নেশায় আসক্ত অভিরূপ মুন্সী মাঝেমধ্যেই পৌঁছে যেত ভদ্রনগর বস্তিতে, তার প্রেমিকা অজন্তার কাছে। তাদের একান্ত মুহূর্তগুলোর সাক্ষী হয়ে এল হাবা। তার দুনিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। কী আছে সেই দুনিয়ায়?...
অসংস্কৃতির শহর নিস্তারডাঙা। ঝাড়খণ্ডের এই ছোট্ট শহরে শেষ হতে বসেছে সায়নের স্বপ্নগুলো। অপর দিকে ঘুরতে শুরু করেছে তার প্রেমিকা জয়িতার ভাগ্যের চাকা। কী হবে এরপর?...
অতি সাধারণ ঘরের ছেলে ঋজু। ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এসে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না সে। ক্রমে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে তার চারপাশ। একে একে হারিয়ে ফেলছে বন্ধুদের। জীবন যেন খেলছে ঋজুর সঙ্গে। তবে কি সে ফুরিয়ে যাবে? নাকি ঘুরে দাঁড়াবে আবার ছন্দময় জীবনে?...
আট বছর বয়সের স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছে সমীর। ঝুমুরবাদের দিনগুলোর চরম দারিদ্র্য তাকে নাড়িয়ে দিয়েছে ভেতর থেকে। স্মৃতির অতলেই যেন হারিয়ে ফেলেছে বর্তমানকে। আলোছায়ার এই পথ ধরে সে কি আবার ফিরে পাবে তার সবকিছু?
একঝাঁক যুবক যুবতীর আশা নিরাশা, প্রেম অপ্রেম, সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে চারটি নভেলেটের ‘হাবা দুনিয়া’য় আপনাকে স্বাগত।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
বইটি মূলত চারটি বড় গল্পকে নিয়ে লেখা, আরো ভালো করে বলতে গেলে লেখকের ভাষায় চারটি উপন্যাসিকা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বইটি, হাবা দুনিয়া নেশায় আসক্ত এক কবি অভিরূপ মুন্সি যখন তার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকতো না বা তার কাছে নেশার দ্রব্যের জন্য টাকা থাকতো না সেই সময় সে পাগলের মতন তার কিছু পরিচিত মানুষের কাছে ঘুরে বেড়াতে। তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে তার প্রেমিকা অজন্তা। তেমনই একটি দিন অজন্তার কাছ থেকে বেরিয়ে সে আচমকা মারা যায়, তার বেশ কিছু বছর পর অজন্তার কথা অনুযায়ী তারও অভিরূপের ভালোবাসার চিহ্ন হিসেবে হাবা জন্ম নেয় , ছোটবেলা থেকেই আর পাঁচটা স্বাভাবিক বাচ্চার মতন সে নয়, তার ওপর আবার পিতৃ পরিচয়হীন তো দুই মিলেই বস্তির লোকেদের হাসির খোরাক হয়ে ওঠে সে, তবে তার মধ্যে আস্তে আস্তে অলৌকিক কিছু ক্ষমতা বস্তির লোকজন দেখে এবং একটা সময় পর তারা হাবাকে নিজের মতন ছেড়ে দেয় এবং হাবার কিছু কীর্তিকলাপ নিয়ে এই গল্পটি। অনন্ত আলোকচিত্র অফিস পলিটিক্স এর চক্করে চাকরি হারাতে বসে সায়ন, সেই সময় তার ঝাড়খণ্ডের কাটানোর সময় কে নিয়ে একটি গল্প লেখে সে, এবং সেটি বাস্তবায়নের জন্য অনেক ওঠা পড়া দেখতে থাকে, সে সময় উকিলের চেম্বারে তার দেখা হয় জয়িতার সাথে তারা