মহাস্থানগড়ের অদূরে শান্তশিষ্ট নিস্তরঙ্গ মফস্বল শব্দলদীঘি৷ সে নির্জনতায় চির ধরিয়ে হয়ে গেল একটি খুন৷ সাধারণ ভ্যানচালক কিসলুর খুনের সে তদন্তে নেমে পড়লেন শখের গোয়েন্দা বৃদ্ধ মশিউর রহমান, সাথে তার সহকারী হাসান৷
হঠাৎ পাওয়া গেল রহস্যময় নিখোঁজ সংবাদ, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এক স্কুলছাত্রকে৷ রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে৷ শব্দলে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা৷ সে অমানিশার মাঝ থেকেই ভেসে ওঠে আরেকটি লাশ৷
ভয়ানক ব্যাপারটা হচ্ছে বিকৃত এই লাশের দৈর্ঘ্য রীতিমতো বারো ফিট!
ওদিকে একটা চিরকুট আসে শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস চিফের কক্ষে৷ চিরকুটের পেছনে একটি চিহ্ন৷ চোখ কুঁচকে যায় চিফের৷ বিশ বছর আগের এক কাল্ট—নাইট অব দ্য ফলেন স্টার৷ তবে কি আবার ফিরে এসেছে ওরা?
বীভৎস অস্বাভাবিক লাশ, কাল্ট এবং সবার অগোচরে থাকা এক এক্সপেরিমেন্ট—সবকিছু মিশে যায় এক বিন্দুতে৷ ইতিহাস! বাংলার হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস৷ গল্পটা আমাদেরকে ঠিক কোথায় নিয়ে যাবে? ভয়ানক কোনো কানাগলিতে কি লুকিয়ে আছে দৈব কোনো শক্তি?
পাঠক, তাসিন আহমেদের “জিয়ৎ” আপনাদেরকে ঘুরিয়ে আনবে জমজমাট এক রহস্যের গলিঘুপচি থেকে৷ রুদ্ধশ্বাস এ উপন্যাসে সব রহস্য লুকিয়ে আছে বইটির পাতায় পাতায়৷
নিস্তরঙ্গ জীবন কাটাচ্ছিল শব্দল নামক অজপাড়াগাঁ- এর মানুষগুলো। হঠাৎ খুন হয়ে গেল সেখানের এক সাধারণ ভ্যান চালক। এর দুদিন বাদেই নিখোঁজ হয়ে গেল এলাকার এক ব্যবসায়ীর ছেলে। তদন্তে নামলেন শখের গোয়েন্দা মশিউর রহমান। এরপর শব্দলের নদীতে ভেসে উঠল ১২ ফুট সাইজের এক মানুষের লাশ! এদিকে ঢাকাতেও নিখোঁজ হচ্ছে অল্প বয়সী তরুণীরা। সিক্রেট সার্ভিস এজেন্সি শ্যাডোতে চিঠি পাঠাল নাইট অফ দ্য ফলেন স্টার নামের এক কাল্ট৷ হুমকি দিল দেখে নেবে পুরো দেশের সিস্টেমকে। ওদিকে এসবকিছুর সাথে বারবার উঠে আসছে শত বছরের মিথ হিসাবে টিকে থাকা মহাস্থানগড়ের জিয়ৎকুণ্ডের কথা। কারা করছে এতকিছু? এই দুই জায়গার ঘটনাবলীর সূত্রটাই বা কোথায়?
দু'দিন আগে সর্বেসর্বার রিভিউতে লিখেছিলাম কোনো নতুন লেখকের পক্ষেও এত বাজে কিছু লেখা সম্ভব না। কথাটা যে ভুল কিছু নয় তার প্রমাণ এই বইটা। নতুন লেখক, বড় উপন্যাস; অথচ কী দূর্দান্ত একটা জার্নি গেল বইটার সাথে। সত্যি বলতে একেবারেই জিরো এক্সপেক্টেশন নিয়ে বইটা পড়তে বসেছিলাম। এমনকি ব্লার্বটাও পড়িনি এর আগে কখনো। ভেবেছিলাম যেখানে দেশের নামকরা মৌলিক থ্রিলার লেখকদের বই পড়েই সহজে সন্তুষ্ট হই না, সেখানে অচেনা অজানা এক লেখক কীই- বা আর লিখবে!! কিন্তু আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম আমি দুইদিনের দুই বসাতে ৩৩৬ পেইজের এই বইটা পড়ে শেষ করে ফেলেছি। যেখানে এখন নামকরা লেখকরাও বইয়ের কলেবর ছোট করার দিকে ঝুঁকেছেন, সেখানে একজন আনকোরা লেখক প্রমাণ সাইজের একটা থ্রিলার লিখে ফেলেছে যেটা রীতিমতো পেইজ টার্নার এবং যেখানে আদর্শ থ্রিলারের সকল উপাদান ভালোভাবেই ব্যবহার করা হয়েছে। অবাক হওয়ার মতোই ব্যাপার!
শব্দলে শব্দহীন ঘটনার ঘনঘটা
বইয়ের বেশ বড় একটা অংশ দুইটা ভিন্ন জায়গায়, আলাদা আলাদা ঘটনা, ভিন্ন চরিত্র এবং পৃথক তদন্ত নিয়ে এগিয়ে চলে। যার একটা অংশ শব্দল নামক এক গ্রামকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। উপরের কাহিনি সংক্ষেপে যা যা বলেছি মোটামুটি সেগুলাই এই অংশের ঘটনা। এখানে মূখ্য বিষয় হলো লেখকের চরিত্রদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ব্যাপারটা। প্রচুর চরিত্র এই বইয়ে। এবং লেখক অদ্ভুত দক্ষতায় প্রতিটা চরিত্রকে স্বতন্ত্র রাখতে পেরেছেন। যেমন শব্দলে রয়েছে শখের গোয়েন্দা মশিউর রহমান, তার সাগরেদ হাসান, পুত্রসম ফরহাদ। ওদিকে পুলিশে রয়েছে এসআই শফিক এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার উৎস। এই অংশে আরো চরিত্র থাকলেও এই ৫ জনের ভূমিকা বেশি। এবং প্রতিটা চরিত্রকে আলাদা করে চেনা যায় তার কর্মপদ্ধতি, চিন্তাভাবনা ও বাচনভঙ্গি থেকে। এমনকি আঞ্চলিক ভাষাকেও চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন লেখক। এই অংশের তদন্ত প্রক্রিয়া আসলে কিছুটা ধীর, কিছুটা অনুমান নির্ভর। তবে এতবার দৃশ্যপটে এত ধরণের পরিবর্তন ঘটে যে পাতার পর পাতা উলটে যেতে ক্লান্তি আসে না। এই অংশে সবুজ নামের এক ছেলেকে গ্রেফতারের সিকুয়েন্স আছে। ওই অংশটা আমার ক্ষেত্রে একটা বড় চমক হয়ে এসেছে। এ ধরণের ক্ষেত্রে অন্যান্য থ্রিলার বইতে যেমনটা দেখা যায় কিংবা এমনকি এই বইটার গল্পও যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেই তুলনায় ঘটনপ্রবাহ একেবারেই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন লেখক। ওই জায়গাটুকু পড়েই মনে হয়েছে, ধরে রাখতে পারলে বেশ ভালো একজন লেখক পেতে যাচ্ছি আমরা।
নাইট অফ দ্য ফলেন স্টার
বইয়ে স্পাইস যুক্ত করতে চাইলে একটা সংঘ বা কাল্টের উপস্থিতি থাকা দরকার। লেখক এই কমন ফ্যাক্টরটাকে ধরেছেন। তবে উপস্থাপন করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। এখানের মূল চরিত্র শ্যাডো এজেন্ট ফারাবি ও আকিব। তবে এই জায়গাতেও চরিত্রের অভাব নেই। এখানের তদন্ত প্রক্রিয়া শব্দলের তুলনায় অনেক গুছানো এবং যৌক্তিক৷ একটার পর একটা সূত্র খুঁজে, একেকবার একেক জায়গায় হানা দেয়া, সেখানে ব্যর্থ হয়ে আবারও নতুন সূত্র খোঁজা এসব ব্যাপারগুলো ভালোভাবেই গল্পে এনেছেন লেখক। তবে এই অংশে নাটকীয়তার পরিমাণও একটু বেশি ছিল। যদিও তাতে আমার সমস্যা মনে হয় না। ফিকশন পড়িই তো এসব নাটকীয়তার জন্য।
তবে একটা ব্যাপার না বললেই না, বিভিন্ন পরিস্থিতির বর্ণনায়, সংলাপে কিংবা জিজ্ঞাসাবাদের অংশে লেখক বাস্তবতার যে ছোঁয়া রেখেছেন তা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। থানায় গেলে পুলিশের আচরণ, একটা ঘটনায় আশেপাশের মানুষের আচরণ৷ অভিযুক্ত বা সাধারণ মানুষদের প্রতি পুলিশের মনোভাব কিংবা পুলিশের প্রতি মানুষের মনোভাব সবকিছুই অতি স্বাভাবিক লেগেছে। লেখকের গদ্যশৈলী অতি চমৎকার। বর্ণনায়ন, সংলাপ এবং ঘটনাপ্রবাহের মাঝে চমৎকার ব্যালেন্স করেছেন। যে কারনে একটাবারের জন্যও গল্পের গতি ব্যহত হয়নি। একটানা পড়ে যাওয়া গিয়েছে।
বইয়ের সবটাই কি ভালো?
