মৃতদেহ বহনকারী ফ্রিজিং ভ্যান থেকে অনাকাঙ্খিতভাবে নিখোঁজ এক দেহ৷ ভ্যানের তোবড়ানো ধাতবদেহ দেখে ধারণা করা যায় ভেতর থেকে পালিয়েছে কেউ৷ হুট করে ভেস্তে গেল একাধিক ক্ষমতাশীল মহলের পরিকল্পনা৷ এসআই প্রদীপ ধাওয়া করল সেই রহস্য মানবের পেছনে৷ অবাক হয়ে দেখল তার চলার পথের সব চিহ্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে অতিমানবিক কোনো শক্তির। এমপি খসরু মাহমুদ খুব ধূর্ত, কিন্তু হঠাৎ কার ইশারায় নিখোঁজ হলো সে? নাকি খুন? খসরুর বিদেশফেরত মেয়ে নাজিয়ার বিক্ষোভ সভায় গুলি ছুড়ল কারা? কুলি থেকে ক্ষমতার চূড়ায় উঠে আসা নিয়াজ মোর্শেদেরই বা পুরো ঘটনার সাথে কী সম্পর্ক? আহনাফ আসগরকে কেন সে খুঁজে বেড়াচ্ছে? খসরুর স্ত্রী তানজিনা কি এবার পেতে যাচ্ছে মনোনয়ন? সবকিছুর সাথে যোগসাজশ পাওয়া যাচ্ছে ওপরমহলের। কে এই ওপরমহল? লক্ষ্য কী সবার? আড়াল থেকে নাড়ানো হচ্ছে কলকাঠি, প্রাণ ঝরছে নিরীহ উলুখাগড়ার। ক্ষমতা আর অর্থের লোভে উন্মত্ত একদল মানুষ শামিল হয়েছে যুদ্ধে। ঘাত-প্রতিঘাত, ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছু অজানা জীবপ্রযুক্তির এই গল্পে পাঠক আপনাকে স্বাগতম।
Rafat Shams has spent all of his years in the city of Dhaka. The underbelly of the city always intrigued him and such is reflected in his writing. He goes for a bold, unabashed approach in his writing.
রাজধানীর অদূরে একটা লা*শবাহী ফ্রিজার এক্সিডেন্ট করল। আর এতেই নড়েচড়ে বসল দেশের অন্যতম প্রভাবশালী কিছু লোকজন৷ ফ্রিজারে থাকা লা*শগুলোর মাঝে গায়েব হয়ে গেল একটি লা*শ। সেই 'লা*শকে' খুঁজতে গিয়ে অদ্ভুত শক্তিশালী এক কিশোরের সম্পর্কে জানতে পারল ওসি প্রদীপ। মানুষের তো এত ক্ষমতা থাকার কথা নয়! তাহলে কে এই কিশোর? এদিকে তাকে পাওয়ার জন্য কেন দেশ বিদেশের বেশকিছু সংস্থা একযোগে উঠে পড়ে লেগেছে?
থ্রিলার বই যদি একইসাথে হয় গতিশীল এবং ঘটনাবহুল, সেক্ষেত্রে বইটা অনেকাংশেই পাঠকের পছন্দ হবার কথা। তুমুল উত্তেজনা, দূর্দান্ত একশন; থ্রিলারপ্রেমী বেশিরভাগ পাঠকেরই পছন্দ। অথচ এই বইটাতে এসব অনুষঙ্গ বেশ ভালো পরিমাণে থাকার পরেও বইটা আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। কারন গতি আর ঘটনাবলীর পাশাপাশি যে মেজর তিনটা জিনিস একটা থ্রিলারের ভিত্তি করে দেয়, তা এই বইতে অনুপস্থিত। একটা প্রপার প্লট, ভালো এক্সিকিউশান এবং কারেক্টার ডেভেলপমেন্ট। ৪০০ পেইজের বইতেও এসব কিছু তুলে আনতে না পারা বেশ হতাশাজনক।
যা কিছু ভালো
সব জায়গায় এখন সুপারহিরোদের জয়জয়কার। তেমনি একটা প্লট নিয়ে লেখা বই, এই ব্যাপারটা ভালো। বইয়ের শুরুটাও বেশ আগ্রহ জাগানিয়া। তিনটা অংকে বিভক্ত বইয়ের প্রথম অংকটা খুবই ভালো। ওটুকু পড়লে নিশ্চিতভাবেই দূর্দান্ত কিছু পড়ার অনুভূতি হবে। একশন দৃশ্যগুলো ওয়েল ডিটেইলড, পড়লে রীতিমতো চোখের সামনে ভেসে উঠে। বইতে বেশকিছু টুইস্ট এন্ড টার্নস আছে। তবে এর মাঝে একমাত্র নাজিয়ার অংশগুলোই ভালো লেগেছে। লিখনশৈলী মন্দ নয়, অন্তত সহজে পড়ে যাওয়া যায়। এই তো! এগুলাই আমার মতে বইটির ভালো দিক।
যে কারনে ভালো লাগেনি
গোপন প্রজেক্ট, রাজনীতির মারপ্যাঁচ, বেঈমানী, হিংসা, জিঘাংসা, তদন্ত, অনেক কিছুই রয়েছে বইতে। গতিও ভালো, পেইজ টার্নার। তাহলে সমস্যা কই? সমস্যা যে আসলে কই তা আমিও ধরতে হিমশিম খেয়ে গেছি। হুট করে গল্প শুরু হতেই পারে, এরপর আস্তেধীরে লেখক মূল গল্পের পেছনের গল্পগুলো জানাবেন। কিছু গল্প হাতে রেখে দিবেন যা দিয়ে পাঠককে শেষ পর্যন্ত আটকে রাখা যাবে। এই জিনিসগুলোর অভাব এই বইতে।
একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ধরে এগিয়েছে বইয়ের গল্প। ওপরমহলের ল্যাব, নাজিয়ার বাবাকে খোঁজা, প্রদীপের তদন্ত, মেঘের কর্মকাণ্ড। মোটাদাগে গোটা বইটা এই চারটা সাবপ্লট ধরে এগিয়েছে। এর বাইরেও ছোটখাটো আরো কিছু অংশ আছে। সমস্যা হচ্ছে প্রতি অধ্যায় এগিয়েছে এখান ওখান থেকে টেনে আনা এই সাবপ্লটগুলোর টুকরো টুকরো অংশ নিয়ে। একই অধ্যায়ে রয়েছে ২/৩ টা সাবপ্লটের অংশবিশেষ। এতে যা হয়েছে বইয়ের কাহিনি কখনোই গ্রীপিং মনে হয় নাই। অসংখ্য টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গল্পটা। কোনো প্লটই ঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারেনি। তবুও এটা হয়তো মন্দ লাগত না যদি না ঘটনাবলী অলমোস্ট কাছাকাছি না হতো। কেমন যেন একঘেয়ে লেগে উঠে একটা পর্যায়ে। মনে হয় যেন একই জিনিস একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বারবার পড়ে যাচ্ছি! বইয়ের গল্পে ন্যুনতম গভীরতা নেই। পাঠককে এংগেজ করে রাখার মতো বইয়ে কোনো উপাদানই নেই।
অসংখ্য চরিত্র বইতে, অথচ একটা চরিত্রও মনে দাগ কাটার মতো নেই৷ চরিত্ররা যে যার মতো গল্পে আসছে যাচ্ছে। কেউ কেউ গিয়ে অনেক পরে আবার ফিরে এসেছে। অথচ গল্পে কোনো সিগনিফিকেন্ট ইমপ্যাক্ট নাই এসব চরিত্রের। নিয়াজ ছাড়া আর কারোই তেমন ব্যাকস্টোরি বলা হয়নি। এত বড় বইতে চরিত্রায়নের এই অভাব কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। লেখক গতিশীল বলতে গিয়ে গল্পের বিল্ডআপ জিনিসটাকে স্রেফ হাওয়া করে দিয়েছেন। অসংখ্য ঘটনার কোনো ব্যাখ্যাই নেই বইতে। তবে বইটা ভালো না লাগার মূল কারণ হলো অনেকগুলো অসঙ্গতি। নিচে লিখছি, তবে আগেই বলে নিচ্ছে এতে অনেক স্পয়লার থাকবে।
অসংখ্য অসংগতি *** স্পয়লার অ্যালার্ট ***
প্রথমে আসি প্লটে। একটা বিদেশি গ্রুপ দেশের এক রাজনৈতিক নেতার সাথে মিলে সুপার সোলজার প্রোগ্রাম চালু করেছে। আরেকটা গ্রুপ আছে যারা এই প্রোগ্রামের অ্যাসেট চুরি করতে চায়। স্রেফ এটুকুর উপরেই ভিত্তি করে গোটা বই এগিয়ে চলে। এই বিদেশি গ্রুপ কারা, শুরুতে কীভাবে ওদের সাথে যোগাযোগ হয় দেশের নেতাদের? কোনো কিচ্ছুরই ব্যাখ্যা নেই। এমন একটা প্লট যার কোনো কাঠামো নেই। স্রেফ কঙ্কাল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি!!
দেশে এতকিছু ঘটে যাচ্ছে, অথচ সেখানে দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনির তেমন কোনো ভূমিকাই দেখানো হয় না। বইয়ের সবচেয়ে বড় চরিত্র এবং অ্যান্টাগনিস্ট ওপরমহল, এই লোকটার ব্যাপারে অলমোস্ট কিছুই জানানো হয়নি।
গল্পে বেশকিছু পল্টিবাজি আছে। কিন্তু একেকটা পল্টির পেছনে কোনো শক্ত কারণ দেখানো হয়নি। টাকা পয়সা, পরকীয়া জাতীয় ব্যাপার স্যাপার হালকা করে বলা হয়েছে। কিন্তু পাঠক সেগুলার সাথে রিলেট করার মতো গুছালোভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। এমনকি তাশরিফ কেন তার ভাইকে মারতে চেয়েছে সেটার কোনো ব্যাখ্যাই দেয়া হয়নি বইতে। মানে লেখক বলেছেন অমুক তমুকের সাথে বেঈমানী করবে, অমুক তমুককে মেরে ফেলতে চাইবে; আর পাঠককে সেটা মেনে নিয়ে পড়ে যেতে হবে।
বইতে প্রচুর প্রচুর ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে৷ কিছু ক্ষেত্রে সেগুলোর প্রপার বাংলা নেই মেনে নিলাম, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কথাগুলো আরোপিত লেগেছে৷ নাজিয়ার সংলাপে ইংরেজি মেনে নেয়া যায়। কিন্তু এমন আরো অনেক জায়গায় ইংরেজি ব্যবহার রয়েছে যা ভালো লাগেনি। এছাড়া খাইসে, করসে টাইপ সংলাপ তো আছেই। বইয়ের পাতায় এমন শব্দ পড়তে কোনো কারনে অস্বস্তি লাগে।
