ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশ পায়। বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র সাজিদ বিভিন্ন কথোপকথনের মধ্যে তার নাস্তিক বন্ধুর অবিশ্বাসকে বিজ্ঞানসম্মত নানা যুক্তিতর্কের মাধ্যমে খণ্ডন করে। আর এসব কথোপকথনের মধ্য দিয়েই বইটিতে অবিশ্বাসীদের অনেক যুক্তি খণ্ডন করেছেন লেখক। বইটি প্রকাশের পরপরই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এটি ইংরেজি ও অসমীয়া ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। ২০১৯ সালের একুশে বইমেলায় ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ - ২’ প্রকাশিত হয়ে এবং এটিও বেস্টসেলারে পরিণত হয়। সাজিদ সিরিজ ছাড়াও আরিফ আজাদ এর বই সমগ্রতে আছে ‘আরজ আলী সমীপে’ এবং ‘সত্যকথন’ (সহলেখক) এর মতো তুমুল জনপ্রিয় বই।
মাঝে মাঝে ভাবি যদি স্মৃতি প্রতারণা করত আর পৃথিবী ফিরে যেত আরও আদিম সময়ে; সাড়ে চৌদ্দ'শ বছর আগে। নবিজির দেখা পাওয়ার আশা পেলে আমি নিঃসংকোচে হাটে মাঠে বিক্রি হতে রাজি আরব আর অনারব-যতো খুশি আমার বুকের ওপর তুলে দিক শক্ত পাথর। নবিজির আলিঙ্গন পেলে বুকে উহুদ পাহাড় উঠে গেলেও ক্ষতি নেই আরিফ আজাদের লেখা কথা বলো যয়তুন বৃক্ষ থেকে পড়ছিলাম। তিনি এই জেনারেশনের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক। ২০১৯ সালে প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ এর মাধ্যমে অসংখ্য তরুণের জীবন বদলে দেয়া আরিফ আজাদ ২০২৫এর বইমেলায় প্রকাশ করেছেন তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ কথা বলো যয়তুন বৃক্ষ। বইয়ের শুরুতে শ্রদ্ধেয় মুসা আল হাফিজের একটা মন্তব্যের পাতা রয়েছে, পুরো বইটাকে ব্যাখ্যা করতে সেটিই যথেষ্ট। আকুতি শিরোনামের রাসুল প্রেমের একটি কবিতা দিয়ে তিনি শুরু করেছেন এই বই, আর শেষ করেছেন শান্তির শর্তাবলী নামের দারুণ আরেকটি কবিতা দিয়ে। এর মাঝে তিনি লিখেছেন তার আশা-আকাঙ্খার কথা- তার কলম লিখেছে ইয়াহইয়া সিনওয়ারের কথা, জুলাইয়ের কথা, আমাদের ফিলিস্তিনের কথা আর শাসনের নামে শোষন করতে থাকা হায়েনাদের কথা। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে গেছে তার নবীপ্রেমের কবিতা। তিনি লিখেছেন নবীপ্রেমে অন্ধ হয়ে যাওয়া এক প্রেমিকের গল্প- যিনি কখনও হাবশার বিলালের মতো হতে চেয়েছেন, কখনওবা মক্কার সেই মহামানবের সাক্ষাতের আশায় আরবের হাঁটে মাঠে গোলাম হিসেবে বিক্রি হওয়ার আকাঙ্খা করেছেন। স্মৃতির প্রতারণা নামক এই কবিতার পর আমার কাছে সবচাইতে ভালো লেগেছে মহাকাব্যিক উপন্যাস নামের একটি কবিতা- তিনি লিখেছেন, পৃথিবীকে সারিয়ে তোলার সেই সেমিনারে 'যুদ্ধ নয়, শান্তি' বিষয়ে বক্তব্য রাখল জো বাইডেন। 'সাম্প্রদায়িকতা নয়, সহাবস্থান' বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে প্রচুর হাততালি পেল নরেন্দ্র মোদি। 'অনলাইনে বাক-স্বাধীনতা' শীর্ষক শিরোনামে অত্যন্ত গোছালো বক্তব্য দিয়ে সমাদৃত হলো মার্ক জাকারবার্গ। মুগ্ধ শ্রোতাদের মুহুর্মুহু করতালিতে যখন কেঁপে কেঁপে উঠছে সভা-ঘর, আমি দেখলাম, 'নাগরিক স্বাধীনতা' বিষয়ে বক্তব্য দিতে স্টেজের দিকে হেঁটে যাচ্ছে কিম জং উন।
আমার জন্য কথা বলো যয়তুন বৃক্ষ পড়ার আরেকটি বড় কারন হচ্ছে এর প্রচ্ছদ- স্নিগ্ধ সুন্দর এই প্রচ্ছদটি করেছেন কাজী যুবাইর মাহমুদ। আমার ধারনা তিনি যখন কোনো বইয়ের প্রচ্ছদ করেন তখন শুধুমাত্র তা দেখার জন্য হলেও সেই বইটা অনায়েসে কিনে ফেলা যায়। এবং এইটাও তার ব্যতিক্রম নয়। সুকুন পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত এই বইটার বাইন্ডিং নিয়ে আমার একটু অভিযোগ আছে। প্রথম পড়ার সময়ই আমি খেয়াল করলাম বইটার মাঝখানের পৃষ্ঠাগুলোর সেলাই খুলে যাচ্ছে, দ্বিতীয়বার কেউ পড়তে গেলে হয়তো পুরোপুরিই খুলে যাবে। তবে আমি আশা করছি শুধুমাত্র আমার এই কপিটার সাথেই এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে। কথা বলো যয়তুন বৃক্ষ আরিফ আজাদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ এটি, তবে আমি দুআ করবো কবিতার জগতে তার কলম নিজের অবস্থানকে আরও মজবুত করবে এবং তার কবিতার মাধ্যমে পথহারা পথিক খুঁজে পাবে সঠিক পথের দিশা।