'মা' শব্দের একটি অপ্রচলিত অর্থভাব 'পরিমাপ করা'। শিবের যিনি পরিমাপক অর্থাৎ যাঁহার ভিতর দিয়া অপরিমেয় শিব সৃষ্টি প্রপঞ্চরূপে পরিমিত হন সেই শক্তিরূপিণী হইলেন উমা। উমা শিবের শক্তি, সেই অমিতশক্তির নিয়ন্ত্রক। মাতা উমা পার্বতী, দক্ষকন্যা সতী, দুর্গা, চণ্ডিকা প্রভৃতি বিবিধ নামাঙ্কিতা। একপ্রকারে মহাদেবী বা মহামায়া। মহাদেবী রূপ বদলে কালিকা বা কালী। আর সেই ধারাতেই শ্যামা। আদতে সবই শক্তি, আদিশক্তি বা আদ্যাশক্তি।
মা কালীকে নিয়ে বিবিধ গ্রন্থ, তত্ত্বসার ও ক্ষেত্রসমীক্ষা রয়েছে। মা কালী বাঙালির প্রাণ ও সংস্কৃতিতে তিরতির করে বয়ে চলা অপারবিসারী নদী। তাতে মহার্ঘ্য প্রস্তরখণ্ড থেকে দুই পাড়ের মাটি সবই এসে পলি হয়ে মিশেছে। রাজা, উজির, সাধক, ভিখারি, অজস্র রচয়িতা, অজস্র পদ, অজস্র সুর সবই মায়ের নামেই উৎসর্গীকৃত। 'কালী কথা' সেখানেই আরেকটি নতুন সংযোজন।
মন্ত্র-তন্ত্রহীন এক সন্তানের মনোজগতে সহজভাবে দৃশ্যমান মাতৃজগৎ, সরলভাবে মায়ের কথা বলার চেষ্টা। যন্ত্রণায়, আকুতিতে যে ঈশ্বর বাস করেন, তাকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা। সেই যে বলা হয়-তরল হলে তবেই তো গড়িয়ে যাবে। এই সেই তরল করে মায়ের কঠিন কথা বলার চেষ্টা।
তমোঘ্ন নস্করের কালী কথা পড়া যেন এক আশ্চর্য যাত্রা — যেখানে দেবী কালী শুধু ইতিহাসের চরিত্র নন, বরং এক জীবন্ত, বহুমাত্রিক সত্তা, যিনি বাঙালির জাতিস্মৃতি, দৈনন্দিনতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত।
এই বই একটানা পড়লে মনে হয়, এক গভীর প্রার্থনা পাঠ করছি, আবার কোথাও যেন শ্মশান থেকে গৃহস্থালি, লোককথা থেকে তন্ত্র, রামপ্রসাদ থেকে রক্তে মেশা প্রতিকারের আখ্যানে চলে আসা এক অন্তঃসলিলা জার্নি—যার গন্তব্য নয়, শুধু যাত্রা। ধর্মতত্ত্ব বা একাডেমিক ডিসকোর্সের বাইরে দাঁড়িয়ে এই বই একেবারে ‘জীবন্ত’—তবে হুজুগ নয়, বরং অনুধ্যান।
তমোঘ্ন কালীকে দেখান এক গর্ভগভীর অস্তিত্বচেতনার প্রতীক হিসেবে—যিনি কখনও বিপন্নতার বিরুদ্ধে রক্তচোষা ভাষা, কখনও বা কোমল আশ্রয়, আবার কখনও সময় বা কালস্বরের নিজস্ব ছায়াচিত্র। তাঁর বিশ্লেষণে কালী কালো নন শুধু গাত্রবর্ণে, তিনি কাল—যার ভিতরে সময় ঘূর্ণমান, স্থিরতা নেই, কারণ কালী নিজেই অনন্ত প্রবাহ।
এই প্রবাহের মধ্যে ঢুকে পড়ে আমাদের পরিচিত মা—যিনি ইলিশের ভোগ নেন, আবার রক্তভেজা খড়্গও ধারণ করেন। তাই কালী এখানে কেবল হিন্দু দেবীমাত্র নন, বরং এক ‘মিথিক ভাষা’, যাঁর প্রতিটি উপকরণ—খড়্গ, জিভ, মুণ্ডমালা, নগ্নতা—এক একটি দার্শনিক স্তরের প্রতীক। এ যেন কালী নয়, এক গভীর অলৌকিক কাব্য।
তুলনামূলক পাঠে এই বই দাঁড়ায় এক অভিনব ধারায়। যেখানে Kali: The Black Goddess of Dakshineswar নামের গ্রন্থটি কেন্দ্রীভূত ভক্তি-ভাষা আর রামকৃষ্ণীয় অনুভবকে ধারণ করে, সেখানে Encountering Kali বা Kali’s Child তৈরি করেছে একাডেমিক বা মনোবিশ্লেষণাত্মক কথন। Kālī Kaula-য় যেটুকু তন্ত্রানুভব, বা Shakti Mantras-এ যে উচ্চারণগত পথ, তার থেকেও আলাদা তন্ময়ের কলম—কেননা এখানে তত্ত্ব নয়, আন্তরিকতা সবচেয়ে বড় সত্য। Mother of My Heart, Daughter of My Dreams-এর মতোই কালী কথা-ও তাত্ত্বিক আবর্ত নয়, বরং হূদয়াবেগ আর লৌকিক সংস্কৃতির উপচে পড়া অভিজ্ঞতা। যেমনভাবে বিপত্তারিনী ব্রতের স্তোত্রে দেবী বলে ওঠেন “ঐকেবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা”—এই বইও তাই বলে ওঠে, “আমি-ই কালী, আমি-ই স্মৃতি, আমি-ই অভয়, আমি-ই ভয়।”
তমোঘ্ন যেভাবে বিপত্তারিনী, কৌশিকী, দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী বা ফলহারিণী—এই প্রতিটি রূপকে একটি করে জীবনদর্শন হিসেবে মেলে ধরেন, তাতে বোঝা যায়, তাঁর কাছে দেবতা বলতে কেবল পূজ্য বস্তু নয়—তিনি এক ধারালো প্রতিচ্ছবি, এক প্রতিবাদের শরীর, এক অস্তিত্বচিহ্ন।
