এই কাহিনি মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের। পাশের মিজোদেরও। জুম্ম ও মিজোদের প্রধান দুই রাজনৈতিক চরিত্র মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও লালডেঙ্গাকে ঘিরে বইয়ের বিস্তার। দুজনেই এ অঞ্চলের মূলধারার ইতিহাসের বাইরে থাকা রাজনীতিবিদ। তাঁদের জীবনসংগ্রাম এবং জুম্ম ও মিজো এথনো পলিটিক্সের অনালোচিত নানা অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে এ বইয়ে।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
"..আমি একজন চাকমা । আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ—কেউ বলে নাই আমি বাঙালি ।
আমার সদস্য-সদস্যা ভাই-বোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায় ...। "
গণপরিষদে এম এন লারমার দেওয়াই এই বক্তব্যেই নিহিত রয়েছে সমস্যা ও তার সমাধান। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ নিজেদেরকে জুম্মা অর্থাৎ পাহাড়ে যাঁরা জুম চাষ করেন, সেই জাতিগোষ্ঠী হিসেবে দাবি করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় সবমিলিয়ে তেরোটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বাস করেন। যাদেরকে মানবেন্দ্রনাথ লারমা, যিনি এম এন লারমা নামে পরিচিত, তিনি একত্রে জুম্মা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) গঠন করেন। এই দলেরই সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সংকটের ইতিবৃত্ত দীর্ঘকালের। তবে সমসাময়িককালে তা সূচনা হয় দেশভাগের সময়। ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের ভাগে পড়ে। কিন্তু সেখানে পাকিস্তানের নিশান ওড়েনি। কোথাও ভারত আবার কোথাও ওড়ানো হয়েছিল মিয়ানমারের পতাকা।
দেশভাগের সময় তৈরি হওয়া সংকটকে তীব্র করে তোলে আইয়ুব খানের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পয়সায় নির্মিত কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। হাজার হাজার একর জমি রাতারাতি কাপ্তাই হ্রদের পানিতে তলিয়ে যায়। ঠিক কত হাজার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এই হ্রদের কারণে বাস্তুচ্যুত হন তা নিয়ে বিতর্ক কোনোদিন থামেনি। তাদের ভূমি কেড়ে নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হলো অথচ তারা পেলো না কিছুই। হ্রদে বাড়িঘর ডুবে যাওয়ার পর অনেক চাকমা পরিবার ভারতে চলে যায়।
মুক্তিযুদ্ধের পর সুযোগ ছিল পাহাড়ি-বাঙালি সম্মিলিত জাতি গঠনের। পারস্পরিক মতপার্থক্যগুলোকে রাজনীতির শিষ্টাচার মেনে মীমাংসার। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার সেই সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। বরং সবাইকে কলমের জোরে বাঙালি বানিয়ে ফেলার কোশিশ নিয়ে খোদ এম এন লারমাই গণপরিষদে সরব ছিলেন।
আজকে বাহাত্তরের সংবিধানকে দিনরাত গালাগাল করা রীতিতে পরিণত হয়েছে। এই সতর্কবার্তা পঞ্চাশ বছর আগে গণপরিষদে এম এন লারমা দিয়েছিলেন। তিনি সংবিধানপ্রণেতাদের শাসনতন্ত্র সভায় স্মরণ করিয়ে দেন,
" যেহেতু এই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি নর-নারীর মধ্যে ধনী রয়েছে গরিব, রয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তাদের মনের কথা, তাদের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার কথা যদি আমাদের এই সংবিধানে না থাকে, তাহলে কীভাবে আমরা আমাদের যারা ভবিষ্যৎ বংশধর আসবে, তাদের কাছে—এই দাবি রাখতে পারব, তোমাদের জন্য আমরা এই সর্বাঙ্গ সুন্দর সংবিধান রেখে যাচ্ছি । [...] এই সংবিধানে যদি এমন একটা নীতি না থাকে, যে নীতির দ্বারা আমাদের দেশে যারা ঘুষখোর, যারা দুর্নীতিপরায়ণ, তাদের যদি আমরা উচ্ছেদ করতে না পারি, তাহলে এই সংবিধানের কোন অর্থ হয় না । [...] আজকে এই সংবিধানের মাধ্যমে আমরা যে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি সেই সমাজতন্ত্রের নামে আমরা আবার যদি উচ্চশ্রেণির দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও সেই ক্ষমতা অপব্যবহারকারীদেরই আবার দেখতে পাই তাহলে ভবিষ্যতের নাগরিক, যারা আমাদের ভবিষ্যতের বংশধর, তারা আমাদের বলবে, যারা এই সংবিধান প্রণয়ন করে গিয়েছেন তারা ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। "