কিছু খামতি তো অবশ্যই রয়েছে। প্রথমেই বলতে হয় অ্যাকশন দৃশ্যের কথা। আমার কাছে সেগুলা দূর্বল বলে মনে হয়েছে। গতানুগতিক এবং ভিজ্যুয়ালাইজ করার মতো ওয়েল ডিটেইলড মনে হয়নি। ফারাবির কর্মকাণ্ড যদিও তার চরিত্রের সাথে ভালোভাবে মানিয়ে যায়, তবে কিছু জায়গায় সেগুলা অতিরঞ্জিত লেগেছে। লিখনশৈলী ভালো হলেও, শেষে এসে দূর্বলতাগুলো প্রকট হয়েছে। শেষের দিকে তাড়াহুড়োর ছাপ সুস্পষ্ট।
প্রচুর থ্রিলার পড়ার কারনে শেষের টুইস্টটা আগেই বুঝে ফেলেছিলাম। তবে তাতে করে আমার কোনো অসুবিধাই হয়নি। আর এটাই আমি মনে করি একজন লেখকের স্বার্থকতা। অনেক লেখক টুইস্ট দিতে গিয়ে শেষে এসে লেজেগোবরে করে ফেলেন। এখানে তেমনটা হয়নি। যৌক্তিক টুইস্টই দিয়েছেন। তবে যে ঘটনার উপর ভিত্তি করে পুরো গল্পটা এগিয়েছে সেই ঘটনাটা আরো অন্য রকমভাবে উপস্থাপন করে যেত বলে আমার মনে হয়েছে।
তবে যেসব খামতির কথা উল্লেখ করলাম তা আসলে সমালোচকের দৃষ্টি থেকে দেখেছি বলেই নজরে পড়েছে। বইটা এতটাই ভালো যে এগুলা আসলে ইগনোর করে অনায়াসে পড়ে যাওয়া যায়। সব মিলিয়ে আমি অতি অবশ্যই স্যাটিসফাইড। পড়া শুরু করার পর একটাবারও আমার মনে হয়নি সময় নষ্ট হচ্ছে। আর এই অনুভূতিটা বই শেষ করার পরেও টিকে ছিল।
ব্যক্তিগত রেটিং: ০৮/১০ (মাঝের ছোট দুইটা চ্যাপ্টারে পরশুরামের জিয়ৎকুণ্ডের বর্ণনায় কিছু ঐতিহাসিক অংশ এনেছেন লেখক। খুবই দূর্দান্ত হয়েছে সেই জায়গাটুকু। লেখকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন করার জায়গাই রাখেননি। কথা হলো এবার নিজের এই দক্ষতাকে উনি আরো কত শাণিত করতে পারেন সেটাই দেখার অপেক্ষায় রইলাম)
যুদ্ধ যদি এমন হয়, নিজ সৈন্যদের সংখ্যা কখনোই না কমে; তাহলে কেমন হয়? প্রতিপক্ষ একের পর এক আক্রমণ শানাচ্ছে, আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে শত্রুর নিধন; কিন্তু দিন শেষে শত্রুর সংখ্যা কমছে না, এমন ঘটনা কি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়?
বগুড়ার মহাস্থানগড়ে একটি কূপের কিংবদন্তি আছে। পরশুরামের শাসনামলে যার খনন করা হয়। যে কূপের পানির অলৌকিক ক্ষমতা আছে, এমন এক মিথ ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। সে পানি পান করলে না-কি জীবন ফিরে পাওয়া যায়। শাহ্ সুলতান বলখীর সাথে এক যুদ্ধে এই পানির ব্যবহার করেছিলেন পরশুরাম। এতে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে ফেলার সুযোগ হয়।
মহাস্থানগড়ের আরেকটি মিথ প্রচলিত আছে। বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি জানে না, এমন মানুষ হয়তো খুঁজে পাওয়�� কঠিন। কিন্তু যে কিংবদন্তি আমরা জানি, যে ইতিহাস আমরা শুনি; তার সতত্য যদি মিথ্যে প্রমাণ হয়? বেহুলার বাসর যেখানে হয়েছে বলে জানা যায়, তা যদি অন্যখানে হয়? তাহলে যে ইতিহাসের পাতাতে বিরাট রদবদল হবে।
◾কাহিনি সংক্ষেপ :
বগুড়ার মহাস্থানগড়ের অদূরে শিবগঞ্জ উপজেলার শান্ত, নিরুপদ্রব শব্দলদিঘী গ্রামে যেন নেমে এসেছে অশুভ ছায়া। এক ভ্যানচালক, যে কারো সাতে-পাঁচে থাকে না; তাকে কেন কেউ গু লি করে মেরে ফেলবে? শান্ত শব্দল তাই আলোচনার উপলক্ষ পেল। কিন্তু এই আলোচনা তখনই ভীতিতে রূপ নেয়, যখন একজন স্কুল পড়ুয়া ছেলে নিখোঁজ হয়। তাহলে কি এই শান্ত গ্রামে কোনো অপরাধীর আগমন হলো?
মশিউর রহমান একজন বৃদ্ধ যুবক। বয়স হলেও তার প্রাণ চঞ্চল মনোভাব থাকে বৃদ্ধ হতে বাঁধা দেয়। তিনি সমাজের চিন্তা করেন। বদলে দিতে চান সবার মানসিকতা। অনেক কাজের মধ্যে ডুবে যেতে চান। তাই নিজেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ হিসেবে তৈরি করেন। কিন্তু শব্দলের মতো জায়গায় যেখানে অপরাধ হয় না, সেখানে ডিটেকটিভ হিসেবে কাজের কিছু নেই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলে মনোযোগ দেন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা করার কাজে। যেখানে এলাকার মানুষ, স্কুলের ছেলেমেয়েরা লেখালেখি করবে। এই কাজের ফাঁকে গ্রামে একটি খু ন আর এক অপ হর ণ তাহলে পুরোনো কাজে ফিরিয়ে এনেছে। পুরোদস্তুর প্রাইভেট ডিটেকটিভ হয়ে অপরাধীর তালাশ করতে ছুটছেন।
শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস বাংলাদেশের সিক্রেট এজেন্সি। যার চিফ এসকেইউ সাবেক এনএসআই এজেন্ট। রাশভারী, রাগী এই মানুষটিকে সবাই ভয় পায়। দক্ষ হাতেই গড়ে তুলেছে তার দল। একদিন তার ডেস্কের উপর একটি চিঠি নজরে আসে। যে চিঠিতে হুমকি দেওয়া আছে, আছে পৃথিবী দখলের আভাস। এমন হুমকি তিনি অহরহ-ই পান। তাই গুরুত্ব দেন না। কিন্তু চিঠির পেছনে থাকা একটি চিহ্ন তাকে কৌতূহলী করে তোলে। সাথে ভয়ের এক ছায়া পড়ে অন্তরে। তিনি ফিরে যান অতীতে, যেখানে মুখোমুখি হয়েছিল এক অজানা শক্তির।
বিশ বছর আগের একটি গুপ্ত সংগঠন আবারও চলে এসেছে বর্তমানে। তাদের কাজ কী? কোন ক্ষমতা অর্জনের জন্য ছুটে চলে ওরা? বিশ বছর আগে যেভাবে তরুণীরা নিরুদ্দেশ হতো, আবারও কি সেই সময় আসবে? শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিসের চৌকষ দুই অফিসার ফাহিম ও আকিব খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে এর মূল। কিন্তু সেই দলটা যেন কো হেজি-পেজি গোছের কোনো দল না। তারা শক্তিতে অতুলনীয়। তাদের সাথে তাই টক্কর খুব সহজ হবে না।
আমেরিকা ফেরত এক বিজ্ঞানী শব্দলের মতন জায়গায় কী করছে? তার কি বিশেষ কোনো কারণ আছে? ইতিহাসবিদ সুলেমান সাহেবের ইতিহাসের জ্ঞান এই গল্পে কোনো ভূমিকা রাখবে কি? ফাহিমের হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া নিজেকে যেমন বিপদে ফেলে, তেমনি বিপদে ফেলে সহকর্মীকে। তাই ভুলের মাশুল দিতে হয় সাসপেন্ড হয়ে। কিন্তু যে কাজে সে হাত দিয়েছে, তার শেষ না দেখে সে ছাড়বে না। খুঁজতে খুঁজতে সে চলে এসেছে শব্দলে। যেখানে এক খুন আর এক অপহরণের কেস সামলাচ্ছে স্পেশাল ব্রাঞ্চের উৎস। পরিচয় হয় প্রাইভেট ডিটেকটিভ মশিউরের সাথে। দুই শ্যাডো এজেন্টের সাথে যুক্ত হয় এসআই শফিক।
সবাই মিলে এমন এক রহস্যের পেছনে ছুটছে যা তাদের নিয়ে যাবে এক কিংবদন্তি গল্পে। যে গল্প বয়ান দেয় অমরত্বের। প্রিয়জনের জন্য মানুষ সবকিছু করতে পারে। ভালোবেসে নিজের মেধা কাজে লাগাতে পারে, আনার প্রতিশোধ-পরায়ন হয়ে উঠতে পারে। তাই এই গল্পটা দিনশেষে হয়তো কাঠ-পুতুল হওয়ার, যে অন্যের হাতের ইশারায় চলে। কিন্তু এই ইশারা করা মানুষটি কি নিজের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাবে? না-কি নিঃশেষ হয়ে যাবে অচিরেই?
