Audiobook duration: 7:04:23 শখের আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ভবতারণ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে দৈবাৎ এসে পড়ল একটি প্রাচীন পুথি। সেই পুথিতে খোঁজ পাওয়া গেল এক আশ্চর্য ভেষজ পুষ্পের, যা নাকি মানুষের যৌনকামনা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। চাটুজ্জেমশাই সেই ভেষজ পুষ্পের খোঁজে উত্তর আসামের জঙ্গলে পাড়ি জমালেন, আর জড়িয়ে পড়লেন এক প্রাণঘাতী জটিল ষড়যন্ত্রের মধ্যে। জঙ্গলের মধ্যে সেই অভিশপ্ত প্রাচীন মন্দিরে কাহার খোঁজ পেলেন তিনি? মাধুরীর বিবাহিত জীবনের ওপর ঘনিয়ে এসেছে কোন অভিশাপের কালো ছায়া? দেওরিদের হারিয়ে যাওয়া উপজাতি পাতরগোয়্যাদের গ্রামে আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে কী ঘটেছিল? এক রাতের মধ্যে তারা উধাও হয়ে গেছিল কোন জাদুমন্ত্রে? অভীক সরকার-এর ‘কাউরীবুড়ির মন্দির’ উপন্যাসে এক হারিয়ে যাওয়া জনজাতির প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে তিনটি নরনারীর জীবন, ত্রিকোণ প্রেমের অব্যক্ত লিখন। দেওরিদের অজানা মিথের সঙ্গে মিশে গেছে এক অসহায় নারীর পারিবারিক কলঙ্কের কাহিনি। এ কাহিনি ভয়ের, এ কাহিনি লোভের, এ কাহিনি অসহায়তার, ক্রুরতার, কামনার এবং সবার ওপরে এ কাহিনি ভালোবাসার, শুধুমাত্র নিখাদ ভালোবাসার।
অভীক সরকারের জন্ম পয়লা জুন, উনিশশো উনআশি সালে। বেড়ে ওঠা প্রাচীন শহর হাওড়ার অলিগলিতে। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন, মা স্কুল শিক্ষিকা। রয়েছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। পেশায় সেলসম্যান, কর্মসূত্রে ঘুরেছেন পূর্ব-ভারতের প্রায় সব শহর ও গ্রাম। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাসা বেঁধেছেন হায়দ্রাবাদ, পাটনা, মুম্বাই ইত্যাদি বিভিন্ন শহরে। শখের বই ব্যবসায়ী ও প্রকাশক। লেখালেখির শুরু আন্তর্জালে ও বিভিন্ন ব্লগে। প্রকাশিত বইগুলো হল মার্কেট ভিজিট, তিতিরপাখি ও প্রিন্সেস (সহলেখক অনুষ্টুপ শেঠ), এবং ইনকুইজিশন, খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ, চক্রসম্বরের পুঁথি, ইত্যাদি। বিবাহিত। কন্যা সন্তানের পিতা। ভালোবাসেন ইলিশ, ইস্টবেঙ্গল, ইয়ারবন্ধু এবং ইতিহাস।
বাংলা বইয়ের বাজারে এই মুহূর্তে ফগ নয়, তান্ত্রিক হররই চলছে৷ কিন্তু আসলে সেগুলোতে আমরা কী পাচ্ছি? অধিকাংশ লেখাতেই পাচ্ছি কিছু ধোঁয়াটে চরিত্র, বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস, যৌনতার যথেচ্ছাচার, আর প্রেত-পিশাচের গা-ঘিনঘিনে কারবার হিসেবে আটের দশকের 'ইভিল ডেড' সিরিজ থেকে শুরু তুলে আনা দৃশ্যাবলি। তাতে না আছে তন্ত্র, না আছে হরর। এখানেই অভীক সরকারের লেখার সার্থকতা। কেন জানেন? কারণ তাঁর লেখায় দু'টি উপাদানই থাকে একেবারে প্রাণবন্ত ও প্রোজ্জ্বল হয়ে— তন্ত্র ও হরর।
তন্ত্র কী? দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এই প্রসঙ্গে ঋগ্বেদে তন্ত্রের একমাত্র উল্লেখটিকে চিহ্নিত করেছেন। ১০.৭১.৮-এ "তন্বতে তন্ত্রম" এবং প্রাসঙ্গিক সূক্তগুলির সায়ণাচার্য-কৃত ভাষ্য অবলম্বন করে দেবীপ্রসাদ দেখিয়েছেন, তন্ত্র মানে "কৃষিলক্ষণম বিস্তারয়ন্তি কুর্বন্তি"— চাষবাস বা কৃষিকাজ। তিনি বলেছেন, কৃষি-কেন্দ্রিক যাদুবিশ্বাসের মধ্যেই তন্ত্রের বীজ নিহিত ছিল। ("তন্ত্র-ভাবনা", পরিচয়, আশ্বিন ১৩৬৫) অর্থাৎ, প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ চেয়ে জাদুভাবনাই তন্ত্র। আলোচ্য উপন্যাসে ঠিক সেটিই তো হয়েছে! মারণ, উচাটন, বশীকরণ প্রভৃতি ষড়যন্ত্রের যে প্রয়োগ এবং প্রাসঙ্গিক অভিচার এতে দেখানো হয়েছে, অন্তে তার লক্ষ্য তো থেকেছে একটিই— প্রজনন তথা কাম! 'মেঘদূত' আলোচনা প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় রাজা ভট্টাচার্য একদা বলেছিলেন, প্রাচীন ভারতে কাম ও প্রেম সমার্থক ছিল৷ তাই আজ থেকে তিন দশক আগের উজনি অসমের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে যা ভালোবাসা, তাই অতীতে ছিল কাম, আর তার জন্য বিশ্বাসের সংঘাতই ছিল তন্ত্র! তাই এই উপন্যাসের নিঃশ্বাসে এবং বিশ্বাসে জড়িয়ে আছে তন্ত্র।
হরর কী? অক্সফোর্ড-এর দ্বারা সমর্থিত সাইট লেক্সিকো বলছে, ওটি হল "অ্যান ইনটেন্স ফিলিং অফ ফিয়ার, শক, অর ডিসগাস্ট।" আছে! ফেলুদার মতো টেলিপ্যাথির জোর না থাকলেও এই উপন্যাসের ডি.এন.এ-তে ডাবল হেলিক্সের মতো, বা শঙ্খ-লাগা সাপের মতো করে পরস্পরকে জড়িয়ে আছে প্রথম ও দ্বিতীয় রিপু। ঘৃণা, বিস্ময়াঘাত এবং ভয়— তিনটি অনুভূতিরই জন্ম দিয়েছে তারা সময়ে-সময়ে। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই উপন্যাসের চরিত্রদের মধ্যে আগ্রাসন আর সমর্পণ— দুটি ভাবই অত্যন্ত শুদ্ধ ও অনাবিল হয়ে এসেছে। ফলে কাহিনি পরিণতির দিকে ধাবমান হওয়ামাত্র পাঠকের মনে সত্যিকারের ভয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে। মাধুরী'র অকালমৃত্যুর ভয়। তার দিদুনের সাধনা ব্যর্থ হওয়ার ভয়। ভবতারণের ভালোবাসা হারানোর ভয়। কাউরীবুড়ির অভিশাপ নতুন করে জেগে ওঠার ভয়। গল্পটা শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়!
