অন্ধকারে ঢাকা এক শহর। এক অজানা যাত্রার শুরু। মস্তিষ্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক দুষ্ট স্নায়ুর বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছেন তিনি। কিন্তু এই যাত্রা কেবল একটি অপারেশনের গল্প নয়—এটি এক গভীর রহস্যের উন্মোচন।
কেন তিনি এই পথে পা বাড়ালেন? কী এমন ঘটেছিল, যা তাঁকে বাধ্য করল নিজের জীবন এবং ভবিষ্যৎকে বাজি রাখতে? হাসপাতালের শীতল করিডোর থেকে দিল্লির ব্যস্ত রাস্তাগুলো পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়।
"ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে" এমন একটি কাহিনি, যেখানে প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে নতুন আবিষ্কার, নতুন প্রশ্ন। বন্ধুত্বের শক্তি, পরিবারের অটুট বন্ধন, আর জীবনের প্রতি অদম্য আকর্ষণ—সবকিছু মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দলিল।
কিন্তু এই গল্প কি শুধুই আনন্দ আর মানবিকতার? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু, যা পাঠককে বাধ্য করবে বারবার ভাবতে? প্রতিটি পৃষ্ঠা আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে এক অজানা জগতে, যেখানে ব্যথা আর আনন্দ হাত ধরাধরি করে চলে।
আপনি কি প্রস্তুত এই রহস্যময় যাত্রায় অংশ নিতে? "ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে" শুধু একটি ভ্রমণ কাহিনি নয়; এটি একটি থ্রিলার, যা পাঠকের হৃদয়ে দোলা দেবে এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে।
মানুষের শরীর এক অনবদ্য যন্ত্র, যার কাঁটা নিরবিচারে চলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু এই যন্ত্রও ক্লান্ত হয়, জং ধরে, আর এক সময় থেমে যায়।"—এই দার্শনিক বাক্য দিয়ে শুরু হওয়া আত্মজৈবনিক ভ্রমণকাহিনিটি আমাদের নিয়ে যায় এক ব্যতিক্রমধর্মী যাত্রায়—যেখানে শরীর, যন্ত্রণা, চিকিৎসা, দেশ-বিদেশ, ইতিহাস আর আত্মজয়ের গল্প মিশে এক হয়ে যায়। “ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে” বইয়ের লেখক একজন চিকিৎসক, কিন্তু এই গল্পে তিনি রোগীর ভূমিকায়। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া নামের এক দুর্লভ ও যন্ত্রণাদায়ক স্নায়বিক ব্যাধি তাঁর মুখের পেশিকে আক্রমণ করে। রোগটি এমন, যেখানে হাসি-কান্না—উভয় অনুভূতিই হয়ে দাঁড়ায় শারীরিক এবং মানসিক শাস্তি। তিনি যেভাবে ব্যথাকে ভাষায় রূপ দিয়েছেন, তা শুধু একজন ডাক্তার নয়, একজন লেখকের সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে। লেখক ডাক্তারি ভাষায় এই রোগকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন: "কাঁদতে চাইলেও হাসি আসে, আর হাসতে চাইলেও চোখে পানি জমে—তার সঙ্গে জুড়ে যায় ছুরির মতো তীক্ষ্ণ ব্যথা।" ওষুধে ফল না মেলায়, শেষমেশ তিনি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁর মেডিকেল ট্যুরিজম—চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে পাড়ি দেওয়া। ভিসার জটিলতা, আর্থিক চিন্তা, অপারেশনের ভয়, আর এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে দাঁড়িয়ে—তিনি রওনা দেন ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লির উদ্দেশ্যে। এমন একটা ছোট ভাই হয়ত সবাই চাইবে তার জীবনেও থাকুক। এই বইয়ের একটি বড় শক্তি হলো চিকিৎসা-ভিত্তিক ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে লেখকের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মেলবন্ধন। দিল্লির লাল কেল্লা, কুতুব মিনার, পুরনো বাজারের চঞ্চলতা, রাস্তার খাবার—সবকিছুই জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর লেখায়। এমনকি অপারেশনের আগে-পরের মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যেও তিনি কেরালার স্বাদের মোমো আর আলু পরোটা উপভোগ করতে ভোলেন না। ভ্রমণ কাহিনীর যে অংশটুকু সেটা এত উপভোগ্য হয়েছে তার একমাত্র কারন “এস এম নিয়াজ মাওলা”। তবে, শুধু নিজের কাহিনিতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি লেখক। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকেও তিনি অন্য রোগীর গল্প শোনেন—কখনো ইয়েমেনের এক ছেলের, আবার কখনো এক মায়ের আত্মত্যাগের। এসব পার্শ্বকাহিনি তাঁর অভিজ্ঞতাকে আরো মানবিক, সার্বজনীন করে তোলে। কলকাতার এক নার্স যখন ফোনে কথা বলে তার ভালোবাসার মানুষকে বলেন আমার সামনে যে রোগী সে বাংলা বুঝে না এইটা পড়ে আমি হেসেছি অনেক সময়। অপারেশনের দিন ও পরবর্তী অধ্যায়ে লেখক আমাদের শোনান এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক ভ্রমণের গল্প—চোখ ঝাপসা, মাথায় ব্যথা, কিন্তু হৃদয়ে সাহস। অপারেশনের পরের দিনগুলো ছিল কষ্টকর, তবে শিক্ষা ও পুনর্জন্মেরও। ICU তে থাকার সময়ের গল্প উনি একটু কম বলেছেন হয়ত যে অবস্থা উনার ছিলো উনার মনে নেই অনেক কিছু। এই রচনাটি লেখকের সাধারণ পৌরাণিক ও মিথভিত্তিক বইগুলো থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর অতীত লেখায় যে ভারীতা ও প্রাচীনতত্ত্বের ছায়া ছিল, এই বইতে তা নেই। বরং এখানে আছে একেবারে বাস্তব, বর্তমান ও মানবিক অভিজ্ঞতা। আমার কাছে পড়তে পড়তে হুট “আয়েশার মা” সংক্রান্ত কাল্পনিক subplot কিছুটা অপ্রয়োজনীয় ও গল্পের মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়েছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা বইটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে ধরে—দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বৈষম্য। লেখক ভারতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশংসা করলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। বইটি এই বার্তাও দেয়—স্বাস্থ্যবীমা শুধু আর্থিক নয়, মানসিক নিশ্চয়তারও অপরিহার্য অংশ। বইটা পড়ার সময় আমার খুব আফসোস হয়েছে কেনো আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এত খারাপ, শেষ দিকে লেখক সেটার কিছু কারন বলেছেন। ব্যক্তিগত সংযোগ ও পাঠ-অভিজ্ঞতা এই বই পড়ে আমি আমার নিজের অপারেশনের দিনগুলোর কথা মনে করলাম— কিডনির অপারেশনের সকাল থেকে আমার যে আতঙ্ক ছিলো আমার, পড়ার সময় বুঝতে পেরেছি একা একজন মানুষ দেশে বাইরে তার কেমন লেগেছে। এখনো অপারেশনের নাম শুনলে বুক কেঁপে ওঠে। উনি এনেস্থেসিয়া (Anesthesia) দেওয়ার সময় একটু কথা বলেছেন বাস্তবে আসলে এমনি মনে হয়, যারা গিয়ে গেছে তারা বুঝতে পারে। এই বই তাই শুধু একজন চিকিৎসকের ডায়েরি নয়, বরং একজন মানুষের—যিনি সাহস, ব্যথা, ইতিহাস আর আত্মবিশ্বাসকে একসাথে ধারণ করেছেন। লেখকের অপারেশনের পরে উনার একজন কাছের মানুষ উনারে একটা সারপ্রাইজ দেয় ঐ সময়ের গল্প পড়ার সময় আমার চোখ ভিজে গিয়েছিলো, আহ কি স্নেহ-মমতা।
এই বই শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়, এটি জীবন যুদ্ধের উপাখ্যান। চিকিৎসা, ব্যথা, ইতিহাস, মানবিকতা—সবকিছু এক অসাধারণ ভাষাশৈলীতে মিশে গেছে। পাঠক হিসেবে আমার কাছে এটি লেখকের সেরা কাজগুলোর একটি। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আমাদের দেশেও এমন একদিন আসবে—যেখানে চিকিৎসার জন্য আর কাউকে দেশের বাইরে যেতে হবে না। আর লেখকের জন্য রইল দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের শুভকামনা। প্রকাশনা মূল্যায়ন: বইটির সামগ্রিক উপস্থাপনা আরও উন্নত হতে পারত। লেখকের অন্যান্য বই যেভাবে প্রিমিয়াম মানের কাগজ, ছাপা ও বাঁধাইয়ে প্রকাশিত হয়, সেই তুলনায় বিবলিওফাইল প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত এই বইটির গুণগত মান কিছুটা দুর্বল। বইটিতে কিছু ছবি সংযুক্ত রয়েছে, তবে সেগুলো রঙিন না হয়ে শুধুই সাদাকালো হওয়ায় ছাপার পর অধিকাংশ ছবিতে অতিরিক্ত কালচে ভাব দেখা গেছে, যা পাঠকের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত। যেহেতু লেখকের অভিজ্ঞতা চিত্রায়নে ছবিগুলোর একটি আবেগ-ভরাট ভূমিকা রয়েছে, তাই সেগুলোর মান ও ছাপা আরও যত্নসহকারে করা যেত।
❛অসুস্থ হলেই একমাত্র বোঝা যায় সুস্থতা কত বড়ো নেয়ামত!❜
আমাদের এই দেহঘড়ি ২৪ ঘন্টা বিরতিহীনভাবে চলছে। প্রতিটি অঙ্গ ঠিকমতো কাজ করছে বলেই আমরা চলতে ফিরতে পারছি। পারছি নিজের মতো থাকতে। তবে দেহঘড়ি চলতে চলতে ক্লান্ত হয়, কখনো বিকল হয় আর সেই ঘড়ির মেয়াদ ফুরোলে বিলীন হয়ে যায়। দেহঘড়িতে একটু সমস্যা দেখা দিলে একটু চিকিৎসা করে আবার সচল করা যায়। তবে সেই প্রক্রিয়াটা কখনো সরল, কখনো জটিল। রোগের পরিমাণের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা। মানব দেহ এক অপার রহস্যের আধার। সৃষ্টিকর্তার নিখুঁত সৃষ্টির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তবে এই দেহ চলতে চলতে ক্ষয়ে যায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়, অসুস্থ হয়। তেমনই এক অসুখ ❛ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া❜। মুখের পেশীর বেশ অদ্ভুত কিন্তু ভোগান্তির এক রোগ এটি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, ❛এটি এমন এক রোগ যেখানে আপনি কাঁদতে চাইলে হাসবেন, আবার যদি চান হাসতে তখন দেখবেন কাঁদছেন!❜
আর সেই সাথে তীক্ষ্ণ ব্যথা তো আছেই। দেহের স্বাভাবিক চলন প্রক্রিয়ার মধ্যে বিদ্রোহ করে বসা এই রোগ আপনাকে ভোগাবে। যেমন ভুগিয়েছে লেখককে। পেশায় চিকিৎসক হওয়ায় পেশীর এই বিদ্রোহকে তিনি সহজেই ধরে ফেলতে পেরেছেন। কেমন ব্যাপার না, আজীবন রোগীর চিকিৎসা করে যাওয়ার পর নিজেই যখন রোগীর চরিত্রে আসন পান তখন কেমন হয়?