◾পাঠ প্রতিক্রিয়া :
অনেকদিন পর তৃপ্তি নিয়ে কোনো থ্রিলার শেষ করলাম। প্লট, এক্সিকিউশন, গল্পের গতিপ্রকৃতি, প্রাচীন বাংলা কিংবদন্তি, বৈজ্ঞানিক বিষয়, সবকিছুকে এক সুতোয় গাঁথা, চরিত্রগুলোকে যথাযথ ব্যবহার করা, কাহিনির মাঝে মাঝে চমক, মানুষের মনস্তত্ত্বের এক গুরুত্বপুর্ণ দিক — সবকিছুকে তাসিন আহমেদ যেভাবে বেঁধেছেন, মনেই হয়নি তিনি তার প্রথম বইটি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। এক ধরনের পরিণত ছাপ ছিল লেখকের লেখায়। গল্প বলার ধরনও আকর্ষণীয়।
আমার বেশ ভালো লেগেছে লেখকের লেখনশৈলী। ভাষাশৈলী ও শব্দশৈলীর ব্যবহারে একবারের জন্যও মনে হয়নি লেখক তার প্রথম বই লিখেছেন। পরিণত ছোঁয়া ছিল তার লেখার মধ্যে। ফলে পড়তেও আরাম লেগেছে। লেখকের লেখাও বেশ গতিশীল। এমন কাহিনির সাথে গতির এক সামঞ্জস্যপূর্ণ খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এইদিকে লেখক কিঞ্চিৎ দুর্বলতা দেখিয়েছেন। গতির নিয়ন্ত্রণ তিনি তেমন করতে পারেননি। বেশ কিছু ঘটনায় গতি ছিল লাগাম ছাড়া। এমন রোলার কোস্টার গতির গল্পে গতিপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। পাঠককে শ্বাস নেওয়ার সময় দিতে হয়। কিন্তু লেখক সেই জায়গায় গতির লাগাম টানতে অনেক জায়গায় ব্যর্থ হয়েছেন। খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না, তারপরও অতিরিক্ত গতিতে গল্প ছুটতে থাকলে মস্তিষ্কে ধারণ করতে বেগ পেতে হয়। একটা ঘটনা শেষ হওয়ার পর বুঝতে না বুঝতে আরেক ঘটনার সূত্রপাত ও ছুটে যাওয়া খেই হারিয়ে ফেলতে হয়।
উপন্যাসে দুটি ঘটনা সমান্তরালে এগিয়ে চলে। একদিকে শব্দলের ঘটনা, অন্যদিকে শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিসের কাহিনি। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, লেখক বাংলাদেশের ইন্টিলিজেন্সের নাম শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস দিয়েছেন। অথচ সিক্রেট শ্যাডো নামের অন্য একটা সিরিজ অলরেডি আছে। লেখক জানেন কি না জানি না, হয়তো নিতান্তই কাকতালীয়ভাবে মিলে গিয়েছে। তবে জানানোর জন্য বললাম আরকি।
সে যাই হোক, সমান্তরালে থাকা দুটি ঘটনাই ছিল আগ্রহ জাগানিয়া। একদিকে নিতান্তই খুন ও অপহরণের তদন্ত চলমান। অন্যদিকে একটি চিরকুট, একটি গুপ্ত সংঘ — যারা হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর। এমন দুই ভিন্ন ঘটনার সংযোগ লেখক কীভাবে ঘটান, সে বিষয়ে আমার বেশ আগ্রহ ছিল। এবং লেখক যেভাবে দুই পরিস্থিতি এক বিন্দুতে মিলিয়েছেন, প্রশংসার যোগ্য। চমকটাও বেশ ভালো ছিল। আগে থেকে কোনো আভাসই পাওয়া যায়নি।
লুসিফারের আরাধনা, ভাতৃসংঘ; এ জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে এক ধরনের কমন প্যাটার্ন থাকে। লেখক কীভাবে এই কমন প্যাটার্ন ভাঙার চেষ্টা করেন, সেটা জানার বড্ড আগ্রহ ছিল। লেখক ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। কাল্টের আড়ালে যেভাবে কাহিনির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেছেন, বিষয়টা বেশ ব্যতিক্রম। কাল্ট আনুষঙ্গিক কিন্তু কখনো প্রধান হয়ে উঠতে দেয়নি। রহস্যটা এভাবেই রেখেছেন লেখক। কোনোভাবেই আগে থেকে কোনো কিছুই বোঝা যাবে না। পাঠকের মস্তিষ্ক নিয়ে লেখক খেলা করেছেন।
তবে লেখক একটু বেশিই আক্রমণাত্মক। যেকোনো ঘটনা সমাধানের জন্য গোলাগুলির আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ লেখকের হাতে অন্যান্য অপশন থাকার কথা ছিল। কিন্তু লেখক আক্রমণের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। ফলে যে লাগাম ছাড়া গতির কথা বলছিলাম, তার কারণ লেখকের অতিমাত্রায় আক্রমণাত্মক হওয়া। শুরুর দিকে এই আক্রমণের বিষয়গুলো লেখক যেভাবে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তেমনটা পারেননি। না-কি আমি বুঝিনি, কে জানে! সময়ের সাথে সাথে বর্ণনাগুলো পরিণত হয়েছে। তবে এতবেশি গোলাগুলির আশ্রয় না নিয়ে আরো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা যেত বলেই মনে হয়েছে।
উপন্যাসে দুইটি বাংলার কিংবদন্তির কথা বলা হয়েছে। লেখক যেভাবে কিংবদন্তিগুলো উপস্থাপন করেছেন, বা মূল উপন্যাসের সাথে জুড়ে দিয়েছেন বেশ ভালো লেগেছে। তবে আমি আরেকটু বেশি প্রত্যাশা করেছিলাম। বেহুলা ও লখিন্দরের কাহিনি তাদের মধ্য দিয়ে বর্ণনা করা যেত। আর জিয়ৎকুন্ডের ঘটনা সংক্ষিপ্ত পরিসরে না দেখিয়ে আরেকটু বিস্তারিতভাবে দেখানো যেত। তাহলে হয়তো আরেকটু বেশি তৃপ্তি পেতাম। মোটের উপর বেশ ভালোভাবেই লেখক সবকিছুর এক সংযোগ জুড়ে দিয়েছেন।
কিছু অতীতের ঘটনা এখানে এসেছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এই ঘটনা শুধু গল্প���র গাঁথুনি মজবুত করতে বা ব্যাকস্টোরি বোঝাতে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু এখানেই লেখক তার তুরুপের তাস প্রয়োগ করেছেন। এই ঘটনা যে মূল ঘটনার একটা হয়ে উঠবে, পুরো রহস্যের চালিকাশক্তি হয়ে যাবে, আগে থেকে বোঝা যায়নি। পুরো ঘটনার মূলভাব যেন অচিরেই পাল্টে গেছে। মানুষ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। হতে পারে তা প্রয়োজন হারানোর কারণে। কিংবা এই জং ধরা সিস্টেম বা আমাদের সমাজের যে কার্যক্রম, তার প্রতি। বদলে দেওয়ার চেষ্টা কেউ কেউ তো করে। কিন্তু পুরোটাই কি বদলে দিতে পারে? দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা যে সিস্টেম, তাকে কি বদলে ফেলা যায় সহজেই? না-কি অজান্তেই নিজেকেই এই সিস্টেমের অংশ হয়ে যেতে হয়।