একে অপরের দুঃখের বোঝা নিতে নিতে কাছাকাছি চলে আসে এবং একদিন হঠাৎ করে জয়িতা জানায় তার সমস্যা প্রায় শেষের মুখে এবং সে নতুনভাবে সবকিছু শুরু করতে চলেছে, কি হবে জয়িতা ও সায়নের রসায়ন, আদৌ কি আলোকচিত্রটি সম্পন্ন হবে, এইসবের উত্তর আছে এই গল্পটিতে। খেলা ফুরায় অতি সাধারণ ঘরের ছেলে ঋজু, মাস্টার ডিগ্রি করতে এসে আস্তে আস্তে সে তার জীবনে মানে বুঝতে পারে কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চারপাশ বন্ধু বান্ধব থাকা হতে থাকে তার প্রিয় বান্ধবী শহর ছেড়ে পালিয়ে যায় দিল্লিতে , এক ঝাঁক স্বপ্ন ঘুরে দাঁড়ানো এবং বন্ধুত্বের গল্প এটি। আলো ছায়ার পথে - ৮ বছর বয়সে ঝুমুরবাদে পরিবারের সাথে ঘুরতে যায় সমীর, সেখানের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার হয় তার, সেটা সে সারাজীবন বয়ে নিয়ে চলে, তার বর্তমান জীবনে তার প্রভাব পড়ে ভীষণ, সে নিজের জীবনকে ঝুমুরবাদের দিনগুলি সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে বর্তমান দিনগুলোকে, সে কি এই মানসিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারবে, এই গেল বইটির কথা, এবার আসা যাক আমার কেমন লাগলো সত্যি কথা বলতে সৈকত স্যারের লেখনী নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। খুবই অসামান্য লেখেন। এবং বইটি সত্যি কথা বলতে বেশ ভালো এক ঝাঁক তরুণ তরুণী পাওয়া না পাওয়া নিয়ে লেখা এই বইটি।
“হাবা দুনিয়া” এমন এক রচনা, যেখানে ভাষা কেবল শব্দের বাহন নয়—তা অনুভূতিরও প্রতিফলন। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের কলম কখনও নিঃশব্দে হৃদয়ের গোপন দরজায় কড়া নাড়ে, আবার কখনও স্মৃতির ধুলোমাখা জানালায় আলতো আলো ফেলে দেয়।
এই গ্রন্থের চারটি গল্প—চারটি ভিন্ন ছায়া-জগৎ। কিন্তু প্রত্যেকটিই বাঁধা এক অদৃশ্য সুতোর টানে, যেখানে সময় যেন একা হাঁটে না; হাঁটে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ, শহর, স্বপ্ন, প্রেম, পরিণতি এবং প্রান্তিকতা।
ভদ্রনগর বস্তিতে অভিরূপ ও অজন্তার একান্ত মুহুর্তগুলোর সাক্ষী হয়ে এসেছিল হাবা। তার দুনিয়া সম্পূর্ণ আলাদা। তার দৃষ্টি কেবল দেখার নয়, সে যেন টের পায় জগতের যাবতীয় অপ্রকাশিত বিষাদ। ওদিকে নিস্তারডাঙার ধুলো মেখে সায়নের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, আর জয়িতার জীবনও এক নতুন বাঁকে প্রবেশ করছে। প্রতিটি চরিত্র একা, কিন্তু একাকীত্বের রঙ একেকজনের জীবনে একেকরকম ছবি এঁকে দেয়।
ঋজু যেন সেই তরুণ, যার ভেতরে আমরা অনেকেই নিজের ছায়া খুঁজে পাই—বিশ্ববিদ্যালয়ের কোলাহলে যার নিঃসঙ্গতা সবচেয়ে প্রবল। আর সমীর? সে তো জীবনের শেষপ্রান্ত থেকে ফিরে তাকানো এক নরম দুপুরের স্মৃতি, যেখানে দারিদ্র্য, নিস্পৃহতা ও অনাবিষ্কৃত আবেগ মিশে আছে আটপৌরে বাস্তবের ক্যানভাসে।
