শিশু যখন ছোটো। তখন তার ভাষা নেই। মা-বাবাই পর্যবেক্ষণের আওতায় রাখেন। তার কথা বোঝেন ও বলেন। শিশু ওঁয়া বললে, মা বলেন, খিদে পেয়েছে সোনা?
তেমনই, নিত্যকার চলার পথে, যা লক্ষ করি, যা শুনি, সেগুলিই তুলে ধরা। সাধারণ মানুষের সাধারণ কথা, ছোটো ছোটো সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না- যাদের বলার মধ্যে গৌরব নেই, গ্লানি নেই, চাকচিক্য নেই। এ সেই পথের গল্প, পথে পড়ে-থাকাদের গল্প। দ্বিতীয়বার ফিরে তাকালে, যাদের থেকে মহাকাব্যের সূচনা হতে পারত!
✒️ পান্থপাদপ: শেষ না হওয়া গল্পেরা / তমোঘ্ন নস্কর ▪️শব্দ প্রকাশন / ৩৫০ টাকা
_________________________________________
পান্থপাদপ অর্থাৎ পথিকের জন্য যে গাছ বা পথিকের গাছ, Travellers' tree. তৃষ্ণার্ত পথিকের জন্য পথমধ্যে যে গাছ নিজের কান্ডে জল সঞ্চয় করে রাখে। লেখক তমোঘ্ন নস্কর, তার এই সংকলনটির পথ এমনভাবেই যেন সাজিয়ে রেখেছেন পান্থপাদপ-এর মত বিশেষ প্রজাতির কিছু গল্প দিয়ে। বর্তমানের এই ঘোর অন্যায়-অনাচার, অসহিষ্ণুতা, অসহায়তার মাঝে পাঠক যাতে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন এবং পান একটু শান্তির খোঁজ। পান আশ্বাস, ভালোবাসা, বিশ্বাসে জারিত হওয়া সম্পর্কগুলির পুনর্মুল্যায়নের অবসর। লেখক বলেছেন গল্পগুলি শেষ না হওয়া গল্প, নিত্যকার চলার পথে, যা তিনি লক্ষ করেছেন, শুনেছেন, সেইসব পথের ধারের পড়ে থাকা গল্প, যাদের দিকে দ্বিতীয়বার ফিরে তাকালে হয়তো মহাকাব্যের সূচনা হতে পারত। এখানেই তাঁর লেখনীর সার্থকতা। চিরপরিচিত এবং চির অভ্যস্ত সম্পর্ক এবং ঘটনাগুলির সামনে তিনি পাঠককে নিঃশব্দে দাঁড় করিয়ে দেন। বাকিটা পাঠকের বা এই কাহিনির পথিকের জন্য বরাদ্দ, তিনি কীভাবে সেই গল্পটি শেষ করতে চান বা দেখতে চান। লেখক আড়াল থেকে তাকে গাছটির সন্ধান দিয়েই নিরুদ্দেশ।
গল্পগুলি আয়তনে অণুগল্পের ধাঁচের। নামকরণ এবং যথোপযুক্ত প্রচ্ছদ থেকেই ধারণা পাওয়া যায় লেখক কেমন ধারার গল্প আমাদের বলতে চেয়েছেন। পরিচিত বৃত্ত, দৈনন্দিন স্থূল জীবনযাত্রার মধ্যে থেকেই লেখক গল্পগুলি ধার করেছেন এবং মায়া ভালোবাসা যত্নে মুড়িয়ে পেশ করেছেন। ব্যক্তিগতভাবে সব গল্পগুলিই কমবেশি আমার ভালো লেগেছে। বর্তমানের এই জড় সময়ে সত্যিই যেন এই সংকলনটির ছায়ার বড় প্রয়োজন ছিল। এই ধরনের টুকরো টুকরো গল্পের বা লেখার সংকলন আগেও পড়েছি, প্রসঙ্গত মনে পড়ে রাজা ভট্টাচার্যের 'ভারতবর্ষ' বইটির কথা, যদিও তমোঘ্ন নস্করের সংকলনটির কাহিনিগুলি ভিন্নমুখী এবং কিছুটা অন্য ধরনের।
বেশ কিছু জায়গায় লেখকের বাক্যের গঠন এবং বিন্যাস আমার একটু দুর্বল মনে হয়েছে। এবং ব্যাক্তিগতভাবে বইটির ভিতরের স্পেসিং বা সাজানো আমার ঠিক পছন্দ হয়নি, মনে হয়েছে বইটির পৃষ্ঠাসংখ্যা এবং মূল্য দুটিই সেই কারণে যেন কিছুটা অনাবশ্যক এবং অতিরিক্ত। সুমন সরকারের প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর এবং আকর্ষণীয়, রাভেনালা প্রজাতির এই বিশেষ বৃক্ষের ছবিটি তিনি যেমন সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছেন, তা ভীষণভাবেই অর্থবহ এবং আকর্ষক লেগেছে। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য্য আমার প্রিয় শিল্পী, তাঁর অলংকরণ অনবদ্য, কিন্তু আরেকটু বেশি হয়তো তাঁর অলংকরণ এই বইতে ব্যবহার করা যেত, অনুরাগী হিসেবে তা আমার মৃদু অভিযোগ। তাঁর অলংকরণগুলি লেখাবিশেষে অনিয়মিত বা কোন নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স মেনে করা হয়নি, আরেকটু সংখ্যায় বেশি হলে অন্ততঃ যে পরিমাণ ফ্রি স্পেস বইটিতে আছে, তা ভরাট করা যেত বলে মনে হয়। তবে মোটের উপর তমোঘ্ন নস্করের এই ব্যতিক্রমী প্রয়াস আমাকে পাঠক হিসেবে আলাদাই এক তৃপ্তি এবং শান্তি দিয়েছে। পাঠক, পান্থপাদপ পড়ে দেখুন। আশা করি ভালো লাগবে। প্রিয় একটি গল্প তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারি না।