উপন্যাসের চরিত্রগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং। একদিকে আছে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ, যার এটাই প্রথম কেস। অন্যদিকে সাধারণ পুলিশ অফিসার, স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ, সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্ট। সবাইকে লেখক বেশ দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা উপন্যাসে অনস্বীকার্য। বিশেষ করে প্রাইভেট ডিটেকটিভ মশিউর রহমানের বুদ্ধিমত্তা বেশ মনে ধরেছে। এখানে তার দুইজন সহকারী আছে। একজন হাসান, আরেকজন ফরহাদ। দুইজনের চরিত্রকে লেখক বেশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন ব্যাকস্টোরিসহ। কোনো কার্পণ্য করেননি।
তবে স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ উৎসকে শুরুতে পছন্দ হয়নি। এখানে লেখক চরিত্রটিকে দিয়ে জোর করেই যেন হাস্যরস সৃষ্টির প্রয়াস করেছেন যা বিরক্ত লেগেছে। তার কাজের পর হুট করেই যেন উৎস গায়েব হয়ে গেল। এই চরিত্রটিকে আরও ভূমিকা দেওয়া যেত সমাপ্তির ঘটনায়। যেখানে সে জানে পরবর্তী ঘটনা কী ঘটছে। সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্ট ফাহিম ও আকিবকে বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন লেখক। তবে আকিবের অতীত যেন এখানে সবচেয়ে বড় চমক। এমন ঘটনা প্রত্যাশারও বাইরে ছিল। কিন্তু ফাহিমের বিষয়ে খুব একটা জানা যায়নি, যেখানে লেখক আভাস দিয়েছেন তার অন্ধকার এক অতীত আছে।
শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস নিয়েও তেমন একটা বর্ণনা এখানে ছিল না। যতটা ঘটনার প্রয়োজনে আসে, ঠিক ততটাই। তবে একটা সিক্রেট সার্ভিসের কর্মপদ্ধতি আরেকটু বিস্তারিত বর্ণনা করা যেত। একই সাথে ফরেনসিক বিভাগের ঘটনাও এসেছে সামান্য। এই দিকে গুরুত্ব দেওয়া যেত বলে মনে হয়েছে। বইতে যে বিজ্ঞানী ছিলেন, তার মনস্তত্ত্বের যে দিক লেখক তুলে ধরেছেন তারিফ করার মতন। প্রিয় মানুষকে বাঁচানোর তাগিদে মানুষ কত কী না করে!
আমার মনে হয়েছে লেখক চাইলে ভিলেনের দিক দিয়ে আরেকটু কিছু দেখানো যেত। শুরু আর শেষ ছাড়া রহস্য যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে এখানে। লেখক সম্ভবত ইচ্ছা করেই এই রহস্য বাড়িয়ে নিতে চেয়েছেন। তবে শেষটা চমকপ্রদ। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অতিরঞ্জিত বিষয় নেই। একেবারে পিন পয়েন্ট ফিনিশিং যাকে বলে। শেষে ক্লিফহ্যাঙ্গার রেখে দিয়েছেন লেখক। এখান থেকে নতুন কিছু শুরু হলেও হতে পারে। সম্ভবত লেখকের সেই ইচ্ছাও আছে।
◾বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
“জিয়ৎ” বইটিতে বেশ কিছু ছাপার ভুল চোখে পড়েছে। বানান ভুলও ছিল কিছু। দুয়েক জায়গায় নামের অদল বদল, শব্দের অদল বদল ছিল। যেমন এক জায়গায় অনুধাবন শব্দের পরিবর্তে অনুবাধন লেখা ছিল। কয়েক জায়গায় যুক্তবর্ণ ভেঙে গিয়েছিল।
এছাড়া সম্পাদনা ঠিকঠাক ছিল। বাঁধাই বেশ মজবুত। ঋদ্ধ প্রকাশের প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ নেই।
প্রচ্ছদটাও বেশ ইউনিক। দেখতে ভালো লাগে।
◾পরিশেষে, এক জীবনে মানুষ হয়তো দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে চায়। এই পৃথিবীর আলো বাতাস উপভোগ করতে চায়। কিন্তু কেউ কেউ চায় আজীবনের চালিকাশক্তি, চায় অমরত্ব। কিন্তু মৃত্যু তো মানুষের জীবনে নিরেট বাস্তব এক বিষয়। তাকে হারিয়ে অমরত্ব পাওয়ার চেষ্টা করলে কি সফল হওয়া যায়?
◾বই : জিয়ৎ ◾লেখক : তাসিন আহমেদ ◾প্রকাশনী : ঋদ্ধ প্রকাশ ◾প্রকাশ সাল : বইমেলা ২০২৫ ◾পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৩৬ ◾মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ ◾ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
দুইদিনের দুনিয়া। জন্মিলে ম রিতে হইবে, অমর কে কোথা রবে?
আসলেই কি তাই? নাকি ইতিহাসের আড়ালে এমন কিছু আছে যা প্রচলিত ধ্যান ধারনাকে পাল্টে দিতে পারে? তিনবেলা খাওয়া, ঘুম, সিস্টেমের জাতায় চাকরি-বাকরি করে ঘর সংসার চালিয়ে একটা পর্যায়ে জীবনের এই প্রতিযোগিতা থেকে অবসরের নামই কি মানবজীবন?
❛আমরা সিস্টেমের অংশ। ঘুনে ধরা সিস্টেমকে যতোই বকে দেইনা কেন দিনশেষে সবাই আমরা সিস্টেমের দাস। এমনকি সিস্টেমের বাইরে যেতে চাওয়াও হতচ্ছাড়া সিস্টেমের একটা অংশ!❜
যদি বলা হয় অমুক জায়গা একেবারে শান্তির, নিঃস্তব্ধ, ঝামেলা ছাড়া, তবে ধরে নিতে হবে কোনো লেখক নিশ্চয়ই সেখানে কাহিনি করতে প্রস্তুত হচ্ছেন।
এই যেমন, বগুড়ার অদূরে শিবগঞ্জের ভেতর শব্দল নামক এক গ্রাম। সেখানে সবাই সুখে থাকে। কোনো অপরাধ নেই তেমন। সবাই ভালোই ছিল। কিন্তু হুট করেই এই শান্তির পানির মাঝে ইটের টুকরা এসে আন্দোলিত করে দিলো গ্রামটাকে। পথের মাঝে দেখা মিললো কিসলু নামক নিরীহ এক ভ্যানচালকের নিষ্প্রাণ দেহ। গরীব, অসহায় এক ভ্যান চালক কেন কারো শ ত্রু হতে যাবে? উত্তর নেই। তদন্ত কর্মীরাও হদিশ পাচ্ছে না এর।
মশিউর সাহেব জীবনের তারুণ্য পেরিয়ে এসেছেন অনেক আগে। এখন চাচা পর্যায়ের লোক। কিন্তু বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর। শব্দলে তিনি পরিবর্তন আনতে চান। একটা মাসিক পত্রিকা প্রকাশের তোড়জোড় করছেন। তিনি আবার শখের গোয়েন্দা। দুইজন সাগরেদও আছে। হাসান এবং ফরহাদ। শব্দলে নতুন এই ঘটনা তাকেও আন্দোলিত করলো। লেগে পড়লেন তিনিও। কিন্তু বাস্তবে শখের গোয়েন্দাকে গুণেই কয়জন? প্রতিকূলতা..
শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস তথা এসএসএস বেশ নাম কামিয়েছে। তাদের চিফ এসকেইউ। তাকে যমের মতোই ভয় পায় জুনিয়ররা। প্রতিদিনের মতোই অফিসে নিজের ডেস্কে বসে আরেকটা দিনের সূচনা করতে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু চোখে পড়লো একটা চিরকুট। হু মকি দেয়া চিরকুট। সার্ভিস এই এজেন্সির জন্য এসব হুমকি ধামকি ডালভাত। কিন্তু মাথা ঘুরে গেল চিরকুটের পেছনে থাকা একটা নাম বা চিহ্ন দেখে। এসকেইউ ভেবে পান না কী করে সম্ভব এটা!
বিশ বছর আগে সমূলে উৎপাটন করা একটা কাল্ট কী করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো? জবাব নেই। জবাব পেতে কাজে লাগালেন এজেন্ট আকিব এবং আরেক ঘাড় ত্যাড়া এজেন্ট ফাহিমকে। দুজনে মিলে খুঁজে যেতে লাগলো রহস্যের কিনার।
শব্দলে আসলেই বড় নজর লাগছে। না হয় ভ্যান চালকের এমন খু নের কিনার না হতেই অপহরণ হয়ে গেল এলাকার নামি ব্যক্তির ছেলে। পুলিশ কিসলুর কেসে তেমন গা করতে না চাইলেও এখন চুপ থাকা যায় না। মশিউর সাহেবও লাগলেন একই কাজে। সেইসাথে আসলেন স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসার উৎস। বেশ বড়ো জায়গাতেই হানা দিতে হবে।
অতীত বড়ো পীড়া দেয়। অতীতের জখম গুলোই বর্তমানকে প্রভাবিত করে। বেশি পীড়াদায়ক অতীত আবার প্রতিশোধের নেশাকে বাড়িয়ে দেয়।
শব্দলে আরো বেশ কয়েক বছর আগেই এসেছেন এক বিজ্ঞানী। বিদেশের রঙিন জীবন ফেলে এমন অজপাড়াতে ঠাঁই নেয়ার কারণ কী? কী করছেন সবার অগোচরে তিনি?
শব্দলকে আবার ভয় পাইয়ে দেয় আরো আগে নিখোঁজ হওয়া ইকবালের মৃ তদেহ। যার উচ্চতা অস্বাভাবিক বেশি। কীসের শিকার হয়েছিল সে?
আকিব, ফাহিম নিজ কাজে কিছুটা ব্যর্থ হওয়ায় সাসপেনশন ঘাড়ে জোটে। তবে কেস ছুটে গেলেও কেসের পিছে ছোটা বন্ধ হয়না তাদের। তারা পাড়ি জমায় এক গাঁয়ে। সবকিছু একত্র হচ্ছে। রহস্য সমাধান হবে নাকি নতুন রহস্য উন্মোচন হবে?
মিথ, ইতিহাস আর এর সত্যতা বেশ ঘাম ঝরানো বিষয়। আমরা যা জানি দেখা গেল তার পুরোটাই শুভঙ্করের ফাঁকি। হয়তো চোখে ধুলা দিয়ে আসল সত্য রয়ে গেছে একদম গোপনে। প্রকৃতি তার সব রহস্য মানুষকে দেখাতে চায় না। আর মানুষ যখন সেই রহস্য উন্মোচন করতে চায় প্রকৃতি কি তাকে ছেড়ে দেয়? কী আছে এমন জিয়ৎকুন্ডে? বেহুলা লখিন্দরের বাসর ঘর নিয়ে আমরা যা জানি তার কতটা সত্য?
পুলিশ, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, শ্যাডো, শখের গোয়েন্দা সবাই ছুটেছে রহস্য সমাধানে। শেষ পর্যন্ত কী হবে অজানা।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝জিয়ৎ❞ তাসিন আহমেদের লেখা প্রথম উপন্যাস। আসলেই? প্রথম লেখা কারো এত দারুণ হতে পারে? পারে, পারে। এই উপন্যাসটি তার এক টুকরো প্রমাণ ধরা যায়।
বইটা প্রকাশ হওয়ার পর নাম দেখে আগ্রহ হয়েছিল, তবে কী নিয়ে লেখা ধ��রনা ছিল না। রিভিউ দেখেছি বেশ কিছু তবে বই না পড়ে রিভিউ পড়া হয়না আমার। এজন্য বইটা এবার পড়েই ফেললাম। তবে নিজের কাছেই নিজে অসন্তুষ্ট। দারুণ এই বইটা আমি অনেক অনেক বেশি সময় খরচ করে পড়েছি। প্রায় এক সপ্তাহের বেশি লেগেছে। দোষটা অবশ্যই লেখকের না। দোষটা আমারও না। দোষ মোবাইলের। যাই হোক আসল কথায় আসি।
উপন্যাসের শুরুটা ম্যাড়মেড়ে লেগেছে। তেমন আগ্রহ পাচ্ছিলাম না। অতীতের একটু আলাপন ছিল। এরপরেও কোনো রকম ভূমিকা ছাড়া বর্তমানে প্রবেশ। এরপর থেকেই ঘটনা এগিয়ে যায়। একই সময়ের সমান্তরালে দুটো জায়গায় ঘটনা তাল মিলিয়ে এগোয়। এরপর একত্র হয়ে যায়। মাঝে ছিল অতীতের দেখা। যা গল্পের মূল গাঁথুনিতে প্রভাব ফেলেছে। লেখকের সময়ের এই এক্সিকিউশন বেশ ছিল। ঘটনাগুলো এমনভাবে এসে একত্রে জুড়েছে যে প্রথমে ধারনা করা যায়নি।
রহস্যের উপাদান আনতে লেখক এখানে ❛নাইট অফ দি ফলেন স্টার❜ নামক এক কাল্টকে এনেছেন। তাদের দিয়েই রহস্য তৈরি করেছেন। আর সেইসাথে এনেছেন ভেতরের অজানা মুখ্য উদ্দেশ্যকে।
একটা সংঘ আনার সাথে সাথে লেখক জুড়েছেন বাংলার প্রচলিত পুরাণকে। বাংলার পুরাণ সমৃদ্ধ কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার বা সংরক্ষণের অভাবে সেগুলো আসলে আলো পায় না। এমনই প্রচলিত দুটো মিথ নিয়ে লেখক বলা যায় পুরো গল্পের ভিত্তি তৈরি করেছেন। এখানে ছিল একদম দূর অতীতের কথাও। যদিও এই অংশে এসে আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল চাইলে এর ব্যাখ্যা আরেকটু দেয়া যেত। আর অতীতের এই অংশের শুরুটাও হুট করে হয়েছিল। শেষটাও জলদি করে দিয়েছেন। এখানে সময় নিলে সমস্যা হতো না।
লেখক অনেক অনেক ঘটনা এনেছেন। এনেছেন অনেক সন্দেহ। আর এই সন্দেহের ডামাডোলে আমি একটা চরিত্রের অল্প একটু অতীত মনে করার স্থানেই টুইস্ট ধরতে পেরেছিলাম। যদিও উপন্যাস উপভোগ করায় সেটা প্রভাব রাখেনি। লেখক অনেক ঘটনা, রহস্য আর পরপর টুইস্ট দিয়ে মাতিয়ে রেখেছেন।
শুরুতেই লেখক বাজিমাত করলেন কিনা সে প্রসঙ্গে যাবো না। তবে প্রথম উপন্যাস হিসেবে বেশ ভালো করেছেন। গল্পের শুরু, সুতা ছেড়ে হুট করেই পুরো ঘটনা পাল্টে দেয়ার ব্যাপার এবং শেষের অসমাপ্ত ব্যাপার বেশ ভালো ছিল।
শেষটা পাঠকের ভাবনা থাকবে। হয়তো নতুন করে আসতে পারে পুরোনো কেউ। লেখক অ্যাকশন গুলো এনেছেন অনেক। তবে সেখানে আরো উন্নতি করা যেত।
চরিত্র:
৩৩৬ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে ভাইটাল ফ্যাক্টর ছিল এখানে আসা অনেক চরিত্র। লেখক অনেকগুলো মুখের আশ্রয় নিয়েছেন। গল্পের এক অধ্যায়ে যেন টুপ করেই একেক চরিত্র হাজির হয়ে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে আমি একটু খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। শুরুতে বুঝতে পারছিলাম না। কারা এরা? কোথা থেকে এলো?