এই রোগের সাথেই শুরু হয় ব্যথার রাজ্যে প্রবেশ। তবে রোগকে বাড়তে দেয়া মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। তাই ওষুধে যখন ধরছিল না তখন সিদ্ধান্ত হলো নিজেকে ছু রি, কাচির নিচেই সমর্পণ করা তথা অ স্ত্রোপচার করা।
এখানেই যাত্রা হলো স্বাস্থ্য পর্যটনের। ভিনদেশে জটিল অ স্ত্রোপচারের জন্য পাড়ি জমানোর পাশাপাশি ভিনদেশটা একটু ঘুরেও দেখা। বায়ু পরিবর্তন বলা যায়। ভিনদেশ হিসেবে বেছে নেয়া হলো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে। সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ধারনা সকলেরই আছে। তবে এই কয়েক মাসে আগের দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে পাশের দেশের সাথে সম্পর্কের অবনতি মিলিয়ে সেখানে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বেশ কঠিন হয়ে গেল। নানা কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি পেলেন নিজেকে সুস্থ করতে যাওয়ার সম্মতিপত্র তথা ভিসা। আর চিকিৎসা মানেই টাকার খেলা। উন্নত চিকিৎসার জন্য পয়সা খসাতে হবে। এই বিপদেও তিনি পেলেন কাছের মানুষের সহযোগিতা সাথে সাস্থ্য বীমার ভরসা।
শুরু হলো দিল্লি যাত্রা। সঙ্গী লেখকের কাছের ছোটো ভাই। মস্তিষ্কের জটিল অ স্ত্রোপচার কোনো ছেলেখেলা নয়। আছে ঝুঁকি, আছে অনিশ্চয়তা। তবে নিজেকে হার না মানিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। জীবন প্রতি পদে শিক্ষা দেয়, প্রতি মোড়ে বাঁক পরিবর্তন করে। কখনো জিওপির জন্য অপেক্ষা, কখনো সামনে কী হবে সে অনিশ্চয়তা আর সঙ্গী হিসেবে ব্যথা তো ছিলই। তবে মানুষ জীবনের সকল প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে সবসময় দৃঢ় থাকে।
দুঃখের মাঝেও আনন্দকে খুঁজে নিতেই তিনি বেরিয়ে পড়লেন দিল্লি দর্শনে। কুতুব মিনার, লাল কেল্লা, দিল্লির অলিগলি, মল, দিল্লির মুখরোচক খাবার চেখে দেখা, চাঁদনী চক ইত্যাদি জায়গা। দিল্লির প্রতিটি গলি, দর্শনীয় স্থান যেন একেকটা ইতিহাসের সাক্ষী। কুতুব মিনার যেমন কালের সাক্ষী হয়ে নিজের ইতিহাসের জানান দিচ্ছে তেমনি লাল কেল্লার প্রতিটি কোনা জানাচ্ছে মুঘল আমলের শান শকাতের কথা। দাওয়াহ-ই-আম থেকে সম্রাটের আমোদ কক্ষ, দরবার, সংগ্রহশালা কী করে কালের বিবর্তনে ইংরেজ বাহিনীর সৈন্য ঘাটি হয়ে তার সৌন্দর্য হারালো সেই করুণ ইতিহাসও উঠে এসেছে। উঠে এসেছে আলু পরোঠা কিংবা কেরালার মুখরোচক খাবারের স্বাদ। বিরিয়ানি, স্ট্রিট ফুড, মোমো থেকে শুরু করে ভিন্ন স্বাদের চা সবই ব্যথাকে সঙ্গী করে চেখে দেখেছেন লেখক।
একইসাথে চলেছে নিজেকে সুস্থ করার কার্যক্রম। দিন ঘনিয়ে আসলে নিজেকে সপে দিতে হয়েছে ডা. বিপিনের অপারেশন টেবিলের নিচে। অ্যানেসথেসিয়ার প্রভাবে যখন চেতনা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল তখন কি ভয় হয়নি? হতে পারে এটাই জীবনের শেষ জাগ্রত মুহূর্ত? দীর্ঘ ঘন্টা পর যখন চোখ একটু আলোর দেখা পেলো তখন মাথায় তীব্র বেদনার অনুভূতি, ঘুম কিংবা জাগরণের মাঝে দোলাচল, আবছা দৃষ্টিতে সামনে ঝাপসা কাউকে দেখা আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেকে ধাতস্থ করতে গিয়ে কি মনে হয়নি, একটা যু দ্ধ প্রায় অর্ধেকের বেশি জয় করা হয়ে গিয়েছে? এইটুক যখন আসা গেছে বাকিতেও উতরে যাওয়া যায়।
একটা হাসপাতাল যেন শুধু চিকিৎসা নেয়ার জায়গা নয়। এখানে নানা রোগের, নানা রোগীর আগমন ঘটে। যাদের প্রত্যেকের আছে একটা করে অজানা গল্প। এই যেমন পাশের বেডের আয়েশার মায়ের গল্পটা লেখক নিজের মতো কল্পনা করেছেন। আবার জেনেছেন ইয়েমেনি পুত্রের মাকে সুস্থ করতে আসার দীর্ঘ যাত্রা এবং ত্যাগের গল্প। সেই কষ্টগুলোর মাঝে রোগী হিসেবে নিজেকে কখনো হয়তো একটু ভাগ্যবান মনে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে যখন ক্রমশ সুস্থতার পথে তখনই আবার দিল্লির পথে ঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন, চেখে দেখেছেন দিল্লির রসনা বিলাশ।
এরপর দিনটা ছিল ডিসেম্বরের এক তারিখ, ২০২৪। দিল্লির আকাশ তখন রাতের আধারে ঘনিয়ে গেছে। আধো ঘুম অবস্থায় যখন দুই রুমের বেজমেন্টের দরজায় টোকার শব্দ হলো তখন তিনি অবাক হয়েছেন অবশ্যই! অচেনা এই দেশে কে আসবে তার কাছে? সঙ্গী ছোটো ভাই এহসান তো বাইরে বেরিয়েছে, যার সঙ্গে ঘরে ঢোকার চাবি আছে।
দরজা খুলে দেখা গেল সুদূর কানাডা থেকে হাজির লেখকের বোন। পরদিন যে ভাইয়ের জন্মদিন! একে অসুস্থ এরপর আবার ভাইয়ের জন্মদিন। কী করে দূরে থাকা যায়? তাই চমকে দিতেই এসে পড়া। মানুষ চেনা যায় বিপদে, অসুস্থতায়। লেখকের পাশে ঠিক এই সময়েই ছিল এমন কিছু মানুষ যাদের সহযোগিতা আর ভালবাসা তাকে কঠিন এই পথে চলতে অদম্য সাহস যুগিয়েছে। ভরসার হাত দুটোর বদলে কয়েক জোড়া ছিল বলেই হয়তো কঠিন সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লড়ে যেতে পেরেছেন।
অ স্ত্রোপচার পরবর্তী হালকা জটিলতা দেখা দিলেও ভাগ্যবিধাতা আগের মতো আর বাঁকা হাসি হাসেননি। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের বেশির যাত্রার পর তাকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন স্বদেশের মাটিতে। দিল্লিতে চিকিৎসা নেয়া শুধু একটা সুস্থতার যাত্রা নয়, ছিল দ্বিতীয় জন্ম। নিজেকে নতুন করে জানা গেছে। কঠিন সময়ে নিজেকে ধরে রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ঠিকই ব্যথার মাঝে আনন্দের খোঁজ করে নিয়েছেন। কাঁটা পেয়েও ফুল দান করার মতো করেই রোগকে জয় করেছেন। অভিজ্ঞতার ভান্ডারে নতুন গল্প যোগ হয়েছে। যোগ হয়েছে নিতান্ত ক্ষুদ্র জিনিসের মাঝেও লুকিয়ে থাকা শিক্ষা।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে❞ এস এম নিয়াজ মাওলার লেখা ভ্রমণকাহিনি। আরো ঠিকভাবে বললে বলা হবে স্বাস্থ্য পর্যটন বিষয়ক লেখা।
লেখককে আমরা চিনি পুরাণের লেখক হিসেবে। নানা দেশের পুরাণ নিয়ে ঢাউস সাইজের বই লিখে তিনি পাঠকের কাছে পরিচিত। আরো একটু বেশি পরিচিত ঢাউস সাইজের বইগুলোর সাধ্যের বাইরে মূল্যের কারণেও। তবে এবার তিনি আবির্ভূত হয়েছেন নিজের প্রচলিত লেখার গন্ডির বাইরে। নিয়ে এসেছেন ব্যক্তিগত জীবনে হওয়া নতুন এক অভিজ্ঞতাকে। যাকে ভ্রমণকাহিনি হিসেবে পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের কাছে।
