Jump to ratings and reviews
Rate this book

বিদ্বান বনাম বিদুষী

Rate this book

Paperback

Published January 1, 2025

6 people are currently reading
57 people want to read

About the author

Pritam Basu

11 books75 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
22 (57%)
4 stars
12 (31%)
3 stars
4 (10%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 10 of 10 reviews
Profile Image for Shotabdi.
821 reviews199 followers
September 25, 2025
অনেক দিন অপেক্ষার পর যে বইটা হাতে এল, সেটা পড়ার পর অন্তত এটুকু বলা যায় যে অপেক্ষা সার্থক হয়েছে। সুখপাঠ্য, স্বচ্ছ কাহনী। পড়তে কোন বেগ পেতে হয় না।
টাইমফ্রেম মূলত দুটো, ইংরেজ আমলের গ্রাম আর বর্তমান কলকাতা।
জন্মান্তরবাদের থিওরি আছে। সেটায় চরিত্রগুলো সব আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
আর মূল বিষয় হচ্ছে-খনা। খনাকে নিয়ে এত চমৎকার একটা উপন্যাসের প্রয়োজন ছিল। স্কুলে থাকতে আমরাও পড়েছি, ' মঙ্গলে ঊষা বুধে পা যথা ইচ্ছা তথা যা' কিংবা ' কলা রুয়ে না কেটো পাত
তাতেই কাপড় তাতেই ভাত'
এইসব প্রবচন বানানো নাকি সত্যিই খনার সেই তর্কই বইয়ের মূল বিষয়বস্তু। এই বিষয়ের সাথেই অবতারণা ঘটে গেছে এক চিরায়ত তর্কাতর্কির। সেটা আর কিছুই না। নারীর উপর যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুরুষের অত্যাচারের।
খনার পান্ডিত্য অসহনীয় লাগায় তারই স্বামী বরাহমিহির খনার জিভ কেটে দেয়।
খনাকে উপজীব্য করে আরো অনেক পরের ভারতে আসে আরেক নারী, সেও জ্যোতিষশাস্ত্রে দড়। নাম তার বেহুলা। বেহুলার জবানেই আমরা খনার গল্প শুনি আর শুনি বেহুলার নিজের গল্পও। তবে বেহুলা আর ডেভিডের পরিণতিটা সম্পূর্ণ না হওয়া আমার চোখে এই উপন্যাসের একটা নেতিবাচক দিক।
বর্তমান সময়ে বিদেশী কোম্পানির ঔষধ এর পেটেন্ট আর বাঙলার পুরাকাল থেকে চলে আসা আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসা আর গবেষণার ক্লেশে উঠে আসে অন্যায়ভাবে হেরে যাওয়া এক বিদুষী নারীর উপাখ্যান।
খনা-মিহির, বেহুলা-সত্যাচার্য আর বিদ্যাধরী-পৃথুযশ তাই মিলে যায় এসে এক সুতোয়।
Profile Image for Biprateep Mandal.
22 reviews3 followers
April 24, 2025
এই বই সমস্ত সাহিত্যপ্রেমীর পড়া উচিত।

ইতি।
Profile Image for Amit Kumar Bala.
3 reviews1 follower
March 22, 2025
খুব কম সংখ্যক ব‌ই আছে যেগুলো পড়া শুরু করলে বোঝা যায় না কীভাবে পাতার পর পাতা দ্রুততার সঙ্গে পড়া শেষ হয়ে চলেছে। আবার পরে, এটুকু পরে, বাকিটা পরে পড়বো— এসব কথা মনেই আসে না। 'বিদ্বান বানাম বিদুষী' ঠিক এরকমই একটি রচনা লেখক প্রীতম বসুর, যা পাঠকের মনকে ডুবিয়ে রাখে ধারাবাহিক পাঠের মধ্যে।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,191 reviews387 followers
July 4, 2025
বিদ্বান বনাম বিদুষী—প্রীতম বসুর সর্বসাম্প্রতিক গ্রন্থ—নিঃসন্দেহে নিছক কোনও ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি নয়; বরং এটি এক জাগ্রত চৈতন্যযাত্রা, যেখানে ইতিহাসের গহ্বর, উপকথার কুয়াশা, আর একবিংশ শতাব্দীর ক্লান্ত, ক্লেদাক্ত বাস্তবতা একাকার হয়ে যায়। কালের পর্দা এখানে শুধু সরেই না, গলে যায়; অতীত ও বর্তমানের মধ্যবর্তী ফাটলে গজিয়ে ওঠে এক নতুন সাহিত্যিক ভূগোল।

উপন্যাসটি পড়ে ওঠার পর মনে হয়—খনা, বেহুলা, বিদ্যাধরীরা কেবল ইতিহাসের চরিত্র নয়, তারা আজও জীবন্ত; তারা আমাদের শহরে ঘুরে বেড়ায় ট্রেনের কামরায়, কোর্টরুমে, জ্যোতিষমন্দিরে, মেডিক্যাল ল্যাবে—প্রতিবাদে, গবেষণায়, প্রতিকথায়, এবং নিরব বিপ্লবের চোরা স্রোতে। এই বই তাই শুধু পাঠ্য নয়, পাঠকের মনে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিধ্বনি তুলবে—প্রশ্ন, ব্যথা, আর পুনর্জন্মের প্রত্যয়ে।

