২০১৩ সালের আগস্ট মাস। একই রাতে শহরের একাধিক জায়গায় ঘটে যায় নৃশংস কয়েকটি হত্যাকাণ্ড। প্রতিটি অকুস্থলে পাওয়া যায় চিরকুট, যাতে লেখা- 'ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু'। চিরকুটে হত্যাকারীর নামও পাওয়া যায়। মজন্তালী সরকার। পরদিন খবরের কাগজে এই একই হত্যাকারীর নামে বেরোয় আশ্চর্য এক বিজ্ঞাপন। সেখানে দাবি করা হয়, আগামী বারোই সেপ্টেম্বর ফড়িয়াপুকুর ধর্ষণ- মামলার আসামীকে আলিপুর জেলের মধ্যে হত্যা করা হবে।
উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের বিখ্যাত চরিত্রের নামের আড়ালে কে এই অজ্ঞাতপরিচয় 'এথিকাল' খুনি? সোশাল মিডিয়ায় এই নামে ভাইরাল হয়ে যায় ক্যাটওম্যানের কায়দায় পোশাক পরা মুখোশধারী এক নারীর ছবি। কলকাতা ও সংলগ্ন শহরতলি জুড়ে শুরু হয়ে যায় তার উৎপাত। তদন্তভার আসে সিআইডি-র হাতে।
তিন তদন্তকারী অফিসার, তিন টিভি- সাংবাদিক, এক মনোবিদ ও এক নির্যাতিতাকে ঘিরে ঘুরতে থাকে গল্পের ফ্রেম। কেসে জড়িয়ে যায় একাধিক বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের নাম।
ক্রাইম আর পানিশমেন্ট, প্রেম আর পলিটিক্সের এই রুদ্ধশ্বাস রোলার কোস্টার রাইডে পাঠক, আপনাকে স্বাগত।
গত দেড় দশকে এই বাংলা, বিশেষত কলকাতা ও শহরতলি এক অদ্ভুত প্যারাডক্সের সাক্ষী হয়েছে। তার কেন্দ্রে থেকেছে এমন এক অপরাধ— যার নাম শোনামাত্র বুক কেঁপে ওঠে। ধর্ষণ! এই নিয়ে শহর তোলপাড় হয়েছে বারবার। কাদের মদতে প্রকৃত অপরাধীরা ছাড়া পাচ্ছে, তা জেনেছে সব্বাই। অথচ... কেন এই দ্বিচারিতা? কেন এই নিয়ে যাবতীয় রাগ-ক্ষোভ সোশ্যাল মিডিয়াতেই বিস্ফোরিত হয়, অথচ সবাই সব জেনেও আসল দিনে... তাহলে কি এর জন্য আসলে দায়ী আমরাই— যারা আজও ধর্ষককে বেশি শক্তিশালী বলে ভাবি, আর তাকেই সগর্বে পদচারণার সুযোগ দিয়ে ধর্ষিতা/ধর্ষিতকে ডুবিয়ে দিই 'লজ্জা' নামক অন্ধকারে? এন্টার মজন্তালী সরকার। ২০১৩। পার্ক স্ট্রিট আর কামদুনির যৌথ ঘটনার অভিঘাতে থরথর করে কাঁপছে কলকাতা। তখনই হঠাৎ কয়েকটি বীভৎস হত্যাকাণ্ড নাড়িয়ে দিয়ে গেল পুলিশ, প্রশাসন, মিডিয়া, আর গোটা সমাজকেই। হত্যাকারী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল, সে— অর্থাৎ মজন্তালী সরকার— নারীদের অবমাননার বিরুদ্ধে লড়ছে, লড়বে। এই ভিজিল্যান্টে এবং তার সহায়কদের গ্রেফতার করতে মরিয়া পুলিশ দায়িত্ব দিল এক অত্যন্ত দক্ষ অফিসারকে, যিনি শীতঘুম থেকে ফিরিয়ে আনলেন আর এক হারিয়ে যেতে থাকা সহকর্মীকে। তাঁদের সঙ্গে রইল একজোড়া উঠতি অফিসার। সেই ছোট্ট টিম এগিয়ে গেল সত্যের সন্ধানে। সত্য! তাকে নিয়ে আসল কথাটা তো সেই ক-বে বলে গেছেন কবি~ "সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নয়।" অতঃপর আমরা প্রবেশ করলাম এক গূঢ় ও গাঢ় পোলিস প্রোসিডিওরালে। তারই সূত্র ধরে উঠে আসতে লাগল ইতিহাস। সত্য যেন নিজের একের পর এক খোলস খুলে ফেলতে লাগল আমাদের সামনে। ফালা-ফালা হয়ে গেল আমাদের ভুলিয়ে রাখা কথারা। কিন্তু শেষে... হে লেখক, শেষটায় গিয়ে এ আপনি কী করলেন? সমাজের মানসিকতা বদলানোর নামে একশো কেজি আর.ডি.এক্স দিয়ে গড়া গাঁজার ধোঁয়ায় থ্রিলারটাকে কেন উড়িয়ে দিলেন আপনি? তবে কুর্নিশ আপনাকে। এমন চমৎকার চরিত্রচিত্রণ, এমন নাড়িয়ে দেওয়া ন্যারেটিভ, এতটা ভাবিয়ে তোলা ভীষণতা আমি শেষ কবে পড়েছি, মনে করতে পারছি না। একটি তারা খসালাম ওই গঞ্জিকাধূম্রসঞ্জাত প্লট-টুইস্টের জন্য— যা রিভেঞ্জ থ্রিলারটার ইয়ে ইয়ে দিল। তবে এই উপন্যাসের একটা টেক টু-র আশাতেও রইলাম। কারণ... "অ্যান্ড সামওয়ান টোল্ড মি (সামওয়ান টোল্ড মি) দ্যাট দ্য গডস্ বিলিভ ইন নাথিং সো উইথ এম্পটি হ্যান্ডস্ আই প্রে অ্যান্ড আই টেল মাইসেলফ ওয়ান ডে দে জাস্ট মাইট সি মি দে জাস্ট মাইট সি মি!" ('ফেইথ', জর্জ মাইকেল)
এক কথায় টানটান একটা thriller। গল্পের গতি এতটাই ভালো যে একবার শুরু করলে থামতে ইচ্ছে করে না। শুধু রহস্য নয়, সমাজের অন্ধকার দিক আর ন্যায়বিচারের প্রশ্নও খুব স্মার্টভাবে উঠে এসেছে। কিছু জায়গায় একটু বেশি ডিটেইল মনে হলেও overall বইটা বেশ thought-provoking। থ্রিলারপ্রেমীদের জন্য definitely worth reading।
বইটা আমাকে বিরক্ত করেছে। মজন্তালি মার্জারের মতোই এ ডাল থেকে ও ডাল দ্রুত পদচালনা করেছে। ছোট ছোট চ্যাপ্টারে দুম করে বন্ধ করে দিয়েছে মুখের ওপর দরজা। আরও যখন জানার ছিল তখনি হঠাৎ চ্যাপ্টার শেষ। বইটা শুরুতে ছোট খাটো অনেক plotholes পাওয়া যাবে। সোশ্যাল কমেন্ট্রি গুলো বিরক্ত করবে। কিন্তু যত এগোবে বিশেষ করে মাঝখান থেকে মজন্তালি গতি নিয়েছে ফেরারির স্পিডে। জেন্ডার ভায়োলেন্স যারা পশ্চিমবঙ্গে বড়ো হয়ে উঠেছে লাস্ট ১৫ বছর তাদের কাছে সমস্ত ঘটনা ভীষণভাবে চোখে পড়বে। পার্কস্ট্রিট থেকে জয়নগর , তিয়াশা পৈলান, সুজান জর্ডন আসল নাম পরিবর্তিত। খুঁজলে দেখা যাবে এদের মধ্যে কেউ কেউ আপনার আমার পরিচিত। ইনফ্যাক্ট আমার পরিচিত এক চরিত্র এই গল্পে ভিকটিম। এরা আসল মানুষ। লেখক এদেরকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখেছেন। থ্রিলার লিখেছেন। কিন্তু কোথাও গিয়ে এই গল্প থ্রিলারের থেকেও অনেক এগিয়ে গেছে। এইখানে এসে মজন্তলী মাত করে দিয়েছে সবাইকে। পশ্চিমবঙ্গ বাসী হিসেবে এগুলো শুধু আর গল্প নয়। আমরা সবাই এসব কাগজে পড়েছি। সেই মানুষগুলোকে একটা কাল্পনিক জাস্টিস দিতে মজন্টালি সক্ষম। গল্পের শেষ অংশে এসে চোখ ভিজে গেছে আমারও।
