পান্থপাদপ: ধুলোমাখা পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ অলৌকিকতা
আলোচনার উৎসমুখ:
একটা নিদাঘ গ্রীষ্মের দুপুর। শহরের কংক্রিট গলিয়ে দেওয়া রোদ মাথার ওপর খাড়া। ক্লান্ত শরীর, হেমন্তবেলার মন। রিকশার চাকা ঘুরছে ধীরে, দূরে কুকুর ঘুমোচ্ছে ছায়ায়। ঠিক এমন এক সময়ে, মনে হয়—কোথাও থামতে হবে। একটু বসতে হবে। বিশ্রাম নয়, আশ্রয় চাই।
ঠিক তখনই যেন দেখা মেলে এক অদ্ভুত গাছের। পান্থপাদপ। গায়ে ধুলো জমেছে, পাতায় ক্লোরোফিলের ক্যানভাসে আঁকা একেকটা গল্প। কাণ্ডে জল ধরে রাখা গাছ, নিজের দিকে কোনো দাবি নেই, কেবল দাঁড়িয়ে থাকে পথিকের মুখ তুলে চাওয়ার অপেক্ষায়।
তমোঘ্ন নস্করের পান্থপাদপ এমনই এক সাহিত্যের বৃক্ষ। যেখানে ক্লান্ত পাঠক থেমে পড়ে, নিশ্বাস নেয়, চোখ মুছে নেয়, আর কল্পনায় পান করে এক চুমুক স্মৃতি আর বেদনার জল।
এই বই কোনও হাইপার-ন্যারেটিভ থ্রিলার নয়। এখানে নেই কোনও কল্পবিজ্ঞান, ড্রাগন, রহস্য উন্মোচনের বাজনাবাজি।
এখানে নেই কোনও মহানায়ক, সুপারপাওয়ার কিংবা মহা-উপসংহার।
যা আছে, তা হল অসাধারণ দৈনন্দিনতা।
নীরব, অনাবৃত, অথচ হৃদয়-নাড়িয়ে দেওয়া গল্পেরা—যাদের আমরা প্রতিদিন পাশ কাটাই, চোখে দেখি না, কানে শুনি না। কিন্তু তারা থাকে। নিঃশব্দে।
তমোঘ্ন নস্কর সেই নীরব গল্পগুলোর ব্যাকরণ রচনা করেছেন, যেন নিজেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন, জুতোয় ধুলো, চোখে জিজ্ঞাসা, কুড়িয়ে নিচ্ছেন কথামালা— কখনও কেঁদে ফেলছেন চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে, কখনও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি।
এই বইয়ের প্রতিটি গল্প এমন এক অদ্ভুত কল্পসন্ধ্যা— যেখানে সূর্য অস্ত যায় কিন্তু আলো নিভে না, যেখানে শেষ না হওয়া গল্পেরা পাঠকের কাঁধে হাত রাখে, আর বলে— "এই পথটা তোমারও হতে পারত।"
তমোঘ্ন যেন আমাদের জানিয়ে দেন— সাহিত্য কেবল যুদ্ধ-বিজয়-রাজনীতি-দর্শনের শৃঙ্গ নয়, সাহিত্য হল রাস্তার পাশের ধুলোমাখা বুড়োর হাতের কাঁচা গাজর, এক বাচ্চা মেয়ের আঁকা উল্টোপাল্টা বাড়ি, এক পরিত্যক্ত স্টেশনের বেঞ্চে বসে থাকা স্বপ্ন।
পান্থপাদপ সেইসব গল্পের গাছ—যেটা ফল দেয় না, ছায়া দেয়; রোদে পোড়ে, তবু অন্যকে আশ্রয় দেয়।
