পত্রিকায় প্রকাশিত সাধারণ একটা ধাঁধার সমাধান রুদ্র আর তূর্যকে হাজির করলো ইতিহাসের এক বন্ধ দরজার সামনে। ইতিহাসের সে বিস্মৃত দরজা তাদের সামনে উন্মুক্ত করলো এক দুর্ভাগা যুবরাজের রক্তাক্ত যাত্রাপথ। শ্বাপদসংকুল এই যাত্রাপথে চলতে গিয়ে তারা মুখোমুখি হলো রক্তপিপাসু প্রতিশোধকামী এক বিভীষণের, মুখোমুখি হলো লোকমুখে প্রচলিত রূপকথার এক পিশাচের । শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়তির নাটাই-সুতো কি চলে গেলো সেই বিভীষণের নিয়ন্ত্রণে? নাকি সবকিছুই আসলে পর্দার অন্তরালের কোন এক স্থপতির দক্ষ হাতের সুনিপুণ কারুকাজ? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ডুব দিতে হবে রুদ্র আর তূর্য'র জগতে। নি:সন্দেহে 'বিভীষণ' আপনাকে চমকে দেবে।
এই বইটা একাধারে অনেক কিছুর মিশেল। ধাঁধা রহস্য, এডভেঞ্চার, ইতিহাস, গুপ্তধন, প্রতিশোধ মিলে পাঁচ মিশালী হয়ে গেছে।
আমার কাছে প্রথম ধাঁধার ব্যাপার টা বেশি ভালো লেগেছে। ইতিহাসের সাথে মিল করে গুপ্তধনের অবতারণা ও ছিল চমৎকার। বই জুড়ে পার্বত্য অঞ্চলের বর্ণনা দেয়ায় লেখক মুন্সিয়ানা দেখালেও কাহিনীতে এত বেশি প্রয়োজন ছিলো না। শেষের দিকের দীর্ঘ কথপোকথন বিরক্তির উদ্রেক করেছে। অনেক কিছু আগেই আন্দাজ করে নেয়ায় তেমন কোন টুইস্ট বা চমক পাইনি । সাদা মাটা একটা রহস্যভেদী এডভেঞ্চার এর কাহিনী আর কি। পড়তে পড়তে শৈশবে পড়া কাকাবাবু , ফেলুদার ভাইব পাচ্ছিলাম। যারা এধরনের কাহিনী পছন্দ করেন তাদের ভালো লাগবে।
পড়ে শেষ করলাম সৈয়দ মোস্তাকীম হায়দার এর লেখা ‘বিভীষণ’ বইটি। অ্যাডভেঞ্চার জনরার এই বইটি নিয়ে আলোচনার আগে চলুন দেখে নিই বইটির কাহিনী সংক্ষেপ…
কাহিনী সংক্ষেপ :-
পত্রিকায় প্রকাশিত সাধারণ একটা ধাঁধার সমাধান রুদ্র আর তূর্যকে হাজির করলো ইতিহাসের এক বন্ধ দরজার সামনে। ইতিহাসের সে বিস্মৃত দরজা তাদের সামনে উন্মুক্ত করলো এক দুর্ভাগা যুবরাজের রক্তাক্ত যাত্রাপথ। শ্বাপদসংকুল এই যাত্রাপথে চলতে গিয়ে তারা মুখোমুখি হলো রক্তপিপাসু প্রতিশোধকামী এক বিভীষণের, মুখোমুখি হলো লোকমুখে প্রচলিত রূপকথার এক পিশাচের । শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়তির নাটাই-সুতো কি চলে গেলো সেই বিভীষণের নিয়ন্ত্রণে? নাকি সবকিছুই আসলে পর্দার অন্তরালের কোন এক স্থপতির দক্ষ হাতের সুনিপুণ কারুকাজ?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ডুব দিতে হবে রুদ্র আর তূর্য'র জগতে। নি:সন্দেহে 'বিভীষণ' আপনাকে চমকে দেবে।
পাঠ্য-প্রতিক্রিয়া :-
অ্যাডভেঞ্চার জনরার এই বইটির কাহিনী শুরু হয় দুই কাজিন রুদ্র এবং তূর্যের পত্রিকায় দেওয়া একটা ধাঁধা সমাধানের মাধ্যমে। পত্রিকায় দেওয়া ধাঁধার সমাধান তাদেরকে পৌছে দেয় ইতিহাসে ঘুমিয়ে থাকা এক যুবরাজের দিকে। কাহিনীতে তারা মুখোমুখি হয় দেশের এক প্রভাবশালী গ্রুপ,বেশ কিছু হত্যা,প্রতিশোধের এবং তার সাথে থাকে বাংলাদেশের এক দুর্গম অঞ্চলে অভিযান ও সেখানকার মানুষ এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য। সবকিছু মিলিয়ে ৩০০ পেজের এই বইটি ছিলো বেশ গতিশীল এবং পেজ টার্নার যেটা বইটাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
তবে বইয়ের কাহিনী ফাস্ট পেজড হলেও বইয়ে বর্ণনার আধিক্য ছিলো। লেখক খুব সুন্দরভাবে ডিটেইলিং করতে পারেন কিন্তু কাহিনীর প্রয়োজনে এতো বেশি বর্ণনা বা ডিটেইলিং না করলেও চলতো। বিশেষ করে একই তথ্য এক পৃষ্ঠার ব্যবধানে পুনরায় ব্যবহার করা হয়েছে অনেক জায়গাতেই যেটার প্রয়োজনীয়তা ছিলো না আসলে। তাছাড়া অনেক তথ্যই পাঠককে স্পুনফিডিং করিয়ে দেওয়া হয়েছে বইয়ে যেগুলো আসলে পাঠকদের বোঝার জন্য ছেড়ে দিলেই ভালো হতো।