ধর্ষণ একটি লজ্জার বিষয়। কিন্তু কার লজ্জা পাওয়া উচিৎ? যে এই ঘৃণ্য কাজটি করেছে, নাকি যে নির্যাতিত বা নির্যাতিতা হয়েছে? আশ্চর্য ব্যাপার এই যে চুরি করলে চোরের শাস্তি হয়, দুর্নীতি করলে অপরাধীর শাস্তি হয়, কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে যে ভিকটিম তারই সমাজে মুখ লুকিয়ে থাকতে হয়। যে নির্যাতিত হলো সেই মেয়েটির শুধু মানসিক অবসাদ হয়েই দুর্ভোগ শেষ হয়ে যায় না, বরং নষ্ট হয়ে যায় ছাত্র জীবন, কর্মজীবন ও সামাজিক জীবন। তাই আজও কোনো নারী অত্যাচারিত হলে তাঁকে খবরে নিয়ে এলে মুখটি ঢেকে দেওয়া হয় যাতে সে সমাজে চলার পথে বাধাপ্রাপ্ত না হয়। এমনকি কোনো মেয়েকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার চরম পদ্ধতি হচ্ছে ধর্ষণ, কোনো পুরুষকে শিক্ষা দিতে গেলেও তার মেয়ে বউ বোনকে ধর্ষণ করা হচ্ছে সহজ পন্থা।
অন্ধকারে বাড়ির পথে পা দিয়েছে একজন স্কুল ছাত্রী। কোনো একটি অনুষ্ঠানের কারণে কয়েকদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে মেয়েটির। তাকে ঘিরে ধরে কয়েকটি নরপিশাচ। হয়তো মেয়েটির খুব ক্ষতি হয়ে যেত, মোক্ষম সময় উপস্থিত হয় কালো পোশাকে ঢাকা এক নারী মূর্তি। লোকগুলোকে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে খুন করে মেয়েটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়ে পালায় খুনি। তাঁর নাম বলে মজন্তালী সরকার। পরের দিন আসতে থাকে একের পর এক চমক। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় যে আগামী মাসের নির্দিষ্ট তারিখে জেলের ভেতর খুন হবে কুখ্যাত ধর্ষক। মেয়েদের অশালীন দৈহিক প্রদর্শন করে ছবি ছাপার একটি ম্যাগাজিনকে জানানো হয় আগামীকাল আগুন লাগবে তাদের অফিসে। মজন্তালী সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ ওঠে সিনেমায় আইটেম গান রাখার বিরুদ্ধে। এই একের পর এক খুন ও হুমকির তদন্ত করতে নামে সি আই ডি ডিপার্টমেন্টের গোয়েন্দা অমিতাভ সান্যাল, দময়ন্তী মুখার্জি, রাহুল ও তানিয়া। অন্যদিকে নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিক সৌমিলি, শিরিন ও শাক্য জড়িয়ে পড়ে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে।
এই উপন্যাসটি শুধুমাত্র একটি রুদ্ধশ্বাস টানটান থ্রিলার হয়েই থেমে থাকেনি, তার সাথে এই ধরণের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ করা হয়েছে তিন সাংবাদিকের কথপোকথনের মাধ্যমে। আজকাল দেখি বেশিরভাগ জনপ্রিয় উঠতি লেখকরা থ্রিলার লেখেন ও এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যে থ্রিলারের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তাছাড়া এই মোবাইল ও ইন্টারনেটের দুনিয়ায় যেখানে মনোযোগ ধরে রাখা একটা চ্যালেঞ্জ সেখানে এমন টানটান কাহিনী না হলে চলে না। কিন্তু আমি এটা দেখে খুব গর্বিত বোধ করি যে এই থ্রিলারগুলো সবসময় বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে সফলভাবে তুলে ধরে। এই উপন্যাসটির খোঁজ আমি পেয়েছি সানডে সাসপেন্স থেকে। কিন্তু যারা এই বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন তাদের বলবো যে অডিও শোনার আগে আসল বইটি পড়ুন। কারণ নিজে বইটি পড়লে আপনি এই সমাজের মনস্তত্ত্বের দিকগুলো আরো ভালো করে গভীরে গিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পাবেন। সবশেষে বলবো যে কাহিনির শেষে মনে হলো যে এর পরের পার্ট আসার একটি সম্ভাবনা রয়ে গেল। আশা করছি দময়ন্তী মুখার্জি ও তার দলের অভিযান আবার পড়তে পারব।
এই বইটাকে আমি ঠিক কতো নাম্বার দেব ভাবছি। খুব সেনসিটিভ একটা সোশ্যাল ইস্যু নিয়ে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন। প্রচণ্ড গতিশীল বইটা। বিজ্ঞাপনের ভাষায়, 'টান টান উত্তেজনা। একদম আনপুটডাওনেবল।' কিন্তু কথা হচ্ছে এত্ত দুর্দান্তভাবে যে বইয়ের শুরু, এত্ত চমৎকার যেই বইয়ের গতি, প্রতিটা ক্যারেক্টার এতো ওয়েল ডেভেলাপড আর এতোটা জীবন্ত! কিন্তু তার পরিণতি এমন ক্যান? আমি সত্যিকার অর্থে এই দুই তিন দিন বইটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। হাত থেকে নামাতেই ইচ্ছা করছিল না শেষ না করে। কিন্তু শেষ অংশে লেখক টুইস্ট দেখাতে যেয়ে যে পুরো বইটার *** মারা দিয়ে দিয়েছেন তা কি উনি বুঝতেছেন? এই টুইস্ট লেখক কেন দিয়েছেন বুঝতে পেরেছি, কিন্তু অহেতুকভাবে একটা দিক ছুঁতে যেয়ে লেখক ছন্দ হারিয়ে ফেলেছেন অথবা উনার কিছু একটা হয়েছিল -_- মানে টুইস্টের প্যাটার্নটা থাক, কিন্তু অন্যভাবে হতো...
নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে, স্টোরিটা মোটের উপর মজন্তালী সরকারকে নিয়ে। কলকাতা শহরটা হঠাৎ অপরাধীদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠেছে। যে সে অপরাধী নয়। ধর্ষক, নিপীড়ক কিংবা মেয়েদের ব্ল্যাকমেইলারদের জন্য স্পেশালি। পুরানো পাপেও কেউ ছাড়া পাচ্ছে না। এবং এই সুপার হিরোয়িন আসছেন বলে কয়ে রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে। যথারীতি আমজনতা দু'ভাগে ভাগ হয়েছে। মজন্তালীর কর্মকাণ্ডের বৈধতা আর অবৈধতা নিয়ে। দুষ্টের দমন যখন আইন করে হয় না তখন শিষ্টকেই অশিষ্ট হয়ে ভূমিকা নিতে হয়। কিন্তু যত ভালো আর মহৎ কাজই হোক, আইনগত দিক দিয়ে এই মজন্তালী কতোটুক যৌক্তিক? আইনের ধারক-বাহকেরা উঠে পড়ে লাগে মজন্তালীর মূল খুঁজতে।
ছোট্ট করে পটভূমিকাটা একটু বলে নি। কাহিনীর সময়কাল ২০১৩। পার্কস্ট্রীট গণধর্ষণ কাণ্ডের নির্যাতিতা সুজান জর্ডন মৃত্যুপথগামী। এই সময়েই, শহরে আবির্ভুত হলেন এক ভিজিলান্টি সিরিয়াল 'কিলারিণী'... 'মজন্তালী সরকার'। যার মন্ত্র, 'ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু'। শুধু খুনই করেন না, মৃতদেহের পাশে নোট রেখে যান আত্মঘোষণা করে। একাধিক হত্যাকাণ্ডের গুঁতোয় পুলিশও উঠেপড়ে খুঁজতে শুরু করে মজন্তালী কে। অতি সরলীকরণ করে বলতে গেলে, এই সেয়ানা বেড়ালের সাথে চোর পুলিশের খেলাই উপন্যাসের উপজীব্য।
মূল অপরাধ ধর্ষণ হলেও, কাহিনীকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেছে আরো নানা রঙের অপরাধ তথা অপরাধী ও তাদের দমনের জন্য পুলিশি তৎপরতা। এর পিছনে নিশ্চই কঠিন ও সুবিশাল রিসার্চ রয়েছে। হার্ডকোর পুলিশি প্রসিডিওরাল এই উপন্যাসের ভুমিকাতে লেখক লিখেছেন যে দীর্ঘ দিন ধরে এই উপন্যাস রচিত হয়েছে। স্বাভাবিক! এত গভীরতা সম্পন্ন বিচিত্র অপরাধের ছায়া, সাথে এত এডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেল দেওয়া কাহিনীর পরতে পরতে... অথচ কি নির্মেদ লেখনী, লেখককে কুর্নিশ জানাতেই হয়।
পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল, উপন্যাসের প্রকাশকাল ও বিষয়বস্তুর কি অদ্ভুত সমাপতন! এমন এক সমাজ ও সময়ে আমরা বাস করি যেখানে দশ বছর পরে ইতিহাস আবার নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। আমরা দমবন্ধ হয়ে থাকতে থাকতে প্রহর গুনি সেই সিস্টেমের মধ্যে, যে শুধু আমাদের ঘরের দিদি/বোনকে শহরের মাঝখানে ধর্ষণ করে খুনই করেনা, অর্গানাইজড ভাবে ম্যানুপুলেট করে সেটিকে চাপাও দিয়ে দেয় সেই এক যুগ পুরোনো চেনা সিলেবাস দেখে।
আর সেকারণেই হয়ত লেখক কল্পনা করেছেন এক ক্যাটউওম্যানের। যে কিনা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে নিজের হাতেই তুলে নিতে বাধ্য হয়েছেন আইন।
গড়পড়তা বই এর মাঝে মাঝে আকস্মিক ভাবেই এমন কিছু বই হাতে চলে আসে, যা কিনা ঘোরের মধ্যে রেখে দেয় বেশ কয়েকদিন। 'মজন্তালী সরকার' এরকমই কিছুর অভিজ্ঞতা দিয়ে গেল। বইমেলার সময় দেখেছিলাম বইটির নাম কিছু বইয়ের গ্রুপে। কিন্তু, সত্যি বলতে কি সেরকম কিছু হাইপ দেখিনি। তদুপরি লেখকও নবাগত। পাত্তা দিইনি। কি করা যাবে! FOMO আর পিয়ার প্রেসারেই কাল কাটাই। আদপে তো মধ্যমেধা।
সম্প্রতি সুলেখক অভীক মোহন দত্তের একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া দেখে সংগ্রহ করার মোটিভেশন পেয়ে গেছিলাম। এমনিতেই আমি স্লো রিডার, সাথে, অফিসও চলছে পুরোদমে... এবং বইটিকেও মোটামুটি আকৃতিতে 'কোঁৎকা'ই বলা চলে। তাতেও, শেষ দুদিন কোল থেকে নামেনি সেয়ানা বেড়াল 'মজন্তালী'।
২৯৬ পাতার উপন্যাসের শেষটুকু পড়ে বোঝা যায়, 'পিকচার অভি বাকী হ্যায়'। লেখকের প্রতি অনুরোধ বেশি দিন অপেক্ষা করাবেন না প্লিজ। আর হ্যাঁ, বইয়ের পিছনের মলাটে যে একটা গল্পের টিজার গোছের দেওয়া থাকে, সেটি বদলানোর দাবি রাখি। এত সুন্দর একটা বইয়ের পিছনে এত দায়সারা ব্ল্যার্ব কিন্তু এই বইয়ের প্রাপ্য নয়।
পুনশ্চ: যেসব চরিত্রগুলো বাস্তব থেকে অনুপ্রাণিত, তাদের নামকরণের সময় লেখক যে 'সৃজিতীয়' টাচ দিয়েছে, তা মনে খুবই পুলক জাগায়... এর জন্যও লেখকের অতিরিক্ত বাহবা প্রাপ্য 😊
অনেক বই আছে যা পড়া শেষ করার পরেও অনেক সময় পর্যন্ত একটা ঘোরের মধ্যে রেখে দেয়। ভালোলাগার ঘোর। একটা সূক্ষ্ম অনুভূতি যা আমি কলমের জোরে বোঝাতে পারব না। ‘মজান্তলী সরকার’ সেই ঘোরেরই নাম।
আমার অনেক দিনের আক্ষেপ ছিল যে, বাংলা থ্রিলার অনুভূতিহীন ও নিরস। রোহন রায়ের এই উপন্যাস যেন এক বাটি রসগোল্লা নিয়ে আমার কাছে হাজির হলো।
উপন্যাসের শুরুটা খুবই টানটান। অনেক দিন পর ভালো লেখা পড়তে পেরে আমি বেশ খুশি। রোহন রায়ের লেখনীও চমৎকার; চরিত্রের আবেগ, অনুভূতি লেখক খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কিন্তু উপন্যাসের মাঝের অংশ কিছুটা বিরক্তিকর। কিছু কিছু অংশ শ্রেফ পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হয়েছে, যেগুলো বাদ দিলে গল্পটা অনেক বেশি মেদহীন ও সুখপাঠ্য হতে পারত। পাঠককে বিভ্রান্ত করার জন্য অনেক চরিত্রের আমদানি করা হয়েছে, আর তাদেরকে কোনও না কোনও ভাবে গল্পের সাথে যুক্ত করা হয়েছে ‘রেড হেরিং’ হিসেবে। সবচাইতে বিরক্তিকর লেগেছে, যে সমস্ত চরিত্রের বিস্তার শুধু মাত্র একটি প্যারাগ্রাফের জন্যই, তাদেরও লেখক যত্ন করে নাম দিয়েছেন। এত চরিত্র, এত নাম, মনে রাখার পক্ষে খুবই অসুবিধাজনক। বিভ্রান্তি এড়াতে আমাকে প্রায়ই পৃষ্ঠা উলটে আবার আগের চ্যাপ্টারে ফিরে যেতে হয়েছে। আর নাম গুলোও খুবই বিভ্রান্তিকর—সবর্ণা, সুজান, সম্পূর্ণা, শ্রীপর্ণা, সৌমিলি, শিরিন, শালিনী, সুচেতা, শম্পা ইত্যাদি। দিবাকর দাসের মহাকাল পড়েও এই সমস্যা হয়নি আমার।
ক্লাইম্যাক্সে এসে গল্প আবার গতি পেয়েছে। টানটান উত্তেজনাময়। তবে, ক্লাইম্যাক্সের আগ পর্যন্ত পাঠক যেখানে সবকটা রহস্যের জট খোলার সাক্ষী হচ্ছিল, সেখানে শেষে গিয়ে লেখক পাঠককে অনেকটা সময় ধোঁয়াশার মধ্যে রাখেন। অপরাধী জিজ্ঞেস করে, “তুমি এটা কী করে জানলে?” গোয়েন্দা জবাব দেয়, “হু হু! আমি জেনেছি এই এইভাবে….।” লেখক নিজেই সমসাময়িক বাংলা রহস্য গল্পের খিল্লি করে লিখেছেন, প্রায় সবই ওই স্বপন কুমারের মতো ‘কোথা থেকে কী হইয়া গেল’ কেস, মাথামুন্ডু নেই। লেখকের নিজের ক্লাইম্যাক্সটাও অনেকটা সেরকম।