এরপর ধীরে ধীরে তাদের অতীত গল্প রোমন্থন করেছেন লেখক। আবার কিছুক্ষেত্রে লেগেছে কয়েকটা চরিত্রকে আরো স্পেস দেয়া যেতো। তাদের অতীত নিয়ে আরো জানানো যেতো।
খলনায়কের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা লক্ষণীয় ছিল। যদিও এর স্টোরি বুঝতে পেরেছি। তবে মাঝে সাঁঝে কোথাও একটু রহস্যময় উপস্থিতি থাকতে পারতো।
উপন্যাসে শখের গোয়েন্দা মশিউর বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তার খবর পাওয়ার ব্যাপারগুলো ভালো ছিল। কিছুটা কাকতাল কিংবা ধুপধাপ খবর আসার ব্যাপারটা একটু অবাক লাগলেও তাকে ভালো লেগেছে। প্রথম কেস হিসেবে তার অপরিপক্কতা চলনসই। পোড় খেলে ঠিক হবেন!
ফাহিম রু ড, হাতছাড়া। তাকে এই ভালো এই মন্দ লাগলেও তার পোটেনশিয়াল ভালো লেগেছে। লেখক এই চরিত্রের কালো অতীত ধোঁয়াশা রেখেছেন। তাকে নিয়ে হয়তো পরিকল্পনা আছে।
স্পেশাল অফিসার উৎসকে একটু পিকুলিয়ার হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হলেও তার চরিত্রের টার্ন ভালো লেগেছিল। ইচ্ছে করে ভাড়ামো করার পিছে যে দক্ষতা আছে আঁচ করতে পেরেছি। তবে তাকে হুট করে গায়েব না করে শেষ পর্যন্ত রাখা যেত।
চিফ কামাল উদ্দিনের অতীত অল্পই জানা গেছে। তাকে আরো জানার ইচ্ছা রইলো।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
প্রচ্ছদ চলনসই।
বইতে ছাপার ভুল ছিল অনেক। শব্দগুলো কেমন যেন খাপছাড়া লাগছিল কিছু জায়গায় পড়তে গিয়ে। সেটা ছাপার ভুল কিংবা প্রুফের ঘাটতি ছিল বলে হয়তো। বাদবাকি সব ঠিক ছিল। লেখকের লেখা একবার পড়ে দেখাই যায়। প্লট, গল্পের ব্যাপ্তি, সমাপ্তি আর অল্প কিছু ধোঁয়াশা মিলে উপন্যাসটা উপভোগ্য।
❛প্রতিশোধের ভাষা সবসময়ই নেতিবাচক। কারো করা কোনো ভুল বা ইচ্ছাকৃত অপরাধ ভুক্তভোগীকে বদলে দেয়। অধরা কোনো কিছুর জন্য তখন সে ম রিয়া হয়ে যায়। ক্ষমতা, লোভ আর অজেয় হওয়ার এই বাসনাই নতুন কোনো বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। এটাই মানব জাতির পুনরাবৃত্তি করা সবথেকে প্রচলিত ভুল।❜
ভালই এনজয় করেছি, লেখকের প্রথম বই হিসেবে দারুণ। প্লট ভাল, গল্পে গতি ছিল, লেখনি সুন্দর-সাবলীল, মাঝে দুটো অধ্যায় ছিল যেখানে পরশুরাম-পূন্ড্রনগর এর ইতিহাস দেয়া, অধ্যায় দুটো চমৎকার লেগেছে। বাস্তবের কোনো স্টোরির সাথে ইতিহাস/মিথের সংমিলন সবসমই ভাল লাগে, আর ইতিহাস আমাদের নিজেদের হলে তো কথাই নেই। গল্পে বেশ কিছু ফাঁক-ফোকোর ছিল, এক্সিকিউশিনটা আরো ভাল হতে পারত; যেহেতু প্রথম বই, আশা করি সামনে লেখা আরো স্ট্রং হবে। সিকুয়েল আসবে মনে হচ্ছে, তেমনই ইঙ্গিত ছিল শেষে। শুভকামনা।
বাংলাদেশের বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ছোট্ট একটা গ্রাম শব্দলদীঘি। শান্তশিষ্ট এই গ্রামটা ইদানীং হঠাৎ করেই যেন অশান্ত হয়ে উঠেছে। ভ্যানচালক কিসলুকে কে বা কারা খু'ন করে ফেলে রেখে গেলো। দিন এনে দিন খাওয়া সহজসরল মানুষটাকে কারা এভাবে খু'ন করলো শত ভেবেও কেউ কোন কূলকিনারা করতে পারলো না। এদিকে গ্রামেরই এক প্রভাবশালী ব্যক্তির একমাত্র কিশোর ছেলে নাহিন নি'খোঁ'জ হয়ে গেলো। তবে কি কিসলু'র খু'ন আর নাহিনের হারিয়ে যাওয়া কি একই সুতোয় বাঁধা?
রিটায়ার্ড ব্যাংকার মশিউর রহমান একজন শখের গোয়েন্দা। শার্লকের ওয়াটসনের মতো মশিউর সাহেবের আছে হাসান নামের এক সহকারী। তাঁরা দু'জন নেমে পড়লেন শব্দলে ঘটে যাওয়া ঘটনাদুটোর তদন্তে। এদিকে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশের লিডিং ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস-এর হেড অফিসে। শ্যাডো চিফ শেখ কামাল উদ্দিন ওরফে এসকেইউ-এর ডেস্কে পাওয়া গেলো একটা অদ্ভুত চিরকুট। চিরকুটের লেখাগুলো পড়ে খোদ শ্যাডো চিফের কপালে দেখা গেলো চিন্তার রেখা।
বহু বছর ধরে মানুষ অনেক নি'ষি'দ্ধ জ্ঞা'নের চর্চা করে আসছে। এদের মধ্যে একটা অংশ আজও অমরত্বের সন্ধানে ব্যয় করছে নিজেদের সমস্ত রিসোর্স। এমনই একটা স্যা'টা'নি'ক কা'ল্ট নাইট অব দ্য ফলেন স্টার। একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই কাল্ট আবারও ফেরত এসেছে। বাংলাদেশের বুকে জোরেসোরে শুরু করেছে নিজেদের কর্মকাণ্ড। প্রভু লু'সি'ফা'রের প্রতি স্যা'ক্রি'ফা'ই'স হিসেবে তরুণী মেয়েদেরকে ব'লি পর্যন্ত দিচ্ছে এরা। নাইট অব দ্য ফলেন স্টার-কে সমূলে উৎপাটন করতে শ্যাডো চিফ এসকেইউ নিয়োগ করলেন তাঁর দুই দুর্ধর্ষ এজেন্ট ফাহিম ফারাবি ও আকিব জিলানকে।
শব্দলে কিন্তু রহস্যময় ঘটনা ঘটা বন্ধ হয়নি। এরইমাঝে একদিন সেখানে পাওয়া গেলো অদ্ভুত এক লা'শ, যার দৈর্ঘ্য প্রায় বারো ফুট! কালো কাপড় পরা কিছু লোককে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেলো আশেপাশে। আমেরিকা ফেরত বিজ্ঞানী জুবায়ের আল মাহমুদের ওপরও যেন নজর রেখে চলেছে অজ্ঞাত কিছু ব্যক্তি। একের পর এক ঘটে চলা সব অঘটনের সাথে স্যা'টা'নি'ক কাল্ট আর অমরত্বের কোথাও একটা নিবিড় যোগাযোগ লক্ষ্য করলো শ্যাডো এজেন্ট ফাহিম ফারাবি ও আকিব জিলান। তারা কি পারবে এই অঘটনগুলো থামাতে? আর এসবের সাথে হাজার বছর আগের ইতিহাসেরই বা সম্পর্ক কি?
