আমরা ভীষণভাবে মোবাইল ফোন বিশেষ করে স্মার্টফোন ডিপেন্ডেন্ট হয়ে গেছি এই মুহূর্তে। বাস থেকে ট্রেনে, যেখানেই যাই, সর্বত্র সবাই ফোনে মুখ গুঁজে বসে আছে। বিকেলে খেলার সাথীরাও কমে যাচ্ছে। ছোটোদের হাতেও এখন মোবাইল ফোন। ফোন নির্ভরতা এখন এতটাই বেড়ে গেছে, ফোনটা এখন আর আমাদের শুধুমাত্র কারও সঙ্গে কথা বলার মাধ্যম নয়। ব্যাঙ্কিং, ম্যাপ দেখা থেকে শুরু করে সব কিছুই যন্ত্রটার দখলে চলে গেছে। ঠিক এই জায়গা থেকে এ কাহিনি লেখার সূত্রপাত। কী হবে, যদি কেউ মোটা টাকার বিনিময়ে আমাদের হাতের ফোনটা নিয়ে নেয়? আমরা কি পারবো স্মার্টফোন ছাড়া থাকতে? দেখা যাক…
মফস্বল শহর অশোকনগরে বেড়ে ওঠা। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে। ছোটবেলা থেকেই পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বইয়ের নেশা ছিল। লেখার নেশা জাঁকিয়ে বসে কলেজে পড়াকালীন৷ ওই সময়েই "আদরের নৌকা" লিটল ম্যাগ প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ। প্রথম বই ২০০৮ সালের বইমেলাতে প্রকাশিত হয় , "এক কুড়ি গল্প"। পরবর্তী কালে অফিস থেকে ফিরে ফেসবুকে লিখতে বসা এবং ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাওয়া।
গান গাইবার পাশাপাশি ঘুরতে, ফটোগ্রাফি করতে ভালবাসেন লেখক।
বর্তমান সময়ে আমরা সবাই ভীষণ ভাবে স্মার্টফোনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণে নেতিবাচক পরিণতি জানা সত্ত্বেও তা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারি না। এতোগুলো কথা বলার কারণ, এই উপন্যাস ❝মৃত্যুর থাবা❞ লেখক ‘অভীক দত্ত’। এখানে উপন্যাসের গল্পটা একটু আলাদা, শহর কলকাতার বেশ কিছু ছেলেমেয়ে কে টার্গেট করে একটা অফার দেওয়া হচ্ছে - (পাঁচ কোটি টাকার) শর্ত, জীবনে আর কখনো স্মার্টফোন ইউজ করতে পারবে না। কোনো সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইট ইউজ করতে পারবে না। আর এই মুহূর্তে নিজের ব্যাবহার করা স্মার্টফোনটি ওনাদের হাতে তুলে দিতে হবে। সাথে একটা কন্ট্রাক্ট পেপার ও সিগনেচার করতে হবে, তাতে লেখা রয়েছে “আপনি যদি আমাদের এই শর্ত গুলো না মানেন তবে আপনাকে গুলি করে উড়িয়ে দেওয়া হবে”! কন্ট্রাক্ট পেপারে সিগনেচার করে দিলে, সাথে সাথেই পাঁচ কোটি টাকা অ্যাকাউন্ট এ চলে আসছে, এবং সাথে একটি কিপ্যাড ফোন। ঠিক এই জায়গা থেকে এ গল্পের সূত্রপাত। কী হবে, যদি কেউ মোটা টাকার বিনিময়ে আমাদের হাতের ফোনটা নিয়ে নেয়? আমরা কি পারবো স্মার্টফোন ছাড়া থাকতে? জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে। দুর্দান্ত একটি থ্রিলার..... এই উপন্যাসটির অডিও Youtube Available রয়েছে, চাইলে আপনারা সেখান থেকে শুনে নিতে পারেন। তবে হ্যাঁ বই পড়ার একটা আলাদাই মজা...... প্রতিটি পেজ উল্টে উল্টে পড়ে উপলব্ধি করা, কল্পনা করা, সেটাকে একদম নিজের মতো করে ভাবা এই জিনিসটা অডিও তে মেলে না! পেজ কোয়ালিটি, বইয়ের বাধাই, সাথে দুর্দান্ত একটি প্রচ্ছদ পাঠকের মন ধরতে বাধ্য। বুক ফার্ম থেকে বইটি প্রকাশিত হয়েছে। মূল্য ₹২৭৫