সমাজের সেই স্তর—যাদের কথা আমাদের মূলধারার আলোচনায় খুব একটা আসে না—তাদের জীবনের লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য এবং তাদের ছোট ছোট বেঁচে থাকার লড়াইগুলোই এখানে সাহিত্যের সংবেদনশীল ভাষায় উঠে এসেছে।
লেখকের কলমে অলৌকিক কখনও অযাচিত নয়, বরং জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক স্বাভাবিক বাস্তবতা। কোথাও ম্যাজিক রিয়ালিজমের ইঙ্গিত থাকলেও, তা কখনও সাহিত্যের আবরণ হয়ে ওঠে না, বরং হৃদয়ের অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে যায়।
লেখক যেন বার্তা দিচ্ছেন—মানুষকে বুঝতে হলে তার পাশে হাঁটতে হয়, তার অভিজ্ঞতা ছুঁয়ে দেখতে হয়। থিওরিতে কিছু বোঝা যায় না। এই উপলব্ধিই গোটা গ্রন্থজুড়ে ঘন হয়ে উঠে আসে।
“হাবা দুনিয়া” কোনও ঘরানায় ধরা দেয় না। এটি এক ধরনের সাহিত্যিক অভিযান—যেখানে পাঠক কখনও হেরে যাওয়া চরিত্রগুলোর পাশে দাঁড়ান, কখনও তাঁদের সঙ্গে স্বপ্ন দেখেন। এই বই পাঠককে গল্প শোনায় না, বরং জিজ্ঞেস করে—"তুই কে রে হাবু? তুই সত্যিকারের কে?"
আমরা যারা নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি, আমাদের জীবনের সুরগুলো ঠিক 'ন্যাচারাল নোটস'-এ বাজে না। সেখানে বরং অহরহ ঢুকে পড়ে জীবনের 'শার্প' আর 'ফ্ল্যাটস' নোটসের ওঠানামা। আমরা বড় হই এমন কিছু গল্প দেখে, যা সচরাচর তথাকথিত উচ্চমার্গীয় সাহিত্যে জায়গা পায় না।
আমাদের বেড়ে ওঠার ক্যানভাসে মিশে থাকে— টাইম কলের জলের লাইন, সকালে-বিকালে পাড়ার ঝগড়া আর খিস্তি-খেউড়, কাপড় মেলা নিয়ে অশান্তি কিংবা পরীক্ষার ঠিক আগেই লোডশেডিং। সেখানে সবাই মিলে সচিনের আউটে একরাশ মন খারাপ জমে, আবার দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠার রোমাঞ্চও থাকে। কখনো ক্যাপ ফাটানো, কখনো দোকানে বাকি রাখা, কিংবা নিজের খবরের চেয়ে পাড়ার লোকের খবর বেশি রাখা— এই নিয়েই আমাদের চিরচেনা জীবন।
সকালের মাছের বাজার, টিফিনে রুটি-আলুভাজা (মাঝে মাঝে স্পেশাল লুচি-তরকারি), স্কুলে বন্ধুদের 'মোটা' বলে খেপানো, আর বড় হয়ে চাকরি না পেলে মানুষের চোখে নিজের দাম কমে যাওয়া দেখা— এই তো আমাদের রূঢ় বাস্তবতা। এমনকি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েদের আলাদা চোখে দেখাটাও আমাদের জীবনেরই অংশ।
এই সব ঝামেলার মধ্যেই কিশোর বা তরুণরা দুভাগে ভাগ হয়ে যায়। একদল ভাবে— খুব পড়াশোনা করে দেশ বদলে দেবে, গরিব মানুষের সেবা করবে। অন্যদল ভাবে— শুধু পড়াশোনা করে কী হবে? তার চেয়ে টাকা কামানো আর ব্যবসা করাটা বেশি দরকার। তাদের কাছে 'উই শ্যাল ওভারকাম' গানের চেয়ে পাড়ার মোড়ে রোলের দোকান দেওয়াটা অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়।
