বনগাঁর দিকে একটা গ্রাম্য স্টেশনে রাতের অন্ধকারে খুন হয় একজন। আততায়ীকে সে কি চিনতে পেরেছিল মৃত্যুর আগের মুহূর্তে? খুন হয় আরও কিছু মানুষ। যার মধ্যে একজন বিখ্যাত সোশাল ওয়ার্কার, জনদরসী মানুষ অরণ্য ওইও আছেন। ফলে উত্তপ্ত হয় রাজ্য রাজনীতি। সুনেত্রা একজন স্কুল টিচার। সবদিক থেকে পারদর্শী মেয়েটার জীবনে একটাই খামতি। সেই থামতির জনাই তার জীবনের সম্পর্কের সমীকরণগুলো সব পালটে যায়। কোনোদিন কি সেই খামতি পূরণ হবে? হবে কোনো ম্যাজিক। এনজিওর চাকরি নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে আসে খুশি। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে তার আর খোঁজ পাওয়া যায় না। তার মা গ্রামের বাড়িতে একাই অস্থির হয় মেয়েটার জন্য। কে খুঁজে দেবে খুশিকে? কী হল ওর সাথে? দ্বৈতা সান্যাল। লালবাজার হোমিসাইড বিভাগের এক অফিসার। তার খুব ইচ্ছা একটা সংঘাতিক কেন সলভ করবে সে। শেষমেশ কি এমন কোনো কেসেই জড়িয়ে পড়বে দ্বৈতা? এই শহরের অন্দরে কোথাও কি ঘটে চলেছে গহীন কোনো অপরাধ? সুনেত্রা, খুশি, দ্বৈতা সবাই কীভাবে এক সূত্রে গাঁথা পড়বে?
বাংলা সাহিত্যের রহস্য রোমাঞ্চের গণ্ডি যখন গতানুগতিক ছক কাটার পরিশ্রমে ক্লান্ত, ঠিক তখনই লেখিকা অমৃতা কোনারের 'মায়াজাতক' এক পশলা সতেজ বাতাসের মতো হাজির হয়েছে। দীর্ঘকাল যাবৎ বাংলা সাহিত্যে 'সায়েন্টিফিক থ্রিলার' বা 'মেডিকেল থ্রিলার' এর যে খরা অনুভূত হচ্ছিল, এই উপন্যাসটি সেই শূন্যস্থানে কেবল তালি দেয়নি, বরং এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জটিল রসায়নকে লেখনীর নিপুণতায় যখন গল্পের মূলস্রোতে মেশানো হয়, তখন পাঠক হিসাবে এক অনন্য বৌদ্ধিক রোমাঞ্চের স্বাদ পাই।
গল্পের সূত্রপাত এক আপাত শান্ত মফস্বলী জনপদে ঘটে যাওয়া কিছু নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। তারপর প্রখ্যাত সমাজসেবী অরণ্য গুহর খুনের ঘটনায় যখন জনমানসে চাঞ্চল্য তুঙ্গে, তখন তদন্তের ভার পড়ে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা দ্বৈতা সান্যালের ওপর। দ্বৈতা চরিত্রটি এই উপন্যাসের এক প্রধান আকর্ষণ। বাংলা সাহিত্যের বহু গোয়েন্দার মধ্যে যে অতিমানবিক বা অবাস্তব বীরত্ব লক্ষ্য করা যায়, দ্বৈতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। লেখিকা তাকে কোনো 'সুপারহিরো' হাইপ দিয়ে উপস্থাপিত করেননি। বরং দ্বৈতা আমাদের পাশের বাড়ির সেই মেয়েটির মতো যাকে প্রতিনিয়ত বিয়ের জন্য পরিবারের চাপের সম্মুখীন হতে হয়, যে ভালো তদন্ত না এলে বিষণ্ণতায় ভোগে এবং যার আবেগগুলো অত্যন্ত রক্তমাংসের। তার তদন্ত প্রক্রিয়া কোনো জাদুকরী চমক নয়, বরং নিখাদ বিজ্ঞানসম্মত তথ্য বিশ্লেষণ এবং ঘটনার পরম্পরাকে যৌক্তিকভাবে সাজিয়ে তোলা। তথ্যের প্রতিটি সুতো ধরে তিনি এগিয়ে চলেন রহস্যের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। উপন্যাসটির বুননশৈলী অত্যন্ত চমৎকার; যা অনেকটা ডালিয়া ও গাঁদা ফুলের নিঁখুত মালার মতো বৈচিত্র্যময় অথচ একসূত্রে গাঁথা। কৃত্রিম প্রজনন বিদ্যার মতো আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে যখন অশুভ শক্তির করাল গ্রাস বিস্তৃত হয়, তখন যে ভয়াবহ মায়াজাল সৃষ্টি হয় তাই এই কাহিনীর উপজীব্য। লেখিকা এখানে নিপুণভাবে দেখিয়েছেন, বিজ্ঞানের নৈতিকতা আর মানুষের সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে। বইটির পাতায় পাতায় চিকিৎসা বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম বর্ণনা যেমন লেখিকার গভীর গবেষণার পরিচয় দেয়, তেমনই মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের আবেগ ও সংস্কারের চিত্রায়ন গল্পটিকে শিকড়ের টান জোগায়। একটি এনজিওর নিখোঁজ মেয়ে থেকে শুরু করে নিঃসন্তান দম্পতির হাহাকার সব মিলিয়ে এটি কেবল একটি রহস্যগল্প নয়, বরং মানুষের অস্তিত্ব আর বিজ্ঞানের সীমারেখা নিয়ে এক গভীর দার্শনিক অভীপ্সা। যাঁরা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নতুন ঘরানার বাংলা থ্রিলারের স্বাদ পেতে আগ্রহী, তাঁদের কাছে 'মায়াজাতক' এক অনিবার্য গ্রন্থ। আধুনিক প্রযুক্তির অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা ভয়াল বাস্তবতাকে চিনতে হলে এই মায়াজালের অন্দরে প্রবেশ করা একান্ত প্রয়োজন। লেখিকা অমৃতা কোনার প্রমাণ করেছেন, মেধা এবং পরিমিতিবোধের সঠিক মিশেল থাকলে বাংলা থ্রিলারও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।।