ট্রেড মিলে দৌড়াতে দৌড়াতে বছর তিরিশের আগমনী হঠাৎ অনুভব করে ওর স্কুলজীবন থেকে দুটো বছর স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। সঙ্গে গায়েব হয়েছে চারটে বন্ধু আর তাদের স্মৃতি। সেই হারিয়ে যাওয়া সময় আর বন্ধুত্বের চিহ্ন হিসেবে পড়ে আছে কেবল একটা পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া ফটোগ্রাফ।
হারানো কৈশোরের খোঁজ আগমনীকে নিয়ে আসে এক রহস্যের সামনে...অতীতের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের সামনে... সদ্য পনেরো পেরোনো স্কুলড্রেস পরা পাঁচ কিশোর-কিশোরীর ঝাপসা রূপকথার সামনে...।
সায়ক আমানের জন্ম ১৯৯২ সালে। কলকাতায় কারিগরি বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করলেও, সাহিত্যচর্চাকেই তিনি নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। লেখালেখি এবং অডিও জগতে সমলয়ে বিচরণ তাঁর। বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় অডিও স্টোরি সিরিজ, মিডনাইট হরর স্টেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা তিনি। Midnight Horror Station Spotify podcast-এর সঞ্চালক। বর্তমানে নিজের ইউটিউব চ্যানেল ছাড়াও কাজ করছেন জনপ্রিয় রেডিও- শো সানডে সাসপেন্স-এর সঙ্গে।
ইচ্ছে - যেনো একটা রোদ্দুরের পাখি। কাঁধে এসে বসে হঠাৎ, আবার উড়েও যায় ঠিক তেমন। কোনোদিন বিকেলের জানলার ধারে বসে থাকা কিশোরীর চোখে জন্মায় সে, কোনদিন ক্লাসের বেঞ্চে রাখা টিফিনবক্সের পাশে গিয়ে বসে - চুপিচুপি। কখনো সে এমন কিছু হতে চায়, যা হবার নয় - তবু চায়।
কিন্তু কখনো মহাবিশ্বের অমোঘ কোনো নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব কোনো ইচ্ছে - যদি হঠাৎ পূরণ হয়ে যায়? কারণ, ইচ্ছার সাথে যে হাত ধরাধরি করে চলে সে হলো সময়। সময়ের ঘূর্ণন যে অপার্থিব শূন্যতার জন্ম দেয় তার দায় থাকে না কোনো অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতকে মানার - সে কেবল ঘুরে যায় তার নিজের ছন্দে - আর সেই ছন্দে দৃশ্যপটের মতো ফুটে ওঠে - শিশুকাল, কৈশোর, যৌবন, মৃত্যু। এক জীবনের মধ্যে কত জীবন।
ট্রেড মিলে দৌড়াতে দৌড়াতে বছর তিরিশের আগমনী হঠাৎ অনুভব করে ওর স্কুলজীবন থেকে দুটো বছর স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে। সঙ্গে গায়েব হয়েছে চারটে বন্ধু আর তাদের স্মৃতি। সেই হারিয়ে যাওয়া সময় আর বন্ধুত্বের শেষ দলিল হিসাবে রয়ে গেছে কেবল একটা পুরোনো হলদে হয়ে যাওয়া ফটোগ্রাফ। হারানো কৈশোরের খোঁজে আগমনী বেরিয়ে পড়ে এমন এক যাত্রায় যেখানে সে মুখোমুখি হয় অতীতের অমীমাংসিত অনেক প্রশ্নের। সে এসে দাঁড়ায় সদ্য পনেরো পেরোনো স্কুলড্রেস পরা পাঁচ কিশোর কিশোরীর ঝাপসা রূপকথার সামনে - যেখানে সময় বাঁধা মানে না কোনো কিছুর।
Netflix এর "ডার্ক" শো এর একটা ডায়ালগ ছিল, "What we know is a drop, what we don't know is an ocean"। সায়ক আমানের "তালদীঘিতে ভাসিয়ে দেবো" পড়েও প্রায় এই ডায়ালগ টাই বলা যেতে পারে। কারণ, স্কুল জীবনের নস্টালজিয়া, ফেলে আসা বন্ধুত্ব, কৈশোর জীবনের প্রেম - এর ছায়ায় ছায়ায় এই উপন্যাস শুরু হলেও ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত রহস্য চেপে বসে এই সব কিছুর ওপর। ছোটদের রূপকথার বই, সেই বইয়ের চরিত্র ইনা, ইনা আর নহর জান্নাত - যাদের একই রকম দেখতে আর তার সাথে একজন সদা হাস্যময় ব্যক্তি - যাকে চেনা যায় তার মেরুন রঙের শার্ট থেকে।
আমার চোখে এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র "সময়"। সেই এই গল্প বোনে। তার হাত ধরেই শুরু হয় সমুদ্রের মত গভীর, অবিশ্বাস্য এই যাত্রা। হাসি মুখে সে বলে, "আপনার কাছে এসেছিলাম একদিন জন্ম নিয়ে। তারপর শৈশব, কৈশোর, ভালবাসা, দুঃখ, আনন্দ, শোক, বার্ধক্য আমিই নিয়ে এসেছিলাম। একদিন আপনার মৃত্যুকে নিয়ে আসবো। ততদিন আমাকে আর দেখতে পাবেন না।"
সময় আর স্মৃতি যখন মিলেমিশে যায়, তখন নিজেকেও খুঁজে পাওয়া যায় নতুন করে। আগমনীর মতোই আমরাও নিজেদের প্রশ্ন করতে শিখি—আমরা কাদের হারিয়েছি, আর সেই হারানোর মধ্যে আমরা নিজেকে কতখানি হারিয়েছি?
