গল্প সঙ্কলন পড়তে আমার ভালো লাগে। অনেক সময় একটানা উপন্যাস পড়ার পর স্বাদ পরিবর্তন করতে আমি বেছে নিই গল্প সঙ্কলন। আর সেই গল্প সঙ্কলন যদি হয় হরর ও থ্রিলার কেন্দ্রিক, তাহলে তো জমে ক্ষীর। আদী প্রকাশনের পাঠকপ্রিয় হরর-থ্রিলার গল্প সঙ্কলনের সিরিজ 'নিশুতি'-এর ষষ্ঠ কিস্তি পড়ে শেষ করলাম। ২১ জন লেখকের ২১টা মৌলিক গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে এই সঙ্কলনটা। যথারীতি সম্পাদনায় ছিলেন ওয়াসি আহমেদ। নিচে আমি 'নিশুতি ৬'-এর কিছু গল্প নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করছি। সেই সাথে জানাচ্ছি আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া।
গহ্বর - তাসনিয়া আহমেদ: সালমান আর হাসান দুই বন্ধু। তারা একটা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। থাকে মাদ্রাসারই হোস্টেলে। ঈদের ছুটিতে সবাই যার যার বাড়িতে চলে গেলেও সালমান মাদ্রাসার হোস্টেলেই থেকে গেলো। বাড়িতে চলে গেলো হাসানও। সালমানকে একা ফেলে হাসানের বাড়িতে যেতে ইচ্ছা করছিলো না। কিন্তু যেতে তো হবেই। ঈদ বলে কথা।
অনেকটা ভূত এফ.এম. টাইপ গল্প 'গহ্বর'। হরর পডকাস্টগুলোতে এই ধরণের গল্প অহরহ শোনা যায়৷ শুনতে তাৎক্ষণিকভাবে ভালোও লাগে। তাসনিয়া আহমেদের এই গল্পটাও পড়তে ভালোই লেগেছে। তবে এটাকে আলাদা রকমের কিছু বলে মনে হয়নি। পড়া, পড়তে পড়তে উপভোগ করা আর তারপর ভুলে যাওয়া। 'গহ্বর' আমার মতে এমনই একটা হরর গল্প।
পাপ - রিফু: অনিমা অন্তঃসত্ত্বা। ইদানীং সে রাতে বেশ ভয় পায়। তার সারাক্ষণই মনে হয় রাত হলেই তার খাটের নিচে কোন এক কিলবিলে সাপ নড়াচড়া করে। সেই সাথে তীক্ষ্ণ এক হিসহিসানি শব্দে ভরে যায় পুরো ঘর৷ অনিমা প্রচণ্ড ভয়ে তার স্বামী আসিফকে ডেকে তোলে। আসিফ সারা ঘর খুঁজতে থাকে। এভাবেই চলতে থাকে সবকিছু। কথায় আছে, পুরোনো পাপ আবার ফিরে আসে। আসলেই বোধহয় তাই।
রিফু'র 'পাপ' গল্পটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। গল্পটাতে শুরু থেকেই একটা অস্বস্তির ভাব ছিলো। ধীরে ধীরে সেটা ভয়ের রূপ নিয়েছে। কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানা থেকে গেলেও ওভারঅল পুরো গল্পটা ভালো ছিলো। লেখকের লেখা এর আগে পড়া হয়নি আমার। তার গল্প বলার ধরণ আলাদা। গল্পের ভেতরে বেশ কিছু টাইপিং মিস্টেক লক্ষ্য করেছি। এতে সামান্য বিরক্ত হয়েছি। রিফু'র লেখা ভবিষ্যতেও পড়তে চাই।
এখানে স্বপ্ন পূরণ করা হয় - রাফিউল লিছিল তালুকদার: হাবিবুর রহমান সাহেবের স্বপ্ন, তাঁর একমাত্র মেয়েটাকে একটা ভালো ঘরে বিয়ে দিয়ে তিনি একটু নিশ্চিন্ত হবেন। কিন্তু কিছুতেই যেন মেয়েটার একটা গতি হয়েও হচ্ছে না। নানা বাধায় আটকে থাকছে। তাই তিনি শরণাপন্ন হলেন এমন এক মানুষের, যে কিনা মানুষের যেকোন একটা স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। এদিকে সদাহাস্যজ্বল থাকা কোন মানুষের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ দুর্বিপাক। শোনা যায় প্রতিশোধের শিঙাধ্বনি।
