গণঅভ্যুত্থান ঘটে আছে। সবাই ফিরে যাচ্ছে যে যার কাজে। এই গল্পের প্রধান চরিত্র এখনও আটকে আছে জুলাইতে। গণহত্যার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ছুটে যাচ্ছেন নানা জায়গায়, কখনও বা ১৯৭১ এ! লাশবাহী রিকশা অথবা ট্রেন, কম দামে মিলছে তাজা রক্ত। টুকরো টুকরো কাল্পনিক সাক্ষাতকার, একাত্তর-চব্বিশ, অথবা তথৈবচ। যেসব গল্প হয়ত কেউ কখনই লিখবে না।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ—অতি সত্য চেতনার পক্ষে ক্ষতিকারক না।
Hasan Enam, a university student, first started writing in a magazine. But gradually his writing changed and he turned his attention to publishing his own books. 'Dhakay Fagun', a dense fiction about the history of Dhaka, makes Hasan Enam a new acquaintance among the readers. However, he came out of these people the next year and wrote the novel 'Jaltaranga'.
The tendency to introspect is evident in his writings. Hasan Enam will throw himself into more debauchery in upcoming projects.
জুলাই আসলে কী? জুলাই একটি মহাকাব্য। জুলাই একটি দীর্ঘ কবিতা, একটি অনন্ত উপন্যাস।
“তথৈবচ” বইটির কোনো এক অধ্যায়ের শুরুটা এমন। জুলাই এমন এক গল্প, যেখানে বদলে গেছে সবকিছু। মানুষ তার অসীম সাহসে ভর করে দাঁড়িয়ে পড়েছিল কিছু হায়েনার সামনে। একটি দেশের ভবিষ্যত বদলে গিয়েছিল সেই সময়টাতে। মানুষের হাহাকার, চিৎকার, রক্তের ছড়িয়ে যাওয়ার এই গল্প কি ভুলে থাকা যায়?
হাসান ইনামের নাম আপনারা যারা জানেন, যারা তাকে চিনেন — আপনারা জানেন জুলাইয়ের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও, তিনি এখনো জুলাই থেকে বের হতে পারেননি। শাসকশ্রেণীর নিষ্ঠুরতার যে গল্প জুলাই লিখেছিল, সেই গল্পের মূল কুশীলব তিনি। টুকরো টুকরো গল্প জোড়া দেওয়ার চেষ্টা তিনি করছেন। যেন সময়ের সাথে এসব গল্প ফিকে না হয়ে যায়!
“তথৈবচ” উপন্যাসিকার প্রধান যে চরিত্র, তাকে আমার হাসান ইনামেরই কার্বন কপি মনে হয়েছে। সে-ও জুলাই ধরে রাখতে চায়। একটি বিদেশী সংস্থা জুলাই বিপ্লবের উপর কাজ করতে চায়। সে-ই ধারাবাহিকতায় মেসবাহ আমান কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। শহীদের পরিবার বা আহত কিংবা ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার নিয়ে যাচ্ছে।
কী বীভৎস সে সময় ছিল! কত রক্ত ছড়িয়ে পড়েছিল এই পথে, কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল! এগুলো সহ্য করা যায় না। যারা এ নিয়ে কাজ করে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া অস্বাভাবিক না। হয়তো এ কারণে জেগে হোক কিংবা ঘুমিয়ে, দুঃস্বপ্ন আসে। যা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। উপায় থাকে না।
মেসবাহ ছুটে চলে সময়ের খাতায়। কখনও চব্বিশে থাকে, কখনও ফিরে যায় একাত্তরে। একাত্তর না এলে চব্বিশও আসত না। চব্বিশের বিজয় দিয়ে একাত্তর অস্বীকার করা যায় না। স্বৈরশাসক সবসময় একই রূপে আবির্ভূত হয়। নির্মম, নিকৃষ্ট। ভয়াবহ নারকীয় সব ঘটনা ঘটিয়ে ফেলা যায়। একাত্তরে চুকনগর বা সৈয়দপুর দেখেছিল বিভীষিকার অন্যতম নিদর্শন।
চব্বিশে এসে হয়তোবা উত্তরা কিংবা যাত্রাবাড়ী। তবে চব্বিশ যতই ভয়ংকর হয়ে সামনে আসুক না কেন, একাত্তরের কাছে সবই অম্লান।
