অনেক দিন অপেক্ষার পর যে বইটা হাতে এল, সেটা পড়ার পর অন্তত এটুকু বলা যায় যে অপেক্ষা সার্থক হয়েছে। সুখপাঠ্য, স্বচ্ছ কাহনী। পড়তে কোন বেগ পেতে হয় না। টাইমফ্রেম মূলত দুটো, ইংরেজ আমলের গ্রাম আর বর্তমান কলকাতা। জন্মান্তরবাদের থিওরি আছে। সেটায় চরিত্রগুলো সব আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আর মূল বিষয় হচ্ছে-খনা। খনাকে নিয়ে এত চমৎকার একটা উপন্যাসের প্রয়োজন ছিল। স্কুলে থাকতে আমরাও পড়েছি, ' মঙ্গলে ঊষা বুধে পা যথা ইচ্ছা তথা যা' কিংবা ' কলা রুয়ে না কেটো পাত তাতেই কাপড় তাতেই ভাত' এইসব প্রবচন বানানো নাকি সত্যিই খনার সেই তর্কই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু। এই বিষয়ের সাথেই অবতারণা ঘটে গেছে এক চিরায়ত তর্কাতর্কির। সেটা আর কিছুই না। নারীর উপর যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষের অত্যাচারের। খনার পান্ডিত্য অসহনীয় লাগায় তারই স্বামী বরাহমিহির খনার জিভ কেটে দেয়। খনাকে উপজীব্য করে আরো অনেক পরের ভারতে আসে আরেক নারী, সেও জ্যোতিষশাস্ত্রে দড়। নাম তার বেহুলা। বেহুলার জবানেই আমরা খনার গল্প শুনি আর শুনি বেহুলার নিজের গল্পও। তবে বেহুলা আর ডেভিডের পরিণতিটা সম্পূর্ণ না হওয়া আমার চোখে এই উপন্যাসের একটা নেতিবাচক দিক। বর্তমান সময়ে বিদেশী কোম্পানির ঔষধ এর পেটেন্ট আর বাঙলার পুরাকাল থেকে চলে আসা আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা আর গবেষণার ক্লেশে উঠে আসে অন্যায়ভাবে হেরে যাওয়া এক বিদুষী নারীর উপাখ্যান। খনা-মিহির, বেহুলা-সত্যাচার্য আর বিদ্যাধরী-পৃথুযশ তাই মিলে যায় এসে এক সুতোয়।
খুব কম সংখ্যক বই আছে যেগুলো পড়া শুরু করলে বোঝা যায় না কীভাবে পাতার পর পাতা দ্রুততার সঙ্গে পড়া শেষ হয়ে চলেছে। আবার পরে, এটুকু পরে, বাকিটা পরে পড়বো— এসব কথা মনেই আসে না। 'বিদ্বান বানাম বিদুষী' ঠিক এরকমই একটি রচনা লেখক প্রীতম বসুর, যা পাঠকের মনকে ডুবিয়ে রাখে ধারাবাহিক পাঠের মধ্যে।
১৭৩৬ সাল। বাংলায় তখনও সতীদাহ প্রথা বিদ্যমান। লখা তাঁতির সাপে কাটা নিথর মৃত দেহটিকে শেষ যাত্রায় নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে স্ত্রী বেহুলাকে। তাঁকে সতী হয়ে স্বামীর চিতায় উঠতে হবে।
বহু কষ্টে ও কঠোর বুদ্ধির প্রয়োগ করে বেহুলা পালায়। এক সহৃদয় ব্যক্তি তাকে নিয়ে আসে তার নিজের গ্রামে। বেহুলা তাঁর পিতৃসম শ্বশুরমশাইয়ের কাছে খুব ভালোভাবে জ্যোতিষ শাস্ত্র শিখেছিল। ক্রমে সেই গ্রামে বেহুলা জ্যোতিষ গণনার জন্য সুখ্যাতি লাভ করে।
এবার এগিয়ে আসা যাক ২০১৯ সালে। বেঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অফ আর্টস ফ্যাকাল্টি নমিতার কাছে আজ এসেছেন আইনজীবী মাধবী বসাক। তিনি নিজের মেয়ে ও তার কোম্পানির হয়ে একটি মামলা লড়ছেন। এই ভারতীয় কোম্পানি সুশ্রুত ' বিষহরি ' বলে একটি সর্পদংশনের বিষ প্রতিরোধের ওষুধ তৈরি করে। সুশ্রুত থেকে সেই ফর্মুলা চুরি করে একজন বৈজ্ঞানিক সেটির পেটেন্ট নিয়ে একটি বিদেশি কোম্পানি অ্যামফার্মাতে দিয়ে দেয়। অ্যামফার্মা তখন সুশ্রুতকে ওই ওষুধ বিক্রি করা বন্ধ করতে বলে। কিন্তু সুশ্রুত এবং তাদের আইনজীবী এটা বলছেন যে এই ওষুধের নাম বহুকাল থেকেই ভারতে জনসাধারণের মুখে মুখে আলোচিত হয়েছে, এমনকি খনার বচনে এর উল্লেখ পর্যন্ত আছে। প্রমাণস্বরূপ মাধবী বসাক ' বেহুলার খনা ' নামে একটি বই নিয়ে এসেছেন নমিতার কাছে। অ্যামফার্মা পৃথুযশ ভৌমিক নামে একটি বিশেষজ্ঞকে দিয়ে লিখিয়ে এনেছে যে খনার বচন বিশ্বযোগ্য নয় কারণ খনা বলে কোনোদিন কোনো বিদুষী নারী ছিলেন না। ওটা উপকথা মাত্র।
মাধবী আজ নমিতার কাছে এই অনুরোধ নিয়ে এসেছেন যে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি এই ' বেহুলার খনা ' বইটি পড়েন ও খনা ছিল, খনার বচন সত্য সেটা যেন উনি লিখে দেন।
এরপর কাহিনী এগিয়েছে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে
1. খনার কোনো ঐতিহাসিক উপস্থিতি ছিল কিনা, এবং বরাহমিহির যদি সত্য হন, খনা কেন সত্য নয়?