প্রীতম বসু এই উপন্যাসে যে তিনটি ভিন্ন কালের আখ্যানকে সমান্তরালে বুনে দিয়েছেন—তা নিছক একটি আখ্যানকৌশল নয়; বরং এটি এক সুগভীর রাজনৈতিক অবস্থান এবং ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক দর্শনের বহিঃপ্রকাশ। ১৩ শতকে খনা ও বরাহমিহিরের পৌরুষবাদী দ্বন্দ্ব, ১৮ শতকে বেহুলা ও সত্যাচার্যের মধ্যকার সতীত্ব বনাম স্বশক্তির লড়াই, এবং একবিংশ শতাব্দীর পৃথুযশ ও বিদ্যাধরীর কোর্টরুমে জ্ঞান ও অধিকারের প্রতিদ্বন্দ্ব—এই তিনটি আলাদা যুগ, আলাদা ভাষা, আলাদা সমাজতন্ত্র—তবু যেন একটিই প্রবাহমান প্রাচীন রক্তরেখা। যুগ বদলায়, প্রযুক্তি আসে, সমাজ শিক্ষিত হয়—কিন্তু বিদুষীকে ছায়ায় ফেলে রাখতে চাওয়া বিদ্বানের অন্তর্মুখী সংকীর্ণতা আজও অটুট থাকে। এই উপন্যাস সেই পুনরাবৃত্ত দমনচক্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করায় এক গর্জন—যেখানে খনা, বেহুলা, আর বিদ্যাধরী যেন একাত্ম, এক নারীচৈতন্য, যে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কণ্ঠরুদ্ধ হবার পরেও মুখ তুলে বলে—"আমি এখনো বচন বলি, এবং আমার কণ্ঠ এখনও স্পষ্ট।"

উপন্যাসের প্রাথমিক স্তম্ভটি দাঁড়িয়ে আছে খনার কণ্ঠে—যাঁর “বচন” আজও বাংলার কৃষিজীবন, রাশিফল, লোকপ্রবাদ ও দৈনন্দিন বিশ্বাসের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে, অথচ তাঁর জীবনচর্যাকে ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে এক বিপুল ঐতিহাসিক ধোঁয়াশা। সেই অন্ধকারেই প্রীতম বসু জ্বেলে দিয়েছেন এক প্রত্নতাত্ত্বিক আলো, যেটি ইতিহাসের শীতল স্তব্ধতাকে ছুঁয়ে জাগিয়ে তোলে স্পন্দিত সাহিত্য। খনার চরিত্রকে তিনি শুধুমাত্র পুনর্গঠিত করেননি, তাঁকে তিনি নির্মাণ করেছেন—একজন মহাজাগতিক বিদুষী রূপে, যিনি একাধারে নৃতাত্ত্বিক কৌতূহলের উপাদান, পুরাতাত্ত্বিক বিস্ময়, এবং এক জীবন্ত নারীমনস্ক লৌকিক শক্তি।

এই খনা একদিন হেঁটেছিলেন বরাহমিহিরের পিতৃ-ঈর্ষার নিচে, কিন্তু তিনিই পরে ফিরে আসেন বেহুলার ছদ্মবেশে সতীদাহের আঁচ থেকে পালিয়ে; আর ফিরে আসেন বিদ্যাধরীর প্রতিবাদী মুখ হয়ে, নমিতার বিচারবুদ্ধিতে, এমনকি এক হকারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও। এই ‘পুনর্জন্ম’ কেবল আধ্যাত্মিক নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক DNA—যেখানে বিদ্রোহ, স্মৃতি ও প্রতিভার উত্তরাধিকার বহন করে নারীচৈতন্য প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। এক খনার মুখ বন্ধ করলে, আরেক খনা উঠে দাঁড়ায়। কারণ সত্য, যুক্তি ও স্পষ্ট বাক্যকে থামানো যায় না—বরাহমিহিরের হাতেও নয়, আজকের পৃথুযশের হাতেও নয়।

দুটি বিশ্লেষণ :

১) বেহুলা বনাম খনা: পুনর্জন্ম, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের লৌকিক ব্যাকরণ

এই উপন্যাসে বেহুলা এবং খনা—দুজনেই শুধু নামমাত্র পুরাণ বা কিংবদন্তির চরিত্র নন, তাঁরা এক একটি সময়-উত্তীর্ণ চৈতন্যরূপ, যাঁরা লৌকিকতা আর নারীজাগরণের সম্মিলিত প্রতিরূপ। খনা তাঁর “বচন”-এর মধ্য দিয়ে যেমন প্রতিরোধের এক দার্শনিক ব্যাকরণ রচনা করেন, বেহুলা তাঁর জীবন-পাল্টানো পদক্ষেপ দিয়ে সেই ব্যাকরণকে ব্যবহার করেন। খনা ইতিহাসের গর্ভে প্রবেশ করেন যুক্তির শক্তি নিয়ে, আর বেহুলা ইতিহাসের সীমানা ভেঙে বেরিয়ে আসেন নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের অধিকার নিয়ে।

এই দুই চরিত্র যেন এক নারীকেন্দ্রিক পুনর্জন্ম-চক্রের দুই প্রান্ত—খনার তাত্ত্বিকতা আর বেহুলার প্রয়োগ। একজনে কথার বানে প্রতিবাদ করেন, অন্যজনে জীবনের স্রোতকে উল্টে দেন। সতীদাহের নিষ্ঠুরতা আর সমাজে নারীর জ্ঞানচর্চার উপরে চাপানো নিষেধাজ্ঞা—এই দুই নির্মমতা যখন বেহুলার জীবনে একসাথে আছড়ে পড়ে, তখনই তিনি হয়ে ওঠেন খনার প্রতিস্বর, এক পুনর্জাত বিদুষী। বেহুলার গ্রামে গণনার প্রতিভা পিতৃতন্ত্রের অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়ে, যা তাঁর প্রতি হিংস্রতা ও ভয়কে জন্ম দেয়। সমাজ তাঁকে শ্মশানে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তিনি পালিয়ে যান নৌকায় করে—এই প্রস্থানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতীক: বেহুলা কেবল সতী নন, তিনি খনার মতন এক নব্য গ্রহবিপ্র, যাঁর জ্ঞান ভবিষ্যৎ রচনার উপাদান।

