বই : আর্য দিগন্তে সিন্ধু সভ্যতা লেখক : রজত পাল প্রকাশক : খড়ি প্রকাশনী প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারি ১, ২০১৫ হার্ডকভার, পৃষ্ঠা : ৩৪৪ মূল্য : ৪৫০/-
সমকালের ঐতিহাসিকের পক্ষে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনও ইতিহাসেই কি নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব?
Edward Hallett Carr তাঁর 'What Is History?' বইতে এই রকম একটি প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন। প্রত্যেক ঐতিহাসিক একটা বিশেষ সমাজের লোক, একটা বিশেষ শ্রেণীভূক্ত, একটা বিশেষ শিক্ষা-দীক্ষার ফল। তাঁর সহজাত পূর্বসংস্কার, শ্রেণীস্বার্থ, রুচি ও প্রবণতা, তথ্য নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বাধ্য।
স্রেফ সমকালীন কেন, কোনও ইতিহাসেই ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পৃথক করা যায় না।
ইলিয়টের ভাষায় বলতে গেলে :
“Time present and time past Are both perhaps present in time future, And time future contained in time past. If all time is eternally present All time is unredeemable.
অর্থাৎ অতীতের ঐতিহ্য যেমন বর্তমানে প্রবাহিত এমনকি তাকে প্রভাবিত করছে, তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আশা-আশঙ্কা, মোহ, মোহ মুক্তি, ঐতিহাসিকের চেতন-অবচেতন, তাঁর তথ্য সংগ্রহ ও বিচার-বিশ্লেষণ কে প্রভাবিত করছে।
মহাকাল ত্রিনয়ন দিয়ে বিশ্ব অবলোকন করেন। সুতরাং অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তিনটিই ইতিহাস লিখনের মূল উপজীব্য
ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্য এইটাই যে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের ইতিহাস বিকৃতির ধারা আজও প্রবহমান। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় সুক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের মঞ্চ থেকে অনিশ্চিত অনুমানকে প্রত্যয়ের চেহারা দেওয়া হয়েছে।
ইন্দোইউরোপিয় ভাষাসমষ্টির পারস্পরিক নৈকট্য দেখে ধারণা করা হয় যে এই ভাষাভাষীরা সকলে একই পূর্বআবাসস্থল থেকে এসেছেন। সংস্কৃতের সাথে ইউরোপিয় বেশ কয়েকটি ভাষার সাযুজ্য দেখেই জার্মান ইন্ডোলোজিস্ট ম্যাক্স মুলার প্রথম আর্য আক্রমণ তত্ত্বের সূচণা করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী আর্যরা রাশিয়ার দক্ষিণ অংশ থেকে মাইগ্রেট করে ভারতীয় উপমহাদেশের আদিম অধিবাসীদের আবাস তথা সিন্ধু উপত্যকায় পৌঁছায়।
কেবল ভাষাগত মিলকে ধ্রুবক বিবেচনা করে নিয়েই এমন একটি সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত তত্ত্ব খাড়া করানো হয়। সিন্ধু সভ্যতার কোনও প্রত্নতাত্বিক প্রমান তখনও আবিস্কৃত হয়নি। পরবর্তীতে ১৯২০ সালের দিকে যেই একটার পর একটা নগর সভ্যতা আবিস্কৃত হলো, ধূর্ত ইংরেজ সেই মুহূর্তেই পূর্বতন তত্ত্বটির উপরে পুলটিস লাগালেন কিছুটা।
মহেঞ্জোদারোয় হুইলারের প্রাপ্ত কঙ্কাল থেকে বৃটিশ ঐতিহাসিকরা বহিরাগত আর্যদের হাতে অনার্যদের হত্যার গল্প ফাঁদলেন এবং এই গণহত্যার জন্য ঋগ্বেদে বর্নিত ইন্দ্র বা পুরন্দরকে দোষী ঠাহর করলেন। মার্টিমার হুইলার হরপ্পান সাইট খনন করে ৩৩ টি (মতান্তরে ৩৭) কঙ্কাল পেলেন সেগুলিকে ঋগ্বেদে বর্নিত ইন্দ্র বা পুরন্দরের শেষ হত্যালীলার ফলাফল বলে বর্ননা করা হলো। সব ভ্রান্ত গল্প সুচারুভাবে ইতিহাসের নামে পাঠ্যপুস্তকেও ছড়িয়ে দেওয়া হলো।
তত্ত্ব অনুযায়ী খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে আর্যরা ভারতের প্রাচীন কিন্তু সভ্য অধিবাসী দ্রাবিড়দের আক্রমণ করে। এই অসভ্য-বর্বর-যাযাবর-পশুপালক জাতিই আর্য জাতি। এদের হাতেই ঋগ্বেদ রচিত হয়।
কী সহজ, সরল, একরৈখিক ইতিহাস!