লেখক যেহেতু এখনো এই বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, সম্ভবত তিনি তার অভিজ্ঞতাগুলোই লিপিবদ্ধ করেছেন। মানুষ মাত্রই সুবিধাবাদী। সে কারণে এই চব্বিশ নিয়েও ছলচাতুরি করার সুযোগ পেলে অনেকেই ছাড়ে না। কেউ কেউ লাভবান হওয়ার চেষ্টা করে। জীবনের চেয়ে নিজের লাভটাই তাদের কাছে মুখ্য।
আবার কিছু মানুষ থাকে নির্ভেজাল। তারা শুধু নিজের কাজটাই বুঝে। কখনো কোনো প্রতিদানের আশা না করে যতটুকু কাজ করা দরকার, মানুষকে সাহায্য করা দরকার — করে যায়। তারাই সম্ভবত এত ভয়ংকর অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়, মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে ওঠে। দুঃস্বপ্ন দেখে। সময়ে অসময়ে তাদের কাউন্সিলের প্রয়োজন হয়।
ছোট্ট এই উপন্যাসিকা নিয়ে বেশি কিছু বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে। স্বল্প পরিসরে লেখক সেই সময়ের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ভুক্তভুগী মানুষদের যেমন দেখিয়েছেন, তাদের হাহাকারের গল্প বলেছেন; তেমনি দেখিয়েছেন এই সুযোগ থেকে কারা লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছে। তাছাড়া মানুষের ভাবনা-চিন্তা; তরুণ ও বার্ধক্যের ভাবনাচিন্তাগুলোও এখানে গুরুত্ব পেয়েছে কল্পনায়।
লেখক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও কথা বলেছেন। যাদের আসলে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম; আবার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লাম — এমন করেই রাজপথে এসেছিল ওরা। বিজয় শেষে ফিরে গিয়েছে নিজেদের জায়গায়। কোনো ক্ষমতার লোভ নেই, মারামারি নেই, রেষারেষি নেই। কত প্রিয় বন্ধুকে হারানোর গল্প আছে এতে। হয়তো মিনিট দুয়েক আগেও কথা হয়েছে। কিন্তু তারপর?
শেষটা এমন হবে আশা করেছিলাম। ধারণার সাথে মিলে গেছে। তবে ছোট্ট এই বইটি ভালো লেগেছে জুলাই ধরে রাখার চেষ্টার কারণে। বিশাল পরিসরে লেখা যেত হয়তোবা। তবে ছোট্ট এই বইটিতে চব্বিশ আর একাত্তরের যে ব্লেন্ডিং করা হয়েছে, এটাও ভালো লাগার কারণ। লেখকের কাছে আমার একটা দাবি আছে। এমন প্লটে বড় একটা উপন্যাস আমরা আশা করতেই পারি। ছোট্ট ঘটনায় মন ভরে না। হুট করে শেষ হয়ে যায় যেন। তবে ভালো লেগেছে অবশ্যই বলা যায়।
আমি কখনও কোনো বইয়ের উৎসর্গ নিয়ে কথা বলি না। এটা নিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে। বইটির উৎসর্গপত্র মোট সাত পৃষ্ঠার। তিনি জুলাইয়ের সকল শহীদদের বইটি উৎসর্গ করেছেন। হয়তো এক বাক্যেই লেখা যেত। কিন্তু লেখক তা না করে প্রতিটি শহীদের নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের আত্মত্যাগের ঘটনা হয়তো অনেক জায়গাতেই সমাদৃত হবে না, কিন্তু এই বইয়ের উৎসর্গপত্রে ঠিকই থেকে যাবে।
প্রচ্ছদ সাদামাটা, কিন্তু বেশ পছন্দ হয়েছে। কিছু ছাপার ভুল, বানান ভুল ছিল। সেটআপের পর শব্দ ভেঙে গিয়েছিল দুয়েক জায়গায়। ছোট্ট বইয়ে এগুলো না থাকলেই বোধহয় ভালো।
পরিশেষে, এই চেনা পরিবেশে অচেনা অবয়বের মতোই ঘাপটি মেরে থাকে পতিতদের দোসর। তারা সুযোগ খুঁজে। একবার যদি সে সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলেই বিষধর সাপের মতো ছোবল মারবে। সেই ছোবলে কার আকাশে মেঘ জমবে, কে জানে?