2. যদি তিনি সত্য হোন , তাহলে খনার নিজের হাতে লেখা কোনো পুঁথি কেন পাওয়া যায়নি?
3. ষষ্ঠীদাস নামে একজন কবি খনা ও তাঁর বচনের উল্লেখ তাঁর কবিতায় করেছেন। এটা কি হতে পারে যে এই ষষ্ঠীদাস নিজেই খনার বচনগুলি লিখেছেন?
4. খনার স্বামী মিহির ও তাঁর শ্বশুরমশাই বরাহমিহির। এটা হতে পারে যে মিহির নিজেই আসলে বরাহমিহির। খনাকে তাঁর নিজের স্বামীই জিভ কেটে মেরেছিলেন।
5. অন্য একটি থিওরি এমন দেওয়া হচ্ছে যে খনার যে সময়কাল বলা হচ্ছে বরাহমিহির তার অনেকখানি আগের সময়ের মানুষ তাই তিনি তাঁর স্বামী বা শ্বশুর হতেই পারেন না। জিভ কেটে নেওয়ার কথাটা একটা লোককথা মাত্র।
6. তাহলে খনা মিহিরের ঢিপি কি সত্য নয়?
এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে যান মাধবী বসাক, নমিতা ও নমিতার কলেজের প্রাক্তন মেধাবী সিনিয়র বিদ্যাধরী দাস।
উপন্যাস কেমন লেগেছে সেটা নিয়ে বেশি বলছি না। আমার খুব ভালো লেগেছে। আমার মনে হলো এই কাহিনীর বিষয়বস্তুটি একজন পাঠককে বইটি পড়তে উৎসাহী করতে যথেষ্ঠ।
শুধু একটাই কথা বলবো এ বই সকল বাঙালির অবশ্য পাঠ্য। এতো সুন্দর রিসার্চ ওয়ার্ক লেখকের 🙏। কুর্নিশ জানাই সু-লেখক আপনাকে আর আমরা কৃতজ্ঞ আপনার কাছে যে এরকম একটি রত্ন আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য। 🙏🙏।
বইটা কিনে রেখেছিলাম অনেকদিন, তারপর রয়ে সয়ে ঠান্ডা মাথায় পড়বো বলে সেই যে তুলে রেখেছিলাম উপরের তাকে – তারপর নামানোই হয়নি এতকাল। অবশেষে তাক থেকে নামিয়ে দুদিন টানা পড়ে শেষ করলাম প্রীতম বসুর বিদ্বান ও বিদুষী। এই বইতেও নিজস্ব স্টাইলে লেখক বাংলার বুকের ভিতর থেকে আরেক সম্পদকে খনন করে এনেছেন, তার উপর ভিত্তি করেই বুনেছেন গল্প। চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, কীর্তনের পর এবার সেই জয়যাত্রা অব্যাহত থেকেছে প্রাচীন বাংলার কিংবদন্তী সেই বিদুষী খনার হাত ধরে। যে খনার বচন যুগে যুগে মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে বঙ্গভাষার প্রবাদে পরিণত হয়েছে – সেই খনা কি সত্যিই ঐতিহাসিক চরিত্র? নাকি নিতান্তই কল্পকথা – বাংলার নিজস্ব মিথ? বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের এক রত্ন বরাহমিহিরের সঙ্গে তাঁর আসল সম্পর্ক কী ছিল? চন্দ্রকেতুগড়ের কাছে খনামিহিরের ঢিপি-র তাৎপর্যই বা কী? এই সকল প্রশ্নকে একই সূত্রে বেঁধে লেখক উপন্যাসের ভিত্তিস্থাপন করেছেন। সেই সঙ্গে উপন্যাসে জুড়ে গিয়েছে আধুনিক যুগের আরো জীবন্ত কিছু সার্বিক সমস্যা – বায়োপাইরেসি, সামান্য মুনাফার লোভে কর্পোরেট জায়েন্টদের স্বেচ্ছাচার, দেশের অমূল্য সম্পদকে টাকার বিনিময়ে বিদেশী ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেওয়া এবং মেধা-চুরি। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে আমাদের গরীর দেশের ঐতিহ্য কি অজান্তেই পদদলিত হয়ে চলেছে শক্তিশালী বিত্তশালীদের কাছে? তবে এই গল্পের মূল উপজীব্য দাঁড়িয়ে থাকে পুরুষ ও নারীর চিরকালীন দ্বন্দ্বে- যুগে যুগে পুরুষতান্ত্রিকতার করাল গ্রাসে কিভাবে নারীদের মুছে যেতে হয়, সফল নারীকে কিভাবে সমাজের সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে চলতে হয় আজও, সেই চিত্র তুলে ধরে আবারও। উপন্যাসে দুটি কালের স্রোত সমান্তরালে বয়ে চলে, সেই স্রোতের সাথে আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলে কাহিনীর দুই নায়িকা। দুই যুগের দুই বিদুষী- অষ্টাদশ শতকের বাংলার এক অজপাড়া গ্রামের মেয়ে বেহুলা, যে স্বামীর চিতা থেকে পালিয়ে গিয়ে নিজের বিদ্যাবৃত্তিকে সম্বল করে এগিয়ে যেতে চায় জীবনযুদ্ধে; আর অন্যদিকে আধুনিক যুগের আরেক নারী – বিদ্যাধরী; পুরুষের অক্ষম অহঙ্কারের সামনে হেরে গিয়ে যাকে ডুবে যেতে হয় অবসাদের অন্ধকারে, আর পথশিশুদের শিক্ষাদানের মধ্যেই যে খুঁজে নেয় মুক্তির পথ। গল্পের প্লট মূলত একটি ওষুধের ফর্মুলা নিয়ে বিদেশী কোম্পানীর সাথে দেশীয় একটি ছোট আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানের আইনি লড়াইকে নিয়ে কেন্দ্রীভূত। এই লড়াইয়ের মধ্যে প্রধানতম উপাদান হিসেবে এসেছে বেহুলার গল্প – এসেছে খনার বচনের তাৎপর্য। লিখতে লিখতে লেখক ছুঁয়ে গিয়েছেন ইতিহাস, জ্যোতিষ, বাংলার তাঁতশিল্প, প্রবাদ-প্রবচন এবং আরো অনেককিছু। প্রীতমবাবুর প্রতিটি লেখার পিছনে যে কতখানি পরিশ্রম ও সুবিশাল গবেষণা থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই লেখাতেও তার ব্যত্যয় হয়নি। গল্পের গতি চমৎকার, প্রাঞ্জল ভাষায় বর্ণিত এতগুলি কঠিন বিষয় একসাথে বুঝতে একটিবারো হোঁচট খেতে হয়না। চরিত্রগুলিতে গতিময়তা রয়েছে- মাধবী, নমিতা, আরুষি – সকলের গল্প যেন বারবার খনা ও বরাহমিহিরের প্রাচীন আখ্যানকেই বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত করে। এবার আসি পাঠপ্রতিক্রিয়ায়। আমি প্রীতম বাবুর লেখার মস্ত ফ্যান। প্রথমবার পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল পড়ে রীতিমত ছিটকে গিয়েছিলাম। কিন্তু একদম সৎভাবে বলতে গেলে সেই ম্যাজিক এই গল্পে পেলাম না। এই গল্পে উপাদান সবরকমই মজুদ ছিল,পরিশ্রমও নিতান্ত কম ছিল না। কিন্তু তাসত্ত্বেও গল্প যেন ঠিকমতো দানা বাঁধলো না। গল্পের টানে ভেসে গিয়ে পড়তে পড়তে যেন কখনো কখনো মনে হচ্ছিল, তথ্যের বিপুল সমাহারের মধ্যে গল্পের নিজস্ব চলন হারিয়ে যাচ্ছে। ফলত উদরপূর্তি হল বটে, কিন্তু রসনাতৃপ্তি হল না। বিশেষত বেহুলার গল্পটি বড়ই আরোপিত মনে হয়েছে আমার। তার কারণ হয়তো কিছুটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সাথে ফলিত জ্যোতিষ, ললাটলিখন, গ্রহনক্ষত্রের স্থান দেখে ভাগ্যের বিচার ইত্যাদি ধারণার বিশাল অমিল; উপন্যাসের নমিতা চরিত্রটির মতন আমারও অবিশ্বাসী মন অর্ধেক ঘটনা মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু সেই অংশটুকু ছেড়ে দিয়েও যেন এই কাহিনীকে কৃত্রিম মনে হল। অষ্টাদশ শতকের প্রেক্ষাপটে রচিত কাহিনীবিন্যাসে ঐতিহাসিকভাবে সমস্ত উপাদান যথাযথ থাকা সত্ত্বেও বেহুলার চরিত্রচিত্রণে যেন কোথায় ফাঁকি রয়ে গেল। সেইযুগের সতীভ্রষ্টা বিধবা এক বিদুষী নারীর সমাজসংস্কারের বিরুদ্ধে যে লড়াইয়ের চিত্র মনে গেঁথে থাকে তার প্রতিফলন বেহুলার মধ্যে পেলাম না। আধুনিক প্রেক্ষাপটের গল্পটি তুলনায় ভালো লেগেছে, ভালো লেগেছে প্রত্যেকটি নারীর নিজস্ব লড়াইয়ের ভিন্নরূপ। পেটেন্টের অধিকার নিয়ে আইনি লড়াই এই গল্পের মেরুদন্ড- এবং সেখানে শেষ অবধি রোমাঞ্চ ধরে রেখেছেন লেখক। তবুও কোথায় যেন মনে হল শেষে গিয়ে বড্ড সহজেই সব শেষ হয়ে গেল – কোর্টরুমের লড়াই আরো জোরদার হওয়ার সম্ভবনা ছিল। তাছাড়া উপন্যাসে জন্মান্তরের প্রসঙ্গ এসেছে এবং অবধারিতভাবে প্রাচীন প্রেক্ষাপটের চরিত্রগুলোকে সাম্প্রতিক চরিত্রদের সাথে জন্মান্তরের সুতো দিয়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে - যা আমার কিছুটা কৃত্রিম মনে হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু চরিত্রের সংলাপে অতিরিক্ত ‘ইনফো-ডাম্পিং’ করা হয়েছে, যা আমার মতে গল্পের স্বাভাবিক ধারাকে বাধা দিয়েছে। তবে গল্পের শেষপ্রান্তে এসে সত্যিকারের তৃপ্তিতে ভরে ওঠে মন – যখন বিদ্বান এসে মাথা নত করে বিদুষীর সম্মুখে, জয় হয় সত্যের। বিদ্বান ও বিদুষী আমার পড়া প্রীতম বসুর দুর্বলতম উপন্যাস। আমার যে উপন্যাসটি ভালো লাগেনি তা একদমই নয়, তবে লেখকের প্রত্যেকটি লেখায় যে এক্স ফ্যাক্টর থাকে – সেটার অভাব এখানে বোধ করলাম। আসলে লেখকের নাম প্রীতম বসু বলেই প্রত্যাশার পারদটা অনেকটা উপরে থাকে, সামান্য বিচ্যুতিই বড় হয়ে চোখে পড়ে। তবে বিদুষী খনাকে নিয়ে এমন তথ্যমূলক লেখা বোধহয় সাহিত্যজগতে খুব একটা নেই, খনার অস্তিত্ব সম্পর্কীত যাবতীয় গবেষণাকে গল্পের আকারে এত সুন্দর বিশ্লেষণই বা কোথায় আছে। বঙ্গসাহিত্যের জগতে এই বই তাই আলাদা স্থান দাবী করে।
