১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুরো দেশে কর্তৃত্ব ধরে রাখতে হলে সরকারকে হতে হয় অনেক স্ট্র্যাটেজিক। একদিকে যেমন উন্নয়নের বাণী শুনিয়ে জনগণের মন যোগাতে হয়, অন্যদিকে জনগণের মনে ত্রাসও সৃষ্টি করে রাখতে হয়। যাতে তারা প্রতিবাদ করার সাহস না দেখাতে পারে।
আর প্রতিবাদ যদি শুরু হয়েও যায়, সেক্ষেত্রে খুব সুচারুভাবে তা হ্যান্ডেল করতে হয় সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে। বাইনারি বয়ান ব্যবহার করে প্রতিবাদী কণ্ঠদের ধামাচাপা দিতে হয়। হাসিনা সরকারের সেই বাইনারি বয়ান ছিল, মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা।
প্রোপাগান্ডা আর বুদ্ধিজীবীদের কাজে লাগিয়ে দারুণভাবে অনেক সরকারবিরোধী আন্দোলনও সরকার নিজের শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছিল।
এছাড়াও গণমাধ্যমকে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করাও ছিল হাসিনার কর্তৃত্ব ধরে রাখার উপায়। গণমাধ্যমকে জনগণের হতে দেয়া হয়নি। তাদের সবসময় শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছে। যাতে হাসিনার তৈরি বয়ানটাই প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। এসবের সম্মিলনই ছিল হাসিনার ১৫ বছরের দুঃশাসন।
এই দুঃসময়েও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলাম, বই, গবেষণা লিখে গেছেন যাঁরা, তাঁদের মধ্যে সাইমুম পারভেজ অন্যতম। ‘পতনের পূর্বাপর’ বইটি মূলত ২০২১ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে লেখা তাঁর বাছাই করা কিছু প্রবন্ধ নিয়ে। বইয়ের নাম থেকেই আঁচ করা যায়, বইটি মোটাদাগে দুইভাগে বিভক্ত। একটা অংশ হাসিনার পতনের পূর্বের, অন্যটা তার পরের।
প্রথম আলো, দৃক নিউজ ইত্যাদিতে লেখা এসব কলাম বা প্রবন্ধ বেশ গবেষণা করে লেখা। হাসিনার দুঃশাসন বর্ণনায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট, বহু বিদেশি রেফারেন্সের সুন্দর মিশেল পাওয়া যায় বইটিতে, যা প্রবন্ধগুলোর মূল বক্তব্যকে জোরালো করে। হাসিনার পতন যে নিশ্চিত হয়েছিল রিগড ইলেকশনের পরপরই, তার ইঙ্গিতও পাওয়া যায় ’২৪ এর আগস্ট পূর্ববর্তী একটি লেখাতেই।
বইটি যেকোনো কর্তৃত্ববাদী সরকারের জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতি বর্ণনা করেছে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাইকোলজিক্যাল দিক থেকে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায়। তবে ইতিহাস সবসময়ই এই ধরনের কর্তৃত্ববাদী সরকারকে ধ্বংস করে গণজাগরণের মাধ্যমে, এই বিষয়টিও পুনরায় নিশ্চিত হওয়া যায়।