এ তো সত্যি, মেজর রেনেলের অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতবর্ষের মানচিত্রে সলপ তো দূরের কথা, সিরাজগঞ্জও জনহীন এক বিন্দু। সেখানে তখনো ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, হুরা সাগর, বড়াল আর ফুলজোড় নদীর লাগাতার ভাঙাগড়া। অথচ বিন্দুই ঊনবিংশ শতাব্দীতে হয়ে ওঠে কলকাতার ঠাকুর, ঢাকার ব্যানার্জী আর সলপের সান্যালসহ পাঁচটি বিখ্যাত জমিদার পরিবারের ক্ষমতার লড়াইয়ের কেন্দ্র। হয়ে ওঠে পুরো ব্রিটিশরাজের মনোযোগের মূল বিন্দু।
ইতিহাসের সেই বাঁক ঘোরানো কালপর্বে সংঘটিত আলোচিত সিরাজগঞ্জ কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে এই প্রথম লেখা হলো কোনো উপন্যাস। শঙ্খগহন সলপকাল হয়ে উঠেছে বাংলা কথাসাহিত্যে ঊনবিংশ শতাব্দীর পূর্ব বাংলার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের প্রথম কথকতা। আর সেই কথকতার অবলোকনের চোখটিও পূর্ব বাংলার বা বাংলাদেশের।
আপাতদৃষ্টিতে এ কাহিনি আবর্তিত হয়েছে সলপের আলোচিত সান্যাল পরিবারকে ঘিরে, কিন্তু মূলত তা নতুন সামাজিক শক্তির উত্থানের ধারাপাত। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ উপন্যাস লেখা হয়েছে বটে, তবুও তা ঐতিহাসিক নয়; বাস্তবকে ভেঙে এতে লেখক যে রক্তমাংস যুক্ত করেছেন তাতে অতীত উজ্জ্বলতা পেয়েছে বর্তমানের শিল্পালোকে।
ইমতিয়ার শামীমের জন্ম ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫ সালে, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। আজকের কাগজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের শুরু নব্বই দশকের গোড়াতে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ডানাকাটা হিমের ভেতর’ (১৯৯৬)-এর পান্ডুলিপি পড়ে আহমদ ছফা দৈনিক বাংলাবাজারে তাঁর নিয়মিত কলামে লিখেছিলেন, ‘একদম আলাদা, নতুন। আমাদের মতো বুড়োহাবড়া লেখকদের মধ্যে যা কস্মিনকালেও ছিল না।’
ইমতিয়ার শামীম ‘শীতের জ্যোৎস্নাজ্বলা বৃষ্টিরাতে’ গল্পগ্রন্থের জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার (২০১৪), সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সকল প্রধান সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন।
"জীবন এখানে, এই সলপে, স্তব্ধতার অনুবাদ আর করতে পারে না। অবশ্য কখনো সে অনুবাদ হতো কি না, তাও কারো জানা নাই; তেমনি সে অনুবাদের দরকার আছে বলেও আর মনে হয় না। সব কিছুকেই এখানে ছুঁয়ে আছে নিঃস্পৃহতা, নির্লিপ্ততা। কারো জন্ম হলেও এখানে কোনো উল্লাস হয় না। তেমনি কান্নার শব্দও বড়ো অস্পষ্টই মনে হয় কারো মৃত্যু হলে। শুধু ধূলিমাখা নূপুরের রিনিঝিনি বেজে ওঠে শস্যের জন্ম ও বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে, কী এক সশব্দতায় দূরের আকাশও কেঁপে কেঁপে ওঠে শস্যের বিপদ এলে। নারীকেও দূরে ঠেলে দেয় পুরুষ, শস্য এক এমনই নারী সলপের।"
