প্রফেসর চিন্তাহরণ মুখার্জি কোনও প্রথাগত গোয়েন্দা নন। তিনি আসলে একজন সেলস অ্যান্ড মার্কেটিংয়ের প্রফেসর। সি আই ডি'র এডিজি, যিনি ওঁর ভাগ্নেও বটে, তাঁর অনুরোধে আরক্ষা বাহিনীকে কিছু জটিল কেসে সামান্য সাহায্য করে থাকেন, এই মাত্র। আর এই সব কর্মকাণ্ডে তাঁর সহকর্মী হল নবীন পুলিশ অফিসার মনুজেন্দ্র বর্মণ। প্রফেসর সাহেবের ভাষায় ব্রাইট ইয়ং চ্যাপ।
প্রফেসর মুখার্জি বন্দুক চালাতে পারেন না, অপরাধীদের পেছনে ধাওয়া করতে পারেন না, সিগারেটের ছাই বা জুতোর ছাপ দেখে কারো ইতিহাস ভূগোল গড়গড় করে বলে দিতে পারেন না। তিনি শুধু একটি জিনিসই পারেন। বিভিন্ন সূত্র, তথ্য, বক্তব্য ইত্যাদি বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে। তাঁর পড়াশোনা অগাধ, মস্তিষ্কটি ক্ষুরধার, যুক্তিজাল অভ্রান্ত। তবে এই খাদ্যরসিক এবং সুরাপ্রেমী মানুষটির সবচেয়ে বড় গুণ তাঁর রসবোধ।
এ হেন তীক্ষ্ণবুদ্ধি এবং রসিক প্রফেসর সাহেবের পাঁচটি রুদ্ধশ্বাস রহস্য উপন্যাস এবার পাঠকের হাতে।
অভীক সরকারের জন্ম পয়লা জুন, উনিশশো উনআশি সালে। বেড়ে ওঠা প্রাচীন শহর হাওড়ার অলিগলিতে। বাবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন, মা স্কুল শিক্ষিকা। রয়েছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। পেশায় সেলসম্যান, কর্মসূত্রে ঘুরেছেন পূর্ব-ভারতের প্রায় সব শহর ও গ্রাম। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বাসা বেঁধেছেন হায়দ্রাবাদ, পাটনা, মুম্বাই ইত্যাদি বিভিন্ন শহরে। শখের বই ব্যবসায়ী ও প্রকাশক। লেখালেখির শুরু আন্তর্জালে ও বিভিন্ন ব্লগে। প্রকাশিত বইগুলো হল মার্কেট ভিজিট, তিতিরপাখি ও প্রিন্সেস (সহলেখক অনুষ্টুপ শেঠ), এবং ইনকুইজিশন, খোঁড়া ভৈরবীর মাঠ, চক্রসম্বরের পুঁথি, ইত্যাদি। বিবাহিত। কন্যা সন্তানের পিতা। ভালোবাসেন ইলিশ, ইস্টবেঙ্গল, ইয়ারবন্ধু এবং ইতিহাস।
অনেকদিন পর রহস্যলেখা পড়লাম আর তার সাথে লেখকের সৃষ্টির সাথে পরিচয় ঘটল প্রথমবার । লেখকের লেখা পড়ে বেশ উপভোগ করেছি আর এই বইতে রয়েছে পাঁচটি রহস্য উন্মোচন গল্প। প্রত্যেকটি তদন্তে যে মানুষটি কমন তিনি হলেন পেশায় প্রফেসর চিন্তাহরণ মুখার্জি ,সেলস ও মার্কেটিংয়ের প্রফেসর। তার দূরসম্পর্কের ভাগনে মনোজ চাকলাদার হলেন এডিজি অফ সি আই ডি । সেইসব সূত্রে তিনি তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্কের মাধ্যমে অনেক কেস সলভ করে থাকেন আর এই কাজে সর্বক্ষণের সঙ্গি নবীন পুলিশ অফিসার মনুজেন্দ্র বর্মণ। পাঠ প্রতিক্রিয়া :- প্রত্যেকটা গল্পের শেষের অংশটুকু সার্থক। প্রফেসরের মুখ থেকে কেসের গল্প শোনা । দোষীদের সামনে বসিয়ে বিস্তারিত বিবরণ , তিনি কি কি ভাবে চিহ্নিত করতে পারলেন বেশ ভালো লেগেছে। কোথাও কোথাও মনে হয়েছে আর একটু রহস্যের বুনট ভালো হতে পারতো । আবার কোথাও অযথা টেনে বড়ো করা হয়েছে । আমি অনেকদিন পর এই ধরনের বই পড়লাম , মোটের উপর ভালো লেগেছে। এবার