কিন্তু ফুলশয্যাই যদি স্মৃতির কবর খুঁড়ে তুলে আনা একটুকরো বিষাক্ত স্মৃতির আঘাতে কালরাত্রি হয়ে যায়, তখন কী করা যায়?
যাত্রা শুরুর আগেই ভেঙে পড়া জাহাজের কাণ্ডারি সায়ন ঠিক করল, হনিমুনে সে না হয় একাই যাবে প্রিয় কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে- তবে এবার একেবারেই উদ্দেশ্যহীন হয়ে। গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগে এক সহযাত্রীর কাছ থেকে সে এক অদ্ভুত জায়গার সন্ধান পেল, যেখানে নাকি সবাই যেতে পারে না। নানা কারণে চলতি
পথ ছেড়ে সে সেখানেই যাওয়ার রাস্তা ধরল। পৌঁছেও গেল সেই নিঃসঙ্গ পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে।
আর তার থেকে ‘দুই পা ফেলিয়া’ দূরত্বে তার সঙ্গে আলাপ হল এক বৃদ্ধার। তিনি দাবি করলেন, ভবিষ্যৎ কিন্তু অতীতের মতো নিরেট নয়। অতীতের ভুল শোধরালে ভবিষ্যতও নাকি বদলে যায়!
তারপর কী হল?
স্মৃতির সরণি বেয়ে নিজের ফেলে আসা দিন আর দ্বিধাদীর্ণ বর্তমানের গল্প বলল সায়ন। সে কি তাহলে পারল নিজের ভবিষ্যৎকে বদলে নিতে?
আমাদের সবার অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের ভাবনা, আর ভবিষ্যতের কুয়াশা নিয়েই লেখা হল ‘নভেম্বর রেইন!’
"I shall be telling this with a sigh Somewhere ages and ages hence: Two roads diverged in a wood, and I— I took the one less traveled by, And that has made all the difference." আজ থেকে একশো দশ বছর আগে লেখা এই লাইনগুলো মনে-মনে আওড়ায়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। জানি না, 'আটলান্টিক মান্থলি' পত্রিকায় প্রকাশের জন্য এই কবিতাটা পাঠানোর সময় রবার্ট ফ্রস্ট কী ভেবেছিলেন। কিন্তু জীবনের এক-একটা সন্ধিক্ষণে নেওয়া সিদ্ধান্ত বা আচরণ পরে, বিশেষত সংকটকালে, আমাদের প্রত্যেককে নিজের-নিজের জীবনের "দ্য রোড নট টেকন্"-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সত্যিই যদি সুযোগ আসত সেই অন্য, ফেলে আসা পথ ধরে চলার, আমরা কী করতাম? আমরা কি সত্যিই পারতাম বর্তমানের সব না-পাওয়ার পাশাপাশি যা-কিছু সঞ্চয় তাকেও ছুড়ে দিতে, যাতে নতুন করে সব শুরু করা যায়? লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলমেন, ওয়েলকাম টু " নভেম্বর রেইন"— এক আপাতদৃষ্টিতে উপন্যাস, যা আদতে আমাদের প্রত্যেককে একটা আয়নার সামনে দাঁড় করায়। গল্পের প্রটাগনিস্ট সায়নের মতো আমরাও নিজেদের স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত আর অনিচ্ছাকৃত ভুলে গুমরে উঠি। আমরাও পুপুলের মতো মেঘের স্বপ্ন দেখে বালিতে বাসা বাঁধার কষ্ট নিয়ে বৃষ্টি খুঁজি— যাতে চোখের জল তাতে ঢাকা পড়ে যায়। আমরাও খুঁজে বেড়াই সেই মুহূর্তটা— যখন পাশার দান একটু অন্যরকম ফেললে জীবনটাই হত... ভালো? মন্দ? অন্যরকম? এ এক অসাধারণ লেখা। একে পড়তে গিয়ে আমি নিজে ভেতরে-ভেতরে হেসেছি, কেঁদেছি, একবুক শ্বাস টেনে সোজা হওয়ার চেষ্টা করেছি, শেষে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে ভেবেছি~ "নাথিং লাস্টস্ ফরেভার!" বইটা, আমার মতে, সত্যিই অনন্য। স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার গদ্যে, ছোট্ট-ছোট্ট অধ্যায়ে লেখক যে কাহিনিটি পেশ করেছেন, তার মতো কিছু, অন্তত সাম্প্রতিক কালে লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। শাবাশ, লেখক! টেক আ বাও।
📖 বই - নভেম্বর রেন ✍🏻 লেখক/লেখিকা - কৌশিক সামন্ত 📚 প্রকাশনা - Aranyamon Prokashoni 💵 মুদ্রিত মূল্য - ২২৫/- ভারতীয় টাকা 📑 পৃষ্ঠা সংখ্যা - ১২৫ টি
📃 বিষয় বস্তু - ফুলশয্যার দিন রাত্রি বেলায় সায়ন আর তার সদ্য বিয়ে করা বউ সর্বাণীর মধ্যে এমন কিছু ঘটে, যার ফলে এই নব দম্পতির মধ্যে বিয়ের প্রথম দিনেই বিভেদ সৃষ্টি হয়ে যায়। যার ফলে নিজের হানিমুনে একাই বেড়িয়ে পড়ে সায়ন। তার কারণ, দোষ যে তারই ছিল, তাই সর্বাণী তার সাথে কোথাও যেতে চায়নি। বাধ্য হয়ে সায়ন যখন যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে, পথ মধ্যে তার সাথে দেখা হয় এক বৃদ্ধর, যে কিনা সায়নকে বলে নতুন একটি আনকোরা জায়গায় যেতে, যেখানে গেলে তার জীবন বদলে যেতে পারে। সায়ন সেই জায়গায় গিয়ে দেখা পায় একজন বৃদ্ধার, যিনি দাবী করেন যে, অতীতের ভুল শোধরানো যেতে পারে, যার ফলে তৈরি হবে নতুন এক ভবিষ্যৎ। কিন্তু তার জন্য সায়নকে বলতে হবে তার অতীতের কাহিনী। এরপরে কি হল? সায়ন কি তার অতীতের কাহিনী সত্যিই তুলে ধরল সেই বৃদ্ধার কাছে? সেকি সত্যিই পারলো নিজের ভবিষ্যৎকে বদলাতে? জানতে হলে পড়তে হবে এই কাহিনীটি।
📈 পজিটিভ পয়েন্টস - গল্পের প্লট, লেখনী, চরিত্র গুলির গঠন, ফিলজফি এবং ইমোশনের সুন্দর মিশ্রণ, ছোট ছোট চ্যাপ্টার, বইটির সাইজ।
❎ নেগেটিভ পয়েন্টস - এই বইতে আমার নেগেটিভ পয়েন্ট তেমন নজরে আসেনি।
🙏🏻 উপসংহার - বৃষ্টি হওয়ার পরেও যেমন তার রেশ খানিকক্ষণ থেকে যায়, তেমনই এই নভেম্বর রেইন শেষ করার পরেও তার একটা রেশ থেকে যায়। সেই রেশ কেমন তা বলে বোঝানো মুশকিল, কারণটা হল এর শেষটা। স্পয়লার হয়ে যাবে বলে, এর থেকে বেশি কিছু বলছিনা। কৌশিক বাবু তার লেখনীর মাধ্যমে এমন একটা জাদু বিস্তার করেছেন যে, আমি সত্যিই মুগ্ধ না হয়ে পারিনি। কৌশিক বাবুর কাছে তাই একটাই অনুরোধ - ভৌতিক, অপার্থিব লেখা আসলে আসুক, তাতে অসুবিধা নেই, তার সাথে সাথে এরকম লেখাও কিন্তু আরও চাই, যেটা পড়তে গিয়ে আমরা খানিকক্ষণের জন্য হলেও সেই জগতে হারিয়ে যেতে পারি। বইটি আমি সকল সাহিত্য প্রেমীদের পড়ার জন্য রেকমেন্ড করছি।