ইমতিয়ার শামীম ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে উপন্যাস লিখেছেন জানার পরই খুব আগ্রহী ছিলাম বইটি নিয়ে। ১৮৭২ সালে সিরাজগঞ্জের সলপে সংঘটিত কৃষক ও নীল বিদ্রোহ হচ্ছে মূল কেন্দ্রবিন্দু। গুরুত্ববহ এই বিদ্রোহ নিয়ে আমাদের জ্ঞান শূন্যের কোঠায়। ইতিহাসের প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়টি তুলে ধরা হয়েছে পরম মমতায় ও বিপুল পরিশ্রমলব্ধ তথ্য উপাত্ত দিয়ে। ঘটনার সময়কাল ও পরিবেশ বিশ্বস্তভাবে উপস্থাপনের জন্য গ্রন্থকারকে বর্ণনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। ফলে "শঙ্খগহন সলপকাল" হয়ে উঠেছে তথ্যবহুল; কিছুক্ষেত্রে তথ্যভারাক্রান্ত। যদিও পুরো কাহিনিই সলপ তথা সিরাজগঞ্জ ও পাবনাকে ঘিরে রচিত, প্রকারান্তরে উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ববঙ্গের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, জনমনস্তত্ত্ব, ইংরেজদের অত্যাচার, জমিদারদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক সফলভাবে ফুটে উঠেছে। ভাষাকে কাব্যিক করে তোলার সহজাত প্রবণতা সচেতনভাবে পরিহার করেছেন লেখক। উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা নিজেদের বিকাশের সুযোগ পেয়েছে কম। লেখায় তাড়াহুড়ো বা অযত্নের ছাপ নেই কিন্তু শেষদিকে বিদ্রোহ শুরু হতে না হতেই যবনিকাপাত হয় কাহিনির; উপসংহার উন্মুক্ত। মনে হতেই পারে - প্রাণান্ত পরিশ্রম করে, পাহাড় ডিঙিয়ে, কোনো জলপ্রপাত দেখতে যেয়ে শেষ মুহূর্তে সেই জলপ্রপাত ঠিকঠাক না দেখেই যেন ফেরত আসতে হলো। কিন্তু আইরিশ পিটার নোলান চরিত্রটির মাধ্যমে বাংলার বিদ্রোহকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার কারণে এটাও মনে হয় যে, লেখক ইচ্ছাকৃতভাবেই হয়তো থেমেছেন। কারণ বিদ্রোহ শেষ হয় না কখনো । অত্যাচার ও নিগ্রহও যেমন শেষ হয় না। সাধারণ মানুষ সুন্দর আগামীর স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজের জীবন তুচ্ছ করে; জেগে থাকে সলপ, জেগে থাকে বিপ্লবের অগ্নিশিখা।
অবিভক্ত ভারত কিংবা বাংলাদেশকে বিচার করতে গেলে অবধারিতভাবেই টানতে হবে শত শত বছরব্যাপী চলমান কৃষক বিদ্রোহ, কৃষক আন্দোলন আর কৃষকের সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাস। আজকে যে মাটিতে প্রাণদায়ী ফসল ফলছে সেই মাটি শত শত বছর ধরে এই মাটির সন্তান কৃষকদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, যার কতকটা আমাদের জানা, বেশিরভাগইটাই অজানা। কালের ধূলিতে চাপা পরে থাকা তেমনি প্রায় অজানা এক বিদ্রোহ সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহ, বা পলো বিদ্রোহ। প্রায় দেড়শো বছরেরও আগে সংগঠিত আলোচিত সেই কৃষক বিদ্রোহকেই উপন্যাসের পাতায় তুলে ধরেছেন ইমতিয়ার শামীম তার "শঙ্খগহন সলপকাল" উপন্যাসে।