আচ্ছা ধরুন আপনার ভীষণভাবে পয়সার প্রয়োজন বাজারে প্রচুর ধার দেনা, বা আপনার জন্মই হয়েছে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সারা জীবন সবার দামি জিনিস দেখেই আপনার জীবন কেটেছে। হঠাৎ করে এক লোক আপনার কাছে এক অভিনব ডিল নিয়ে হাজির হলেন, সে আপনাকে বললেন তাদের কোম্পানি একটি সমীক্ষা করছে এবং তাতে আপনাকে কয়েক কোটি টাকা তার দেবে ,তার পরিবর্তে আপনাকে আপনার স্মার্টফোনটি কোনরকম ফরম্যাট ছাড়াই তাদের কাছে জমা দিতে হবে এবং তাদের দেওয়া কি-প্যাড ফোনটি ব্যবহার করতে হবে। এবং আপনি যদি কোন স্মার্ট ডিভাইস বা কোন স্মার্টফোন ব্যবহার করেন তবে তার কোম্পানির লোক আপনাকে মেরে ফেলতে একবারও ভাববে না। স্বভাবতই সারা জীবন পয়সার পিছনে ছোটা আপনি কোন কিছু চিন্তা না করেই টাকাটা নিয়ে নেবেন এবং ভাববেন ফোন ছেড়ে থাকা কোন ব্যাপারই না কিন্তু সময় যাতে এগোতে থাকবে আপনি বুঝতে পারবেন যে আপনি ফোন ছাড়া থাকতে পারছেন না এবং কোন কিছু চিন্তা না করেই একটা ফোন নিয়ে নেবেন এবং হঠাৎ করেই এক তীব্র যন্ত্রণায় আপনার মৃত্যু হবে। সারা কলকাতা জুড়ে হঠাৎ করে কতগুলো খুন হচ্ছে এবং খুনগুলো হচ্ছে মেইন রোডের উপরে এবং খুন করার পরে খুনি আততায়ীর গায়ে একটি ফরম্যাট স্মার্টফোন ছুড়ে পালিয়ে যাচ্ছে এবং সব থেকে অবাক করা ব্যাপার আজকালকার এই সিসিটিভির যুগে কোন ভাবে খুনী কে সনাক্ত করা যাচ্ছে না, একদিন শুভ্র সাথে এক ভদ্রলোকের দেখা হয় তিনি জানান সে যদি তার ফোনটি তাকে দেয় তবে সে তাকে ৫ কোটি টাকা দেবে, স্বাভাবিকভাবে কর্পোরেট শ্রমিক শুভ্র কিছু না ভেবেই তার ফোনটি দিয়ে দেয় এবং সারা জীবন টাকার পেছনে ছোটা ছেলেটি নিজের ব্যাঙ্ক একাউন্ট কতগুলো টাকা দেখে স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ আপ্লুত হয়ে পড়ে এবং আস্তে আস্তে সে ভাবতে থাকে সে টাকাগুলো নিয়ে কি করবে হঠাৎ করে সে ঠিক করে সেই এয়ারপোর্টে গিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবে এবং এয়ারপোর্ট যাওয়ার পথেই তার দেখা হয় একটি মেয়ের সাথে যে স্মার্টফোনের যুগে একটি কি-প্যাড ফোন ইউজ করছিল তাকে দেখে শুভ্র বুঝতে পারে মেয়েটি সেই একই সমীক্ষার একজন। এবং তারা দুজনে একসাথে পাহাড়ে যায় এবং মেয়েটি নিজের স্মার্টফোনের নেশাকে ধরে রাখতে না পেরে হঠাৎ করে একটা ফোন কিনে ফেলে, এবার কি হবে পাহাড়েও কি ওই সমীক্ষার লোকজন তাদের খুঁজে পাবে নাকি শুভ্র কোন ভাবে মেয়েটিকে বাঁচিয়ে ফেলবে? এই সমীক্ষাগুলো করছে কারা বা তারা এত টাকা পাচ্ছে বা কোথা থেকে ? কলকাতার গোয়েন্দা পুলিশ কি এদের মাথাকে ধরতে পারবে , নাকি সেও বিক্রি হয়ে যাবে টাকার কাছে?