তরুণ লেখক তাসিন আহমেদের 'জিয়ৎ' পড়ার ইচ্ছা ছিলো অনেকদিন থেকেই। অবশেষে পড়েও ফেললাম। 'জিয়ৎ'-এ মূলত উঠে এসেছে এক স্যাটানিক কাল্টের সাথে বাংলাদেশি এক ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির দ্বৈরথের গল্প। মূল এই থিমের আশেপাশে প্রভাবক ও অনুঘটক হিসেবে লেখক অবতারণা করেছেন আরো কিছু ছোটখাটো ঘটনার। প্লটটা একদম পিকিউলিয়ার না৷ তবে তাসিন আহমেদের প্রথম কাজ হিসেবে তাঁর পুরো প্রচেষ্টা ছিলো এটাকে ভিন্নরকম কিছু হিসেবে দেখানোর। 'জিয়ৎ' আমার কতোটুকু ভালো লাগলো বা কতোটুকু খারাপ লাগলো সেটা নিয়ে তো আমি কথা বলবোই। কিন্তু সবার আগে আমি বাহবা দিতে চাই তাসিন আহমেদকে, লেখালেখির শুরুতেই এমন একটা প্লট বেছে নেয়ার জন্য। থ্রিলার সাহিত্যের পথে তাঁর যাত্রার শুরুটা নেহাত খারাপ হয়নি।
'জিয়ৎ' নিয়ে আমার এক্সপেকটেশন অনেক ছিলো। বিশেষ করে গুডরিডস-এর পজিটিভ রেটিং ও রিভিউ দেখার পর সেটা বেড়ে গিয়েছিলো। তবে এটাও মাথায় রেখেছিলাম যে এটা লেখকের প্রথম উপন্যাস। তাই পড়া শেষে আশাহত হতে গিয়েও হইনি। আবার আশা পূরণও হয়নি৷ তাসিন আহমেদ তাঁর এই উপন্যাসটা মোটামুটি বড়সড় একটা ক্যানভাসে লেখার চেষ্টা করেছেন। সেটা করতে গিয়ে প্রচুর চরিত্র এসেছে। তবে মূল থিমটা কিন্তু এতো বিস্তৃত মনে হয়নি আমার। যে কারণে এতোগুলো চরিত্রও আমার অপ্রয়োজনীয় লেগেছে। আর বেশিরভাগ চরিতের চরিত্রায়নে লেখক সময় দিয়েছেন কম। ক্ষেত্রবিশেষে খুবই কম। আরেকটা ব্যাপার বেশ অদ্ভুত লেগেছে। তা হলো 'জিয়ৎ'-এ নারী চরিত্রের খুব কম উপস্থিতি। কম মানে খুবই কম। যাই হোক, ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের ব্যাপারে লেখককে আরো সময় দিতে হবে।
উপন্যাসের শুরুটা প্রমিসিং ছিলো। মাঝামাঝি পর্যন্ত মোটামুটি গতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন লেখক তাসিন আহমেদ। অনেকটা সফলও হয়েছেন। কিন্তু এরপর মাঝেমাঝেই বোর হয়েছি। একটু একঘেয়ে লাগা শুরু হয়েছিলো। প্রায় প্রত্যেক অধ্যায়ের শুরুতে লেখক আবহাওয়া বা পরিবেশের কাব্যিক বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। সেটা মাঝেমাঝে দীর্ঘ হয়ে গেছে। ব্যাপারটা বেশ বিরক্ত করেছে বইটা পড়তে গিয়ে। কিছু সিরিয়াস সিকোয়েন্সের মাঝে চরিত্রগুলোর নিজস্ব চিন্তাভাবনা এতো রিপিটেটিভলি এসেছে যে মূল সিকোয়েন্সগুলো থেকে ছিটকে যেতে হয়েছে। এই বাহুল্যগুলো বাদ দেয়া গেলে 'জিয়ৎ' আরো খানিকটা উপভোগ্য হতে পারতো।
'জিয়ৎ'-এর মূল প্রোটাগনিস্ট এজেন্ট ফাহিম ফারাবি ও আকিব জিলানের ক্ষমতা অতিরিক্ত সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। দেশের প্রথম সারির একটা সিক্রেট এজেন্সির ক্ষমতা এতোটা কম হওয়ার কথা না। আবার একটা স্যা'টা'নি'ক কাল্টের পেছনে তাদের ধাওয়া করে বেড়ানোর ব্যাপারটা অনেক জায়গাতেই অ্যামেচারদের মতো লেগেছে আমার কাছে। কিছু জায়গায় মনে হয়েছে শুধু ডিডাকশনের জোরেই এজেন্টরা কাজ করছেন। ডিটেইলিংয়ের ব্যাপারে অনেক জায়গাতেই ঘাটতি লক্ষ্য করেছি। শুরুর দিকে বেশ কয়েক জায়গায় কিছু চরিত্রের নাম ও পদবী এদিক-ওদিক হয়ে গেছে। মোটকথা, 'জিয়ৎ'-এর প্লটটা মোটামুটি ভালো হলেও এর এক্সিকিউশনে অনেক কমতি লক্ষ্য করেছি। তাসিন আহমেদের প্রথম উপন্যাস হিসেবে এই কমতিগুলো মেনে নেয়া যায়। তাঁর পরবর্তী কাজগুলোতে উন্নতি চোখে পড়বে, এমনটাই আশা করি।
বইয়ের অনেক জায়গাতেই ভুল বানান ও বাক্যগঠন জনিত ভুল চোখে পড়েছে। সম্পাদনা ও প্রুফ রিডিংয়ে আরেকটু সিরিয়াসনেস দরকার ছিলো বলে মনে হয়েছে আমার। নতুন লেখক হিসেবে তাসিন আহমেদের প্রথম কাজ 'জিয়ৎ'-এর বাহুল্যগুলো ছেঁটে ফেলা গেলে এটা একটা নির্মেদ থ্রিলার উপন্যাস হয়ে উঠতে পারতো। আরো অনেক রাস্তা বাকি। লেখকের প্রতি আরো স্টাডি করার, আরো রিসার্চ করার সাজেশন রইলো।
পরাগ ওয়াহিদের করা প্রচ্ছদটা খুব একটা ভালো লাগেনি। এলিমেন্টগুলো সঠিকভাবে ফুটে ওঠেনি। প্রোডাকশন চমৎকার হয়েছে।
বই : জিয়ৎ লেখক : তাসিন আহমেদ জিম প্রকাশনী : ঋদ্ধ প্রকাশ প্রকাশ সাল : বইমেলা ২০২৫ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৩৬ ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৮/৫
"এদেশে কোনো কেসের গুরুত্ব নির্ভর করে ভিক্টিম আর সাসপেক্টের সামাজিক অবস্থানের ওপর ।"
"অমরত্ব অনেক কঠিন এক বর,সুলতান।এর লোভ সামলানো কঠিন ।যতদিন জিয়ৎকুন্ড থাকবে,অমরত্ব নিয়ে মানুষ লড়াই করবে।যুদ্ধ হবে।শান্ত হবে না দুনিয়া।এই কালো ইতিহাস আপনি নিশ্চিহ্ন করে ফেলুন ।"
কাহিনী সংক্ষেপ: মহাস্থানগড়ের অদূরে শান্তশিষ্ট নিস্তরঙ্গ মফস্বল শব্দলদীঘি ।সে নির্জনতায় চির ধরিয়ে হয়ে গেলো একটি খুন।সাধারণ ভ্যানচালক কিসলুর সে খুনের তদন্তে নেমে পড়লেন শখের গোয়েন্দা বৃদ্ধ মশিউর সাহেব,সাথে তার সহকারী হাসান । একটা চিরকুট আসে শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস চিফের কক্ষে।চিরকুটের পেছনে একটা চিহ্ন।চোখ কুঁচকে যায় চিফের।বিশ বছর আগের এক কাল্ট-নাইট অব দ্য ফলেন ষ্টার। তবে কি আবার ফিরে এসেছে ওরা? ওদিকে শব্দলে পাওয়া গেল রহস্যময় নিখোঁজ সংবাদ ,খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এক স্কুলছাত্রকে।রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে।শব্দলে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা।সে অমানিশার মাঝেই ভেসে ওঠে আরেকটি লাশ। ভয়ানক ব্যাপারটা হচ্ছে বিকৃত এই লাশের দৈর্ঘ্য হচ্ছে বারো ফিট । বীভৎস অস্বাভাবিক লাশ,কাল্ট এবং সবার অগোচরে থাকা এক এক্সপেরিমেন্ট - সবকিছু মিশে যায় এক বিন্দুতে।ইতিহাস!বাংলার হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: প্রথমত প্লটটা আমার কাছে ইউনিক লেগেছে। এমন প্লট নিয়ে লেখা বই আগে পড়া হয়নি ।একজন নতুন লেখক হিসেবে ইতিহাস,মিথ,বিজ্ঞান,একটা কাল্টকে যেভাবে একত্রিত করেছেন,তা প্ৰশংসনীয়। এক্সিকিউশন, গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ,গল্প বলার ধরন,ভাষাশৈলী ও শব্দশৈলীর ব্যবহারে একবারের জন্যও মনে হয়নি লেখকের প্রথম বই পড়ছি । শুরু থেকে গল্প দুইটা ভিন্ন শহরের ঘটনা দিয়ে এগোচ্ছিল।লেখক যেভাবে দুই পরিস্থিতি এক বিন্দুতে মিলিয়েছেন, প্রশংসার যোগ্য।চমকটাও বেশ ভালো ছিল।