সলপকাল পড়তে পড়তে আমার বারবারই মনে পরে যাচ্ছিলো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা পড়ার অভিজ্ঞতা। তেভাগা, দেশভাগ আর সিপাহী বিদ্রোহের পটভূমিতে ইলিয়াস যেমনি করে প্রবল মমতাভরে তুলে এনেছিলেন নিজ জনপদ বগুড়ার কাৎলারহার বিল, গিরিরডাঙা, নিজগিরিডাঙা আর তার মানুষকে, তেমনি ঠিক একই মমতায় যেন ইমতিয়ার শামীমও তুলে ধরেছেন তার নিজ জনপদ সলপ, বোয়ালিয়া, হুরা সাগর আর তার আশেপাশে বসবাস করা মানুষ আর তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, তাদের সংগ্রামকে।
আরও মজার ব্যাপার, মূলত যেই সান্যাল জমিদার পরিবারকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাস, সে জমিদার বংশেরই একজনের লেখা পারিবারিক ইতিহাসও লেখকের হস্তগত হয়েছিল। বই শেষ করে কিছুটা সিরাজগঞ্জের এই বিদ্রোহ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে পিটার নোলান, ঈশানচন্দ্র... এসব বাস্তব চরিত্রের উল্লেখও পেলাম। ফলে পড়তে গিয়ে কোন ঘটনাই ঠিক গল্প বলে মনে হচ্ছিলো না, বরং সব কিছুই সত্যি ভাবতে ভালো লাগছিলো। তবে উপন্যাসের শেষটা অসমাপ্তির অতৃপ্তি দিয়েছে। আরও অনেক কিছুই যেন অজানা থেকে গেলো। আরও দুই একটা অধ্যায় চাইলেই বড় করা যেতো।
সলপকাল পাঠ এক চমৎকার অভিজ্ঞতা। গত বছরই সিরাজগঞ্জ ঘুরে এসেছি। ভালো লেগেছে সেখানকার সজল-শ্যামল রূপ। পুরো বই জুড়েই সেই সজল শ্যামলিমার এতই মনকাড়া বর্ণনা, বই পড়তে পড়তেই পরপর দু রাত স্বপ্ন-ভ্রমণ করে এসেছি সেখান থেকে। খুব দ্রুতই আবার সিরাজগঞ্জে, সলপে, সলপের সান্যাল জমিদার বাড়ি ঘুরতে যাবো বলে আশা রাখি।
সিরাজগঞ্জের সলপ। নীলচাষ। জমিদারদের পড়তি দশা। ইংরেজদের প্রতিপত্তি তবে তাও ভঙ্গুর। এইসব নিয়েই শঙ্খগহন সলপকাল। ঐতিহাসিক উপন্যাস বলা চলে তবে না বলাই ভালো। ইমতিয়ার শামীমের লেখার সঙ্গে পরিচিতরা কোনো সন্দেহ না রেখেই বইটা পড়া শুরু করবেন। তবে ব্যক্তিগত মত হলো, কিছু একটা খটকাচ্ছিল পড়ার সময়। বইয়ের ভেতরে ঢোকা যাচ্ছিল না। দ্বিতীয় পাঠ হয়ত আমার প্রয়োজন।
১৫০-২০০ বছর আগের জমিদারি ব্যবস্থা, ইংরেজ শাসন, নীলচাষ, ফরায়েজি আন্দোলন, কৃষক বিদ্রোহ, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এসবই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। বইয়ের গদ্য খুবই সুন্দর। ভীষণ রকমের মসৃণ। সুন্দর গদ্যের জন্য একটানে অনেকখানি পড়ে ফেলা যায়। তবে পাঠক হিসেবে আমি কংক্রিট স্টোরি পছন্দ করি। যেটা কিনা এই উপন্যাসে পেলাম না। পুরাটাই কেমন জানি ভাসা ভাসা লাগলো।
বইয়ের প্রথম ৫০/৬০ পৃষ্ঠা উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, চরিত্রের ব্যাকগ্রাউন্ড, এক পরিবারের সাথে আরেক পরিবারের বন্ধুত্ব বা শত্রুতার ইতিহাস, আর্থ-সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি থাকবে এরপর শুরু হবে কংক্রিট স্টোরি। কিন্তু শঙ্খগহন সলপকাল এ সেরকম ঘটলো না। হয়তো পাঠক হিসেবে এটা আমারই ব্যর্থতা যে উপন্যাসের ভেতরে ঢুকতে পারিনি।