সেটা জানতে হলে সম্পূর্ণ উপন্যাসটি পড়তে হবে। এই গেল উপন্যাসের কথা এবার আসা যাক উপন্যাসটি পড়ে আমার কেমন লাগলো, অসাধারণ একটা কনসেপ্ট এবং আজকাল আমাদের এই স্মার্টফোনের নেশা কি মারাত্মক নেশা এবং তার ফলে মানুষ যে নিজের জীবনের ও মায়া করছে না সেটা হয়তো আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমাদের স্বাভাবিক বোধ বুদ্ধি কে নষ্ট করে দিচ্ছে এই স্মার্ট ডিভাইস গুলো। এবং তার সাথে অভীক দত্তের টানটান লেখনি উপন্যাসটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। আরেকটা কথা যেটা না বললেই নয়, আমি অভীক দত্তের কি লেভেলের ফ্যান যারা আমাকে পার্সোনালি চেনেন তারা সবাই জানে। আমার কাছে অভীক দত্তের বইয়ের একটা আলাদা কালেকশনে আছে। তো আসল কথায় আসা যাক এবার বই মেলায় বইটি কিনে অভীক দার কাছে যাই সই করানোর জন্য এবং অভীক দা আমাকে দেখে বইটিতে আমার নাম সই করে, এটা একটা ফ্যান গার্ল হিসেবে যে কি পাওনা তা সত্যি ই কথায় প্রকাশ করার মতো নয়।
নতুন প্রজন্মের লেখকদের মধ্যে অভীক দত্তের লেখনীতে যেমন রয়েছে বাস্তবতা, তেমনি রয়েছে রহস্য ও মনস্তত্ত্বের গভীর মিশ্রণ। "মৃত্যুর থাবা" তাঁর সাম্প্রতিক সৃষ্টি, যেখানে মৃত্যু শুধু একটি পরিণতি নয় বরং একটি উপস্থিত সত্তা, যা ছায়ার মতো ঘিরে থাকে গল্পের প্রতিটি চরিত্রকে।
উপন্যাসটি রহস্যের ছোঁয়া নিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে এক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দিকে টেনে নিয়ে যায়। লেখক এখানে মৃত্যুকে শুধু ভয় বা আতঙ্কের রূপে দেখাননি। বরং Reel life আর real life এর মাঝে হাবুডুবু খাওয়া উদ্দেশ্যহীন মানবসমাজের এক অস্তিত্বমূলক প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। অভীক দত্ত লিখেছেন - "মানুষ একে অপরের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক মানুষকে আর সোশ্যাল করছে না।" খেলার মাঠ, বই, প্রেম, কাছের মানুষের স্পর্শের আকুতি এসবই যেনো স্মার্টফোনের স্ক্রিনের কারাগারে বন্দী রেখে কিসের অলীক সুখ খুঁজে চলছি আমরা নিজেরাও জানিনা বোধ হয়।
উপন্যাসটির সহজ ভাষা, গতিশীল ঘটনাপ্রবাহ এবং গল্প বলার ধরনটি যথেষ্ট মনোগ্রাহী। পাঠককে ধরে রাখার দক্ষতা আছে তাঁর কলমে। তবে কিছু জায়গায় প্লট একট�� ছড়ানো। শেষভাগে গতি কিছুটা তাড়াহুড়ো মনে হয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে উপন্যাসটি একটি সুখপাঠ্য।
“মৃত্যুর থাবা” এক আধুনিক থ্রিলার, যেখানে মৃত্যুর রূপ একাধিক মাত্রা পায়। প্রবহমান বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার জন্য লেখক অভীক দত্ত কে অনেক শুভকামনা, ভালোবাসা।