এটা একটা বই নয়, এটা একটা অনুভূতি— যা ফেলে আসা শহরের, ছেড়ে আসা বাড়ির, অথবা ফিরে না পাওয়া চিঠির মতো হৃদয় ছুঁয়ে থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।
এখানে প্রতিটি গল্প একেকটি পাতার মতো— যা বাতাসে উড়ে যায়, কিন্তু একবার চোখে পড়লে আর ভোলা যায় না।
এই গ্রীষ্মেও যদি কোনও অলৌকিক গাছের ছায়ায় বসে, তোমার কান্না এক বিন্দু হালকা হয়, তবে জেনে রেখো— তুমি পান্থপাদপ পড়েছ।
তুমি তার গল্পের ছায়ায় থেকেছ।
আর একবার ছায়া দিলে, এই গাছ আর ভুলতে দেয় না।
বিশদে:
(১) তরঙ্গের মতো গল্পেরা: জলছাপে লেখা অনুভূতির অভিঘাত
একটা অণুগল্পে কতটুকু বলা যায়? দুটো অনুচ্ছেদ, মাত্র কয়েকশো শব্দে কীভাবে সৃষ্টি হয় মহাকাব্যিক অভিঘাত? তমোঘ্ন নস্করের পান্থপাদপ তারই নিঃশব্দ কিন্তু জোরালো জবাব।
“দুধের দাম”, “বিপত্তারিণী”, “গৌরি-শ্যামা”, “মাতা মেরি ও ব্যর্থ শহর”— প্রতিটি গল্প যেন জলছাপ। ক্ষণিকের আলোর মতো আসে, স্পষ্ট হয়, আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু তার ছাপ রয়ে যায় কাগজের ভিতরেও, আর পাঠকের চেতনার অন্তর্লীন পরিসরে।
এমনভাবে লেখা এই গল্পগুলি, যেন লেখক নিজেই জানেন না তিনি শুরু করছেন এক নতুন কাহিনি, না কি তিনি খুলে দিচ্ছেন পাঠকের মনে বয়ে চলা কোনো পুরোনো নদীর ধারা।
পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে বারবার মনে হয়: “এই গল্পটা তো কোথাও শুনেছি… না, এ তো আমার নিজের জীবন!” এই আত্মচিহ্ন খোঁজার সৌন্দর্যই তো ছোটগল্পের সত্যিকারের সার্থকতা।
এখানেই তুলনা চলে আসে আরেক অমর কথাকার—বনফুলের সঙ্গে। বনফুলের মাইক্রো-গল্পগুলোর মতই পান্থপাদপ-এর গল্পগুলোতেও আছে
ক) সংক্ষিপ্ত অথচ সপ্রাণ নির্মাণ: এক-দুই অনুচ্ছেদেই আঁকা হয় চরিত্র, বোনা হয় প্লট, আর মোড় ঘোরে অবধারিত দক্ষতায়।
খ) স্নিগ্ধ ব্যঙ্গ ও কৌতুক: “শিউলি” বা “চিঠি”র মতো গল্পে হাসি আসে, কিন্তু সেই হাসি আসলে সমাজের রংচটা মুখোশ খুলে ফেলে।
গ) গভীর মানবিকতা: দারিদ্র্য, ত্যাগ, নিরাশা, বা ছোট্ট এক ঝলক আশার রঙ—সবই ফুটে ওঠে কম ক’টি শব্দে, যেন লেখকের কলম চলার সময় মগজে নয়, চলেছে হৃৎপিণ্ডের ধার ধরে।
