গোলকনাথ মুখোপাধ্যায় পূর্ববঙ্গের মেঘনা নদীর তীরস্থ এক গ্রাম থেকে আসা যুবক, যে কলকাতায় চাকরি করে ও মালিকের বাড়িতেই থাকে। সেখানে থাকা-কালীন কিছু অপরাধের জট খোলার কাজে জড়িয়ে পড়ে নম্রভাষী এবং বুদ্ধিমান গোলক। প্রথম গল্পে, গোলক যে বাড়িতে থাকে তার মালিক সবার সামনে খুন হয়ে যায়। খুনি নিজেই ধরা দেয়! কিন্তু তারপর? কোথায় খটকা লাগে গোলকের? আবার দ্বিতীয় গল্পে ওই বাগবাজারেরই অন্য এক বাড়িতে খুন হন বৃদ্ধা হরিদাসী দেবী। পুলিশের বড় দারোগা যদুনাথ এই ব্যাপারেও সাহায্য নেন গোলকের। গোলক এখানেও নানান সূত্র গেঁথে এগিয়ে যায় খুনির দিকে! কিন্তু গোলক কি শেষে ধরতে পারবে সেই অপরাধীকে? এই গল্পের আরেকটি দিক হল কনকমালা। গোলকের সঙ্গে তার না-বলা মিঠে-কড়া প্রেম, গল্পকে অন্য এক আঙ্গিক আর আনন্দ দেয়। এই রহস্য কাহিনিদুটির প্রেক্ষাপট বিংশ শতকের প্রথম দশক। তখন ইংরেজ শাসন চলছে। বঙ্গ-ভঙ্গ নিয়ে বাংলা উত্তাল। সেই পুরনো সময়ের কলকাতা ও তার মধ্যে গোলকনাথ মুখোপাধ্যায়ের, গোয়েন্দা গোলক হয়ে ওঠার কাহিনিই টানটান ও মসৃণ গদ্যে এই গ্রন্থে বিধৃত রইল।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর জন্ম ১৯ জুন ১৯৭৬, কলকাতায়। বর্তমানে দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা। পৈতৃক ব্যবসায় যুক্ত। প্রথম ছোটগল্প ‘উনিশ কুড়ি’-র প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত। প্রথম ধারাবাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত। শৈলজানন্দ স্মৃতি পুরস্কার ২০১৪, এবিপি এবেলা অজেয় সম্মান ২০১৭, বর্ষালিপি সম্মান ২০১৮, এবিপি আনন্দ সেরা বাঙালি (সাহিত্য) ২০১৯, সানডে টাইমস লিটেরারি অ্যাওয়ার্ড ২০২২, সেন্ট জেভিয়ার্স দশভুজা বাঙালি ২০২৩, কবি কৃত্তিবাস সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩, উৎসব পুরস্কার ২০২৪, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড ২০২৪, আনন্দ পুরস্কার (উপন্যাস: '‘শূন্য পথের মল্লিকা') ২০২৫ ইত্যাদি পুরস্কারে সম্মানিত ।
একটা ছোটগল্প আর একটা উপন্যাস নিয়ে গোয়েন্দা গোলক। যেখানে উপন্যাসটার জন্য বরাদ্দ করেছি দুইটা গোল আর ছোট গল্পটার জন্য বরাদ্দ আরো অতি উচ্চ মানের দুইটা গোল।
স্মরণজিৎ চক্রবর্তীকে বাঙালি মোটামুটি বিজাতীয় নামের চরিত্র সম্বলিত টিন-এজ রোমান্সের লেখক হিসাবেই চেনে। আমি কলেজে থাকতে খান-দুই পড়েছিলাম, একেবারেই অপাঠ্য লেগেছিলো সেই বয়সেই, তাই আর পরে এসবের পাশ মাড়াইনি। গত শুক্রবার হঠাৎ ইনস্টাগ্রামে আনন্দ পাবলিশার্সের বিজ্ঞাপন দেখলাম একটা নতুন গোয়েন্দা উপন্যাসের, লেখক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী। আনন্দ নিজেদের রীতি মেনে ২০০ পাতার বইয়ের দাম করেছে ৪০০/-! বইতে রয়েছে গোয়েন্দা গোলককে নিয়ে এখনো পর্যন্ত্য লেখা একটি ছোটগল্প ও একটি নভেলা।
ছোটোগল্পটা একদম জালি, মানে চূড়ান্ত বোকাবোকা ধরণের জালি। তার মধ্যে আবার স্মরণজিতের টিপিকাল ন্যাকা রোমান্স। যাই হোক, একদম কোনোরকম প্রত্যাশা ছাড়াই নভেলাতে ঢুকি। প্রথম অধ্যায়েই হয়ে যায় খুন, আর থানার ছোটবাবু রহস্য "সমাধান" করে ফেললেও বড়োবাবু যদুনাথ নিয়ে আসেন গোলককে (ওই ছোটোগল্পটিতে গোলকের সঙ্গে আলাপ যদুবাবুর)। খুন হওয়া বৃদ্ধার সঙ্গে তাঁর বাড়ির বাকি সদস্যদের সম্পর্ক মনে করিয়ে দেয় "অর্থমনর্থম"-কে। এই গল্পে খেলিয়ে লেখার পরিসর পেয়েই মনে হয় স্মরণজিৎ গোলককে দিয়ে অনেক বিশদে গোয়েন্দাগিরি করিয়ে নিয়েছেন। রেড হেরিংটিও দারুণ ব্যবহার করেছেন। একেবারে ১০০% ফেয়ার প্লে হয়তো নয় গল্পটি, কারণ জায়গায় জায়গায় গোলক এমন কিছু দেখছে, যা দর্শককে জানতে দেওয়া হচ্ছে না। যদিও গোলকের এই অব্জার্ভেশনগুলির মধ্যে সব থেকে জরুরি যেটা, সেটা একটু ঘুরপথে দেখিয়েছেন লেখক, একটু খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায়। বারবার সন্দেহভাজন লোকেদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে, তাঁদের কথার অসঙ্গতি ও ফাঁক-ফোকরের মধ্যে দিয়ে অপরাধীকে সনাক্ত করার প্রসেসটা শেষ অধ্যায়ে বেশ ভালোই বর্ণনা করা হয়েছে। তার আগে অবশ্য রয়েছে ফাঁদ পেতে খুনিকে ধরা, যার মধ্যে আবার শরদিন্দুর হাতের ছাপ স্পষ্ট (এবার "সত্যান্বেষী")।
সব মিলিয়ে বাংলায় গড়পড়তা যা গোয়েন্দা গল্প লেখা হয়ে থাকে, সে তুলনায় বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে লেখা "গোয়েন্দা গোলক" বেশ উপভোগ্য; মোটামুটি ৭/১০ দেওয়াই যায়। কেবল গোলক আর কনকমালার ভয়াবহ ক্রিঞ্জ রোম্যান্সটা বন্ধ করে, দরকার হলে কনকের অন্যত্র বিয়ে দিয়ে বিদায় করে হলেও, স্রেফ রহস্যে ফোকাস করলে আগামীতে হয়তো গোয়েন্দা গোলকের আরো চিত্তাকর্ষক কিছু গল্প আমরা পেতে পারি।