এই স্তরেই প্রীতম বসু খনার পুনর্জন্মকে ভিন্ন এক মাত্রা দেন—অতীত থেকে আসা সেই বিদুষী আত্মা আবারও এক নবতর বোধে ফিরে আসে, গ্রামের নিরক্ষর মেয়েদের মধ্যেও যেন খনার ছায়া পড়ে। আর এই ধারাটিই বিস্তৃত হয়ে যায় বর্তমান পর্বে, যেখানে জ্যোতিষশাস্ত্রের মতই আয়ুর্বেদ, বচনের মতই পুঁথি, আর সৎ মমতার সঙ্গে প্রতারণার সংঘর্ষ—সবকিছু এসে মিলিত হয় এক জটিল, বহুপার্শ্বীয় আইনি লড়াইয়ে।

সুশ্রুত কোম্পানি ও অ্যামফার্মার মধ্যে চলা কেসটি কেবল প্রযুক্তি বনাম ট্র্যাডিশনের দ্বন্দ্ব নয়, এটি জাতীয় গর্ব বনাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সংঘর্ষও বটে। আয়ুর্বেদের গূঢ়তত্ত্ব, কবিরাজি ঐতিহ্য, ধন্বন্তরি বংশের শাস্ত্রজ্ঞান যখন একপ্রান্তে দাঁড়ায়, তখন তার বিপরীতে দাঁড়ায় বিশ্বাসঘাতক তথাগত—যার চরিত্র যেন সেই যুগের বরাহমিহিরেরই কর্পোরেট সংস্করণ। প্রেম আর বিশ্বাস যখন ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক, তখন তা আর নিছক পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়—তা হয়ে ওঠে এক জাতিগত লড়াই।

খনার বচনের মতোই—এই লড়াইও ভবিষ্যদ্বাণী করে। শুধু প্রতিশোধ নয়, এটি উত্তরাধিকার রক্ষার এক অলিখিত যুদ্ধ, যেখানে বচন, আয়ুর্বেদ, প্রেম ও প্রতিবাদ একসাথে হাত ধরাধরি করে চলে। আর এই চলার ছায়াতেই দেখা যায়—খনা, বেহুলা, বিদ্যাধরী—তাঁরা কেউই অতীত নন, তাঁরা একেকটি চলমান সত্য, বারবার ফিরে আসা প্রতিরোধ।

২) চরিত্র বিশ্লেষণ: বিদ্যাধরী, তথাগত, নমিতা, আহুজা

বিদ্যাধরী—তিনি কেবল একজন গবেষক নন, এক জীবন্ত প্রতিবাদ। ইতিহাস ও জ্যোতিষশাস্ত্রে পারদর্শী হলেও, তাঁর আসল শক্তি আত্মনির্মাণে। তাঁকে হয়তো একসময় প্রতিষ্ঠান নিঃস্ব করে দিয়েছিল, কিন্তু তবু তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ হয় না—তাঁর লেখা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর অবস্থানই হয়ে ওঠে এক মৌন বিদ্রোহ। বিদ্যাধরী যেন সেই খনার উত্তরসূরী, যাঁর জিভ না কেটে শুধু চেপে ধরা হয়েছে, কিন্তু যিনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের গবেষণাকেই করেছেন অস্ত্র। তাঁর চরিত্রে মেলে তপস্যা ও প্রতিবাদের সম্মিলিত রেখা—যা একইসাথে আধ্যাত্মিক ও বিপ্লবী।

তথাগত—ধন্বন্তরী কবিরাজের রক্তধারা বহন করেও, সে যেন বংশের আর্শীবাদ নয়, অভিশাপ। তাঁর চরিত্র এক জটিল লয়—প্রেমিক ও প্রতারক, প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন অথচ আদর্শশূন্য। কর্পোরেট লোভের এক জীবন্ত প্রতিমা, তথাগত সেইসব চরিত্রের প্রতিনিধি যাঁরা নিজেদের শিকড় বিকিয়ে দিয়ে ক্ষমতার কাছে মাথা নত করে। তথাগতকে ঘৃণা করা যায়, কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না—কারণ সে আমাদের সমাজের সেই বাস্তব ছায়া, যাঁরা প্রেমে চুমু খায় কিন্তু পেটেন্টে ছুরি বসায়।

নমিতা—এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী গবেষক, যিনি বচনপিসির এক আধুনিক অবতার, অথচ নিজেই নিজের দ্বিধা ও শঙ্কার ভিতরে আচ্ছন্ন। তিনি বিদ্যাধরীর পাণ্ডুলিপির রক্ষক, কিন্তু পৃথুযশের সামনে তাঁর ভঙ্গুরতা চোখে পড়ে। পাঠক বুঝে যান, জ্ঞান থাকলেই কি শক্তি আসে? নাকি শক্তি আসে স্থিতি ও নৈতিক দৃঢ়তা থেকে? নমিতা প্রশ্ন তোলেন, উত্তর দেন না—আর সেখানেই তাঁর চরিত্রের গভীরতা।

আহুজা—আইনজীবী হিসেবে মেধাবী, তীক্ষ্ণ ও চতুর, কিন্তু তাঁর চরিত্র কিছুটা রৈখিক। তিনি যেন এক কৌশলী টুল, যিনি গল্পে কনফ্লিক্ট বাড়াতে হাজির হন, কিন্তু নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্বের দিক থেকে কিছুটা ফাঁপা থেকে যান। তাঁর চরিত্রে যদি ব্যক্তিগত কোনো বয়ান যোগ হতো, তবে তিনি হয়ে উঠতেন তথাগতের এক কর্পোরেট প্রতিদ্বন্দ্বী, এখন যেটুকু রয়েছেন, তা কেবল আদালতের একটি অনিবার্য বিপক্ষ।

এই চারটি চরিত্র যেন একই নাটকের চারটি মৌলিক দিক:

ক) বিদ্যাধরী প্রতিরোধ,

খ) তথাগত প্রতারণা,

গ ) নমিতা দ্বিধা,

ঘ) আহুজা সংঘর্ষ।

আর তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মাধবী বসাক—কেবল একজন আইনজীবী নন, তিনি হলেন আধুনিক কালের খনার কণ্ঠস্বর, এক কথ্য প্রতিরূপ যিনি দলিল দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন বিদুষীকে ঘিরে সমাজের সেই পুরাতন, পুরুষতান্ত্রিক অবজ্ঞাকে। তিনি কোনও রূপকথার বচনপিসি নন, তিনি এক শাণিত যুক্তিবাদী নায়িকা, যাঁর অস্ত্র হল আইন, যাঁর বচন হল দলিল।

এই উপন্যাসে “বেহুলার খনা” নামক একটি বই, শুধু "সুশ্রুত" কোম্পানির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার আইনি অস্ত্রই নয়—এ এক প্রতীকি পুনর্জন্ম। এটি কেবল একটি পাণ্ডুলিপি নয়, বরং এক দগ্ধ অথচ দীপ্ত নারীকণ্ঠ, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও বলে চলে: জ্ঞান কোনো জাত, পেশা বা লিঙ্গের সম্পত্তি নয়—এটি উত্তরাধিকার, কিন্তু সেটি চূর্ণ করে ফিরেও আসতে পারে। খনার বচন ও বেহুলার স্মৃতি, সেই বিস্মৃত নারীকণ্ঠের পুনরারোহণ, যা একসাথে স্মৃতি, মিথ এবং পেটেন্ট আইনের মিটমাটে অদ্ভুতভাবে গাঁথা।

এই উপন্যাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক, সম্ভবত, ইতিহাস ও রাজনীতির দ্বৈত বিন্যাস—যেখানে একদিকে ইউরোপের উইচ-হান্টিং, ব্রিটিশ পণপ্রথা, কিংবা ঔপনিবেশিক বায়োপাইরেসির ধারাবাহিকতা দেখা যায়, আবার অন্যদিকে উপন্যাস ছড়িয়ে দেয় এক টেক্সচুয়াল ম্যান্ডালা—কলকাতার চৌরঙ্গি, প্রাচীন নদীপথ, জিভকাটা মন্দির, পুরনো পুঁথিঘর, বা গঙ্গার নিঃশব্দ প্রেক্ষাপটে হাজির হয় চন্দ্র ডাকাত, পাখমারা গণক, বিশে, ডেভিড সাহেব, আর আমাদের সকলের প্রিয় বচনপিসি।

তারা সবাই যেন এই পাঠভ্রমণের একেকটি বিন্দু, যাদের চারপাশ ঘিরে বুনে ওঠে বাংলার নারীকেন্দ্রিক জ্ঞানচর্চার এক অন্তর্লীন ভূগোল—যেখানে নারীরা মায়ের মতো শুধু জন্ম দেন না, জ্ঞান দেন, ভবিষ্যদ্বাণী করেন, কিন্তু তবুও সমাজ তাঁদের স্তব্ধ করতে চায়। সেই স্তব্ধতাকে টপকে “বেহুলার খনা” হয়ে ওঠে এক প্রামাণ্য জবাব, এক নারীবাদী নথি।

এইভাবেই উপন্যাসটি কেবল ‘কী হবে মামলায়?’ এই উত্তেজনায় আবদ্ধ থাকে না, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, এবং দার্শনিক চেতনায় মিশে গিয়ে তৈরি করে একরকম পাঠ-তীর্থ—যেখানে পাঠক শুধু গল্প পড়েন না, হারিয়ে যান এক মানসচিত্রে।

একটাই খটকা :

তবে একটি প্রশ্ন, একটি খটকা নিঃশব্দে মাথা তোলে—আহুজার মতো একজন বিরুদ্ধচরিত্র, যিনি মামলার গতি প্রকৃতি নির্ধারণে এত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর নির্মাণ আরও বেশি মনস্তাত্ত্বিক স্তর পেতে পারত। কোথাও কোথাও তাঁর চাতুর্য একরৈখিক, যেন কেবল ঘটনার পাটিগণিত মেলানোর এক গাণিতিক মুখ। ঠিক তেমনি, নমিতার একটি–দু'টি সিদ্ধান্ত—বিশেষত পৃথুযশের সামনে তাঁর আবেগতাড়িত স্বীকারোক্তি—আখ্যানের যুক্তিবিন্যাসে খানিকটা অসতর্ক ফাটল এনে দেয়, পাঠককে টেনে আনে বাস্তবের মাটিতে।

কিন্তু এই ছোট ছোট কাঁচের টুকরোগুলো উপন্যাসের দীপ্তিকে ম্লান করতে পারে না, কারণ গোটা আখ্যানটি এমন এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত—যেখানে সাহিত্যের কল্পনা, ইতিহাসের পাঠ, নারীবাদের অন্তর্দৃষ্টি, আয়ুর্বেদের বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্য, লৌকিক সংস্কৃতির মাটি, আর অধ্যাত্মবাদের আকাশ একসঙ্গে এসে দাঁড়ায় এক অলৌকিক সমবেত সুরে। এ এক মহাকাব্যিক সংহতি—যেখানে ত্রুটিরাও যেন পরিণতির অংশ, আর অপূর্ণতাও হয়ে ওঠে সম্পূর্ণতার ছায়াপথ।

শেষের কথা:

“বিদ্বান বনাম বিদুষী” কেবল একটি বই নয়, এটি এক প্রতীক—একটি যুগচিহ্ন, একটি জ্যোতির্বর্তুল, যা আমাদের বলে দেয়: প্রতিভা কখনও নিঃশেষ হয় না। সময়ের গহ্বর চিরে সে ফিরে আসে বারবার—খনা হয়ে, বেহুলা হয়ে, বিদ্যাধরী হয়ে, আর প্রতিবারই সে চ্যালেঞ্জ জানায় সেই সমাজকে, যে সমাজ কেবল “বিদ্বান”দের কণ্ঠে সম্মান সংরক্ষণ করে।

এমন এক সমাজে, যেখানে বিদ্যাধরীর কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায় পুরুষতান্ত্রিক গবেষণার গর্জনে, সেখানে “বিদুষী”-র বিদ্যা ঝলসে ওঠে এক অনিবার্য বিদ্যুৎসম্বরণে। যুগের পর যুগ ধরে, চৈতন্যের মেরুদণ্ডে কাঁপন তুলে, সে প্রশ্ন তোলে—জ্ঞান কি কেবল পাণ্ডুলিপির মধ্যে? না, তা বেঁচে থাকে প্রতিরোধের ভাষায়, প্রতিটি নিরুদ্ধ ইতিহাসের বুকে?