এই খামতিটুকু বাদ দিলে মজান্তলী আপনাকে নিরাশ করবে না। লেখক তার কলমের তুলি নিয়ে সামাজিক প্রেক্ষাপটের যে ছবিটা তুলে ধরেছেন, তা মন ছুঁয়ে যায়। এ এক যথার্থ সাহিত্যিক থ্রিলার। আমার পছন্দের লেখকের তালিকায় আরও একটি নাম যুক্ত হলো।
অনেক যুগ পরে একটা উপন্যাসের এরকম দুর্বার গতিসম্পন্ন নিখুঁত শুরুর ঝাঁজ একেবারে ব্রহ্ম তালু অবধি আলোড়িত করলো। উপন্যাসের অন্তর্নিহিত ভাবনা ও অস্বস্তি জাগানো প্রশ্ন গুলি দ্বারা মুগ্ধতায় চিৎপটাং হয়েও বলতে বাধ্য হচ্ছি শেষ টা ঠিক রহস্য গল্পের সমীকরণের নিটোল খাঁজে না বসে বিষাদ জাগানো কবিতার মতো বাতাসে ভাসমান। অবশ্য লেখক হয়তো এটাই চেয়েছিলেন। সাবলীল বুদ্ধির পাশাপাশি অর্ধতরল কৌতুকবোধটাও এই লেখার জ্বালানি।
এন্ডিংটা আমার কম পছন্দ হয়েছে (ভালো লাগেনি নয়)। কিন্তু এছাড়া বইটা দারুণ। ঠিক যেন আগাথা ক্রিস্টির কোনো নভেল পড়লাম। 'মজন্তালী সরকার' চোখের সামনেই ছিল, কিন্তু দেখেও দেখতে পাইনি।
মজন্তালী সরকার: অন্ধকার শহরের অদম্য প্রতিশোধের কাহিনি
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জগতে অসংখ্য ক্রাইম থ্রিলারের মধ্যে 'মজন্তালী সরকার' যেন একটি বিদ্যুৎচমক—যা শুধু আলো ফেলে না, বরং সমাজের অন্ধকার কোণগুলোকে উন্মোচিত করে, পাঠকের হৃদয়ে এক অস্থিরতা জাগিয়ে তোলে। রোহন রায়ের এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পত্রভারতী থেকে প্রকাশিত হয়েছে, কলকাতার রাতের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য যোদ্ধার গল্প বলে। ২৯৬ পৃষ্ঠার এই বইটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য নয়, বরং সমাজের এক গভীর ক্ষতের প্রতিফলন—যেখানে ন্যায়ের অভাবে জন্ম নেয় ভিজিলান্টিজমের আগুন। লেখক রোহন রায়, যিনি কলেজের দিনগুলোতে নির্ভয়া কাণ্ডের (২০১২) অভিঘাতে এই প্লটের বীজ রোপণ করেছিলেন, এখানে শুধু গল্প বলেননি; সমাজকে একটি আয়না ধরে দিয়েছেন। পড়তে পড়তে মনে হবে, আপনি কলকাতার সেই গলিপথে হাঁটছেন, যেখানে প্রতিটি ছায়ার পিছনে লুকিয়ে আছে একটি চিৎকার।
'মজন্তালী সরকার' এর কাহিনি শুরু হয় ২০১৩ সালের আগস্ট মাসের এক অন্ধকার রাতে—কলকাতা এবং তার আশেপাশের এলাকায় একই সঙ্গে ঘটে যায় একাধিক নৃশংস হত্যাকাণ্ড। প্রতিটি অকুস্থলে পাওয়া যায় একটি চিরকুট: "ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু"। চিরকুটে হত্যাকারীর নামও লেখা—মজন্তালী সরকার। পরের দিন একটি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যাতে ঘোষণা করা হয়েছে যে আলিপুর জেলের ভিতরে এক ধর্ষণ-অভিযুক্ত ব্যক্তির হত্যা হবে ১২ সেপ্টেম্বর। এই ঘটনা যেন একটি চ্যালেঞ্জ—পুলিশের, সমাজের এবং পাঠকের। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে ওঠে একটি ছবি: ক্যাটওম্যান-স্টাইলের কালো পোশাক পরা এক মুখোশধারী মহিলা, যিনি নিজেকে 'নৈতিক' হত্যাকারী বলে দাবি করেন।
একটি জটিল জাল—যেখানে তিনজন গোয়েন্দা, তিনজন টিভি সাংবাদিক, একজন মনোবিজ্ঞানী এবং একজন ভিকটিমের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প এগোয়। সিআইডি (CID) তদন্তের দায়িত্ব নেয়, কিন্তু রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, মিডিয়ার সেনসেশনালিজম এবং সমাজের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যেন তদন্তকে জটিল করে তোলে। লেখক রোহন রায় এখানে স্পয়লার ছাড়াই বলে দেন যে, এটি শুধু একটি সিরিয়াল কিলারের গল্প নয়; এটি একটি সমাজের আয়না—যেখানে ধর্ষণ, নির্যাতন এবং ন্যায়বিচারের অভাবের মধ্য দিয়ে বয়ে যায় প্রতিশোধের স্রোত। প্লটের গতি অসাধারণ: শুরুতে একটি ঝড়ের মতো দ্রুত, মাঝামাঝি একটু ধীর (কিছু পুনরাবৃত্তির কারণে), এবং শেষে একটি অপ্রত্যাশিত টুইস্ট যা পাঠককে ভাবিয়ে রাখে। এটি পড়তে গিয়ে মনে হয়, যেন আপনি কোনো এক হলিউড থ্রিলারের বাংলা সংস্করণে ডুবে গেছেন, কিন্তু কলকাতার লোকাল ফ্লেভার—যেমন আলিপুর জেল, সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরালতা এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র—এটিকে অসাধারণ করে তোলে।
রক্তমাংসের যোদ্ধা এবং ছায়াময় মানুষ, এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো তার চরিত্রসমূহ—যারা শুধু নাম নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে 'মজন্তালী সরকার', সেই রহস্যময়ী মহিলা যিনি কালো পোশাকে লুকিয়ে ধর্ষক এবং নির্যাতকদের শাস্তি দেন। তাঁর পরিচয় অজানা, কিন্তু তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন একটি ঘোষণা—ন্যায়ের অভাবে জন্ম নেওয়া প্রতিশোধ। পাঠক তাঁকে দেখতে পাবেন না, কিন্তু অনুভব করবেন: তাঁর মধ্যে মিশে আছে ক্রোধ, করুণা এবং এক অদম্য শক্তি, যা ফেমিনিজমের প্রতীক হয়ে ওঠে।
তদন্তকারীদের মধ্যে অমিতাভ সান্যাল, দময়ন্তী মুখোপাধ্যায়, রাহুল এবং তানিয়া—এই চারজন সিআইডি অফিসার যেন গল্পের মেরুদণ্ড। অমিতাভের যুক্তিবাদী মন এবং দময়ন্তীর সহানুভূতিশীলতা তাদেরকে জীবন্ত করে; তারা শুধু কেস সলভ করছেন না, বরং নিজেদের অতীতের ছায়ার সাথে লড়ছেন। টিভি সাংবাদিকরা—সৌমিলী, শিরীন এবং শক্যম—মিডিয়ার দ্বৈততার প্রতিনিধি: তারা সত্য খোঁজেন, কিন্তু রেটিংসের লোভে সেনসেশন তৈরি করেন। একজন মনোবিজ্ঞানী চরিত্র যোগ করে গভীরতা, যিনি হত্যাকারীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেন এবং ভিকটিমদের ট্রমার উপর আলোকপাত করেন। এবং ভিকটিম চরিত্রগুলো—যেমন সুজেট জর্ডানের মতো বাস্তব-অনুপ্রাণিত নারী—যাঁরা গল্পের হৃদয়: তাদের বেদনা, সামাজিক বয়কট এবং পুনরুদ্ধারের চেষ্টা যেন পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
এই উপন্যাসের চরিত্ররা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত, কেউ অতিরিক্ত নয়, কিন্তু কখনো কখনো তাদের সংযোগ অতিরিক্ত মনে হয়, যা পাঠককে বিভ্রান্ত করে। তবু, মজন্তালীর ছায়া সবার উপরে—তিনি যেন একটি প্রতীক, যা পাঠককে প্রশ্ন করে: ন্যায়ের জন্য হত্যা কি ন্যায়?