গত বছর শেষের দিকে তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন কঠিন এক ব্যাধিতে। যা তাকে শেষ পর্যন্ত ভিনদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য করে। সেই অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই লেখক বইটি রচনা করেছেন। কয়েকটি অধ্যায়ে সুন্দর কিছু শিরোনামে সজ্জিত বইটির শুরু হয়েছে ব্যথার রাজ্যে প্রবেশের মধ্য দিয়ে। যেখানে সুস্থ হওয়ার তাগিদে লেখককে সম্মুখীন হতে হয়েছিল নানা বাধার, ভাগ্যের জটিল খেলা আর একেকবার হাসি আর হতাশার অদ্ভুত দোলাচলে দুলেছেন তিনি। তবে আমি বলবো তিনি অনেক দিকেই ভাগ্যবান। আশপাশে পেয়েছেন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী, পাশে থাকার মানুষ এবং ব্যথার মাঝেও একটু মুখে হাসি ফোটানোর স্বজন। অসুস্থতা থেকে সুস্থতার যাত্রায় প্রতি পদে তিনি যে শিক্ষা পেয়েছেন সেগুলো দারুণ সুন্দর উপমায় প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে দিল্লির রাস্তায় বিচরণের কথা, দিল্লির ইতিহাস, রসনা এবং অদেখা ব্যাপারগুলোও তুলে ধরেছেন। ভ্রমণের সাথে সাথে ইতিহাসপাঠ হয়ে গেছে বেশ। জানতে পেয়েছি পশমিনা শালের ইতিহাস, বিপত্তি আর সম্ভাবনার কথা, মুঘল আমলের বিলাসিতা, তাদের প্রযুক্তি আর কালের বিবর্তনের কথা। বর্ণনার ভঙ্গি ভালো ছিল বলে এটা যে নন ফিকশন সেরকম মনেই হয়নি। সেইসাথে লেখককে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে আরো পূর্ণতা দান করতে অজানা সেই রোগী যার কন্যার নাম আয়েশা তার গল্পের দুটো সমাপ্তি লিখেছেন লেখক নিজের মতো করে। এই অংশটা দারুণ ছিল। লেখকের লেখা বেশ দ্রুত গতির। কঠিন রোগকে বেশ সাবলীলভাবেই ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে সেখানে বারবারই একই জাতীয় শব্দ আর উপমার প্রয়োগ কিছুটা একঘেঁয়ে লাগছিল। আবার কিছু উদাহরণ আমার কাছে মনে হয়েছে মানানসই না (আইফোন কেনার উদাহরণ বা উপমাটা মিল লাগে নি আমার কাছে)। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় হয়তো সেটাকেই লেখকের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।
১৯৮ পাতার এই অভিজ্ঞতার বর্ণনায় এটা বেশ বুঝা গেছে অসুস্থতাকে জয় করতে নিজের আত্মবিশ্বাস, আশপাশের শিক্ষা আর কিছু ভরসার মানুষ কত জরুরি। সেই সাথে জরুরি আর্থিক অবস্থা ঠিক থাকার। আর এখানেই গুরু���্ব পেয়েছে আমাদের দেশীয় প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য বীমার কথা। যে সুবিধা চাকরিসূত্রে লেখক পেয়েছেন সেটা একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে বা রোগী হিসেবে দেশের প্রতিটি মানুষের থাকা উচিত। এই নিশ্চয়তা আমাদের দেশের চিকিৎসা খাত এবং ব্যবস্থাকে অনেক পরিবর্তন করে দিতে পারে।
লেখক নিজের অসুস্থতার বর্ণনাকেই এখানে প্রাধান্য দিয়েছেন এমনটা নয়। আমার মনে হয়েছে বেশিরভাগ জুড়ে ছিল ভারতের দিল্লির বর্ণনা। তাদের ঐতিহ্য, আধুনিকতা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাবার, দর্শনীয় স্থানের বর্ণনা সাথে জুড়ে থাকা অজানা ইতিহাস। লেখকের বর্ণনাতেই দিল্লি দর্শন হয়ে গেছে।
লেখক যেমন ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন। তেমনি ভুলে যাননি আপন ভূমিকেও। আমাদের দেশ আসলে কতটা সম্ভাবনার সেটাও উল্লেখ করেছেন। শুধুমাত্র দরকারি পদক্ষেপ আর কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা পারে চিকিৎসা খাতে আমাদের দেশকেও উন্নত করার। শেষে লেখক এই খাতে আমাদের উন্নয়ন করার আশা ব্যক্ত করেছেন। এই বইটা পড়ার সময় কখনো না কখনো অসুস্থতার সম্মুখীন হয়েছেন, ছু রি কাচির নিচে নিজেকে ফেলতে হয়েছে এমন মানুষ বেশ ভালো রিলেট করতে পারবেন। অসুস্থতা আর চিকিৎসার সময়টুকু একজন রোগীর কাছে কেমন কাটে অনুধাবন করা যায়।
আমার এই জীবনে অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হয়েছে দুইবার। প্রথমবার আমি বেশ এক্সাইটেড (!) ছিলাম বলতে দ্বিধা নেই। সিনেমায় OT লেখা দেখতাম। লাইট জ্বলছে নিভছে। টেবিলের গোল লাইটের নিচে রোগীর জীবন ম রণের সিদ্ধান্ত হচ্ছে। ব্যাপারগুলো আমার কাছে কিছুটা ফ্যান্টাসির মতো ছিল। তো প্রথমবার আমাকে যখন সার্জারির আগে অবজার্ভেশন কক্ষে রাখা হলো আমি বেশ হালকাই ছিলাম। হাতে ক্যানুলা নিয়েও রুমের এই সেই ঘেঁটে দেখছিলাম। বাকিরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিক। এরপর যখন আমাকে অ্যানেসথেসিয়া দেয়া হলো ঐ অনুভূতি ব্যক্ত করা সম্ভব না। অতল ঘুমে তলিয়ে যাবার আগে আমি শুধু চাইছিলাম এই মুহুর্ত যেন নেক বান্দার পুলসিরাত পার হওয়ার মতো গতিতে চলে যাক। এরপর আর কিছু মনে নেই.. যখন চোখ খুলেছিলাম তখনো আমি জানিনা আমার সার্জারি শেষ। উঠতে গিয়ে তীব্র ব্যথায় আচ্ছন্ন হলাম। লেখকের জ্ঞান ফেরার বর্ণনাও আমার অভিজ্ঞতার কাছাকাছি ছিল। তবে লেখকের অস্ত্রোপচার আমার থেকে কয়েক গুণ জটিল ছিল। তবে দ্বিতীয়বার সার্জারিতে আমি যারপরনাই ভীত ছিলাম। রোগটা আমাকে এক দশকের বেশি সময় ভুগিয়েছে। ঐ অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। যা আমাকে এখনো পীড়া দেয়। ডাক্তার, হাসপাতাল, রোগ আর রোগী এই ব্যাপারটা গত দুই বছর ধরে আমার কাছে একটা মানসিক ধাক্কার মতো। অনেক আগে থেকেই আমি রোগী দেখতে যেতে পছন্দ করিনা। আমার দমবন্ধ লাগে। দুই বছর আগের পারিবারিক একটা অভিজ্ঞতা আমাকে আরো বেশি ধাক্কা দিয়েছে। যার ফলস্বরূপ আমি নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালের সামনে দিয়ে গেলে চোখ বন্ধ করে যাই। যেন স্মৃতিগুলো আমার চোখে না ভাসে। এমনকি আজও কোনো হাসপতালের সামনে দিয়ে গেলে আমি চোখ কান বন্ধ রাখি। মানসিক, আর্থিক আর শারীরিক ক্ষতি সেটা একজন রোগীর হয় সাথে তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরাও কিছুক্ষেত্রে সেই ট্রমা ভুলতে পারে না। এই বইটা পড়তে গিয়ে আমি নির্দিষ্ট কয়েকটা বছরের ঘটনা যেন আবার চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম। আর একজন চিকিৎসক যখন নিজেই রোগীর আসনে অধীন হোন তার অনুভূতিও বোঝা যায়। এই বইয়ের ভালো মন্দ দিক থেকে আমার কাছে মূল মনে হয়েছে কঠিন সেই অভিজ্ঞতাটা। লেখক যথেষ্ঠ আবেদন, আবেগ দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছেন। রোগের ব্যাখ্যায়, রোগে ভোগা অংশগুলো যেমন পীড়া দিচ্ছিলো, তেমনি দিল্লির ইতিহাস, অলিগলি বর্ণনা মুগ্ধ করেছিল। আবার জিভে জল এনেছিল রসনার বর্ণনা। আনন্দ দিয়েছিল পরিবার আর বন্ধুদের চমকে দেয়া, পাশে থাকার বর্ণনা।
