Jump to ratings and reviews
Rate this book

সুভাষচন্দ্র— অন্তর্ধান, প্রত্যাবর্তন ও অন্বেষণ

Rate this book
An Investigation into the Disappearance and Return of Netaji Subhashchandra Bose

728 pages, Hardcover

First published December 23, 2023

19 people want to read

About the author

Dipayan Raychowdhury

1 book1 follower

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
2 (100%)
4 stars
0 (0%)
3 stars
0 (0%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 of 1 review
Profile Image for Preetam Chatterjee.
6,892 reviews370 followers
August 9, 2025
"History is written from the point of view of the victor. The British won World War II and the Congress party came to power after India won freedom. The history of the freedom struggle that is propagated in India seeks to give credit only to the Congress party for winning freedom. But this is an imperfect story of how India became independent. There were many forces at play....." (Netaji: Living Dangerously by Kingshuk Nag)

দীপায়ন রায়চৌধুরীর “সুভাষচন্দ্র – অন্তর্ধান, প্রত্যাবর্তন ও অনুসন্ধান” কেবলমাত্র একটি জীবনী কিংবা ঘটনাপঞ্জির নয়; এটি ইতিহাসের এক জটিল, রহস্যঘেরা ও বিতর্কিত অধ্যায়কে তথ্য, দলিল, সাক্ষ্য এবং প্রেক্ষাপটের আলোকে পুনর্গঠনের এক সুচিন্তিত ও গভীর প্রচেষ্টা। সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন এক অগ্নিবিন্দু—যেখানে আবেগ, রাজনীতি, এবং জাতীয়তাবাদের উত্তাপ মিলেমিশে এক অনন্ত রহস্যের জন্ম দিয়েছে। লেখক সেই অগ্নিবিন্দুকে কেবল দেখিয়েই থেমে যান না; বরং তার চারপাশের ধোঁয়া, উত্তাপ, আর অদৃশ্য ছায়াগুলোকেও তুলে আনেন পাঠকের চোখের সামনে।

“A champion is one who is remembered. A legend is one who is never forgotten.” ― Matshona Dhliwayo

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট। ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হল এক দুঃসংবাদ। তাইহোকুর আকাশে তখনও ভোরের আবছা আলো। জাপানি ক্বান্টুং সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুনামাসা শিদেই-এর অতিথি হয়ে এক সামরিক বোম্বারে চড়ে নাকি যাত্রা শুরু করেছিলেন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষচন্দ্র বসু। কিন্তু উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়, মুহূর্তে প্রাণ হারান প্রধান পাইলট, সহ-পাইলট এবং জেনারেল শিদেই। সুভাষচন্দ্র গুরুতর দগ্ধ হন—তৃতীয়-ডিগ্রি burns, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনাবসানের কারণ হয়।

আর সেই আকস্মিক বজ্রপাত উপমহাদেশে পৌঁছতেই যেন থমকে গেল সময়। আর তারপরই অকালপ্রলয়ের অনুরণনে কেঁপে উঠল জনমনের অন্তঃস্থল। স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ানো জাতি হঠাৎ হারিয়ে ফেলল তার সবচেয়ে দীপ্ত, সবচেয়ে দুঃসাহসী সেনানায়ককে।

অথচ, এই অন্তর্ধান যেন কোনো চূড়ান্ত পূর্ণচ্ছেদ নয়—বরং এক দীর্ঘশ্বাসের মতো অর্ধবিরাম, যার পর শুরু হল গুজব, আশাবাদ, ষড়যন্ত্রকথা আর অদম্য কৌতূহলের এক অন্তহীন প্রবাহ, যা আজও সময়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে।

এখানে আমায় প্রথমেই বলতে হয় দীপায়নের ভাষা প্রসঙ্গে। ভাষা কখনও আর্কাইভের ধুলোঝরা নথির মতো নিখুঁত, আবার কখনও সাহিত্যের আবেগে টইটুম্বুর। দীপায়ন আদালতের রিপোর্ট, সরকারি গোপন নথি, সমসাময়িক সংবাদপত্রের বিবরণ, এমনকি গোপন সাক্ষাৎকার ও গুজব—সবকিছুকেই একত্রিত করে রচনা করেছেন এক বহুস্বরিক বিবরণ। এই বই যেন “তথ্য” ও “প্রচলিত মিথের” সেতুবন্ধন, যেখানে পাঠক স্বয়ং অনুসন্ধানীর ভূমিকায় অবতীর্ন হন।