বুকের ভিতর দুমড়ে মুচড়ে ফেলা বই! এই বই অবশ্যই সবার ঘড়ে থাকা উচিত। একাত্তরের গোলাহাট থেকে চব্বিশের হত্যাকাণ্ড কি নেই এই বইতে। পড়তে পড়তে শরীরের লোমহর্ষক অনুভূতি গুলো কম্পন তৈরি করবে। "ছাত্রদের জন্য ফ্রি পান্নু মামার এক কাপ চা খাও, চাংগা হয়ে দেশ গড়তে লেগে যাও। " দেশের নানা প্রান্তে থাকা এই পান্নু মামারা একাত্তরকে যেভাবে ধারণ করেছে,সেভাবে ধারণ করেছে চব্বিশকেও।
"না আছে ক্ষমতার লোভ, না আছে চেতনার ডুগডুগি "
এখনো অনেক মানুষ আছে, যারা বলে চব্বিশে কি আর হয়েছে যাদের দেখলে বমি আসে। যারা একাত্তর মানে বোঝে একটি পরিবার ও তাদের কিবলা টুংগিপাড়া।
বই - তথৈবচ লেখক - হাসান ইনাম বাতিঘর প্রকাশনী মুদ্রিত মূল্য ২০০ টাকা রেটিং ৫/৫ বানান ভুল গুলা নেগলেক্ট করে পড়তে হবে যা খারাপ দিক বইয়ের, তবে আমার কাছে কন্টেন্ট ই প্রধান।
"জুলাই" গতবছর সবচেয়ে দীর্ঘতম মাস ছিল জুলাই। এরপর একসময় জুলাই শেষ হল সফলতার সাথে। এল আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর.. এভাবে বছরটাও শেষ হল। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে শেষ হলেও কিছু মানুষের মস্তিস্কে আজো জুলাই জীবিত। জুলাই কোন মাস নয় বরং এক জীবিত সত্তা, যে নিঃশ্বস নেয় বিশাল এক দানবের মতন।
জুলাই আমাদের মুক্ত করে দিয়ে গেছে দীর্ঘ এক স্বৈরাশাসকের শাসনের ছোবল থেকে। জুলাই শুধুযে দিয়েছে তা কিন্তু না বরং সফলতা দিতে গিয়ে সে কেড়ে নিয়েছে প্রচুর সংখ্যক তাজা প্রাণ। জুলাইকে শত চাইলেও ভুলে যাওয়া সম্ভব না কোনদিন ও।
"জুলাই আসলে কী? জুলাই একটা মহাকাব্য। জুলাই একটি দীর্ঘ কবিতা, একটি অনন্ত উপন্যাস।" - অধ্যায় ৪
হাসান ইনাম ভাইয়া, জুলাইয়ের একজন একটিভ যোদ্ধা ছিলেন। তার চোখের সামনে দিয়ে অনেক অনাচার, জুলুম হতে সে দেখেছে সমগ্র মাসজুড়ে, আশরাফুল মাখলুকাতকে জানোয়ারে রূপান্তর হতে দেখেছেন। এত কিছু চোখের সামনে দেখে দেখে মানসিক ট্রমাতে চলে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। ভাইয়াও, জুলাই পেরিয়ে গেলেও...তিনি বের হতে পারেন নাই জুলাইয়ের হাতকড়া থেকে। সেই জুলাই আর জুলাইয়ের পরবর্তী সময়ের দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে নিয়ে তিনি লিখেছেন ছোট্ট এই বইটি, নাম "তথৈবচ"।
সঠিক ইতিহাস ধরে রাখা আর সেই ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া সহজ বিষয় না৷ সুবিধাভোগীরা ইতিহাসকে বিকৃত করে, ব্যক্তির স্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্য যে ইতিহাসের রচনা করে তা থেকে ভবিষ্যতের প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাসের ৫% ও জানতে পারে না। আমার জন্মের পর থেকে এই ইউনিভার্সিটি লাইফ অব্দি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কম পড়ালেখা করা লাগে নাই। প্রতি বছরই মুক্তিযুদ্ধ রিলেটেড টপিক ছিল কিন্তু সেই সকল টপিকে শুধুমাত্র একটা মানুষের গুণগান ব্যাতিত আমি আর কিছুই জানতে পারি নাই। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে, অনেক অনেক বই সফট কপি হিসাবে অনলাইনে খুঁজে পেতে থাকি, যা স্বৈরাশাসক বছরের পর বছর ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে রেখেছিল। কিন্তু অবশেষে যখন বই গুলা পড়ার সুযোগ হয় আমার তখন এতত পরিমাণে রাগ হচ্ছিল নিজের পর..আমি এত এত বছর যা যা পড়েছি, বিশ্বাস করে এসেছি তার প্রায় অর্ধেকের বেশি টাই ছিল বানোয়াট, অতিরঞ্জিত উপস্থাপন। এই আন্দোলন না আসলে হয়ত কোনদিন ও আমার জানা হইত না এগুলা। ইতিহাস এভাবে বিকৃত করার ফলে গোটা এক জেনারেশনকে ব্রেন ওয়াশের পর চলতে হচ্ছিল যার মুখোশ উন্মোচন হল ২৪ এর ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে। ইতিহাস যেন কোন ভাবে বিকৃত না হয়, এর দ্বায়ভার থাকে লেখক গোষ্ঠীদেরপর। যুগ যুগ তাদের লেখাই টিকে থাকে। হাসান ইনাম ভাইয়া এই স্থানেই তার দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছেন। জুলাইয়ের আন্দোলনও একসময় বিকৃত করা হবে। (অলরেডি করা হচ্ছে, জুলাই আন্দোলনের ক্রেডিট নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে, একদল মব নিয়ে আরেক দল লন্ডন কেন্দ্রিক হয়ে আন্দোলনের ক্রেডিট নিজেদের দিকে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে) এই বিকৃত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে লেখক ছোট্ট পরিসরে জুলাইকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছন তার ১১২ পৃষ্ঠার বইটার মাঝে।
গল্পের প্রধান চরিত্র "মেসবাহ আমান"। সে জুলাই পরবর্তী সময়ে বসে বিদেশি এক সংস্থার হয়ে জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী, আহত-নিহতদের স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে দেখা করে তাদের ইন্টারভিউ নিচ্ছেন, জানার চেষ্টা করছেন জুলাই আন্দোলনটা লোকভেদে, মস্তিষ্কভেদে কেমন প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু এই কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। বরং অতিমাত্রায় ডিস্টার্বিং সব তথ্য সংগ্রহ করতে করতে সে নিজেও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মানসিক ট্রমা বা ডিপ্রেশনের স্বীকার হয়ে হ্যালোসিনেশন, PTSD তে ভোগা শুরু করে। কিন্তু থেমে যায় নাই তার প্রচেষ্টা।
প্রত্যেক আন্দোলন/যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এক সুবিধাভোগী শ্রেণির জন্ম হয়। এরা আন্দোলনকে পূজী করে শুরু করে নিজেদের রোজগার। আন্দলোনে আহত, নিহত যোদ্ধাদের সাহায্য না করে সেই সরকারি অনুদান কিভাবে নিজেরা বানচাল করার পরিকল্পনা করে তার সূক্ষ্ম এক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক। যদিও গল্পটা ফিকশন কিন্তু এর বাস্তবতা বর্তমানে (অক্টোবর ২৫) বসে আমরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি।