এই বইটা হাতে পেয়েছিলাম এক অদ্ভুত সময়ে—যখন মনে হচ্ছিল, নিজের ভিতরের আলো যেন নিভে আসছে। “বিদ্বান বনাম বিদুষী” আমার পড়ার টেবিলকে গবেষণার চাতাল করে তুলল। ডিঙাডুবি গ্রাম যেন পুনর্জীবন লাভ করলো আমার আত্মার মাটিতে—খুব ব্যক্তিগত, খুব কল্পনাতীত এক জায়গায়। মনে পড়ে গেল কলেজ পলিটিক্সে পিষে যাওয়া মেধাবী মুখ, রিসার্চের মাঝে থেমে যাওয়া একেকটা কণ্ঠ, আর সেই চিরন্তন যুদ্ধ—জ্ঞান বনাম দম্ভ, প্রেম বনাম লোভ, ক্ষমতা বনাম শ্রদ্ধা, বিদ্বান বনাম বিদুষী।

এই উপন্যাস আমাকে শুধু পড়তে বাধ্য করেনি, পুনর্জন্ম দিয়েছে আমায়। আমি যেন চিনে ফেলেছিলাম প্রতিটি চরিত্রকে—আমার মা, আমার সহপাঠিনী, আমার ছাত্রীরা, আমার সহ-গবেষক বন্ধুরা—সবাই যেন এক একটি খনা, যাঁরা যুগে যুগে নিজের জিভ হারিয়েও বচনের আগুন নেভাননি। সেই আগুনেই যেন আলোকিত হয় আমার চেতনা।

আমি ঋণী এই বইয়ের কাছে। এই অসামান্য, অপ্রতিরোধ্য, আর সম্ভবত এই সময়ের সবচেয়ে জরুরি চৈতন্যের কাছে।

১০/১০ না, তা ছাড়িয়ে যাওয়া এক অভিজ্ঞতা।

একবার নয়, বারবার পড়ার মত বই।

বিদ্বান তো অনেক, বিদুষী তো অমৃতস্রোতা। সেই স্রোতের মুখোমুখি হবার সাহস— আছে তো আপনাদের?

অলমতি বিস্তরেণ।
Profile Image for Arpan Kumar Basak.
22 reviews
May 19, 2025
ভারতের অবদানটা কি ?  এই বিষয়ে অনেক তথাকথিত মুক্তমনস্ক মানুষ ব্যঙ্গ করে বলে থাকে, "যা কিছু বিদেশ আবিষ্কার করছে তার সবই আমাদের *ব্যাদে* আছে!" তাদের কাছে ভারতের কোন প্রাচীন আবিষ্কারের কথা যদি বলা হয়, তারা তা নিয়ে বিদ্রুপ করতে শুরু করে দেবে। কিন্তু সেই একই জিনিস যদি বিদেশ একটা নতুন প্যাকেজে ভরে ভারতেই বিক্রি করার চেষ্টা করে, তাহলে সেই একই দল হাততালি দিতে শুরু করবে। এটা শুধু হিপোক্রেসি নয়, হীনমন্যতাও। আর সেই হীনমন্যতাকে কাজে লাগিয়েই, বিদেশ হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করে চলেছে আর তার জন্য ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

সাপের বিশ্বের আয়ুর্বেদিক ওষুধ আমাদের দেশে অনেক পুরনো কাল থেকেই চলে আসছে। কিন্তু সেই ওষুধের ফর্মুলা চুরি করে বিদেশি কোম্পানি অ্যামফার্মা এক বিশাল ব্যবসা শুরু করে বসে এবং সেই বিষয়ে পেটেন্টও নিয়ে নেয়, অর্থাৎ এটি তাদের আবিষ্কার বলে তারা দাবি করে। আর এই বিষয়ে সাহায্য করে একজন ভারতীয়, তথা বাঙালি। ভারতীয়  কোম্পানি সুশ্রুত, যা সেই ওষুধ মার্কেটে বিক্রি করে আসছিল, তাদের উপরেই অ্যামফার্মা উল্টে কেস দিয়ে বসে। এবার এই দুই কোম্পানির মধ্যে যে আইনি যুদ্ধ শুরু হয়, সেটাই  হল এই বইয়ের প্রেক্ষাপট।

প্রীতম বসু স্যারের বই সম্বন্ধে আমরা এটুকু জানি, ওনার লেখা মানেই সম্পূর্ণ নতুন কিছু। সেই বইতে থাকে অজানা অনেক ইতিহাসের তথ্য। এবং দুটি ভিন্ন সময়কালের ঘটনা একই সাথে চলতে থাকে। এই বইয়েও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

আমরা বাঙালিরা অনেকেই খনার অস্তিত্ব স্বীকার করিনা। কিন্তু অবাঙালিরা কোনদিনও বরাহমিহিরের অস্তিত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলেনি। এখানেই আমাদের ব্যর্থতা। খনার মতো বিদুষী নারী কিভাবে অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছিল, সেই ঘটনা আজকে অনেকেই ভুলতে বসেছে। অনেকেরই অজানাও। তাই আমাদের গৌরবের ইতিহাসকে আমাদের সামনে ধরে তুলে ধরে এই বই। আজ থেকে ৩০০ বছর আগে, ধুলস গ্রামের বেহুলা কিভাবে খনার জীবন ও মেধা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সতীদাহের মতো কুসংস্কারের বিরোধিতা করে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যায় ও  জ্যোতিষবিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করে তার আখ্যান এটাই প্রমাণ করে যে, যুগে যুগে একই মহান সত্তা বারবার ফিরে আসে একই উদ্দেশ্য নিয়ে।

