'বাড়ি' কি শুধুই ইঁটকাঠের এক ইমারত? বাড়িতে যারা বসবাস করে, তাদের জীবনের বয়ে চলায় কি বাড়ির কোনও ভূমিকা থাকে না? বাড়ির মধ্যে নারী-পুরুষ, তাদের প্রেম বিরহ যন্ত্রণা, তাদের জীবনের লড়াই থেকে শুরু করে সেই বাড়িরই মেয়ে 'নীপা'র জীবনে কেমন করে জড়িয়ে আছে ওদের বাড়িটা?...
মাধ্যমিকের সময় থেকে কিশোরী নীপার বেড়ে ওঠা, তার একমাত্র আশ্রয় 'মা', বিচিত্র হবু 'স্বামী' থেকে নানা রূপের প্রেমিকরা, তার বাবার পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা নতুন মা...সর্বত্র ছায়া ফেলেছে এই বাড়িটা।
এ উপন্যাস শুধু রহস্যকাহিনি নয়, শুধু প্রেমের উপাখ্যান নয়, আশ্চর্য সব ঘটনায় আলোড়িত নীপা ও তাদের বাড়িকে ঘিরে আবর্তিত এক দীর্ঘ জার্নির নাম। অভীক দত্ত ইতিমধ্যেই এক পাঠকপ্রিয় লেখক। আমরা নিশ্চিত, তাঁর বিরাট ক্যানভাসে আঁকা এই উপন্যাসও সমান সমাদৃত হবে।
মফস্বল শহর অশোকনগরে বেড়ে ওঠা। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে। ছোটবেলা থেকেই পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বইয়ের নেশা ছিল। লেখার নেশা জাঁকিয়ে বসে কলেজে পড়াকালীন৷ ওই সময়েই "আদরের নৌকা" লিটল ম্যাগ প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ। প্রথম বই ২০০৮ সালের বইমেলাতে প্রকাশিত হয় , "এক কুড়ি গল্প"। পরবর্তী কালে অফিস থেকে ফিরে ফেসবুকে লিখতে বসা এবং ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাওয়া।
গান গাইবার পাশাপাশি ঘুরতে, ফটোগ্রাফি করতে ভালবাসেন লেখক।
পড়ে যে বিশাল কিছু মনে হয়েছে তা নয়। ধুমতানাতানা কোনো থ্রিলার নয়, বিশাল প্লট টুইস্ট নেই। খুব সাদামাটা জীবনের গল্প। তবে পড়ার পর মনে হলো, এটা না পড়লে ব্যাক্তিগত জীবনের কিছু হিসেব মেলাতে গিয়ে ডাঁহা ভুল করতাম। আমার কাছে তাই এই বইটা পড়ার গুরুত্বটা ওইটুকুই — কয়েকটা বিষয় নিজেকে আবার মনে করিয়ে দেওয়া, একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করা। বাকি সাহিত্যের দিক থেকে দেখলে বইটা না পড়লেও ক্ষতি খুব কিছু নেই। তবে আমার ভালো লেগেছে তাই পাঁচতারা, নাহলে এটা অনায়াসে তিনতারা দেওয়া যায়।
বাড়ি কি শুধুই একটা ঠিকানা? নাকি তার দেওয়াল, উঠোন, প্রতিটা কোণ জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবনের সঙ্গে? এই প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখেই অভীক দত্ত লিখেছেন নীপাদের বাড়ি।
গল্পের মূল চরিত্র নীপা। মাধ্যমিকের সময় থেকে তার বেড়ে ওঠা এই বইয়ের মেরুদণ্ড। একমাত্র ভরসার জায়গা তার মা। বাবা নতুন সংসার পেতেছেন অন্যত্র। জীবনে এসেছেন নানা রূপের প্রেমিক, বিচিত্র সব সম্পর্ক। আর এই পুরো যাত্রায় ছায়ার মতো পাশে থেকেছে সেই বাড়িটা। বাড়িটা শুধু পটভূমি নয়, সে নিজেই একটা চরিত্র।
লেখক নিজেই বলেছেন এটা একটা "দীর্ঘ জার্নি"। থ্রিলার নয়, চমকদার প্লট টুইস্ট নেই। এটা একটি মেয়ের জীবনের স্বাভাবিক বয়ে চলার উপন্যাস।
বইটির মূল থিম দুটো। এক, একটি বাড়ির সঙ্গে তার বাসিন্দাদের অলিখিত সম্পর্ক। দুই, একজন নারীর বড় হওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং তারপরও টিকে থাকা।
প্রথম থিমটার মধ্যে বেশ চমৎকার একটা ভাবনা আছে। ঘর কীভাবে মানুষের স্মৃতি ধরে রাখে, কীভাবে একটা পরিবারের ভাঙন বা জোড়া লাগার সাক্ষী হয়ে থাকে চুপ করে, সেটা নিয়ে অভীক দত্তের আগ্রহ স্পষ্ট। এই ভাবনাটা কাজও করে, বিশেষত প্রথম দিকে।
কিন্তু ২২৪ পৃষ্ঠার বিস্তারে এই থিম সবসময় সমান ধার বজায় রাখতে পারেনি। কিছু অংশে গল্প সরলরৈখিক হয়ে যায়, টানা জীবনের ঘটনাপ্রবাহ, কিন্তু সেখানে যে গভীরতা বা চমক দরকার ছিল সেটার ঘাটতি অনুভব হয়।
অভীক দত্ত ফেসবুক-পাঠকদের কাছে প্রিয় লেখক। তাঁর গদ্যে একটা স্বাভাবিক প্রবাহ আছে, পড়তে বসলে আটকে যেতে হয় না। কিন্তু এই সাবলীলতাই কখনো কখনো গভীরতার জায়গা নিয়ে নেয়। কিছু দৃশ্য বা অনুভূতি আরেকটু থিতু হলে আরও দাগ কাটতে পারত।
নীপার চরিত্রটা ভালো সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে। তার বেদনা, তার একাকিত্ব, তার মায়ের উপর নির্ভরতা, এগুলো believable। কিন্তু ২২৪ পৃষ্ঠা জুড়ে তাকে বহন করতে গিয়ে কিছু জায়গায় চরিত্রটা একটু সমতল হয়ে পড়ে। পাঠকের কাছে কিছু মুহূর্ত "চর্বিত চর্বন" মনে হওয়াটা তাই অস্বাভাবিক নয়।
বইয়ের শারীরিক মান ভালো। অলংকরণ প্রশংসার দাবি রাখে।
এখানে সততার সাথে বলা দরকার। Goodreads-এ রেটিং মিশ্র, ৩.১২। পাঠকদের মধ্যে কেউ বলেছেন এটা তাদের ব্যক্তিগত হিসাব মিলিয়ে দিয়েছে, কেউ মাঝপথেই থামিয়ে দিয়েছেন। এই বিভাজনটাই বইটার সবচেয়ে সৎ মূল্যায়ন।
নীপাদের বাড়ি সেই পাঠকের জন্য যিনি শান্ত, ধীর একটা জীবনের গল্প পড়তে চান, কোনো নাটকীয়তার প্রত্যাশা ছাড়াই। অভীক দত্তের আগের লেখায় যাঁরা মুগ্ধ, তাঁরা একটা সুযোগ দিতে পারেন। কিন্তু যাঁরা ঘটনাবহুল কাহিনি বা মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা খুঁজছেন, তাঁরা হতাশ হতে পারেন।
বইটা পড়া যায়। কিন্তু পড়া না হলে খুব বড় কিছু মিস হয়ে যাওয়ার ভয় নেই।