একটা অদ্ভুত কাজের দায়িত্ব নিয়ে উত্তর সিকিমের এক দুর্গম পাহাড়ে ট্রেক করতে রওনা হয় উদিত। কিন্তু সেই ট্রেক থেকে ফিরে আসার পরেই তার জীবনে একের পর এক ঘটতে থাকে অদ্ভুত ঘটনা। কোন প্রাচীন রহস্য চাপা পড়ে আছে ইয়োসামের পরিত্যক্ত কুটিরে? কোন দুঃস্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায় উদিত আর ইভানার ছোট্ট, সাজানো সংসারকে? পাহাড়ের হাওয়া কি সত্যিই কিছু বলতে চায় পর্বতারোহীকে? সায়ক আমানের হরর উপন্যাস- হাওয়ার রাত।
শুরুটা বেশ ভালো, উত্তর সিকিমের রহস্যময় পাহাড়ি এলাকা, কনকনে ঠান্ডা অদ্ভুত ফিসফিসে হাওয়া, প্রেম, ট্রেকিং, দু:স্বপ্ন, আর অন্ধকার জগতের ভয়াল মিশেল। কিন্তু গল্প যতই আগালো জুলিয়া কিউবেকের মত আজাইরা ক্যারেক্টার কাহিনিটার দফারফা করে দিল। শেষমেশ মনে হল ধুর ছাই কিছুই হল না।
চমকে উঠেছিলাম, প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি! গত পাঁচ বছরের ট্র্যাক রেকর্ড অনুযায়ী যিনি থ্রিলার-হরর লেখা থেকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণাটুকুই যা বাকি রেখেছিলেন, খাস তাঁর হাত থেকে নাকি খাঁটি হরর উপন্যাস বেরিয়েছে এ বছর! নিজের কৈশোর-বয়ঃসন্ধি'র দিনগুলো'র কথা ভেবে নস্টালজিক লাগছিল। কন্সপিরেসি থিওরি, লাভক্রাফ্ট ইউনিভার্স, প্রাচীন সভ্যতা, দেশ-বিদেশের মাইথোলজি ও লোককথা, অজানা কল্পবিজ্ঞানের জগতের দ্বার ইনি একা দায়িত্ব নিয়ে খুলে দিয়েছিলেন একসময়ে আমার মত বহু নবীন শ্রোতা ও পাঠকদের কাছে। আর এখন তাকে নবপ্রজন্মের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে শুধুমাত্র লাভগুরুর পরিচয়ে পাওয়া যায় বললেই চলে। সে যাই হোক, এখন প্রশ্ন হল, এই পুনরাগমনকে কি 'রিটার্ন অফ দ্য কিং' বলা যায়?
প্রচ্ছদের পাশাপাশি বইয়ের বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ বেশ কৌতূহলের উদ্রেক জাগায়। উদিত, পেশায় একজন মাউন্টেইন গাইড, এক অদ্ভুত কাজের দায়িত্ব নিয়ে স্ত্রী ইভানা'র সঙ্গে ট্রেক করতে যায় উত্তর সিকিমের এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। সেখান থেকেই তাদের জীবনে শুরু হয় একের পর এক অলৌকিক ঘটনা'র ঘনঘটা। ইয়োকসামের পরিত্যক্ত কুটিরের কাছে পাহাড়ি হাওয়া নাকি অনেকটা মানুষের কণ্ঠস্বরের মত শোনায়। কী বলতে চায় তারা?