এই মিথ্যার বিরুদ্ধে অনেকে কলম ধরেছেন। আধুনিক সময়ে এই কাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন শ্রী রজত পাল।
‘দেবতা’ কারা? ‘অসুর’-ই বা কারা? মানব বলতে ঠিক কাদের বোঝায়?
সব মিলিয়ে ‘আর্য’ বলতে কি বুঝি আমরা? আমাদের ইতিহাস কি বলে?
পৌরাণিক রূপকথার গল্পের মধ্যে ইতিহাস খোঁজার কথা বললে যদি আপনাদের অপ্রীতি বা অসন্তোষ থাকে তাহলে F. B. J. Kupier সাহেবের ‘The Basic Concept of Vedic Religion’ (1975) এবং W. E. Hale সাহেবের ‘Asur in early Vedic Religion’ (1986) পড়ে দেখা যেতে পারে।
দুটি প্রধান আঙ্গিকে আলোচনা এগিয়েছে :
1) In the Rigveda the term asura is applied to numerous dominant and beneficent gods who merit equal if not greater reverence than their divine counterparts designated by the term ‘deva’, whereas in the later Vedic texts asura is employed to portray a collection of hostile and demonic forces incessantly set in opposition and disputation with the deva gods.
2) From the earliest Iranian texts (the Gathas of Zarathustra) the cognate term ‘ahura’ is fundamentally used to illustrate the highest and most benevolent god of the religion (Mazda), while the cognate term daeva is applied to rival and evil gods.
অর্থাৎ তাঁরা বলছেন যে, ‘The basic meaning of asura is something like lord but in usage it comes to mean, ‘powerful, a creature of power’।
‘আর্য দিগন্তে সিন্ধু সভ্যতা’ বইটির লেখক রজত পাল খুঁজে বের করেছেন যে কেবল সেদিনের ভারতেই নয়, আজও ভারতের কয়েক জায়গায় ‘অসুর’ সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন।
১৯৩১ আদমশুমারির রিপোর্টে ছোটনাগপুর অঞ্চলে ‘অসুর’ ছিলেন ৪৮৯৪ জন। চাবাগানে কাজ করতে এসে ডুয়ার্সের কালচিনি ব্লকে এক গ্রাম বানিয়ে বসবাস করছেন অসুর সম্প্রদায়ের মানুষ।
কিন্তু কেবল এটুকুই নয়, রজতবাবু ঋগ্বেদের বিভিন্ন মণ্ডল থেকে উদাহরণ তুলে দেখিয়েছেন যে আদিতে বৈদিক দেবতাদের সকলেই ছিলেন ‘অসুর’। পরবর্তী সময়ে যজ্ঞরীতি নিয়ে বিরোধ হয়ে দুদলে বিভক্ত হয়ে যায় অসুর সমাজ, সুর এবং অসুর। অসুর ও দেবগোষ্ঠী।
শতপথ ব্রাহ্মণ বলছে - “যজ্ঞেন বৈ দেবাঃ” যারা যজ্ঞ করতেন তাঁরাই দেব।দেবতা কথার অর্থ 'বিদ্বান ব্যক্তি'।' শতপথ ব্রাহ্মণ বলছে - 'বিদ্যাংসো হি দেবাঃ'। 'অসুর' শব্দ না নিন্দাপূর্ণ না পরিবাদমূলক, না কুৎসাত্মক।প্রকৃতপক্ষে, অব্যাজে শব্দটির অর্থ 'বিভামণ্ডিত', 'সুদীপ্ত', 'অত্যুজ্জ্বল', 'দীপ্তোজ্জ্বল'।
আমাদের ঋগ্বেদই অসংখ্যবার প্রশংসাত্মক বা সম্মানসূচক অভিভাষণ স্বরূপ ইন্দ্র, সূর্য, এবং বরুণকে অসুর সম্বোধন করেছে। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যে দেবাসুরের সংগ্রামের কথা পাই, তা বাস্তবে ছিল প্রভাব, প্রতিপত্তি বা শক্তি বনাম উৎকৃষ্ট বোধশক্তি বা প্রজ্ঞার সঙ্ঘর্ষ। সেই বৈরিতায় বিদ্যার অনুসারী গোষ্ঠী বিজয়মন্ডিত হয় ও পরাজিত হয়ে আর্য্যাবর্ত ত্যাগ করে পশ্চিমে আ্যসিরিয় সভ্যতা স্থাপন করেন অসুররা। রজতবাবু দেখিয়েছেন যে আদতে দেব অথবা অসুর নামক জনগোষ্ঠী ভারতেরই দুইটি প্রাক্কালীন, সুপ্রাচীন আর্য জাতি - একদল যাজ্ঞিক, আর অন্যদল যজ্ঞ রহিত। অসুর, দেবতা, মানব সকলকে নিয়েই ‘আর্য সমাজ’ সেদিনের।
কেবল বেদপুরাণ নয়, ভাষাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব সবকিছু মিলিয়ে লেখক সেদিনের ভারতের ইতিহাসকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। বইয়ের প্রথম পঞ্চাশ পাতা লেখক ব্যয় করেছেন ‘আর্যরা বহিরাগত নয়’ প্রমাণ করার জন্য। এবং এই সন্দর্ভে ডিস্টিংকশন সহযোগে উত্তীর্ন হয়েছেন তিনি।
ম্যাক্সমুলার, বপ, স্লেগেল, ভলতেয়ার দিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন লেখক।
শুরুতেই লেখক দেখাচ্ছেন যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দশ হাজার পাউন্ড পারিশ্রমিকে জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্সমুলারকে নিয়োগ করছেন বেদের অনুবাদের কাজে। একটি বাণিজ্যিক সংস্থা খামোখা কেন ধর্মসাহিত্যের অনুবাদে অর্থব্যয় করবে? তা-ও ব্রিটিশ নয়, জার্মান পণ্ডিত ধরে এনে ?