নিজের ভেতরের অতীতের রাস্তাগুলো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে পড়ে প্রতিটি মোড়ে কেউ একদিন দাঁড়িয়ে ছিল। এখন নেই, কিন্তু স্মৃতি রেখেছে। "তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেবো" সেই সব মনের পুকুরে এক-একটা নিঃশব্দ ঢিল ছুঁড়ে দেয়। আর আমরা চুপচাপ দেখি, কেমন করে জল কাঁপে।
কারণ, স্মৃতির মতন সুন্দর যেমন কিছু হয়না তেমনি স্মৃতির মতন ভয়ঙ্কর ও কিছু হয়না। স্মৃতি আমাদের ছেড়ে ঠিক যায়না, তারা অপেক্ষা করে। ঠিক সময়ের। তারপর গন্ধ, শব্দ, রং হয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমাদেরকে হাত বাড়িয়ে ডেকে নিয়ে যেতে চায় সেই তালদীঘির দিকে - যেখানে এখনো হয়তো ভেসে চলে আমাদের কাগজের নৌকো, তবে কে না জানে সেই নৌকোর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে নেই।
এক বন্ধুর রেকমেন্ডেশনেই তার বইটি নিয়ে পড়ে ফেল্লাম।
অদ্ভুত একটা অনুভুতি আছে গল্পটার মধ্যে। ছোটবেলার বন্ধু বান্ধব, প্রথম প্রেম, বড় হয়ে ওঠা, হারিয়ে যাওয়া অনেক ছোটো ছোটো অনুভুতি দিয়ে লেখক বইটা লিখেছেন যা শুধু অনুভব করাই সম্ভব, ভাষায় ব্যাক্ত করতে গেলে যেন ঠিক গুছিয়ে তুলতে পারবো না।
বইটির শেষে কিছু প্রশ্ন মনে থেকে যায়, কিছু ঘটনার দমকা হাওয়া মনকে আচমকা অনেকখানি নাড়িয়ে দিয়ে যায়, অথচ অন্তিমে স্মৃতির পাতায় শেষে রেখে দিয়ে যায় ব্যাক্ত অব্যাক্ত একটা মায়ামোহিনী প্রভাব। এই বেড়ে ওঠার তীব্র রোদের দাবদাহের মতো জীবনের মাঝে রাস্তার এক কোণে বটবৃক্ষের ছায়ার মতো।
।।।"আমার মা বলত মায়েদের গ্রামের বাড়িতে তালদিঘি বলে নদী আছে। আমরা জলের ওপর কোনও অসম্ভব ইচ্ছা লিখে নৌকা ভাসালে সেই সব নৌকা ওই তালদিঘিতে চলে যায় ।...."।।।
সাম্যজিৎ ঘোষ, ঋতবান সেন, বেদান্ত চৌধুরী, নহর জান্নাত, আগমনী... ওরফে সাম্য, খুঁটি, ব্যাদা, ইনা এবং মণি। স্কুলজীবনের শেষ বছর দুটিতে পাঁচ অভিন্নহৃদয় বন্ধু। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের নিয়মে খুব স্বাভাবিকভাবেই পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় তারা। সমস্যা সেটা নয়, আসল সমস্যা আগমনীর। ক্লাস ইলেভেন ও টুয়েলভ - এই দুবছরের কোনো স্মৃতিই নেই তার কাছে। না ভুল বললাম বাকি সমস্ত স্মৃতি আছে, শুধু স্কুলের স্মৃতি, ওই চার বন্ধুর স্মৃতিগুলো কে যেন নিপুন হাতে মুছে দিয়েছে ওর মস্তিষ্ক থেকে। ওর কাছে ওদের পাঁচজনের একটা ছবি এসে পৌঁছায় হঠাৎ, তখন থেকেই কিছু একটা মনে পড়বে পড়বে করেও মনে পড়ে না ওর, শুধু নহর জান্নাতের নামটুকু ছাড়া।এই ভুলে যাওয়া স্মৃতির অস্বস্তি ওর মনকে গ্রাস করে, কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়ে ও। জীবন থেকে মুছে যাওয়া ওই দুবছরের স্মৃতি আর বন্ধুদের খোঁজ পাওয়ার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে মনি। খুঁজতে খুঁজতে কিছু রহস্যের সম্মুখীন হয় ও আর ওর কলেজের বন্ধু কৌশিক। স্কুলজীবনের শেষ দুই বছর খুব অদ্ভুত। অনেকেই নতুন স্কুলে ভর্তি হয়, গার্লস- বয়েস স্কুল পেরিয়ে কো-এড স্কুলের ছোঁয়া পায় কিশোর- কিশোরীরা। স্কুলে, কখনো বা টিউশানে নতুন বন্ধু- বান্ধবী, নতুন প্রেম, প্রথম সিগারেট খাওয়া, প্রথম ফোন হাতে পাওয়া...