বিদ্বান বনাম বিদুষী—প্রীতম বসুর সর্বসাম্প্রতিক গ্রন্থ—নিঃসন্দেহে নিছক কোনও ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি নয়; বরং এটি এক জাগ্রত চৈতন্যযাত্রা, যেখানে ইতিহাসের গহ্বর, উপকথার কুয়াশা, আর একবিংশ শতাব্দীর ক্লান্ত, ক্লেদাক্ত বাস্তবতা একাকার হয়ে যায়। কালের পর্দা এখানে শুধু সরেই না, গলে যায়; অতীত ও বর্তমানের মধ্যবর্তী ফাটলে গজিয়ে ওঠে এক নতুন সাহিত্যিক ভূগোল।
উপন্যাসটি পড়ে ওঠার পর মনে হয়—খনা, বেহুলা, বিদ্যাধরীরা কেবল ইতিহাসের চরিত্র নয়, তারা আজও জীবন্ত; তারা আমাদের শহরে ঘুরে বেড়ায় ট্রেনের কামরায়, কোর্টরুমে, জ্যোতিষমন্দিরে, মেডিক্যাল ল্যাবে—প্রতিবাদে, গবেষণায়, প্রতিকথায়, এবং নিরব বিপ্লবের চোরা স্রোতে। এই বই তাই শুধু পাঠ্য নয়, পাঠকের মনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিধ্বনি তুলবে—প্রশ্ন, ব্যথা, আর পুনর্জন্মের প্রত্যয়ে।
প্রীতম বসু এই উপন্যাসে যে তিনটি ভিন্ন কালের আখ্যানকে সমান্তরালে বুনে দিয়েছেন—তা নিছক একটি আখ্যানকৌশল নয়; বরং এটি এক সুগভীর রাজনৈতিক অবস্থান এবং ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। ১৩ শতকে খনা ও বরাহমিহিরের পৌরুষবাদী দ্বন্দ্ব, ১৮ শতকে বেহুলা ও সত্যাচার্যের মধ্যকার সতীত্ব বনাম স্বশক্তির লড়াই, এবং একবিংশ শতাব্দীর পৃথুযশ ও বিদ্যাধরীর কোর্টরুমে জ্ঞান ও অধিকারের প্রতিদ্বন্দ্ব—এই তিনটি আলাদা যুগ, আলাদা ভাষা, আলাদা সমাজতন্ত্র—তবু যেন একটিই প্রবাহমান প্রাচীন রক্তরেখা। যুগ বদলায়, প্রযুক্তি আসে, সমাজ শিক্ষিত হয়—কিন্তু বিদুষীকে ছায়ায় ফেলে রাখতে চাওয়া বিদ্বানের অন্তর্মুখী সংকীর্ণতা আজও অটুট থাকে। এই উপন্যাস সেই পুনরাবৃত্ত দমনচক্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এক গর্জন—যেখানে খনা, বেহুলা, আর বিদ্যাধরী যেন একাত্ম, এক নারীচৈতন্য, যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কণ্ঠরুদ্ধ হবার পরেও মুখ তুলে বলে—"আমি এখনো বচন বলি, এবং আমার কণ্ঠ এখনও স্পষ্ট।"
উপন্যাসের প্রাথমিক স্তম্ভটি দাঁড়িয়ে আছে খনার কণ্ঠে—যাঁর “বচন” আজও বাংলার কৃষিজীবন, রাশিফল, লোকপ্রবাদ ও দৈনন্দিন বিশ্বাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে, অথচ তাঁর জীবনচর্যাকে ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে এক বিপুল ঐতিহাসিক ধোঁয়াশা। সেই অন্ধকারেই প্রীতম বসু জ্বেলে দিয়েছেন এক প্রত্নতাত্ত্বিক আলো, যেটি ইতিহাসের শীতল স্তব্ধতাকে ছুঁয়ে জাগিয়ে তোলে স্পন্দিত সাহিত্য। খনার চরিত্রকে তিনি শুধুমাত্র পুনর্গঠিত করেননি, তাঁকে তিনি নির্মাণ করেছেন—একজন মহাজাগতিক বিদুষী রূপে, যিনি একাধারে নৃতাত্ত্বিক কৌতূহলের উপাদান, পুরাতাত্ত্বিক বিস্ময়, এবং এক জীবন্ত নারীমনস্ক লৌকিক শক্তি।