অথচ শুরুয়াত হয়েছিল কিঞ্চিৎ অন্যভাবে।
প্রাথমিক পর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসকবৃন্দ ও তাঁদের পৃষ্ঠপোষক পন্ডিতবর্গ ভারতবর্ষ সম্পর্কে আপাত সদর্থক মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। এই মনোভাবের প্রতিফলনের গালভরা নাম দেওয়া হয় 'প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি'। শুরুর দিকে ভারতবর্ষে বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুবিধার্থে, প্রশাসক ও কর্মচারীদের ভারতীয় আইন-কানুন, রীতিনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গড়ে তোলার জন্য সংস্কৃত-আরবি-ফারসি ভাষা শিক্ষা ও আইন কানুন বিষয়ে সম্যক জ্ঞানলাভের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।
ধূর্ত ইংরেজ, ভারতীয় সংস্কৃতিকে নিজের সুবিধার্থে এক ধরনের রোমান্টিকতা মাখানো আধ্যাত্বিক রূপে ও ইউরোপীয় বা পাশ্চাত্�� চিন্তাধারাকে 'বস্তুবাদী' হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।
কিন্তু 'White man's burden' তত্বের প্রবক্তারা নিজেদের colonizing মিশন বাদ দিয়ে আর কতদিনই বা রইবেন বলুন তো? ভারতাত্মার fundamental চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়ার জন্য আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি-অর্থনীতির এক এক দিক সম্পর্কে নির্মোহ ঐতিহাসিক গবেষণার চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং গভীর, ভূয়োদর্শী প্রজ্ঞার সমন্বয়ে নির্মিত পাঠের প্রয়োজন। সর্বোপরি, সেই পাঠের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক হল ভারতীয় সমাজে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাত সম্পর্কে বিশ্লেষণের নির্মোহ ভারসাম্য, যাতে শাসক-শাসিতের সম্পর্কের বহুমুখী, বিমিশ্র চরিত্রটি তার সমস্ত জটিলতা, টানাপোড়েন, আর আপাত-বৈপরীত্য নিয়ে ধরা পড়ে৷
কোম্পানির বয়েই গেছে এতশত করতে।
প্রকৃতপক্ষে ত্রিধাবিভক্ত ছিল তাদের প্রকল্পের অভিমুখ --
*প্রথমত প্রমান করতে হবে যে আর্যরা বহিরাগত;
*দ্বিতীয়ত এস্ট্যাব্লিশ করতে হবে একটি কাল্পনিক আর্য অনার্য সংঘর্ষের কন্সট্রাক্ট ও
*তৃতীয়ত সৃষ্টি করতে হবে একটি কাল্পনিক, পরম প্রতাপান্বিত ও অত্যাচারী ব্রাহ্মণ সমাজের যারা নেপথ্য অঙ্গুলিহেলনে পরিচালিত করছে ভারতের সমগ্র শাসন ব্যবস্থা।
"Like a snake he had split tongue. Sometimes he praised the Vedas and other times he scoffed at them.
Why?
Anyone who studies Max Muller’s writings can see one thing crystal clear. Whenever he praised the Vedas, he would show that the Aryans and Germans lived under one roof at one time and then the Aryans entered India. This is what he paid for by the East India Company and the universities. He and Caldwell distorted the history of India by giving a new meaning for the word Aryan...."