চরিত্রগুলোর বিল্ডিং এ বাড়তি নজর দিয়েছেন;যা গল্পের গভীরে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে ফাহিম ফারাবী চরিত্রটা আর তার হিউমর দারুণ লেগেছে ,গল্পে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে ।সব চরিত্রের ব্যাকস্টোরি প্রকাশ না করলেও(শুধু খন্ডচিত্র ছিল)যে কয়টা করা হইছে,তার একটাতে ছিল আমাদের সমাজের অন্যতম এক নোংরা দিক আর দেখানো হইছে কিভাবে ছোট্ট একটা ঘটনা বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর মতো বড় সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মশিউর সাহেবের শখের গোয়েন্দা হয়ে ওঠাকে দারুণভাবেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন।এমন একটা চরিত্রকে হুট করেই গোয়েন্দা হিসেবে দেখাননি,তাকে কিরকম প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে স��গুলো বর্ননা করেছেন। তবে,পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসার উৎস'র কাজের পর হুট করেই যেন গায়েব হয়ে গেল। এই চরিত্রটিকে একটু বর্ননার মাধ্যমে বিদায় দেওয়া যেতো ।
গল্পের সাথে সাথে গল্পের বিভিন্ন জায়গাই সিস্টেমের অবস্থা তুলে ধরা ;বিশেষ করে আইনি সেক্টর আর এর সাথে যুক্ত মানুষের অবস্থা তুলে ধরাটা ভালো ছিল।
টুইস্টগুলো ভালো ছিলো। বিশেষ করে প্লট টুইস্টটা।একবার আন্দাজ করেও মেলাতে পারিনি যে এটাই হবে।
এই জনরার বইতে জিজ্ঞাসাবাদ অংশটাতে আমার আলাদা আকর্ষণ কাজ করে ।ওই অংশটাও দারুণ লাগছে।সাথে একশন পার্ট এর বর্ণনা ;তবে কিছু ক্ষেত্রে বর্ণনা বেশি দ্রুত আগানোই বুঝতে অসুবিধা হইছে
বইয়ের একটা অংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত কাব্যিক ভাষার ব্যবহার ছিলো। এই জনরার বইতে এমন লেখা পড়ে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।
এছাড়া ছোটখাটো প্লটহোল আছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে।
তবে একজন নতুন লেখকের লেখা বই হিসেবে দুর্বলতার চেয়ে পজিটিভ দিক গুলোই বেশি নজর কেড়েছে । দুর্বলতা লেখক সময়ের সাথে সাথে কাটিয়ে উঠবেন বলে মনে করি।
পরিশেষে,কিছু চরিত্রের অপ্রকাশিত অতীত,শেষের ক্লিফহ্যাঙ্গার-সবকিছু বইয়ের সিক্যুয়েলের দিকে ইঙ্গিত করে ।সেক্ষেত্রে,লেখকের লেখনশৈলী বিবেচনায় পরবর্তী কিস্তিতে দারুণ কিছুর আশা করাই যায় ।
বানান: বানান ভুল বা টাইপিং মিস্টেক যা ছিলো সেগুলো খুব একটা অসুবিধার সৃষ্টি না করলেও চরিত্রের নামের অদল বদলের কারণে একটু আধটু সমস্যা হয়েছিলো।
প্রোডাকশন,প্রচ্ছদ: এই প্রথম 'ঝদ্ধ প্রকাশ' বই পড়লাম।বইয়ের বাঁধাই কিছুটা আটসাটো ছিলো,এধরনের বাঁধাই এ বই পড়ে আমি খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।তবে,আমার সংগ্রহের বইটা বইমেলার সময়কার।এক ভিডিওতে দেখলাম, প্রকাশনীর ওই লটের বইগুলোর বাঁধাই নাকি এমনই হয়েছে ।পরের লট থেকে বইয়ের বাধাই নাকি ঠিকই ছিলো।এছাড়া প্রোডাকশন ভালই ছিল।
প্রচ্ছদটা আমার কাছে দারুণ লাগছে ।পরাগ ওয়াহিদ ভাই দারুণ কাজ দেখিয়েছেন।
সর্বোপরি,নতুন লেখকের বই হলে সবসময় এমন একটা চিন্তা মাথায় কাজ করে যে,'বইটা ভালো হবে তো?' জিয়ৎ' বইটা সে জায়গায় অনন্য।
বেশ গতিময় ছিল,লেখক সাসপেন্স ক্রিয়েট করে মাঝে মাঝে বর্ণনাকে টান টান উত্তেজনাপূর্ণ ও করেছেন,পড়তে লেগেছে বেশ মজা,শুরুর দিকে কোথাও কোথাও একটু বোরিং ও লেগেছে।লেখক যে এলিমেন্ট বেছে নিয়েছেন তা আর আমাদের থ্রিলার সাহিত্যে নতুন নয়-অবশ্য পৃথিবীর সব পুরানো গল্পই আমরা শুনি আসলে নতুন করে,অন্যভাবে।সব মিলিয়ে খারাপ লাগে নি।মিথ্যে বলবো না-বইয়ের নাম দেখে এবং নামের বিষয়বস্তু নিয়ে যে গল্পটা ছিল তা নিয়ে আর প্রত্যাশা একটু বেশিই ছিল।দুইটা পুরানো লোককথা কে একটা সুতোয় যেভাবে বেধেছেন-তা নিয়ে আরো একটু গল্প বলা যেত। তবে আমার ধারণা লেখক তার সামনের বইগুলোতে আরো বেশি এগিয়ে যাবেন আরো থ্রিলার আমাদের উপহার দিবেন।শুভকামনা রইলো লেখকের জন্য।একশন,এডভেঞ্চার,ফ্যান্টাসি যাদের পছন্দ এই বইটা তারা পড়ে ফেলতে পারেন।
বিষয়বস্তু-
মহাস্থানগড়ের অদূরে শব্দলদীঘিতে পরপর দুইটা ঘটনা ঘটে-একটা হত্যা কান্ড আরেকটা নিখোজের।তদন্ত-এ নেমে পড়ে এক শখের গোয়েন্দা।ওদিকে বিশ বছর আগে নিশ্চিহ্ন হওয়া নাইট অব দ্য ফলেন স্টার জেগে উঠে আবার,জানান দেয় এর অস্তিত্ব।এর পেছনে ছুটে ঠাকে শ্যাডো সিক্রেট সার্ভিস।এছাড়াও সব কিছুর আড়ালে চলছে ভয়ংকর এক এক্সপেরিমেন্ট -ইতিহাসের কিছু মিথকে পুজি করে।এইসব কিছু ঘটে চলেছে সমান্তরালে-একটা সুতোয় বাধা হবে বলে। এইসব কিছু মিলিয়ে উপন্যাস "জিয়ৎ"।
প্রথম মৌলিক উপন্যাস হিসেবে লেখক একদম ফাটিয়ে দিলেন এমনটা বলবো না। তবে হ্যাঁ very promising স্বীকার করতেই হবে। শেষ অব্দি ইন্টারেস্টটা ধরে রেখেছেন, মাঝে হালকা স্লিপ ছিল। এই থ্রিলারগুলো নিখাঁদ সাহিত্য নয় যে চরিত্র কিংবা ঘটনা নিয়ে বিশ্লেষণ চলে। এখানে কিছু বলা মানেই সাসপেন্স শেষ করে দেয়া। কাজেই সে সব থাক। এখানে মিথ আছে, আছে গোয়েন্দা বিভাগের দৌঁড় ঝাপ, আরও আছে কাল্ট রিচুয়ালস এর সুক্ষ্ম প্রদর্শন আর টুইস্ট তো সেই মাত্রার। এটা লিস্টে রাখতে পারেন।