এই খনা একদিন হেঁটেছিলেন বরাহমিহিরের পিতৃ-ঈর্ষার নিচে, কিন্তু তিনিই পরে ফিরে আসেন বেহুলার ছদ্মবেশে সতীদাহের আঁচ থেকে পালিয়ে; আর ফিরে আসেন বিদ্যাধরীর প্রতিবাদী মুখ হয়ে, নমিতার বিচারবুদ্ধিতে, এমনকি এক হকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও। এই ‘পুনর্জন্ম’ কেবল আধ্যাত্মিক নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক DNA—যেখানে বিদ্রোহ, স্মৃতি ও প্রতিভার উত্তরাধিকার বহন করে নারীচৈতন্য প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। এক খনার মুখ বন্ধ করলে, আরেক খনা উঠে দাঁড়ায়। কারণ সত্য, যুক্তি ও স্পষ্ট বাক্যকে থামানো যায় না—বরাহমিহিরের হাতেও নয়, আজকের পৃথুযশের হাতেও নয়।
দুটি বিশ্লেষণ :
১) বেহুলা বনাম খনা: পুনর্জন্ম, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের লৌকিক ব্যাকরণ
এই উপন্যাসে বেহুলা এবং খনা—দুজনেই শুধু নামমাত্র পুরাণ বা কিংবদন্তির চরিত্র নন, তাঁরা এক একটি সময়-উত্তীর্ণ চৈতন্যরূপ, যাঁরা লৌকিকতা আর নারীজাগরণের সম্মিলিত প্রতিরূপ। খনা তাঁর “বচন”-এর মধ্য দিয়ে যেমন প্রতিরোধের এক দার্শনিক ব্যাকরণ রচনা করেন, বেহুলা তাঁর জীবন-পাল্টানো পদক্ষেপ দিয়ে সেই ব্যাকরণকে ব্যবহার করেন। খনা ইতিহাসের গর্ভে প্রবেশ করেন যুক্তির শক্তি নিয়ে, আর বেহুলা ইতিহাসের সীমানা ভেঙে বেরিয়ে আসেন নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অধিকার নিয়ে।
এই দুই চরিত্র যেন এক নারীকেন্দ্রিক পুনর্জন্ম-চক্রের দুই প্রান্ত—খনার তাত্ত্বিকতা আর বেহুলার প্রয়োগ। একজনে কথার বানে প্রতিবাদ করেন, অন্যজনে জীবনের স্রোতকে উল্টে দেন। সতীদাহের নিষ্ঠুরতা আর সমাজে নারীর জ্ঞানচর্চার উপরে চাপানো নিষেধাজ্ঞা—এই দুই নির্মমতা যখন বেহুলার জীবনে একসাথে আছড়ে পড়ে, তখনই তিনি হয়ে ওঠেন খনার প্রতিস্বর, এক পুনর্জাত বিদুষী। বেহুলার গ্রামে গণনার প্রতিভা পিতৃতন্ত্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়ে, যা তাঁর প্রতি হিংস্রতা ও ভয়কে জন্ম দেয়। সমাজ তাঁকে শ্মশানে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি পালিয়ে যান নৌকায় করে—এই প্রস্থানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতীক: বেহুলা কেবল সতী নন, তিনি খনার মতন এক নব্য গ্রহবিপ্র, যাঁর জ্ঞান ভবিষ্যৎ রচনার উপাদান।
এই স্তরেই প্রীতম বসু খনার পুনর্জন্মকে ভিন্ন এক মাত্রা দেন—অতীত থেকে আসা সেই বিদুষী আত্মা আবারও এক নবতর বোধে ফিরে আসে, গ্রামের নিরক্ষর মেয়েদের মধ্যেও যেন খনার ছায়া পড়ে। আর এই ধারাটিই বিস্তৃত হয়ে যায় বর্তমান পর্বে, যেখানে জ্যোতিষশাস্ত্রের মতই আয়ুর্বেদ, বচনের মতই পুঁথি, আর সৎ মমতার সঙ্গে প্রতারণার সংঘর্ষ—সবকিছু এসে মিলিত হয় এক জটিল, বহুপার্শ্বীয় আইনি লড়াইয়ে।