লেখকের ভূমিকা কিন্তু ষোলো আনা সত্যি। তিনি নিজমুখেই সেখানে স্বীকার করেছেন, এ ধরণের লেখা লিখতে তাঁর বিলকুল না-পসন্দ আজকাল, তবু রয়্যালটি'র চাপেই একরকম হেঁহেঁ...। আর প্রকাশকমশাই তাঁর কপালে বন্দুক আর হাতে কীবোর্ড ঠেকিয়ে নাকি এই লেখা শেষ করিয়েছেন। বইটা শেষ করবার পর অবশ্য এই দু'টো কথা নিয়ে সন্দেহপ্রকাশের কোনও অবকাশই থাকে না। গোটা উপন্যাস জুড়ে একটা চরম অযত্ন আর থেকে থেকে ভ্যানতাড়া গোছের একটা ন্যারেটিভ ভয়ঙ্করভাবে বিদ্যমান। এর ফলে ল্যাপটপ কখনও হয়ে যায় কম্পিউটার, সোফা কখনও হয়ে যায় বিছানা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দীপ প্রকাশনের পাহাড়প্রমাণ পরিমাণের ছাপার ভুল। বোঝাই যাচ্ছিল, কোনও প্রুফ রিডারের হাতে অন্তত এ পাণ্ডুলিপি ভুলক্রমেও পড়েনি। এ ছাড়া, উপন্যাসে রয়েছে তিন-চারখানা অপ্রয়োজনীয় লম্বা ড্রিম সিকোয়েন্স, যা না থাকলে ক্ষতি বই লাভ হত উপন্যাসের দৈর্ঘ্যের দিক থেকে। দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র উদিত ও ইভানা'র সঙ্গে শিহরণ জাগানো চরম ভৌতিক ও অলৌকিক কান্ডকারখানা ঘটছে। অথচ, অন্য এক চরিত্র'র কাছ থেকে সেসবের একটা সম্ভাব্য ব্যাখ্যাকে তারা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। কারণ, সেটা নাকি 'পাতি ভূতের গল্পের মত' শোনাচ্ছে!
ভ্যানতাড়া এবং একাধিক জাম্পস্কেয়ার সিনের পর উপন্যাসের মোটামুটি ৬০% জায়গা থেকে শুরু হয় আসল কাহিনী। কন্সপিরেসি থিওরি, প্রাচীন সভ্যতা ইত্যাদি আস্তে আস্তে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করে। ভাবতে শুরু করেছিলাম, এই তো, সেই চেনা পেঁয়াজের খোসা আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করেছে বুঝি, কিন্তু কা কস্য! টেনে-হিঁচড়ে সেই দু'কথা গিয়ে থামে পাঁচ পাতায়। বড়োগল্প লেখা'র মালমশলা পিটিয়ে পিটিয়ে উপন্যাস করার উপক্রমের জ্বালায় মাঝে বইটা একবার-দু'বার বন্ধ করতে হল। বর্তমান সময়ে গল্পের এক চরিত্রের মুখ থেকে নিজের শৈশবের অজানা ব্যাকস্টোরি শুনছে আরেক চরিত্র। অথচ, ঠিক তার পরের অধ্যায়ে সেই ঘটনাটাই আবার জোর করে রিয়েল টাইম সিকোয়েন্সে দেখানোর কি আদৌ কোনও দরকার থাকে?