লেখকের লেখা এই নিয়ে তিনটা বই পড়া হয়েছে। আমি নিঃসন্দেহে এই বইকেই এগিয়ে রাখবো। আমার মতে বইটি শুধু একটা ভ্রমণকাহিনি না অসুস্থতাকে জয় করার আখ্যান। লেখকের সাথে আগে কাজ করায় তাকে চিনি। তিনি কতটা উচ্ছল এবং প্রাণবন্ত জানি। তিনি দীর্ঘ কয়েকটা মাস যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন সেটা অল্প হলেও জানতাম। তবে এখানে বিস্তারিত জেনে অবাক হয়েছি। এত কিছুর মাঝেও তিনি নিজের কাজ করে গেছেন।
লেখকের সুস্থতা কামনা করি। আর আশা করি ভবিষ্যতে আমার দেশের চিকিৎসা পদ্ধতি যেন এত উন্নত হয় যেন ভিনদেশের কোনো রোগী আমার দেশের ব্যবস্থা, ইতিহাস, অলিগলি, সৌন্দর্য আর খাবার নিয়েও আপন অভিজ্ঞতা লিখুক।
ভ্রমণকাহিনি আমার খুব একটা পড়া হয়নি। তাই এই ঘরনায় রিভিউ লেখা আমার জন্য কঠিন। কঠিন কাজটা করতে পেরেছি নাকি জানিনা। এই বইটা যখন পড়ছি তখন আমি নিজেও শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। অসুস্থ থাকলে মন নরম থাকে শুনেছি। তাই হয়তো বইটা রিলেট করতে পেরেছি একটু বেশি।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইয়ের প্রচ্ছদটা মনোরম। বইয়ের প্রোডাকশন বেশ ভালো। বানান ভুল বা প্রমাদ তেমন চোখে পড়েনি।
একজন মানুষের জন্য সুস্থতা কত বড় নেয়ামত, অসুস্থ হলেই কেবল বোঝা যায়। অসুস্থ থাকলে কোনো কিছুই ভালো লাগে না। কোনো কাজে মন বসে না। সারাদিন অস্থির অস্থির লাগে। সুস্থ হওয়ার প্রার্থনায় প্রতিনিয়ত দিন কাটাতে হয়। প্রিয়জনদের উৎকণ্ঠায় দিন কাটে। অনেক সময় নিরীহ অসুস্থতাও অনেক বড় আকারে ধরা দেয়।
আমাদের আজকের গল্পের প্রধান কুশীলব দুইজন। একজনকে আপনারা চিনেন। মিথলজি কিং খ্যাত এস এম নিয়াজ মাওলা। তার পাশাপাশি আরও একজন এই গল্পের সুতো ধরে গল্প এগিয়ে নিয়েছে। তাকে নিয়ে একটু কথা বলা যাক!
একটি রোগ, নাম ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া। এই রোগ যখন হবে, তখন আপনাকে এক ব্যথার রাজ্যে প্রবেশ করতে হবে। যেকোনো ব্যথা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। আর যদি হয় দাঁতের ব্যথা, তাহলে মানুষের সহ্য ক্ষমতাও সেখানে অসহায় হয়ে ওঠে। ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া রোগটা দাঁতের ব্যথা দিয়ে শুরু হলেও এটা একটি নিউরোলজিক্যাল অসুখ। যেখানে মুখের পেশী অদ্ভুত আচরণ করে। এ অসুখ দিনে দিনে বীভৎসতায় রূপ নেয়। আর বীভৎসতা ব্যথার মধ্য দিয়ে বাড়তেই থাকে। তখন লেখকের ভাষায় বলতে হয়, এই রোগ হলে আপনি হাসতে গেলে কাঁদবেন, কাঁদতে গেলে হাসবেন।
এই রোগটাই এই বইটির প্রধান চরিত্র। কারণ এই রোগ না হলে বইটিই যে লেখা হতো না। তাই লেখক নিজে পার্শ্ব চরিত্র হিসেবে থেকে গিয়েছেন। লেখক নিজে যেহেতু পেশায় চিকিৎসক, সেহেতু এই রোগের লক্ষণ ও প্রভাব সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। আর সে কারণেই কালক্ষেপণ করেননি। দ্রুত চিকিৎসকের স্মরনাপন্ন হয়েছিলেন। তিনি জানতেন খুব দ্রুত অপারেশন করাতে না পারলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তথাপি দিনে দিনে পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হয়ে উঠবে।
যে ভাবা সেই কাজ। তবে এমন এক জটিল রোগ, যার অপারেশন খুব একটা সহজ নয়; সেই রোগের চিকিৎসার জন্য দেশীয় চিকিৎসকদের ভরসা করা যায়? তখনই চলে আসে হেলথ ট্যুরিজমের বিষয়টা। চিকিৎসার জন্য অসংখ্য মানুষ বিদেশ যায়। সেই সংখ্যাটা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। পাশের দেশে স্বাস্থ্যখাতে উন্নতির কারণে বেশিরভাগ মানুষ সেখানেই ছুটে।
লেখকও সেই কাজ করলেন। অসুস্থ অবস্থায় প্রতিটি শক্ত সবল মানুষও দুর্বল হয়ে যায়। মানসিকভাবে সাহস বা শক্তি হারায়। কিছুটা নার্ভাস অনুভব করে। তাই যখন চিকিৎসা�� জন্য বিদেশ ভ্রমণের কথা চলে এসেছে, তখন কাউকে তো পাশে লাগে। একজন ভালো মানুষের শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব হয় না। সেই শুভাকাঙ্ক্ষীর বদৌলতেই হয়তো ছোটো ভাইয়ের মতন এক বন্ধুকে সঙ্গী করে পাওয়া।
এরপর সেই বিদেশ যাত্রা। এক সময় ভারতবর্ষের অংশ থাকা দুটি দেশকে কাটা তারের বেড়ায় দুই দেশে পরিণত করলেও কি সেই আবেদন মুছে ফেলা যায়। বিশাল ভারতবর্ষের অংশের রাজধানী যে দিল্লি-ই ছিল!
এই দিল্লি যাত্রায় লেখককে অনেক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা থেকে শুরু করে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি থেকে সঠিক সময়ে মেইল না আসা! এক উৎকণ্ঠায় দিন কেটে যায়। আর এই উৎকণ্ঠা কাটানোর সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে ভ্রমণ। দিল্লির মতন ঐতিহাসিক শহরে ঘুরে বেড়ানোর জায়গার তো অভাব নেই। লেখক নিজে ঘুরেছেন, আমাদেরও ঘুরিয়ে এনেছেন দিল্লির ইতিহাসের সাথে সাথে।
কখনও কুতুব মিনার, কখনও লাল কেল্লা, চাঁদনী চক লেখকের লেখায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল হুট করে মুঘল আমলে ঢুকে পড়েছি। তাদের ঐতিহ্য চোখের সামনে দেখছি। দরবার কক্ষ, আমোদ কক্ষ, ইতিহাসের পাতায় সেই সময়ের স্থপতিদের কারিগরি মুগ্ধ করার মতো। বর্তমান সময়ে গরম আবহাওয়ায় থেকে পরিত্রাণ পেতে এসি খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু অতীতের সময় তো এসি ছিল না। তাহলে? তীব্র গরমকে ঠান্ডা করে রাখার জন্য কৃত্রিমভাবে নদী প্রবাহের মতো বিস্ময়কর সৃষ্টি বর্তমান সময়ে কোন স্থপতি কি করতে পারবে?