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সিরিজ বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেই ধারায় শ্রেষ্ঠ লেখা এটা। কেন জানেন? কারণ এই কাহিনিতে কৃষ্ণানন্দ সার্জেন হিসেবে তাঁর চরম দক্ষতাটি দেখিয়েছেন। এই উপন্যাসের লালসা, রিরংসা, জিঘাংসায় ভরা প্রান্তরে তিনি প্রকৃত ত্যাগীর মতো বিচরণ করেছেন। তাঁর আশীর্বাদ পেয়েছে প্রেমী, আর অভিশাপে দগ্ধ হয়েছে লোভী। ঘোরকৃষ্ণ শক্তির যথাযথ রক্তলাল ভৈরব হয়ে এসেছেন তিনি। তাঁর মতো করেই বলি, "ভালো হোক। সবার ভালো হোক।" আর পরের লেখাটাও আসুক— ধীরে-সুস্থে।
কলকাতা ভিত্তিক তন্ত্র-মন্ত্র বিষয়ক হরর প্রচুর রয়েছে। সবগুলো জাতেরও না। তবে এগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটা ভালো হরর পাওয়া যায়। কাউরীবুড়ির মন্দির এরকমই একটা বই। কাউরী অর্থ কাক। কাকদের এক ভয়ঙ্কর দেবীর মন্দির, দেবীর অভিশাপ, একটা আয়ুর্বেদ লতা আর নিষিদ্ধ যৌনতা নিয়েই গল্পটা। গল্পের সবথেকে আকর্ষণীয় দিক হল গল্পটা বেশ ডার্ক। মন্দির ও হারানো জাতির মিথলজি, বলি প্রথা, যজ্ঞ সবকিছু এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা পড়লে পাঠকের গা শিউরে উঠতে পারে। তবে নিষিদ্ধ যৌনাচারের ব্যাপারটা অনেকের বিব্রত লাগার কথা। আয়ুর্বেদী লতার ধান্দায় থাকা এক লোক ও তার গুরুর রহস্যের সমাধানে নামা গল্পটাকে পেজ টার্নার বানিয়েছে। এক বসায় পড়ে ফেলেছি। শেষের টুইস্টও ভালোই মিলিয়েছেন লেখক। হররপ্রেমীদের ভালো লাগবে বইটা।
অনেকদিন পর একটা ভালো তন্ত্রভিত্তিক উপন্যাস পড়া গেলো। 'খাড়া বড়ি থোর'-দের চক্করে পড়ে, সঙ্গত কারণে আর এসব পাড়া মারানো হয় না। সেই একই, ছকে বাধা "ইহার পর বিভাগুণীন তাহার জেমস বন্ডিয় শক্তিশেল নিক্ষেপ করিয়া, মোহনভোগাসুর কে হত্যা করিলেন। কহিলেন তিনি দক্ষিণা লইবেন না।" আর মুখে রোচতে চায় না।
হ্যা, এই উপন্যাসটি অসাধারন নয়। এখানেও লেখক কিছু ক্লিশের ব্যবহার সাগ্রহে করেছেন। তবে, অভীক সরকার লিখতে জানেন। পাকা গল্পবলিয়ে। সারা বছর এখানে সেখানে লিখে বেড়ান না। নইলে 'এবং ইনকুইজিশন'-এর অমন ভয়ানক ডিমান্ডের পরেও কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ সিরিজে বইয়ের সংখ্যা মাত্র তিনটে রইতো না। হায়রে, এপার বাংলার বাকি লেখকেরাও যদি এমন সংযমী হতেন। অবশ্য, ব্যতিক্রম আছেই। গিলিয়ান ফ্লিন নিজ ক্যারিয়ারে মাত্র তিনটে বই, এবং একখানা ছোটগল্পে লিখে দিব্যি বর্তে আছেন। ওদিকে স্টিফেন কিং সেঞ্চুরি না ছুয়ে থাকলেও, শিগগিরই ছোবেন বলে মনে হচ্ছে। যার যেটা রোচে আরকি।
এ গল্পটি অনেকটা ওই স্টোরি উইদিন আ স্টোরি হিসেবে উপস্থাপিত। বেশ বরদা স্টাইলে, প্রৌঢ় সদ্য-রিটায়ার্ড চাটুজ্যে মশাইয়ের মুখে বসানো এক অভিনব কাহিনী। নেপথ্যে ক্লাবঘরের সান্ধ্য বচসা, এবং বৃষ্টিস্নাত শীতল রাত। এক আশ্চর্য ঔষধের সন্ধানে তরুণ অবস্থায় ভবতারণ চট্টোপাধ্যায় পাড়ি জমিয়েছিলেন উত্তর আসামের গহীন জঙ্গলে। সেখানে পৌঁছে কোন ষড়যন্ত্রের ধুম্রজ্বালে বেষ্টিত হলেন তিনি? সময় ফুরিয়ে আসে, অভিশাপের ছায়া ঘনিয়ে আসে, এক অসহায় পরিবারের মাথায়। কেনই বা কেউ দিনের বেলাতেও যেতে চায় না কাউরীবুড়ির মন্দিরে? উত্তরের খোঁজে, অচিরেই যে গল্পের সন্ধানে মাতলেন চাটুজ্যে মশাই, সেই গল্পের পরতে পরতে লুক্কায়িত উগ্র কামনা ও ক্রুরতার ভয়ংকরী প্রলেপ।