এই গল্পটা একটু বড়। সুপারন্যাচারাল থ্রিলার ঘরানার এই গল্পটা আমার মোটামুটি ভালোই লেগেছে। রাফিউল লিছিল তালুকদারের গল্প বলার ভঙ্গি চমৎকার। তবে লিখতে গিয়ে পার্সন এলোমেলো করে ফেলেছেন তিনি অনেক জায়গাতেই। হুটহাট ফার্স্ট পার্সন গল্পে এসে পড়েছে। সম্পাদনার ক্ষেত্রে একটু মনোযোগ থাকলে এই ব্যাপারটা কাটিয়ে ওঠা যেতো। লেখকের নিজেরও উন্নতির আরো জায়গা আছে। সময়ের সাথে সেটা হয়ে উঠবে আশা করি।
জরায়ু - সামসুদ্দোহা রিফাত: আনিস আর রিয়া'র সুখের সংসার। আনিস সারাদিন খেটেখুটে বাসায় ফিরে রিয়াকে সময় দেয়ার চেষ্টা করে। রিয়া তৃতীয়বারের মতো অন্তঃসত্ত্বা। এর আগের দুইবার অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তাদের বাচ্চা মি'স'ক্যা'রে'জ হয়ে যায়। তাই এবার আনিস আর রিয়া দুজনেই বেশ সতর্ক এই ব্যাপারে। কিন্তু ইদানীং রিয়া'র সবসময়ই মনে হয় তার সাথে কেউ আছে। অজানা কারো এই নীরব উপস্থিতি রিয়াকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। ভয় পেতে থাকে মেয়েটা।
'জরায়ু' গল্পটা আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। গল্পে সুপারন্যাচারাল ভাইব পুরোদমে ছিলো। কিন্তু সেটাকে ছাপিয়ে যে ব্যাপারটা বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছে সেটা হলো মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের চিরাচরিত টানাপোড়েন। এই ব্যাপারটার সাথে পাঠক মাত্রই বেশ রিলেট করতে পারবেন, যেমনটা আমি পেরেছি। গল্পটার মাঝামাঝি পর্যন্ত আসতে আসতে শেষটা অনেকটাই প্রেডিক্টেবল হয়ে গেছিলো। তবে সামসুদ্দোহা রিফাতের চমৎকার ডেলিভারির কারণে উপভোগ করেছি পুরোটাই। সামনে লেখকের মৌলিক উপন্যাস আসতে যাচ্ছে। সেটাও পড়ার ইচ্ছা আছে।
মরা মানুষের রোগ - সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: ঘাঘু চোর রতন এক রাতে চুরি করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলো৷ একাকী থাকা এক বৃদ্ধকে আবিস্কার করলো সে একদম চলৎশক্তিহীন অবস্থায়৷ বৃদ্ধ ভদ্রলোকের আচার-আচরণ দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলো রতন। চুরি করতে গিয়ে জীবনে অনেক কিছুই দেখেছে, অনেক কিছুই শুনেছে রতন। কিন্তু এমন ব্যাখ্যার অতীত কিছুর দেখা সে এর আগে কোনদিন পায়নি।
চমৎকার একটা গল্প 'মরা মানুষের রোগ'। গল্পের নামটা যেমন ইন্টারেস্টিং, এর প্লটটাও তেমনই ইন্টারেস্টিং। এই গল্পটা আমার ভেতরে যুগপৎ দুটো অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। ভালো লাগা আর মন খারাপ করা। লেখিকা সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি'র গল্প এর আগে আমি একটাই পড়েছিলাম৷ লেখার প্রচুর উন্নতি করেছেন তিনি৷ 'মরা মানুষের রোগ' শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অসাধারণ লেগেছে। এর সমাপ্তিটাও ভালো লেগেছে আমার।
চোখ বদলে গেলে - এনামুল রেজা: চল্লিশোর্ধ্ব দম্পতি আনোয়ার আর রুবার মধ্যে সারাক্ষণ খিটিমিটি লেগেই থাকে। মাঝেমাঝে এমন অবস্থা হয় যে ঝগড়াঝাঁটি নিজেদের আয়ত্তের বাইরেও চলে যায়। একদিন হঠাৎ আনোয়ারের চারপাশের সবকিছু বদলে যায়। চারিদিকে শুধু আনন্দ আর আনন্দ। যা দেখে সবই সুন্দর লাগতে থাকে। অতঃপর কি হ্যাপি এন্ডিং? হয়তো!