এক জায়গায় বলা হচ্ছে এত ফাইল নাজিয়ার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়, তাই সড়িয়ে রাখল। ঠিক পরের প্যারাতে বলা হচ্ছে সে সব ফাইল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছে! অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছে ওরা রাতে রওনা দিল, ঠিক পরের প্যারাতে বলা হচ্ছে ভোরে রওনা দিয়ে পৌঁছেছে৷ সিসিটিভিতে যুবক বয়সের মেঘকে দেখে প্রদীপ, অথচ পরবর্তীতে সাদা চুল দাঁড়িতে রীতিমতো বৃদ্ধ মেঘকে এক দেখায় চিনে ফেলে সে!! এমন বেশকিছু অসংগতি চোখে পড়েছে। আর যে পরিমাণ বানান ভুল আছে তা আসলে গুনে দেখা সম্ভব না। ঋদ্ধ প্রকাশের সবচেয়ে দূর্বল বই মনে হয়েছে এই বইটাকে আমার। সম্পাদনা করে প্রয়োজনে বইয়ের কিছু অংশ বাদ দিয়ে, স্টোরি এন্ড কারেক্টারে আরেকটু ডেপথ আনলে হয়তো বইটা মোটামুটি উৎরে যেত।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৩/১০ (বইটা অনেকটা এমন এক ধারাবাহিক সিরিয়ালের মতো, যেটা যখন খুশি দেখা বাদ দিয়ে, পরে আবার অন্য জায়গা থেকে দেখা শুরু করা যাবে। দর্শকের তাতে কিছু যায় আসবে না। গভীরতার অভাব পুরোটা বই জুড়েই রয়েছে। সত্যি বলতে, এমন আরো অনেক কিছু পড়ার সময়ে খটকা লেগেছে বা বিরক্ত লেগেছে যা এখন আর মনে পড়ছে না )
ভালো দিক- অ্যাকশন দৃশ্যের নিঁখুত বর্ণনা, বিস্তার আলোচনা- যা এর বিশাল পেইজ সংখ্যার (৪০০) দিকেই ইঙ্গিত দেয়।
খারাপ দিক- অনেক অসঙ্গতি। যেমন- প্রথম দিকে শুধু ডেড বডি ভারতে পৌছানোর কথা থাকলেও, পর জীবিত মেঘে’র পেছনে উঠে পরে লাগে।
শুধু আকর্ষণের কারণেই রাত্রি একরাতের জন্যে মেঘের সাথে মিলিত হয়। এবং পরে সে সিদ্ধান্ত নেয় এই বাচ্চা সে জন্ম দিবে- শুধুমাত্র মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে, যা তার ক্যারেক্টারের সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না। সে এটাও জানে, এই সিদ্ধেন্তের জন্যে বিভিন্ন পক্ষের লোক তার পিছু লাগবে, জন্ম দিতে গিয়ে তার মৃত্যু হবার ভালোরকম সম্ভাবনা রয়েছে যেহেতু তার পেটের শিশুর গ্রোউথ সাধারণ গর্ভাবস্থার বাচ্চাদের থেকে বেশি। যেখানে রাত্রি সকল কাজেই খুব ক্যালকুলেটিভ এবং প্রেসারের সময় স্থির বুদ্ধির, সো এই বাচ্চাকে জন্ম দেয়ার মতো ডিসিশন তা সাথে যায় না। যেহেতু এই শিশু পরবর্তীতে গল্পে ভালো প্রভাব রাখে তাই এচাকে সাধারণ অসঙ্গতি হিসেবে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
এমন আরোও কিছু অসঙ্গিত রয়েছে। এতো কিছু ঘটছে- রাজনীতি, বিশ্বাসঘাতকতা, চুরি, আঘাত- পাল্টা অঘাত- সবকিছুর সমীকরণ ঠিক রাখা কঠিন হয়ে দাড়ায়।
১.৫ স্টার। অদ্ভূত এক ছেলেকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, একশোটা ওয়ান ডিমেনশনাল চরিত্রের একে অপরকে ডাবল আর ট্রিপল ক্রসিং। এক গাদা বানান ভুল। প্রুফরিডাররা যে কোন কাজই করেনি সেটা দুইপাতা পড়লেই বোঝা যায়৷ কিন্তু একটা ভালো সাই-ফাই-এর কোন লক্ষণ নেই। যে কোন অস্ত্রই যেমন একদিকে নিরাপত্তা দেয়, অন্যদিকে আবার ধ্বংসযজ্ঞ করতে পারে। তেমনি, ওই সুপার-সোলজার বানানোর প্রজেক্টটি যুদ্ধজয়ের কথা চিন্তা করলে লাভজনক হলেও, মানবশিশুর ওপর এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন অমানবিক বা অনৈতিক হতে পারে, এসব নিয়ে কোন আলাপ নেই। অথচ এরকম চিন্তা যেন পাঠকের মনে আসে, পাঠক যেন বিজ্ঞানের ধূসর দিকটা নিয়ে ভাবতে শেখে, সেটা নিশ্চিত করে একটি ভালো মানের কল্পবিজ্ঞান। আরো অনেক কিছুই লেখা যেত এই পাঠপ্রতিক্রিয়ায়। পড়ার সময় আরো অনেক বিষয়ে মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো যেসব এখন মনে নেই। বইয়ের সাহিত্যমান বেশ নিচুই বলবো। আমার বই পড়ার স্ট্যান্ডার্ড এমন কিছু উচ্চমানের না। অনেক ছাই-পাশ পড়ে ফেলি হাসিমুখে। সেই আমারই যেহেতু এত অভিযোগ, তার মানে বইটি আসলেই সুখাদ্য নয়। লেখকের প্রতি অনুরোধ, মিশন ইম্পসিবল মার্কা থ্রিলের পাশাপাশি পাঠকের মনে একটু দার্শনিক প্রশ্নের যোগান দিলে ভালো হয়।