পড়তে পড়তে মনে হয়, অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সেই লাইন যেন এখানে কতটাই না প্রযোজ্য— “The important thing is not to stop questioning. Curiosity has its own reason for existence. One cannot help but be in awe when he contemplates the mysteries of eternity, of life, of the marvelous structure of reality. It is enough if one tries merely to comprehend a little of this mystery each day.

সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি গোটা জাতির রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে এক স্থায়ী ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। এই ক্ষত থেকে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য তত্ত্ব—তাঁর মৃত্যুর সরকারি ঘোষণা, সাইবেরিয়ায় বন্দিত্বের কাহিনী, গুমনামী বাবার কিংবদন্তি—সবই যেন সময়ের বুকে স্থাপিত রহস্যের একেকটি স্তম্ভ।

দীপায়ন রায়চৌধুরীর কাজের বৈশিষ্ট্য হল তাঁর নিরপেক্ষতা। তিনি না অন্ধ ভক্ত, না অন্ধ সমালোচক— এই বইয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তিনি এক ধৈর্যশীল গবেষক, যিনি জানেন যে সত্য প্রায়শই “কালো-সাদা” নয়, বরং অসংখ্য ধূসর ছায়ার সমাহার।

“सत्यं शिवं सुंदरम्”—সত্য শুধু সুন্দর নয়, তা কঠিনও, এবং তাকে খুঁজে পাওয়া প্রায়শই এক অন্তহীন যাত্রা।

পাঠের সময় এই বইটি আমাদের পৌনঃপুনিকভাবে মনে করিয়ে দেয়, সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান হয়তো আজও অনসিদ্ধ রহস্য, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও সংগ্রাম চিরকাল বর্তমান।

পর্যালোচনার এই অংশে, একটা লেখ্যংশ আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া লোভ সামলাতে পারছি না। ২০১৭ সালে পাঠ করার সুযোগ এসেছিল একটি বই, যার নাম 'Democracy Indian Style: Subhas Chandra Bose and the Creation of India's Political Culture' -- লেখক Anton Pelinka।

বইয়ের একাংশে লেখক বলছেন: "Neither myth is without foundation. Neither myth is pure invention. Each myth complements the foundation myths of India that were propagated primarily by Gandhi and Nehru: that Indian independence was fought for using Gandhi’s strategy of nonviolence, and that India’s partition could not have been prevented by Gandhi or Nehru or anyone else. The memory of Bose and the INA does not contradict these foundation myths—but it expands, broadens, and relativizes them.

The political system and the political culture of India allow for contradictions in order to integrate them. The India of the present is clearly directed against consistency. In this sense, the India of the present is neither that of Jinnah nor that of Subhas Bose.

But Subhas Chandra Bose fulfills an important function in this India. This India is his only in a limited sense.

But he is part of the same: the memory of him, of his INA, but primarily the memory of his alternative to the political culture created by the Congress, the culture of using ambiguity to integrate opposing forces—which remains dominant even after the end of the Congress’s hegemony.

Bose’s longing for clarity fits into India’s ambiguity as a variation of India: his longing, for instance, for one Indian language, for a nationalistically and socialistically determined India whose thinking should come from Europe—influenced by Mazzini and Lenin; for an India that should also be anchored in the specifically Indian (or specifically Bengali) tradition represented by C. R. Das; for an India whose secularism would correspond fundamentally in terms of content if not in terms of form with the secularism that would continue to develop from Nehru to Vajpayee.

Bose fulfills the task of an alternative foundation myth that expands the reigning foundation myth—embodied by Gandhi and by Nehru..."