এর চেয়ে বেশি বলে কাজ নেই। বইখানা উৎরেছে ভালো। মানগত দিক দিয়ে, এ বই 'প্রেতবত্থু'-কে ছাপিয়ে যায় আরামসে। সঙ্গে সৌজন্য চক্রবর্তীর করা রক্তিম প্রছদখানাও অসাধারন। খোদ 'সেই' মানুষটির আগমন অবশ্য যথারীতি মাঝ-বরাবর। তবে কোথায় গিয়ে মনে হয়, এই আসাটা খানিক প্রি-ম্যাচিউর যেন। রহস্য আরেকটু ঘনীভূত হলে, তার মঞ্চে অবতীর্ণ হওয়াটা অনেক বেশি কার্যকরী দেখায়। তবে সে যাক গে, কুছ পরোয়া নেহি। গল্পের খাতিরে, মানুষটি যখনই দেখা দিন না কেনো। ঠিক মনে করে নিয়ে আসেন এক তোড়া শুভশক্তি। তিনি যে আলোর দিকপাল, ভালোবাসার কান্ডারী। এত বিভৎসতা, এত অন্ধকার, ষড়রিপুর তাণ্ডব উল্লাস। সবকিছুর মাঝে ভাসমান সেই ভালোবাসাই। কৃষ্ণানন্দের মন্ত্রে দীক্ষিত, সেই আদিম অকৃত্তিম জাদু। তাই নিজ অজান্তে যেন বারংবার বলে উঠতে হয়...ভালো হোক, যারা ভালোবাসে তাদের ভালো হোক। ভালো হোক।
চাইল��� তাই পড়ে দেখতেই পারেন। ক্ষ্মীনতনু বই, সময়টা বেশ কাটবে। কথা দিচ্ছি, আর যাই হোক কোনো তন্ত্রভিত্তিক ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়ে থাকতে হবে না।
অভিক বাবু আমার কাছে বেশ পরিচিত একটি নাম। তার বেশ কয়েকটি বই সম্প্রতি শেষ করেছি। তার সাথে প্রথম পরিচয় ঘটে মিরচি বাংলার অডিও গল্পে। সেখানে প্রচারিত "এবং ইনকুইজিশন " থেকে নেওয়া শোধ এবং ভোগ গল্প দুটির কথা মনে হলে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। তারপর একে একে এবং ইনকুইজিশন বাকি গল্প, পেতবথ্থূ, খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ সবগুলোই গোগ্রাসে গিলেছি । সেই হিসেবে কাউরীবুড়ির মন্দির বইটি পাওয়ার পর একেবারে লোভ সামলাতে পারেনি।
প্রায় একবারে টানা পড়েই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বইটা শেষ করে ফেলেছি। কোথাও একটুও একঘেয়েমি লাগেনি। 'কাউরীবুড়ির মন্দির' বইটি সম্পর্কে যদি কিছু বলতে হয় তাহলে প্রথমেই বলব, এটি একাধারে এক রহস্য-রোমাঞ্চ এবং কিঞ্চিৎ ভালোবাসার গল্প। বইটি লিখতে গিয়ে লেখককে আসামের আদিম জনজাতি সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা করতে হয়েছে। আর তার প্রতিফলন বইটির মধ্যে যথার্থই লক্ষণীয়। গল্পের বাঁধন খুব সুন্দর।প্রতিদিনের জীবনযাপনের মুখের ভাষাকে হাতিয়ার করে লেখক ভাষাশৈলী রচনা করেছেন এখানে। তাই সেই ভাষা হয়ে উঠেছে আরও জীবন্ত, যেখানে পাঠক নিজেকে সহজেই সংযুক্ত করতে পারেন।
কাউরিবুড়ির মন্দিরের বর্ণনা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। জঙ্গলের বড় ঝিল,শুকনো নালা,পায়ে হাঁটা পথ যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং এক গা ছমছমে পরিবেশ তৈরি হয়। প্রতিটি চরিত্রকে গল্পের প্রয়োজনেই উপস্থিত করা হয়েছে, কোনরকম অপ্রয়োজনীয় চরিত্রের উপস্থিতি অলক্ষ্যনীয়।
গল্পের মুখ্য চরিত্র ভবতারন। তিনি একটি পুরনো বইয়ের উপর ভিত্তি করে এক বিশেষ ধরনের ভেষজ ফুল 'গোলকপুষ্প' অনুসন্ধানে সুদূর আসামে পাড়ি দেন, যার রস খেলে মানুষের যৌন ক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তিনি কাউরীবুড়ির মন্দির আবিষ্কার করেন, আর বিভিন্ন ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে সে নিজে এক অদৃশ্য মায়াবী জালে জড়িয়ে পড়ে। সেখানথেকে উত্তরণের পথই এই গল্প।
তাই আমি বলব দেরি না করে এই সুখাদ্যের আস্বাদন অতি তাড়াতাড়ি সেরে ফেলুন। হ্যাপি রিডিং।
অফিস থেকে বাসে করে বাসায় আসার সময় বসে বসে পড়ে ফেললাম বইটা! এত জ্যাম, গরম, মানুষের ভিড়, চিৎকার-চেঁচামেচি কিছুই টের পাইনি, এতটাই বিভোর হয়ে গিয়েছিলাম। এমনিতেই আমার তান্ত্রিক হরর পড়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহ, তার উপরে এত সুন্দর করে গল্প বলা, সব কিছু মিলে একদম জমে ক্ষীর। এ বছর এই প্রথম এই জনরার একটা বই পড়লাম। And I love it!