“We stopped looking for monsters under our bed when we realized that they were inside us.” ― Charles Darwin
মানব সভ্যতার ইতিহাস অনেক বছরের পুরনো। আসলে সঠিক করে বলা যায় না। এটা শুধু একটা ধারণা। সেই আদি মানব থেকে আজকের আধুনিক যুগ। ধীর ধীরে মানব সভ্যতার পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মানব সভ্যতা পার করেছে কয়েক হাজার বছর বা তারও বেশি। ধীরে ধীরে মানুষ জানতে পেরেছে শিখতে পেরেছে। আবিস্কার করেছে অনেক নতুন কিছু। আগুন থেকে শুরু করে আজকে মহাকাশ ভ্রমণ, সময়ের সাথে সাথে মানুষ নিজেদের নিয়ে গিয়েছে এক অন্য উচ্চতায়। . সভ্যতার আদি থেকেই মানুষ ক্ষমতা, লোভ, রাজনীতি আর প্রতিহিংসার কাছে আবদ্ধ হয়ে আছে। সবাই ক্ষমতা চায়। নিজেকে বড় করে অপরে দমিয়ে রাখতে চায়। এটাই আদিম প্রবৃত্তি। ক্ষমতার কাছে সব কিছুই হচ্ছে যেন নস্যি। আসলে মানুষের বিবর্তনের সাথে সাথে আদিম এই প্রবৃত্তির বিবর্তন ঘটেছে। আগে যেটা ছিল নিজেকে জাহির করার এখন সেটা হচ্ছে হস্ত গত করার। আসলে ক্ষমতা থাকলেই কেবল সব কিছু হাসিল করা সম্ভব। . “Intelligence is based on how efficient a species became at doing the things they need to survive.” ― Charles Darwin . মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ অনেক আগেই ঘটেছে। আবিস্কার করে চলেছে এবং পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আগুন আবিস্কার থেকে শুরু করে আজকের সৌর জগতে পা রাখা, সব কিছুই মানুষকে এগিয়ে নিয়েছে। বিবর্তনের সাথে সাথে মানুষ নিজেকেও আবিস্কার করেছে। আর সেই থেকে মানুষ নিজেকে নিয়েও গবেষণা করছে। হয়ত কোন দিন জয় করে ফেলবে অমৃত। . সম্প্রতি পড়ে ফেলেছি “অপবিবর্তন”, যা বাংলাদেশে থ্রিলার সাই-ফাই জনরার একটি বই। বেশ ইন্টারেস্টিং একটা প্লট। বাংলাদেশে এমন প্লট নিয়ে লেখা বেশ কষ্টসাধ্য বলা যায়। তবে লেখক কিন্তু বেশ ভাল করেছেন। কিন্তু এখানে কিছু যদি, আর কিন্তু রয়েছে। হয়ত সেগুলো না থাকলে বইটি দুর্দান্ত হতে পারত। এর কারণ হচ্ছে প্লট, এক্সিকিউশন, ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্ট এবং ধারাবাহিকতা। মুলত এই কারণে হয়ত বইটি দুর্দান্ত হতে গিয়েও হয়নি। . প্রথমে কিছু ব্যাপার যা থ্রিলারপ্রেমীদের দারূণ লাগবে। সেটা হচ্ছে সুপার হিরোদের নিয়ে গল্পের প্লট। আবার বলা যায় সুপার সোলজার নিয়ে এই গল্পটি গড়ে উঠেছে। বইয়ের শুরুটাও বেশ দুর্দান্ত। বলা যায় বইটি তিনটি ভাগে রয়েছে। তাই যখন প্রথম ভাগ পড়া শুরু করেবন দারুণ কিছু পড়তে যাচ্ছেন অনুভূতি হবে। আর লেখকের সাবলীলতার কারণে পড়ে খারাপ লাগবে না। কিছু টুইস আর টার্ন বেশ ভাল ছিল। বলা যায় মাঝে মাঝে বেশ আনএক্সপেক্টেড। . মুলত গল্পের কাহিনী গড়ে উঠেছে মানুষের বিবর্তন বা অপবিবর্তনকে ঘিরে। গোপন প্রজেক্ট, ক্ষমতা, বেঈমানী, হিংসা, একশন, থ্রিল, এডভেঞ্চার সহ সব কিছুই আছে। আবার সব কিছু থেকেও যেন নেই। বলা যায় আসলে কোনটার সঠিক ব্যবহার হয়েছে আবার কোনটির হয়নি তাও বলা মুশকিল। আসলে কাহিনীর পেছনের কাহিনী নিয়েই গল্প এগিয়ে যায়। তার কারণে গল্পটি হয়ে ওঠে দারূণ, সম্ভবত এই জায়গাতেই লেখক খেই হারিয়েছেন। . বইটিতে চারটি মুল ক্যারেক্টার যদি আমরা ধরি তবে দেখব সেটা ওপরমহল, নাজিয়া, মেঘ, ওসি প্রদীপের কর্মকান্ড। আসলে কারণে কোনটি ঘটছে সেটাই বলা বেশ মুশকিল। ঘটনার পেছনের ঘটনাও বেশ হুটহাট ঘটেছে। ওই যে গল্পের ধারাবাহিকতা বেশ থেমে গিয়েছে এই কারণে। একই জিনিস বারবার ঘুরে এসেছে। এক জায়গাতে দুই তিনটা সাব প্লট এসে গিয়েছে। পড়ার সময় বেশ তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। . তাছাড়া এই বইটিতে চরিত্রের ছাড়াছড়ি। মানে যেখানে দরকার নেই সেখানেও একটা