আসি পাঁচটি গল্পের পাঠ প্রতিক্রিয়া :- (কমেন্টে) • ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় - একটা গানের লাইন একটা কেসকে ঘুরিয়ে দিতে পারে । চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের মালিক অয়ন রায়চৌধুরীর সঙ্গে ব্যাঙ্ক জালিয়াতি হয়। প্রফেসর মুখার্জি এক এক করে সমস্ত স্টাফদের জেলা করেন। সেক্রেটারী পলাশ রাহাকে সন্দেহ করাতে তার এবং পরিবারের ব্যাপারে জানতে পারেন। উঠে আসে অনেক তথ্য , কেসটি সলভ হয়। • নরেন মিত্তিরের পারফিউম - নরেন মিত্তির একজন বিখ্যাত সুগন্ধি প্রস্তুতকারক । তিনি ফ্রান্সের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে এসে এই পেশায় যুক্ত হন। বিপিন হালদারের মাধ্যমে তিনি সমস্ত পারফিউম বিক্রি করতেন । হঠাৎ করে বিপিন হালদার ও নরেন মিত্তির দুজনেই খুন হয়ে যায়। অদ্ভুতভাবে শরীরে বিষ প্রয়োগে খুন করা হয় । প্রফেসরের হাত ধরে আসল খুনির সন্ধান পাওয়া যায় এবং খুনির পরিচয় অবাক করতে বাধ্য। • আত্মহত্যার অন্দরমহল - আমার সবথেকে ভালো লেগেছে এই গল্পটি। দেশের অন্যতম প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানী রমেশ সরভানন । দেশে ফেরার পর তার সিকিউরিটির দায়িত্বে পরেন প্রফেসর মুখার্জি। রমেশ সরভাননের খুনকে ঘিরেই এই তদন্ত। দেশে তাদের বাড়ির দেখাশোনা করত শঙ্কর কাকা। রমেশ বাবুর ভাই সুরেশ অস্ট্রেলিয়াতে ব্যবসা করতেন এবং রামিয়াকে বিয়ে করেন। দেশে ফিরে এসে সুরেশ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায় । তারপর রামিয়ার সাথে অবৈধ সম্পর্ক , শঙ্কর কাকার ছেলের সম্পর্কে উঠে আসে একের পর এক তথ্য। রহস্যের দুনিয়ায় জিইয়ে রেখেছিল এই গল্প। • অপহরণের আড়ালে - বাগবাজারের মুখার্জি বনেদী পরিবারের ছেলে ব্রতীন্দ্রনারায়ণের অপহরণ ঘিরে এই তদন্ত। তার দাদু জগদিন্দ্রনারায়ণ ছিলেন কালেক্টর, তার উৎসাহ ছিল ফিলোটেলি এবং স্ট্যাম্প কালেকশনে। তিনি তার সারা জীবনের পড়াশোনা নিয়ে একটি বই লেখেন তার নাম 'কাল অফ দ্য সিনধ্' । এবং তিনি অমূল্য সিনধ্ ডাক জোগাড় করে ছোট্ট প্লাস্টিকের মধ্যে মুড়ে বইটির মাথায় রাখেন । ব্রতীন সেই অমূল্য জিনিস খুঁজে পায় এবং সেটি বিক্রি করার ফন্দি আঁটে। এই কাজে তাকে সাহায্য করে তার একমাত্র বন্ধু ভেরোনিকা। ব্রতীনের মা বাবা তাকে বিদেশে পাঠাবে না কিন্তু ব্রতীন চায় ভেরোনিকার সাথে বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করতে। সেই জন্য সেটি বিক্রি করতে চায় এবং অপহরণের গল্প ফাঁদে । শেষ পর্যন্ত প্রফেসর সেইসবের হদিশ খুঁজে বের করেন। • বরেন মজুমদারের হত্যা রহস্য - এটা পড়ে আমার মনে হয়েছে একটু অযথা টেনে বড়ো করা হয়েছে । ওনার বাড়িতে রাখা এক আঁকা ঘিরে শুরু হয় ,যার দাম বারোশো কোটি টাকা । বরেনবাবুকে টুথপেস্টের সাথে বিষ মিশিয়ে খুন করানো হয়। প্রফেসরের দূরন্ত বুদ্ধিবলে জট খুলে আসে এক এক করে এবং আসল খুনিদের পরিচয় জানা যায় ।