সমাজের ক্ষত এবং প্রতিশোধের দ্বন্দ্ব তীব্র ভাবে ধরা পড়েছে এই উপন্যাসে। এই উপন্যাস শুধু থ্রিলার নয়; এটি একটি সামাজিক মন্তব্য। কেন্দ্রীয় থিম 'অপরাধ এবং শাস্তি' —যেখানে আইনের ব্যর্থতা ভিজিলান্টিজমের জন্ম দেয়। লেখক দেখান যে, ধর্ষণের মতো অপরাধে রাষ্ট্রের অকর্মণ্যতা কীভাবে ভিকটিমদের জীবন ধ্বংস করে: শিক্ষা, কর্মজীবন এবং সামাজিক জীবন সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণ সংস্কৃতি এখানে তীব্রভাবে উঠে আসে—পশ্চিমবঙ্গের শেষ ২০-৩০ বছরের অপরাধের খতিয়ান ঘাঁটলে যা দেখা যায়, তা অনেকটা গথামের মতো: নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা ছাপিয়ে যায় সবকিছু। এর পাশাপাশি প্রেম এবং রাজনীতি মিশে যায়: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কীভাবে তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করে, এবং প্রেম কীভাবে প্রতিশোধের মধ্যে একটি আলোর রেখা আঁকে।
এই উপন্যাসে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকরা সত্যের সাথে সেনসেশনের মধ্যে দ্বিধায় পড়েন, যা সমাজের দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন। এছাড়া, ফেমিনিজম এবং সশক্তিকরণ—মজন্তালী যেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহের প্রতীক, যা নারীদের সুরক্ষার জন্য সমাজের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে। বৌদ্ধ দর্শনের মতো নয়, এখানে দর্শন হলো বাস্তবতা: আইনের ফাঁকফোকর কীভাবে 'নৈতিক' হত্যাকে জায়েজ করে। এই থিমগুলো পাঠককে ভাবায়—আমরা কি শুধুই দর্শক, নাকি পরিবর্তনের অংশ?
উপন্যাসে দ্রুতগতির প্রবাহ এবং লোকাল টাচ লক্ষণীয়। রোহন রায়ের ভাষা যেন একটি তীর—দ্রুত, তীক্ষ্ণ এবং লক্ষ্যভেদী। বাংলার স্থানীয় স্বাদ মিশিয়ে তিনি কলকাতার রাস্তা, জেলের অন্ধকার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভাইরাল হওয়ার দিকটি জীবন্ত করে তুলেছেন। ডায়ালগগুলো সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাবশালী, এবং ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে অতীতের ট্রমা উন্মোচিত হয়। ন্যারেটিভ মাল্টি-পার্সপেক্টিভ—বিভিন্ন চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প এগোয়, যা সাসপেন্স বাড়ায় কিন্তু কখনো বিভ্রান্তও করে। শেষের টুইস্টগুলো অপ্রত্যাশিত, কিছু ক্ষেত্রে মনে হলেও হতে পারে যে, এগুলো জোর করে যোগ করা। সামগ্রিকভাবে, লেখনশৈলী এমন যে, বইটি একসাথে শেষ করতে ইচ্ছে করে—রাতের বেলা পড়লে ঘুম আসবে না!
এই উপন্যাস আসলে একটি একটি চ্যালেঞ্জ এবং আহ্বান। 'মজন্তালী সরকার' পড়া মানে শুধু একটি বই শেষ করা নয়, এটি সমাজের সেই চিরকুটটি পড়া যা বলে, "শাস্তি হবে"। রোহন রায় এখানে একটি অমর প্রশ্ন রেখে গেছেন: যখন আইন নীরব, তখন কে হবে ন্যায়ের কণ্ঠ? যদি আপনি সেই পাঠক যিনি থ্রিলারের সাথে সমাজের সত্য খুঁজতে চান, তাহলে এই বইটি আপনার জন্য। পড়ুন, এবং দেখবেন, কলকাতার রাত আপনারও ছায়ায় ভরে উঠবে। কী বলেন, এই প্রতিশোধের যাত্রায় যোগ দেবেন?
বাংলা রহস্য কাহিনির ভান্ডারে রোহন রায়ের প্রথম উপন্যাস ‘মজন্তালী সরকার’ একটি অসামান্য সংযোজন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত হওয়া এই উপন্যাসকে অবশ্য শুধুমাত্র রহস্যকাহিনি না বলে, সামাজিক উপন্যাস হিসেবেও সহজেই দাগিয়ে দেওয়া যায়। রোহন খুব যত্ন নিয়ে প্রতিটা চরিত্রকে তৈরী করেছেন, এবং তাদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনেকটা সময়য় দিয়েছেন। এর ফলে উপন্যাসটি শুধুই খুনী-পুলিশের বিড়াল-ইঁদুর দৌড় হয়ে ওঠেনি। এখানে শীর্ষেন্দু আছেন, জয়-জীবনানন্দ আছেন, সি-আই-ডি আছে, অত্যন্ত সূক্ষ্ম হিউমার আছে, প্রেম-খুনসুটি আছে, জিভে-জল-আনা সব খাবারদাবার আছে, এবং সবার ওপরে আছে -শহর কলকাতা। কিছু কিছু জায়গায় রোহনের বর্ণনা বড় মধুর। আজন্ম দেখতে থাকা এই শহর কলকাতাকে নতুনভাবে দেখতে শিখলাম, পাঠক হিসেবে সেটা বড় পাওনা।
রহস্যকাহিনি হিসেবে ‘মজন্তালী সরকার’ দুরন্ত। একদম শেষ অবধি লেখক রহস্যটাকে ধরে রেখেছেন, এবং পাঠককে গোলকধাঁধাঁর মধ্যে ঘুরপাক খাইয়েছেন। কাহিনি যখন শেষ হল, তখন ‘চেখভস্ গান’-এর কথা কেন এল, সেটা বেশ বুঝতে পারলাম। বনির চরিত্রটা এই গল্পে সবচেয়ে কম স্থান পেয়েছে, কিন্তু বনি গল্পের গোটা কাঠামোটাকে ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে, এবং সেটা শেষ অবধি গিয়ে অনুভব করে আমার দুর্দান্ত লেগেছে।
এক সপ্তাহকাল এই বইয়ের সঙ্গে যাপন করে, চরিত্রগুলো বড়ই আপন হয়ে উঠেছিল। দময়ন্তী-অমিতাভ-তানিয়া-রাহুল-লোকনাথ-সুকুমার হোক, বা সৌমিলি-শাক্য-শিরিন-রণ হোক, আবার অঙ্কিত-শালিনী-উপাসনা-লীনা হোক, সবকটি চরিত্রকেই খুব ভাল লেগেছে। চরিত্রনির্মাণে লেখক একদম লেটার-সে-ভি-বেটার নম্বর পাবেন।
কিন্তু… …পারফেক্ট ক্রাইম বলে যেমন কিছু হয়না, পারফেক্ট উপন্যাস বলেও কি কিছু হয়না? এই উপন্যাসেও কিছু অত্যন্ত চোখে-পড়ার মতন ত্রুটি আছে, যেগুলো খুবই ব্যথা দিয়েছে আমাকে। প্রথমত, নাম-পদবী নিয়ে রোহনের আরো একটু যত্নবান হওয়া উচিৎ ছিল। সুকুমার শুরুতে দত্ত ছিলেন, পরে ওঁর পদবী বদলে গেছে, একই ঘটনা লোকনাথের ক্ষেত্রেও ঘটেছে। সাগ্নিক সাহা হিসেবেই ভাল ছিলেন, বড়াল হতে গেলেন কেন কে জানে! রাহলের মায়ের নাম তপতী থেকে হঠাৎ করে মধুমিতা হয়ে গিয়েছে। এগুলো অবশ্যই এড়ানো যেত।
সময়ের গোলযোগও ধরা পড়েছে। এই কাহিনি ২০১৩ সালের। সেক্ষেত্রে ২০১৫ বা ২০১৭ সালে মামণি কোনোভাবেই লিলুয়া হোমে আসতে পারেনা। যদিও এই টাইমফ্রেমটা রহস্য সমাধানের ক্ষতিবৃদ্ধি করেনা, কিন্তু পাঠক হিসেবে বেশ খানিকক্ষণ থম মেরে বসেছিলাম এই জায়গায় এসে। এত ভাল একটা গল্পে এরকম ভুল – কী করে হয়?