তবে এই বর্ণনার আধিক্যে আমার খুব একটা অসুবিধা হয়নি মূলত লেখকের লেখার ধরণের জন্য। এর আগে লেখকের একটা বই বেরিয়েছে। সে হিসেবে দ্বিতীয় বইয়ে লেখক চমৎকারভাবে যেভাবে সবকিছু বর্ণনা করেছেন সেটা অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। কাহিনীতে ধাঁধাগুলো এবং একটি চরিত্রের ক্ষেত্রে মনে হয়েছে লেখক ফেলুদা সিরিজ দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছেন এবং অভিযানের বর্ণনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাকাবাবু সিরিজের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তবে এই প্রভাবকগুলো কাহিনীতে পজিটিভ ইমপ্যাক্টই ফেলেছে, কাহিনীকে করে তুলেছে আরও বেশি আকর্ষণীয়।
তবে বইয়ে আরও কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা ছিলো। যেমন বাংলাদেশের যে অঞ্চলের অভিযানের বিষয়গুলা দেখানো হয়েছে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিগুলো কাহিনীতে আসেনি যেটা আসার দরকার ছিলো। এছাড়াও বইয়ের এক ক্ষেত্রে দেখা গেছে একজন চরিত্র যিনি মূলত গ্রামপ্রধান ছিলেন তিনি ইতিহাসবিদদের মতো করে ইতিহাস বর্ণনা করে যাচ্ছেন। আবার বইয়ে শুরুর দিকে কাকতালীয়তার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে ২-৩ জায়গাতে। এরকম ছোটখাটো সমস্যা বইজুড়ে ছিলো, কিন্তু এগুলোর জন্য মূল কাহিনীতে বেশি প্রভাব পড়ে নাই। তবে এগুলো ঠিকঠাক করতে পারলে বইটা আরও সুন্দর হতো।
বইয়ের আরেকটা ভালো দিক হলো এন্ডিং এবং বইয়ের নাম। বইয়ের এন্ডিংয়ে এসে লেখকের দেওয়া টুইস্টগুলো ভালো ছিলো। যদিও যারা নিয়মিত থ্রিলার পড়েন তারা কিছু টুইস্ট আগে অনুমান করতে পারবেন। তারপরেও লেখকের সুন্দর লেখনী এবং পারফেক্ট টাইমিংয়ের জন্য টুইস্টগুলাতে মজা পেয়েছি। এরই সাথে বইটা শেষ করার পরে যখন বইয়ের নামের সারমর্ম বোঝা যায় তখন একটা পারফেক্ট কাহিনী শেষ করার ফিল পাওয়া যায়।
পার্সোনাল রেটিং : ৩.৫০/৫.০০
গুডরিডস রেটিং : ৩.৪৪/৫.০০
প্রোডাকশন :-
বইটা এসেছে বাতিঘর প্রকাশনী থেকে। টিপিক্যাল বাতিঘর প্রকাশনীর যেমন প্রোডাকশন হয় সেরকমই প্রোডাকশন হয়েছে। তবে ভেতরে বানান ভুল কম থাকলে নামের ক্ষেত্রে ২-৩ জায়গায় ভুল পেয়েছি। বানান ভুলের থেকেও বেশি সমস্যা হয় আসলে চরিত্রের নাম ভুল হলে। বাতিঘরের এই সমস্যাটা আরও কিছু বইয়ে আমি পেয়েছি। আশা করি এই সমস্যা নিয়ে প্রকাশনী অবশ্যই কাজ করবে।
প্রচ্ছদ :-
বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন ডিলান। বইয়ের প্রচ্ছদটি কাহিনীর সাথে খুবই চমৎকারভাবে মানিয়েছে। সবুজ জঙ্গলের মাঝে দুই তরুণের হেটে যাওয়া এবং তাদের সামনে দাড়িয়ে থাকা হাতি ও প্রচ্ছদের এক প্রান্তে দেওয়া একটা ঘড়ির ছবি এ সবকিছুই বইয়ের কাহিনীকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে। হালকা রঙয়ের উজ্জ্বল এই প্রচ্ছদটি অনেক পাঠকেরই পছন্দ হবে।
সবমিলিয়ে বিভীষণ এবং এর কাহিনী আমাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। বইয়ের শুরুতে লেখক ৬ পৃষ্ঠা জুড়ে কৃতজ্ঞতা এবং উৎসর্গ লিখেছেন যেটা পড়লে বোঝা যায় একটা বই লিখতে একজন লেখককে কত পথ পাড়ি দিতে হয়, কত মানুষের সাহায্য নিতে হয়। আমরা বই প্রকাশের পরে তার কাহিনী পড়লেও এই কাহিনী লেখার পেছনের কাহিনী নিয়ে ভাবি না কখনো। লেখককে অনেক ধন্যবাদ এই সুন্দর বইটা পাঠকদের উপহার দেওয়ার জন্য এবং লেখকের পরের বইগুলোর প্রতি শুভকামনা রইলো।