গৃহের মন্দির আর গ্রাম্য শ্মশান—দুটোর মাঝের বিস্তৃত ধূসর জায়গা—সেই মধ্যবর্তী অঞ্চলেই এই বইয়ের বাস। তাঁর ভাষা কখনও শিশিরস্নাত শ্লোকের মতো, কখনও কাঁদা-ধুলোমাখা বারোমাস্যার মতো। এ যেন রক্তমাংসের দেবী, যিনি দুধের মতন স্নেহ, অথচ তেজের মতন সংহারী।
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব তার সীমানাহীন রূপান্তরশীলতা—লেখকের কলম আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, কালী একধারে ত্রিভুবনের তেজ, আবার অন্যদিকে জননী, যাঁর চোখে লাল আগুন, আর কোলে ঘুমন্ত জাতিস্মৃতি।
কালী কথা তাই কেবল বই নয়—এক প্রজ্ঞা, এক নিমজ্জন, এক কালীময় আত্মকথন।
দেব দেবী বিষয়ক লেখালেখি বই আমার বিশেষ পছন্দ। পুরাণ, মিথ, আঞ্চলিক লোকাচার ও ঐতিহাসিক দিক সম্পর্কে অনেক অজানা দিক জানা যায় এই লেখাগুলি থেকে। সেরকমই একটি সংকলন কালী কথা।
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় ফেসবুকে মা কালীর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ছোট বড় লেখা এই বইতে রয়েছে। তমোঘ্ন নস্করের লেখার সাথে পূর্ব পরিচিত। সহজ সরল ভাবে লেখেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মা কালীর বিভিন্ন রূপ ও তার পৌরাণিক কাহিনী, দেবীর বিভিন্ন অবতার ,শক্তিপীঠ সতীপীঠের কথা , বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বহু পুরোনো কালী মন্দির ও মূর্তির ইতিহাস, সাধকের কাহিনি সহজ ও সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন।
তন্ত্র ও ধারনা এই অধ্যায়ে যেভাবে এই কঠিন বিষয়কে সাধারন পাঠকদের জন্য বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে তা প্রশংসনীয়। কুন্ডলিনী শক্তি ,পঞ্চ ম কার বিষয়ে শ্লোক ও মন্ত্রের ব্যাখ্যা সহ লেখা বেশ ভালো লেগেছে। সোস্যাল মিডিয়ায় এই নিয়ে তথাকথিত জ্ঞানীগুনী জনের ত্রুটিপূর্ণ পোষ্ট পডকাস্ট এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে ভুল ধারনার জন্ম দেয় বিভ্রান্তি ছড়ায় সেদিক থেকে এই অধ্যায়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও দরকারি বলে মনে হয়েছে। অমৃতস্য পুত্র অধ্যায়ে স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে বিপ্লবীদের মধ্যে কালীর পুজো কেন ও কিভাবে প্রচলিত হয়েছিল সেই সব বিষয় জানা গেল।
মাতৃকল্প অধ্যায়ে মা কালীর মূর্তির তাৎপর্য ব্যাখা বাংলার কিছু লোকাচার , উপদেবতা সংক্রান্ত তথ্য পাঠে সমৃদ্ধ করেছে
মা কালীকে নিয়ে লেখা লেখকের নিজস্ব উপলব্ধি ও বিষয় উপস্থাপনা মোটের উপর ভালোই লেগেছে। লেখনী সহজ ও মনোগ্ৰাহী। লেখক বইতে থাকা প্রায় প্রতিটি মন্ত্রের ডিকোড করেছেন সেটা আমার সবথেকে ভালো লেগেছে। তবে ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে বেশিরভাগ লেখাই সংক্ষিপ্ত।আরো বিস্তারিত বর্ননা থাকলে ভালো লাগতো সেইজন্যই কিছু বিষয় দ্রুত শেষ হয়ে গেল বলে মনে হয়েছে। প্রচ্ছদ চিত্র যথাযথ কিন্ত কিছু মন্দির ও কালীর ছবি ও অলংকরণ রাখা যেত বইতে। লেখাগুলি যেহেতু বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আগে প্রকাশিত হয়েছিল তাই প্রতিটি লেখার সাথে প্রকাশকাল উল্লেখ থাকলে সুবিধা হতো।
এই বিষয়ের উপর লেখা কিছু বইপত্র আগে পড়েছি তাই কিছু টপিক নতুন মনে হয়নি। যারা মা কালী সম্পর্কে সহজ ভাবে স্বল্প পরিসরে কিন্তু তথ্যসমৃদ্ধ ভাবে জানতে ও পড়তে আগ্ৰহী তারা এই বইটি দিয়ে শুরু করতেই পারেন। পরবর্তী সময়ে বিস্তৃত পাঠের আগ্ৰহ থাকলে রেফারেন্স বইতে দেওয়া আছে। লেখককে কালী কথার পরবর্তী খন্ডের জন্য আন্তরিক শুভকামনা জানাই। লেখা চলতে থাকুক। জয় মা কালী 🙏