তবে সব মিলিয়ে, রোহন লিখতে পারেন। যত্ন নিয়ে লিখলে, তিনি আরো উৎকৃষ্ট মানের লেখা আমাদের উপহার দেবেন, এই আশা করি।
অন্ধকার শহরে কখনও কখনও ন্যায়বিচার আসে মুখোশ পরে ।
টানা ৮ দিন ধরে বইটার ভেতর ডুবে ছিলাম - উফ , কী অসাধারণ ! অনেক দিন পর এমন মুগ্ধ করে রাখা কোনো বই পড়লাম । এই বইটা শুরু থেকেই একটা টানটান উত্তেজনা তৈরি করে । ২০১৩ সালের কলকাতাকে ঘিরে এমন একটা গল্প যেটা একবার শুরু করলে থামানো মুশকিল । শহরের অন্ধকার দিকটা খুব তীক্ষ্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে । একটার পর একটা খুন আর সব খুনের পেছনে একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য - এই জিনিসটাই গল্পটাকে আলাদা করে তোলে । যে মানুষগুলো মেয়েদের ক্ষতি করতে চেয়েছে , তাদেরই টার্গেট করা হচ্ছে । এই জায়গাটা পড়তে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে , এটা শুধু গল্প না বাস্তবের একটা প্রতিফলন । মজন্তালী সরকার চরিত্রটা রহস্যময়, শক্তিশালী আর ভীষণ আকর্ষণীয় । তার প্রতিটা পদক্ষেপের পেছনে একটা বার্তা আছে । শুধু খুন না , সমাজের অনেক ভুল দিকের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদটা খুব স্পষ্ট । ম্যাগাজিন , ওয়েবসাইট , সিনেমা - সব জায়গায় সে প্রশ্ন তুলছে । এই অংশগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে । নিষিদ্ধ ওয়েবসাইট হ্যাক করে সেখানে ৫০ টা ভালো বই এর লিংক দিয়ে সেই মহিলা বোঝাতে চাইছেন খারাপ জিনিসে মাথা নষ্ট করার চেয়ে বই পড়ে মগজ পুষ্ট করা ঢের ভালো । গল্পটা যত এগোয় , তত বেশি কৌতূহল বাড়তে থাকে । কে এই মজন্তালী সরকার আর কেন সে এমন করছে - এই প্রশ্নটাই মাথায় ঘুরতে থাকে । মিডিয়া আর পুলিশের ভূমিকা এখানে খুব ভালোভাবে দেখানো হয়েছে । তারা যেভাবে ধীরে ধীরে ক্লু ধরে এগোয় , সেটা পড়তে ভালো লাগে । প্রতিটা ছোট তথ্য যেন একটা বড় ছবির দিকে নিয়ে যায় । তবে একটা জিনিস একটু খেয়াল হয়েছে - চরিত্র সংখ্যা অনেক বেশি । কিছু কিছু জায়গায় সবকিছু ট্র্যাক করা একটু কঠিন লাগে । তবুও গল্পের গতি আর উত্তেজনা সেটা সামলে নেয় । লেখার ধরন খুব ফাস্ট আর গ্রিপিং । কোনো জায়গায় বোরিং লাগে না বরং আরও পড়তে ইচ্ছে করে । প্রতিটা অধ্যায় শেষে মনে হয় , আরেকটু পড়ি । এই বইটা শুধু থ্রিলার না এর ভেতরে একটা শক্ত মেসেজ আছে। মেয়েদের বর্তমান অবস্থার একটা কড়া প্রতিচ্ছবি দেখা যায় । এই দিকটা বইটাকে আরও অর্থপূর্ণ করে তোলে । আমি ব্যক্তিগতভাবে বইটা ভীষণ এনজয় করেছি । অনেকদিন পর এমন একটা টানটান গল্প পড়লাম। শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার মতো শক্তি এই বইয়ের আছে । যারা থ্রিলার ভালোবাসেন , তাদের জন্য এটা একদম পারফেক্ট রিড ।
ধ*র্ষণ— এই একটি শব্দই আমাদের সমাজের বহু অস্বস্তিকর সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করায়। সংবাদমাধ্যমে তোলপাড়, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের বিস্ফোরণ, প্রতিবাদের ঝড়, সবই হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উত্তাপ কমে যায়, আর অপরাধ, অপরাধী ও ভুক্তভোগীকে ঘিরে সমাজের পুরোনো মানসিকতা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। রোহন রায়ের মজন্তালী সরকার সেই অসুখী বাস্তবতাকেই থ্রিলারের মোড়কে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
২০১৩ সালের কলকাতা। পার্ক স্ট্রিট ও কামদুনি-কাণ্ডের অভিঘাতে যখন রাজ্য উত্তাল, ঠিক তখনই একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড চমকে দেয় সবাইকে। হত্যাকারী নিজের পরিচয় দেয়— মজন্তালী সরকার। তার দাবি, সে নারীর প্রতি অবমাননা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে শুরু হয় এক জটিল অনুসন্ধান, যেখানে পুলিশের একটি বিশেষ দল নেমে পড়ে এই রহস্যময় ভিজিল্যান্টেকে ধরার লক্ষ্যে।
উপন্যাসের অন্যতম শক্তি তার তদন্ত-নির্ভর বর্ণনা। ধাপে ধাপে রহস্য উন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে সমাজ, ইতিহাস, ক্ষমতা এবং ন্যায়বিচার নিয়ে অস্বস্তিকর সব প্রশ্ন। লেখক চরিত্রগুলিকে শুধু গল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করেননি; প্রত্যেকের নিজস্ব উপস্থিতি ও মানসিক জটিলতা রয়েছে, যা কাহিনিকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য লেখকের ন্যারেটিভ নির্মাণ। গল্প যত এগোয়, ততই পাঠক উপলব্ধি করেন যে সত্য কখনও সরলরৈখিক নয়। আমরা যা বিশ্বাস করি, তার আড়ালেও লুকিয়ে থাকতে পারে আরও অনেক স্তর, আরও অনেক অনুচ্চারিত ইতিহাস।
তবে উপন্যাসের শেষভাগ নিয়ে আমার কিছু আপত্তি রয়ে গেল। যে বাস্তবধর্মী ও তীক্ষ্ণ সুরে গল্পটি এগোচ্ছিল, ক্লাইম্যাক্সে এসে তা কিছুটা অতিনাটকীয় বলে মনে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, সেই প্লট-টুইস্ট উপন্যাসের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে খানিকটা দুর্বল করেছে। আরও সংযত সমাপ্তি হয়তো গল্পটিকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারত।
তবুও এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মজন্তালী সরকার নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী থ্রিলার। এটি শুধু রহস্যভেদ বা অপরাধ অনুসন্ধানের গল্প নয়; বরং সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করার এক সাহসী প্রয়াস। বইটি শেষ করার পরও এর বহু প্রশ্ন পাঠকের মনে দীর্ঘদিন থেকে যায়, আর সেখানেই এর সাফল্য।