এই উপমহাদেশে কত ইতিহাসের জড়িয়ে আছে! রাজা বাদশাদের যেকোনো বিষয়ই বিস্ময়ের জন্য দেয়। তাদের বিশ্রাম করার স্থান কিংবা শপিং করার বাজার, সবকিছুই রাজকীয়। ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে জ্বলে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় কত ইতিহাস ফিকে হয়ে যায়। এই উপমহাদের ইতিহাসের পালাবদল তো কম হলো না। ইংরেজরা এসেছে। ঐতিহাসিক স্থানগুলোয় নিজেদের ব্যারাক স্থাপন করেছিল। কত নিদর্শন এভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। যদিও বর্তমানে ভারতীয় সরকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর প্রতি যত্নশীল, তবুও কতটা পারে যাবে তা সময়ই বলে দিবে। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ঐতিহাসিক স্থানের বর্ণনা দিয়েছেন। যা হয়তো ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিবে।
লেখকের বর্ণনার দিল্লির খানাপিনার বর্ণনা এসেছে প্রবলভাবে। লেখকের লেখার দক্ষতা কিংবা খাবারের গুণ, যাই বলি না কেন; পৃষ্ঠার এপাশে থেকেও জিভে জল এসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। দুর্দান্তভাবে লেখক সব বর্ণনা করেছেন। ধোসা, বিরিয়ানি, কেরেলার ঐতিহাসিক খাবার, স্ট্রিট ফুডের স্বাদ, সবকিছুতে মনে হচ্ছিল একবার এ জাতীয় খাবারের স্বাদ না নিতে পারলে জীবন বৃথা। দিল্লির খাবারের সুবাস এখানেও ছড়িয়েছে বেশ ভালোভাবেই।
তবে ভ্রমণ ও খাবারের স্বাদে মজে থাকলে তো চলবে না। কারণ এগুলো সব পারিপার্শ্বিক বিষয়। লেখক এখানে এসেছে চিকিৎসার সূত্র ধরে। এক জটিল অপারেশন অপেক্ষা করছে। উৎকণ্ঠা তো কাজ করেই। মস্তিষ্কের অপারেশন কখনোই নির্ভার কিছু না। এখানে লেখকের আবেগ অনুভূতি যেভাবে ফুটে উঠেছিল, একজন পাঠক হিসেবে অনুভব করতে পেরেছিলাম।
অপারেশন টেবিলে যাওয়ার আগে ঘোর অসহায় মুহূর্তে মানুষ কাছের মানুষদের বেশি খোঁজে। তাদের কথা মনে করে। অতীতের ভালো কিছু মুহূর্ত মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। ফ্ল্যাশব্যাকের মতন করে ফিরে ফিরে আসে সোনালী অতীত। সেই সময়গুলোকে আঁকড়ে ধরে মানুষ বাঁচতে চায়। একটা শঙ্কা তো কাজ করেই। এই কি তবে শেষ? ফিরে আসা হবে তো? মস্তিষ্কের মতো স্পর্শকাতর এক অঙ্গের অপারেশন বড্ড কঠিন। এরপর বিভিন্ন জটিলতাও আসতে পারে। সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠা কাজ করে ফিরে আসা যাবে তো? না-কি এখানেই শেষ!
একজন রোগী তার কঠিন মুহূর্তে যেমন অসহায়ত্ব বরণ করে সেই অনুভূতি অসাধারণভাবে বইটিতে ফুটে উঠেছিল। একটা হাসপাতাল যেন একটুকরো পৃথিবী। বিভিন্ন দেশের নানান মানুষ এখানে আসে চিকিৎসার জন্য। একটু সুস্থতার আশায় অনেকেই তাদের শেষ সম্বলটুকু বিসর্জন দিয়ে দেয়। প্রিয়জনকে সুস্থ দেখার জন্য সে কী তীব্র হাহাকার। হয়তো আর ফিরে আসা হবে না। কিন্তু মানুষ তো চায় কোনো একটা মিরাকল ঘটুক। যে মানুষগুলো আমাদের চিকিৎসা দেয়, সেবা করে তাদের জীবনেও কত গল্প আছে। যে গল্প আমরা জানি না। সকল গল্পের সলিল সমাধি করে তারা মানুষকে সুস্থ করে তোলার কাজ করে যায়। “ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে” শুধু যে একটি ভ্রমণ কাহিনি কিংবা লেখকের অনুভূতি এমন না, এখানে ভিন্ন মানুষজন উঠে এসেছে। উঠে এসেছে সংস্কৃতি। ইয়েমেনের যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশের কেউ তার মায়ের সুস্থতার জন্য ভিনদেশে পাড়ি জমায়। মনে অগাধ বিশ্বাস নিয়ে, মা সুস্থ হবেই। এছাড়া একদিন নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারবে। যুদ্ধ বন্ধ হবে। সবকিছু স্বাভাবিক হবে। আদৌ কি স্বাভাবিক হবে সবকিছু? বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারবে প্রকৃতি?
লেখক এস এম নিয়াজ মাওলাকে যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে চিনি, আমি জানি তিনি কতটা আমুদে ব্যক্তি। খুব বেশি প্রাণবন্ত, ভীষণ আড্ডাবাজ। তার লেখায় সেই প্রাণবন্ত ছাপ ছিল। তিনি এমনভাবে বইটি লিখেছেন, যেন পাঠকের সাথে গল্প করছেন। এই বিষয়টা আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু একজন নবীন পাঠক যখন বইটি পড়বেন, যিনি লেখককে চিনেন না; হয়তো তার বিরক্তির কারণ হলেও হতে পারে।
আমার বিরক্তি লেগেছে অন্য জায়গায়। লেখকের লেখায় বেশ কিছু বাক্যের পুনরাবৃত্তি ছিল। একাধিক ঘটনায় একই ধারার বর্ণনা ছিল। নিজের আবেগ অনুভূতি প্রকাশের একই শব্দচয়নের আশ্রয় নিয়েছেন লেখক। ফলে বেশ বিরক্তিকর লাগছিল। এখানে লেখকের শব্দচয়নের ঘাটতিকে প্রতিফলিত করে। লেখক যেভাবে বর্ণনা করেছেন, সাবলীল। পড়তে ভালো লেগেছে। তারপরও একটি বই রচনাকে আমি শব্দের খেলা মনে করি। সেই জায়গায় কিঞ্চিৎ দুর্বলতা একটু হতাশ করেছে। আরও বেটার বর্ণনা হতে পারত। অনুভূতিগুলো আরো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা যেত। তাহলে পাঠকও কানেক্ট হতে পারত। সব জায়গায় ইমোশনে একই ধারার বর্ণনা পড়লে ওই সংযোগটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
শুরুর দিকে বইটি পড়তে বিরক্ত লাগছিল। হতে পারে এই জাতীয় বই পড়ার অভ্যাস কম বলেই। পরবর্তীতে অবশ্য বইয়ে মজে গিয়েছিলাম। এই চিকিৎসার সময় লেখকের জন্মদিন ছিল। এই জন্মদিনের মুহূর্তগুলো ভালো লেগেছে। বিশেষ করে লেখকের বোনের সুদূর কানাডা থেকে ভারতে এসে ভাইকে সারপ্রাইজ দেওয়া আমাকে আবেগী করে তুলেছিল। এখানে লেখক নিজের পরিবার সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। ভাইবোনের সম্পর্ক কতটা মধুর হয়, তারই দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন। ভাইবোনের একে অপরের শক্তি হয়ে ওঠা, তাদের ভালোবাসা, ভরসার প্রতীক হয়ে ওঠার মতো ঘটনা আবেগের পূর্ণরূপ হিসেবে ধরা দেয়। পরিবার সম্পর্কে লেখকের নিজের অনুভূতিও এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।
ভিনদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়ে ঘুরে ফিরে যে আনন্দের খোঁজ লেখক পেয়েছিলেন, তার মধ্যেও লেখক নিজের দেশকে ভুলেননি। শেষে এই দেশের স্বাস্থ্যখাতে সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। কত মানুষ চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন দেশে যায়। দেশের কত টাকা আমরা ব্যয় করে আসি। এই টাকা দেশে থাকলে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও দেশ শক্তিশালী হতো। লেখক এই সমস্যার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি পরিত্রাণের জন্য কী কী করণীয় তা-ও বাৎলে দিয়েছেন। অবশ্যই লেখকের নিজস্ব মত। স্বাস্থ্যখাতে দেশের উন্নতি হলে শুধু যে দেশের মানুষরাই উপকৃত হবে এমন না। হয়তো বিদেশ থেকেও অনেকে আসবে। তখন হেলথ ট্যুরিজম নতুন দিশা পাবে।
লেখক এখানে ভারতের সাহায্য নেওয়ার কথা বলেছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত সাহায্য আদৌ করবে? বাংলাদেশে হেলথ ট্যুরিজম চালু হলে তো তাদেরই ক্ষতি। তাদের দ���শের চিকিৎসা ব্যবস্থা যে অংশ এখানে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভবান হয়, সেই শেয়ার কমে যাবে। যে দেশ নিজের দিকটা ছাড়া কিছু বুঝে না, তাদের কাছ থেকে সাহায্য আশা করা অনর্থক। তবে আমরা চাইলে ভারতের মডেল অনুসরণ করতেই পারি। যেভাবে তারা স্বাস্থ্যখাতে উন্নতি করেছে, সেই পথ আমাদেরও অনুসরণ করা উচিত। হয়তো ভবিষ্যতে ভালো কিছু হবে।
“ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে” বইটা পড়তে ভালোই লেগেছে। ব্যতিক্রম একটা বই। উপভোগ করেছি। বিবলিওফাইলের প্রোডাকশন কোয়ালিটি চমৎকার। বানান ভুল, ছাপার ভুল একদমই চোখে পড়েনি। বইয়ের মাঝে মাঝে বেশকিছু ছবি ছিল। লেখকের নিজের, কিছুটা কাল্পনিক। তবে ঐতিহাসিক স্থাপনার আরো কিছু ছবি সংযুক্ত করে দেওয়া যেত মনে হয়। বইয়ের প্রচ্ছদতাও বেশ দারুণ। ইউনিক কনসেপ্ট।
পরিশেষে, একটু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় দিয়ে শেষ করি। “ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে” বইটা পড়তে পড়তে একটা বিষয় ভাবছিলাম। ভারত তো তাদের পুরো দেশ পরিচালনা করে দিল্লি থেকে। সেই দেশে সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানদের অনেক অত্যাচার সহ্য করতে হয়। অথচ তাদের দিল্লির ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেকটা জুড়ে আছে মুসলমানদের ছোঁয়া। মুসলিম শাসকদের (বিশেষ করে মুঘল শাসক) রাজকীয় চিন্তাধারার ফলশ্রুতিতে তাদের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো এখনো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সে স্থাপনা নিয়ে তাদের গর্বেরও শেষ নেই। এগুলো থেকে ভারত সরকার প্রচুর অর্থ আয় করে। অথচ তারাই কি না বিভিন্ন সূত্রে মুসলিমদের দমিয়ে রাখতে চায়, অত্যাচার করে প্রতিনিয়ত। বিষয়টা দারুণ না?