আমার তথৈবচের সবচেয়ে ভাললাগার জায়গাটা হচ্ছে, লেখক যেভাবে ১৯৭১ এর পাক-হানাদার বাহিনী, বিহারী, রাজাকারদের পৈশাচিক সব কাজের সাথে ২০২৪ এর স্বৈরাচারের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ আর হেলমেট বাহিনীর যে নিপীড়নের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। উনি ইতিহাস থেকে তুলে এনেছেন "গোলহাটের গণহ*ত্যা", "চুকনগর জেনোসাইড" এর মতন ঘটনা যা...অনেকের কাছেই আজো অজানা। কারণ ইতিহাস তো শুধু একজনকে নিয়েই সমগ্র যুদ্ধ শুরু থেকে শেষ ঘটিয়েছে, শুধু তার অংশটাই পাঠ্যবইয়ে জায়গা পেয়েছিল, বাকি সব অগুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থেকে গেছে এতত গুলা বছর, আফসোস!
অধ্যায় ৪ এর শেষাংশে, লেখক এক চা বিক্রেতা মামার সাথে আলাপ করছিলেন, আলাপের শেষ প্রান্তে যখন সে চায়ের বিল দিতে যায় তখন চা আলা মামা নিতে অস্বীকার করেন এবং একটি সাইনবোর্ডের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখান যেখানে লেখা - "ছাত্রদের জন্য ফ্রি, পান্নু মামার এক কাপ চা খাও, চাঙ্গা হয়ে দেশ গড়তে লেগে যাও"। এই লাইনটা পড়তে গিয়ে আমার নিজের সাথে ঘটে যাওয়া একটা অভিজ্ঞতা মনে পড়ে যায় যা আমি সেয়ার না করে পারছি না। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে অনেক অনেক দোকানদার মামারা যে যেভাবে পেরেছে নিজের জায়গা থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের সাহায্য করে গেছেন। খাওয়ার পানি, সেলাইন, বিস্কুট.. যার পক্ষে যা সম্ভব সে সেভাবে সাহায্য করে গেছে। আমাদের খুলনাতে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিভবাড়ি মোড়। আন্দোলন চলাকালীন কোন এক দিন তীব্র গরমে সকাল থেকে দুপুর দেড়টা অব্দি আমি আর আমার এক ফ্রেন্ড আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। এরপর ক্লান্ত হয়ে গিয়ে, বাসায় গিয়ে খাওয়াদাওয়া করে আবার ব্যাক আসার প্লান নিয়ে হাঁটা শুরু করি, হাঁটতে হাঁটতে সোনাডাঙা বাস স্ট্যান্ড মোড় অব্দি এসে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। পাশে এক মিস্টির দোকান, আমরা দুজন সেখানে যাই, ফ্যানের নিচে একটু বসি। পানি খাই। খুদাও লেগেছিল খুব, ও দুইটা ছোট দই অর্ডার করে। আমরা খেতে খেতে আলোচনা করছিলাম বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তখন দোকানদার মামা এগিয়ে এসে জিগ্যেস করেন, আন্দোলনের কি অবস্থা। বয়স্ক একজন লোক, চোখে চশমা। আমরা টুকটাক সেয়ার করি। উনি আমাদের মনোবল দেন যে, কোনোভবেই যেন পিছে হাঁটা না হয়, যে উদ্দেশ্যে সবাই এগিয়ে গেছে, উদ্দেশ্য হাসিল না করা অব্দি এর কোন শেষ যেন না হয়। মামার