বাহাত্তর সালে একদিকে এম এন লারমাসহ বাকিরা সাংবিধানিক উপায়ে নিজেদের স্বায়ত্তশাসনের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ; অন্যদিকে, পাহাড়ে নিজেদের অবস্থানকে দৃঢ় করতে জনসংহতি সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধুর আমলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে একাধিক ছোটোখাটো সংঘর্ষ হয় জেএসএসের সামরিক শাখা শান্তিবাহিনীর। ড. কামাল জানিয়েছেন, শেখ মুজিব কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সাংবিধানিক পথকে কখনোই পরিত্যাগের পক্ষে ছিলেন না এম এন লারমা। তাই, নিজ জাতির পক্ষে কথা বলার সুযোগ রাখতেই যোগ দেন বাকশালে। তবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। আত্মগোপনে চলে যান এম এন লারমা। আর, পাহাড়ে রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পূর্ব পর্যন্ত জেএসএসকে প্রত্যক্ষ বড়ো কোনো সমর্থন দেয়নি ভারত। বরং কিছু ক্ষেত্রে এদেরকে মোকাবিলায় সহায়তা করেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের আশ্রয়-প্রশ্রয় সবকিছুই পায় জেএসএস। শান্তিবাহিনীকে ভারত সরকার অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে শান্তিবাহিনীর সংঘাতে পাহাড় হয়ে ওঠে অশান্ত।
এদিকে মুজিব-পরবর্তী বাংলাদেশ সরকার পুরোনো এক অধ্যায়কে আবার উন্মোচিত করে। এই অধ্যায়ের নেতা মিজো জাতির পিতা লালডেঙ্গা।
মিজোদের রাজ্য জোর করে দখল করে ইংরেজরা। সেই থেকে পরাধীনতার শুরু। এরপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মিজোরা খুশি মনে ইংরেজদের পক্ষ নিয়েছিল। কারণ তারা মিজোদের আজাদির খোয়াব দেখায়। কিন্তু সেই ওয়াদা পূরণ না করেই ইংরেজরা চলে যায়। আজাদির স্বপ্নভঙ্গের সাথে যুক্ত হয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও আসাম রাজ্য সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ। উল্লেখ্য, তখন মিজোরাম আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিজোদের মাঝে ইংরেজরা দুইটি বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। এক. তাদেরকে গণহারে খ্রিষ্টের খোঁয়াড় তথা খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করে এবং দুই. সাহসী মিজোদের সেনাবাহিনীতে চাকরির সুযোগ দেয়। আর, সেনাবাহিনীতে যেসব মিজো চাকরি করত, তারা নিজ সমাজে অত্যন্ত কদর পেত। এমনই এক মিজো ছিলেন লালডেঙ্গা। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য ছিলেন। নিজ সম্প্রদায়ের পক্ষ নেওয়ায় তাকে সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর জীবিকার তাগিদে জেলাপ্রশাসনে ছোটো একখান চাকরি নেন। মিজোদের পক্ষে ও কংগ্রেস সরকারের বিপক্ষে প্রচারণার দায়ে তাকে এই চাকরি থেকেও বের করে দেওয়া হয়। বৈশিষ্ট্যগতভাবে সাহসী লালডেঙ্গাকে সেনাবাহিনীর চাকরি দিয়েছিল সামরিক অভিজ্ঞতা এবং জেলাপ্রশাসনে চাকরির সুবাদে পেয়েছিলেন শহুরে সংস্কৃতি ও বেসামরিক জনগণের মনোভাব বোঝার সুযোগ। এই দুই মিলেই লালডেঙ্গাসহ বাইশ মিজো মিলে গঠন করেন মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট ( এমএনএফ)।
লালডেঙ্গার সংগ্রাম ও এম এন লারমার স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন - দুটোর সূচনা ষাটের দশকে। আর, ভারত সমর্থন দিত চাকমাদের। অপরদিকে, লালডেঙ্গার এমএনএফকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘাঁটি গড়ার সুযোগ দেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। শুধু সুযোগই নয়, অস্ত্রশস্ত্রসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেয় পাকিস্তান।