গত 1st January বইটি পড়া শুরু করি এবং আজ পড়া শেষ হল। পড়া শেষ করবার পর কতক্ষণ যে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বসেছিলাম বলতে পারবো না। করণটা plot twist ... শেষটা একদম চমকে দিয়েছে। প্রথমে একটু আশাহত হয়েছিলাম ঠিকই পরে অনেক ভেবে লেখকের point of view টা বুঝতে পেরে নিজেকে সান্তনা দেওয়া গেল।
যাইহোক বইটির বিষয়ে বেশি কিছু বলতে গেলে সেটা spoiler হয়ে যাবে। Spoiler যথাসম্ভব না দিয়ে বলি... ঘটনার সূত্রপাত 2013 সালে শহর কলকাতা জুড়ে নৃশংস খুনের হাত ধরে। তবে এই খুন সাধারণ নয়। যাদের খুন করা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই ধর্ষক। এবং খুনি মজন্তালী সরকার। তাঁর মন্ত্র ' ধর্ষকের শাস্তি খুন'। কিন্তু কে এই মজন্তালী সরকার? কী তার আসল পরিচয়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ভার পরে স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসার অমিতাভ এবং দয়মন্তীর টিমের ওপর। সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে আরও অনেক তথ্য। অন্যদিকে 'মার্জার ললনা'-ও তার কাজ করে চলেছে একের পর এক ধর্ষককে শাস্তি দিয়ে। সবটা নিয়ে কঠিন জট তৈরী হয়। এরই মধ্যে লেখক খুব পারদর্শিতার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন সিরিন, সৌমিলি, শাক্য আর রণ -এর মতো চরিত্রের কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে। পাশাপাশি লেখক সমাজ এবং পাঠকদের সামনেও প্রশ্ন তুলেছেন। ধর্ষণের লজ্জা আসলে কার? সবসময় নির্যাতিতাকেই কেন সমাজে লজ্জা বস্ত্র পরিয়ে রাখা হয়? এইভাবেই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার ত্রুটি সামনে রেখে গল্প এগোতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কি মজন্তালী সরকারের রহস্য উদঘাটন করতে পারবে অমিতাভ - দয়মন্তীর টিম? করলেও কীভাবে? কী হবে মার্জার ললনার শেষ পরিনতি? সবের উত্তর পেতে পড়ে ফেলুন 'মজন্তালী সরকার'।
এক মহিলা সিরিয়াল কিলার কলকাতাকে বিনা নোটিশে রোলার কোস্টারে চড়িয়ে দিয়েছে | ২০১৩ সালের আগাস্ট মাসে শহরের একাধিক জায়গায় ঘটে যায় নৃশংস হত্যাকান্ড | প্রতিটি হত্যাকান্ডের পাশে পাওয়া যায় চিরকুট , যাতে লেখা রয়েছে - 'ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যু' |উপেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরির এর বিখ্যাত গল্পের সেয়ানা বিড়ালের নাম মজন্তালী সরকার| খুন এর পাশে যে চিরকুট পাওয়া গেছে তাতে এই ছন্দনাম ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে হত্যাকারীকে| আগাথা ক্রিস্টির গল্প -"আ মার্ডার ইজ অ্যানাউন্সড " যেখানে খুনি পেপারে অ্যাড দিয়ে খুনের কথা ঘোষণা করেছিল ঠিক সেইরকমই নতুন ফিল্মের টিজার বলে বিভিন্ন পত্রিকায় এই খুনের ঘটনার অ্যাড অর্ডার করা হয়েছিল আগের থেকেই | এইসব ঘটনা সামনে আসার পরই এই ঘটনার দায়িত্বভার এসে পড়ে সিআইডি এর ওপর|তিন তদন্তকারী অফিসার, তিন টিভি-সাংবাদিক, এক মনোবিদ ও এক নির্যাতিতাকে ঘিরে ঘুরতে থাকে গল্পের ফ্রেম। কেসে জড়িয়ে যায় একাধিক বিতর্কিত ব্যক্তিত্বের নাম। উপেন্দ্রকিশোরের গল্পের বিখ্যাত চরিত্রের নামের আড়ালে কে এই অজ্ঞাতপরিচয় 'এথিকাল' খুনি? যে কিনা ক্যাটওমেন এর চরিত্রে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে কেনই বা সে এমন কাজকর্ম করে বেড়াচ্ছে??
সমাজের একটা বিশাল সেনসিটিভ ইস্যু এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে লেখা গল্পটি । Vengeance is one of my favourite genres to read । গল্পের শুরুটা ভালোই হয় কিন্তু মাঝপথ থেকে ডুবতে শুরু করে । আগে থেকেই বুঝেছিলাম যে শেষে ডিসঅ্যাপয়েন্ট হব। ঠিক তাই হলো।
অতিরিক্ত ইন্টেলেকচুয়াল কথাবার্তা, অপ্রয়োজনীয় charecters দিয়ে পাতা ভর্তি না করলে বইটির আরও interesting হতো। প্রায় ১০০ তা পাতা এক্সট্রা drag করা গল্প । তার উপর গল্পের শুরুতেই বোঝা যাচ্ছিল যে ইন্টারনাল হেল্প না থাকলে এই কাজ possible নয় তাই হতো প্রত্যেক পাঠকই ইন্টারনাল কাউকে সন্দেহ করেছে। তাই সেই সন্দেহ কে উড়িয়ে দিয়ে unexpected কাউকে খুনি প্রমাণ করতে গিয়ে একেবারে insignificant একজন কে খুনি করে দেওয়া হয়েছে। আর শেষে একটা তো মোটিভ দেখাতে হবে তাই একটা পাস্ট অ্যাড করে দেওয়া হয়েছে ।
ব্যাপারটা অনেকটা মোটিভের জন্য খুন নয়, খুনের জন্য মোটিভ জুড়ে দেওয়ার মত গল্পে পরিণত হয়েছে ।
This is such a devastating book... I have never seen that ending coming, not Once. The book challenges the moral value of our current society and also argued on the "Feminist POV" topic . I think I haven't read such a contradicting,dark, political satirical novel in my life. This Book deserves atleast An Sahitya Academy for its powerful mindbending story of all the victims of our Patriarchial Society and it's ethics.
This book is a must read for every person who are confused about the true meaning of Poetic justice, gender equality and feminist view. I bet a thousand dollars this book will just blow your mind.