ক্যারেক্টার চলে এসেছে এমন। কিন্তু সেই ক্যারেক্টার সেভাবে ডেভলপ হয়নি, ক্যারেক্টারের কোন গভীরতা নেই। মুল ক্যারেক্টারের একই অবস্থা। বেশ ভাসা ভাসা। যেন লেখক গভীরে ঢুকতে চাননি। মানে সিগনিফিকেন্টলি যদি বলি কোন একটা ক্যারেক্টার যদি স্ট্রং হত, সেটাও হয়নি। যাকে ঘিরে গল্প সেই মানুষটার প্লট, ব্যাকগ্রাউন্ডও অনেক দুর্বল। এছাড়া কারোও ব্যাক স্টোরি সেভাবে তুলে ধরা হয়নি। বড় একটা অসংগতি হচ্ছে বইটিতে হুটহাট সব ঘটে গিয়েছে। মানে এটারও কোন সিকয়েন্স সেভাবে মেইনটেইন করা হয়নি। . এবার প্লট নিয়ে কিছু কথা বলি। বইটির প্লট বেশ দারূণ, কিন্তু লেখক সম্ভব প্লট ও সাব প্লট নিয়ে সেভাবে মাথা ঘামাননি। এত বড় একটা বইয়ে সব কিছুই ভাসা ভাসা। এই যেমন ধরুন এই প্রজেক্ট কারা রান করছে, কারা এর পেছনে আছে, কিভাবে তারা এই প্রজেক্ট শুরু করেছে, কবে থেকে শুরু হল এটা। কেন শুরু করা হল। কিসের প্রয়োজনে। এসবের কোন ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
তাছাড়া আমরা যেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছে সেটা হচ্ছে দেশের প্রসাশনকে এতই দুর্বল দেখানো হয়েছে যেটা বলার বাইরে। এত কিছু হচ্ছে কিন্তু তারা যেন চোখে কিছুই দেখছেন না। এরপর বেঈমানী বা হত্যার ব্যাপার গুলোতে শক্ত কোন কারণ রাখা হয়নি, হয় টাকা, নয়ত পরকীয়া বা হালকা কিছু। এভাবেই ঘটনা শেষ করে দেয়া হয়েছে। . তারপর আছে বানান ও সম্পাদনার কিছু ব্যাপার। যেটা চাইলেও এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। আসলে বইটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যা না হলে ভাল হত। কিছু সংলাপ ছিল যার কোন মানে ছিল না। আসলে খাইসে, গেছে, করসে, আঞ্চলিকতা রয়েছে। হ্যা, গল্পের প্রয়োজনে এগুলো দরকার হয়, কিন্তু এখানে তেমন মনে হয়নি। মনে হয়েছে লিখতেই হবে না হলে জমবে না। . সবশেষে বলব বইটি দুর্দান্ত হতে গিয়েও হয়নি। আবার প্লট দারূণ ছিল এক্সিকিউশন ভাল হলে হয়ত দারূণ হত। তবে ঋদ্ধ বইটি নিয়ে আর একটু ভাবতে পারত। আবার সম্পাদনা সুন্দর হলে বইটি আর একটু ভাল হতে পারত।
বইঃ অপবিবর্তন লেখকঃ রাফাত শামস প্রকাশনীঃ ঋদ্ধ প্রকাশ পৃষ্ঠাঃ ৪০০
বইটা রাফাত ভাইকে না জানিয়েই পঁচিশের বইমেলা থেকে কিনে নিয়েছিলাম। তারপর আর পড়া হচ্ছিলো না। অবশেষে ছাব্বিশের জুলাইতে এসে পড়ার সুযোগ তৈরী করে নিলাম।
এই মাসে আমার পড়া সেরা বই ঋদ্ধ প্রকাশের 'অপবিবর্তন', সাইন্স ফিকশনের মাধ্যমে দেশীয় সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এমন ধুন্ধুমার থ্রিলার প্রথম পড়লাম। এই মাসের আরও বাকি অনেকদিন, কিন্তু বাকি দিনগুলোতেও মনে হয় না আমি এমন কোনো বই আর পড়বো। লেখক রাফাত শামস ভাইকে বলবো এটাকে যেন মুভিতে রূপান্তর করা হয়।
বইটা পড়ে ঘোর কাটাতে পারছি না। সকাল থেকে রাত একটানা পড়েই গেছি। তারপর শেষ হলো রাতের ৩টা বাজে। ঘুমাতে গিয়ে আর ঘুম আসে না। বইটা বন্ধ করে আমি অন্ধকারে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ। বুকের ভেতর একটা পাথর জমে গিয়েছিল। ভাবছিলাম আমরা আসলে কী চাই এই দেশটার কাছে? একটা ফ্রিজিং ভ্যান থেকে পালিয়ে যাওয়া লাশ, এইটুকু দিয়ে যে গল্প শুরু হয়, সেটা যে আমার নিজের চেনা রাস্তার গল্প হয়ে উঠবে, বুঝিনি প্রথমে।
লেখক আমাকে একটা লাশের ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে নোংরা করিডরে। একজন এমপি নিখোঁজ হয়, নাকি খুন হয়, কেউ জানে না, কারো জানার দরকারও নেই। তার মেয়ে বিক্ষোভ করে, গুলি চলে, রক্ত পড়ে রাস্তায়, আর পরদিন খবরের কাগজে সেটা হয়ে যায় দুই লাইনের একটা সংবাদ। আমরা কতবার দেখিনি এই দৃশ্য? কতবার মিছিলে গুলি খেয়ে মরে গেছে কেউ, আর আমরা শুধু স্ক্রল করে গেছি ফেসবুকে?