এস. এম. নিয়াজ মাওলা সম্ভবত লেখকজীবনের সেরা লেখাটা লিখে ফেলেছেন।
স্টেটমেন্ট হিসেবে কঠিন হলেও ব্যাখ্যাটা সহজ। অসুখের দিনগুলির অসহায়ত্ব আর মৃত্যুভয়কে কেন্দ্র করে যে শব্দগুচ্ছের জন্ম, তাতে যে নিখাঁদ আবেগময় অনুভূতি ফুটে ওঠে, তার চেয়ে শক্তিশালী সাহিত্য আদৌ কি সম্ভব?
জীবন কখনো কখনো এমনসব চ্যালেঞ্জ সামনে এনে দাঁড় করায়, যার জন্য কেউ প্রস্তুত থাকে না। বিশেষ করে, হঠাৎ এক ভয়ংকর স্নায়ুরোগ যখন জীবনের ছন্দ বদলে দেয়, তখন তা মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এস এম নিয়াজ মাওলার "ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে" ঠিক তেমনই এক জীবনযুদ্ধের দলিল। তবে অসুস্থতার গল্পকেও ছাপিয়ে এ এক সাহসী যাত্রার উপাখ্যান, যেখানে লেখক ব্যথার গভীর থেকে আনন্দের সন্ধান করেছেন, জীবনকে নতুন করে বুঝতে চেয়েছেন।
নিছক স্মৃতিচারণ বললে অবশ্য বইটির প্রতি অবিচার করা হয়। ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে একই সঙ্গে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার সমাহার। তাতে মিশে আছে ভ্রমণের রোমাঞ্চ, স্বাস্থ্য পর্যটনের নতুন দিগন্ত, ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া, মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আর ভালোবাসার অমৃত রস। সাহিত্যের গভীরতা আর ভাষার শৈল্পিক ব্যবহারে লেখক এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যে, পাঠক যেন এক ফিকশন উপন্যাসের স্বাদ পায়। গল্পের বাঁকে বাঁকে কল্পনার মিশ্রণ নেই, কিন্তু লেখকের দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ও বর্ণনার মুন্সিয়ানায় তা হয়ে উঠেছে সাহিত্যিক এক অভিজ্ঞতা।
লেখকের কলমে এর আগে মিথলজির তাত্ত্বিক বয়ান পড়েছি। অভিজ্ঞতা হয়েছে শুরুর দিকের বেশ কিছু ছোট গল্প পড়ারও। তবে ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে পড়তে গিয়ে নতুন করে যে নিয়াজ মাওলাকে আবিষ্কার করলাম, তা বোধ করি কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের মতোই বিস্ময়কর! এই বইয়ে তিনি নিজেকেই নতুনভাবে সৃষ্টি করেছেন।
শুরুতেই ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া নামক ব্যধির বর্ণণায় লেখককে একজন রোগতত্ত্ববিদ বলে মনে হতে পারে, যিনি সহজ সাবলীল ভাষায় শিক্ষার্থীদেরকে গল্পের ছলে জটিল সব বিষয়ে জ্ঞান দিতে সক্ষম:
"এই রোগটাকে "টিক ডৌলোরেক্স” বলে ডাকা হয়। শুনে কি মনে হচ্ছে না। এটা কোনো ফরাসি রেস্তোরাঁর মেনু কার্ডের নাম? "স্যার, আজ আপনার জন্য স্পেশাল ডিশ-টিক ডৌলোরেক্স আলা ক্রিম!" কিন্তু হায়রে হায়, এটা আসলে এমন এক দুষ্টু রোগ যা আপনার মুখে এমন ব্যথা দেয় যে আপনি হাসতে গিয়েও কাঁদবেন, আর কাঁদতে গিয়েও হাসবেন!
মজার ব্যাপার হলো, এই রোগটা হয়, যখন আপনার মুখের একটা বড়ো স্নায়ু (ট্রাইজেমিনাল স্নায়ু) হঠাৎ করে বেয়াড়া আচরণ করা শুরু করে। মনে করুন, আমাদের মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়ে আসা এই স্নায়ুটা একদিন ঠিক করল যে সে আর ভালো ছেলের মতো কাজ করবে না। কিন্তু কখন সে এই সিদ্ধান্ত নেয়? যখন হয়তো একটা রক্তনালী এসে এই স্নায়ুকে টিপে ধরে, “এই যে মিস্টার স্নায়ু, তোমাকে একটু আদর করে দেই!” অথবা হয়তো স্নায়ুর গায়ের জামাটা (মায়েলিন শিথ) ছিঁড়ে গেল, "আমি আর এই পুরোনো ফ্যাশনের জামা পরব না!” ব্যস, তখন থেকেই শুরু হয় এই যন্ত্রণার মহাভারত!"
কয়েক পাতা উল্টোতেই আবার দেখা যায়, হেলথ ট্যুরিজম কিংবা কাঠখোট্টা স্ট্যাটিস্টিকসের হিসাব দিয়ে যাচ্ছেন লেখক, অথচ পড়তে চমৎকার লাগছে। এই অংশে তিনি পুরোদস্তুর গবেষক, দক্ষ প্রাবন্ধিক:
"হেলথ ট্যুরিজমের জগতটা যেন একটি রঙিন উৎসব। আপনি যদি ভাবেন যে এটি শুধু ডাক্তার দেখানোর জন্য, তাহলে আপনি ভুলের মহাসাগরে ডুবে যাচ্ছেন। এখানে রয়েছে চিকিৎসা পর্যটন, যেখানে জটিল অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া হয়। কার্ডিওলজি থেকে শুরু করে অঙ্গ প্রতিস্থাপন পর্যন্ত সবকিছুই এখানে অন্তর্ভুক্ত। আবার দন্ত পর্যটনও আছে, যেখানে দাঁতের চিকিৎসার জন্য বিদেশে ভ্রমণ করা হয়। দাঁতের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নতুন বন্ধু বানানোর সুযোগ তো থাকেই-একই সঙ্গে নতুন হাসি আর নতুন বন্ধুত্ব! প্রজনন পর্যটন, যেখানে গর্ভধারণের জন্য বিশেষ চিকিৎসা নেওয়া হয়-নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে নতুন দেশে যাত্রা। কসমেটিক সার্জারি, যেখানে সৌন্দর্যবর্ধক অস্ত্রোপচারের জন্য ভ্রমণ করা হয়। একটু নতুন লুক পেতে কে না চায়? নতুন দেশে গিয়ে নতুন চেহারা নিয়ে ফেরা-এর চেয়ে রোমাঞ্চকর কী হতে পারে? ওয়েলনেস পর্যটন, যেখানে স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সুস্থতা বজায় রাখার জন্য বিভিন্ন স্পা এবং যোগব্যায়ামের সুবিধা নেওয়া হয়-মন-শরীর-আত্মার ত্রিবেণি সঙ্গমে অবগাহণ। বাংলাদেশ থেকে হেলথ ট্যুরিজমের গন্তব্য হিসেবে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, তুরস্ক এবং দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম। প্রতিবছর প্রায় পঁচিশ লাখ বাংলাদেশি রোগী ভারতে চিকিৎসার জন্য যান। থাইল্যান্ড বিশ্বব্যাপী চিকিৎসা পর্যটনের একটি প্রধান গন্তব্য-স্বাস্থ্য আর আনন্দের অপূর্ব মিলনভূমি। ২০১৯ সালে থাইল্যান্ডে ছয় লাখ বত্রিশ হাজার রোগী চিকিৎসা পর্যটনে গিয়েছিল।"
পুরোদস্তুর ভ্রমণকাহিনী পড়ার অভিজ্ঞতা মিলবে এই বইয়ের পাতায়। দিল্লির পথে যাত্রা, ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা, কুতুব মিনার ভ্রমণ, চাঁদনি চকের জগত, পশমিনা শালের গল্প। মনে হবে নিজের চোখে সবকিছু দেখার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। সেই সাথে জানা যাবে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানা ইতিহাস; আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে লেখক যা বর্ণণা করে গেছেন গল্পের ছলে। জামে মসজিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থাপনাশৈলীর ইতিহাস যা সম্পর্কে জেনে বিস্মিত হবেন; কিংবা মার্কস এন্ড স্পেন্সার থেকে শুরু করে স্টারবাকস- যার শুরুর কথা হয়তো আপনি জানতে চাননি, অথচ জেনে মুগ্ধ হয়ে গেছেন!