স্ত্রীকে লেখা ম্যাক্সমুলারের একটি পত্রে তিনি লিখছেন : ‘it is the only way of uprooting all that has sprung from it during the last three thousand years’।
কোম্পানির উদ্দেশ্য পরিষ্কার। ভারতবাসীরা যেন তাদের নির্দেশিত পথে ভাবতে শুরু করে।
কি সেই পথ ? না, ইউরোপ থেকেই একদিন উন্নত জাতির আর্যরা এসে ভারতে সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিল। লাভ একটাই, এসব বলে। ভারবাসীদের বোঝানো যে আবার আমরা (সাহেব) এসেছি তোমাদের উন্নত করতে। এই না হলে মাত্র কয়েক হাজার ব্রিটিশ দিয়ে তেত্রিশ কোটি ভারতবাসীকে শাসন করা যাবে কি প্রকারে ? 'White man's burden' তত্ব বাস্তবে রূপায়িত হবে কোন প্রকারে ?
মেজর জেনারেল গগনদীপ বকশী তাঁর 'The Sarasvati Civilisation: A Paradigm Shift in Ancient Indian History' বইয়ে যেমনটি লিখছেন :
"Over two centuries, this concerted cultural assault took its toll and inflicted a deep sense of inferiority amongst educated Indians. This narrative of inferiority was deeply internalized by the victims of this cultural and psychological assault that was remarkable for its sophistication and the lengths to which it was prepared to go to facilitate British rule in India.
This colonial attempt to craft a civilisational narrative went to very great lengths and was hugely successful. Indian culture and its arts and crafts were derided. The very idea of India was ridiculed. One of the most insidious attempts, however, was to write the history of the colonial subjects in a manner that would mitigate the foreignness of British rule and justify this rule to the natives. Colonial historiography therefore had a deeply ingrained racial bias.
It very deliberately crafted a series of narratives that would fortify the cardinal concept of British Imperial Justice...."
স্বামীনাথন 'Max Muller and His Contemporaries' গ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে লিখছেন - "Because Max Muller was a paid coolie, he said that we all lived under one roof 5000 years ago outside India! This he tried to prove in his 51 volumes and miserably failed. The fact of the matter is Hindus went outside and spread their culture..."
ম্যাক্সমুলার না হয় মালবাহী গাধা ছিলেন। কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে কী দেখা গেল ? সাদা চামড়ার ঐতিহাসিকরা প্রস্থান করলেও তাঁরা রেখে গেলেন একটি সুবৃহৎ অনুসারী ঐতিহাসিকের শ্রেণী।
প্যারাডাইম শিফট হলো না। স্রেফ বদলে গেলো আক্রমণের অভিমুখ। রাজীব মালহোত্রা তাঁর '“Breaking India: Western Interventions in Dravidian and Dalit Faultlines” বইয়ে আক্ষেপ করে লিখছেন:
"Today, the colonial Historians are dead and gone. Unfortunately the empire has simply shifted to the other side of the Atlantic. The ruling credo of the post war western society is now drawn from Samuel Huntington’s, “Clash of Civilisations and the Remaking of the World Order” thesis. The West takes the threat from the rising new Sinic, Indian, Slav, Islamic and other civilisations rather seriously. For some strange reason, the animus against the Indic civilisation is rather deep rooted and full of bile..."