👉🏻 এই কাহিনী/কাহিনী সংকলনের পাঠ প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত। অন্যের মতের সাথে মিল নাও হতে পারে।
Coffee ☕ নিয়ে বসে আগে নিজেকে Charge দিয়ে নিলাম, তারপর ঘন্টা দুয়েক এর মধ্যেই বইটি শেষ! লেখক কৌশিক সামন্তের লেখা বছর ডেরেক আগে পড়েছিলাম সেই ‘বোরিংপুর বাইফোকালস্’ বইটি, ভীষণ ভালো লেগেছিলো। তারপর এই ‘নভেম্বর রেইন’...... ‘নভেম্বর রেইন’ বইটি ২০২৫ কলকাতা বইমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয়। মেলা শেষ হওয়ার আগেই প্রথম মুদ্রণ শেষ, যথারীতি আবার ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বইটি দ্বিতীয় মুদ্রণ আসে। তারপর সংগ্রহ করা....... 'নভেম্বর রেইন' একটি বিখ্যাত গান! গল্প লেখার ধরন এলমেল, তবে ভীষণ গুছিয়ে.... আর মাঝে মাঝে রয়েছে চমৎকার সব memes আর একটা ব্যাপার হলো এটাকে ঠিক Romantic Novel বলা যায় না। তবে মাঝে মাঝে লেখক মশাই খুব সুন্দর ভাবে Romantic মুহূর্ত তৈরি করেছেন।🤭 উপন্যাসে রয়েছে উদ্দেশ্যহীন যাত্রা, নিঃসঙ্গ পাহাড়, একাকিত্বের অনুভব, আর ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। খাসা লিখেছেন মানতেই হবে, এমনি-ই কি আর এই বইটি নিয়ে এতো মাতামাতি social media তে! পড়ার পড় বুঝলাম ব্যাপারখানা....... আর প্রচ্ছদ ও আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি, আপনিও আপনার নিঃসঙ্গ যাত্রা পথের সঙ্গী করতে পারেন এই 'নভেম্বর রেইন'-কে, সময়টা নিঃশব্দে বয়ে যাবে..... বইটি অরণ্যমন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। মুদ্রিত মূল্য ২২৫/- #নভেম্বর_রেইন 📖🏞️
জীবনের এমন একটি পর্যায়ে চলে এসেছি যেখানে নিজের সবথেকে প্রিয় কাজগুলো করতেও চরম অনীহা বোধ করছি । বেশ কিছুদিন ধরে কোনো বই পড়তে পারছি না, সিনেমা দেখতে পারছি না... কোনো বিষয়েই কোনো আগ্রহ পাই না আর । শেষ কবে যে একটা বই এইরকম একটানা শেষ করেছি, সেটা নিজেই ভুলে গেছি ।
কিছু কিছু বই থাকে যেগুলো পড়ে ফেললেও নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়ে ওঠে না । এমন কিছু বই থাকে যেগুলো পড়ার পর গলার কাছে কিছু একটা আটকে থাকে, একটা ঢোঁক গিলে সেটা আত্মস্থ করে নিতে হয় । নির্দিষ্ট কিছু শব্দে বা কয়েকটি বাক্যে এইধরণের বইয়ের কোনো পাঠ-প্রতিক্রিয়া লেখা যায় না, বরং প্রতিক্রিয়া হিসেবে থাকে একরাশ মুগ্ধতা ।
▫️'নভেম্বর রেইন' ! আমেরিকান ব্যান্ড 'গানস্ এন্ড রোজেস'-এর একটি বিশ্ববিখ্যাত গানের নামে এই উপন্যাসের নামকরণ !! কিন্তু এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু কি ? কেন পড়বেন এই উপন্যাস ?
এর উত্তর দেওয়ার আগে আপনাদেরকে কিছু প্রশ্ন করি বরং... জীবনে কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন ? না না, পরিপূর্ণ প্রেমের কথা বলছি না, একতরফা ভালোবেসেছেন কখনো ? কলেজ জীবনে এমন কিছু বন্ধু পেয়েছেন কি, যাদের গুরুত্ব ঐ 'বন্ধু' শব্দটির থেকেও অনেক বেশি ? আচ্ছা, কখনো হোস্টেলে থেকেছেন কি ? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন... নিজের জীবনের কোনো নির্দিষ্ট সময়কাল বা নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে আপনি কি মনেপ্রাণে 'অতৃপ্ত' ? যদি আপনাকে সুযোগ দেওয়া হয় আপনার জীবনের সেই নির্দিষ্ট সময়কাল পরিবর্তন করার, আপ��ার জীবনটা আপনার ইচ্ছামতো করে সাজিয়ে নেওয়ার, আপনি কি করতেন ?
▫️১২৪ পাতার ক্রাউন সাইজের বইটির মধ্যে প্রেম-বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব, হোস্টেল জ���বন, পাহাড়ের বুকে অবস্থিত এক ছোট্ট জনপদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য... এই সবকিছুই আছে । আর আছে জাদুবাস্তবতার ছোঁয়া । লেখকের স্বাদু গদ্য আর টানটান লেখনী এক নিঃশ্বাসে বইটি শেষ করতে বাধ্য করেছে, অথচ এটি কিন্তু কোনো 'থ্রিলার' বই নয় । গোটা উপন্যাস জুড়ে অজস্র পপ-কালচার রেফারেন্স, পুরোনো গানের লাইন, সাম্প্রতিককালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া মিম্ - সবই আছে । যে কোনো দৃশ্যের বর্ননা যে কত 'পরিমিত' শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে করা যেতে পারে, তার প্রকৃত উদাহরণ এই বইটি । কোথাও বর্ণনার আধিক্য নেই । এই লেখকের আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ওনার 'সূক্ষ রসবোধ' প্রবল । বিষাদময় কোনো দৃশ্যের বর্ণনার সাথে এতো সুনিপুণভাবে হাস্যরস মিশিয়ে দেন, যে পড়ার সময় মনটা খারাপ হলেও ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি লেগেই থাকে ।
▫️শেষটুকু : আমি জানি অনেকেরই এই উপন্যাসের শেষ অংশটুকু পছন্দ হবে না, কিন্তু আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে এর থেকে 'যথাযথ' সমাপ্তি বোধহয় আর কিছু হয় না । জীবনটা শাহরুখ খানের সিনেমা বা স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর উপন্যাস নয়, যে শেষমেশ সবকিছু 'ঠিক' হয়ে যাবে । 'Life is unpredictable' - এর চেয়ে বড়ো সত্যি আর কিচ্ছু নেই । আর তাছাড়া যে উপন্যাসের নাম 'নভেম্বর রেইন' তার শেষটা তো 'Nothing lasts forever' দিয়েই হবে, তাই নয় কি ?