এই উপন্যাসের যে দুই সমান্তরাল কাহিনি দুটোই সমানভাবে থ্রিলে ভরপুর। আর এইজন্যই এই বইয়ের আড়াইশো পৃষ্ঠা আমি পড়েছি একই দিনে। এর আগে কোন বই যদি এইভাবে পড়ে থাকি, তবে তা হল "প্রাণনাথ হৈও তুমি"। গল্পের বুনন এতটাই শক্তিশালী যে কাজের ফাঁকেও এই বই বারবার হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছি।


আমাদের বাংলার বিভিন্ন প্রবাদ ও তার সত্যতা মূর্ত হয়ে ওঠে এই কাহিনীতে। সাথে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই উপন্যাসের এক মূল প্রসঙ্গ হিসেবে ধরা দিয়েছে এবং তা হল পুরুষতন্ত্র। কিভাবে পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করে বিভিন্ন সময়ে বিদুষীরা জয়লাভ করেছে এই বই তারই কথা বলে। তবে আমাদের অনেকের মধ্যেই একটি বিশাল ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে পাশ্চাত্য মানেই মুক্তমনা এবং প্রাচ্য মানেই সংকীর্ণ মনোভাবাপন্ন। সেই মিথও এই বইয়ে ভেঙেছেন লেখক। আমাদের দেশে বিবাহের সময় আদিকালে পুরুষ পক্ষকে পণ দিতে হতো কিন্তু বর্তমানে যে পণপ্রথা আমরা দেখি তা আসলে ব্রিটিশ প্রথা কারণ সেখানে নারী পক্ষকে পণ দিতে হতো। অনেকেই হয়তো জানে, ইউরোপে বহু বছর ধরে উইচ হান্টিং হয়ে এসেছে। মেয়েদেরকে ডাইনি আখ্যা দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। এটি সেই সব মেয়েদের সাথে করা হতো যারা যুক্তিবাদী হত ও সমান অধিকারের জন্য লড়তো। এসবই প্রমাণ করে পুরুষতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট কাঁটাতারের মধ্যে সীমিত নয়। এ এক বিশ্বব্যাপী রোগ!


আমাদের সমাজ ও তার সাথে যে অঙ্গাঙ্গীভাবে হিন্দুধর্ম জড়িয়ে আছে তা খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। যেমন আমাদের প্রতিটি মাসের নাম বিভিন্ন নক্ষত্র থেকে আসে; বিভিন্ন প্রথা, জায়গার নাম নানা দেবদেবীর নাম থেকে আসে।  অর্থাৎ বাংলার সবকিছু সাথেই ঠাকুর দেবতা জড়িয়ে।
আমাদের বাংলার বিভিন্ন অজানা ইতিহাস যেমন আগে কলকাতার ম্যাপ কেমন ছিল, গঙ্গার গতিপথ কেমন ছিল, কলকাতা চৌরঙ্গীর নাম আসলে কোথা থেকে এসেছে এরকম আরো অনেক কিছু। এই বইয়ের আরেকটি বিশেষত্ব হলো, বইটিতে কয়েকটি ছবি আছে। জ্যোতিষবিদ্যা এই উপন্যাসের একটি বড় অঙ্গ।


বেহুলা, মাধবী, আরুষি ,নমিতা, বিদ্যাধরী, ধন্বন্তরি কবিরাজ, তথাগত, পৃথুযশ, গগন, রুপা, অমৃতা এরকম প্রচুর চরিত্রের সম্ভার আমরা দেখতে পাই। বেহুলার চরিত্র নিঃসন্দেহে ভালো লেগেছে কিন্তু সবচেয়ে বেশি আমি সাপোর্ট করেছি মাধবী বসাকের চরিত্রকে। যেভাবে হোক ওনাকে কেসটা জিততেই হবে এটাই ভেবে এসেছি। আমার নিজের সারনেমের চরিত্র প্রথমবার উপন্যাসে দেখলাম বলে নয়, চরিত্রটি সত্যি দারুণ। এছাড়া বিদ্যাদির চরিত্রও আমার বেশ লেগেছে। সমীহ করার মত চরিত্র।

কলেজ পলিটিক্স ও র‍্যাগিং যে কি ভয়ংকর হতে পারে তাও লেখক দেখিয়েছেন। ইতিহাস, বিজ্ঞান, আইন, রাজনীতি, জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা - কী নেই বইতে।

ওনার আগের বইটি উনি উৎসর্গ করেছিলেন মা সরস্বতীকে। এই বইটি উৎসর্গ করেছেন মহাদেবকে। যেহেতু বইটি চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে আর মহাদেবকে বৈদ্যনাথ  ও পশুপতিনাথ বলা হয়, সেটাই কারণ বলে মনে হয়েছে আমার।

সবশেষে সেই কথাই বলি যেটা আমি আগেও অনেকবার বলেছি, বর্তমান সময়ের আধুনিক লেখকদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক প্রীতম বসু স্যার। ওনার বই এরকম অতুলনীয় ও অসাধারণ হবে, সেটাই প্রত্যাশিত।

এটা পুরো ১০/১০ রিড! সবাইকে অনুরোধ করব পড়তে।

©Arpan Kumar Basak
Profile Image for Bratik Bandyopadhyay.
22 reviews
January 8, 2026
বিদ্বান বনাম বিদুষী: সময়ের স্রোতে নারীমেধার অমর যাত্রা