একাত্তরের পর পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি থেকে উৎখাত করা হয় এমএনএফকে। তারা বার্মায় আশ্রয়। কেউ কেউ চলে যায় মিজোরামে। পঁচাত্তরের পর আবারও বাংলাদেশে আশ্রয় পায় এমএনএফ।
জেএসএসে এম এন লারমা ও তার ছোটো ভাই জে এম লারমা ওরফে সন্তু লারমার সঙ্গে প্রীতিকুমার চাকমাসহ বাকি অংশের বিরোধ ছিল। এই মতভেদের মূল কারণ বাদি বনাম লাম্বা নীতি। অর্থাৎ প্রীতিকুমার গ্রুপ চাইত ভারতের সাহায্য নিয়ে শান্তিবাহিনীর কার্যক্রম চালাতে। তাতে স্বায়ত্তশাসন অর্জনে সহজ হবে। তাই ভারতনির্ভর এই নীতিকে বাদি বলা হয়। অপরদিকে, এম এন লারমা চাইতেন না ভারতসহ বিদেশিদের সাহায্য নিতে। কারণ তার আশঙ্কা ছিল ভারত তাহলে নিজেদের স্বার্থে জেএসএসকে ব্যবহার করতে পারে। অপরের সাহায্য না নেওয়ার এই নীতিতে বলা হয়, লাম্বা।
জেএসএসের এই কোন্দলে প্রীতিকুমার অংশের হাতে আত্মগোপনে থাকা অসুস্থ এম এন লারমা নিহত হয়। দলটির দলিলপত্রে এটিকে 'প্রথম গৃহযুদ্ধ' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরশাদের আমলে প্রথম বড়ো আকারে আলোচনা শুরু হয় জেএসএসের সঙ্গে। একই সময়ে লালডেঙ্গার মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট দুর্বল হয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসে। মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসে।
শান্তিচুক্তির পর অনৈক্য সৃষ্টি হয় জেএসএসের মধ্যে। দলটি ভেঙে তৈরি হয় ইউপিডিএফ। তারা শান্তিচুক্তির পক্ষে না। জেএসএস ও ইউপিডিএফ দুই পক্ষের সংঘর্ষে অনেকবার রক্তাক্ত হয়েছে পাহাড়। এখনো তা থামেনি। আরও পরে ইউপিডিএফে ভাঙন ধরে তৈরি হয় নতুন গোষ্ঠী।
অপরদিকে, লালডেঙ্গা অল্প সময় মিজোরামের ক্ষমতায় ছিলেন। সফলতার পরিচয় দিতে পারেননি। তবে জলদিই মারা যান এবং আরও ইমেজ নষ্ট হওয়ার আগেই অমরত্ব লাভ করেন মিজোদের হৃদয়ে। কিন্তু মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট লালডেঙ্গার জীবদ্দশাতেই ভেঙে যায় এবং আলাদা উপদলে ভাগ হয়ে কংগ্রেসে যোগ দেয়।
এম এন লারমা ও লালডেঙ্গা - দুজনেই ইতিহাসের অংশ। তাঁরা নিজ নিজ জাতিতে সম্মানীয়। আলতাফ পারভেজ সুন্দরভাবে লারমা ও লালডেঙ্গাকে নিয়ে লিখেছেন। মাত্র ২ শ পাতায় সুন্দর করে ব্যাখা করেছেন জেএসএস ও এমএনএফের কার্যক্রম।
আলতাফ পারভেজ সব সময় পড়াশোনা করে লেখেন। "বাতিঘর" প্রকাশিত বইটিতে তার মেহনতের ছাপ রয়েছে। কিন্তু বরাবরের মতো পুরোনো সমস্যা তাঁর রয়েই গেছে। তিনি সহজভাবে লিখতে পারেন না। সরল বাক্যে লেখার বদলে তিনি জটিল ও যৌগিক বাক্যে লেখেন। ফলে পাঠক হিসেবে শতভাগ স্বস্তি নিয়ে তার লেখা পড়তে পারিনি। লারমাকে নিয়ে বেশি লিখেছেন। লালডেঙ্গা সেই তুলনায় কম জায়গা পেয়েছেন৷ ভাষাশৈলী নিয়ে আলতাফ পারভেজের কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। আর, এখানেই তিনি দেশের জনপ্রিয় লেখক মহিউদ্দিন আহমদের তুলনায় পিছিয়ে। জনাব মহিউদ্দিন এক বছরে অনেকগুলো বই 'লেখেন'। সেগুলোর মান খুবই খারাপ। কিন্তু গদ্য ভালো। তরতরিয়ে পড়া যায়।
আলতাফ পারভেজ একেবারে নিরপেক্ষ জায়গা থেকে লেখেননি। তাঁর দরদ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও মিজোদের প্রতি। বইটার বড়ো একটা অংশ তিনি নিয়েছেন সুবীর ভৌমিকের ''Insurgent Crossfire" বইটা থেকে। সুবীর ভৌমিকের বইটা পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সবমিলিয়ে ভালো বই। তবে আলতাফ পারভেজ আরও বড়ো পরিসরে আলাপ করতে পারতেন। নাগাল্যান্ডের নেতা ফিজোকে এই আলোচনায় আনতে পারলে ভালোই হতো। শ্রীলঙ্কার তামিলদের নিয়ে বৃহৎ আঙ্গিকে তিনি লিখেছেন। সেভেন সিস্টার্স নিয়েও এমন সুবিস্তৃত লেখার দাবি রইল।