বহুদিন পর এমন রোমাঞ্চকর ভৌতিক উপন্যাস পড়লাম। বেশ দ্রুতগতির আর পুরো গল্পতেই যেন মনোযোগ ধরে রেখেছে। তারানাথ তান্ত্রিকের পর কোন ভৌতিক উপন্যাস এতটা উপভোগ করলাম।
জেনে রেখো, ভালোবাসাই হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র সবচেয়ে বড় জাদু
বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যায় পাড়ার ক্লাবঘরের ছেলেদের অনুরোধে ভবতারণ চট্টোপাধ্যায়, ওরফে চাটুজ্জেমশাই এর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভান্ডার থেকে এই রোমহর্ষক কাহিনী শুরু হয়।
কাহিনী শুরুর সময়কাল ১৯৯০ সালের এক সন্ধ্যা, যেদিন তার হাতে এসে পড়ে এক প্রাচীন আয়ুর্বেদশাস্ত্রের পুঁথি। সেই পুঁথিতে উল্লেখ আছে 'গোলকপুষ্প' নামক এক অতি দুষ্প্রাপ্য ভেষজলতার কথা। এই 'গোলকপুষ্প' পাওয়া যায় আসামের ডিব্রুগড় থেকে শুরু করে ধুবড়ির মাঝামাঝি কোন এক জঙ্গলে। আর সেই জঙ্গলে রয়েছে এক দেবীর অতি প্রাচীন মন্দির।যার গর্ভগৃহে বছরের এক বিশেষ দিনে ফোটে সেই আশ্চর্য গুল্মলতাটির ফুল। এই ফুলের রসের দুটি বিশেষ গুণ আছে - একটি মেডিসিনাল অর্থাৎ বিভিন্ন জটিল এবং দুরারোগ্য রোগ নির্মূল করার ক্ষমতা এবং অপরটি হল এফ্রোডিসিয়াক, অর্থাৎ এতে রয়েছে মানুষের যৌনক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার শক্তি।
ভবতারণ এই 'গোলকপুষ্প' এর সন্ধানে পাড়ি দেয় আসামের উদ্দেশ্যে এবং এখান থেকেই কাহিনিটি জমাট বাঁধতে শুরু করে। ভবতারণ এখানে এসে বিভিন্ন অশুভ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় এবং তার থেকে জানতে পারে এই ফুল যেই মন্দিরে ফোটে সেখানে বিগত আড়াইশো বছরে কেউ পা রাখেনি, কিংবা রাখলেও সেখান থেকে কেউ বেঁচে ফিরে আসতে পারেনি।স্থানীয় লোকেরা এই মন্দিরকে বলে 'কাউড়িবুড়ির মন্দির' আর তাদের কাছে এই মন্দির অত্যন্ত অভিশপ্ত এক স্থান, যার জন্য এই অতি দুষ্প্রাপ্য ভেষজলতার কথা এখানকার জনজাতিরা জানালেও তা সংগ্রহ করার দুঃসাহস কেউ দেখায় না।
এই মন্দিরকে ঘিরে জনমানসে প্রচলিত আছে নানারকম মিথ - ১) এই মন্দিরের লতা এই স্থান ছাড়া অন্যত্র বাঁচে না, কারন এই গাছ বেড়ে উঠতে প্রয়োজন হয় এক বিশেষ দ্রব্যের। ২) আড়াইশো বছর আগে এই দেবীর পুজোয় একটা বড়সড় ভুল হবার ফলে দেবীর অভিশাপে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর সকলে একরাতের মধ্যে মারা যায়। সেই থেকে এই মন্দির অভিশপ্ত। ৩) এই মন্দিরকে পাহারা দেয় অসংখ্য কাউরী, এই কাউরীদের নজর এড়িয়ে এই স্থানে প্রবেশ এককথায় অসম্ভব।
ভবতারণকে এই মিথগুলি তাড়া করে বেড়ায় - ১) কেন এই 'গোলকপুষ্প' এই মন্দির ছাড়া অন্য কোথাও বাঁচে না, কি বিশেষ দ্রব্যের প্রয়োজন হয় একে বাঁচিয়ে রাখতে? ২) আড়াইশো বছর আগে এই মন্দিরে ঠিক কি অনাচার ঘটেছিল যার জন্য একটা বিশেষ গোষ্ঠী একরাতের মধ্যে নির্বংশ হয়ে গেছিল? ৩) এই অসংখ্য কাউরী এখানে কেন ঘুরে বেড়ায়? তাদের আচার-আচরণ এরকম অস্বাভাবিক কেন?
উপরিক্ত কাহিনীগুলির সমান্তরালে চলতে থাকে এক অসহায় নারীর পারিবারিক কলঙ্কের কাহিনী যা শুনলে শিউরে উঠতে হয়। সেই কাহিনী কিভাবে উপরিক্ত কাহিনীগুলির সাথে একসুতোয় মিলে যায় এবং তার সাথে ভবতারণ কিভাবে জড়িয়ে পরে তা জানতে হলে ১৫২ পাতার এই টানটান উপন্যাসটি একনিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে হবে।
কাহিনীর যে যে বিষয়গুলি পড়ে ভাল লেগেছে -
১) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাহিনীর বুনন, বিন্যাস অসম্ভব টানটান। সারা কাহিনী জুড়ে 'এরপর কি হয়' সেটা জানার একটা অদম্য কৌতূহল পাঠকেরা শুরু থেকে অনুভব করবেন। পুরো কাহিনী জুড়ে একটার পর একটা ঘটনা এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে যা পড়তে শুরু করলে শেষ না করে বই নামিয়ে রাখা মুশকিল। একদম 'সিনেমাটিক' লেখা - পড়তে পড়তে সবকিছুকে যেন চোখের সামনে visualize করতে পারা যা���়।
২) এই ধরনের কাহিনী লেখার ক্ষেত্রে কাহিনীকে পাঠকদের কাছে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য করে তোলাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। লেখক এই বিভাগে সস্মানে উর্তীর্ণ হয়েছেন।
৩) সারা কাহিনী জুড়ে যে মিথগুলি তিনি রচনা করেছেন, কাহিনীর শেষে সেগুলিকে যথাসম্ভব যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন।
৪) এই ধরনের কাহিনীতে অলৌকিক পরিবেশ সৃষ্টির একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে - লেখক কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেটিকে অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে ব্যবহার করেছেন। যার ফলে একটা 'uncanny' ফিলিং পাওয়া সারা লেখা জুড়ে।
৫) এই কাহিনীতে সমস্ত সমস্যার থেকে উদ্ধা��কারী ব্যক্তিটির পরিচয়টি কাহিনীর শেষে যেভাবে দেওয়া হয়েছে তা এককথায় 'মাস্টারস্ট্রোক'। ব্যক্তিটি কে সেটা বুঝতে পারলেও এইভাবে নাম/পরিচয় উন্মোচন করার ভাবনাটা প্রশংসনীয়।
৬) আরেকটি জিনিস খুব ভাল লেগেছে সেটা হল এই বইয়ের নাম বা title নির্বাচন। অসম্ভব স্মার্ট নাম - 'কাউড়িবুড়ির মন্দির'। কেন? সেটা জানতে বইটা পড়েই ফেলুন।
অতি এলেবেলে করে মাখিয়ে ফেলা গল্প লাগলো। সোজা পথ রেখে দুনিয়া ঘুরে এসে দীক্ষা, যজ্ঞ, দেওরি জপে দুনিয়ার বাহাস করে গল্পটাই ঘেঁটে দিলেন। সাথে ডার্ক করতে কিঞ্চিত অষ্টাদশী বিবরণ যোগ হল। শেষে আবার আনপ্রেডিক্টেবল টুইস্ট হিসেবে দেখি বেঞ্চের খেলোয়ারই আসলে ব্লুচিপ!