চোখে মুখে জ্বলন্ত আগুনের শিখা ছিল। আমাকে বাসা দিয়ে একটানা কল করছিল আম্মু, (মিথ্যা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম), তো তারাহুরো করে উঠে পড়ি, এরপর পেমেন্ট করতে গেলে, উনি টাকা নিয়ে দশ টাকা ফেরত দেন। আমি তখন জিগ্যেস করি, মামা কি হল, আমি তো ঠিকঠাক ই দিয়েছি, তখন উনি বললেন, "দেখো বাবা, বয়স হইছে আর আমাদের ও হাত বাঁধা, চাইলেই আমরা সবকিছুতে অংশ নিতে পারি না কিন্তু খুব করে মন চায়.. যাইহোক, তুমি এটা রাখো।" তার চোখে ছিল বিনীত অনুনয়, আমি একবার ভাবলাম নিব না কিন্তু পরাক্ষণে নিয়ে নিলাম। ওনাকে ধন্যবাদ দিলাম এবং আমাদের জন্য দোয়া করতে বললাম। এখন হয়ত ভাবতে পারেন মাত্র ১০ টাকা নিয়ে আমি কেন এত উৎফুল্ল? আমার কাছে এই দশ টাকা ছিল অনেক। মামা তার দিক থেকে হয়ত সব স্টুডেন্টদের থেকে কিছু কিছু কম রাখছিলেন, নিজের লাভের অংশটুকু। ওনার স্থান হতে যাই করেছেন উনি, কিছু ক্লান্ত আন্দোলন কারীদের থেকে কম টাকা নিয়েছেন খাবারের বিনিময়ে, এটাই তার অংশগ্রহণ। যাহোক, গল্পে পান্নু মামার অংশটুকু পড়তে গিয়ে আমার বারবারই শুধু মিষ্টিআলা মামার কথাই মনে পড়ছিল।
তবে বইটার শেষাংশ নিয়ে আমি সন্তুষ্ট না। আমার কাছে শেষটা আজগুবি লেগেছে। বইটার সম্পূর্ণ অংশ দারুণ থাকলেও যেভাবে লেখক শেষটা টেনেছেন তাতে আমি পুরাপুরি স্যাটিসফাইড হতে পারি নাই।
তবে একটা বিষয় যদি উল্লেখ না করি, তবে বইটার এবং লেখকের প্রতি অবিচার করা হবে। লেখক হাসন ইনাম, বইয়ের উৎসর্গে এই আন্দোলনে নিহত হওয়া প্রায় অধিকাংশ শহিদের নাম উল্লেখ করেছেন যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ পৃষ্ঠা অব্দি। লেখক চাইলে এক বাক্যে সম্পূর্ণ কার্যসিদ্ধি সাধন করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেন নাই। তিনি ইতিহাসকে বিকৃত হওয়ার পূর্বে নিজের জায়গা থেকে কৈফিয়ত মাফিক যতটুকু পেরেছেন ততটুকুতে সর্বোচ্চ চেষ্টাটাই দিয়েছেন। লেখক এইজন্য হাইলি অ্যাপ্রেসিয়েশন ডিজার্ভ করেন।
বইয়ের নাম:তথৈবচ লেখক:হাসান ইনাম প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১২ ব্যক্তিগত রেটিং:৪.৭/৫
"আমি সামান্য ছররা বুলেটের আঘাত পেয়ে ঢামেকে বসে ছিলাম তখন,আমার বন্ধু তখন তাজা বুলেট বুকে নিয়ে শহীদ হয়ে গেলো।"
ফ্ল্যাপ: গণঅভ্যুত্থান ঘটে আছে। সবাই ফিরে যাচ্ছে যে যার কাজে। এই গল্পের প্রধান চরিত্র এখনও আটকে আছে জুলাইতে। গণহত্যার তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ছুটে যাচ্ছেন নানা জায়গায়, কখনও বা ১৯৭১ এ! লাশবাহী রিকশা অথবা ট্রেন, কম দামে মিলছে তাজা রক্ত। টুকরো টুকরো কাল্পনিক সাক্ষাতকার, একাত্তর-চব্বিশ, অথবা তথৈবচ। যেসব গল্প হয়ত কেউ কখনই লিখবে না।
সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ—অতি সত্য চেতনার পক্ষে ক্ষতিকারক না।