▫️কিছু কিছু বই পড়তে পড়তে চোখ ভিজে ওঠে । 'নভেম্বর রেইন' এইরকমই একটি বই । 'নভেম্বর রেইন' পড়ুন... হয়তো মনে রাখবেন, অথবা রাখবেন না... কিন্তু পড়ার পর সহজে ভুলতে পারবেন না ।
"মানুষের এসকেপিজমের বাসনা তীব্র। সিনেমা-বই-কবিতা কিম্বা পাহাড় --- সবগুলোই সেই দিকশূন্যপুরে হারিয়ে যাওয়ার হাতছানি।"
গত কয়েকদিনের ভীষণ hectic schedule-এর tiredness থেকে এসকেপের উদ্দ্যেশ্যেই আজ পুজোর পরে দুপুরে হারিয়ে গিয়েছিলাম নভেম্বরে রেইনের পাতায়। তারপর.....? তারপর ঠিক কী হলো তা তো জানিনা। জীবনেই তো সব গল্প লুকিয়ে থাকে, এখানেও ছিলো কখনো সায়ন, কখনো সর্বাণী, কখনো স্মিতা বা কখনো অনির্বাণের গল্প। আবার কখনো বা দুই অদ্ভূত চরিত্রের প্রভাব। Engineering জীবনের শৈশব-কৈশোর বা যৌবন কী ভীষণভাবে relatable আমার কাছে, সে বলে বোঝানো যাবেনা। সায়ন না, যেন আমিই ওই পরিস্থিতিতে থেকেছি বা সচক্ষে দেখেছি।
কিন্তু এটুকুই না। এ কাহিনী ইঞ্জিনিয়ারিং জীবনের নয়, আর না-ই কোনো নিছক প্রেম কাহিনী। প্রায় শেষভাগ পর্যন্ত একরকম, চারপাতা আগে আরেকরকম, একদম শেষ প্রান্তে আবার একটা বজ্রপাত। এ কাহিনী কীরকম সেটা প্রত্যেক পাঠকের কাছে নিজস্ব। এ কাহিনী শুধুই পড়ার নয়, অনুভব করার, জীবনের রেলগাড়ির চালক সময়ের হাতে নিজেকে আবিষ্কার করার। তবে, সময়ের কাছে কি সত্যিই এতো সময় নেই যে দ্বিতীয়বার আপনাকে সময় দেবে? বেঁকে যাওয়া, কুয়াশায় মিলিয়ে যাওয়া পথে একবার নতুন করে পথচলা শুরু করে দেখুনই না সেকেন্ড চান্স পান কিনা।
যে বইয়ের প্রতি অনেকদিন থেকেই নজর ছিলো সেটি কখন যে শেষ হলো, কেনো যে শেষ হলো দুটোর উত্তরই আমার কাছে নেই। প্রথম কথাটাই বলবো এখনো পর্যন্ত যেটুকু দেখেছেন, যেটুকু জেনেছেন এই বই সম্পর্কে, এ বই না পড়লে এর ১%-ও বুঝতে পারা যায়না, আমি পারিনি, আপনিও পারবেন না। অনেক কিছু লিখতে, কল্পনা করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু ভাষা পাচ্ছিনা, আর কল্পনা করতে তো সেসব নিয়মকানুন লাগেনা, তাই ওটাই করি আপাতত, বাকিটা না হয় আপনারা পড়েই বুঝে নেবেন।
অসাধারণ একটি বই। ♥️ প্রতিটি শব্দকে অনুভব করেছি। রিলেট করেছি নিজের লাইফের সাথে। কিছু লাইন মনে দাগ রেখে গেছে। কম বয়সের প্রেম হোক আর মধ্য বয়সের। না পাওয়া ভালোবাসার অনুভূতি কোনোদিন বোঝানো সম্ভব না। কিন্তু লেখক একটি অসম্ভব কাজকে সম্ভব করেছেন।
পাহাড়ি গ্রামে এখন বহু মানুষ যান ঘুরতে অথবা ট্রেন্ড এর চক্করে। খুব কম মানুষই আছেন যারা নিজেদেরকে একবার খুঁজতে যান সেখানে। অনেক না পাওয়ার গল্পের খোঁজে যায়। পাহাড়ি নিস্তব্ধতা আমাদের অনেক না পাওয়া উত্তর দিয়ে যায় যেটা আমরা এই শহুরে আবহাওয়ায় বুঝতে পারিনা।
এই বই সেরকম অনেক অনুভূতির সম্ভার। এই বই সত্যিই এমন একটা রেশ রেখে যায় মনে যেটা আমাদের একটু হলেও নস্টালজিক করে তোলে আর পুরোনো স্মৃতিচারণায় নিয়ে যায়।
🌧️ “নভেম্বর রেইন” কৌশিক সামন্তের নভেম্বর রেইন পড়তে গিয়ে মনে হল, কেউ যেন নিঃশব্দে বসে আছে জানালার পাশে, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, আর ভিতরে মনটা ভিজে যাচ্ছে পুরোনো স্মৃতিতে। গল্পটা মূলত সায়ন নামের এক মানুষের—যে একা হয়ে গেছে নিজের সিদ্ধান্তে। হানিমুনে যাচ্ছে একাই, কিন্তু একাকীত্বে। পাহাড়, বৃষ্টি, আর এক অচেনা বৃদ্ধা—যিনি নাকি অতীত বদলানোর এক অলৌকিক পথের কথা বলেন। এখানেই গল্পটা ধীরে ধীরে মিশে যায় বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখায়। সবচেয়ে বেশী ভালো লেগেছে লেখার ভেতরের নরম আবেগটা। কষ্ট আছে, কিন্তু চিৎকার নেই। ভালোবাসা আছে, কিন্তু চুপচাপ, গভীর, ঠিক নভেম্বরের বৃষ্টির মতো। বাস্তবের ছোঁয়াতে শেষটায় শান্ত হাহাকার। কেউ যদি জীবনের ভুল, ভালোবাসা বা হারিয়ে যাওয়া সময়ের জন্য নিজের ভেতরে কিছু খোঁজে—এই বইটা তার সঙ্গে নিঃশব্দে কথা বলবে। বারবার প্রশ্ন করাবে কেন হল? এমনটা কেন হল? এক কথায়, নভেম্বর রেইন এমন একটা বই, যেটা শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও মনের মধ্যে হালকা ভিজে গন্ধ রেখে যায়—ভালোবাসার, আফসোসের, আর অল্প নিজস্বতায় বাঁচার।
কোনও কোনও দিন চারপাশ অন্ধকার করে যখন হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামে, বাড়িতে থাকলে জানলা দিয়ে দেখতে বেশ লাগে। সেই অঝোর বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া আর মাটির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে মনের কোনে বাসা বাধে একরাশ মন খারাপ। ‘নভেম্বর রেইন’ পড়ার পর অভিজ্ঞতা ঠিক সেরকমই। বৃষ্টি দেখতে যেমন ভালো লেগেছে, তেমন উপভোগ করেছি বিষাদও। পড়তে পড়তে আমিও যেন নস্টালজিয়ার হাতছানিতে ফিরে গিয়েছিলাম কলেজের দিন গুলোতে। যেই গল্পগুলো আমার আপনার অতীত জুড়ে রয়েছে, সেই গল্পগুলোই স্মৃতির চিলেকোঠায় থাকে তালাবন্ধ হয়ে। কখনো কখনো যখন সেইসব অনুভূতিগুলো অজান্তেই ভেসে ওঠে মনে, তখন হয় এক চিলতে হাসিতে ভরে ওঠে মুখ কিংবা বেড়িয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। কারো কারো জীবনে শীতের দিনের সেই অকাল বৃষ্টি হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হয় না, কিন্তু কারও কারও জীবনে হয়! তাই লেখকের কলমে সেই বিখ্যাত ‘নভেম্বর রেইন’ গানের একটি লাইন বারবার আশ্বাসরূপে ফিরে আসে, ‘Cause nothin' lasts forever, even cold November rain’ সায়নের জীবনও এর ব্যতিক্রমী নয়। ভিজতে ভিজতে ক্লান্ত হয়ে একদিন সেও জোসেফের মতন রংচটা পাহাড় হতে চায়, চায় প্রকৃতিতে মিলিয়ে যেতে। কিন্তু কোনও এক অজানা মায়াবলে সে যদি আরেকবার সুযোগ পায়? তবে কি সায়ন বসন্ত হতে চাইবে? নাকি হতে চাইবে ‘মুক্ত ও স্বাধীন – যেন আরব বেদুইন’? নাকি পাখি হয়ে ফিরে আসতে চাইবে বার বার? আসলে শেষেই যে শুরু- সময়চক্র! যা সৃষ্টির শুরু থেকে প্রতি মুহূর্তে বিদ্যমান। আর সৃষ্টিকর্তা? সে কি স্বয়ংসম্পূর্ণ? নাকি, he also needs someone?