ঘ) চমকপ্রদ শেষ লাইন: শেষ পঙ্ক্তিগুলো পাঠককে আটকে রাখে; কখনও ধাক্কা দেয়, কখনও কোমল করে তোলে, কখনও আবার ঠেলে দেয় নিঃশব্দ বিষণ্নতায়। যেমন “গুণা” বা “রুটি” গল্পের শেষটায় ঘটে।
তমোঘ্নের এই গল্পগুলো যেন একেকটা তরঙ্গ—আসছে, স্পর্শ করছে, আবার ফিরে যাচ্ছে; কিন্তু তটরেখায় রেখে যাচ্ছে একেকটি ভেজা পদচিহ্ন।
বনফুল যেমন বলেছিলেন, “অল্প কথায় অনেক কিছু বলাই সাহিত্যের কৌশল।” তমোঘ্ন যেন এই পাঠ একদম হৃদয়ে ধারণ করেছেন। আর তাই, পান্থপাদপ হয়ে ওঠে সেই গাছ, যার পাতায় চুপিচুপি লেখা থাকে আমাদের সকলেরই হারানো গল্প।
(২) প্রচ্ছদ ও নামের গূঢ়তত্ত্ব:
একটি গাছ, যে ফল দেয় না—তবু পথিক চায় তার ছায়া
পান্থপাদপ। Travellers’ Tree।
এই নাম একমাত্র নাম নয়—এ এক গূঢ় রূপক, এক মৌন প্রতীক যা বইটির মর্মরস বহন করে। এটি শুধু একটি গাছ নয়, এটি এক নীরব সহযাত্রী, ঠিক যেমন তমোঘ্ন নস্করের লেখা।
এই গাছ ফল দেয় না। ছায়া দেয়। জল সংরক্ষণ করে রাখে কাণ্ডের গভীরে—শুধু পথিকের জন্য। নিজে কিছু চায় না, কারো কাছে কিছু দাবি করে না। তবু তার থাকা অনেক। তার প্রয়োজনে দাঁড়ানো হয় না কখনও, কিন্তু যখন প্রয়োজন পড়ে, তখন সে চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে—ঠিক আমাদের হারিয়ে যাওয়া, অদৃশ্য মানুষের মতো, যাঁরা হয়তো আমাদের জীবনের ক্লান্ত দুপুরে একবার ছায়া হয়েছিলেন, তারপর হারিয়ে গেছেন।
এই গাছের সবচেয়ে করুণ সত্য হল: এটি অদৃশ্য হয়, ঠিক তখনই যখন তার প্রয়োজন শেষ।
নয় কি চূড়ান্ত বিষণ্ন উপহাস আমাদের ব্যবহারপরায়ণ সমাজব্যবস্থার?
এখানেই তমোঘ্নর বইয়ের শিরোনাম হয়ে ওঠে এক ধর্মপালক প্রতিম অলংকরণ—যা কেবল একটা নাম নয়, বরং তার প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রীয় দর্শন। “শেষ না হওয়া গল্পগুলোর” কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর লেখার চরিত্রগুলো ঠিক ওই গাছের মতোই:
নিজে নিরব, অথচ আশ্রয়দায়ী
নিজের বেদনা চাপা দিয়ে অন্যের ক্লান্তি শুষে নেয়
সব গল্পেই যেন তারা কিছু দেয়, কিন্তু কিছুই চায় না
সুমন সরকারের প্রচ্ছদচিত্র সেই দর্শনের এক দৃশ্যমান প্রতিমূর্তি।