ভারতের অবদানটা কি ? এই বিষয়ে অনেক তথাকথিত মুক্তমনস্ক মানুষ ব্যঙ্গ করে বলে থাকে, "যা কিছু বিদেশ আবিষ্কার করছে তার সবই আমাদের *ব্যাদে* আছে!" তাদের কাছে ভারতের কোন প্রাচীন আবিষ্কারের কথা যদি বলা হয়, তারা তা নিয়ে বিদ্রুপ করতে শুরু করে দেবে। কিন্তু সেই একই জিনিস যদি বিদেশ একটা নতুন প্যাকেজে ভরে ভারতেই বিক্রি করার চেষ্টা করে, তাহলে সেই একই দল হাততালি দিতে শুরু করবে। এটা শুধু হিপোক্রেসি নয়, হীনমন্যতাও। আর সেই হীনমন্যতাকে কাজে লাগিয়েই, বিদেশ হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে চলেছে আর তার জন্য ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
সাপের বিশ্বের আয়ুর্বেদিক ওষুধ আমাদের দেশে অনেক পুরনো কাল থেকেই চলে আসছে। কিন্তু সেই ওষুধের ফর্মুলা চুরি করে বিদেশি কোম্পানি অ্যামফার্মা এক বিশাল ব্যবসা শুরু করে বসে এবং সেই বিষয়ে পেটেন্টও নিয়ে নেয়, অর্থাৎ এটি তাদের আবিষ্কার বলে তারা দাবি করে। আর এই বিষয়ে সাহায্য করে একজন ভারতীয়, তথা বাঙালি। ভারতীয় কোম্পানি সুশ্রুত, যা সেই ওষুধ মার্কেটে বিক্রি করে আসছিল, তাদের উপরেই অ্যামফার্মা উল্টে কেস দিয়ে বসে। এবার এই দুই কোম্পানির মধ্যে যে আইনি যুদ্ধ শুরু হয়, সেটাই হল এই বইয়ের প্রেক্ষাপট।
প্রীতম বসু স্যারের বই সম্বন্ধে আমরা এটুকু জানি, ওনার লেখা মানেই সম্পূর্ণ নতুন কিছু। সেই বইতে থাকে অজানা অনেক ইতিহাসের তথ্য। এবং দুটি ভিন্ন সময়কালের ঘটনা একই সাথে চলতে থাকে। এই বইয়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আমরা বাঙালিরা অনেকেই খনার অস্তিত্ব স্বীকার করিনা। কিন্তু অবাঙালিরা কোনদিনও বরাহমিহিরের অস্তিত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলেনি। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা। খনার মতো বিদুষী নারী কিভাবে অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছিল, সেই ঘটনা আজকে অনেকেই ভুলতে বসেছে। অনেকেরই অজানাও। তাই আমাদের গৌরবের ইতিহাসকে আমাদের সামনে ধরে তুলে ধরে এই বই। আজ থেকে ৩০০ বছর আগে, ধুলস গ্রামের বেহুলা কিভাবে খনার জীবন ও মেধা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সতীদাহের মতো কুসংস্কারের বিরোধিতা করে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যায় ও জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করে তার আখ্যান এটাই প্রমাণ করে যে, যুগে যুগে একই মহান সত্তা বারবার ফিরে আসে একই উদ্দেশ্য নিয়ে।
এই উপন্যাসের যে দুই সমান্তরাল কাহিনি দুটোই সমানভাবে থ্রিলে ভরপুর। আর এইজন্যই এই বইয়ের আড়াইশো পৃষ্ঠা আমি পড়েছি একই দিনে। এর আগে কোন বই যদি এইভাবে পড়ে থাকি, তবে তা হল "প্রাণনাথ হৈও তুমি"। গল্পের বুনন এতটাই শক্তিশালী যে কাজের ফাঁকেও এই বই বারবার হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছি।
আমাদের বাংলার বিভিন্ন প্রবাদ ও তার সত্যতা মূর্ত হয়ে ওঠে এই কাহিনীতে। সাথে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই উপন্যাসের এক মূল প্রসঙ্গ হিসেবে ধরা দিয়েছে এবং তা হল পুরুষতন্ত্র। কিভাবে পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করে বিভিন্ন সময়ে বিদুষীরা জয়লাভ করেছে এই বই তারই কথা বলে। তবে আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি বিশাল ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে পাশ্চাত্য মানেই মুক্তমনা এবং প্রাচ্য মানেই সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন। সেই মিথও এই বইয়ে ভেঙেছেন লেখক। আমাদের দেশে বিবাহের সময় আদিকালে পুরুষ পক্ষকে পণ দিতে হতো কিন্তু বর্তমানে যে পণপ্রথা আমরা দেখি তা আসলে ব্রিটিশ প্রথা কারণ সেখানে নারী পক্ষকে পণ দিতে হতো। অনেকেই হয়তো জানে, ইউরোপে বহু বছর ধরে উইচ হান্টিং হয়ে এসেছে। মেয়েদেরকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। এটি সেই সব মেয়েদের সাথে করা হতো যারা যুক্তিবাদী হত ও সমান অধিকারের জন্য লড়তো। এসবই প্রমাণ করে পুরুষতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট কাঁটাতারের মধ্যে সীমিত নয়। এ এক বিশ্বব্যাপী রোগ!
