মানুষের জীবনে, স্মৃতিতে এমনও কোনো ঘটনা থাকে, যা তাকে সারা জীবনের জন্য অর্ধমৃত ও আতঙ্কিত করে রাখে। আমরা হয়তো জানি অথবা জানি না; কিংবা জেনেও না জানার ভান করি—আঙুল তুলে চুপ করিয়ে দেই অভিযোগকারীকে, যা মানুষটাকে সারা জীবনের জন্য মানসিকভাবে পঙ্গু করে রাখে।নানামুখী নদীর উপর দিয়ে বয়ে গেলেও এই বইয়ের উৎস, তেমনি তিক্ত এক গল্প। পাঠকের সামনে হয়তো খুলে যাবে স্মৃতির দরজা; না হলেও পাঠপরবর্তী অনুভূতিতে সে আগলে রাখবে তার নিকটজন ও স্বজনকে। চোখ-কান খোলা রাখবে, যাতে কোনো শিশু-কিশোরের জীবন তিক্ত না হয়ে ওঠে। এটাই পাঠকের কাছে নিবেদন—গুজারিশ।
আলেমা, সৃজনশীল ও শক্তিমান লেখিকা। পিতা : মাওলানা মুশতাক আহমাদ খান। মুহতামিম : জামেয়া আরাবিয়া ইসলামিয়া ধনকান্দি, শাহপরান, সিলেট। খতীব : কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, বন্দরবাজার, সিলেট শিক্ষা : দাওরায়ে হাদিস, ২০০৭ খ্রি.,মাদরাসাতুল বানাত, উপশহর, সিলেট পেশা : গৃহিণী, জননী, তালিবে ইলম লেখালেখি : লেখেন প্রবন্ধ, ফিচারসহ শিশুতোষ গল্প। অনলাইনে চমৎকার লেখার পসরা সাজিয়ে রাখেন তাঁর টাইমলাইনে। যুগোপযোগী লেখায় তাঁর হাত বড্ড পাকা। বেশ দরদ নিয়ে লিখেন, যেন তপ্তঅশ্রু বেয়ে বেয়ে ঝরে পড়ছে তাঁর কলম থেকে। বাংলা গদ্যে দক্ষতা অসাধারণ। তাঁর বাক্যের বুনন ও কারুকাজ পাঠককে সম্মোহনী শক্তির মতো টানে।
স্বপ্ন : প্রতিবেশী মুসলিম নারীদের সাথে নিয়ে সব ধরনের দ্বীনি ইলম অর্জন করা এবং এ চিন্তা ও কাজ ব্যাপকভাবে অন্যান্য মুসলিম নারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া। যাতে মায়েদের কোলে বেড়ে উঠতে থাকা ফুলশিশুরা হয় সভ্য পৃথিবীর পাহারাদার এবং যুগের অন্ধকারে দীপ্ত প্রদীপ।
বইটি শুরুর দিকে মনে হয়েছে এইটা বোনদের নিয়ে লেখা কোন গল্প হবে। যেখানে বোনদের প্রতি ভালোবাসা তাদের সাথে কাটানো সময় গুলো, তাদের করা খুনসুটি লেখিকা আপু দেখাবেন।
কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর বুঝতে পারলাম এটা রাবেয়ার গল্প। শুধু রাবেয়ার গল্প বললে ভুল হবে এইটা প্রতিটি মেয়ের গল্প যাদের স্মৃতিতে এমন কোন ঘটনা থাকে, যা তাকে অর্ধ মৃ'ত ও আতঙ্কিত করে রাখে।
অনেক সময় দেখা যায় ছেলেমেয়েরা ভুল না করেও বাবা মায়ের কাছে দোষী সাব্যস্ত হয়। বাবা মা পুরো ঘটনাটা না জেনেই দোষারোপ করা শুরু করে দেয়। তেমনি ঘটনা ঘটে রাবেয়ার সাথে। কোন দোষ না করেও শাস্তি পায়। যার কারণে ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে যায়। কাউকে কিছু বলে না, কোন অভিযোগ করে না, নিজের মতো থাকতে শুরু করে। একটা সময় পর একেবারে চুপচাপ হয়ে যায়।
গল্পটি রাবেয়ার। ছোটবেলায় অনেক চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে ছিল। রাবেয়াকে বোঝার মতো একজন মানুষ ছিল সেটা হচ্ছে আমেনা বড় বোন। সে রাবেয়াকে অনেক ভালোবাসত। রাবেয়া ও আমেনা বলতে পাগল ছিল। কোন একটি কারণে তাকে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মাদ্রাসায় চলে যাওয়ার পর আমেনা নিয়মিত কথা বলতে না পারলেও নিয়মিত চিঠি লিখতো। কিন্তু রাবেয়া একটাও খুলে দেখতো না। ওর মনে হতো খুলে দেখলেই শেষ হয়ে যাবে। তাই জমিয়ে রাখতো চিঠি গুলো। জমিয়ে রাখতো নিজের না বলা কথা গুলো। বড় বোনের সাথে দেখা হলে সব অভিযোগ, অভিমান এক সাথে প্রকাশ করবে এই আশায়।