প্রীতম বসুর 'বিদ্বান বনাম বিদুষী' (২০২৫ সালে প্রকাশিত) ঐতিহাসিক ফিকশনের সীমানা ছাড়িয়ে তাত্ত্বিক দর্শনের গভীরে ডুব দেয়। এই ৪৪৮-পৃষ্ঠার উপন্যাসটি কেবল একটি অস��ধারণ থ্রিলার নয়, বরং একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক ম্যানিফেস্টো, যা প্রাচীন খনার 'বচন' থেকে আধুনিক আদালতের করিডর পর্যন্ত বিস্তৃত।
উপন্যাসটি দ্বৈত কাঠামোর উপর নির্মিত: প্রাচীন ভারতের ধুলোমাখা গ্রাম থেকে সমকালীন কলকাতার কর্পোরেট যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় কাঠামো হলো দুটি সমান্তরাল কাহিনির অসাধারণ সমন্বয়, যা সময়ের সীমানা অতিক্রম করে একটি চক্রাকার গতি সৃষ্টি করে। প্রাচীন কাহিনি (প্রায় ষষ্ঠ শতাব্দী, বরাহমিহিরের যুগ) খনা নামক এক বিদুষীর উপর কেন্দ্রীভূত, যিনি জ্যোতিষ, চিকিৎসা এবং দার্শনিক জ্ঞানে পারদর্শী হয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অবজ্ঞা ও নিপীড়নের শিকার। তাঁর 'বচন' – একটি অদৃশ্য জ্ঞানের স্মৃতি – গ্রাম বাংলার লোককথা এবং প্রবাদের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকে। এই কাহিনি বেহুলা চরিত্রের মাধ্যমে বিস্তৃত হয়, যিনি ৩০০ বছর আগে ধুলস গ্রামে খনার অনুপ্রেরণায় সতীদাহের মতো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং জ্যোতিষবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেন।

অন্যদিকে, আধুনিক কাহিনি একটি কর্পোরেট যুদ্ধের চারপাশে আবর্তিত। ভারতীয় কোম্পানি সুশ্রুত (যা আয়ুর্বেদিক সাপ-কামড়ার ওষুধ 'বিষহারী' বিক্রি করে) বনাম বিদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট অ্যামফার্মা (যা একই ফর্মুলা 'ভেনাম'-এর নামে প্যাটেন্ট করে ৮ কোটি টাকার মামলা করে)। এই আইনি লড়াইয়ে মাধবী বসাক নামক এক শিক্ষিতা আইনজীবী প্রধান ভূমিকা পালন করেন, যিনি কলেজ রাজনীতি, র‍্যাগিং এবং ব্যক্তিগত সংঘাতের মধ্য দিয়ে বায়োপাইরাসির (প্রাচীন জ্ঞানের চুরি) প্রমাণ সংগ্রহ করেন।
দুটি কাহিনি ইন্টারকানেক্টেড, খনার জ্যোতিষীয় গণনা মাধবীর আইনি যুক্তির সাথে মিলে যায়, এবং প্রাচীন প্রবাদ (যেমন সাপ-কামড়ার লোকচিকিৎসা) আধুনিক প্যাটেন্ট যুদ্ধের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। এই কাঠামো তাত্ত্বিকভাবে প্রতিধ্বনিত করে, যে ইতিহাস কেবল অতীত নয়, বরং বর্তমানের নৈতিক যুদ্ধের অস্ত্র। লেখক এখানে দেখান যে, জ্ঞানের স্রোত কখনোই শুকায় না – এটি চক্রাকারে ফিরে আসে, যেন হেগেলীয় ডায়ালেকটিকের থিসিস (প্রাচীন জ্ঞান), অ্যান্টিথিসিস (ঔপনিবেশিক চুরি) এবং সিনথেসিস (আধুনিক জয়)।

উপন্যাসের অসাধারণত্ব তার বহুস্তরীয় চরিত্রে, যা কেবল কাহিনি এগিয়ে নেয় না, বরং সমাজের আয়না হয়ে ওঠে। খনা একটি আর্কিটাইপ – প্রাচীন ভারতের বিদুষী, যাঁর মেধা বরাহমিহিরের ছায়ায় লুকিয়ে থাকলেও ইতিহাসে স্থায়ী। তাঁর অভ্যন্তরীণ সংঘাত জ্ঞানের আনন্দ এবং সামাজিক অবজ্ঞার দ্বন্দ্ব, যা সিমোন দ্য বোভোয়ারের 'দ্য সেকেন্ড সেক্স'-এর 'দ্য আদার' ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। বেহুলা, খনার অনুপ্রাণিত উত্তরসূরি, সতীদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করে জ্যোতিষের মাধ্যমে নারীশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন – তাঁর চরিত্র ফ্রয়েডীয় 'সুপারইগো'র মতো, যেখানে সমাজের শৃঙ্খল ভাঙার সাহস অভ্যন্তরীণ শক্তি থেকে উদ্ভূত।

আধুনিক অংশে মাধবী বসাক পোস্টফেমিনিস্ট যোদ্ধা – কলেজ র‍্যাগিংয়ের শিকার থেকে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি, তাঁর সংগ্রাম 'ফেমিনিজম ইজ ফর এভরিওয়ান'-এর মতো সকলের জন্য। অন্যান্য চরিত্র যেমন বিদ্যাধরী (জ্ঞানের দেবী-সদৃশ), ধন্বন্তরি কবিরাজ (চিকিৎসার পুরুষতান্ত্রিক প্রতিনিধি), তথাগত (দার্শনিক সাক্ষী), আরুষি, নমিতা, পৃথুযশ, গগন, রুপা, অমৃতা – একটি পলিফোনিক কোরাস গড়ে তোলে। এই লেখা'জেন্ডার পারফরম্যান্স'কে অতিক্রম করে দেখায় যে লিঙ্গ শুধু পারফর্ম্যান্স নয়, ঐতিহাসিক স্থায়িত্ব – বিদুষীরা 'বনাম' নন, বরং সমান্তরাল শক্তির প্রতীক। মাধবীর চরিত্রটি বিশেষভাবে নজর টানে, যা 'জিততেই হবে' এমন অনুভূতি দেয়।