বই মন্দ লেগেছে তা বলছি না। তবে কোথায় জানি অতৃপ্তি রহিয়া গেল টাইপ ব্যাপার আরকি।
“ জোনাকির মতো এক রাতে একটু আলো জ্বেলে হলেও যদি পারতাম মরে যেতে।”
ইমতিয়ার শামীম সাধারণত আমাদের চেনা ইতিহাসের গল্পকে উপন্যাসের মোড়কে পুরে দেন। সেটাও আবার ছোট আকারে করে। এই উপন্যাসটা সেই জায়গায় আলাদা। যে কাহিনি, তা ইতিহাস হলেও আমাদের তেমন চেনা নয়। আর, এর যা আকৃতি সেটা লেখকের অন্য কোনো বইয়ে দেখার ভাগ্য আমাদের হয়নি।
উপন্যাসে শামীম যে ভাষা অন্য জায়গায় ব্যবহার করেছেন, এই জায়গায় সেটা পুরোপুরি পাওয়া যায় না। তবে, এর মানে এই না যে এইটায় ভাষা সুন্দর নয়।
ইমতিয়ার শামীমের লেখা বলেই চোখ বন্ধ করে কিনে ফেলেছিলাম। যদিও শুরু করতে সময় লাগেনি। কিন্তু অনেকগুলো কারণে অল্প অল্প করে পড়া হচ্ছিলো। যার কারণে শেষ করতে মাসখানেক লেগেছে। মানে প্রথম একশ পৃষ্ঠা পড়েছি মাসখানেক। কিন্তু বাকিগুলো তিনদিনেই শেষ।
বই ধরা�� আগে মনে করেছিলাম সলপকাল হলো একটা সময়কাল।পরে জানলাম এ এক জায়গা! এতে ঊনবিংশ শতাব্দীর পাঁচ বিখ্যাত জমিদার পরিবারের ক্ষমতার লড়াই,কৃষকবিদ্রোহ আর ছিলো বৃটিশদের আকর্ষণ। এই পাঁচ জমিদারের কথা থেকে থেকে আসলেও কাহিনী আবর্তিত হয়েছে সলপের সান্যালদের নিয়ে। ঠিক অত্যাচারী স্বৈরশাসকের মুখ্য উদাহরণ, জমিদার বললেই যে অত্যাচারের চেহারা ভাসে, সলপের জমিদারেরা ঠিক তেমন ছিলো। প্রজাদের গোলাম আর অন্যায় আবদারের ডালা সবই তাদের ঝুলিতে ছিলো। কথিত আছে তারা বোধহয় নিজেরাই ডাকাত কিংবা ডাকাতদল পোষে। এই জমিদারদের অন্যায়, কুক্ষিগত ক্ষমতার অত্যাচার থেকে নিজেদের বাঁচানোর আখ্যান এই বই। সেই সাথে আছে নীল চাষের সেই ভয়াবহ ইতিহাস। দীনবন্ধু মিত্রের "নীল দর্পণ" ছাড়া নীল চাষের ভয়াবহতা আর কোথাও পড়েছি কিনা মনে পড়ছেনা।কৃষকের শেষ সম্বল থেকে শুরু জীবন পর্যন্ত হারাতো এই লোভী নীলকরদের কাছে। ছোটোবেলায় পড়া বিভিন্ন প্রবন্ধ আবার নাটক সবই নতুন করে মনে পড়লো। আবার যদিও জমিদারদের অত্যাচারের কথা অনেক পড়েছি। আবার বই পড়তে পড়তে মনে হলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে কাহিনীতে মিল অনেক। কুক্ষিগত একক ক্ষমতার অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতে সাধারণের জেগে উঠা,এ যেনো অন্য জুলাইয়ের আখ্যান।
ইমতিয়ার শামীমের 'শঙ্খগহন সলপকাল' বইটা মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর সিরাজগঞ্জের সলপ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে লেখা এক বৃহৎ উপন্যাস। নদীঘেরা, কৃষিনির্ভর ও দুঃখভারাক্রান্ত এই জনপদের মানুষের জীবন, জমিদারি শোষণ, ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচার এবং কৃষক বিদ্রোহ সহ সব মিলিয়ে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে বাংলার ব্রিটিশ আর জমিদারি বন্দোবস্তোর সময়ের গ্রামীণ জীবনের ইতিহাসের এক জীবন্ত চিত্র।