সম্পাদনায় ঋজু গাঙ্গুলী, অলংকরণ করেছেন ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য। সর্বসাকুল্যে ছয়টি ইলাস্ট্রেশন আছে, সবকটিই বেশ সুন্দর। প্রচ্ছদটিও বেশ মনকাড়া। লেখার মধ্যে একটা সার্কাসম্ আছে, তাতে বেশ বিষাদঘন মুহূর্তেও আপনার মুখে স্মিতহাসি এনে দেবে। সময়ের বেড়াজাল পেড়িয়ে হারিয়ে যাবেন অতীতে। বেশ কিছু লাইন মন ছুঁয়ে গেছে, আলাদা করে ভাবিয়েছে। উপন্যাসটিতে কখন যে ইমোশনাল রোলারকোস্টারের মধ্যে দিয়ে বাস্তবের সাথে ম্যাজিকাল রিয়েলিজম্ মিশে যাবে, ধরতে পারবেন না। বেশ সুখপাঠ্য। যদি আপনি আরও একটিবার অতীতের চাওয়া পাওয়ার হিসেবগুলো মিলিয়ে দেখতে চান, যদি আপনিও ভিজতে ভিজতে ক্লান্ত, তাহলে এই উপন্যাসটি অবশ্যই আপনার জন্য।
💬ব্লার্ব : কালরাত্রির পর ফুলশয্যা হয়, তাই তো? কিন্তু ফুলশয্যাই যদি স্মৃতির কবর খুঁড়ে তুলে আনা একটুকরো বিষাক্ত স্মৃতির আঘাতে কালরাত্রি হয়ে যায়, তখন কী করা যায়? যাত্রা শুরুর আগেই ভেঙে পড়া জাহাজের কাণ্ডারি সায়ন ঠিক করল, হনিমুনে সে না হয় একাই যাবে প্রিয় কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে- তবে এবার একেবারেই উদ্দেশ্যহীন হয়ে। গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগে এক সহযাত্রীর কাছ থেকে সে এক অদ্ভুত জায়গার সন্ধান পেল, যেখানে নাকি সবাই যেতে পারে না। নানা কারণে চলতি পথ ছেড়ে সে সেখানেই যাওয়ার রাস্তা ধরল। পৌঁছেও গেল সেই নিঃসঙ্গ পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে। 'আর তার থেকে 'দুই পা ফেলিয়া' দূরত্বে তার সঙ্গে আলাপ হল এক বৃদ্ধার। তিনি দাবি করলেন, ভবিষ্যৎ কিন্তু অতীতের মতো নিরেট নয়। অতীতের ভুল শোধরালে ভবিষ্যতও নাকি বদলে যায়! তারপর কী হল? স্মৃতির সরণি বেয়ে নিজের ফেলে আসা দিন আর দ্বিধাদীর্ণ বর্তমানের গল্প বলল সায়ন। সে কি তাহলে পারল নিজের ভবিষ্যৎকে বদলে নিতে? আমাদের সবার অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের ভাবনা, আর ভবিষ্যতের কুয়াশা নিয়েই লেখা হল 'নভেম্বর রেইন!'
“নভেম্বর রেইন”: এক ফোঁটা মেঘলা বৃষ্টি, এক গাল হিমেল দীর্ঘশ্বাস — একটি প্রেমের উপন্যাস নয়, এটি আমাদের জীবনের আয়নায় এক ঝাপসা প্রতিচ্ছবি
কৌশিক সামন্তের নভেম্বর রেইন এক নিঃশব্দ গর্জনের নাম। বাইরের দিকে এটি একটি আত্মবিশ্লেষণী প্রেমের উপন্যাস, অথচ ভেতরে ভেতরে এটি সেই না-বলা কথাগুলোর নোটবুক, যা আমরা বুকে চেপে রাখি বছরের পর বছর। প্রেম? হ্যাঁ, প্রেম আছে, তবে তা ফুল-চকলেট-ক্যান্ডেললাইট নয়। বরং এখানে প্রেম ঠিক ওই “I am half agony, half hope.” — জেন অস্টেনের পের্সুয়েশন-সুলভ আত্মবিচ্ছেদ। একেবারে মজ্জায় বসে যাওয়া ঘুমকাতুরে ভালোবাসা, যা সায়নের চরিত্রে উঠে আসে প্রতিটি পৃষ্ঠায়।
এই বইতে সায়নের ‘ফেলনা অতীত’ আর ‘ভয়ানক বর্তমান’ এক রহস্যময় পাহাড়ি গ্রামে এসে মুখোমুখি হয় এক অলৌকিক সম্ভাবনার। দ্বিতীয় সুযোগ — one last chance — যা আমরা সবাই চাই, কিন্তু ক’জনই বা পাই? আর সেই সুযোগের প্রশ্নে, লেখক আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তের মুখে, এমন এক মোরে, যেখানে পাঠক যেন নিজেকেই খুঁজে পান সায়নের জায়গায়।
পাহাড়, কুয়াশা, হোমস্টে, কাঞ্চনজঙ্ঘা — নিছক লোকেশন মাত্র নয়, এরা প্রত্যেকেই যেন প্রতীক হয়ে ওঠে — যন্ত্রণার, পুনর্জন্মের, আত্মদর্শনের। “I want to do with you what spring does with the cherry trees.” — এখানে সায়নের সেই কামনা নেই, বরং সেই নবজন্মের আকাঙ্ক্ষা আছে। একটা পুরোনো সম্পর্ককে ভালোবাসার রঙে নতুন করে রাঙানোর আকাঙ্ক্ষা, এক নতুন বসন্ত চাওয়ার লালসা।
আর পুপুল? সে কি কেবল বিরক্ত স্ত্রীর প্রোটোটাইপ? মোটেও নয়। সে সেই সমস্ত নারীদের প্রতিচ্ছবি, যারা চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, অপেক্ষা করে — ঠিক সেই Hafiz-এর অমর লাইনের মতো:
“I wish I could show you, when you are lonely or in darkness, the astonishing light of your own being.”
যদি বলি এই উপন্যাসে "ভালবাসা" শব্দটি এক হাজার মুখোশ পরে এসেছে, তবে ভুল হবে না। কখনও তা স্মিতার একতরফা মোহ, কখনও তা লিলি ম্যাডামের অদ্ভুত ট্রান্সেন্ডেন্স, আবার কখনও তা পুপুলের নিঃশব্দ সম্মতি। কিন্তু তার মূল সুর — দ্বন্দ্ব।
“I burn, I freeze; I am never warm. I am neither ice nor fire.” — জ্যঁ রাসিনের এই পঙ্ক্তি যেন সায়নের হৃদয়ের প্রতিধ্বনি।
সায়নের সেই দোদুল্যমানতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফিট্জেরাল্���ের সেই obsessive longing-এর কথা: “She was more than human to me. She was a star. I would have followed her to the end of the world.”
লেখকের কারুকাজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সময়ের প্রেক্ষাপটে মানুষের হৃদয়বৃত্তের চলমানতা। প্রতিটি অধ্যায় যেন নিজেই এক ছোট গল্প, একেকটা বাঁক, একেকটা নদীর মোহনা — যেখানে এসে আমাদের প্রতিদিনের ক্লান্তিগুলো আশ্রয় নেয়।
কিন্তু যেটা সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়, তা হল উপন্যাসের শেষাংশ — যেখানে রহস্য মিশে যায় দার্শনিকতায়। যেখানে সময় ঈশ্বরের মতো দাঁড়িয়ে আছে — ন্যায় বা অনুকম্পা নয়, শুধুই নিয়ম দিয়ে চলা এক শীতল বিচারক।
এখানে কোনও এক রাত্রি শেষ হয় না, শুধু নতুন কোনও melancholy rain শুরু হয় — মনছোঁয়া বৃষ্টিতে, যেখানে
“Whatever our souls are made of, his and mine are the same.” — এমিলি ব্রন্টের এই কথা যেন পাঠকের নিজের জন্যই লেখা বলে মনে হয়।
যা ভালো লেগেছে:
১) ঝরঝরে ভাষা, গতি আর ব্যাকরণচর্চার বাইরে গিয়ে লেখক হৃদয়ের গহীনে গিয়ে লেখেন।
২) পেছনে ফেলে আসা কলেজের দিনগুলোকে এতো বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তোলায় মন কেমন হয়ে আসে।
৩) পুপুল চরিত্রটি এক অনুচ্চারিত বিপ্লব — সাহসী, সহনশীল, কিন্তু দৃঢ়।
৪) লিলি ম্যাডাম এবং ফিকলেগাঁও — এই দুই চরিত্র ও জায়গা যেন অলৌকিক রূপকথার দ্বারপাল।
একটুখানি আফসোস: শেষের ম্যাজিক রিয়ালিজমের অংশটি কিছু পাঠকের কাছে কিছুটা overdone মনে হতে পারে, তবে তা ���াঠ্যবস্তুর ঋজুতাকে তেমন প্রভাবিত করে না।
শেষে বলব: “Love me or hate me, but spare me your indifference.” — এই উপন্যাস ঠিক তাই করে, পাঠককে কোনোভাবেই উদাসীন থাকতে দেয় না।
Final Verdict: নভেম্বর রেইন একবার পড়লে সাধ মেটেনা। এটি একবার পড়ে হৃদয়ে রেখে দেওয়ার মতো বই — আর তারপর যতবার খুলবেন, ততবার নতুন কিছু বলে যাবে। প্রেম, পাপ, পুশব্যাক, পুনর্জন্ম — সব মিলে এক গোলমেলে অথচ আশ্চর্যরকম সুন্দর হেমন্ত বিকেলের উপন্যাস।
আসলে ব্যাপারটা কী জানেন, Love carries within it a regenerative fire — it dies, it burns, and yet it rises again and again, like a phoenix from its own ashes, more luminous each time; it perishes in flame, only to rise reborn, fiercer, brighter, ever undying.