উপন্যাসের কোর থিম হলো পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদুষীদের অমর সংগ্রাম, যা কেবল লিঙ্গভিত্তিক নয়, বরং বৈশ্বিক। বায়োপাইরাসি – প্রাচীন আয়ুর্বেদিক জ্ঞানের (সাপ-কামড়ার ওষুধ) চুরি করে প্যাটেন্ট – গায়ত্রী স্পিভাকের 'ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?'-এর প্রশ্নকে পুনরুজ্জীবিত করে। উপনিবেশিত জ্ঞান কি কখনো শোনা হয়? লেখক এখানে দেখান যে, অ্যামফার্মার মতো কর্পোরেট জায়ান্ট হীনমন্যতার সুযোগ নেয়, যা ফুকোর 'নলেজ/পাওয়ার' ধারণাকে প্রতিফলিত করে – জ্ঞান কে নিয়ন্ত্রণ করে? প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিথ ভাঙা (পাশ্চাত্য=মুক্তি, প্রাচ্য=বন্ধন) অসাধারণ। সতীদাহের তুলনায় ইউরোপের উইচ হান্টিং (যুক্তিবাদী নারীদের পোড়ানো) দেখিয়ে পুরুষতন্ত্রকে 'বিশ্বব্যাপী রোগ' ঘোষণা করা হয়। পণপ্রথার উৎপত্তি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতায় খোঁজা পোস্টকলোনিয়াল থিওরির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলার প্রবাদ (যেমন লোকচিকিৎসা), জ্যোতিষ (নক্ষত্র-ভিত্তিক মাসের নাম), হিন্দু সমাজের গঠন (দেবতা-সংযুক্ত ভূগোল, যেমন চৌরঙ্গীর উৎপত্তি) এবং কলকাতার প্রাচীন ম্যাপ – এসব তাত্ত্বিকভাবে বাংলা সংস্কৃতির 'লিভিং হেরিটেজ' প্রমাণ করে। উৎসর্গ মহাদেবকে (বৈদ্যনাথ হিসেবে চিকিৎসার দেবতা) নারীশক্তির সৃষ্টিগত দিককে স্মরণ করিয়ে দেয়।

উপন্যাসের লেখনশৈলী এক মিশ্রণ – ঐতিহাসিক নির্ভুলতা (বরাহমিহিরের গ্রন্থ, বাংলার প্রাচীন ভূগোল) এবং আধুনিক ডায়ালগের সজীবতা। ভাষা বাংলার সমৃদ্ধতা প্রদর্শন করে। প্রাচীন অংশে সংস্কৃত-মিশ্রিত, আধুনিকে কথ্য। স্ট্রিম অফ কনশাসনেস চরিত্রের মনে প্রবেশ করে, যখন থ্রিলারের গতি পাঠককে আটকে রাখে। ছবি-সমৃদ্ধ (জ্যোতিষীয় চিত্র) এবং গবেষণাভিত্তিক (কোনো অতিরিক্ত তথ্য নয়), এটি 'ডকু-ফিকশন'-এর পর্যায়ে উন্নীত, একইসাথে একটি চমৎকার থ্রিলারও।

এক কল টু অ্যাকশন 'বিদ্বান বনাম বিদুষী' 'MeToo' -এর পরবর্তী যুগে এক আয়না – নারী অধিকারের লড়াই চলছে, এবং এটি পাঠককে প্রশ্ন করে, আমরা কি খনা বা মাধবীর মতো সাহসী? এটি বাংলা সাহিত্যে ফেমিনিস্ট ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে।

বিদুষীর জয়গান – এক অমর ঘোষণা
প্রীতম বসুর 'বিদ্বান বনাম বিদুষী' এক মাইলফলক – এটি সময়ের সেতু, যা নারীমেধার অবিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করে। 'বনাম' এক মিথ, বিদ্বান এবং বিদুষী একই মুদ্রার দুই পিঠ। উপন্যাসটি পড়ার পর প্রবাদগুলো নতুন অর্থ পায়, এবং পাঠক নিজেকে খুঁজে পান। আমরা সকলে খনা, মাধবী – জয়লাভকারী। এই বই এক উপহার, ইতিহাসের পুনর্লিখনের শক্তি। অসাধারণত্ব এখানে – এটি পড়ে আর কখনো পুরুষতন্ত্রকে একইভাবে দেখা যাবে না।
11 reviews
July 3, 2025
একথা অনস্বীকার্য যে বাংলার গৌরব আজ শুধু ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ ।সাহিত্য-সিনেমা-সংস্কৃতিতে মধ্যমেধার আস্ফালন। তবু সাহিত্যিক প্রীতম বসু নিজগুণে অনন্য। সাহিত্যের যে শীর্ণ ফল্গুধারা বয়ে চলেছে বাঙালির মননে, লেখক যেন উষ্ণ প্রস্রবণ হয়ে সেই মৃতপ্রায় নদীর জানান দিয়ে যান । ওনার প্রত্যেকটা বই এক একটা পিএইচডি থিসিস। ফিকশন- ননফিকশনের অদ্ভুত মিশেল । ইনস্টাগ্রাম রিলসের যুগে বইগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিবদ্ধ করে রাখতে পারে মনসংযোগ। সদ্য পড়ে শেষ করলাম “বিদ্বান বনাম বিদুষী”। আগের মতোই একইরকম ভালোলাগা। মোহাচ্ছন্ন অনুভূতি ।
Profile Image for Antara Ghosh.
2 reviews8 followers
April 8, 2025
বহুদিন পরে একটা ভালো বই পড়লাম। রেশ থেকে যাবে অনেকদিন ❣️
Displaying 1 - 10 of 10 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.