অর্থাৎ গোদা বাংলায় দাঁড়াচ্ছে: সুভাষচন্দ্র ও তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজের স্মৃতি ভারতীয় স্বাধীনতার প্রচলিত গান্ধী-নেহরুবাদী ভিত্তি-কাহিনিকে খণ্ডন করে না, বরং তাকে বিস্তৃত ও আপেক্ষিক করে তোলে। তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্ন—যেখানে স্পষ্টতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ইউরোপীয় চিন্তার প্রভাব ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়—ভারতের সেই সাংস্কৃতিক কাঠামোরই বিকল্প রূপ, যা বিরোধী শক্তিকেও অস্পষ্টতার মাধ্যমে আত্মস্থ করে।

দীপায়নের বইটির অন্তর্নিহিত দর্শন যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে তা এর চেয়ে খুব একটা far-fetched নয়। এই বই যেন ইতিহাসের বুক থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি, যা আজও আমাদের ডাকে, প্রশ্ন করে, তাড়িত করে—তুমি কি জানো, আসল সত্য কোথায়?

ন্যারেটিভের প্রথম থেকেই লেখক পাঠককে বুঝিয়ে দেন যে এটি কোনো পক্ষপাতমূলক বা আবেগঘন বিবরণ নয়, বরং নিরপেক্ষ তথ্য-নির্ভর অনুসন্ধান। তিনি ঘটনার পটভূমিতে ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ধারা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভৌগোলিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট, এবং সেই সময়ের ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও সম্ভাবনাকে সুনিপুণভাবে জুড়ে দিয়েছেন।

ফলে পাঠক শুধু একটি ঘটনা নয়, বরং সেই ঘটনার ভেতর-বাহির, তার কারণ ও প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে শুরু করেন।

বইটি এগোয় ধাপে ধাপে। ১৯৪১ সালে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের অধ্যায়ে লেখক দেখান কীভাবে ব্রিটিশ গোয়েন্দা তৎপরতা, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী গোপন নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক শক্তির টানাপোড়েন একসাথে কাজ করেছিল। ব্যবহৃত হয়েছে সমকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন, সরকারি দলিল এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতি।

এখানেই স্পষ্ট হয় যে, লেখকের শক্তি শুধু তথ্য আহরণে নয়, সেই তথ্যকে প্রেক্ষাপটে বসিয়ে ব্যাখ্যা করাতেও। লেখক কেবল জানিয়ে দেন না কী ঘটেছিল, বরং ব্যাখ্যা করেন কেন তা ঐভাবে ঘটেছিল এবং তার পরিণতি কীভাবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করেছিল।

যুদ্ধকালীন অধ্যায়ে সুভাষচন্দ্রের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং সামরিক উদ্যোগের চিত্র উজ্জ্বলভাবে ফুটে ওঠে। জার্মানি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাঁর কর্মকাণ্ড, বিদেশি রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে সম্পর্ক, এবং ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির গঠন ও উদ্দেশ্য সবই এসেছে কিন্তু লেখক সচেতনভাবে পাঠকের জন্য রহস্যের কিছু অংশ খোলা অর্থাৎ open-ended রাখেন। ফলে যিনি বইটি প্রথমবার পড়ছেন, তাঁর জন্য অনুসন্ধানধর্মী উত্তেজনা নষ্ট হয় না।

অন্তর্ধানের প্রথম সরকারি প্রতিক্রিয়ার বর্ণনায় ধরা পড়ে কূটনৈতিক জটিলতা। ব্রিটিশ প্রশাসন, জাপানি কর্তৃপক্ষ, এমনকি অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি কীভাবে ঘটনাটির প্রাথমিক সংবাদ পেয়েছিল এবং প্রচার করেছিল, তা নানা চিঠিপত্র, গোপন নথি ও দূতাবাসের রিপোর্ট দিয়ে দেখানো হয়েছে।

এখানেই বইয়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে—একই ঘটনার একাধিক উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করা এবং পাঠককে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।

এরপর আসে নানা অন্তর্ধান তত্ত্বের উত্থান। এখানে লেখক একেবারেই কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছান না, বরং প্রতিটি তত্ত্বের উত্স, সমর্থক ও সমালোচক, এবং প্রমাণ ও প্রমাণের অভাব একসাথে তুলে ধরেন। জনমনে এসব তত্ত্বের প্রভাব, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ব্যাখ্যা করেন।