'চোখ বদলে গেলে' গল্পটা আমার কাছে ভালো লেগেছে। পুরো গল্পটা জুড়েই একটা আশ্চর্যরকম অস্বস্তি আর ভয়ের আবহ টের পাওয়া যায়। একটু গভীরে ভাবতে গেলে এগুলো নার্ভের ওপর একরকম প্রেশার ক্রিয়েট করে। এনামুল রেজা'র লেখা এর আগে পড়েছি কি-না মনে করতে পারি না। চমৎকার লেখেন তিনি।
জয়নাল সব জানে - সিদ্দিক আহমেদ: জয়নাল পেশায় একজন পামিস্ট৷ হাতের রেখা দেখে মানুষের ভাগ্য গণনাই তার আয়ের একমাত্র উৎস৷ ইদানীংকালে তার ব্যবসার অবস্থা খুবই শোচনীয়। একদমই কোন ক্লায়েন্ট পাচ্ছে না সে। আর এই কারণেই নিজের অফিস আর বাড়ির ভাড়া দিতেও নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে তার। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও শান্তির দেখা পাচ্ছে না সে৷ এতো সব অশান্তির মাঝেও জয়নালের একমাত্র শান্তির জায়গা একটাই। জায়গাটা তার একমাত্র মেয়ে।
প্রিয় লেখক সিদ্দিক আহমেদের 'জয়নাল সব জানে' আমার খুবই ভালো লেগেছে। এই সঙ্কলনের সেরা গল্প আমার মতে এটাই। সিদ্দিক আহমেদের এই গল্পটা এতোটাই হৃদয়ছোঁয়া যে পড়ে শেষ করার পরেও ভালো লাগার একটা রেশ থেকে গেছে মনের ভেতরে৷ যেরকম হাই এক্সপেকটেশন নিয়ে গল্পটা পড়া শুরু করেছিলাম সেটা নিঃসন্দেহে পূরণ হয়েছে। গল্পটা বড়। কিন্তু শেষ করার পর মনে হলো এটা আরেকটু বড় হলেও মন্দ হতো না।
পবিত্র নরক - সাজ্জাদ সিয়াম: শিশির নিজেকে অতিমানব মনে করে। অবশ্য সেটা মনে করার পেছনে কারণও আছে। ২১ বছর বয়সী শিশিরের ধারণা, সে অমর। মৃত্যু তাকে স্পর্শ করতে পারবে না, এমনটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে সে। তার এই জীবনে অনেকবার মৃত্যু তার কাছ ঘেঁষে বের হয়ে গেছে, কিন্তু তাকে এক চুলের জন্যও স্পর্শ করেনি৷ এরকম ঘটনা বারবার ঘটলে অবশ্য যেকোন মানুষেরই নিজেকে স্পেশাল মনে করাটা স্বাভাবিক।
সাজ্জাদ সিয়ামের লেখায় যে ডার্ক সাইকোলজির একটা ভাইব থাকে, 'পবিত্র নরক' গল্পেও সেই ভাইবটা পুরোদমে ছিলো৷ গল্পটা কলেবরে ছোট হলেও এর বর্ণনা বেশ গ্রাফিক। পড়তে গিয়ে এক ধরণে গা শিউরানো ভয়ের অনুভূতি টের পেয়েছি। সাজ্জাদ সিয়াম হতাশ করেননি। ভালো লেগেছে গল্পটা।
শকুনচোখা - আদনান আহমেদ রিজন: বৃদ্ধ লোকটার সবই ভালো। সে দয়ালু। সে দায়িত্ববান। তার শুধু একটাই সমস্যা। তার চোখদুটো তীক্ষ্ণ। সেই চোখদুটোর দৃষ্টি একদম বুকে গিয়ে বিঁধে যায়। ঠিক যেন শকুনের চোখের মতো। এই তীক্ষ্ণ চোখের মানুষটার আচরণই রাত আসলে বদলে যায়। রীতিমতো ভয় পেতে থাকে সে। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে ওঠে। কি দেখে ভয় পায় সে?