এমন লেখার জন্য কৌশিক সামন্ত, তোমার সঙ্গে শেষ যখন কথা হয়েছিল, তোমার বয়স অনেকটাই কম। তোমার কলমে অবশেষে যৌবন ডানা মেলতে আরম্ভ করেছে।
তোমার জন্য মহাকবি রুমির ভাষায় বলি "In your light I learn how to love. In your beauty, how to make poems.”
📘 বই : নভেম্বর রেইন ✒️ লেখক : কৌশিক সামন্ত 📚 প্রকাশক : অরণ্যমন 💰 মুদ্রিত মূল্য : 225 📖 পাঠ অনুভূতি : শ্রী
"Waqt jaaye main rok na paaun Tu thodi der aur thehar ja..."
সময়কে কে কবে আটকাতে পেরেছে কোনদিন ? তবুও মানুষ চায় ধরে রাখতে | স্মৃতির খড়কুটো আঁকড়ে ধরে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে বেঁচে থাকে অতীত | তার দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে বারবার | বিষাক্ত সরীসৃপের মতো সে বয়ে আনে কালরাত্রির অভিশাপ |
নাহঃ .. এই বইয়ের গুছিয়ে "রিভিউ" - লেখার মতো দুঃসাহস আমার নেই | এলোমেলো কিছু কথা মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে | সেগুলোকেই শুধু একটু আলতো করে ছুঁয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা মাত্র | জানি, মনের আকাশে যে মেঘ জমে আছে তা থেকে নেমে আসা অসময়ের কয়েক পশলা বৃষ্টির মতোই হয়তো এলোমেলো হবে এই লেখা | তাই প্রথমেই মার্জনা চেয়ে নিলাম |
এই গল্প অতীতের গল্প | সেই যে দিন ভেসে গেছে কবে , রেখে গেছে তার চলে যাওয়ার গন্ধ আর সময়ের আঁচড় ... সেই চলে যাওয়া দিনের গল্প | স্মৃতির সরণি বেয়ে নিজের ফেলে আসা দিন আর দ্বিধাদীর্ণ বর্তমানের গল্প বলে চলে সায়ন | কিন্তু এই গল্প শুধু একা সায়নেরই কি ? নাকি নভেম্বরের এই অকারণ বৃষ্টি সেই সমস্ত মানুষদের ভিজিয়ে দিয়ে যায় যাদের "সুখস্বপ্ন শুরু হতে না হতেই ভেঙে গেছে" | গল্পের পরতে পরতে নেমে আসা মেঘলা দিনের গাঢ় অন্ধকারে হয়তো ঢেকে যায় সেই অগুনতি মানুষের স্মৃতি যারাও কিনা স্বপ্ন দেখবে বলে স্বপ্ন বাঁচিয়েছিল কোনোদিন |
সায়নের গল্প , জোসেফ পাহাড়ের গল্প, পুপুলের গল্প .. আসলে অজান্তে সেই সমস্ত দিনের কথা বলে যায় ... স্মৃতির কবরে নিজের হাতে যাদের দাফন করে এসেছি একদিন | সেই চির অপরিচিতের বিরুদ্ধে চলা অ্যাডাম সাহেবের এ যুদ্ধ আদিম, চিরন্তন | এ যুদ্ধ থামার নয়.. এ গল্প শেষের নয় | এই গল্প বেঁচে থাকার, মানুষের না বলা দুঃখ, অপূর্ণ স্বপ্ন আর ... নভেম্বরের বৃষ্টির মতো অসময়ে ফিরে আসার |
গল্পের শেষ অধ্যায়টা পড়ে প্রথমটায় আমারও মনে হয়েছিল এটা কী হলো ? কেন হলো ? এই অধ্যায়টা না থাকলে হতো না ? তারপর মনে হলো .. জীবনে এমন কত অধ্যায়ই তো সযত্নে পেরিয়ে এসেছি প্রতিদিন আর ভেবে গেছি .. এটা.. এটা কি না হলেই হতো না ? সেদিন সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাইনি | আজ পেলাম | না...হতো না | কারণ, শেষ অধ্যায়টা বড়ো জরুরী.. বড়ো ভীষণ জরুরী | শেষটুকু না থাকলে এ গল্প জীবনের হতো না.. হতো রূপকথার | "কিন্তু... প্রতিটা রূপকথারই একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে | .... .... রূপ খসে গেলে কথারা হারিয়ে যায় !"
তবুও অহেতুক ইচ্ছেরা হানা দেয় মাঝরাতের স্বপ্নের মতো | রূপকথায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় আবার | মনে হয় সময়কে আরও একবার বলি, "আভি না যাও ছোড় কার , কে দিল আভি .. ভরা নেহি,.."
কিন্তু জানি শত সহস্রাব্দ পেরিয়ে গেলেও প্রেমিকের এই "দিল ভরবার" নয় | অপর প্রান্তের মানুষটার মতো সময়েরও আর থাকা হয়না তাই | না বলেও সে নিঃশব্দে বলে যায় ...
"আগার ম্যায় রুক গয়ি আভি, তো যা না পাউঙ্গি কভি ইয়াহি কাহোগে তুম সদা , কে দিল আভি নেহি ভরা যো খতম হো কিসি জাগা ইয়ে অ্যায়সা সিলসিলা নেহি ..."
আর তাই নভেম্বরের বৃষ্টিও থেমে যায় একসময় | থেমে যায় মেঘেদের গান | নিস্তব্ধ হয় বাতাসে বয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ | শেষ হয় আরও কোনো গল্প |
"Cause nothin' lasts forever, even cold November rain !"
একদিনেই পড়ে শেষ করলাম কৌশিক সামন্তের লেখা নভেম্বর রেইন। Guns n Roses এর বিখ্যাত গানের উপর এই উপন্যাসের নাম।
গল্পে যদি আসি, বিয়ের পরে স্ত্রী পুপুলের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চরম মুহূর্তে সায়নের মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায় অন্য নারীর নাম। ব্যস, ওখানেই ফুলশয্যায় ফুলস্টপ ! এরপর অনেক চেষ্টা করেও স্ত্রীকে মানাতে পারেনা সে। কারণ দ্বিতীয় একদিন রাতে সেই একই নারীর প্রোফাইল ঘাটতে গিয়ে ধরা পড়ে যায় সায়ন। ডবল কেলেঙ্কারি ! তাই শেষমেষ হানিমুন এ একাই যেতে হয় সায়নকে। কী ভয়ঙ্কর ! পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য বরাবরই তাকে আকর্ষণ করে। এরপর শুরু হয় তার স্মৃতিরোমন্থন। উপন্যাসের অধিকাংশ অংশ সেটি নিয়েই। কিভাবে সেই আগের নারী স্মিতা তার জীবনে আসে, তার কলেজের দিন, বন্ধুত্ব - এসবই উঠে আসে।
উপন্যাসটা যাকে বলে একটা নস্টালজিয়া ডোজ অর্থাৎ পড়লে নিজের কলেজের দিনগুলো কমবেশি মনে পড়তে বাধ্য। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বন্ধুদের সাথে বাওয়াল, একপাক্ষিক প্রেম, সেমিস্টার, সিনিয়র, র্যাগিং, ক্যামপাসিং - এসবই আছে উপন্যাসে। নিজে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় আমার বেশ ভালই নস্টালজিয়া ট্যুর হয়েছে উপন্যাস পড়ে।
বইয়ের শুরুতে লেখকের ভাষা আমায় মুগ্ধ করেছে। শৈলী বেশ ইমপ্রেসিভ। কিন্তু সেই ভাষা সবজায়গায় সমান থাকেনি। সেটা আবার পেয়েছি উপন্যাসের কিছুটা শেষের দিকে কারণ মাঝে অনেক হালকা মেজাজের মজার সিনের জন্য ভাষাও লঘু হয়েছে। গল্পের শেষটায় যেটা আশঙ্কা করছিলাম সেটাই হয়। সাধারণ স্মৃতিচারণের সাথেও এক অতিপ্রাকৃত উপাদান যোগ হয়েছে। এর ফলে, গল্পের শেষে সঠিক সেন্টিমেন্ট বজায় রাখার জন্য যা হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল তাই হয়েছে। সেটা বোনাস !
