শতাব্দী-প্রাচীন পাপের কালো ছায়া আর অভিশাপের অন্ধকার গ্রাস করেছিল এক বালককে। অভিভাবক শ্রীশচন্দ্র ন্যায়বান তৎপর হয়ে উঠলেন তাকে রক্ষার চেষ্টায়। তাঁর নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি এবং অন্য চিকিৎসকদের যাবতীয় চেষ্টা ব্যর্থ হল। বরং জানা গেল, শাপমুক্ত করতে না পারলে এই নিষ্পাপ বালকের পরিণতি হতে চলেছে ভয়াবহ। এ কোন অভিশাপ যা এতদিন পর জেগে উঠেছে? কেনই বা জেগেছে সে? অতীতে কি এর হাত থেকে নিস্তার পেয়েছিল কেউ? এখন কি কেউ পারবে ছেলেটিকে বাঁচাতে? কীভাবে বাঁচানো যাবে তাকে? যা হতে পারত ইউটিউব কাঁপানো 'গ্রাম বাংলার ভূতের গল্প', তাকে এক সম্পূর্ণ অন্য ও অনন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন লেখক এই উপন্যাসে। এটির হৃৎপিণ্ড হয়ে ধুক্ধুক্ করেছে সন্তানের জন্য মায়ের স্নেহ, আর সেইসব মানুষদের জন্য অশেষ শ্রদ্ধা যাঁদের কথা ভেবে লালন বলেছিলেন, "কত ভাগ্যের ফলে না জানি পেয়েছ এই মানব তরণী। বেয়ে যাও ত্বরায় তরী সুধারায় যেন ভরা না ডোবে।।" হ্যাঁ, ভয়ালরস, ইতিহস, ধর্ম ও দর্শনের ভাবনা— এ-সব ছাপিয়ে এই উপন্যাস আসলে মানবজনমের কথা বলে। তা দেখায়, মানুষের কল্যাণে যাঁরা আত্মোৎসর্গ করেন, তাঁদের স্থান হয় এ-সবের ঊর্ধ্বে। হয়তো সেজন্যই উপন্যাসের শেষে, শাপমোচনের পরে, মায়ের কোলে নিশ্চিন্ত আশ্রয় পান সাধক। এই সজল বাংলার ঘরে-ঘরে প্রতিটি মায়ের নরম আঁচল হয়ে লেখাটি আমাদের আশ্রয় দেয় ঝড়ঝঞ্ঝা আর বিপদের হাত থেকে। এই কাহিনিতে কিছু-কিছু শিউরে উঠে মতো দৃশ্য আছে। আছে বাস্তবের পঙ্কিল ও কর্দমাক্ত পরিসরে দম বন্ধ করে দেওয়া নানা মুহূর্ত। আছে শোক। আছে মৃত্যু। কিন্তু অন্তিম বিচারে এ মানবের গভীরে "আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো" ঘোষণারই প্রকাশ। হয়তো সেজন্যই এই কাহিনির অন্তে আমরাও গুনগুনিয়ে উঠি~ "এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে, যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।" আজকের হিংসা, দ্বেষ ও সন্দেহে পূর্ণ সমাজেও লালনের এই আর্তিকে জাগিয়ে তোলাই এই উপন্যাসের সার্থকতা। ভয় পাওয়ানো নয়, বরং অন্তরে অবিরত চলতে থাকা 'শত্রু'-চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াকে থমকে দিতে চেয়েছে সে। লেখক আমার আভূমি সেলাম নিয়েন। এই উপন্যাসটি পড়ুন। এমন লেখা... সচরাচর হয় না।
আলো সব সময়ই অন্ধকারের ওপর ভারী পড়ে। আমাদের উচিৎ হচ্ছে সেই আলোকে শুধু খুঁজে নেওয়া। সেই প্রকাশ যে কোন ভাবে, যে কোন বেশে, যে কোন মানুষের মাধ্যমে আসতে পারে। জাতপাত, ভেদভাব এইসবই মানুষেরই তৈরি। ওপরওয়ালার চোখে আমরা সকলেই সমান। এই বিষয়টিকে খুব সুন্দর করে এই কাহিনীর মাধ্যমে তমোঘ্ন বাবু আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এই কাহিনী এমন একটি কাহিনী, যা শুধু মাত্র ভৌতিক বা অলৌকিক সাহিত্য প্রেমীদের জন্য লেখা, সেটা বলা যাবে না। বরং যে কোন ভালো সাহিত্য প্রেমী মানুষদের এই কাহিনী পড়তে ভালো লাগবে। আমি অবশ্যই আমার সমস্ত বইপ্রেমী মানুষদের এই কাহিনী পড়ার জন্য রেকমেন্ড করব। তবে হ্যাঁ, এই বইটি যদিওবা দেও সিরিজের তৃতীয় পর্ব, কিন্তু যদি আগের দুটো পর্ব নাও পড়া থাকে, তাও এই কাহিনী পড়তে, কোনরকম কোন অসুবিধা হবে না।
"অনন্ত রূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই শুনি মানবরূপের উত্তম কিছুই নাই"
বছরের প্রথম পড়া শুরু করেছিলাম 'দধীচি'-র হাত ধরে, যেখানে ভয়ের আড়ালে, অলৌকিকতার আবরণে, ধর্মীয় আখ্যানের স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে মানুষের জন্য মানুষের আত্মোৎসর্গের এক অদ্ভূত কাহিনি।
শতাব্দী-প্রাচীন এক অভিশাপ। ষোলো শতকের এক পাপ, যার অনল জ্বলে ওঠে প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ‘শাবা জাওয়ান’ - অতৃপ্ত, প্রতিহিংসায় দগ্ধ এক অপশক্তি - বংশানুক্রমে গ্রাস করে পুরুষানুক্রম। এই অভিশাপের আঁচ এসে পড়ে শ্রীশচন্দ্র ন্যায়বানের পরিবারে, তারই মেজো নাতির শরীরে। শুরু হয় এক নিঃশ্বাসবন্ধ করা লড়াই - মৃত্যুর বিরুদ্ধে, অন্ধকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু লেখক এখানেই থেমে থাকেন না। তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন - অভিশাপ কি কেবল অলৌকিক? নাকি মানুষের অমানবিকতাই তার প্রকৃত উৎস?