রজতবাবু ম্যাক্সমুলারের বক্তব্যের অসারতা তুলে ধরলেন, জাতিবিজ্ঞান নিয়ে আট পাতা আলোচনা করে বোঝালেন যে ‘আর্য জাতি’ বলে আসলে কিছুই হয় না।
পরের আট পাতা জুড়ে করলেন ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা। সেখানেও আর্যদের বাইরে থেকে আগমণের পক্ষে কিছু পাওয়া গেল না।
সর্বশেষে রজতবাবু এলেন প্রত্নতত্ত্ব সংক্রান্ত আলোচনায়। ভারতে প্রাপ্ত নিদর্শনের পূর্বেকার কোনো আর্য নিদর্শন যে বাইরে পাওয়া যায়নি আসলে সেটাও দেখালেন।
স্মৃতিশাস্ত্র বলছে ‘আর্য’ শব্দটি জাতিবাচক নয়। আচরণে একজনকে ‘আর্য’ বলা যেতে পারে। গৌতম বুদ্ধ ‘ধম্মপদে’ বলেছেন ‘প্রাণীহিংসা দ্বারা কাউকে ‘আর্য’ বলা যাবে না, সর্বপ্রাণীতে অহিংসাহেতু কাউকে ‘আর্য’ বলা যায়’।
ঋগ্বেদে 'আর্য' শব্দটি কি একটি জাতিকে বুঝিয়েছে? ঋগ্বেদে 'আর্য' শব্দটি 'গৌরব' বা 'মর্যাদা'র অর্থ বহন করেছে, কোন নির্দিষ্ট জাতির প্রতি ইঙ্গিত করেনি। আর্য ও দ্রাবিড় যদি দুটো ভিন্ন জাতি হত তাহলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের অধিবাসীদের একই দেবতা, একই ঈশ্বর, প্রায় একই ভাষা (সংস্কৃত থেকে উদ্ভুত), একই পৌরাণিক বিশ্বাস ও গল্প হতে পারত না।
দ্রাবিড় কি কোন আলাদা জাতিগোষ্ঠী? তা তো নয়।
ঋগ্বেদ যদি তথাকথিত আর্যদের দ্বারাই রচিত হয় তাহলে কেন ঋগ্বেদের একটিও সূক্তে কোনও ইউরোপীয় স্থান, নদী ইত্যাদির নাম নেই? পন্ডিতদের একটি সমূহ যখন বলেন যে আর্যরা খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালে সিন্ধু সভ্যতা আক্রমণ করে আর অন্যদিকে আমরা ঋগ্বেদে খরস্রোতা স্বরস্বতী নদী দেখতে পাই, যে নদী খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে মারা যায় (সম্ভবত প্লেট টেকটনিক মুভমেন্টের জন্য) তখন এ ইতিহাস যে মিথ্যা, কলুষিত, পচা, তা আর দ্বিতীয়বার ভাবতে হয় না।
তাছাড়া পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের মেহরগড় প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটি খননের পর দেখা যায় প্রায় ৯৫০০ বছর আগে নবপ্রস্তর যুগে এখানকার অধিবাসীরা যাযাবর জীবন ছেড়ে স্থিতিশীল গ্রামীণ কৃষি জীবনে চলে গিয়েছিল। খ্রীষ্টপূর্ব ৮০০ সাল পর্যন্ত সেখানে কোন বাইরের জনগোষ্ঠীর আগমণ ঘটেনি।
ঋগ্বেদ যে কোন যাযাবর জনগোষ্ঠীর রচিত হতে পারে না, তা ফুটে ওঠে এর চমকপ্রদ, সুশোভন ও বর্ণময় সমাজচিত্র রূপায়নে, গৃহনির্মাণের উপমা প্রয়োগে, অট্টালিকা, তন্তুবায়, ভেষজ চিকিৎসা ইত্যাদি শব্দপ্রয়োগে। চান্দ্রমাসে হিসাব করলে যে প্রতি তিন বছর একটি ১৩ মাসে বছর হতে হয় (যা কৃষিকাজ ইত্যাদির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়), যাকে বৈদিক সমাজ মলমাস বলত (এখনও হিন্দুরা বলে) তার উল্লেখও বেদে পা্ওয়া যায়।
উপরন্তু, আর্য নামক কোনও জাতি বাইরে থেকে এসে দ্রাবিড়দের হত্যা করে তাদের দক্ষিণ ভারতের অভিবাসী হতে বাধ্য করে তাহলে তামিলদের প্রাচীন সাহিত্যে কেন এই ঘটনার ন্যূনতম উল্লেখ নেই? খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ নাগাদ রচিত প্রাচীন তামিল সঙ্গম সাহিত্যের কোত্থাও আর্যদের কাছে পরাজিত হয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে মাইগ্রেশনের একটিও নিদর্শন নেই। তদতিরিক্ত, দেখা যায় যে সঙ্গম সাহিত্য বেদের প্রতি চূড়ান্ত বিনীত ও শ্রদ্ধাশীল।
এরকম প্রভূত উদাহরণ পেশ করা যাবে, যাতে প্রমাণিত হয় যে বেদের রচয়িতা মোটেই তথাকথিত আর্যরা হতে পারে না।
রজতবাবু বইটিকে দুভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম খণ্ডে নয়টি অধ্যায়।