উপন্যাসে রয়েছে পপ কালচারের অনেক রেফারেন্স যেমন গেম অফ থ্রোন্স এর জন স্নো এর ইউ নো নাথিং ডায়লগ কিম্বা মার্ভেল এর ভিলেন থ্যানোস এর গন্টলেট এর কথা। রয়েছে মিম রেফারেন্স - হেভি ড্রাইভার ! এরকম আরো অনেক কিছু। যারা এসব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নয় তারা এগুলো মিস করে যাবে ! এগুলো acceptable কিন্তু অনেস্টলি ওই রাজুর পকেট পরোটার রেফারেন্সটা না থাকলেও চলত! তাছাড়া, আরো একটা সিন আমার একটু অড লেগেছে। সেটা হল বৃষ্টির দিনে বাড়ির ছাদে পুপুলের সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়া !
উপন্যাসে রয়েছে কিছু ভালো লাইন যার মধ্যে এই লাইনটা খুব বাস্তবধর্মী আর মনে রাখার মত বলে মনে হয়েছে আমার - 'আজ বুঝি, সবটাই ভুল করছিলাম। একটা মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে হিসেবে ওইভাবে দেবদাস হওয়া আমি অ্যাফোর্ড করতে পারি না। অনেকগুলো কাঁপা কাঁপা হাত অপেক্ষা করে ছিল আমার কাঁধে ভর দেওয়ার জন্য। সেজন্যই আবার চলা শুরু করতে হল।'
আরেকটি বিশেষ কথা, ইন্টিমেট সিন আর ইন্টিমিট থট - এইদুটো ঠিকঠাক লিখতে অনেকেই অসমর্থ হয় ! পরিমিত বর্ণনার কখনও অধিক হয়ে যাওয়ায় ব্যাপারটা ' ক্রিঞ্জ ' লাগতে শুরু করে। কিন্তু লেখক এখানে ক পেয়েছেন। ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের বর্ণনা উনি যেভাবে করেছেন তা সাবলীল ও স্বাভাবিক। ভালো যাকে বলে !
তো সবশেষে বলব, কলেজের নস্টালজিয়া উপভোগ করতে চাইলে আর একদম নতুন বিয়ের পরে কী কী কেলেঙ্কারি করবেন না জানতে গেলে এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাস পড়ে ফেলাই যায় ! কোথাও বোর করবে না !
সদ্যই পড়ে শেষ করলাম কৌশিক সামন্ত স্যারের লেখা "নভেম্বর রেইন" উপন্যাস টি। উনার লেখনীর সাথে আমার প্রথমবার আলাপ হলো এই উপন্যাস দিয়ে। "নভেম্বর রেইন" নাম টাই একটু অন্যরকম, এটা দেখেই বই টা পড়ার আগ্রহ জেগেছিল। তখনই ভেবে নিয়েছিলাম যে কিনতেই হবে বই টা।
কোনও কোনও দিন চারপাশ অন্ধকার করে যখন হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামে, বাড়িতে থাকলে জানলা দিয়ে দেখতে বেশ লাগে। সেই অঝোর বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া আর মাটির সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে মনের কোনে বাসা বাধে একর���শ মন খারাপ। "নভেম্বর রেইন" পড়ার পর অভিজ্ঞতা ঠিক সেরকমই।
আমি কিন্তু কোনো রকম পাঠ প্রতিক্রিয়া দিচ্ছি না এখানে, এবং দিতেও চাই না। আমার মনের কথা টাই শুধু তুলে ধরছি। একজন লেখক যখন কোনো লেখা লেখেন তখন তার লেখা কে বিচার করার কোনো অধিকার আমার নেই। যে কারণে উনি লেখক আর আমি পাঠক।
আসলে জীবনের এমন একটা পর্যায় চলে এসেছি যেখানে নিজের সবথেকে প্রিয় কাজগুলো করতেও চরম অনীহা বোধ করছি। বেশ ক��ছুদিন ধরেই কোনো গল্পের বই সেভাবে পড়তে ইচ্ছে করছিল না। তারপর জানি না কি একটা মনে হতেই এই বই টা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে দিয়েছিলাম।
কিছু কিছু বই থাকে যেগুলো পড়ার পরেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না। বরং প্রতিক্রিয়া হিসেবে থাকে একরাশ মুগ্ধতা ।
এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে এরকমই হয়েছে আমার সাথে। গল্পের মাঝে আমার কান্নাও পেয়েছে। সেই কান্না মনের ভেতরেই হয়ে গেছে। চোখের জল হয়ে আর ঝরতে পারেনি। কোথাও গিয়ে আটকে গেলো। অতীতের অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো।
১২৪ পাতার বইটির মধ্যে প্রেম-বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব, হোস্টেল জীবন, পাহাড়ের বুকে অবস্থিত এক ছোট্ট জনপদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য... এই সবকিছুই আছে।
"নভেম্বর রেইন" এমনই একটি উপন্যাস যেটি পড়ার পরেও এর রেশ অনেকক্ষণ থেকে যায়। যে কোনো দৃশ্যের বর্ননা যে কত 'পরিমিত' শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে করা যেতে পারে, তার প্রকৃত উদাহরণ এই বইটি।
বইটা, আমার মতে, সত্যিই অনন্য। স্বচ্ছন্দ ও নির্ভার গদ্যে, ছোট্ট-ছোট্ট অধ্যায়ে লেখক যে কাহিনিটি পেশ করেছেন, তার মতো কিছু, অন্তত সাম্প্রতিক কালে লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
প্রতিদিন এরকম বই যদি পড়ার সুযোগ পেতাম তাহলে কতই না ভালো হতো।
কৌশিক সামন্তের ‘নভেম্বর রেইন’ এক অসমাপ্ত প্রার্থনার মতো, যা শব্দে নয়, হৃদয়ের স্তব্ধতায় উচ্চারিত হয়। এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হয়, যেন কারও লেখা ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছি—যেখানে প্রেম, অনুশোচনা, আত্মগ্লানি আর একফোঁটা আশার রেখা একসঙ্গে বসবাস করে।
এই গল্পে সায়নের যাত্রা আসলে কোনও গন্তব্যের দিকে এগোনো নয়—বরং ফেলে আসা পথগুলোর দিকে ফিরে তাকানো। অতীতের ধুলোঝরা স্মৃতি, সম্পর্কের ভাঙা গাঁথুনি, এবং হারিয়ে যাওয়া কিছু অপূর্ণতা নিয়ে সে পৌঁছে যায় ফিকলেগাঁও নামের এক পাহাড়ি নীরবতায়। লেখকের কলমে, পাহাড় হয়ে ওঠে এক জীবন্ত চরিত্র—যার নিঃশ্বাসে ধরা পড়ে প্রাচীনতা, আর নিস্তব্ধতায় জমে থাকে নিরন্তর কথোপকথন।
এই উপন্যাসে প্রেম আছে, তবে তা গোলাপের পাঁপড়ির মতো কোমল নয়; বরং পুরনো চিঠির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সুগন্ধির মতো—যার গন্ধে এখনও জেগে ওঠে বিস্মৃত স্পর্শের স্মৃতি। স্মিতা ও পুপুলের মধ্যে দোদুল্যমান সায়ন হয়ে ওঠে পাঠকের মনেরই প্রতিচ্ছবি—যে প্রেমে পড়ে, ভুল করে, হারায়, আর একসময় ফিরে পাওয়ার আশায় চেয়ে থাকে।
উপন্যাসে বাবা-ছেলের সম্পর্ক যেন এক রুক্ষ জায়গায় ফুটে ওঠা নরম ঘাসের মতো। কোনও বাহুল্য নেই, অথচ সেখানে আশ্রয় আছে, শীতলতা আছে। এমনকি লেখকের নিজের দার্শনিক ভাষ্যে যে রকম চিন্তার রেখা বয়ে চলে, তা বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যে এক প্রশংসনীয় সংযোজন।
“সময় মানুষকে শেখায়, কিন্তু সময়ে শেখায় না”—এই একটি বাক্যই যেন সার কথা। কারণ এই গল্পে ভুল শুধরানোর সুযোগই মূল প্রশ্ন। দ্বিতীয় সুযোগ কি সত্যিই জীবনে আসে? না কি আমরা সবাই সেই একবারই বাঁচি, একবারই ভুল করি, আর সেই ভুলের ভার নিয়েই সময়ের অন্ধকারে হারিয়ে যাই?