ঠিক এমনই কিছু রক্ত-মাংসের মানুষের গল্প নিয়ে ৪টি অসাধারণ উপন্যাসিকা লিখেছেন জাদুকর সৈকত মুখোপাধ্যায়। এগুলো কেবল গল্প নয়, বরং আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধ, যার সাথে আপনিও নিজেকে কোথাও না কোথাও মেলাতে পারবেন।
এত ভালো কাহিনী আমি খুব কমই পড়েছি। এ বই বারবার পড়ার মতো; যতবার পড়বেন, মনে হবে নতুন কিছু খুঁজে পেলেন। একটুও একঘেয়ে লাগবে না।
বইয়ের নাম: হাবা দুনিয়া লেখক: সৈকত মুখোপাধ্যায় প্রকাশক: পত্রভারতী
২০২৫ এ আমার পড়া শেষ বই ছিল এটি। সৈকত মুখোপাধ্যায় এর লেখা চারটি উপন্যাসিকা নিয়ে এই বইটি। কিছু যুবক যুবতীর জীবনের নানা অধ্যায়, ইমোশন প্রতিফলিত হয়েছে এখানে। চারটি গল্প, চার রকম হলেও বাস্তব আর কল্পনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে গল্পগুলো যেন আমাদের কথাই বলে যায়।
🔹হাবা দুনিয়া- এই উপন্যাসিকার নামেই বইটির নামকরণ। নেশায় ডুবে থাকা কবি অভিরূপ আর তার প্রেমিকা অজন্তার সন্তান হাবা—যে জন্মায় অভিরূপের মৃত্যুর বহু বছর পরে। প্রশ্ন ওঠে, হাবা কার সন্তান? লোকের হাসি-ঠাট্টার মাঝেই ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় ওর অলৌকিক ক্ষমতা। বাংলা সাহিত্যে এমন ম্যাজিক রিয়ালিজম খুব কমই পড়েছি—এই গল্পটা আলাদা করে মনে থেকে যায়।
🔹অনন্ত আলোকচিত্র- সায়ন একজন গল্পকার, টুকটাক গল্প লিখছে সে। সেরকমই তার লেখা একটা গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে চায় সিনেমা পাগল পরিচালক সাধন বিশ্বাস। পকেটে জোর নেই, প্রডিউসর নেই—তবু সিনেমা বানানোর প্রবল ইচ্ছা। অন্যদিকে অফিস পলিটিক্স এ ফেসে যায় সায়ন, উকিলের চেম্বার এ আলাপ হয় জয়িতার সাথে। সায়নের লেখা গল্প যেন ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হয় ওর আর জয়িতার জীবনে।
🔹খেলা ফুরায়- একদল কলেজের তরুণ তরুণীর কথা বলেছেন লেখক এখানে। ঋজু মফস্বল থেকে পড়তে আসে শহরের কলেজে, ওর চারিপাশে এসে জোটে কিছু বন্ধু বান্ধব। কিন্তু সময়ের সাথে কোন এক অদৃশ্য কারণে ওর দুনিয়া থেকে সবাই চলে যায়? কিন্তু শেষে কি খেলা ফুরায়? না এক নতুন জীবনের ইঙ্গিত পায় ঋজু? আর যার কথা না বললেই নয়, ওর দাদা বিরজু এই সমাজের অনেক যোগ্য চাকরি প্রার্থী প্রজন্মের মুখ। সমাজের এই স্তর টা সত্যি অনবদ্য ভাবে তুলে ধরেছেন লেখক এখানে।
🔹আলোছায়ার পথে- উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে সমীর, যে ছোটবেলায় পরিবারের সাথে ঝুমুরবাদে বেড়াতে যায়। সেখানকার কিছু তিক্ত অতীত ওকে বর্তমান জীবনে তাড়া করে বেড়ায়। সে কি পারবে এই অতীত ভুলে আলোর দিকে ফিরতে।
ম্যাজিক রিয়ালিটি এর সাথে বর্তমান সমাজের নানা স্তর, বর্তমান রাজনীতি দারুণ ভাবে মিশিয়ে অনবদ্য চারটি গল্প আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন লেখক। পড়ে দেখুন ভালো লাগবে।