যাই হোক, শেষের ৩০ পাতা মোটামুটি টানটান। অন্তিম পরিণতি ও ট্যুইস্ট অতি সহজেই অনুমেয়, যা সায়ক আমানের চিরাচরিত গল্পকথনের সঙ্গে দূর-দূরান্ত অবধি খাপ খায় না। সেইটুকু এস্টাব্লিশ করানোর জন্য বইয়ের যত্র-তত্র প্রেম ঢুকে বসে আছে। অধিকাংশ জায়গায় তা মাত্রাতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয়। থেকে থেকে অহেতুক জীবন এবং ভালোবাসা নিয়ে চরিত্রদের আলোচনা, জ্ঞান কপচানো, এগুলো গল্পের মূল ধারা থেকে ফোকাস সরিয়ে আনে। বরং, উপন্যাসে বর্ণিত জায়গাটায় মানুষ এরকম হ্যালুসিনেট কেন করে, তার কারণ এক-দু লাইনে না সেরে, সেটাকে সময় নিয়ে ব্যাখ্যা করা যেত। লেখক বরাবরই মাল্টি-ডিমেনশনাল জঁরের লেখা লিখে এসেছেন, কিন্তু এখানে অনুপাত এতটা কাঁচা দেখে বেশ কষ্টই হল। প্রেম আর হররের এই মিশেল জঁরটা এবার প্রচন্ড একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে লেখকের।
কী ভাবছেন, বইটা'র সবই কি খারাপ? না, তা নয়। কন্সপিরেসি থিওরিটাকে যেভাবে খাড়া করা হয়, তা মোটের উপর মন্দ নয়। কিছু কিছু জাম্পস্কেয়ার সিকোয়েন্স একেবারে মনে গেঁথে যাওয়ার মত। পাহাড় ও আবহাওয়া'র দুর্দান্ত বর্ণনা আপনাকে ইভানা ও উদিতের সঙ্গে নিয়ে যেতে বাধ্য করবে তুষারধবল উপত্যকায়। উপন্যাসে তথ্য আছে মোটামুটি, তবে ইনফো-ডাম্পিং বোধগম্য হয় না লেখনী'র মুন্সিয়ানায়। প্রেম ও ভালোবাসা'র সিকোয়েন্সগুলো'র কিছু যেমন অহেতুক, কিছু আবার তেমনই স্নিগ্ধকোমল। প্রথম ও শেষের দু-তিনটে অধ্যায় বেশ টানটান, কিন্তু উপন্যাসটা'র গতি মাঝে বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর শ্লথ হয়েছে আগেই উল্লিখিত নানান কারণে। আর একেবারে শেষে? একগাদা তাড়াহুড়ো।
বইতে অলঙ্করণের অভাব বিদ্যমান। কিছু কিছু ঘটনাবলী এবং দৃশ্য প্রচন্ড দাবী করছিল অলঙ্করণের, এ ক্ষেত্রেও হতাশ হলাম।
বইটা শেষ করা'র পর, 'কী হইতে গিয়ে কী হইয়া গেল' ধরণের একটা অনুভূতি কাজ করছিল। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, পড়ে চরম হতাশ হলেও কোনও এক অজানা কারণে প্রায় এক সিটিংয়েই শেষ হয়েছে বইটা! শেষে এটাই বলবো, রিভিউ-টিভিউ বেশি আমল না দিয়ে নিজেই বইটা নেড়েচেড়ে দেখুন গে। কারণ, রিভিউ সাবজেক্টিভ, আর এ ক্ষেত্রে এটা আমার কিশোরবেলা'র প্রিয় লেখকের বেঞ্চমার্ক মাথায় রেখে শেষমেশ বুক ঠেলে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাসের দলিলমাত্র।
'মিডনাইট হরর স্টেশন' -এ একের পর এক গল্প পাঠ শুনে অভিভূত হওয়া। সেই শুরু, এরপর একের পর এক মানুষটার লেখা পড়ে মুগ্ধ হওয়া। এ রেশ কাটার নয়। এত কথা বলার একটাই কারণ, আজ মানুষটার জন্মদিন। ছাপোষা, আধুনিক বাঙালির জীবনে রোম্যান্স, টানটান থ্রিল আর হরর মিশিয়ে দেওয়া এক ম্যাজিশিয়ানের লেখা সদ্য শেষ করা এ বইয়ের মায়া কাটানো অসম্ভব। বইয়ের প্রচ্ছদ, নাম, পটভূমি সবই ভীষণ নিপুণ রূপে সাজানো। বলাই বাহুল্য, আমার মতো পাহাড় প্রেমী মানুষদের 'হাওয়ার রাত' ভালো লাগতে বাধ্য। পাহাড়ের সাথে হরর মিশিয়ে আর অল্প স্বাদমতো রোম্যান্স দিয়ে পরিপাটি করে বইটি বানিয়েছেন এই ভদ্রলোক।