একদিন বড় চাচা এসে রাবেয়াকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যায় বড় বোন আমেনার সাথে দেখা করানোর জন্য। রাবেয়ার মনে সন্দেহ জাগলেও কোন প্রশ্ন করে না। অনেক দিন পর বোনের সাথে দেখা করবে এই খুশিতে বাকি সব কিছু ভুলে যাই। আমেনার শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থমকে যায় রাবেয়া। তার এলোমেলো জীবনটা আরো এলোমেলো হয়ে যায়। অধিক শোকে পাথর হয়ে যায় মানুষ। তেমন হয়ে গিয়েছিল। একটুও কান্না করে নি। সবার সাথে বড় বোনের সাথেও পাহাড় সমান অভিমান করে ছিল। একটু কথা বলার সুযোগ দেয় নি। এই জায়গাটায় আমি থমকে গিয়ে ছিলাম। কান্না চলে আসছিল। কোন বই পড়ে এরকম ফিল হয় নি।
হুট করে রাবেয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। যার সাথে রাবেয়ার বিয়ে ঠিক হয় সেই ছেলেটির বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে মেয়ে দেখে তাৎক্ষণিক বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। যার কারণে রাবেয়ার মনে বিরূপ প্রভাব পরে। সে বিয়ে করলেও মন থেকে মেনে নিতে পারে নি। তার স্বামী বিষয়টি বুঝতে পেরে সময় দেয়। অনেক পাগলামী করে রাবেয়া। বিয়ে ভাঙ্গার জন্য অনেক চেষ্টা করে। অনেক ভাবে কষ্ট দেয়। এইসব পাগলামী করতে গিয়ে একটা সময় পর নিজের ভুল বুঝতে পারে। রাবেয়া ও চায় সংসার করতে। কথায় আছে না হারিয়ে ফেলার পর মর্ম বোঝা যায়। তেমন হয়ে ছিল। একটি ঘটনা সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। নিজের সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তার চেয়েও বেশি করে ছিল। কিন্তু ওর স্বামী মানতে নারাজ।
পাঠক প্রতিক্রিয়া: আমার এই বছরের পড়া বেস্ট বইগুলোর মধ্যে একটি বই হচ্ছে গুজারিশ। বইটা পড়া শুরু করার পর আমার মনে হয়েছে আমি হারিয়ে গেছি বইয়ের পাতায়। প্রথম দিকে ছিমছাম একটি গল্প মনে হলেও ১২০ পৃষ্ঠা পড়ার পর বইটি রেখে আর উঠতে পারলাম না। একেবারে শেষ করে উঠেছি। রাত সাড়ে তিনটায় শেষ করার পরও আধা ঘন্টা বইটি বুকের উপর রেখে শুয়ে ছিলাম। আর ভাবতে ছিলাম কি লিখেছে লেখিকা আপু! কেন শেষ করলাম তা ভাবতে ছিলাম!
রাবেয়ার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের আশেপাশের প্রতিটি মেয়ে রাবেয়া। যারা দোষ না করেও ছোট, বড় অনেক ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হয়। যাদের অভিমান বাড়তে থাকে অথচ কাউকে বুঝতে দেয় না। চঞ্চল মেয়েটি হুট করে চুপচাপ হয়ে যাবে। আমার অনেক খারাপ লেগেছে আমেনার মৃ'ত্যু। তবে রাবেয়ার মতো পাথর হয়ে যাই নি। আমার তখন খুব কান্না করতে ইচ্ছা করে ছিল। তারচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে রাবেয়া তার সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করেছেন তা পড়তে গিয়ে। শেষ কবে এরকম বাজে অবস্থা হয়েছিল বই পড়তে গিয়ে আমার মনে নেই। তবে মনে দাগ কে'টে আছে।
বইটি প্রতিটি মেয়ের পড়া উচিত। ছেলেরাও পড়তে পারেন তাতে কোন সমস্যা হবে না। তবে বাবা মায়ের পড়া দরকার। বইটিতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা আপু। বইটিকে অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছে গালিবের শায়েরী। বিভিন্ন বিষয়বস্তুর সাথে মিল রেখে শায়েরী গুলো দেওয়ার কারণে এত্ত ভালো লেগেছে যা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আবার কিছু কিছু শায়েরী পড়ে হাসি আটকে রাখা দায় হয়ে গেছে।
আমি এই বইটির সাথে চমৎকার সময় পার করেছি। যারা পড়েছেন তারা জানেন বইটি কতটা সুন্দর। আর যারা পড়েন নি তারা চাইলে সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। পয়সা উসুল টাইপ একটি বই।