শেষ অধ্যায়টি যেন এক বিষণ্ণ রূপকথা—যেখানে বরফের নিচে জমে থাকা না বলা কথারা, একে একে ভেসে আসে চোখের সামনে। গল্প শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায়, অনেকটা নভেম্বরের শেষ বিকেলের মতো—যা শেষ হয়, কিন্তু ফুরায় না। পাঠ শেষে তাই বুকের গভীরে রয়ে যায় একরাশ হালকা ক্লান্তি, আর কুয়াশার মতো আবছা এক শূন্যতা। এই উপন্যাস পড়া মানে নিজের সঙ্গে একটু কথা বলা, পুরনো ভুলগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ানো, এবং মেনে নেওয়া—জীবন সব সময় সোজাসাপ্টা হয় না। নমস্কার!
আহা কি গল্পটাই না শোনালো কৌশিক সামন্ত। টাইম মেশিন এ করে কলেজ এর সময় ফিরে গেলাম, ফিরে গেলাম সেই Guns N Roses এর নভেম্বর রেইন বা Bryan Admas এর সামার অফ সিক্সটিনাইন এ ।
নভেম্বর রেইন গানটার মতো এই গল্প সম্পর্কের জটিলতা , বাস্তবতা, সময়ের সাথে চেনা মানুষের বদলে যাওয়া , চাওয়া না পাওয়া এর মাঝের অনেকখানি অনুভূতি নিয়ে লেখা ।
“Nothin’ lasts forever And we both know hearts can change”
সবকিছুর শেষে সবাই তো একটা সেকেন্ড চান্স ডিসার্ভ করে, কিন্তু সবাই তা পায় কি? আমাদের মনে হয় না ইস ওর এটা পাওয়া উচিত ছিলো বা ওর এটা পেলে ভালো হতো । কিন্তু সবাই জীবনের পথে চাহিদা মতো সব পায় কি? আচ্ছা আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভালোবাসার জিনিসটা একটা বোতল এ ভরে আমাদের হাতে দেওয়া হয় তবে কি সেটা আমরা নিজেদের সুখের জন্য রেখে দেবো নিজের কাছে? না স্বাধীন ভাবে তাকে যেতে দেবো তার সুখের কাছে । ওই একটা ডায়ালগ আছে না- প্যায়ার হ্যায় ইসলিয়ে জানে দিয়া, জিদ হোতি তো বাহোমে হোতি। এই জায়গাটা পড়তে পড়তে লেখক পাঠক কে নগ্ন করে আয়না এর সামনে দাঁড় করিয়েছে। পাঠক নিজে ভাবুক সে ওই জায়গায় থাকলে কী করত ।
লেখক সল্প পরিসরে, ছোট ছোট অধ্যায় ভাগ করে দারুণ ভাবে গল্প বলেছে, আর ভাষাপ্রয়োগ ও দারুণ । গল্পের প্রোটাগোনিস্ট সায়ন এর কলেজ লাইফ, হোস্টেল লাইফ, প্রেম দারুণ ভাবে ফুটিয়েছে । আর ভাললাগার বিষয় হলো পাহাড়, একটা কোজি হোমস্টে আর পাহাড়ি রাস্তায় বাইক রাইডিং । এ যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছি । থাঙ্কস টু দ্য author এই গল্প লেখার জন্য । আর সর্বোপরি, গল্প কি বাস্তবের মতোই রুক্ষ হবে? না স্বপ্নের মতো মসৃণ? সবাই কি সেকেন্ড চান্স পাবে? এন্ডিং দেখে ভয় পাইছি, ভাবছি জীবনের স্কুইড গেম এ এলিমিনেট না হয়ে যাই । বেশ কিছু রাতের ঘুম কেড়ে নিলে বস । নাহলে এই রাত ৩:৩৭ এ বসে পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখতাম না! সব শেষে বস এর একটা কথা বলে যাই- “হর ইশক কা এক ওয়াক্ত হোতা হ্যায়, ও হামারা ওয়াক্ত নেহি থা, মাগার ইসকা ইয়ে মতলব নেহি কি ও ইশক নেহি থা ।”
"মানুষের এসকেপিজেমের বাসনা তীব্র। সিনেমা-বই-কবিতা কিম্বা পাহাড়- সবগুলোই সেই দিকশূন্যপুরে হারিয়ে যাওয়ার হাতছানি।"
কিছু কিছু বই শেষ করবার পর মনটা কেমন যেন আছন্ন হয়ে থাকে, ভাবনা গুলো তালগোল পাকিয়ে যায়, অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। কিছুক্ষণ আগেই পড়ে শেষ করা এই বইটা খানিকটা সেরকমই। বৃষ্টি যে সময়ই হোক, সে আসার সময় বেশ কিছু অনুভূতিদের সঙ্গে নিয়ে আসে; যেমন - প্রেম, বিরহ, রহস্য আর অতীত।
সায়ন বিয়ের পর নতুন বউকে ছাড়াই পাহাড়ে বেড়াতে যায়। ট্রেনে তাঁর আলাপ হয় একজন অচেনা বৃদ্ধের সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে সায়ন খোঁজ পায় এমন এক নাম না জানা পাহাড়ি জায়গার যেখানে সবাই যেতে পারে না। সায়ন গিয়ে পৌঁছয় সেখানে। সেখানেই ঘটে চলে অদ্ভুত কিছু ঘটনা আর সায়নের স্মৃতিচারণ - হোস্টেল জীবনের, বন্ধুত্বের আর হারিয়ে ফেলা প্রেমের। অতীতের হতাশা আর বর্তমানের ব্যর্থতা - এর ওপারে ভবিষ্যত কি নিয়ে অপেক্ষা করছে সায়নের জন্য? আমরা সবাই বোধহয় মানি, এভরিবডি ডিজার্ভ এ সেকেন্ড চান্স কিন্তু সময় মানে কি?