১) আর্য আক্রমণ তত্ত্ব – দেড়শ বছরের এক ঐতিহাসিক ধাপ্পা ২) তাহলে আর্য কারা ? ৩) বৈদিক সাহিত্য, ঋকবেদ এবং ভারতবর্ষ ৪) মহাভারতের কালনির্ণয় ৫) বৈদিক সাহিত্য ও পৌরাণিক বংশাবলী ৬) আর্য জনজাতির বিস্তার ৭) আর্য জনজাতির পরবর্তী বিস্তার ৮) অসুর জাতির কথা ৯) স্বর্গ ও মর্ত্যের নানান কথা
‘আর্য’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াও ‘অসুর’ নিয়ে একটি পূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। স্বর্গ আসলে কোথায়, পাতালই বা কাকে বলে, এর উত্তর দিয়েছেন লেখক। এ কোনো অলৌকিক উপকথার গল্প নয়। আমাদের পৃথিবীতেই রয়েছে এসবের স্থান।
বইয়ের এই অংশে রজতবাবু উপাত্তের ভিত���তিতে যে যে অনুষঙ্গ নিয়ে আলোচনা করলেন সেগুলো কিছুটা এই প্রকার:
ক) তিনি দিলেন দেবতা ও অসুরদের বংশতালিকা।
খ) দিলেন বিখ্যাত সূর্য ও চন্দ্র বংশের পূর্ণ তালিকা।
গ) জানালেন বিষ্ণু, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতা আসলে একক ব্যক্তি নন। বরং ঐ পদে আসীন একাধিক ব্যক্তি।
ঘ) পুরাণ থেকে লেখক ১৪ জন ইন্দ্র এবং ১৪ জন বিষ্ণুর নাম দিলেন।
ঙ) তিনি দেখালেন যে কেবল দেবতারাই নন, বিভিন্ন মুনিঋষির পদেও একাধিক ব্যক্তি আসীন হতেন। যে বিশ্বামিত্র সুদাস রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তিনি রামকে নিয়ে জনক রাজার কাছে যাচ্ছেন না। যাচ্ছেন পরবর্তী একজন বিশ্বামিত্র। এই পদগুলি খানিকটা শঙ্করাচার্যের মত। আজকের মঠপ্রধান শঙ্করাচার্য নামে পরিচিত হলেও তিনি আদি শঙ্করাচার্য নন।
প্রথম খণ্ডে নানা তথ্য সহযোগে লেখক মহাভারতের কালনির্ণয়ও করেছেন।
দ্বিতীয় খণ্ডটি একটু ভিন্ন স্বাদের। এখানে রয়েছে দশটি অধ্যায়।
১) সরস্বতী নদী ২) ধর্মীয় আলোচনা ৩) অশ্ব ও রথের কথা ৪) নগর ও গ্রামীণ সভ্যতা ৫) নৃতাত্ত্বিক আলোচনা ৬) কৃষিকার্য ৭) সেচ ব্যবস্থা ৮) মৃত সৎকার পদ্ধতি ৯) ভাষা ও লিপি ১০) সিন্ধুলিপির পাঠোদ্ধার
সিন্ধুসভ্যতা আবিষ্কারের পরে আর্যদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই সিন্ধুসভ্যতার তুলনা এসে যায়। লেখক প্রথমেই লুপ্ত নদী সরস্বতীর কথা বলেছেন। নানা রিসার্চ তুলে ধরে লেখক সরস্বতীর গতিপথ বর্ণনা করেছেন।
ইতিহাসের নগন্য ছাত্র হিসেবে আমরা যাঁরা দানিনো, শ্রীনিবাসন , অধ্যাপক বৃজবাসী লাল বা দিলীপকুমার চক্রবর্তীর কাজের সাথে পরিচিত , রজতবাবুর বইয়ের এই অংশটি তাদের অসম্ভব চিত্তাকর্ষক মনে হবে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ধর্মীয় আলোচনা করে দেখিয়েছেন সেদিনের ভারত ছিল নানা সংস্কৃতির এক 'mosaic পৃথিবী', অনেকটা আজকের মতই। সিন্ধুসভ্যতার মধ্যে যে আর্য সংস্কৃতিও ছিল সেটির নানা প্রমাণ লেখক একের পর এক অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন।
সবশেষে লেখক নিজের মত করে সিন্ধুলিপির পাঠ করেছেন।
সবমিলিয়ে এই বই এক অবশ্যপাঠ্যে পরিণত হয়েছে। সেদিনের ভারতের কথা জেনে নিতে গেলে এই বই না পড়লেই নয়। কারণ আমাদের পাঠ্য পুস্তকে যে সেসব কথা লেখে না। এখনো লেখে না।
মিথ্যা ইতিহাসের ঘেরাটোপে এই ২০২১ সাল অবধিও বন্দি হয়ে রয়েছে শিশু-কিশোরদের ইতিহাসবোধ। চতুর্থ শ্রেণীর ইতিহাস বইয়ে আজও লেখা থাকে : "It is believed that the earliest inhabitants of India were Dravidians, who were....the people lived in Mahenjodaro and Harappa...The Aryans migrated from central asia and drove away the Dravidians after fierce battles...The culture of the Aryans was entirely different from that of the Dravidians."