আমাদের সমাজ ও তার সাথে যে অঙ্গাঙ্গীভাবে হিন্দুধর্ম জড়িয়ে আছে তা খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। যেমন আমাদের প্রতিটি মাসের নাম বিভিন্ন নক্ষত্র থেকে আসে; বিভিন্ন প্রথা, জায়গার নাম নানা দেবদেবীর নাম থেকে আসে। অর্থাৎ বাংলার সবকিছু সাথেই ঠাকুর দেবতা জড়িয়ে। আমাদের বাংলার বিভিন্ন অজানা ইতিহাস যেমন আগে কলকাতার ম্যাপ কেমন ছিল, গঙ্গার গতিপথ কেমন ছিল, কলকাতা চৌরঙ্গীর নাম আসলে কোথা থেকে এসেছে এরকম আরো অনেক কিছু। এই বইয়ের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, বইটিতে কয়েকটি ছবি আছে। জ্যোতিষবিদ্যা এই উপন্যাসের একটি বড় অঙ্গ।
বেহুলা, মাধবী, আরুষি ,নমিতা, বিদ্যাধরী, ধন্বন্তরি কবিরাজ, তথাগত, পৃথুযশ, গগন, রুপা, অমৃতা এরকম প্রচুর চরিত্রের সম্ভার আমরা দেখতে পাই। বেহুলার চরিত্র নিঃসন্দেহে ভালো লেগেছে কিন্তু সবচেয়ে বেশি আমি সাপোর্ট করেছি মাধবী বসাকের চরিত্রকে। যেভাবে হোক ওনাকে কেসটা জিততেই হবে এটাই ভেবে এসেছি। আমার নিজের সারনেমের চরিত্র প্রথমবার উপন্যাসে দেখলাম বলে নয়, চরিত্রটি সত্যি দারুণ। এছাড়া বিদ্যাদির চরিত্রও আমার বেশ লেগেছে। সমীহ করার মত চরিত্র।
কলেজ পলিটিক্স ও র্যাগিং যে কি ভয়ংকর হতে পারে তাও লেখক দেখিয়েছেন। ইতিহাস, বিজ্ঞান, আইন, রাজনীতি, জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা - কী নেই বইতে।
ওনার আগের বইটি উনি উৎসর্গ করেছিলেন মা সরস্বতীকে। এই বইটি উৎসর্গ করেছেন মহাদেবকে। যেহেতু বইটি চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে আর মহাদেবকে বৈদ্যনাথ ও পশুপতিনাথ বলা হয়, সেটাই কারণ বলে মনে হয়েছে আমার।
সবশেষে সেই কথাই বলি যেটা আমি আগেও অনেকবার বলেছি, বর্তমান সময়ের আধুনিক লেখকদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক প্রীতম বসু স্যার। ওনার বই এরকম অতুলনীয় ও অসাধারণ হবে, সেটাই প্রত্যাশিত।
বইটার শেষ পাতাটা ওল্টানোর পর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। ঘরের আলো নিভিয়ে জানলা দিয়ে রাতের আকাশ দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সমাজ কি খুব বেশি এগোতে পেরেছে? নাকি চারপাশের এই জাঁকজমকের নীচে এখনো ১৭৩৬ সালের সেই অন্ধকার সমাজটাই লুকিয়ে আছে?
গল্পের শুরুতেই লেখক আমাদের হাত ধরে এক অদ্ভুত টাইম মেশিনে বসিয়ে দেন। তারপর হুস করে আমাদের নিয়ে যান ১৭৩৬ সালের সেই গা ছমছমে অতীতে, যেখানে চিতাগ্নির ধোঁয়া আর ঢাকের আওয়াজে চাপা পড়ে যাচ্ছিল কত মেয়ের বাঁচার আকুতি। বেহুলা নামের সেই মেয়েটি, যে সতীদাহের জলন্ত চিতা থেকে কোনোমতে নিজেকে বাঁচাতে পেরেছিলো, তার জীবনের পরবর্তী প্রতিটি মুহূর্ত পড়তে পড়তে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। আর ঠিক তার সমান্তরালে লেখক আমাদের ফিরিয়ে আনেন ২০১৯ সালে, যেখানে অ্যাডভোকেট মাধবী বসাক, বিদ্যাধরী আর নমিতা লড়ছে এক অদ্ভুত কঠিন লড়াই। তাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমাদের শৈশবে চেনা 'খনা' কোনো কাল্পনিক রূপকথা বা লোকগাথা নয়, বরং রক্তমাংসের এক বাস্তব ঐতিহাসিক চরিত্র, যাকে সমাজ শাস্তি দিয়েছিল শুধুমাত্র মেধাবী হওয়ার অপরাধে। আর এই দুটো সময়ের জটিল আবর্তকে যারা জীবন্ত করে তুলেছে, তারা হলো বইটির এক-একটি অসাধারণ পার্শ্বচরিত্র। যেমন পাখমারা গণক, যেমন বচনপিসি, সাহেব, ডাকাতদল, জমিদার এছাড়া আরও অনেকে। এদের গণনা, চালচলন আর চারপাশের পরিবেশ তৈরিতে প্রীতম বাবু যে অবিশ্বাস্য গবেষণার ছাপ রেখেছেন, তা পড়তে পড়তে সত্যিই থমকে যেতে হয়। বচনপিসির মতো চরিত্র গল্পের আবহকে মাটির গন্ধ আর এক লোকায়ত ঐতিহ্যে ভরিয়ে তোলে।
বইটার পাতা যত উল্টেছি, আমার মনের ভেতর একটা অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হচ্ছিল। সতেরো শতকের বেহুলা আর একুশ শতকের বিদ্যাধরী, এই দুই নারীর মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় তিনশো বছরের। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, তাদের লড়াইয়ের ময়দানটা বিন্দুমাত্র বদলায়নি। বেহুলাকে লড়তে হয়েছিল সেই সময়ের অন্ধ কুসংস্কার আর পুরুষতান্ত্রিক ফতোয়ার বিরুদ্ধে। আর বিদ্যাধরীকে লড়তে হয়েছে আজকের দিনের আধুনিক পোশাক পরা, শিক্ষিত সমাজের অহংকার আর নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে। খনার জিভ কেটে নেওয়ার সেই আদিম নিষ্ঠুরতা যে আজও আমাদের মানসিকতায় রূপ বদলে বেঁচে আছে, প্রীতম বাবু সেটা খুব সূক্ষ্মভাবে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনকি বিদেশেও যে এই জিনিস প্রচলিত ছিলো সেকথা উল্লেখ করতে লেখক ভোলেননি।
সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে লেখকের লেখার পরিমিতিবোধ। বইটাতে আইন, জ্যোতিষবিদ্যা, কলেজ রাজনীতি কিংবা প্রাচীন পুঁথির মতো এমন অনেক খটমটে বিষয় আছে, যা একটু উনিশ-বিশ হলেই ইতিহাস বা গবেষণার শুকনো তথ্যে ভরা বই হয়ে যেতে পারত। কিন্তু লেখক এত সহজ, সাবলীল আর মায়াবী পদ্ধতিতে গল্পটা বুনেছেন যে, কোথাও খেই হারিয়ে যায় না। প্রতিটি চরিত্র এত জীবন্ত যে, মনে হয় নমিতা, বেহুলা, তথাগত, ধন্বন্তরী কবিরাজ এরা সকলেই আমাদের খুব চেনা কেউ। তাদের চোখের জল যেমন মন ভারী করে দেয়, তেমনি তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জেদটা নিজের অজান্তেই অনুপ্রেরণা যোগায়।
এই রকমের বই আমার খুব পছন্দের যেখানে গল্পের ভেতরে ডুবে গিয়ে নিজের ভাবনাকে একটু উস্কে দেওয়ার জায়গা থাকে। এই বইটা আমার বুকশেলফের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
উপন্যাসটির নাম "বিদ্বান ও বিদুষী" না হয়ে "বিদুষী ও বিদ্বান" হওয়া উচিত ছিল। বিদুষীদের জয়গান গাওয়া বইয়ের নামে পুরুষবাচক শব্দটি আগে না আনাই যুক্তিযুক্ত হতো। খনা, বেহুলা, বিদ্যাধরী দাস, মাধবী বসাক, নমিতা সান্যাল, বচনপিসি, রূপা -- এসব বিদুষীদের মেধা, কৌশল, একনিষ্ঠতার কাহিনি নিয়েই উপন্যাসটি রচিত। মূলত ভারতের আয়ুর্বেদ ওষুধের সাথে আমেরিকার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির দ্বন্দ্বের আলোকে বিদুষী বাঙালি নারী খনাকে এই উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। আরও গভীরে গিয়ে বলতে গেলে আমাদের সমাজে যোগ্য নারীকে তার যোগ্যতার অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ের উদাহরণ এ বইয়ের পাতায় পাতায়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে নারীর নিজস্ব প্রতিভা,নিজস্ব সাধনা, নিজস্ব দক্ষতা, যোগ্যতা ও সাহস প্রতিভাত করা, প্রতিষ্ঠা করার নারীবাদী সংগ্রামের চিত্র পেয়েছি এই বইটিতে।
প্রীতম বসুর লেখার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যথারীতি দুই শতাব্দীর কাহিনি সমান্তরাল ভাবে বিবৃত হয়েছে। একটির সময় বর্তমান শতাব্দী ও আরেকটি অষ্টাদশ শতাব্দী। এতে ঐতিহাসিক ঘটনা আছে, রহস্য আছে, কিছু গবেষণা আছে, কিছু কল্পনা আছে, আর আছে আবহমান কাল থেকে প্রচলিত ভেষজ উপাদানের জয়গান, গুণগান।
পড়ুন। বই পড়ুন। মনের মরণ প্রতিরোধে বই পড়ুন। মনের প্রতিষেধক টিকা হলো বই পড়া।
ইদানিং স্বাস্থ্যগত কারণে বাসা থেকে বের হতে পারছি না এবং সৌভাগ্যক্রমে অনেক বড় বড় উপন্যাস পড়তে ভালো লাগছে। সময় ও ভালো লাগার সমন্বয়ে একান্তে বইয়ের সাথে উপভোগ করার সুযোগ হচ্ছে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রীতম বসুর ৪৫০ পৃষ্ঠার বিদ্বান ও বিদুষী নামক থ্রিলার ক্যাটাগরির উপন্যাসটি পড়লাম । উপন্যাসটির নাম "বিদ্বান ও বিদুষী" না হয়ে "বিদুষী ও বিদ্বান" হওয়া উচিত ছিল। বিদুষীদের জয়গান গাওয়া বইয়ের নামে পুরুষবাচক শব্দটি আগে না আনাই যুক্তিযুক্ত হতো। খনা, বেহুলা, বিদ্যাধরী দাস, মাধবী বসাক, নমিতা সান্যাল, বচনপিসি, রূপা -- এসব বিদুষীদের মেধা, কৌশল, একনিষ্ঠতার কাহিনি নিয়েই উপন্যাসটি রচিত। মূলত ভারতের আয়ুর্বেদ ওষুধের সাথে আমেরিকার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির দ্বন্দ্বের আলোকে বিদুষী বাঙালি নারী খনাকে এই উপন্যাসে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। আরও গভীরে গিয়ে বলতে গেলে আমাদের সমাজে যোগ্য নারীকে তার যোগ্যতার অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ের উদাহরণ এ বইয়ের পাতায় পাতায়।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে নারীর নিজস্ব প্রতিভা,নিজস্ব সাধনা, নিজস্ব দক্ষতা, যোগ্যতা ও সাহস প্রতিভাত করা, প্রতিষ্ঠা করার নারীবাদী সংগ্রামের চিত্র পেয়েছি এই বইটিতে।