কখনও অতি পরিচিত সুস্বাদু খাবারের বর্ণণায় জিবে আসবে জল: "হঠাৎ করেই আমাদের টেবিলে এসে হাজির হলো প্রত্যাশিত খাবার। আলু পরোটা দেখে মনে হলো যেন সোনালি রোদের একখণ্ড টুকরো পাতে এসে বসেছে। তার অন্তরালে লুকানো নরম আলুর পুর ইশারা করছিল রসনার উৎসবের। প্রথম কামড়েই জিভে নেচে উঠল মসলার ঝাঁঝালো সুরভি। আলুর কোমল মিষ্টতার সঙ্গে মিশে গেল পেঁয়াজের তীক্ষ্ণতা, রসুনের গন্ধ, আদার ঝাঁজ আর কাঁচা লঙ্কার দাবানল। এহসানের ডিম পরোটাও ছিল অপ্রতিরোধ্য। সোনালি আবরণের নিচে লুকিয়ে থাকা ডিমের পুর, তার সঙ্গে নৃত্যরত সূক্ষ্ম কুচি করা পেঁয়াজ, সতেজ সবুজ লঙ্কা আর সুরভিত ধনেপাতা। প্রতিটি কামড়ে যেন নতুন স্বাদের উন্মোচন, একটি অনাবিষ্কৃত দ্বীপের আবিষ্কার। ওষ্ঠে লেগে থাকা সামান্য তৈলাক্ততা যেন মৃদু স্বরে গুঞ্জন করে উঠল-এই তো সেই প্রকৃত পথের খাদ্যের স্বাদ, দিল্লির প্রাণের স্পন্দন।"
ভ্রমণকাহিনীর ভরপুর রস আস্বাদন করতে করতে আবার হঠাৎ পাতা উল্টাতে গিয়ে খেয়াল হবে, আনন্দের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন লেখক। ভ্রমণ অভিজ্ঞতার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে বিষণ্ণতা কিংবা অসহায়ত্বের রূপ, ব্যধিমুক্তির তীব্র আঁকুতি। ছুরি কাচির আগে নিজেকে বিসর্জন দেয়ার আগে চোখ বন্ধ করার সেই অনিশ্চিত মুহূর্ত; আবার আধো ঘুম আধো জাগরণে চেতনাকে আবিষ্কার করার অনুভূতি পাঠক অনুভব করবে পুরোদস্তর। আয়েশা নামের মেয়েটাকে নিজের মৃত মায়ের একবার চোখ খোলার অপেক্ষায় আকুল হতে দেখে শিউরে উঠবে। নিজের অজান্তেই চোখের কোণ ভিজে যাবে বারবার:
"সন্ধ্যার বিষণ্ণ আলো যখন হাসপাতালের করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন এক অদ্ভুত নিস��তব্ধতা ঘিরে রেখেছিল পুরো পরিবেশ। হাসপাতালের করিডোরে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছিল, যেন সান্ত্বনা দিতে চাইছে ভেঙে পড়া মানুষগুলোকে। দূরে কোথাও মনিটরের একঘেয়ে 'বিপ-বিপ' শব্দ শোনা যাচ্ছিল, কিন্তু তার মাঝেও ভেসে আসছিল এক করুণ আর্তনাদ- আয়েশার কান্না। আমি সেই কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ালাম। করিডোরের শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি ঘরে বসে আয়েশা তার মায়ের হাত ধরে কাঁদছিল। তার চোখে অসংখ্য জলের ধারা, তার মুখে হতাশার ছাপ। সেই কান্না যেন কেবল তার মায়ের জন্য নয়, বরং তার নিজের ভেতরেও একটি শূন্যতার সৃষ্টি করছিল। ডাক্তাররা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মুখে গভীর বিষন্নতা। একজন ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন, "আয়েশা, আপনার মায়ের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। দুঃখের সাথে জানাচ্ছি, তিনি ব্রেইন ডেড।" এই কথাগুলো যেন আয়েশার সমস্ত জগতকে থামিয়ে দিল। তার মুখ থেকে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বের হলো। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। যে মানুষটি ছিল তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু, তার আশ্রয়, সেই মানুষটি আর কখনও তার কাছে ফিরবেন না। ডাক্তার আরও বললেন, "আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন তিনি আর কখনও জ্ঞান ফিরে পাবেন না। লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম ছাড়া তার শরীর আর কাজ করবে না।" এই কথাগুলো আয়েশাকে আরও গভীর বিষাদের মধ্যে ডুবিয়ে দিল। সে ভেঙে পড়ল, মাটিতে বসে পড়ল। তার মুখে কোনো কথা ছিল না, শুধু অঝোরে অশ্রু ঝরছিল তার। মনে হচ্ছিল, তার ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আমি দূর থেকে দেখছিলাম। আমার চোখের সামনে এই দৃশ্য আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিল। মনে পড়ল নিজের মায়ের কথা। কত সহজেই আমরা ভুলে যাই, আমাদের প্রিয়জনরা চিরকাল থাকবে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততায় তাদের সাথে কাটানো মূল্যবান সময়গুলোকে আমরা হারিয়ে ফেলি। আয়েশার মুখে তখন হাজারো স্মৃতির ছায়া। হয়তো মনে পড়ছিল ছোটোবেলার কথা, যখন তার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। সেই রাতগুলোর কথা, যখন সে জ্বরে কাতরাচ্ছিল, আর তার মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতেন..."
আলাপ দীর্ঘ হচ্ছে। শেষ করার আগে বলে ফেলি, এই বই শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা নয়; বরং একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক লড়াই, জীবনকে নতুন করে চিনতে পারার অনুভূতি, এবং কঠিন বাস্তবতাকে গ্রহণ করার দৃষ্টিভঙ্গির চমৎকার রূপায়ণ। অসুস্থতার মুহূর্তেও কীভাবে জীবনকে ভালোবাসতে হয়, আশেপাশের সম্পর্কগুলোর নতুন ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায়—সেই গল্পই বলা হয়েছে এতে। "ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে" শুধু একজন মানুষের সংগ্রামের গল্প নয়, এটি জীবনের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার প্রতিচিত্র। যে কোনো পাঠক এখানে খুঁজে পাবেন অনুপ্রেরণা, পাবেন সাহস, এবং অনুভব করবেন জীবন বয়ে নেওয়ার অনিবার্য শক্তি।
"ট্রাইজেমিনাল নিউরালজিয়া" নিয়ে প্রবেশ করা হলো ব্যথার রাজ্যে। সেই রাজ্যের রাজা ওই বিদঘুটে নামের রোগটাই। এই জটিল স্নায়ুর রোগটি আসলে শরীরের উপর এমন প্রভাব ফেলে যে আসলে জীবনে হাসি কান্নার অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এখানে স্বেচ্ছায় আপনি হাসতে পারবেন না, হাসি যেন কান্না হয়ে বের হবে। আবার কান্নার ইচ্ছায় মুখের পেশিগুলো হাসার ভঙ্গিমায় থাকতে শুরু করবে। ব্যথার রাজ্যে প্রবেশ করে এস এম নিয়াজ মাওলা ভাবলেন এবার আনন্দের খোঁজ তাকে নিতেই হবে। এরকম রোগ নিয়ে কী জীবন চালানো যায়!