দেশের প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও পড়ানো হয় - 'আর্যরা বহিরাগত। আমাদের সন্তান সন্ততি আজও তোতাপাখির বুলি আওড়িয়ে বলে - আর্যরা ইউরেশিয়া থেকে ঘোড়ায় চড়ে ভারতে এসে ভারতের নিজস্ব Indus Valley Civilization (IVC) কে ধ্বংস করেছিল; মহেঞ্জোদাড়োতে অনার্যদের নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেছিল। আর্যদের অত্যাচারে সেখানের মূলনিবাসী অনার্য মানুষরা ভারতে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
লিবারাল-মার্ক্সপন্থী ঐতিহাসিকের দল সর্বদাই বলে থাকেন - "বুঝলে বাপু, প্রাচীন ভারত নিয়ে বহু হাস্যকর গল্প ছড়ানো হচ্ছে এই আমলে। হিন্দুত্ববাদীদের আখ্যানে, প্রাচীন ভারত মানেই এক শোষণহীন সুবর্ণযুগ এবং মধ্যযুগে সুলতানি শাসন মানেই সামাজিক অধোগতি। কিন্তু প্রাচীন ভারতে কী ভাবে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অস্পৃশ্যতা ও শোষণ চলত, তা জানো হে? প্রাচীন ভারতের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদকে অস্বীকার করে পালি, প্রাকৃতের মতো ভাষাকে অস্বীকার করে, শুধু সংস্কৃতের জয়গান ও একমুখী ভ্রান্ত ইতিহাস রচনার চেষ্টা হচ্ছে তা জানো?"
তাঁদের সসম্মানে এটুকুই বলতে হবে - মহাকাল ত্রিনয়ন দিয়ে বিশ্ব অবলোকন করেন মহাশয়। আপনাদের বক্তব্য হয় মেনে নেবো নচেৎ তা নিয়ে বিতর্ক চলবে, কিন্তু আপনাদের প্রত্যক্ষ মদতপুষ্ট 'আর্য-অনার্য' propaganda বর্তমানের জিনগবেষণার অগ্রগতি হেতু মৃত্যুবরণ করেছে। এখন করনীয়, পাঠ্য পুস্তকের ব্যাপক সংস্কার সাধন এবং সত্যকে তুলে ধরে ভ্রান্ত তত্বের বুলি কপচে ভারতীয় রাষ্ট্র কাঠামো, সমাজ ও সংস্কৃতিকে বিভক্ত করতে সদাসচেষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে সক্রিয় দেশবিরোধী শক্তি গুলিকে চিহ্নিত করে কঠোর হাতে দমন।
উপরোক্ত প্রসঙ্গগুলি মাথায় রাখলে রজতবাবুর বইটি এক কথায় unputdownable!!
"হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন— শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।" গানে হোক বা কবিতার আকারে, এই কথাগুলো আমরা বলে আসছি একেবারে শৈশবকাল থেকেই। মাথায় বসে যাচ্ছে অনেকগুলো আপাত অচেনা, পরে ইতিহাসে বারবার দেখা ও শেখা শব্দ। তারপর ইতিহাস বই থেকে শিখছি, আর্য মানে ককেশীয় বহিরাগতের দল, যারা ভারতের বন্য অনার্যদের মেরে, তাড়িয়ে, পরাস্ত করে, সর্বোপরি 'সভ্য' করে এ-দেশের সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। অনেক পরে বুঝেছি, কথাগুলো সর্বৈব মিথ্যা। আর্য জাতি বলে কিছু হয় না। ঠিক সেভাবেই জাতিগতভাবে অনার্য বলে কিছু হওয়া সম্ভবই নয়। বরং ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো দুটো প্রশ্নর উত্তর ইতিহাস বইয়ে পাওয়াই যায় না। সেগুলো কী বলুন তো? (ক) ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে আমরা যা-যা বুঝি তার সূচনা ও বিস্তার ঘটল কীভাবে? (খ) এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম তথা বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো সভ্যতাগুলোর অন্যতম বলে যাকে জানি, সেই সিন্ধু-সভ্যতার শেষ অবধি কী হয়েছিল? দুটো প্রশ্নের উত্তর যে একই, সেটা আমি প্রথম বুঝি মাইকেল ড্যানিনো'র যুগান্তকারী বই "The Lost River: On the Trail of the Sarasvati" পড়ে। সে-বই থেকে জানা যায়, কীভাবে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতাই বিবর্তিত হয়েছিল আর্য সংস্কৃতির চেহারায়— যার চিহ্ন রয়ে গেছে কিংবদন্তি আর পুরাণে। অবধারিতভাবেই ভাবতে