সরকারি ও বেসরকারি অনুসন্ধানের বিবরণে লেখক ধাপে ধাপে বিভিন্ন কমিশনের গঠন, কাজের ধারা, রিপোর্টের সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। কূটনৈতিক যোগাযোগের অধ্যায়ে আন্তর্জাতিক নথি, বিদেশি রাষ্ট্রদূতের বার্তা, বৈঠকের সারাংশ—সবই তথ্যসূত্রসহ উপস্থাপন করা হয়েছে।

এতে বোঝা যায়, এই রহস্য শুধুমাত্র ভারতীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক কূটনীতিরও অংশ হয়ে উঠেছিল।

সমকালীন রাজনীতি ও জনমতের প্রতিক্রিয়ার অংশে লেখক দেখান, অন্তর্ধান নিয়ে গুজব ও অনুসন্ধান কেবল ঐতিহাসিক কৌতূহলই নয়, তৎকালীন রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডারও অংশ ছিল। শেষ অধ্যায়ে উপসংহার টানলেও চূড়ান্ত উত্তর দেন না দীপায়ন ; বরং কয়েকটি খোলা প্রশ্ন রেখে দেন, যা আজও বিতর্কিত।

লেখকের গবেষণাপদ্ধতি এই বইয়ের অন্যতম বড় শক্তি। ব্রিটিশ, ভারতীয়, জাপানি ও অন্যান্য দেশের আর্কাইভ ঘেঁটে তিনি সরকারি ও গোপন নথি সংগ্রহ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবৃতি, চিঠিপত্র, সমকালীন সংবাদপত্র ও পূর্ববর্তী কমিশন রিপোর্টকে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সাজিয়েছেন। এই প্রমাণনির্ভরতা বইটিকে আবেগঘন গদ্যের বদলে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানমূলক দলিলে পরিণত করেছে। তিনি কোনো বিদেশি শব্দ বা রাজনৈতিক পরিভাষা ব্যবহার করলে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ফলে এই বইটি একজন গবেষক যেমন পড়তে পারবেন, তেমনি সাধারণ পাঠকও আগ্রহ নিয়ে পড়তে পারবেন।

দীপায়নের উপস্থাপনাশৈলীতে রয়েছে এক অনবদ্য প্রাঞ্জলতা। সরল জলধারার মতো বয়ে চলে বর্ণনা, অথচ সেই প্রবাহের গভীরে লুকিয়ে থাকে গবেষণার দৃঢ় মাটির স্পর্শ। লেখক ইচ্ছাকৃতভাবেই অপ্রয়োজনীয় অলংকার বা অতিনাটকীয়তার আবরণ পরিহার করেছেন। তাঁর কলম যেন “সত্যমেব জয়তে” মন্ত্রে দীক্ষিত—তথ্য, দলিল ও যুক্তিই তাঁর কথার অটল ভরকেন্দ্র। এই সংযমী অথচ প্রাঞ্জল ভঙ্গি পাঠককে একই সঙ্গে তথ্যের ঘনত্বের ভার অনুভব করায় এবং সেই ঘনত্বের মধ্যে দিয়ে এক একটি প্রমাণ, দলিল বা বিশ্লেষণ খুঁজে পাওয়ার সময় মনে জাগায় আবিষ্কারের নীরব উল্লাস। ফলে বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা যেন এক গবেষণাগারে বসে ইতিহাসের ধুলো সরিয়ে ধীরে ধীরে তুলে আনছি হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোর অমোঘ মুখচ্ছবি।