মেঘ চরিত্রটা আমাকে সবচেয়ে বেশি খুঁচিয়েছে। একজন মানুষ, যাকে বানানো হয়েছে অস্ত্র, তারপর টাকার লোভে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে রাস্তায় একা। ক্ষমতা তাকে দেবতা বানায়নি, বানিয়েছে একটা নিঃসঙ্গ জন্তু, যে শুধু একটা সাধারণ জীবন চেয়েছিল। এই দেশে কত মেঘ আছে, যাদের ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়েছে ইতিহাসের ফ্রিজিং ভ্যানে?
ওসি প্রদীপের কথা ভাবি, একজন সাধারণ পুলিশ অফিসার, যে সিস্টেমের ভেতর থেকেও সত্য খুঁজতে চায়, অথচ সিস্টেম তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গিলে খায়। এই লোকটাকে আমি চিনি। আমাদের চারপাশে হাজারটা প্রদীপ প্রতিদিন নিভে যাচ্ছে, কেউ খবর রাখে না।
আহনাফ আসগরের অঅর্ধমৃত অবস্থাটা আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। একজন দুর্ধর্ষ সেনা অফিসার হেরে যায় রাষ্ট্রের নিজের বানানো দানবের কাছে। রাষ্ট্র কি সত্যিই মানুষ বাঁচাতে চায়? নাকি রাষ্ট্র শুধু একটা যন্ত্র, যেটা মানুষকে ব্যবহার করে, তারপর অকেজো হয়ে গেলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়? কুলি থেকে ক্ষমতার চূড়ায় ওঠা নিয়াজ মোর্শেদ চরিত্রটা এই দেশের রাজনীতির সবচেয়ে নগ্ন সত্যটা খুলে দেখায়। ক্ষমতা এখানে জন্মগত অধিকার না, একটা যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধে সাধারণ মানুষ শুধু উলুখাগড়া, প্রাণ দেয় বিনা কারণে।
ভাষাটা মেদহীন, ঝরঝরে, কিন্তু মাঝে মাঝে অ্যাকশনের বর্ণনা এত লম্বা হয়ে গেছে যে মেঘের একাকিত্ব, প্রদীপের ভাঙন, এইসব জায়গা দ্রুত পার হয়ে গেছে। আমি চেয়েছিলাম আরও বেশি সময় কাটাতে ওই একাকিত্বের ভেতর। কিছু চরিত্র, বিশেষ করে নাজিয়া, আরেকটু গভীরতা পেতে পারতো। সুপারহিরো এলিমেন্ট আর রাজনৈতিক বাস্তবতা মাঝে মাঝে একে অপরের সাথে ঝগড়া করেছে, যেন লেখক নিজেই ঠিক করতে পারেননি এটা বাস্তবতার গল্প নাকি কল্পনার।
সম্পাদনায় অনেক ভুল চোখে পড়েছে, ছোট ছোট বানান ভুল। এগুলো তেমন বড় কিছু না, কিন্তু একটা অসাধারণ থ্রিলারে যেখানে প্রতিটা শব্দ ধারালো হওয়া দরকার ছিল, সেখানে এই অসতর্কতা মাঝে মাঝে আমাকে গল্পের বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
বইটা বন্ধ করার পরও মেঘের মুখটা চোখের সামনে জ্বলছিল। একটা মানুষ, বানানো হয়েছিল অস্ত্র হিসেবে, চেয়েছিল শুধু একটা সাধারণ জীবন, রাষ্ট্র তাকে দিয়েছিল শুধু রক্ত আর একাকিত্ব। অপবিবর্তন নামটা মিথ্যা না। এই দেশটাই তো একটা অপবিবর্তন, যেখানে বিবর্তন হওয়ার কথা ছিল মানবিকতার দিকে, অথচ আমরা হেঁটেছি ক্ষমতার নগ্ন লোভের দিকে।
বইঃ অপবিবর্তন লেখকঃ রাফাত শামস প্রকাশনা সংস্থাঃ ঋদ্ধ প্রকাশ প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারী,২০২৫ “অপবিবর্তন" বইটিকে অনেকে টেকনো থ্রিলার হিসেবে অভিহিত করছেন, তবে আমার কাছে এটি একটি সায়েন্স ফিকশন এবং থ্রিলারের মিশ্রণ বলে মনে হয়েছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ছাপ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গল্পের যেতে হলে আগে একটি জিনিশ বুঝতে হবে - তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো কিভাবে উন্নত দেশের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। বাংলাদেশের টিকাদান ব্যবস্থা এই বিষয়টির একটি উদাহরণ হিসেবে যেতে পারে, কিভাবে উন্নত দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের জনগণের ওপর টিকা পরীক্ষা করে টিকা সেফ কিনা তা নিশ্চিত করে। যাই হোক এমন এক ভাবেই সাব হিউম্যান বা সুপার হিউম্যান তৈরীর পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। কিভাবে হয়ে ওঠে সেটা এই কাহিনীর মূল নয়- পরীক্ষাগার হয়ে ওঠার পরের কিছু ঘটনা এই বইটির উপজীব্য এবং সেখান থেকেই কাহিনীর মোড় ঘুরে যায়। গল্পের প্রথম অর্ধাংশ অত্যন্ত টানটানভাবে এগিয়েছে। পড়তে পড়তে মনোযোগ ছুটে যায় না এবং পাঠক হিসেবে একটা