পাঠপ্রিতিক্রিয়া: তথৈবচ;ক্রাউন সাইজের ১১২ পৃষ্ঠার বই।ছোট সাইজের বই হলেও এটাতে যেভাবে ২৪'র জুলাই-আগস্ট'র ঘটনাগুলো,৭১'র ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে,২টা সময়ের ঘটনাগুলোর এবং শাসকশ্রেণীর অত্যাচারের সামঞ্জস্য তুলে ধরা হয়েছে তা দারুণ।সাথে হাসিনার রোস্টিং তো ছিলোই।
হাসান ইনাম ভাইকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফলো করার কারণে জানি,উনি জুলাই নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।বই পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো উনি নিজের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরেছেন,যদিও এমন প্রত্যাশা থেকেই বইটা কিনেছিলাম।বইতে তিনি তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগী মানুষদের কথা,তাদের দুর্দশার কথা,দেখিয়েছেন এর সুযোগ নিয়ে কারা লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছে।আছে কিছুক্ষণ আগেই ফোনে কথা বলা বন্ধুকে হারানোর গল্প।রিকশাওয়ালা মামা,চা স্টলের মামাদের ঘটনা।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বইয়ের বিষয় থেকে বাদ যাননি।তারা যেন জুলিয়াস সিজারের "এলাম,দেখলাম,জয় করলাম"র মতো চরিত্র।এর মাঝে অনেকে শহীদ হয়েছেন,বাকিরা বিজয় শেষে ফিরে গিয়েছেন নিজেদের জায়গায়।।কোনো ক্রেডিটবাজিতে তারা নেই।
জুলাই নিয়ে কাজ করতে করতে গল্পকথক(হয়তোবা লেখক নিজেই)হ্যালুশিনেশন এ ভুগতে শুরু করেন।সেক্ষেত্রে,তিনি কল্পনার মাধ্যমে বৃদ্ধ-তরুণদের মধ্যকার চিন্তাভাবনার পার্থক্য দেখিয়েছেন,মেটাফোর আকারে আন্দোলন আর আন্দোলন পরবর্তী ঘটনা তুলে ধরেছেন,৭১এর ঘটনা তুলে ধরেছেন।
বইয়ের সবচেয়ে 'heart touching' ব্যাপারে হচ্ছে ৭ পৃষ্ঠার উৎসর্গ,যেখানে ছিলো শহীদদের নাম।
সব মিলিয়ে,জুলাইকে ধরে রাখার জন্য বইটা দারুণ
টাইপিং মিসটেক: বইতে অনেক টাইপিং মিসটেক না থাকলেও যেগুলো ছিলো,তাদের অধিকাংশই পড়াতে প্রভাব ফেলেছে।
প্রোডাকশন ও প্রচ্ছদ: বইয়ের বিল্ড কোয়ালিটি প্রকাশনীর বাকি ক্রাউন সাইজের বইগুলোর মতোই হয়েছে আর বাইন্ডিং 'ইলাস্টিক টাইপ' ছিল।
প্রচ্ছদে থাকা চিত্রের অর্থ না বুঝলেও তা আকর্ষণীয় লাগছে।
তথৈবচ নামের উপন্যাসিকার পাতায় বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলীকে গল্পের মোড়কে সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন হাসান ইমাম। কখনো ফুটে উঠেছে রাজপথের ভয়াবহ দৃশ্য, কখনো সাক্ষাৎকারের আদলে ধরা দিয়েছে শহীদ পরিবারের আর্তনাদ। শুধুমাত্র অভ্যুত্থানেই গল্প থেমে থাকেনি; কীভাবে শহীদের রক্তকে পুঁজি করে ব্যবসা গড়ে ওঠে, সুবিধাবাদীরা নতুন করে সুযোগ খুঁজে লাভবান হয়- সেই তিক্ত বাস্তবতাও উঠে এসেছে বইয়ের পাতায়।