শুরু করেছিলাম, বাংলায় কি এমন কোনো বই আছে, যা ভৌগোলিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং জিনগত তথ্যের সাহায্যে এই আর্য-অনার্য বিভাজনের প্রকাণ্ড মিথ্যেটা প্রমাণ করে দিতে পারে? জানতে পারলাম, তেমন বই আছে। সেটি প্রশ্নাতীতভাবে যুক্তি, তর্ক ও তথ্যের সাহায্যে আর্য-অনার্য নামক বিভাজনকে মিথ্যা বলে সাব্যস্ত করেছে। তারই সঙ্গে সেটি নতুন করে দেখিয়েছে, কীভাবে পুরাণের মধ্যে রূপকের আকারে লুকোনো রয়েছে ইতিহাস। অথচ সে-বইটির কথা জানেন এমন মানুষের সংখ্যা ভীষণ কম। অতঃপর বইটি ক্রয়, পাঠ এবং একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া! সেটিরই রিভিউ করছি এখন।
ঠিক কী-কী আছে এই বইয়ে? একটি সংক্ষিপ্ত 'ভূমিকা' এবং ডক্টর ইন্দ্রজিৎ সরকারের 'প্রস্তাবনা'-র পর এতে এসেছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়~ প্রথম খণ্ড: আর্য সভ্যতার কাহিনি ১. আর্য আক্রমণ তত্ত্ব এবং দেড়শো বছরের এক ঐতিহাসিক ধাপ্পা; ২. তাহলে আর্য কারা? ৩. বৈদিক সাহিত্য, ঋক্বেদ এবং ভারতবর্ষ ৪. মহাভারতের কালনির্ণয় ৫. বৈদিক সাহিত্য ও পৌরাণিক বংশাবলী ৬. আর্য জনজাতির বিস্তার ৭. আর্য জনজাতির পরবর্তী বিস্তার ৮. অসুর জাতির কথা ৯. স্বর্গ ও মর্ত্যের নানান কথা দ্বিতীয় খণ্ড: আর্য সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা— তুলনামূলক আলোচনা ১) সরস্বতী নদী ২) ধর্মীয় আলোচনা ৩) অশ্ব ও রথের কথা ৪) নগর ও গ্রামীণ সভ্যতা ৫) নৃতাত্ত্বিক আলোচনা ৬) কৃষিকার্য ৭) সেচ ব্যবস্থা ৮) মৃত সৎকার পদ্ধতি ৯) ভাষা ও লিপি ১০) সিন্ধুলিপি ও তার পাঠোদ্ধার ১১) উপসংহার এই বিষয়ে যাঁরা লেখালেখি করেছেন তাঁদের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিয়ে বইটা শেষ হয়েছে।
এ-বইটা আমার মনোজগতে প্রায় ভূমিকম্প ঘটিয়ে দিয়েছিল— এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে পাথুরে প্রমাণ, আর সরস্বতী নদীকে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে ভৌগোলিক আলোচনা সম্বন্ধে আমি কিছুটা ওয়াকিবহাল ছিলাম। কিন্ত পুরাণ ও বেদের বিশ্লেষণ করে তার মধ্যেই ভারতেতিহাসের জটিলতম ওই দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার পদ্ধতি ও প্রকরণটি আমার অভিনব, দুঃসাহসিক, অথচ যৌক্তিক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এ-বইয়ের দুটো প্রকাণ্ড সমস্যা ছিল। প্রথমত, বইটার প্রচ্ছদ ছিল অত্যন্ত বোরিং। সৌভাগ্যক্রমে, খড়ি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এটির নবকলেবর-এর প্রচ্ছদটি রুচিশীল ও যথাযথ। দ্বিতীয়ত, লেখক সর্বসাধারণের কাছে বইটিকে জনপ্রিয় করে তোলার মতো করে লেখেননি। তিনি একেবারে রিসার্চ পেপার লেখার মতো করে এতে ছবি, স্কেচ, পরিসংখ্যান, মানচিত্র, ফটো— সবকিছু দিয়েছেন। ফলে বইটা পড়া রীতিমতো কঠিন কাজ হয়ে গেছে। কিন্তু এই কঠিন আকার ও বিন্যাসের মধ্য দিয়ে শেষ অবধি যেতে পারলে এই বই এমন কিছু কথা আমাদের সামনে তুলে ধরে, যা ইতিহাস ও পুরাণের পাঠকে একেবারে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়। লেখক তার মধ্য থেকে যে-সব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আপনি একমত হতে পারেন বা না-পারেন। কিন্তু ভারততীর্থের এই মহামানবের সাগরতীরে যে কালসমুদ্র ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে, আবার পিছিয়ে যাচ্ছে— তার কল্লোল আপনার প্রাণকে স্পর্শ করবেই। যদি আপনি এ-দেশের সত্যিকারের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটি আমি আপনাকে অতি অবশ্যই পড়তে বলব।