রায়গঞ্জের হোড়গাঁতী ছেড়ে মাহমুদ আকন্দ পরিবারসহ সলপে এসে বসতি গড়ে। সেই অঞ্চলেরই স্যানাল পরিবারের নির্যাতন নেমে আসে কয়েকঘর মুসলিম পরিবারগুলোয়, কোরবানে গরু জবাই দিতে না পারে মতো তাদের বেঁধে রাখে হয় জমিদারদের খোঁয়াড়ে। নির্যাতন করা হয় নানান উপায়ে। এদিকে হোড়গাঁতী ছেড়ে সলপে আসা মাহমুদ আকন্দের ছেলে দোয়াউল্লাহ্ সময়ের পরিক্রমায় একসময় সান্যাল পরিবারের সংস্পর্শে দেওয়ানী কাজের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠে এবং কী পরবর্তীতে তারই ছেলে মেহেরও ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠে। অবশ্য মেহেরের এই অবস্থার পিছনে ছিলো ব্রিটিশ বেরি সাহেব ও তার স্ত্রী। বেরি সাহেব হচ্ছে সেই লোক যার হাত ধরেই মাঠের পর মাঠ পাটের চাষে বদলে যেতে শুরু করেছিলো সিরাজগঞ্জের কৃষি জমি। যে কাজের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো মেহেরেরও।
একই সময়ে সলপ অঞ্চলে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে কয়েকটি জমিদার পরিবার সান্যাল, ঠাকুর, ব্যানার্জী, ভাদুড়ী ও পাকড়াশীরা। জমিদারিদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কৃষকের দুর্দশা এবং সমাজের নানান স্তরের ধর্মীয় ও কুসংস্কার আচ্ছন্ন বৈষম্যমূলক কাঠামো গল্প এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ক্রমে গভীর হতে থাকে। অবশ্য গল্পে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে স্যানাল জমিদারদের কাহিনি।
এদিকে ইংরেজ নীলকর কগবার্ন পুরো অঞ্চলে নীল চাষ বিস্তারের স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নে সাধারণ কৃষকদের উপর শুরু হয় ভয়াবহ শোষণ ও নির্যাতন। একসময় কৃষক, সান্যাল জমিদারসহ স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে কগবার্নকে সলপ ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে হয়। কিন্তু বিদ্রূপের বিষয় হলো, যে সান্যাল জমিদার পরিবার একসময় নীলকরদের বিরুদ্ধে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, পরবর্তীতে সেই পরিবারই কৃষকদের শত্রুতে পরিণত হয়। জমিদার সান্যালদের অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে কৃষকেরা বিদ্রোহে ফেটে পড়ে। মাপে কারচুপিসহ নানান বাহানায় খাজনা বাড়ানোর চেষ্টা সেই বিদ্রুকে ঘি ঢালে।
উপন্যাসে শুধু কৃষক বিদ্রোহ নয়, বরং তৎকালীন বাংলার সামগ্রিক সমাজব্যবস্থাও উঠে এসেছে গভীরভাবে। নারী নিপীড়ন, ধর্মীয় কুসংস্কার, শ্রেণিবৈষম্য, নদীভাঙন, কৃষকের বেঁচে থাকার সংগ্রাম সবকিছুই কাব্যিক অথচ নির্মম বাস্তবতায় তুলে ধরেছেন লেখক। স্যানাল পরিবারের মেয়ে মিত্রা স্যানাল তৎকালীন নারী সমাজের অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। তার জীবন বিষন্ন করে দেয় মনকে।