মজন্তালী সরকার পড়ে ভীষণ ভাল লাগল। সাম্প্রতিক কালে এত টানটান, ঠাসবুনোট উপন্যাস কমই পড়েছি। শেষের the big revelation এর impact আর একটু বিস্তারিত থাকলে একটা completeness আসত। তাই ending টা abrupt লাগল। আশা করি পরবর্তী পর্ব আসবে। কয়েকটি জায়গাতে কিছু চরিত্রের নাম আর পদবী পাল্টে গেছে। শেষের কিছু আগে (specifically page 267) একটি চরিত্রের হোমে থাকার সময়কাল 2015 পর্যন্ত লেখা কিন্তু উপন্যাসের সময় 2013। এত well researched novel এ এইরকম mistake দৃষ্টিকটু লাগল। এই বিষয়গুলি বাদ দিলে সবকিছুই দুর্দান্ত। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
টান টান উত্তেজনা ছিল প্রথম থেকেই, কিন্তু শেষ অবধি আর ধরতে পারলেন না লেখক, যেন, জেনে শুনেই ততই তড়িঘড়ি শেষ করে দেওয়া হল। মাছ খেলতে খেলতেও যেন ছিপে উঠল না। আরও ভেবে শেষ করা যেতেই পারত। আরও ১০ পাতা বাড়লেই কি খুব ক্ষতি হত? কিন্তু আমার মনে হয়েছে লেখক এখানে কাহিনির থেকে বেশি দর্শনের দিকে মাঝে মাঝেই বেশি ঝুকে পরেছেন। যেটা না বললেই নয়, লেখক যেভাবে রাজনৈতিক ব্যাপার আর রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন সেটা তার লেখনীর দক্ষতার থেকেও বেশি সাহসেরই পরিচয় দেয়। খারাপ লাগেনি, তার চেয়েও বড় কথা কিছু বক্তব্য সত্যিই ভাবতে বাধ্য করেছে, সেই দিক থেকে ভাবলে লেখক সফল। লেখকের আরও বই পড়ার আগ্রহ রইল।
The idea of this book is pretty great! The mystery, the sub-plots, the social commentary were bang on but it's easy to be on the right side at 2020 when the version of events in the book have long happened in 2013 and one has got the time to analyse and dissect and come to the right/semi-right conclusions after all these years. Had this story been published in 2014, it would have been nothing short of revolutionary.
Plus, honestly I didn't like how it ended. Kind of tanked after everything the author was building towards.
ধর্ষণ ' শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত। সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় লজ্জা হল এই ধর্ষণ। রাতের অন্ধকারকে হাতিয়ার করে প্রতিরাতেই ঘটছে নারী নির্যাতন। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষরা ন্যায় বিচারের জন্য আইন আদালত ছাড়া কার প্রতি ভরসা রাখব? কিন্তু যে রাষ্ট্রে আইন আদালত বিক্রিত , পচে গেছে সমাজ ব্যবস্থা সেখানে ন্যায়ের আশা করা পরিহাস মাত্র। ২০১৬ র এক অন্ধকার রাতে কলকাতা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যায় হত্যাকাণ্ড। হত্যালীলার পাশাপাশি অপরাধী রেখে যাচ্ছে একটা চিরকুটে নিজের পরিচয় - মজন্তালী সরকার। তদন্তে নামে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ। গোয়েন্দাদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড হয়ে চলছে। নিহতদের একটাই পরিচয় তারা প্রত্যেকেই ধর্ষক। কে এই মজন্তালী নামের ত্রাস? যার জন্য পাপীরা ভয়ে রাত দিন কাটাচ্ছে? আদৌ কি লালবাজারের গোয়েন্দাদারা পারবে মজন্তালীকে ধরতে? নাকি সর্ষের মধ্যেই ভূত? উত্তর দেবে রোহন রায়ের- ' মজন্তালী সরকার '। এবং পরিশেষে একটা কথাই বারবার করে বলি - রাতের শহরে মজন্তালীরা ফিরে ফিরে আসুক। ৪.৫/৫
বিভিন্নজনের কাছে এই বইটির নাম শুনে কিনেছিলাম গত বছর, কিন্তু সময়ের অভাবে পড়া হয়ে ওঠেনি। এক সপ্তাহ আগে পড়া শুরু করে শেষ না করে ছাড়তে পারিনি। একদম টানটান থ্রিলার। এখানে পুলিশের তদন্তের মধ্যে লেখক আমাদের ঢুকিয়ে দিয়েছেন, পদে পদে উত্তেজনা আর নতুন আবিষ্কারের চমক। এই পুলিশ প্রসিডুরাল আমাদের গোটা উপন্যাসে ধরে রাখে, এত সুন্দর করে লেখক এটা বর্ণনা করেছেন যে প্রতিটি পুলিশের চরিত্র বিশ্বাস যোগ্য হয়েছে, শেষের ব্যাপারটা ছাড়া । আমরা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডির ভেতরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপের চিত্রও বেশ ভালো ভাবে ফুটে উঠেছে। এই বইতে তথাকথিত অপরাধীর সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে করা অপরাধ গুলিকে লেখক বেশ সহানুভূতির সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন ও তার সাথে সমসাময়িক বিশেষত বছর দশেক আগে কলকাতার রাজনৈতিক চিত্র ভালো ভাবে ফুটে উঠেছে। তাই গল্পের শেষ অবধি অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায়। কিন্তু শেষের যে ঘটনা চমক হিসেবে দেখানো হয়েছে তার ফলে চমকের থেকে হতাশায় বেশি ফুটে উঠবে পাঠকের মনে। এই জন্য একটি তারা খসাতে বাধ্য হলাম। তাছাড়া উপন্যাসটি পড়ে আনন্দই পাচ্ছিলাম, কিন্তু শেষে অপরাধী কিভাবে অপরাধ গুলি করছিল বা তার পূর্ব নির্ধারিত ঘোষণার কি হলো কিছুই জানা না যাওয়ায় যার পরনায় হতাশ হয়েছি।
শুরুটা যতটা ভালো হয়েছিল, সেই আন্দাজে শেষটা একেবারেই জমল না। বড় বেশী সমাপতন আর ইন্টারলিঙ্কে ভর্তি গোটা গল্পখানা। সব চরিত্র নিজেদের মধ্যেই কোনো না কোনো ভাবে কানেক্টেড - আত্মীয়তা, পরিচিতি কিছু না কিছু রয়েছেই। ক্লাইম্যাক্সটাও বড্ড জোর করে খাপে ফেলা হয়েছে বলে মনে হলো, খানিকটা খাপছাড়াও বটে। সব মিলিয়ে মোটামুটি বলা চলে।
থ্রিলার হিসেবে চরিত্রনির্মাণ, প্লট এবং গতি বেশ ভালো, কিন্তু শেষে এসে এইভাবে ছড়িয়ে ফেলা ক্লাইম্যাক্স?! এবং সুতো গোটানোর বদলে অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্ন ফেলে রাখা - এটা একদমই পোষালো না। জানিনা এটা জোর করে সিক্যুয়েল আনার জন্য প্রকাশনীর চাপে করা কিনা - তবে কাহিনীর শেষটা একেবারেই মনঃপূত হলো না ... তীরে এসে তরী ঘাটেও ভিড়ল না, আবার ডুবলোও না পুরোপুরি...
i wish in reality we have super hero like this to clean dirtbags like those. I wish in reality men would really understand the pain women go through. the touch, the look and regarding the rape victim nothing to say.
This entire review has been hidden because of spoilers.
৪ দিলাম, সাড়ে তিন দেওয়ার উপায় নেই। গল্পটা একখণ্ডে সমস্ত উত্তরসহ শেষ হলে পাঁচ দিতাম। লেখা সাবলীল, যত্ন আছে, পেজটার্নার, ভ্যালিড প্রশ্নের পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে কথোপকথন সুন্দরভাবে এস্ট্যাবলিশ হয়েছে, কিন্তু একটু বেশি পুনরাবৃত্তি হয়ে গেছে। সেটা সাবজেক্টিভ। ওভারঅল বেশ ভালো।
গল্পের বিষয়বস্তু বেশ ভালো। গল্পও বেশ ভালো ছন্দে এগোচ্ছিল কিন্তু শেষ টা ঠিক মনঃপূত হলো না।বেশ কিছু জায়গা গল্পের মাঝে অকারণে জটিল করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। চরিত্রের নাম গুলো ভীষণ এক ঘেয়ে যে কারণে নাম গুলো মাঝে মাঝেই গুলিয়ে যাচ্ছিলো যেটা পেছনে ফিরে যেতে বাধ্য করছিলো। Overall good reading.