তমোঘ্ন নস্করের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি, অলৌকিককে তিনি কখনোই একমাত্রিক ভয় হিসেবে ব্যবহার করেন না। কখনো তা ঝড়ো হাওয়ার মতো বুক কাঁপায়, আবার কখনো দখিনা হাওয়ার মতো শান্তি দেয়। ‘দধীচি’-তে ভয় আছে, শিউরে ওঠার মুহূর্ত আছে, মৃত্যু আছে - কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে মায়া। মায়ের আঁচল, দাদুর অসহায় চেষ্টা, বন্ধুত্বের নির্ভরতা, আর সেইসব মানুষ - যারা ধর্মের গণ্ডি ভেঙে কেবল “মানুষ” হয়ে ওঠেন। সার্থক করেন - "দেব দেবতাগণ করে আরাধন জন্ম নিতে মানবে"-র অর্থ।
এই উপন্যাসের এক অনন্য দিক হলো সর্বধর্মসমন্বয়ের সাহসী ও সংবেদনশীল উপস্থাপনা। এখানে হিন্দু দেবদেবী, মুসলিম পীর-ফকির, সুফিয়ানা ভাবধারা, লোকাচার - সব একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী। মা বিষহরি, বাবা পঞ্চানন, বড় খাঁ গাজী, জিন্দা পীর, কানা ফকির - সবাই মিলে গড়ে তোলেন এক মানবিক রক্ষাকবচ। যেন লালনের সেই উচ্চারণ বারবার প্রতিধ্বনিত হয় - “জাত গেল জাত গেল বলে, একি আজব কারখানা!”
ফকির বাবার আত্মবলিদান, অনাথবন্ধু ডাক্তারের দধীচিসুলভ সিদ্ধান্ত - এরা সবাই মিলে বোঝান, দধীচি কোনো এক পৌরাণিক চরিত্র নয়; দধীচি একটি চেতনা। বৃহত্তর কল্যাণের জন্য নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়ার সাহসই দধীচি। তাই এই উপন্যাসে শাপমোচনের পর আশ্রয় মেলে মায়ের কোলে - কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ধর্ম বা তন্ত্রে নয়, মমতায় ; "এই মানুষে হবে মাধুর্য্য ভজন, তাইতে মানবরূপ গঠলেন নিরঞ্জন।"
গ্রামবাংলার রূপ, গন্ধ, মেঠোপথ, বৃষ্টিভেজা সন্ধে, বিশ্বাসে ভরা জনজীবন - লেখকের কলমে জীবন্ত বর্ণনা পাঠককে ধীরে ধীরে গল্পের গভীরে টেনে নিয়ে যায়, শেষ পাতা পর্যন্ত আটকে রাখে; ভয় দেখিয়ে নয়, ভাবিয়ে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় - আলো সবসময়ই অন্ধকারের চেয়ে বড়, শুধু সেই আলোকে চিনে নেওয়ার চোখ দরকার। ‘দধীচি’ পড়ে ভয় লাগতে পারে, শিউরে উঠতে পারেন - কিন্তু বই বন্ধ করার পর যে অনুভূতিটা রয়ে যাবে, তা হলো এক গভীর আশ্বাস। মানুষের জন্য মানুষ আজও আছে। আর সেই বিশ্বাসই এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
এই বই পড়ুন। ভয় পাওয়ার জন্য নয়, মানুষ হয়ে ওঠার জন্য : "কত ভাগ্যের ফলে না জানি পেয়েছ এই মানব তরণী।"