বিদেশী গল্পের কাঠামো অবলম্বনে লেখা 'শকুনচোখা' আমার কাছে মোটামুটি ভালোই লেগেছে। একজন মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের জবানিতে বর্ণিত হয়েছে পুরো গল্পটা। গল্পের বর্ণনা বেশ কিছু জায়গায় কিছুটা অস্বস্তিকর। আর এর শেষটাকে তুলনা করা চলে পোয়েটিক জাস্টিসের সাথে।
এই গল্পগুলো ছাড়াও 'নিশুতি ৬'-এ ছিলো হাসান মাহবুবের 'হাওয়া', সুস্মিতা জাফরের 'ডেইজ অ্যাট দ্য বোটানিক্যাল গার্ডেন', ফারহানা ইয়াসমিনের 'প্রজেক্ট হরিণডাঙ্গা', নাজিম রেজার 'এরিকার নেকলেস', মাহমুদুল হাসানের 'পরাভবী', অপর্ণা মম্ময়ের 'নষ্ট মানুষ', আর অরণ্যানী অর্পিতার 'বঙ্গা'। এই গল্পগুলো মোটামুটি ভালো লেগেছে আমার। এই বইয়ে আরো ছিলো মনোয়ারুল ইসলামের 'বিষ শ্বাসে নিশ্বাস', সরলী শীলনের 'কিছু হয়নি তো', আখতার মাহমুদের 'পৃথিবীর সম্রাট', মোহাম্মদ হাসিন ইশরাকের 'দুই বাতায়ন' আর আবিদ আনজুম ত্রিদিবের 'সময়' গল্পগুলো। এই গল্পগুলো আমার ভালো লাগেনি।
এই হরর-থ্রিলার গল্প সঙ্কলনের অনেক গল্পেরই সম্পাদনা আশানুরূপ হয়নি। বেশ কিছু গল্পে বাক্য গঠন জনিত ভুল আর ভুল বানানের দেখা পেয়েছি। এই ব্যাপারগুলোর প্রতি আরো মনোযোগ প্রয়োজন ছিলো বলে মনে হয়েছে আমার। যথারীতি কোন সম্পাদকীয় ছিলো না বইয়ের শুরুতে। স্বয়ং প্রকাশক আর সম্পাদকও বোধহয় এটার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। আর এই কারণেই এটাকে নামসর্বস্ব সম্পাদনা বলে মনে হয়েছে আমার।
এখানে পুরোনোদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন নতুন লেখকের গল্পও আছে। তাদের মধ্যে অনেকেই চমৎকার লিখেছেন। নতুন লেখকদের লেখার মান সময়ের সাথে সাথে আরো উন্নত হবে, এমনটাই আশা করি। 'নিশুতি ৬'-এর প্রচ্ছদটা কেন যেন খুব বেশি টানতে পারলো না আমাকে। সম্ভবত আদনান আহমেদ রিজনের এর চেয়েও অনেক ভালো ভালো কাজ দেখে চোখ অভ্যস্ত হয়ে গেছে, এই কারণেই। বইয়ের প্রোডাকশন আর কাগজের মান নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।
চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'নিশুতি ৬'।
ব্যক্তিগত রেটিং: ৩.৫/৫
বই: নিশুতি ৬
সম্পাদনা: ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশক: আদী প্রকাশন
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
ঘরানা: হরর ও থ্রিলার গল্প সঙ্কলন
গল্প সংখ্যা: ২১
প্রচ্ছদ: আদনান আহমেদ রিজন
পৃষ্ঠা: ২৩২
মুদ্রিত মূল্য: ৪৫০ টাকা
ফরম্যাট: হার্ডকভার
(১৭ জানুয়ারি, ২০২৬, সন্ধ্যা ৭ টা ৩১ মিনিট; নাটোর)