সত্যি কথা বলতে, নতুন কিছুই জানা হলো না বইটা থেকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা বা তাদের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে আগে যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে সেই চক্রেই বারবার ঘুরপাক খেয়েছেন আলতাফ পারভেজ। নতুন কোনো পারসপেক্টিভ নেই, বিশ্লেষণ নেই। অবশ্য তিনি ভূমিকাতেই বলেছেন এ কথা। সেদিক দিয়ে তিনি স্বচ্ছ থাকতে পেরেছেন পাঠকদের কাছ থেকে, ধারণা দিতে পেরেছেন কী নিয়ে তিনি লিখতে যাচ্ছেন। তবে আমি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আরো বিশদভাবে কিছু পাবো, অজানা কিছু জানবো এমন প্রত্যাশা ছিল।
লালডেঙ্গার অধ্যায়টুকু তিনি শুধু ছুঁয়েই গেছেন, তার জীবন নিয়ে বিশেষ কোনো আলাপ নেই, মিজোদের সংগ্রাম নিয়েও তেমন গভীর বিবরণ বা আলোচনা নেই। পাশাপাশি দুই দেশে অবস্থিত ভিন্ন দুটি জাতির মুক্তিসংগ্রামকে একই ফ্রেমে বেধে তা নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান হতে পারতো বইটা; সেটা না পেয়ে বেশ খানিকটা হতাশ।
পার্বত্য অঞ্চলের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জানতে আগ্রহী নতুন পাঠকদের কাছে এ বই ভালো লাগবে বলে আশাবাদী।
৩.৫/৫ মানবেন্দ্র লারমা এবং লালডেঙ্গা উভয়েই পার্বত্য অঞ্চলের দুটি আলাদা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার হয়ে লড়াই করা নেতা। তাদের সংগ্রামের সময়কাল বলতে গেলে প্রায় একই এবং উভয়েই তাদের অঞ্চলে কিংবদন্তিতূল্য। এই দুই নেতার কর্মকান্ডের বিশ্লেষণ পাওয়া যায় এই বইতে।
মানবেন্দ্র লারমার জীবন যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার আদায় নিয়েই কেটেছে তাই মূল প্রসঙ্গ এটাই। সেজন্য আলোচনা শুরু হয়েছে একটু পেছন থেকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার উৎপত্তির ব্যাপারগুলো দেখার নিমিত্তে। এরপর অধিকাংশটা জুড়েই লারমা এবং তার হাতে গড়া সংগঠন জেএসএস নিয়েই ছিলো। কিন্তু লেখাগুলো বিস্তারিত নয়। তাছাড়া তাদেরকে কোন পদক্ষেপ কেন নিতে হলো সে আলোচনাও পাওয়া যায়না তাই অনেক জায়গাতেই অতৃপ্তির মতো লাগে।
লালডেঙ্গার লড়াইটা ভারতের মিজোদের হয়ে। লারমার মতো তিনিও সামরিক কায়দায় সংগ্রাম চালিয়েছেন অনেকটা সময়। মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানের তরফ থেকে তাদেরকে সহায়তা করা হতো। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এসে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা মিজো অধ্যুষিত অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করার সুবিধা পেত। একইভাবে লারমার জুম্মদের সহায়তা দিতো ভারত সরকার। তাই মিজো বিদ্রোহীদের সাথে জুম্ম বিদ্রোহীদের সংঘাত হয় বহুবার। মুক্তিযুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় মিজোরা পার্বত্য চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যায়। পরবর্তীতে মিজোদের সাথে ভারত সরকারের একটা সমঝোতা হয়ে যাওয়ায় বিদ্রোহেরও ইতি ঘটে।
লালডেঙ্গাকে নিয়ে আলোচনার ব্যাপ্তি বড় নয়। জুম্মদের বিদ্রোহের সাথে তাদের বিদ্রোহের সময়কাল এক হওয়ায় প্রসঙ্গক্রমেই তার আলোচনাটা জানা জরুরী হয়ে পড়ে। সেই আলোচনায় তাই বারবার লারমা কিংবা জেএসএস এর সাথে তাদের তুলনা লক্ষ করা যায়।
এমনিতে পার্বত্য অঞ্চল কিংবা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের নিয়ে লেখাগুলো ভীষণভাবে একপাক্ষিক। উভয়পক্ষই সমস্ত দোষ বিরোধীদের ঘাড়ে চাপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মহিউদ্দিন আহমদের "পার্বত্য চট্টগ্রাম" নিয়ে লেখা বইটা পুরোপুরি নিরপেক্ষ না হলেও সমস্যার পেছনের কারণগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে সক্ষম। আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণী লেখার কারণে তাই আশা ছিলো ব্যাপারগুলো আরেকটু খতিয়ে দেখা যাবে। বলা বাহুল্য সে আশা পূরণ হয়নি। তবে ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তার কাছ থেকে আরো বিস্তারিত পরিসরে কিছু পাওয়ার আশা রাখছি।