এটি কোনও দ্যুতিময়, শোভাময় বিজ্ঞাপন-ধর্মী প্রচ্ছদ নয়—বরং ধুলোভরা, কিন্তু প্রাণবন্ত এক বর্ণচিত্র, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটির গায়ে হালকা কুয়াশা, পাতার ছায়ায় গল্পের শব্দ। দেখতে দেখতে মনে হয় যেন গল্পের পাতাগুলো নিজেই কান্ড থেকে জন্ম নিচ্ছে।
এখানে এক গভীর বিরোধাভাস (irony) কাজ করে— যে গাছ ফল দেয় না, তাকে কখনও ‘দরকারী’ বলে ভাবা হয় না। কিন্তু ঠিক সেই গাছই সবচেয়ে জরুরি।
যেমন—এই গল্পগুলিও কখনও জাতীয় পুরস্কারের কভারে থাকবে না, হাইপ-তোলা হ্যাশট্যাগে ভাসবে না— তবু তৃষ্ণার্ত পাঠকের মনে ঠিক ছায়া ফেলবে।
তাই এই নাম এবং প্রচ্ছদ—এক মহাকাব্যিক ব্রহ্মসূত্র।
এক নিমগ্ন কাব্যিক দর্শন: "তুমি না ফল দাও, না ফুল দাও—তবু তোমার ছায়াই বাঁচিয়ে রাখে।"
এ গাছ যেন বলে— “আমি কিছু দেব না, কেবল এক মুহূর্তের ঠান্ডা শ্বাস। তারপর আমি নিঃশব্দে মুছে যাবো। তোমার মতোই।”
(৩) লেখার গুণ ও অলংকরণ — শব্দে আলোর রেখা, রেখায় শব্দের প্রতিচ্ছবি
তমোঘ্ন নস্করের কলম যেন এক বিরল জাদুকাঠি—যার চালনায় দৈনন্দিন জীবনের অনুচ্চারিত, উপেক্ষিত মুহূর্তগুলো হঠাৎ এক অলৌকিক দীপ্তি পায়। তিনি লিখতে বসেন না। তিনি শোনেন—একটা ভাঙা রেলস্টেশনের কিশোরীর কান্না, একটা বোরওয়েলের নিঃশব্দ গুঞ্জন, কিংবা দূর গ্রামের কোনও মায়ের নিঃশেষ কাঁপা নিঃশ্বাস।
তাঁর গদ্য কখনও স্টেনোগ্রাফারের মত নিরাসক্ত, আবার কখনও মায়াবী কবির মতো কোমল ও কুয়াশায় মাখানো।
এক মুহূর্তে তিনি লিখছেন— “দুধ তোই দিচি, লাজের কী আছে?”
আরেক মুহূর্তে তিনি সাঁঝের আলোয় রচনা করছেন— “ভুট্টাবুড়ো আজও ছেলের খোঁজে পাতিয়ালার কোণে মুখ লুকিয়ে আছে।”
এই দ্বৈততা—দার্শনিক ও দয়ালু, বাস্তব ও বিস্ময়কর—এই দ্বন্দ্বই তাঁর লেখার স্পন্দন।
তমোঘ্নর লেখা একধরনের মনোজাগতিক চিত্রনাট্য। গল্পগুলোর কাঠামো হালকা, কিন্তু ভিত শক্ত; যেন একটি কাঁচের জাহাজ, ভিতরে চরিত্ররা ভাসছে আর বাইরের পাঠক সেই জাহাজটিকে ধীরে ধীরে নিজের দিকে টেনে আনছেন, নিঃশব্দে।
আর এই নীরবতাকেই রেখার ছায়া দিয়ে অলংকৃত করেছেন ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য।
তাঁর আঁকা যেন গল্পের ছায়ার চেয়েও নিঃশব্দ। কখনও মনে হয়, আঁকাগুলো লিখে রেখেছে সেইসব মুহূর্ত— যেখানে গল্প থেমে যায়, কিন্তু চোখ চলতে থাকে।