লেখকের নিরপেক্ষতা এই কাজের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়িয়েছে। তিনি কোনো এক তত্ত্বকে সমর্থন বা খণ্ডন করার জন্য একপাক্ষিক যুক্তি দেননি; বরং প্রতিটি সম্ভাবনার জন্য সমর্থনকারী ও বিরোধী তথ্য একত্রে দিয়েছেন, পাঠকের জন্য রেখে দিয়েছেন নিজস্ব বিচারক্ষমতার স্থান। মাঝে মাঝে তিনি সময়রেখা, মানচিত্র বা তুলনামূলক চার্ট ব্যবহার করেছেন, যা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে বইটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুভাষচন্দ্র প্রসঙ্গে বাংলায় এত বিস্তৃত ও তথ্যনির্ভর কাজ খুব কম হয়েছে। বিশেষত, আন্তর্জাতিক নথি—জাপান ও ব্রিটিশ দপ্তরের দলিলপত্র—একসাথে পাওয়া বিরল; এখানে সেগুলি সুচারুভাবে সংকলিত। ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ ইতিহাসপ্রেমী—সবাই এ থেকে উপকৃত হবেন।

তবে সীমাবদ্ধতাও অনস্বীকার্য। গ্রন্থটির আকার ও তথ্যঘনত্ব এমনই যে, এটি এক দীর্ঘ যাত্রা—যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে থমকে দাঁড়িয়ে দেখা, ভাবা, আর বোঝা প্রয়োজন। তাই ধীরপাঠের দাবি এখানে অবধারিত। যারা হালকা গদ্যের স্বাচ্ছন্দ্য বা কেবল ঘটনার রোমাঞ্চে ভেসে যাওয়ার প্রত্যাশা করেন, তাদের কাছে এ বই প্রথমে কিঞ্চিৎ দুঃসাধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ আসলে পাঠকের মানসিক প্রস্তুতিরই প্রশ্ন—যেমন কবি বলেছেন, “সুখের সন্ধান করিলে পথিক, দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে”—এটি বইয়ের গুণগত সীমাবদ্ধতা নয়, বরং তার গভীরতারই পরিচয়।

সব মিলিয়ে “সুভাষচন্দ্র – অন্তর্ধান, প্রত্যাবর্তন ও অনুসন্ধান” কেবল একটি ঐতিহাসিক রহস্যের কাহিনি নয়, বরং একটি সুনিপুণভাবে নির্মিত তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান, যেখানে আবেগ বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, প্রমাণ, নথি ও যুক্তিই মূল চালিকাশক্তি। এই নিরপেক্ষতা ও নথিভিত্তিকতা একে বাংলায় বিরল করে তুলেছে, বিশেষত যখন তুলনা করা হয় ইংরেজি ভাষায় বিদ্যমান প্রামাণ্য গ্রন্থগুলির সঙ্গে।

Leonard Gordon-এর Brothers Against the Raj যেমন দুই ভাইয়ের জীবন ও রাজনীতির বিশ্লেষণে আর্কাইভাল সম্পদের বিস্তৃত ব্যবহার করে, বা Sugata Bose-এর His Majesty’s Opponent যেমন একটি সমসাময়িক অথচ ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সুবিশাল কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সাজিয়ে তোলে, রায়চৌধুরীর এই বই সেসব ধারাকে বাংলায় আত্মস্থ করেছে এবং স্থানীয় পাঠকের ভাষায় আন্তর্জাতিক মানের উপস্থাপনা করেছে।

Hugh Toye-এর The Springing Tiger যেভাবে INA ও যুদ্ধকালীন সামরিক উদ্যোগের পশ্চিমা-দৃষ্টিকোণ তুলে ধরে, কিংবা Rudrangshu Mukherjee-এর Nehru and Bose: Parallel Lives যেভাবে তুলনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণকে মূল অবলম্বন করে, তেমনই রায়চৌধুরী প্রমাণ ও ব্যাখ্যার সমন্বয়ে অন্তর্ধান প্রসঙ্গকে এক বহুমাত্রিক প্রেক্ষাপটে হাজির করেন।

বাংলায় কৃষ্ণা বসুর প্রামাণ্য রচনা যেমন পরিবারিক নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতায় ভর করে, তেমনি এখানে দেখা যায় বিস্তৃত সরকারি ও আন্তর্জাতিক নথির সংমিশ্রণ—যা স্থানীয় ভাষায় গবেষণার মানদণ্ডকে সবিশেষ উচ্চতায় তুলে ধরেছে। ফলে, এই বই কেবল সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের গল্প নয়, বরং এক সময়ের রাজনীতি, সমাজ, সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক কূটনীতির জটিল জালও উন্মোচিত করে।