আষাঢ়ের বর্ষায় "নভেম্বর রেইন" একটা বিশেষ দাগ কেটে গেল মনে। গল্প ব্যতিরেকে বেশ কিছু উক্তি রয়েছে যা পড়া থামিয়ে পাঠককে ভাবতে বাধ্�� করে। একদমই আপাত সাধারণ কিছু লাইন কিন্তু তার ব্যপ্তি বিশাল যেটা আমায় মুগ্ধ করেছে। আর কি ভীষণ মায়াময় একটা প্রচ্ছদ! বেশ একটা ফিল গুড ব্যাপার আছে বইটার মধ্যে। যাঁরা পাহাড়ের প্রেক্ষাপটে বই পড়তে ভালোবাসেন, তারা অবশ্যই পড়ুন।
"রাত ঘন হলেই বোধহয় বোঝা যায়, আর্ত চিৎকারের শব্দগুলো বাইরের নয়; ভেতর থেকেই আসে তারা। এই কথাটা এখন বুঝতে পারে সে। সময়ের একটা বদভ্যাস হল, সময় মানুষকে সবই শেখায়, কিন্তু সময়ে শেখায় না।"
উপন্যাসের শেষের মায়াময় শব্দগুলোই হয়তো এই গল্পের মূল উপজীব্য। এই গপ্পো আমাদের সকলের জীবনে কোনো না কোনো অধ্যায়ের কথা বলে। একতরফা প্রেম, বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব, ভুল সিদ্ধান্ত সবই আমাদের জীবনে কখনো না কখনো ঘটেছে। তবুও তাকে সরিয়ে বেরিয়ে আসার গল্প বলে নভেম্বর রেইন। এছাড়া বই সম্পর্কে আর খুব বেশি কিছু বলতে ইচ্ছা করছে না। এর বেশি বলতে গেলে আবেশটাই কেটে যাবে। এই বই অনুভব করার। সুতরাং, যতক্ষণ না কেউ এর স্বাদ চেখে দেখছে তাকে কয়েকটা লাইনে এই অনুভূতি বোঝানো সম্ভব নয়। অনেকে হয়তো বইটির শেষটুকু নিয়ে কিছুটা দুঃখিত হয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, বইটার এন্ডিং জাস্টিফাইড। কারণ, 'আখির মে সব কুছ ঠিক হো যতা হ্যায়' ব্যাপারটা হয়তো শাহরুখের ম্যাজিকেই সম্ভব। বাস্তব জীবনে আমাদের মতো অধিকাংশ আদার ব্যাপারীদের কাছে সেই ডিসার্ভিং সেকেন্ড চান্সটা ফিরে আসে না। অতীতের ভুল ডিসিসন, না পাওয়াগুলোকে মেনে নিয়েই বাকি নদীটা পর করতে হয় আমাদের। কারণ, ওই যে কবি বলেছেন, 'Nothing lasts forever', আর বাকিটা তো আমাদের জানা। বড্ড আবেগঘন আর মেলানকোলিক হয়ে যাচ্ছে লেখাটা। কি আর করা! বইটাই তো সেরকম। যাই হোক, কার কেমন লাগবে বা সাহিত্য গুণের দিক দিয়ে কত উচ্চ ব নিম্নমানের লেখা সেসব বাদ দিয়ে বলতে পারি, এ লেখা আমার অন্তত অনেকদিন মনে থেকে যাবে। সকলকে, হ্যাপি রিডিং।
বি. দ্র.: বহুদিন বাদে কোনো উপন্যাস দেড় ঘণ্টায় শেষ করলাম।
নভেম্বর রেইন কৌশিক সামন্ত অরণ্যমন প্রকাশনী মুদ্রিত মূল্য: ₹২২৫/-
কিছু কিছু বই থাকে যেগুলো পড়ার পরে হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয় কারণ ভাবনা চিন্তা সেভাবে কাজ করে না। এই বইটির ক্ষেত্রে আমরা তাই হয়েছে। অতীত আর অতীতের ক্ষত যা আমরা যতই লুকিয়ে রাখতে বা চেপে রাখার চেষ্টা করি তা কখনো না কখনোই সব ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। তেমনই হয়েছে সায়নের সাথে। বিয়ের পর নিজের বউয়ের সাথে সঙ্গমের সময় তার মনে পড়ে গেছে তার কলেজ জীবনের এক তরফা প্রেম স্মিতার কথা। নিজের নতুন বরের মুখে অন্য মেয়ের কথা শুনে স্বাভাবিকভাবে পুপুলের মানসিক অবস্থার কথা না বলাই ভালো। তাই তারা দুজন ঠিক করে কিছু সময় তারা আলাদা থাকবে। যেখানে পাহাড়ে একসাথে যাওয়ার কথা ছিল তাদের সেখানে সায়ন একাই পাড়ি দেয়। ট্রেনে সায়নের দেখা হয় এক অদ্ভুত বয়স্ক মানুষের সাথে তার থেকেই এক হোমস্টের কথা জানতে পারে সায়ন এবং সেখানে পৌঁছে হঠাৎ আলাপ হয় এক বৃদ্ধ দম্পতির সাথে। বৃদ্ধাটি দাবি করেন সে নাকি প্রত্যেকটা মানুষকে নিজের জীবন ঠিক করার জন্য দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়, বৃদ্ধা কি পাগল? নাকি সায়ন তার পুরনো ক্ষত দ্বিতীয়বারের মত সারিয়ে ফেলতে পারবে , সায়ন কি আবার ফিরে যাবে পাপুলের কাছে ?সেটা জানতে হলে বইটি পড়তে হবে। এই উপন্যাসটির কথা এবার আসা যাক উপন্যাসটি করে আমার কেমন লাগলো, আমার পড়া কৌশিক সামন্তের লেখা প্রথম উপন্যাস এটি,উপন্যাসটিতে পুপুল, সায়ন ও সায়নের কলেজ জীবনের সাথে সাথে পাহাড় জড়িয়ে আছে আর আছে এক রহস্যময় দম্পতির কথা। তবে আমার একটা জিনিসই একটু খারাপ লাগলো যে লেখক এই বৃদ্ধ দম্পতির সম্পর্কে আরেকটু লিখলে হয়তো উপন্যাসটি অন্য মাত্রা পেত। তবে এক কথায় বেশ ভালো উপন্যাস পড়া যেতে পারে।
ভীষণ ঝরঝরে এবং সুখপাঠ্য এই উপন্যাস । একবার পড়া শুরু করলে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই শেষ করে ফেলা যায়। আপাতভাবে রোম্যান্টিক লেখা হলেও এর ব্যাপ্তি অনেক সুদূরপ্রসারী । অতীত আর আফসোসের মধ্যে বোঝাপড়া, ম্যাজিক রিয়ালিজম, কলেজের নস্টালজিয়া- লেখক সুদক্ষ কলমে ফুটিয়ে তুলেছেন সবকিছুই । শেষটা একটু দ্রুত এবং অপরিণত লেগেছে আমার কিন্তু উপন্যাসের মূল থিমটা অনবদ্য।
এই বইকে ৪ টি ষ্টারই দিতাম, দিলাম না শুধু একটি কারণে । লেখক এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন মেহেন্দি পরা সদ্য বিবাহিত বউয়ের হাত তার মুখ থেকে সিগারেট ফেলে দিচ্ছে না। যদ্দূর জানি, মেহেন্দি বাঙালি নববধূরা পরেন না। আর লেখক যথেচ্ছ ভাবে হিন্দি কোটেশন ব্যবহার করেছেন পুরো উপন্যাস জুড়ে যেটা আমার ঠিক মনঃপুত হয়নি। একটা দুটো জায়গায় ব্যবহার সীমিত থাকলে বরং ভালো লাগত ।
This book is amazing, totally unexpected ending but throughout it felt as if I am the part of the story the writer connects well with the reader and moreover this story is like a gush of fresh air throught it keeps the reader interested and throughout this book the writer has left several meme references or funny references which makes it more intriguing.
তিনটে তারা বরাদ্দই ছিলো, কিন্তু শুধু শুধু বইয়ের শেষ তিনটে পাতা আমদানি করতে গিয়ে একটা তারা খসে গেলো! আমার মতে তিন পাতা আগেই বইটা শেষ করে দেওয়া যেতে পারতো। জোর করে ট্যুইস্ট আনার এই কায়দাটার কোনো দরকার ছিলো না!
অসাধারণ লাগলো পড়ে। তবে শেষ চ্যাপ্টার��র টুইস্টটা না থাকলেই যেন আরো ভালো লাগতো। লিখনশৈলী, জঙ্গল, প্রকৃতির বর্ণনা - বুদ্ধদেব গুহকে মনে করাচ্ছিল। লেখককে কুর্নিশ 🙏🫡