শিরোনাম থেকে জেনেবুঝে আবারও সেইই তান্ত্রিক গল্পই গেলার দায় আমার। বহু ভালো তান্ত্রিক গল্প পড়েছি, শুনেছি। তাই অমন কথা বেশি ঘটা কম তো আচম্বিত।
আসলে সত্যি বলতে কি, এই বইটি পড়ার আগে অনেকের থেকে রিভিউ পেয়েছিলাম, তাই পড়ার একটি বিশেষ আগ্রহ জন্মেছিল। আবার একটি ভয়ও ছিল মনের মধ্যে। কারণ বইটি থেকে একটা এক্সপেক্টেশন ছিল, আর বইটি সেই লিমিট অতিক্রম করতে পারবে কিনা সে নিয়ে দ্বিধা ছিল।
এই দ্বিধার মূলত কারণ হল এই যে, তন্ত্রসাধনার অনেক বই আছে যেগুলোতে তন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে শেষে লেখক গল্পটাকেই ঘেঁটে 'ঘ' করে দিয়েছেন। তাই সেই গল্পের মধ্যে সাসপেন্স নামক জিনিসটার শ্রাদ্ধ হয়ে যায়। আরও যেটা পাওয়া যায় সেই বই গুলোর মধ্যে সেটা হল পেটের ভেতর থেকে অন্নপ্রাশনের ভাত তুলে আনার মতো অদ্ভুত রকমের বিবরণ।
যাই হোক, স্টারের সংখ্যা দেখে তো বোঝাই যাচ্ছে যে এই বইটি ওই উপরিউক্ত তালিকার মধ্যে পড়ে না। তার অনেক কারণ আছে,
একটা বই তখনই ভালো লাগে যখন গল্পটা জটিল হয়, কিন্তু একইসঙ্গে বোধগম্য হয়। এখানে বলে রাখা দরকার যে, অনেকে মনে করেন একটা বই খুবই ভালো কারণ সেই বইটির বিষয়বস্তু তার মগজে ঢোকেনি। এটা Nolan এর সিনেমার ক্ষেত্রে বলা যায়। কিন্তু সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এখানে লেখক যেভাবে প্লটটি তৈরি করেন এবং একটি মূল ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেসব আসে পাশের ঘটনার উল্লেখ করেন, আবার শেষে সেই উন্মুক্ত প্রশ্নের দরজাগুলোকে যেই দক্ষতার সঙ্গে বন্ধ করেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে একটি চ্যাপ্টারের শুরুতে সেইদিন ঘটা একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করে ফেলেন, যেটির সাথে তার আগের চ্যাপ্টারের শেষের মিল নেই। কিন্তু সেই অমিল ঘটনার বর্ণনা করতে করতেই আবার ফিরে আসেন পূর্ববতী চ্যাপ্টারের শেষের চিত্রে। এই অ্যাপ্রোচটি সত্যিই দারুন লেগেছে আমার।
আবার, চাটুজ্জে মশাই গল্প বলার মাঝে মাঝেই এমন একটা লাইন বলে দেন যে, সেটা জানার জন্য আপনাকে শেষ অবধি পড়তেই হবে। তাই আপনার ইন্টারেস্ট কখনই ক্ষীণ হয়ে আসবে না।
শেষে চাটুজ্জে মশাই নিজের স্ত্রী-এর কথা উল্লেখ করেন। আমিও মনে মনে চেয়েছিলাম যাতে এরকমই একটা ক্লাইম্যাক্স হয়। সেটাও হল। কিন্তু আমার নজর যেটা কেড়েছে সেটা হল, শুধুমাত্র পাঠকবর্গকে দু'পাতা বেশি পড়ানোর জন্য, বা তাদের বন্য চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য বক্তার বিয়ে কিভাবে হল, কিভাবে তিনি কাকামশাই-এর কাছে প্রস্তাব রাখলেন সেসব উল্লেখ করেননি। গল্পের জন্য যেটুকু দরকার সেটুকুই বলে শেষ করে দিয়েছেন।
ব্যস্, এবারে ইতি।
আর একটি কথা বলা ভালো, আমি যেদিন বই শেষ করি সেদিন রেটিং দিই না। তাতে অনেকসময় সময় একটা তাড়না কাজ করে। সবে একটা জিনিষ পড়ে উঠলাম, খুবই ভালো লাগল, কিন্তু সেই সময় আগে পড়া বইগুলোর সাথে তুলনাটা মাথায় আসে না চট্ করে। ভালো বই সেটাই হবে যার রেশটা পড়ার পরেও কিছুদিন রয়ে যাবে। তাই সব মিলিয়ে বলা যায় যে, দিস্ বুক ইজ ওয়ার্থ আ শট্।
ওপার বাংলায় প্রচুর তন্ত্র ভিত্তিক বই বের হচ্ছে। কিন্তু হাইপ কিংবা মানের দিকে দিয়ে বেশিরভাগই সুযোগ্য না। এই বইটা ভালো লাগল বেশ। কাহিনী গুছানো। লেখা ভালো। বেশ গা শিউরানো ডার্ক একটা গল্প।
শখের আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ভবতারণ চট্টোপাধ্যায়। স্ত্রী গত, আপাতত একাকী জীবনযাপন। এক বর্ষণমুখর রাতে পাড়ার আড্ডায় ছেলেপুলেদের অনুরোধে তুলে আনেন তাঁর যৌবনের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। 'কাউরীবুড়ির মন্দির' মূলত ভবতারণ চ্যাটার্জীর এই স্মৃতিরোমন্থনেরই লিখিত রূপ।