রায়চৌধুরীর বিশ্লেষণে পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে যে সুভাষচন্দ্র বসু এমন এক স্বাধীনতা সংগ্রামী, যিনি ভারতের রাজনৈতিক স্মৃতিকে এক অনন্য গভীরতায় সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি শুধু স্বাধীনতার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেননি, বরং তার কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের ধারাকে চ্যালেঞ্জও করেছেন। অহিংসার পথ থেকে সরে এসে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান, কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অক্ষশক্তির সঙ্গে কৌশলগত জোট—এসব পদক্ষেপ তাঁকে একদিকে তীব্র অনুরাগের প্রতীক করেছে, অন্যদিকে সমান তীব্র সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু। এই দ্বৈত প্রতিক্রিয়াই তাঁকে ভারতীয় ইতিহাসে এক জটিল ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত করেছে।

২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ৮০–৯০ হাজার পৃষ্ঠার সরকারি নথি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশিত হয়—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে কেন্দ্র সরকার ১০০টি নথি ২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর ডিক্লাসিফাই করে এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারও একই বিষয়ে ৬৪টি নথি প্রকাশ করে। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্যই নয়, গণতন্ত্রপন্থীদের জন্যও এটি ছিল স্বচ্ছতার নতুন অধ্যায়।

বইটিতে এই নতুন তথ্যপ্রবাহকে অন্তর্ভুক্ত করে তিনটি প্রধান তত্ত্বকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষণ সাজানো হয়েছে। প্রথমটি—তাইওয়ানের বিমান দুর্ঘটনা তত্ত্ব—যেখানে ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এ তাইহোকু বিমানবন্দরে দুর্ঘটনার দাবি করা হয়েছিল, কিন্তু সন্দেহ থেকেই গিয়েছিল সরকারি দেরিতে ঘোষণা, সঙ্গীদের পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য, এবং মার্কিন গোয়েন্দা দপ্তরের ‘সরাসরি প্রমাণ নেই’ মন্তব্যে। এই প্রসঙ্গে শাহনওয়াজ কমিটি (১৯৫৬) ও খোসলা কমিশন (১৯৭০) মৃত্যুর সিদ্ধান্তে ���ৌঁছালেও, মুখার্জি কমিশন (২০০৫) ঘোষণা করে কোনো বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি এবং রেনকোজি মন্দিরের অস্থি আসলে জাপানি সেনা ইচিরো ওকুরা’র। যদিও ভারত সরকার এই রিপোর্ট গ্রহণ করেনি এবং খোসলা কমিশনের মতকেই সরকারি সত্য হিসেবে ধরে রেখেছে।

দ্বিতীয় তত্ত্ব—রাশিয়ায় আত্মসমর্পণ—যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯০-এর দশকে নতুন করে আলোচনায় আসে। রাশিয়ান আর্কাইভে সম্ভবত প্রাসঙ্গিক নথি থাকতে পারে, কিন্তু ভারত সরকার সেগুলি আনতে তেমন চাপ দেয়নি। কিছু কূটনৈতিক বার্তা ও সংবাদ প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি।

তৃতীয় তত্ত্ব—গুমনামি বাবা রহস্য—যেখানে ফৈজাবাদের এক রহস্যময় সন্ন্যাসীর পরিচয় ঘিরে জল্পনা তৈরি হয়। তাঁর কক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া বহু ব্যক্তিগত সামগ্রী, লেখনীর মিল, এবং কিছু আত্মীয় ও পরিচিতদের দাবি এই তত্ত্বকে উস্কে দেয়। যদিও DNA পরীক্ষায় মিল পাওয়া যায়নি এবং সরকারি তদন্তে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নাকচ হয়, তবুও রহস্য থেকে গেছে কারণ গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টের কপি পর্যন্ত নষ্ট বা অনুপস্থিত বলে দাবি ওঠে।