প্রীতম বসুর লেখার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যথারীতি দুই শতাব্দীর কাহিনি সমান্তরাল ভাবে বিবৃত হয়েছে। একটির সময় বর্তমান শতাব্দী ও আরেকটি অষ্টাদশ শতাব্দী। এতে ঐতিহাসিক ঘটনা আছে, রহস্য আছে, কিছু গবেষণা আছে, কিছু কল্পনা আছে, আর আছে আবহমান কাল থেকে প্রচলিত ভেষজ উপাদানের জয়গান, গুণগান।
বিদ্বান বনাম বিদুষী: সময়ের স্রোতে নারীমেধার অমর যাত্রা
প্রীতম বসুর 'বিদ্বান বনাম বিদুষী' (২০২৫ সালে প্রকাশিত) ঐতিহাসিক ফিকশনের সীমানা ছাড়িয়ে দর্শনের গভীরে ডুব দিয়েছে। এই দীর্ঘ উপন্যাসটি কেবল একটি অসাধারণ থ্রিলার নয়, বরং একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ম্যানিফেস্টো, যা প্রাচীন খনার 'বচন' থেকে আধুনিক আদালতের করিডর পর্যন্ত বিস্তৃত। উপন্যাসটি দ্বৈত কাঠামোর উপর নির্মিত, প্রাচীন ভারতের ধুলোমাখা গ্রাম থেকে সমকালীন কলকাতার কর্পোরেট যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত। উপন্যাসের মূল কাঠামো হলো দুটি সমান্তরাল কাহিনির অসাধারণ সমন্বয়, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে একটি চক্রাকার গতি সৃষ্টি করেছে। প্রাচীন কাহিনি (প্রায় ষষ্ঠ শতাব্দী, বরাহমিহিরের যুগ) খনা নামক এক বিদুষীর উপর কেন্দ্রীভূত, যিনি জ্যোতিষ, চিকিৎসা এবং দার্শনিক জ্ঞানে পারদর্শী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবজ্ঞা ও নিপীড়নের শিকার। তাঁর 'বচন' একটি অদৃশ্য জ্ঞানের স্মৃতি, গ্রাম বাংলার লোককথা এবং প্রবাদের মাধ্যমে যা অমর হয়ে থাকে। এই কাহিনি পরবর্তীতে বেহুলা চরিত্রের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়, যিনি ৩০০ বছর আগে ধুলস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন, সতীদাহের মতো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং খনার অনুপ্রেরণায় জ্যোতিষবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন। খনা, বেহুলা এবং বিদ্যাধরীর মতো চরিত্রগুলি যেন পুনর্জন্মের সুতোয় বাঁধা, প্রত্যেকেই নিজস্ব যুগে বিদ্যা এবং সত্যের জন্য লড়াই করেন। উপন্যাসটি শুধুমাত্র বিদ্বানের অহংকার বনাম বিদুষীর অদম্য সাহসের সংঘর্ষ নয়, বরং আয়ুর্বেদের প্রাচীন জ্ঞান বনাম আধুনিক লোভের এক মহাকাব্যিক দ্বন্দ্বও খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছে।
এই উপন্যাসের আধুনিক কাহিনি একটি কর্পোরেট যুদ্ধের চারপাশে আবর্তিত। ভারতীয় কোম্পানি সুশ্রুত (যা আয়ুর্বেদিক সাপ-কামড়ার ওষুধ 'বিষহারী' বিক্রি করে) বনাম বিদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট অ্যামফার্মা (যা একই ফর্মুলা 'ভেনাম'-এর নামে পেটেন্ট করে ৮ কোটি টাকার মামলা করে)। এই আইনি লড়াইয়ে মাধবী বসাক নামক এক আইনজীবী প্রধান ভূমিকা পালন করেন, যিনি কলেজ রাজনীতি, র্যাগিং এবং ব্যক্তিগত সংঘাতের মধ্য দিয়ে বায়োপাইরেসির (প্রাচীন জ্ঞানের চুরি) প্রমাণ সংগ্রহ করেন।
উপন্যাসের দুটি কাহিনি ইন্টারকানেক্টেড, খনার জ্যোতিষীয় গণনা মাধবীর আইনি যুক্তির সাথে মিলে যায়, এবং প্রাচীন প্রবাদ (যেমন সাপ-কামড়ার লোকচিকিৎসা) আধুনিক পেটেন্ট যুদ্ধের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। গল্পের এই কাঠামো প্রতিধ্বনিত করে, যে ইতিহাস কেবল অতীত নয়, বরং বর্তমানের নৈতিক যুদ্ধের অস্ত্র। লেখক এখানে দেখান যে, জ্ঞানের স্রোত কখনোই শুকায় না – এটি চক্রাকারে ফিরে আসে।
এই উপন্যাসটির অসাধারণত্ব তার বহুস্তরীয় চরিত্রে, যা কেবল কাহিনি এগিয়ে নিয়ে যায় না, বরং ধীরে ধীরে সমাজের আয়না হয়ে ওঠে। খনা একটি আর্কিটাইপ – প্রাচীন ভারতের বিদুষী, যাঁর মেধা বরাহমিহিরের ছায়ায় লুকিয়ে থাকলেও ইতিহাসে স্থায়ী। তাঁর অভ্যন্তরীণ সংঘাত জ্ঞানের আনন্দ এবং সামাজিক অবজ্ঞার দ্বন্দ্ব। বেহুলা, খনার উত্তরসূরি, সতীদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে জ্যোতিষের মাধ্যমে নারীশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন, তাঁর চরিত্রে সমাজের শৃঙ্খল ভাঙার সাহস অভ্যন্তরীণ শক্তি থেকে উদ্ভূত। আধুনিক অংশে মাধবী বসাক পোস্টফেমিনিস্ট এক যোদ্ধা, কলেজ র্যাগিংয়ের শিকার থেকে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি। অন্যান্য চরিত্র যেমন বিদ্যাধরী (জ্ঞানের দেবী-সদৃশ), ধন্বন্তরি কবিরাজ (চিকিৎসার পুরুষতান্ত্রিক প্রতিনিধি), তথাগত (দার্শনিক সাক্ষী), আরুষি, নমিতা, পৃথুযশ, গগন, রুপা, অমৃতা – একটি পলিফোনিক কোরাস গড়ে তোলে। এই লেখা'জেন্ডার পারফরম্যান্স'কে অতিক্রম করে দেখায় যে লিঙ্গ শুধু পারফর্ম্যান্স নয়, ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব – বিদুষীরা 'বনাম' নন, বরং সমান্তরাল শক্তির প্রতীক। মাধবীর চরিত্রটি বিশেষভাবে নজর টানে, যা 'জিততেই হবে' এমন অনুভূতি দেয়।