লেখক হিসেবে মানুষটির পরিচয় আছে তেমনি কিন্তু আরো একটি বড় পরিচয় আছে ওনার। তিনি নিজেও একজন ডাক্তার। তাই রোগের সম্পর্কে ভালো জ্ঞান ওনার আছে। প্রথমে চেষ্টা করেছিলেন যদি বাংলাদেশের চিকিৎসায় ওষুধ খেয়ে রোগটা ভালো হয়, নাহলে নিতে হবে সার্জারির সিদ্ধান্ত। এবং এই সার্জারি কিন্তু বেশ জটিল একটি প্রক্রিয়া। এদেশের বড় একটি হাসপাতালে তিনি চিকিৎসা নিলেন, ওষুধ চলছিলো। কিন্তু রোগটা আসলে ভালো হচ্ছিল না। যন্ত্রনার সাথে লড়াই করতে করতে অবশেষে লেখক সিদ্ধান্ত নিলেন সার্জারির।
কিন্তু এতবড় জটিল একটা অপারেশন দেশে করাতে তিনি সাহস পেলেন না। স্থির করলেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের হাসপাতালে হবে এই অপারেশন একজন অভিজ্ঞ নিউরোলজির ডাক্তারের অধীনে। কিন্তু চাইলেই তো আর হুট করে চলে যাওয়া যায় না। প্রথমে ভিসা নিয়ে জটিলতা তারপর চিন্তা হলো লেখকের সাথে কে যাবে। তবে ওই যে বলে বিপদে প্রকৃত বন্ধু চেনা যায়, লেখকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু যাকে মজা করে লেখক ডাস্টবিন বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন সেই বন্ধু পুরো প্রক্রিয়াটি একদম শুরু থেকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে দিলেন। এবং লেখকের আরেক কাছের ছোট ভাই সফরসঙ্গী। রীতিমত অফিস থেকে ছুটি নিয়ে লেখকের সাথে সফরসঙ্গী। যখন সবকিছু ঠিকঠাক এবার তবে শুরু হবে আনন্দের খোঁজে যাত্রা।
আমি ব্যক্তিগতভাবে আত্মকথনমূলক বই কিংবা ভ্রমণকাহিনী খুব কম পড়েছি। লেখক এস এম নিয়াজ মাওলার এই বইটি পড়ার প্রধান কারন আসলে ওনার এই জটিল রোগটি নিয়ে উনি কীভাবে কাটিয়েছিলেন নিজের কঠিনতম দিনগুলো, যখন সেই সুদূর দিল্লিতে অপারেশনের জন্য আপনজন ছেড়ে কাছের সেই ছোট ভাইয়ের সাথে নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। জানার কৌতুহল ছিল বেশ। ওনার সাথে বইমেলায় আমাদের দেখা হয়েছিল। বাকিদের সাথে ওনার কথোপকথন শুনে মনে হয়েছিল বেশ মিশুকে এবং প্রাণখোলা মানুষ। এবং বইয়ের পাতায় পাতায় একজন ডাক্তারকে রোগী হিসেবে যেভাবে আবিষ্কার করলাম তাতে এটা আসলেই সত্যি যে রোগাক্রান্ত সময়টাতে মানুষের মানসিক দিক খুব দূর্বল থাকে। নানান দুঃশ্চিন্তা, কখনো কখনো মৃ*ত্যু ভয় জাগে মনে। প্রাণপণে লড়াই করতে হয় স্থির থাকার জন্য।
দিল্লির বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা বেশ সুন্দর গুছিয়ে উঠে এসেছে বইটিতে। দিল্লির বিখ্যাত সব স্থানের অভিজ্ঞতা লেখকের চোখ দিয়ে যেন আসলে এক ঝলক দিল্লি ভ্রমণ করিয়ে দিলো। বিখ্যাত সেই লাল কেল্লা, চাঁদনি চক এবং অন্যান্য স্থানে লোভনীয় সব খাবারের স্বাদ। এক নজরে যেন গোটা দিল্লি উঠে এলো লেখকের বর্ণনায়। এই ঘোরাফেরা অবশ্যই দরকার ছিল বলে আমি মনে করি। এটা কিছুটা হলেও লেখকের দুঃশ্চিন্তা, ভয় কমাতে সাহায্য করেছে। কারণ দিল্লি গিয়েও কিন্তু সাথে সাথে চিকিৎসা শুরু হয়নি। কিছু অফিশিয়াল জটিলতায় যে খানিকটা সময় দেরি হলো লেখকের সেই সময়টা দিল্লির পথে নতুন এক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় দিয়ে দিলো বরং।
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে লেখকের আরো কিছু অভিজ্ঞতা হলো। বিভিন্ন দেশের কত মানুষ এসেছে চিকিৎসা নিতে। কেউ সুদূর ইয়ামেন থেকে এসেছে অসুস্থ মাকে নিয়ে। আবার কেউ এসেছে পরিবারের অন্য কোনো সদস্য নিয়ে। হেলথ ট্যুরিজম মানে এই অন্য দেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যেন বিশ্বের সব বিচিত্র মানুষের মিলনমেলা দেখা যায়। এরা কেউ কাউকে চেনে না, কেউ কারো ভাষা ঠিক করে বোঝে না। তবুও এই বিশাল হাসপাতালে সারি সারি বেডে রোগী হিসেবে তারা ভর্তি হয়েছে। উদ্দেশ্যে শুধু সুস্থ হওয়া। লেখক নিজেও যেন রোমাঞ্চিত হয়েছেন এসব ভেবে।
সবচেয়ে যে অংশটা আমার ইমোশনাল লাগলো সেটা হলো বিদেশ থেকে হঠাৎ করেই লেখকের বোনের আগমন। অসুস্থ ভাইয়ের সাথে থাকার জন্য, দেখাশোনা করার জন্য লেখকের জন্মদিনে বোন যেন লেখকের জন্য শুভেচ্ছা এবং স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেন। অপারেশনের পর আপনজনকে কাছে পাওয়��� যে কতটা আবেগ এবং ভালো লাগার হয় লেখকের আবেগী অনুভূতির মধ্যে আমি বুঝতে পারছিলাম সেটা। এবং আমার ব্যক্তিগতভাবে ভাই বোনের ওই দিনগুলোর কথা বেশি ভালো লেগেছে।
এই বইটিকে ভ্রমণকাহিনী বলা যায়, আত্মকথনমূলক বই বলা যায় আবার একজন রোগীর দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনদর্শন বলা যায়। জীবনের বহু শিক্ষা মানুষ রোগাক্রান্ত অবস্থায় উপলব্ধি করতে পারে। জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে বদলে যায় যেন। এই বইয়ে প্রধান চরিত্রে আমি কখনোই ওই বিদঘুটে রোগ আনবো না। আমি বরং যেন গল্প শুনলাম একজন লড়াকু মানুষের। যিনি এই রোগের মাধ্যমে মানসিক, শারীরিক সবদিক দিয়ে লড়াই চালিয়ে গেছেন। এই বইয়ে সেইসব বিচিত্র অভিজ্ঞতা গল্পের মতো শুনে গেলাম। ভালো লেগেছে সব মিলিয়ে।
বইয়ের ছবিগুলো সাদাকালো ঠিক আছে তবে দুই একটা ছবি আরেকটু স্পষ্ট হলে বুঝতে সুবিধা হতো। এমনিতে বিবলিওফাইলের প্রোডাকশন মোটামুটি ভালো ছিল। প্রচ্ছদটাও বেশ। লেখকের বই যদি আপনি প্রথম পড়েন তবে মাঝে মাঝে বর্ণনায় মনে হতে পারে একই জিনিস পুনরাবৃত্তি। তবে পুরো বইটাকে অভিজ্ঞতার আলোকে পড়লে আসলে ভালোই লাগবে।
লেখক এই বইয়ের শেষে একটা অধ্যায় রেখেছেন। সেখানে তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন বাংলাদেশ কীভাবে ভবিষ্যতে এমন চিকিৎসা ক্ষেত্রে হেলছ ট্যুরিজমের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিছু কিছু পয়েন্টে আমি লেখকের সাথে একমত আবার কিছু জায়গায় মনে হয়েছে বাংলাদেশে আদৌও কী এটা সম্ভব সবার মেনে চলা! তবে লেখকের আশাবাদী মন যেমন আশা করেছে তেমনি আমিও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বপ্ন দেখতেই পারি সেই সোনালী সম্ভাবনার।
প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ এই দেশ থেকে চিকিৎসা নিতে বিভিন্ন দেশের দ্বারস্থ হয়। যদি উদ্যোগ নিয়ে এই সংখ্যা কমানো যায় অবশ্যই সেটা মঙ্গলজনক।
ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে সূদূর দিল্লিতে চলে গেলাম লেখক সাহেবের সাথে।
প্রথমে ভেবেছিলাম ভ্রমণ কাহিনী পড়ে মনে হলো আত্মজীবনী। তবে জানতে পারলাম লেখক সাহেব নিজেও ডাক্তার। সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন জনরায় ফেলবো তা নিয়ে দ্বিধা থাকলেও সেসবে না যাই।
বইয়ের উৎসর্গ টা 🫶 বন্ধুত্ব, ভাইবোনের সম্পর্ক লেখকের চোখে নিজেকে দিল্লির রাস্তায় হারিয়ে ফেলা সবটাই সুন্দর ছিল। দিল্লির অলিগলি, দর্শনীয় স্থান, রোড সাইডের সুস্বাদু খাবারের বর্ণনা ভালো ছিল।