এইসব তত্ত্ব, কমিশন রিপোর্ট ও আর্কাইভাল প্রমাণ নিয়ে রায়চৌধুরীর বিশ্লেষণ বাংলা ভাষায় গবেষণাধর্মী বইয়ের মানদণ্ডকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলেছে। Leonard Gordon, Sugata Bose বা Hugh Toye-এর মতো ইংরেজি গ্রন্থে যেমন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট মিলে এক বিস্তৃত আখ্যান গড়ে ওঠে, তেমনই এখানে স্থানীয় পাঠকের জন্য গভীর, প্রমাণসমৃদ্ধ ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানমূলক কাহিনি তৈরি হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ে পাঠক একদিকে প্রমাণ ও নথির পথে এগোন, অন্যদিকে রহস্যের স্তরগুলো ধীরে ধীরে সরে গিয়ে স্বাধীনতা-যুদ্ধোত্তর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উন্মোচিত হয়। শেষ পৃষ্ঠায় এসে সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না—বরং নতুন প্রশ্ন জেগে ওঠে, যা ইতিহাসপ্রীতির জন্য এক অনন্ত প্রেরণা হয়ে থাকে।

এই অসামান্য বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় এমনভাবে নির্মিত যে পাঠক একদিকে প্রমাণের পথ ধরে এগোতে থাকেন, অন্যদিকে ইতিহাসের অন্তরাল থেকে রহস্যের স্তরগুলো আস্তে আস্তে উন্মোচিত হয়। ঠিক যেমন Gordon, Sugata Bose বা Toye-এর কাজে দেখা যায় এক ধরণের অনুসন্ধানমূলক গতি, তেমনই এখানে রয়েছে বাংলা ভাষার নিজস্ব ধ্বনি ও বর্ণনাভঙ্গি।

শেষ পৃষ্ঠায় এসে পাঠক বুঝবেন—সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে না; বরং পুরনো রহস্যের সঙ্গে নতুন প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। যেন “I know not what I know not”—এই প্রাচীন সত্যের পুনরাবৃত্তি। ইতিহাস এখানে কোনও সমাপ্ত অধ্যায় নয়, বরং এক অন্তহীন সংলাপ, যেখানে প্রতিটি আবিষ্কার পরবর্তী অনুসন্ধানের দুয়ার খুলে দেয়। এই অসম্পূর্ণতাই বইটিকে ইতিহাসপ্রীতির এক অনন্ত দৃষ্টান্তে পরিণত করে—যা শেষের পরেও পাঠকের মনে দীর্ঘকাল আলোড়ন জাগিয়ে রাখবে।

এই পাঠানুভূতির শেষে শুধু এটুকুই বলার যে সুভাষচন্দ্রের তুলনা তিনি নিজেই। Vera Hildebrand রচিত 'Women at War: Subhas Chandra Bose and the Rani of Jhansi Regiment' বইয়ের একটি অংশ ভাগ করে নেবো আপনাদের সঙ্গে। জার্মান ঐতিহাসিক Milan Hauner সাহেবকে quote করে Hildebrand লিখছেন:

"Milan Hauner, the German historian, saw Bose as ‘the tragic hero of Asian nationalism, a Sisyphus-like figure, constantly overtaken by events and destined to lose the struggle’.

Perhaps a better Bose comparison might be drawn with Icarus, another Greek mortal who came to a bad end, but in his case because of his lofty aspirations rather than his sadistic crimes.

An extraordinarily gifted man dedicated to bringing freedom to his people, Bose sacrificed everything and probably thought he had failed.

However, year by year, India has moved closer to the destiny that Bose had envisioned for his beloved Motherland...."


সংগ্রহে রাখুন এই বইটি—এ কেবল ব্যক্তিগত পাঠের আনন্দই দেবে না, বরং ভবিষ্যতের গবেষণা ও পাঠচর্চারও একটি নির্ভরযোগ্য সহচর হয়ে উঠবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আগামীদিনে এই গ্রন্থ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে স্থান পাবে।

অলমতি বিস্তরেণ—বিস্তারিতের মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের অগণিত সূক্ষ্ম স্রোত, যা পাঠককে নিয়ে যাবে গভীরতর অনুসন্ধানে।

(রাখিপূর্ণিমা, ৯ই আগস্ট, কলকাতা)
Displaying 1 of 1 review

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.