শুধু চব্বিশের জুলাই নয়; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দপুরের গোলাহাট কিংবা চুকনগরের গণহত্যার ভয়াবহতার কথা বলা হয়েছে এই উপন্যাসে। বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই ভয়াবহ গণহত্যার মধ্যে একটি সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন লেখক। বাস্তবতা, নাটকের সেট, স্বপ্ন কিংবা পোস্ট ট্রমাটিক ডিজঅর্ডার থেকে উদ্ভুত হ্যালুসিনেশন- বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে হত্যার ইতিবৃত্ত। উপসংহারে সম্মুখীন হতে হয় অনাকাঙ্ক্ষিত এক টুইস্টের, যার ফলে পাঠক আবারও থমকে দাঁড়ায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বারপ্রান্তে।
ফিকশন, নন-ফিকশন, ডকুমেন্টেশন- মাত্র ১১২ পৃষ্ঠার ভেতর অনেক কিছুর সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক অনন্য সাহিত্যকর্ম তথৈবচ। জুলাই অভ্যুত্থান বিষয়ক অসংখ্য ফিকশন, নন ফিকশনের ভিড়ে হাসান ইনামের এই বইটাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবেই!
বইমেলার কাঁচা বই, শেষ দিন মেলা থেকে আব্বুর কিনে দেয়া আর বইটার গল্পটার জন্যও বইটা স্পেশাল কিন্ত এইরকম একটা সুন্দর বইয়ে এরকম এত বানান ভুল মানায় না, বাতিঘরের বইয়ে বানান ভুল মানায় না, যদিও বাতিঘর যে বানান ভুল একেবারেই করে না তেমন না কিন্তু এই বইয়ে অনেক বানান ভুল করেছেন। আমি নিজেও জানিনা আমার কাঁচা বানান আর ভুল বানান ঠিক কিনা কিন্ত আমি তো পাঠক। যাই হোক বইয়ের গল্প নিয়ে কিছু বলার নাই। বইটা তো আমার বুকসেল্ফে থাকবে, ধরেন বিশ-ত্রিশ বছর বইটা আমার কোনো ভাতিজা-ভাইগ্না বুকসেল্ফ থেকে এমনেই র্যান্ডমলি নিয়ে পড়া শুরু করলো তারপর বললো "কি সময় ছিলো ওইটা" তারপর আবার ভাবলো "এত বানান ভুল কেন ভাই?" বইটা নিয়ে সিরিয়াসনেস কমে যাবে।
সুন্দর বই, এই বইয়ে লেখক একা না গোটা একটা জেনারেশন আটকে গেছে। আমাদের বই।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে এখন পর্যন্ত অনেকগুলো উপন্যাস লিখা হয়েছে,হবে।সবগুলো উপন্যাসের লেখা অথবা থিম প্রায় কাছাকাছিই। তবে 'তথৈবচ' এসব থেকে বেশ আলাদা। উপন্যাসে এখন পর্যন্ত জুলাই এবং জুলাই পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ইস্যুকে খুব সুন্দর এবং সাবলীলভাবে লেখক তুলে ধরেছেন বিভিন্ন গল্পের আলোকে। কখনো শুনিয়েছেন রাজপথের ভয়াল কাহিনী , কখনো শহীদের পরিবারের আকুতি, আবার কখনো তুলে ধরেছেন জুলাইয়ের শহীদদের রক্তকে ব্যবসার সামগ্রী বানানোর গল্প। বইটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বর্বরতম দুইটি গণহত্যার (৭১-২৪) মেলবন্ধন দেখানোর প্রয়াস করেছেন লেখক। শেষ করেছেন অনাকাঙ্ক্ষিত এক টুইস্টের মাধ্যমে। সেটাকে আমরা সতর্ক বার্তা হিসেবে ধরে নিতে পারি। ১১২ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসিকা নন-ফিকশন অথবা ফিকশন, কিংবা উভয়ের সমষ্টিই বলা যায়।