সুশ্রুত কোম্পানি ও অ্যামফার্মার মধ্যে চলা কেসটি কেবল প্রযুক্তি বনাম ট্র্যাডিশনের দ্বন্দ্ব নয়, এটি জাতীয় গর্ব বনাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সংঘর্ষও বটে। আয়ুর্বেদের গূঢ়তত্ত্ব, কবিরাজি ঐতিহ্য, ধন্বন্তরি বংশের শাস্ত্রজ্ঞান যখন একপ্রান্তে দাঁড়ায়, তখন তার বিপরীতে দাঁড়ায় বিশ্বাসঘাতক তথাগত—যার চরিত্র যেন সেই যুগের বরাহমিহিরেরই কর্পোরেট সংস্করণ। প্রেম আর বিশ্বাস যখন ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক, তখন তা আর নিছক পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়—তা হয়ে ওঠে এক জাতিগত লড়াই।
খনার বচনের মতোই—এই লড়াইও ভবিষ্যদ্বাণী করে। শুধু প্রতিশোধ নয়, এটি উত্তরাধিকার রক্ষার এক অলিখিত যুদ্ধ, যেখানে বচন, আয়ুর্বেদ, প্রেম ও প্রতিবাদ একসাথে হাত ধরাধরি করে চলে। আর এই চলার ছায়াতেই দেখা যায়—খনা, বেহুলা, বিদ্যাধরী—তাঁরা কেউই অতীত নন, তাঁরা একেকটি চলমান সত্য, বারবার ফিরে আসা প্রতিরোধ।
২) চরিত্র বিশ্লেষণ: বিদ্যাধরী, তথাগত, নমিতা, আহুজা
বিদ্যাধরী—তিনি কেবল একজন গবেষক নন, এক জীবন্ত প্রতিবাদ। ইতিহাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী হলেও, তাঁর আসল শক্তি আত্মনির্মাণে। তাঁকে হয়তো একসময় প্রতিষ্ঠান নিঃস্ব করে দিয়েছিল, কিন্তু তবু তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হয় না—তাঁর লেখা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর অবস্থানই হয়ে ওঠে এক মৌন বিদ্রোহ। বিদ্যাধরী যেন সেই খনার উত্তরসূরী, যাঁর জিভ না কেটে শুধু চেপে ধরা হয়েছে, কিন্তু যিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের গবেষণাকেই করেছেন অস্ত্র। তাঁর চরিত্রে মেলে তপস্যা ও প্রতিবাদের সম্মিলিত রেখা—যা একইসাথে আধ্যাত্মিক ও বিপ্লবী।
তথাগত—ধন্বন্তরী কবিরাজের রক্তধারা বহন করেও, সে যেন বংশের আর্শীবাদ নয়, অভিশাপ। তাঁর চরিত্র এক জটিল লয়—প্রেমিক ও প্রতারক, প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন অথচ আদর্শশূন্য। কর্পোরেট লোভের এক জীবন্ত প্রতিমা, তথাগত সেইসব চরিত্রের প্রতিনিধি যাঁরা নিজেদের শিকড় বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে। তথাগতকে ঘৃণা করা যায়, কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না—কারণ সে আমাদের সমাজের সেই বাস্তব ছায়া, যাঁরা প্রেমে চুমু খায় কিন্তু পেটেন্টে ছুরি বসায়।
নমিতা—এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী গবেষক, যিনি বচনপিসির এক আধুনিক অবতার, অথচ নিজেই নিজের দ্বিধা ও শঙ্কার ভিতরে আচ্ছন্ন। তিনি বিদ্যাধরীর পাণ্ডুলিপির রক্ষক, কিন্তু পৃথুযশের সামনে তাঁর ভঙ্গুরতা চোখে পড়ে। পাঠক বুঝে যান, জ্ঞান থাকলেই কি শক্তি আসে? নাকি শক্তি আসে স্থিতি ও নৈতিক দৃঢ়তা থেকে? নমিতা প্রশ্ন তোলেন, উত্তর দেন না—আর সেখানেই তাঁর চরিত্রের গভীরতা।
আহুজা—আইনজীবী হিসেবে মেধাবী, তীক্ষ্ণ ও চতুর, কিন্তু তাঁর চরিত্র কিছুটা রৈখিক। তিনি যেন এক কৌশলী টুল, যিনি গল্পে কনফ্লিক্ট বাড়াতে হাজির হন, কিন্তু নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্বের দিক থেকে কিছুটা ফাঁপা থেকে যান। তাঁর চরিত্রে যদি ব্যক্তিগত কোনো বয়ান যোগ হতো, তবে তিনি হয়ে উঠতেন তথাগতের এক কর্পোরেট প্রতিদ্বন্দ্বী, এখন যেটুকু রয়েছেন, তা কেবল আদালতের একটি অনিবার্য বিপক্ষ।