আশ্চর্য এক ভেষজ গোলকপুষ্প। অতি কার্যকর, অতি দুষ্প্রাপ্য, অতি মূল্যবান। ঘটনাক্রমে এক পুঁথিতে এর হদিস পেয়ে যান ভবতারণ। যেতে হবে আসামের একদম পূর্বপ্রান্তে, তিনসুকিয়া জেলায়। রওনাও হয়ে যান, উঠে পড়েন পিতৃবন্ধু সদানন্দকাকুর বাসায়। সেখান থেকে ঘটনা দুভাগে ভাগ হয়ে চলতে থাকে সমান গতিতে। এক দিকে থাকে ভবতারণের গোলকপুষ্প খোঁজার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান, অপরদিকে গৃহস্থের একমাত্র কন্যা, সদ্যবিবাহিতা মাধুরীর দাম্পত্যজীবনের সমস্যা সমাধান। দুদিকেই পরপর অজস্র ব্যাখাতীত ঘটনা দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন ভবতারণ। অতঃপর তাঁকেসহ সকলকে উদ্ধার করতে আবির্ভাব ঘটে অভীক সরকারের বহুল ব্যবহৃত বাস্তবযুগের চরিত্র, জগদ্বিখ্যাত তান্ত্রিক শ্রী কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের।
বইটির পরতে পরতে রয়েছে ঘাত প্রতিঘাত ভালোবাসা বিদ্বেষ আকাঙ্খা ঘৃণা। দেওরি জনজাতির হারিয়ে যাওয়া শাখা পাতরগোঁয়্যা, বিলের ধারে এক পরিত্যক্ত অন্ধকারাচ্ছন্ন মন্দির, বংশানুক্রমে মন্দিরে পূজা দিয়ে যাওয়া রহস্যময় নারী তান্ত্রিকের দল, মহাভারতে উল্লেখিত পাতাল নিবাসী নাগজাতি, আর দশ মহাবিদ্যার সপ্তম বিদ্যা কাক পরিবেষ্টিতা বিধবা দেবী ধূমাবতী - সব মিলিয়ে বইটি ধর্ম তন্ত্র আর রহস্যের পরিপূর্ণ এক মিশেল। এর পাশাপাশি মানবমনের দ্বন্দ্ব, সাংসারিক জটিলতা ও অন্ধকারে বেড়ে ওঠা অবৈধ সম্পর্ক তো আছেই, যাদের ওপর বইয়ের ভিত দাঁড়িয়েছে।
অভীক সরকারের লেখার হাত খুব ভালো। শেষদিকে বইয়ের পুরুষ ভিলেন মগলহানজামার আকষ্মিক আবির্ভাব ছাড়া বাদবাকি সবকিছুই বেশ চমৎকার লেগেছে। সিরিয়াসনেস বজায় ছিলো পুরোটা জুড়ে, লেখকও কোথাও অতিরিক্ত ভায়োলেন্স গিলাতে যাননি, বেশি বেশি ভয় পাওয়াতে যাননি। সবকিছু পরিমাপ মত।
দেবী মাতঙ্গীকে নিয়ে লেখা 'ডামরী'র পর এটা দশ মহাবিদ্যাকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ (সম্ভবত), এবার দেবী ধূমাবতী। এবং যথারীতি, পরিবেশনা বেশ চমৎকার, ভক্তিযুক্ত।
একটানা পড়ে শেষ করলাম দেড়শো পাতার বইটি। একটানা যখন পড়েছি, তখন বইয়ে রহস্য রোমাঞ্চ আর জ্ঞান সব যথাযথ ছিলো বলতেই হবে। রেটিং তাই ৫ এ ৫।
ওই একটা কথা। ওই একটা কথা পড়লেই ঠোঁটের কোণে হাসি আসে, আর মনে হয় ব্যাস, আর কোনো চিন্তা নেই, এবারে সব ঠিক হয়ে যাবে। তারপর ভাবি, এই যে চিন্তা টা এলো মনে, এই যে এত কিছু বেঠিক হচ্ছে, সেটার কারণ তো লেখক স্বয়ং। তিনি লিখেছেনই এমন ভাবে যে গল্প যত এগিয়েছে, suspense এর পারদ ততো চড়েছে, ততোই বেড়েছে দুশ্চিন্তা। কিন্তু আগের ৪ টে গল্পের মতোই আগমবাগীশ আছেন তার স্বমহিমায়, মুশকিল আসান করতে। গল্প দেবী ধূমাবতী কে নিয়ে, গল্প এক আদিম জাতি কে নিয়ে, এই গল্প যৌন ঈর্ষার। এখানে এবং inquisition এর মতো সেই আদিম অভিশাপ নেই, খুব বেশি ইতিহাস কথন নেই, তন্ত্র মন্ত্রের কচকচানিও বেশি নেই, তবে গা হিম করা পরিবেশের বর্ণনা আছে, আছে চোখ লাল করা অভিশপ্ত কাকের দল, মাই কাউরীমানব ও আছে। আর আছে মন ভালো করা একটা ending।
একখান scene আছে গল্পে, যেখানে মন্দিরের বাইরে পূজারিণী মন্ত্র পড়ছেন, আর তাকে ঘিরে মন্ত্র পড়ছে নরকের কিছু জীব! কি বলবো, পুরো witch incantation দেখতে পেলাম যেন চোখের সামনে।
মিথ, তন্ত্র সাধনা আর হরর নিয়ে উপন্যাসটা দারুণ বলা যায়। সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখকের গল্পের Buildup. লেখক ভৌতিক আবহাওয়ার দৃশ্যপটগুলো ভালোই লেগেছে। কিন্তু এতো ভালোকিছুর পরও লেখক শেষটা ভালো করতে পারেনি। মনে হলো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শেষ মুহূর্তে আছাড় খায়ছে। কাউরী বুড়ির মিথ আর রহস্যগুলো বিস্তারিত বলেনি। গোয়াহাটির লোকদের কি অভিশাপ দিয়েছিল সেটাও বলেনি। প্রত্যেকটা ঘটনার পর একটা বর্ণনা আর আসল কারণটা সবাই জানতে চায় কিন্তু লেখক শেষে এসব কিছুই দেন নি। অনির্বাণ, মাধুরী,সদান্দের মামা এদেরকে যেন হুট করে লেখক অদৃশ্য করে দিয়েছে। বইটা পড়ার সময় যতটা ভালো লেগেছিল সেই রেশ ধরে শেষটা মেনে নিতে পারলাম না। কিন্তু প্লট আর লেখনী দুর্দান্ত লেগেছে