শুধু কী সে! গল্পের দোয়াউল্লাহ্, মেহের, ক্ষুদি, ঈশানচন্দ্র, কগবার্ন, পিটার নোলান কিংবা সান্যাল পরিবারের চরিত্রগুলো মিলেই তৈরি হয়েছে সলপের বহুমাত্রিক জীবনের উপন্যাস। যে উপন্যাসের চরিত্রগুলো উঠে এসেছে ইতিহাসের পাতা থেকে। যার প্রতিটি চরিত্রই ক্ষণে ক্ষণে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। তাদের ছিলো নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থান।
উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় এর ভাষা। ইমতিয়ার শামীমের গদ্যে এক ধরনের কাব্যিকতা আছে, যা পাঠককে ধীরে ধীরে সলপের কৃষক, জমিদারদের জীবনের মধ্যে টেনে নিয়ে যায়। তার বর্ণনায় নদী, শস্য, জীবন সবকিছুই জীবন্ত সত্তা হয়ে কল্পনায় ধরা দেয়। অনেক জায়গায় মনে হয় না আমরা কোনো উপন্যাস পড়ছি, বরং বহু পুরোনো কোনো লোককথা বা জনপদের ইতিহাসের অ্যাখান শুনছি। লেখক উপন্যাসকে সংলাপ নির্ভর না করে বরং বর্ণনা নির্ভর ভাবে তুলে এনেছেন। শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে উপন্যাসে সেই সময়কার ব্যবস্থাকে যে ভাবে ফুটে তুলেছেন তাতে উপন্যাসটা সময়ের পরিক্রমায় সেই সময়ের সাথে ভাষার কারণে ভালো ভাবেই মিশে গেছে।
লেখকের চরিত্র নির্মাণও অসাধারণ বলতে হয়। দোয়াউল্লাহ্, মেহের, ক্ষুদি, ঈশানচন্দ্র কিংবা সান্যাল জমিদারদের প্রতিটি চরিত্রকেই লেখক সময় ও সমাজের প্রতিনিধি হয়ে নানান ক্ষেত্রে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রেখেছেন, নির্দিষ্ট কাউকেই ঠিক এই গল্পের প্রধান চরিত্র বলা যায় না। প্রতিটি চরিত্রেরই স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছ�� উপন্যাসে। বিশেষ করে সাধারণ কৃষক পরিবারের মানুষদের যেভাবে গল্পের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে, তা উপন্যাসটিকে আরও মানবিক করে তোলেছে।
তবে এই উপন্যাস সহজপাঠ্য নয়। প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার বিস্তৃত এই আখ্যান ধৈর্য নিয়ে পড়তে বেশ কষ্ট হয়েছে। ইতিহাস, অঞ্চল, চরিত্র ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝে পড়তে পারলে তবেই এ উপন্যাসের গল্পের গভীরে হয়তো পুরোপুরি অনুভব করা সম্ভব হবে। কিন্তু ধৈর্য ধরে পড়তে পারলে গল্পের সলপের মানুষদের দুঃখ, ক্ষোভ আর সংগ্রামের গল্প খুব একটা খারাপ লাগবে না। মাঝে মাঝে অবশ্য মনে হচ্ছিলো গল্প থেকে ছিটকে পড়ছি পরক্ষণেই আবার গল্পে ফিরেছি। মনে হয়েছে লেখক চাইলেই এখানে আরো কম লিখতে পারতেন, কোনো কোনো জায়গায় পরিমিতর চেয়েও বেশি লিখেছেন মনে হয়েছে। তবে গল্প যতই শেষ প্রান্তে গিয়েছে ততই দেখা গেছে লেখকের বর্ণনা আরো শানিত হয়েছে। আর শেষে মনে হয়েছে, আহ! আমিও যদি বিদ্রুক হতে পারতাম, জোনাকির মতো এক রাতে একটু আলো জ্বেলে হলেও যদি পারতাম মরে যেতে।
বইটির প্রচ্ছদটা বেশ চমৎকার, গল্পের সাথে মানানসই। তবে বইয়ের মেকাপটা ঠিক পছন্দ হবে না। চারদিকে যে পরিমাণ মার্জিন রাখা হয়েছে তা প্রচন্ড বিরক্তির উদ্রেক করেছে। মার্জিন চাইলে আরো কমানো যেত তাতে পৃষ্ঠাও কমে আসতো।