এই চারটি চরিত্র যেন একই নাটকের চারটি মৌলিক দিক:
ক) বিদ্যাধরী প্রতিরোধ,
খ) তথাগত প্রতারণা,
গ ) নমিতা দ্বিধা,
ঘ) আহুজা সংঘর্ষ।
আর তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মাধবী বসাক—কেবল একজন আইনজীবী নন, তিনি হলেন আধুনিক কালের খনার কণ্ঠস্বর, এক কথ্য প্রতিরূপ যিনি দলিল দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন বিদুষীকে ঘিরে সমাজের সেই পুরাতন, পুরুষতান্ত্রিক অবজ্ঞাকে। তিনি কোনও রূপকথার বচনপিসি নন, তিনি এক শাণিত যুক্তিবাদী নায়িকা, যাঁর অস্ত্র হল আইন, যাঁর বচন হল দলিল।
এই উপন্যাসে “বেহুলার খনা” নামক একটি বই, শুধু "সুশ্রুত" কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার আইনি অস্ত্রই নয়—এ এক প্রতীকি পুনর্জন্ম। এটি কেবল একটি পাণ্ডুলিপি নয়, বরং এক দগ্ধ অথচ দীপ্ত নারীকণ্ঠ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও বলে চলে: জ্ঞান কোনো জাত, পেশা বা লিঙ্গের সম্পত্তি নয়—এটি উত্তরাধিকার, কিন্তু সেটি চূর্ণ করে ফিরেও আসতে পারে। খনার বচন ও বেহুলার স্মৃতি, সেই বিস্মৃত নারীকণ্ঠের পুনরারোহণ, যা একসাথে স্মৃতি, মিথ এবং পেটেন্ট আইনের মিটমাটে অদ্ভুতভাবে গাঁথা।
এই উপন্যাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক, সম্ভবত, ইতিহাস ও রাজনীতির দ্বৈত বিন্যাস—যেখানে একদিকে ইউরোপের উইচ-হান্টিং, ব্রিটিশ পণপ্রথা, কিংবা ঔপনিবেশিক বায়োপাইরেসির ধারাবাহিকতা দেখা যায়, আবার অন্যদিকে উপন্যাস ছড়িয়ে দেয় এক টেক্সচুয়াল ম্যান্ডালা—কলকাতার চৌরঙ্গি, প্রাচীন নদীপথ, জিভকাটা মন্দির, পুরনো পুঁথিঘর, বা গঙ্গার নিঃশব্দ প্রেক্ষাপটে হাজির হয় চন্দ্র ডাকাত, পাখমারা গণক, বিশে, ডেভিড সাহেব, আর আমাদের সকলের প্রিয় বচনপিসি।
তারা সবাই যেন এই পাঠভ্রমণের একেকটি বিন্দু, যাদের চারপাশ ঘিরে বুনে ওঠে বাংলার নারীকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চার এক অন্তর্লীন ভূগোল—যেখানে নারীরা মায়ের মতো শুধু জন্ম দেন না, জ্ঞান দেন, ভবিষ্যদ্বাণী করেন, কিন্তু তবুও সমাজ তাঁদের স্তব্ধ করতে চায়। সেই স্তব্ধতাকে টপকে “বেহুলার খনা” হয়ে ওঠে এক প্রামাণ্য জবাব, এক নারীবাদী নথি।
এইভাবেই উপন্যাসটি কেবল ‘কী হবে মামলায়?’ এই উত্তেজনায় আবদ্ধ থাকে না, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, এবং দার্শনিক চেতনায় মিশে গিয়ে তৈরি করে একরকম পাঠ-তীর্থ—যেখানে পাঠক শুধু গল্প পড়েন না, হারিয়ে যান এক মানসচিত্রে।
একটাই খটকা :