|| দুধের দাম ||
২০০৮-৯, সাহেবগঞ্জ ল্যুপে ফিরছি। গাদাগাদি ভিড়। পাদানিতে বসেই অগত্যা যাত্রা। পেছনে এক মা আর ছেলে দরজায় হেলান দিয়ে বসে। সাথে একটা ব্যাগ, ফাঁকা জলের বোতল আর মেরি বিস্কুট।
ছেলের খিদে পায়, মা বিস্কুট দেন। ফাঁকা বোতলটায় ট্যাপ থেকে জল ভরে দেন।
দুপুর গড়ায়, ছেলে কাঁদে তারস্বরে। মা বুক খোলেন স্তন্য দেবার জন্য। আমি শশব্যস্তভাবে ভাবে উঠে যেতে চাইলুম। মা বললেন, “থাক ক্যানে। লাজের কী আছে? দুধটোই দিসি অন্যকিছু তো লয়। ও তুও খেয়েছিস। ভালো করে খেতে পাই না। এ শুকনো দুধ মা'য়ের রে বাপ... এতে লজ্জা নাই।”
তমোঘ্ন নস্করের "পান্থপাদপ" একটি অসাধারণ সাহিত্যকর্ম, যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় মিশে আছে জীবনের অসংখ্য গল্প, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতা। এটি কেবল একটি সাহিত্যিক সৃষ্টি নয়, বরং সমাজের গোপন কাহিনী এবং মানবিক অনুভূতির একটি গভীর প্রতিবেদন।
তাঁর লেখায় প্রতিটি শব্দ যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে—একটি প্রবাহিত গাছের রূপে। এখানে কোনো কল্পবিজ্ঞান বা থ্রিলারের উপাদান নেই, বরং রয়েছে আমাদের চারপাশের বাস্তবতার একটি নিখুঁত চিত্রায়ণ। তিনি বিশ্বাস করেন যে দৈনন্দিন জীবনের অনাবিষ্কৃত দিকগুলোই আসলে আমাদের জীবনের গভীরতা এবং জটিলতা বোঝাতে পারে।
"পান্থপাদপ" আমাদের সেই অনুভূতির দিকে পরিচালিত করে যা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। প্রতিটি গল্পের মধ্যে আমরা দেখি বিভিন্ন মানুষ, তাদের যন্ত্রণাসমূহ এবং সেই যন্ত্রণার বেদনাময় কাহিনী। লেখক প্রতিটি চরিত্রের অন্তরে প্রবেশ করে তাদের অধিকার, লজ্জা এবং ক্ষুদ্র অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তোলেন। গল্পগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বেঁচে থাকা মানে কেবল শারীরিক অস্তিত্ব নয়; বরং তা একটি গভীর অন্তর্দর্শনের অভিজ্ঞতা, যেখানে দুঃখ ও আনন্দের সীমানা নেই।
এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে সাহিত্য কেবল বিনোদন নয়, বরং মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রবাহিত এক প্রবাহ—যা পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি, দুঃখ এবং আনন্দকে একসঙ্গে মিলিত করে। তাঁর লেখনী আমাদের শেখায় যে গল্পগুলো শেষ হয় না, বরং তারা আমাদের মনে দাগ কেটে থেকে যায়। এবং আমাদের জীবনকে নতুন অর্থ ও দিশা দেয়।
প্রকাশনার ক্ষেত্রে, কন্টেন্টের গুণগত মান যেমন জরুরি, তেমনই তা উপস্থাপনও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সুমন সরকার প্রদত্ত প্রচ্ছদটি খুবই ভালো। স্যার ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলংকরণসমূহও অত্যন্ত উৎকৃষ্ঠ, তবে তাদের পরিমাণ এতটাই সীমিত যে তা মানসিক তৃপ্তি প্রদান করে না।
তবে, আপামর পাঠকদের জন্য একটি বিনীত আহ্বান—"পান্থপাদপ" পড়ুন এবং তমোঘ্ন নস্করের সৃষ্টি করা এই সাহিত্যিক বৃক্ষের ছায়ায় বসে নিজের জীবনের গল্পের নতুন রং খুঁজে নিন। এই বইটি এমন এক স্থান যেখানে প্রতিটি পাঠক তার অজানা অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হতে পারে এবং সামাজিক বাস্তবতার নিগূঢ়তাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।