এ গল্প এক প্রফেশনাল ট্রেক গাইড উদিত ও তার মিষ্টি একটা টিচার বউ ইভানা কে নিয়ে। তাদের কাছে হঠাৎই একদিন এক ট্রেক অফার এসে হাজির হয় অতীতের এক প্রফেশনাল মাউন্টেনিয়ার বিনোদ ঘোষালের থেকে। স্পন্সরও তিনিই করবেন, শুধু ট্রেক করে পৌঁছে 'হাওয়ার শব্দ' রেকর্ড করে ফিরে আসা, এই ছিল চুক্তি। কিন্তু, সবটাই কী এতটাই সহজ! কী শব্দ বয়ে নিয়ে আসে বাখিম হাটের হাওয়া, কোন রহস্য লুকিয়ে আপন করে নিয়েছে পাহাড়! আর এ সমস্ত কিছুর সাথে উদিত-ইভানার পথ মেশে কী করে! এমন সমস্ত প্রশ্ন এসে জড়িয়ে ধরবে আপনাকে। আর টানটান উত্তেজনায় আপনিও না শেষ করে উঠতে পারবেন না এ বই।
আছে মিস্ট্রি, আছে পুরনো সভ্যতা, হাওয়ায় ভাসা কিছু কন্সপিরেসি থিওরি। এই থিওরি অনুযায়ী হোমোসেপিয়েন্সের পৃথিবীতে আসার আগেই মানুষের পূর্ব পুরুষরা এখানে থাকত। আর, তারা প্রকৃতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। তারাই নাকি এ পাহাড়ের আদিম দেবতা।
কিছু গল্প থাকে যেটা শুনতে ভালো লাগবে পড়ার থেকে, এইটা সেই ধরনের গল্প। শুরুটা খুবই engaging । কিন্ত শেষ অবধি দাবি টা কি ছিল সেইটা বেকার চলে যায় যদি conspiracy theory কে প্রাধান্য দিলে । বইটায় jumpscare আছে ভরে ভরে । সেই একই রকম ভাবে plothole ও আছে । এইটা সত্যি হলে, ওইটা কি করে হলো ? ওইটা সত্যি হলে , এইটা হল কি করে ? এইসব প্রশ্ন মাথায় আসল আপনি একটাই উত্তর পাবেন "ম্যাজিক/অলৌকিক ক্ষমতা" যা নাকি main lead এর মধ্যেও আছে । তারপর শুরু ভালোবাসা নিয়ে জ্ঞান । এক দুবার মানা যায় কিন্তু এক একটা সিন ছাড়া ছাড়াই বড় বড় কথা , এইসব জোর করে একটা quote তৈরী করার মত ।
যাই হোক । অডিওবুক শুনলে অনেকেরই এই বইটা ভালো লাগবে । বিশেষ করে যদি এই ধরনের বই পড়ায় নতুন পাঠক হন । আমি পার্সোনালি এই বইটার স্যাথে kafka on the shore এর কিছু মিল পেয়েছি। গল্প সম্পূর্ণ আলাদা হলেও একটা অদ্ভুত এবং মারাত্মক মিল রয়েছে দুটো গল্পের মধ্যে যেটা আমি স্পট করেও ঠিক করতে পারছি না । Overall, এই লেখক এর অন্য লেখা পড়ায় আগ্রহী রইলাম ।
শুরুটা খুবই ইন্টাস্টারিং ছিল কিন্তু শেষে গিয়ে তেমন আর ভালো লাগে নি। শেষে লেখক একটা টুইস্ট দেয়ার চেষ্টা করসেন কিন্তু সেটা আরেকটু চমক নিয়ে বলা যেতো। কাহিনীর মধ্যে অনেক গ্যাপ রয়ে গেছে বলে মনে হইসে। অল্প সময়ে পড়ে ফেলার মতো সহজ ভাষায় লেখা একটা বই।
অন্যরকম তবে শেষটা ভালো লাগে নি যতটা এক্সপেক্ট করেছিলাম, কাল্পনিকতা আলাদা ব্যাপার আর জাস্ট এমনি মনে হলে শেষ করে দেলাম আলাদা ব্যাপার, মনে হল জাস্ট ভালো লাগলো না তাই বই শেষ এরকম গোছের লেখা।