বইমেলায় বাতিঘর প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে সৈয়দ মোস্তাকীম হায়দারের "বিভীষণ" বইটা হাতে নিয়ে ফ্ল্যাপটা পড়েই বুঝলাম, একটা দারুণ রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরা ঐতিহাসিক উপন্যাস। রুদ্র আর তূর্য নামের দুই তরুণের একটা ধাঁধার সূত্র ধরে যাত্রা, আর সেই সূত্রে ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের উন্মোচন - সব মিলিয়ে বেশ আগ্রহ তৈরি হলো।
পড়ার পরে মনে হল, "ওয়াও!" শুরু থেকেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ইতিহাস আর রহস্যের মিশেলটা দারুণ লেগেছে। প্রতিটা বাঁকেই নতুন কিছু ঘটছে, যা শেষ পর্যন্ত ধরে রেখেছে। লেখকের ভাষা সহজ আর বর্ণনাগুলো জীবন্ত।
রুদ্র আর তূর্য - দুজন দুই ধরনের মানুষ, কিন্তু তাদের বন্ধুত্বটা অসাধারণ। তারা সাহসী, বুদ্ধিমান এবং যেকোনো ঝামেলা সামলাতে পারে। আর বিভীষণ? সে তো এই গল্পের আসল হিরো! প্রতিশোধের নেশায় পাগল, রক্তপিপাসু এক ভয়ংকর মানুষ। লেখকের কলমের জোরে চরিত্রটা যেন ফুটে উঠেছে, তার কাজকর্ম দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়।
বইয়ের প্লট আর গল্প বলার ধরণটা আমার খুব ভালো লেগেছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রহস্য আর রোমাঞ্চে ভরপুর ছিল। লেখকের ভাষা আর বর্ণনাও চমৎকার। চরিত্রগুলোও বেশ গভীর। আর শেষ পর্যন্ত সাসপেন্স ধরে রাখার ক্ষমতা বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
খারাপ লাগার মতো তেমন কিছু খুঁজে পাইনি, তবে কিছু জায়গায় গল্পের গতি একটু কমে গেছে বলে মনে হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সৈয়দ মোস্তাকীম হায়দারের "বিভীষণ" থ্রিলার বইটি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। যারা রহস্য, রোমাঞ্চ আর ইতিহাস ভালোবাসেন, তাদের জন্য এই বইটা মাস্ট রিড। রুদ্র আর তূর্যের সাথে আপনিও একটা শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে যান, যেখানে প্রতি পদে পদে অপেক্ষা করছে নতুন রহস্য। "বিভীষণ" আপনাকে চমকে দেবে এবং অনেক দিন পর্যন্ত এর স্বাদ আপনার মনে লেগে থাকবে।
সহায় সম্বলহীন অসহায় মানুষ কি সব সময় ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে? না মাঝে মাঝে নিজের প্রতিশোধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে নিজেই নিয়ে থাকে?? ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার হিসেবে লেখক এর হোমওয়ার্ক চোখে পড়ার মত। মোঘল সম্রাজ্জ্যের খুঁটিনাটি তিনি তুলে ধরেছেন বেশ মুন্সীয়ানার সাথে। গল্পের প্রয়োজন এ যে সকল চরিত্র এসেছে প্রত্যেকেই তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট জায়গা পেয়েছে। গল্পের ধারাবাহিকতা বেশ ভাল, কোথাও ঝিমিয়ে পড়ে যায় নি। বিভীষণ শকুন এর মতই উপকারী, যদিও শকুন কে আমরা নিজেরাই ধ্বংস করছি তথাপি প্রকৃতি পরিষ্কার এ এর ভূমিকা অনস্বীকার্য, বিভীষণ ও কি তাই?
৩.৫/৫। এক বসাতেই বইটা শেষ করলাম। ভাল থ্রিলারের নিয়ম হচ্ছে - "Show, don't tell." এখানে আসলে বেশিরভাগ ব্যাপারই Tell হয়ে যাওয়াটা সমস্যা। তবে Show হলে বইটা আরো বড় হত, সেটাও একটা বিষয়।