উপন্যাসের কোর থিম হলো পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদুষীদের অমর সংগ্রাম, যা কেবল লিঙ্গভিত্তিক নয়, বরং বৈশ্বিক। বায়োপাইরাসি, প্রাচীন আয়ুর্বেদিক জ্ঞানের (সাপ-কামড়ার ওষুধ) চুরি করে পেটেন্ট নেওয়া – 'ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?'-এর প্রশ্নকে যেন পুনরুজ্জীবিত করে। লেখক এখানে দেখান যে, অ্যামফার্মার মতো কর্পোরেট জায়ান্ট হীনমন্যতার সুযোগ নেয়, যা 'নলেজ/পাওয়ার' ধারণাকে প্রতিফলিত করে – জ্ঞান কে নিয়ন্ত্রণ করে? প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিথ ভাঙা (পাশ্চাত্য=মুক্তি, প্রাচ্য=বন্ধন) এক কথায় অসাধারণ। সতীদাহের তুলনায় ইউরোপের উইচ হান্টিং (যুক্তিবাদী নারীদের পোড়ানো) দেখিয়ে পুরুষতন্ত্রকে 'বিশ্বব্যাপী রোগ' ঘোষণা করা হয়। পণপ্রথার উৎপত্তি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতায় খোঁজা পোস্টকলোনিয়াল থিওরির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলার প্রবাদ (যেমন লোকচিকিৎসা), জ্যোতিষ (নক্ষত্র-ভিত্তিক মাসের নাম), তৎকালীন হিন্দু সমাজের গঠন এবং কলকাতার প্রাচীন ম্যাপ – এসবের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতির 'লিভিং হেরিটেজ' খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসের লেখনশৈলী এক অসামান্য মিশ্রণ, ঐতিহাসিক নির্ভুলতা (বরাহমিহিরের গ্রন্থ, বাংলার প্রাচীন ভূগোল) এবং আধুনিক ডায়ালগের সজীবতা। এর ভাষা বাংলার সমৃদ্ধতা প্রদর্শন করে। প্রাচীন অংশে সংস্কৃত-মিশ্রিত, আধুনিকে কথ্য। স্ট্রিম অফ কনশাসনেস চরিত্রের মনে প্রবেশ করে, যখন থ্রিলারের গতি পাঠককে আটকে রাখে। ছবি-সমৃদ্ধ (জ্যোতিষীয় চিত্র) এবং গবেষণাভিত্তিক (কোনো অতিরিক্ত তথ্য নয়), এটি 'ডকু-ফিকশন'-এর পর্যায়ে উন্নীত, একইসাথে একটি চমৎকার থ্রিলারও। 'বিদ্বান বনাম বিদুষী' যেন 'MeToo' -এর পরবর্তী যুগে এক আয়না – নারী অধিকারের লড়াই চলছে, এবং এটি পাঠককে প্রশ্ন করে, আমরা কি খনা বা মাধবীর মতো সাহসী? এটি বাংলা সাহিত্যে ফেমিনিস্ট ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
প্রীতম বসুর 'বিদ্বান বনাম বিদুষী' একটি সময়ের সেতু, যা নারীমেধার অবিচ্ছিন্নতাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। 'বনাম' এক মিথ, বিদ্বান এবং বিদুষী একই মুদ্রার দুই পিঠ। উপন্যাসটি পড়ার পর প্রবাদগুলো নতুন অর্থ পায়, এবং পাঠক হিসেবে নিজেকে নতুন ভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা সকলে খনা, বেহুলা,মাধবী, বিদ্যাধরী – জয়লাভকারী। এই বই ইতিহাসের পুর্নলিখনের শক্তিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। বাঙলার বিস্মৃত এক গৌরবময় অধ্যায়ের অসাধারণ ইতিবৃত্ত লেখক তুলে ধরেছেন এই বইটিতে, এবং তা লেখকের সুদীর্ঘ অধ্যয়ন এবং গবেষণার ফসল তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
একথা অনস্বীকার্য যে বাংলার গৌরব আজ শুধু ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ ।সাহিত্য-সিনেমা-সংস্কৃতিতে মধ্যমেধার আস্ফালন। তবু সাহিত্যিক প্রীতম বসু নিজগুণে অনন্য। সাহিত্যের যে শীর্ণ ফল্গুধারা বয়ে চলেছে বাঙালির মননে, লেখক যেন উষ্ণ প্রস্রবণ হয়ে সেই মৃতপ্রায় নদীর জানান দিয়ে যান । ওনার প্রত্যেকটা বই এক একটা পিএইচডি থিসিস। ফিকশন- ননফিকশনের অদ্ভুত মিশেল । ইনস্টাগ্রাম রিলসের যুগে বইগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিবদ্ধ করে রাখতে পারে মনসংযোগ। সদ্য পড়ে শেষ করলাম “বিদ্বান বনাম বিদুষী”। আগের মতোই একইরকম ভালোলাগা। মোহাচ্ছন্ন অনুভূতি ।