এগুলো কোনও রঙিন চিত্র নয়। এগুলো যেন কালো-সাদা স্বপ্নের পেছনের মঞ্চসজ্জা, যেখানে চরিত্ররা নেই, কিন্তু তাদের ছায়া রয়ে গেছে।
তবে পাঠক হিসেবে একটা অতৃপ্তি থেকেই যায়—এই অলংকরণগুলো আরও চাইছিল মন।
প্রতিটি গল্পই যেখানে একেকটি জলছবি, সেখানে আরও কিছু রেখার ঢেউ উঠতেই পারত।
তবু যা আছে, তা-ই যথেষ্ট—কারণ তা নিঃশব্দে বলে দেয়,
“এই ছবিটা তোমার চোখে আঁকো, আমি শুধু রেখার ইশারা দিলাম।”
তমোঘ্ন ও ওঙ্কারনাথ—একজন লিখেছেন আত্মার গল্প, আর একজন সেই আত্মার ছায়া এঁকেছেন পাতার প্রান্তে। এ যেন শব্দ আর রেখার এক অনাড়ম্বর যুগলবন্দী— যেখানে পাঠক শুধু পড়েন না, অংশ হয়ে ওঠেন গল্পের।
(৪) ব্যক্তিগত স্মৃতির আয়নায়:
কোনো গল্প শুধুই গল্প নয়—সে হয়ে ওঠে আয়না, সঙ্গী, অথবা এক দুঃস্বপ্নের প্রতিচ্ছবি
তমোঘ্নর পান্থপাদপ পড়তে পড়তে আমার ভেতর হঠাৎ একটা পুরোনো সন্ধে নেমে এলো। সেই সাদামাটা, বিদ্যুৎ-চোখ ছানাবড়া করা সন্ধে, যখন দাদু আমাদের বলতেন— “সব গল্প শেষ হয় না দাদুভাই। কেউ কেউ শুধু বলার অপেক্ষায় থাকে।”
এই বই ঠিক সেইসব অপেক্ষমাণ গল্পদেরই আশ্রয় দিয়েছে। প্রতিটি গল্প যেন একটা ভাঙা চিঠির খাম—যার ভিতরে ছেঁড়া অনুভূতি, অসমাপ্ত পংক্তি, আর হঠাৎ নেমে আসা কান্না জমে আছে। তমোঘ্নর গদ্যে একটা কবিতার শ্বাস আছে। শব্দগুলো খুব জোরে চিৎকার করে না।
বরং তারা নিঃশব্দে চোখের কোণে দাঁড়িয়ে থাকে।
অপেক্ষা করে—তুমি কবে তাকাবে, কবে বলবে—“এই তো, আমি তো এই গল্পটাই খুঁজছিলাম!”
আর তখনই আমার মনে পড়ে প্রীতমকে।
একটা শিশুর নাম, একটার মতো হাজারটা গল্প, কিন্তু ক’জন শুনেছে?
প্রীতম। সাত বছরের একটি ছেলে। যার জীবন থেকে মা-বাবা অদৃশ্য নয়—তারা আছে, কিন্তু… দূরে।
বাবা পাঞ্জাবে, এয়ার ফোর্সে। মা, শহরের কোনও ওয়ার্ডে, রাতভর ডিউটিতে। প্রীতম থাকে দিদার কাছে, শহরতলির এক ঘুপচি ফ্ল্যাটে।
তার মা যেমন রোগী নিয়ে ব্যস্ত, তার বাবা যেমন সীমান্ত পাহারা দিয়ে দেশ বাঁচায়, তেমনই প্রীতম নিজেকে বাঁচায়—নিজের ছোট্ট ঘরে, নিজের গড়েফেলা কল্পনার সঙ্গে।
সে কথা বলে সোফার সঙ্গে— “তুই শুনলি? রায়ান আজকে আমাকে ঠেলেছে।” সে গল্প করে পেন্সিল বক্সের ঢাকনার সঙ্গে— “তুই জানিস? মা কবে ফিরবে?”