উচ্চাশা তৈরি হয়—এই বুঝি বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে! লেখকের লেখার স্টাইল এখানে খুবই সহজবোধ্য। তবে দ্বিতীয়ার্ধে এসে কাহিনী একদম সিনেমাটিক হয়ে পড়ে এবং বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ আলগা হতে থাকে। কাহিনীর বেজলাইন আরও একটু পরিষ্কার হলে এবং প্রথম অর্ধাংশে সেটা করা পরিস্থিতিগুলোর সাথে সংযোগ রেখে গোছানোভাবে পরিণতিতে পৌঁছালে পুরো কাহিনী নিঃসন্দেহে আরও স্ট্রঙ মনে হত। সায়েন্স ফিকশন মানেই সবকিছু অবিশ্বাস্য হতে হবে এমন নয়। বরং বাস্তবতার ছায়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও সায়েন্স ফিকশন বিশ্বাসযোগ্য করা যেতে পারে। "অপবিবর্তন" সেই চেষ্টাটা করেছে— তবে আংশিক সফল হয়েছে বলা যায়। সবশেষে বলব, বইটি পড়ে ভালো লেগেছে, তবে শেষদিকে কিছু খাপছাড়া প্লট আর অস্পষ্টতা পাঠকের সাথে কাহিনীর সংযোগ কমিয়ে দেয়। শুরুতে আমি ৪ স্টার দেওয়ার কথা ভাবছিলাম, কিন্তু শেষ অংশের দুর্বলতার কারণে ১ স্টার কমিয়ে ৩ স্টারই দিতে হচ্ছে। তবুও, বইটি পড়ার মতো এবং পড়তে রেকমেন্ডেড, লেখকের বইগুলোর পলিটিক্যাল ফ্লেভার বেশ এনজয়েবল লাগে আমার কাছে। এবং যথারীতি এই লেখকের পরবর্তী কাজগুলোর জন্য এখন থেকেই অপেক্ষা করছি। ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩/৫
মহাসড়কে একটি ফ্রিজিং ভ্যান দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার পর উদ্ধার করা হয় কয়েকটি মৃত লাশ। কিন্তু ভেতরে থাকা লাশগুলোর মধ্যে একটি লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন থেকে যায় যদি মৃত লাশ'ই হয়ে থাকে তাহলে হারালো কীভাবে? নাকি মৃতদের মাঝেও কেউ জীবিত ছিল। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠে ক্ষমতাশালী একাধিক মহল। তদন্তে নামেন ইন্সপেক্টর প্রদীপ। শুরু হয় এমন এক অনুসন্ধান, যা ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, গোপন গবেষণা, জীবপ্রযুক্তি এবং অতিমানবিক শক্তির সম্ভাবনায় ঘেরা এক অন্ধকার জগতের দিকে।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ- রাফাত শামস বাংলা থ্রিলারে ভিন্ন স্বাদের একটি জগৎ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। সেই জায়গা থেকেই অপবিবর্তন আলাদা গুরুত্ব পায়। রাফাত শামস প্রচলিত রহস্যকাহিনির বাইরে গিয়ে বিজ্ঞান, জীবপ্রযুক্তি, ক্ষমতার রাজনীতি এবং অতিমানবিক সম্ভাবনাকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, লেখক রহস্যকে অযথা জটিল করেননি। শুরু থেকেই রহস্যের বীজ এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, "আসলে কী ঘটছে?"—এই প্রশ্নটি পাঠকের মাথায় ক্রমাগত ঘুরপাক খায়। উপন্যাসটি কেবল একজন তদন্তকারীর গল্প নয়। এটি এমন এক পৃথিবীর আভাস দেয় যেখানে ক্ষমতা, অর্থ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা মিলেমিশে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে যার নৈতিক সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে; যা বইটিকে সাধারণ থ্রিলারের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
রাফাত শামসের লেখার একটি বড় গুণ হলো তাঁর সংযম। চারশো পৃষ্ঠার ভেতরেও অপ্রয়োজনীয় বর্ণনার ভার নেই। সংলাপ স্বাভাবিক, দৃশ্যান্তর গতিশীল আর প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে এমন একটি কৌতূহল রেখে দেওয়া হয়েছে যা পরের অধ্যায়ে যেতে বাধ্য করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কূটকৌশল, অ্যাকশন ও রহস্যের ভারসাম্য বেশ সফলভাবে বজায় রাখা হয়েছে। শেষের অংশে ঘটনাপ্রবাহ তুলনামূলক দ্রুত এগিয়ে যায়। কয়েকটি চরিত্রের প্রেক্ষাপটের ঘটনার ব্যাখ্যা আরও বিস্তৃত হলেও হতে পারতো।
বইটিতে বেশ কিছু ছোট ছোট বানান ভুল রয়েছে। থ্রিলার বইগুলোতে বানান ভুল হলে কিছুটা বিরক্তবোধ হয়। কিন্তু বইটা আরো হাইপ ডিজার্ভ করে।
বই-অপবিবর্তন লেখক-রাফাত শামস প্রকাশনায়-ঋদ্ধ প্রকাশ পৃষ্ঠা সংখ্যা-৪০০