তারপর একটা বছর কেটে গেলেই বন্ধুত্ব, প্ৰেম, স্বাধীনতার উচ্ছাস, স্বপ্ন এসব ছাড়াও কোথা থেকে এসে জোটে ভয়। স্কুলজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়, বন্ধুদের হারানোর ভয়, স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ভয়, প্রেমে বিচ্ছেদের ভয়, মৃত্যুভয়। যতই নিজেকে বোঝানো হোক যে সব একরকম থাকবে, ভিতরে ভিতরে আমরা হয়তো বুঝে যাই যে সবকিছুই বদলে যাবে।মনে মনে হয়তো জেনে যাই, স্কুল ইউনিফর্ম পরা রঙিন উজ্জ্বল দিন পেরিয়ে ,কৈশোর পেরিয়ে কেরিয়ার, কর্তব্য, maturity এর ধূসর পরিবেশে জীবন পৌঁছে দিচ্ছে আমাদের। ছেলেবেলার রূপকথা গুলোকেও বিদায় জানাতে হয় এরপর। কিন্তু সত্যিই কি রূপকথা গুলো হারিয়ে যায়? নাকি বড়বেলার চরম ক্লান্তিকর দিনগুলোতে, হতাশা, একাকিত্বের রাতগুলোতে ওরাই চুপিচুপি এসে আমাদের আগলে রাখে? বিশ্বাস জাগায় যে কোথাও একটা তালদিঘি নিশ্চই আছে। যেকোনো অসম্ভব ইচ্ছেকে কাগজের নৌকো বানিয়ে কোনো জলাশয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হলে ওই তালদিঘিতে ভেসে চলে যায় তারা... "মাঝে মাঝে এক আধটা অসম্ভব ইচ্ছা পূরণ হয়েও যেতে পারে। তালদিঘিতে যেসব নৌকা ভেসে যায় তার সবক'টার ভরাডুবি হয় না।"
সায়ক আমানের নতুন উপন্যাস তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব প্রেম ও বন্ধুত্বের এক মায়াময় উপাখ্যান, যা পাঠকদের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে।
সায়ক আমানের লেখনী আবেগপ্রবণ এবং সহজবোধ্য, কিন্তু কখনো কখনো তা মাত্রাতিরিক্ত নাটকীয় হয়ে ওঠে। সংলাপ ও বিবরণের মধ্যে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত আবেগের বোঝা পড়ে, যা পড়তে গিয়ে একঘেয়ে লাগতে পারে।
বইয়ের শেষভাগ যেন এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে পাঠকের হৃদয়ে বাজে। সম্পর্কের জটিলতা, চিরস্থায়ী না থাকার যন্ত্রণা, এবং স্মৃতির বয়ে চলা ঢেউ পাঠককে এক গভীর অনুভূতির মধ্যে নিমজ্জিত করে। তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব পড়ার পর মনে হয়, জীবনের কিছু অধ্যায় হয়তো শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তাদের প্রতিধ্বনি রয়ে যায় হৃদয়ের গভীরে—যেখানে ভালোবাসা কখনোই পুরোপুরি হারিয়ে যায় না, শুধু অন্য রূপে থেকে যায়।
ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ও স্মৃতির এক মায়াময় দুনিয়ায় পাঠককে ডুবিয়ে দিলেও, কখনো কখনো মনে হয় এটি নিছকই অতিরিক্ত আবেগে মোড়া এক গল্প, যার গভীরতা সব পাঠকের কাছে সমানভাবে ধরা পড়বে না।