পুরো বইটাই দারুণ রোলারকোস্টার রাইডের মত। প্রতিটা চরিত্র দারুণ ভাবে তুলে এনেছেন লেখক। কিন্তু ভাই বোনের এমন সম্পর্ক আমার চোখে মানানসই নয় তাই প্রচন্ড বিরক্তি আর অস্বস্তি হয়েছে। এই ব্যাপারটা অন্যভাবে তুললেও কোনো ক্ষতি ছিলো না। ওভারওল অনেক ভালো ছিলো বইটা। কিন্তু এই জিনিসটাই ঘেটে দিলো যা পড়ার পর বুঝতে পারবেন।
3.5 ভিন্ন স্বাদের একটি বই পড়ার ইচ্ছা করছিল। তাই ঝটপট করে পড়ে ফেললাম পশ্চিম বাংলার অভিক সরকারের " কাউরীবুড়ির মন্দির" ইচ্ছে করেই রাতে পড়েছি, রোমাঞ্চকর মুহূর্ত এর জন্যে 😂
বহুদিন পর এমন রুদ্ধশ্বাস, টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ভৌতিক গল্প পড়বার সৌভাগ্য হল । যৌন ঈর্ষাকে ভিত্তি করে এমন রোমাঞ্চকর ভূতের গল্প শরদিন্দুর "দেহান্তর" এর পর বোধহয় আর পড়িনি । যদিও এটা আসলে গল্প নয়, উপন্যাস আর "দেহান্তর"এর তুলনায় অনেক বেশি ডার্ক আর ভয়াবহ । আগাম সতর্কবাণী- এটি কিশোর পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয় । উপন্যাসে এমন কিছু দৃশ্যের বর্ণনা আছে যেগুলো শুধু ভয়ের নয়, রীতিমতো ডিস্টার্বিং (প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্যও) । ধর্ষণ, অজাচার, এবং নগ্নতার মত কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয় রয়েছে লেখাটিতে, অতএব দুর্বলচিত্তের পাঠক হলে বা এই ধরণের বিষয়ের প্রতি অরুচি থাকলে না পড়ার পরামর্শ দেব ।
তবে যারা মনে করেন ভৌতিক গল্পে এমন সব উপাদানের অবতারণা অযাচিত, তাঁদের জানাতে চাই যে এটা শিশু বা কিশোরপাঠ্য ভৌতিক গল্পের জন্য উপযুক্ত ফর্মুলা হতে পারে কিন্তু ভৌতিক গল্প মাত্রই সেটা শিশু বা কিশোরদের জন্য উপযুক্ত হতে হবে এমনটা দাবী করলে তাতে ভৌতিক কাহিনীর পোটেনশিয়াল ক্ষুণ্ণ হয় । মানবমনের অন্ধকার দিক নিয়ে এমন সব কাহিনী লেখা যায় যেগুলো চিরাচরিত অলৌকিক গল্পের চেয়ে বেশি ভয়াবহ ( প্রচেত গুপ্তের "বকুল" দ্রষ্টব্য) । ভয়ের গল্প লিখতে হলে তাই অলৌকিক, অপার্থিবের অবতারণা করাও নিতান্ত প্রয়োজনীয় নয় ।
সেভাবেই "কাউরীবুড়ির মন্দির"এর মূল ভয়ের জায়গাগুলো যত না অলৌকিক, তাঁর চাইতে বেশি লৌকিক । কাউরীবুড়ি, তাঁর অনুচর রক্তচক্ষু কাকেরা, গোলকপুষ্প, পাতরগোঁয়্যাদের উপর নেমে আসা ভয়াবহ অভিশাপ- এগুলো অলীক কল্পনার বেশি কিছু নয় । যথেষ্ট সাহসী ও যুক্তিবাদী মন হলে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক এতে রোমাঞ্চের আস্বাদ পেতে পারেন বড়জোর (আমি নিজে যখন গল্পটা পড়ে শেষ করি তখন বাজছিলো রাত তিনটে; আলো নিভিয়ে সবে শুয়েছি, জানালার খুব কাছেই ক'টা কাক তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠেছিল হঠাৎই । গল্পটা যারা পড়েছেন, তাঁরা সহজেই বুঝতে পারবেন এই ঘটনাটার তাৎপর্য কী । কিন্তু একটু রোমাঞ্চিত হওয়ার বেশি আমার আর কোনো উপলব্ধি হয়নি) । বরং আসল ভয়ের জায়গা হল সেগুলো যেখানে অলীক কল্পনা আর বাস্তব মিলে-মিশে যায়, যখন আর সেটাকে মনগড়া বলে উড়িয়ে দেওয়ার উপায় থাকে না । গল্পের অন্যতম চরিত্র মাধুরী যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় সেটা আমার মতে উপন্যাসের সবচেয়ে ভয়ের অংশ । রক্তচক্ষু কাকরূপী প্রেত অবাস্তব হতে পারে কিন্তু ধর্ষকরা বাস্তব; যক্ষিনী অলীক কল্পনা হতে পারে কিন্তু যৌন ঈর্ষা অতি ভীষণ বাস্তব । এমন বাস্তবিক ভয়ের উপাদানকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে ভৌতিক গল্প লেখার প্রয়াস কি অবাঞ্ছনীয় নয়?