ঢাকার অদূরে গড়ে ওঠে জিন পরিবর্তন নিয়ে একটি গোপন ল্যাব। সেখান থেকে কয়েকটি মৃতদেহ অন্যত্র নেওয়ার সময়, একজন - কিংবা বলা ভালো, একটি "সাবজেক্ট" - পালিয়ে যায়। তাকে খুঁজে বের করার অভিযান দিয়েই গল্পের শুরু।
শুরু থেকেই গল্পটা বেশ টানটান গতিতে এগিয়েছে। নন-লিনিয়ার স্টাইলে বলা গল্প, আর কিছু অ্যাকশন দৃশ্য লেখক দারুণ ডিটেইলে ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়তে পড়তে বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে, এগুলো পর্দায় দেখলেও ভালো লাগত।
পুরো বই পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা মূলত বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। প্রায় সবাই কোনো না কোনো সময় কাউকে বিট্রে করে। ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টা একটু বেশি মনে হয়েছে। শুধু টাকার জন্য এতবার অবস্থান বদলানো বা বিশ্বাসঘাতকতা - সব সময় খুব বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি।
আরেকটা বিষয় হলো, গল্পে চরিত্রের সংখ্যা অনেক বেশি। একটা সময় গিয়ে কে কার দলে, কে কাকে অনুসরণ করছে - সেটা মাথায় রাখতে একটু কষ্ট হয়েছে। মাঝেমধ্যে একই ধরনের ঘটনাও বারবার পড়ছি বলে মনে হয়েছে।
শুরুর দিকে বইটা সুপারহিরো থ্রিলারের আবহ তৈরি করলেও, ধীরে ধীরে সেটা রাজনৈতিক থ্রিলারের দিকে মোড় নেয়। এই পরিবর্তনটা সবার ভালো নাও লাগতে পারে, তবে গল্পের পরিধি বড় করেছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশি মৌলিক থ্রিলার হিসেবে বইটা আমার ভালো লেগেছে। পড়তে পড়তেই বারবার মনে হয়েছে, এটাকে খুব সহজেই একটি OTT সিরিজে রূপ দেওয়া যায়। এমনকি মনে হয়েছে, লেখক হয়তো একটি বড় ইউনিভার্স মাথায় রেখেই গল্পটা লিখেছেন।
"অপবিবর্তন" একটি চমৎকার বই। কাহিনি বেশ আকর্ষণীয়—সায়েন্স ফিকশন, থ্রিলার এবং রাজনীতির মিশেলে লেখা হয়েছে, যা পাঠককে টেনে রাখে। তবে দুঃখজনকভাবে, এই সম্ভাবনাময় বইটির পুরো অভিজ্ঞতা নষ্ট করে দিয়েছে প্রকাশনার গাফিলতি।
২০২৫ সালের বইমেলায় বইটি প্রকাশ করেছে ঋদ্ধ প্রকাশ, যারা একটি প্রতিশ্রুতিশীল প্রকাশনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা দায়িত্বশীলতার অভাব দেখিয়েছে। বইয়ে প্রচুর বানান ভুল, ইংরেজি শব্দে ভুলভাবে বাংলা ফন্ট প্রয়োগ, কিছু লাইন একাধিকবার লেখা হয়েছে, আবার কোনো কোনো লাইনে একটি শব্দ দুইবার এসেছে—যার ফলে পাঠের সময় অস্বস্তি তৈরি হয়। এছাড়া, ৪০০ পৃষ্ঠার বইটির বাঁধাইও খুব দুর্বল ছিল।
আমার মনে হয় বইটি প্রিন্টের আগে একবারও সম্পূর্ণভাবে পড়ে দেখা হয়নি। এই ভুলগুলোর জন্য লেখকের চেয়ে প্রকাশকই পুরোপুরি দায়ী। অথচ ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করা হলে এটি হতো ভালো একটি মৌলিক থ্রিলার বইগুলোর মাঝে একটি হত।
আশা করি, ভবিষ্যতে ঋদ্ধ প্রকাশ এই বইটির পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশের আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্পাদনা ও প্রুফরিডিং করবে, যেন পাঠকেরা এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।
অসাধারণ একটি উপন্যাস। এটি শুধু সাইন্স ফিকশন নয়, সেই সঙ্গে একটি পারফেক্ট পলিটিকাল থ্রিলারও। কাহিনী টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। সবচেয়ে বেশি ভাল লেগেছে একশন দৃশ্যগুলো। তবে বইটিতে সম্পাদনার ঘাটতি চোখে পড়ার মত। জায়গায় জায়গায় বানান ভুল, ইংরেজি শব্দ বাংলায় ভুল বানানে লেখা, একই শব্দ একাধিকবার ব্যবহার, আর ব্যাকরণগত ভুল তো আছেই। প্রকাশনীর এ বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত। এই ব্যাপারগুলো এড়িয়ে গেলে বইটি একটি মাস্ট রিড বই। Highly recommended!
ভাইরে ভাই এইটা একটা বই ছিল। পুরাই ঝাকানাকা।হাত থেকে নামানোর উপায় নাই। এই বই দিয়ে পুরা দুই তিন পর্বের হলিউডি ফিল্ম বানানো যাবে। খুবই চমৎকার বই এটা। রেকমেন্ডেড।