সে আঁকে একটা রানওয়ে, একটা প্লেন, আর তার ভিতরে মা-বাবার ছবি। নিজে দাঁড়িয়ে প্লেনের নিচে, হাতে একটা সাদা কাগজ—
“আমি ভালো আছি, কিন্তু তোমাদের ছাড়া বাঁচা মানে বেঁচে থাকা না।”
ক্লাসে সে চুপ করে থাকে। টিফিনে নিজের সঙ্গে কথা বলে।
স্যার বলেন—“এই ছেলেটা অদ্ভুত শান্ত।” কেউ বোঝে না—প্রীতম শান্ত নয়, নিঃসঙ্গ।
তার জীবনে সব আছে—জামা, বই, খেলনা, আলো, মোবাইল... কিন্তু উপস্থিতির মধ্যে অনুপস্থিতি যে কীরকম বিষ, সেটা সাত বছর বয়সেই বুঝে গেছে প্রীতম।
এই গল্প হয়তো কোথাও ছাপা হয়নি, কিন্তু এই গল্পটাই আমি খুঁজে পেলাম পান্থপাদপ এর পৃষ্ঠার ভাঁজে। জানলা-চেপে থাকা এক শিশুর চিৎকার যেন ফুটে উঠল “দুধের দাম” বা “বিপত্তারিণী”-র মতো গল্পে।
যেখানে ভালোবাসা কাঁটা হয়ে আসে, আর যন্ত্রণারও থাকে ঠোঁটে প্যাচানো হাসি।
পান্থপাদপ এক নিঃশব্দ সাক্ষী— যে বলে না “এই গল্পটা গুরুত্বপূর্ণ,”
বরং বলে, “এই গল্পটা তোরই ছিল, তুই শুধু চিনতে পারিসনি।”
তমোঘ্ন আমাদের হাতে একটা আয়না ধরিয়ে দেন। সেই আয়নায় আমরা দেখি— শুধু ‘গল্প’ নয়, আমরাও।
আর একদিন—প্রীতম হয়তো সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলবে— “তোরাও আমায় চিনেছিলে। আমি একা ছিলাম না।” আর এটাই, একটা বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
(৫) শেষের কথা: পান্থপাদপের ছায়ায়...
একটা বই কতটা নীরবে আমাদের বদলে দিতে পারে?
পান্থপাদপ সেই প্রশ্নের উত্তর।
এটি কেবল অণুগল্পের সংকলন নয়, এটি এক ধরণের ভিতরের বৃষ্টি—যা গোপনে মন ভিজিয়ে দেয়, ছায়া ফেলে ক্লান্ত হৃদয়ে। এটি এমন এক পাঠ্য যাত্রা, যেখানে শব্দেরা চিৎকার করে না, বরং চুপচাপ বসে থাকে পাঠকের কাঁধে, ঠিক সেই মাটির গাছটার মতো— যেটা কথা বলে না, শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। আর তৃষ্ণার্ত পথিক হঠাৎ একদিন তার পাতায় জল খুঁজে পায়।
তমোঘ্নর এই সংকলন যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সাহিত্যের কাজ কেবল বিনোদন নয়। সাহিত্যের প্রকৃত কাজ—মনকে জলে ধুয়ে দেওয়া। স্মৃতিকে ফেনি করে তোলা। ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, যখন পৃথিবী জ্বলছে।
এই বই সেই কাজটাই করে—ধীরে, ধ্যানে, গভীরভাবে, এবং নীরবে।
পড়তে পড়তে বারবার মনে পড়ে গেল সেই জহর রায়ের গলা: "সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।" এখানেও মানুষই সত্য।
ভিখারিনীর কান্না, ডাইনি মেয়ের ভয়, এক মায়ের বুকের দুধ, এক ছেলের না-বলা কথা— সবই যেন বলে ওঠে— “আমরাও আছি। আমাদেরও গল্প আছে।”
“সব গল্প শেষ হয় না, কিছু গল্প শুধু রয়ে যায়— ধুলোমাখা পাতা, একা গাছ, আর তৃষ্ণার্ত মন…”
রেটিং: ৪.৭৫ / ৫
পাঠ-প্রস্তাব: যারা হুমায়ূন আহমেদের তন্দ্রাবিলাস, রাজা ভট্টাচার্যের ভারতবর্ষ, অথবা কলিম শরাফতের রোজকার কথা পড়ে চোখের কোণে কুয়াশা জমতে দেখেছেন— তাদের জন্য পান্থপাদপ এক অরণ্যের চিরন্তন ডাক।
এখানে গাছই কবি। এবং গল্পই জল। তুমি শুধু একটু থেমে দাঁড়াও... তৃষ্ণা পাবে।
পান্থপাদপ জলে ভরিয়ে দেবে মন।
অলমতি বিস্তরেণ।