ভূতের গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার হল ক্লাইম্যাক্স ভয়ের হয় না; তাতে উত্তেজনা থাকে, থ্রিল থাকে কিন্তু ভয় থাকে না । ভয় থাকে ক্লাইম্যাক্সের আগের দমবন্ধকর পরিস্থিতিতে, ভয় থাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতার মধ্যে অস্বাভাবিকতার এক ঝলক উপস্থিতিতে । আর ভয় থাকে পার্থিব-অপার্থিবের মিলনের মধ্যে যা চেনাকে করে তোলে অচেনা, জানাকে করে তোলে অজানা । তাই যেকোনো ভালো ভূতের গল্পে ভয়ের জায়গা হয় ক্লাইম্যাক্সের আগে অবধি যা-যা ঘটে তার মধ্যে । ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে গেলে সেটা তখন একটা থ্রিলার (মগলহাঞ্জামার প্রেত যখন গল্পের কথককে তাড়া করে আসছিলো বা জলের মধ্যে তাঁর পা টেনে ধরেছিলো সেই জায়গাগুলোতে পাঠকের কতটা ভয় লাগবে তা নিয়ে আমি সন্দিহান ) । "কাউরীবুড়ির মন্দির"ও তার ব্যতিক্রম নয় । চেনাকে আচমকা অচেনা করে তোলাতে লেখক যে পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন তাঁর লেখায় সেটাই পাঠকের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে ।
তবে অভীক সরকারের সব গল্পেই যেটা প্রত্যক্ষিত হয় তা হল অশুভ শক্তির শেষাবধি হার হয় কোনো কল্পিত তন্ত্র-মন্ত্রের দ্বারা নয়, বরং ভালোবাসার কাছে । যে কারণে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রতি গল্পেই তাঁর পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে ভোলেন না- "ভালোবাসাই হল সবচেয়ে বড় তন্ত্র, সবচেয়ে বড় জাদু" । কথাটা যে তাৎপর্যপূর্ণ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না । অতি করাল ভয়ের চেয়েও ভালোবাসার শক্তি বেশি । ভয়কে জয় করার উপায় আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই নিহিত আছে । ব্যাপারটা হয়তো একটু ক্লিশে, তবে লেখক সম্ভবত পাঠককে সম্পূর্ণ নৈরাশ্যে মগ্ন করতে চাননি । গল্পের কথক ভবতারণের মাধুরীর প্রতি জেগে ওঠা প্রেমকে তাই শেষাবধি সার্থকতা দিয়েছেন (যদিও পূর্বে মাধুরীর আয়ু আর মাত্র দু'দিন বলে গণনা করা হয়েছিল) ।
যাই হোক, একনিষ্ট ভূতের গল্পের ভক্ত হিসেবে আমি "কাউরীবুড়ির মন্দির"কে বেশ উঁচুতে স্থান দেব । যথেষ্ট গবেষণাসমৃদ্ধ লেখা সেটা পড়লেই বোঝা যায় । তার সাথে নিজের কল্পনা মিশিয়ে লেখক একটি অনন্য অকাল্ট/সাইকোলজিকাল হরর গল্পের জাল বুনেছেন । অদূর ভবিষ্যতে উনার আরো লেখা পড়বার আর পড়ে শিউরে ওঠার অনুভূতি পাঠকের সাথে ভাগ করে নেব এই আশায় রইলাম ।
This entire review has been hidden because of spoilers.
I keep myself away from the horror genre because I know the impact of terror that is bestowed upon me by horror stories. I can not help myself but think that the terror from those pages will emerge out to intensify and grasp my inner peace. However, I could not avoid reading this book as it was the BOTM with my buddy for April.
My Bengali friends may be well acquainted with Avik Sarkar’s name and writing style. I have been suggested his books many times by different people and I could not resist picking his book up this time. He has this perfect sense of inserting tantrism in horror and presenting a bone-chilling novel to the readers.
Bhabataran Chattopadhyay takes out this thrilling experience from his memory space upon the request of the lads of his area on a certain rainy night. Rare book collector Bhabataran sets off his journey in search of a special leaf that is only available in the jungle of Assam. There is a temple in the jungle where resides this special leaf which has the power to cure many diseases and can be used as an aphrodisiac as well. Unknown to the fact that no one has ever returned from the temple, locally known as Kauriburur Mandir, Bhabataran experiences a chain of events that leave him petrified.
The writing and the detailing will not only leave you baffled but also make your nights a bit scarier. I remember completing the book within three seatings, with the major reason being the crispy writing and well-maintained pace. The book was well edited. The read is perfect for a rainy weekend evening with your favorite snack. The climax, which was the main attraction of the book, was not that satisfying but it created the required ambiance.
Bengali literature has always been versatile. The past richness of Bengali literature has always made me worried about how the new generation authors will live up to the readers’ expectations. Some recent reads have made my belief stronger on the fact that Bengali literature will continue to shine. This book is certainly one of them.
জাস্ট অসাধারণ। ভিষষষণণণণণ ভালো লাগলো।দারুন তৃপ্তি পেয়েছি পড়ে। প্রচ্ছদটিও বেশ ইন্টারেস্টিং।আর হ্যা, অবশ্যই বইটা প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।
এটা মূলত কাউড়ী বুড়ির অর্থাৎ দশমমহাবিদ্যার একটি রূপ ধুমাবতী,তাঁকে নিয়েই গল্প, এক যৌন ঈর্ষার গল্প। গল্পের ছিটেফোঁটাও হিন্টস দিতে চাই না। নিজের পাঠ্য প্রতিক্রিয়া টুকুই জানাবো - কাহিনী বেশ টানটান, কোথাও ঝুলে পড়েনি। বই থেকে চোখ ফেরানোর জো নেই।জঙ্গলের হাঁটা পথ, কাউড়ীবুড়ির অনুচরদের নিস্তব্ধ উপস্থিতি, তন্ত্রের উপাচার, মন্দিরের বিবরণ এত নিখুঁত দিয়েছেন যেন সব চোখের সামনে ছবির মতো ফুটে উঠছিল।কি বিভৎস সব রীতিনীতি, চমকে চমকে উঠছিলাম। আর হ্যা এখানেও বিপদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। হাতে পেলে অবশ্যই পড়ে ফেলুন, নাহলে অনেক কিছু মিস করে যাবেন।নিজের কালেকশনে রাখার মতো একটা বই।
এই প্রথম অভিক বাবুর লেখা পড়লাম। এক্কেবারে গাঁজাখুরি 2 রুপিস গল্প। প্রথমটা আর মাঝের টা তাও একটু উত্তেজনা, টানটান একটা ভাব ছিল। শেষে এতটা cinematic করতে গিয়ে পুরো গ্যাঁজা টেনে লেখা শেষ করেছেন বলে মনে হলো, মানে এতটা না করলেই কি চলছিল না অভিকবাবু? আর এই মন্ত্র তন্ত্র কালা জাদু আর নিতে পারছি না। বর্তমান বই এর বাজার টা পুরো ছেয়ে ফেলেছে এই নেশায়। আর তাতে এই বই একবার পড়বার পর কোথাও রেখে ভুলে গেলে যায় আসবে না।
আসলে আমি এর আগে "ধূমাবতীর মন্দির" বইটি পড়েছি। সেটা বেশ লেগছে। কিন্তু এটা শেষ করার পর মনে হচ্ছিল কি পড়লাম। শুধুমাত্র এক গাদা বর্ণনা আর ইতিহাসের কচকচানি ছাড়া গল্পে কিছুই ছিল না।
বইটিকে যারা ভালো বলছেন তাদের মধ্যে বেশির ভাগ লেখক রয়েছেন দেখলাম। তারা কোন টার্মে ভালো বলেছেন সেটার কিন্তু সেভাবে উল্লেখ নেই। শুধু মাত্র তারা পড়ে অথবা লেখকের মন রাখতে অযাচিত প্রসংশায় ভাসিয়ে দিয়েছেন।