তবে একটি প্রশ্ন, একটি খটকা নিঃশব্দে মাথা তোলে—আহুজার মতো একজন বিরুদ্ধচরিত্র, যিনি মামলার গতি প্রকৃতি নির্ধারণে এত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর নির্মাণ আরও বেশি মনস্তাত্ত্বিক স্তর পেতে পারত। কোথাও কোথাও তাঁর চাতুর্য একরৈখিক, যেন কেবল ঘটনার পাটিগণিত মেলানোর এক গাণিতিক মুখ। ঠিক তেমনি, নমিতার একটি–দু'টি সিদ্ধান্ত—বিশেষত পৃথুযশের সামনে তাঁর আবেগতাড়িত স্বীকারোক্তি—আখ্যানের যুক্তিবিন্যাসে খানিকটা অসতর্ক ফাটল এনে দেয়, পাঠককে টেনে আনে বাস্তবের মাটিতে।
কিন্তু এই ছোট ছোট কাঁচের টুকরোগুলো উপন্যাসের দীপ্তিকে ম্লান করতে পারে না, কারণ গোটা আখ্যানটি এমন এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত—যেখানে সাহিত্যের কল্পনা, ইতিহাসের পাঠ, নারীবাদের অন্তর্দৃষ্টি, আয়ুর্বেদের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য, লৌকিক সংস্কৃতির মাটি, আর অধ্যাত্মবাদের আকাশ একসঙ্গে এসে দাঁড়ায় এক অলৌকিক সমবেত সুরে। এ এক মহাকাব্যিক সংহতি—যেখানে ত্রুটিরাও যেন পরিণতির অংশ, আর অপূর্ণতাও হয়ে ওঠে সম্পূর্ণতার ছায়াপথ।
শেষের কথা:
“বিদ্বান বনাম বিদুষী” কেবল একটি বই নয়, এটি এক প্রতীক—একটি যুগচিহ্ন, একটি জ্যোতির্বর্তুল, যা আমাদের বলে দেয়: প্রতিভা কখনও নিঃশেষ হয় না। সময়ের গহ্বর চিরে সে ফিরে আসে বারবার—খনা হয়ে, বেহুলা হয়ে, বিদ্যাধরী হয়ে, আর প্রতিবারই সে চ্যালেঞ্জ জানায় সেই সমাজকে, যে সমাজ কেবল “বিদ্বান”দের কণ্ঠে সম্মান সংরক্ষণ করে।
এমন এক সমাজে, যেখানে বিদ্যাধরীর কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায় পুরুষতান্ত্রিক গবেষণার গর্জনে, সেখানে “বিদুষী”-র বিদ্যা ঝলসে ওঠে এক অনিবার্য বিদ্যুৎসম্বরণে। যুগের পর যুগ ধরে, চৈতন্যের মেরুদণ্ডে কাঁপন তুলে, সে প্রশ্ন তোলে—জ্ঞান কি কেবল পাণ্ডুলিপির মধ্যে? না, তা বেঁচে থাকে প্রতিরোধের ভাষায়, প্রতিটি নিরুদ্ধ ইতিহাসের বুকে?
এই বইটা হাতে পেয়েছিলাম এক অদ্ভুত সময়ে—যখন মনে হচ্ছিল, নিজের ভিতরের আলো যেন নিভে আসছে। “বিদ্বান বনাম বিদুষী” আমার পড়ার টেবিলকে গবেষণার চাতাল করে তুলল। ডিঙাডুবি গ্রাম যেন পুনর্জীবন লাভ করলো আমার আত্মার মাটিতে—খুব ব্যক্তিগত, খুব কল্পনাতীত এক জায়গায়। মনে পড়ে গেল কলেজ পলিটিক্সে পিষে যাওয়া মেধাবী মুখ, রিসার্চের মাঝে থেমে যাওয়া একেকটা কণ্ঠ, আর সেই চিরন্তন যুদ্ধ—জ্ঞান বনাম দম্ভ, প্রেম বনাম লোভ, ক্ষমতা বনাম শ্রদ্ধা, বিদ্বান বনাম বিদুষী।
এই উপন্যাস আমাকে শুধু পড়তে বাধ্য করেনি, পুনর্জন্ম দিয়েছে আমায়। আমি যেন চিনে ফেলেছিলাম প্রতিটি চরিত্রকে—আমার মা, আমার সহপাঠিনী, আমার ছাত্রীরা, আমার সহ-গবেষক বন্ধুরা—সবাই যেন এক একটি খনা, যাঁরা যুগে যুগে নিজের জিভ হারিয়েও বচনের আগুন নেভাননি। সেই আগুনেই যেন আলোকিত হয় আমার চেতনা।
আমি ঋণী এই বইয়ের কাছে। এই অসামান্য, অপ্রতিরোধ্য, আর সম্ভবত এই সময়ের সবচেয়ে জরুরি চৈতন্যের কাছে।
১০/১০ না, তা ছাড়িয়ে যাওয়া এক অভিজ্ঞতা।
একবার নয়, বারবার পড়ার মত বই।
বিদ্বান তো অনেক, বিদুষী তো অমৃতস্রোতা। সেই স্রোতের মুখোমুখি হবার সাহস— আছে তো আপনাদের?
অলমতি বিস্তরেণ।