১৯৫৯ সালের ১লা ফেব্রুয়ারির রাত। ইগর ডাটলভের নেতৃত্বাধীন ন'জন হাইকার— যাদের মধ্যে দলনেতা-সহ আটজন নিতান্তই তরুণ-তরূণী— উরাল পাহাড়ের মাউন্ট ওটারটেন থেকে কিছুটা দূরে, খোলাত-সিয়াকাল এলাকায় তাঁবু খাটাল। ততদিন অবধি তাদের অভিযান কেটেছিল নির্বিঘ্নে। তাঁবুর ভেতরেও সবাই ঝাড়া হাত-পা হয়ে বসেছিল। তারপর...
কী ঘটেছিল তারপর?
এ-প্রশ্নের সর্বসম্মত উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। শুধু নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেছিল ন'টি মৃতদেহ— তাঁবু থেকে অনেক দূরে-দূরে, নানা অবস্থায়।
ব্যাপারটা দুনিয়া-কাঁপানো কোল্ড কেসগুলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে, কারণ মৃতদেহগুলো যে ধরনের নানা বিকৃতি ও আঘাতের শিকার হয়েছিল তা প্রায় অভাবনীয়। সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে হিমসিম খেয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত প্রশাসন৷ এমনকি ২০১৯ সালে রাশিয়ান সরকার নতুন করে অনুসন্ধান চালিয়ে তার যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, তা প্রায় কাউকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
ঠিক কী হয়েছিল সেই রাতে ওই হাইকারদের সঙ্গে?
বাংলায় এই ঘটনাটির উল্লেখ কয়েকটি বইয়ে পেলেও শুধুমাত্র এই কেসের অনুসন্ধান নিয়েই একটি আস্ত বই এই প্রথম পাওয়া গেল। লিখলেন এই সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের একজন।
কেমন লাগল বইটা?
প্রথমত, গতে-বাঁধা নন-ফিকশন বইয়ের মতো প্রস্তাবনা, পদ্ধতি বর্ণনা, তথ্যাবলি, সিদ্ধান্ত, শেষে পাঠনির্দেশ— এইভাবে বইটাকে আদৌ সাজানো হয়নি। বরং অসরলরৈখিক আকারে, কোনো রহস্যকাহিনির মতো করে এক অনুসন্ধানী দলের চোখে ঘটনার ক্রমশ উন্মোচন দিয়ে শুরু হয়েছে এই বই।
দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক অভিযাত্রীর সংক্ষিপ্ত অথচ বর্ণাঢ্য পরিচিতি দিয়ে লেখক আমাদের মনে তাদের প্রতি আন্তরিক সহানুভূতি ও তাদের পরিণতি নিয়ে কৌতূহলের পাশাপাশি দুঃখও জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বইটা শুধুমাত্র ঘটনাটির 'পোস্ট-মর্টেম' বিশ্লেষণ হয়েই থাকেনি। সেটিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া হতাশা, ক্ষোভ এবং বিস্ময়ের ছবিটিও তিনি যথাযথভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন।
তৃতীয়ত, প্রচুর ছবি ও চার্টের সাহায্যে এই বইয়ে ঘটনাটির সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে প্রস্তাবিত প্রতিটি তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ছবিগুলো আরও বড়ো ও স্পষ্ট হলে হয়তো ভালো হত। কিন্তু বইটির ক্রাউন সাইজের কথা মাথায় রেখেই হয়তো সেগুলোকে এভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে তাতেও, তত্ত্বগুলোর বক্তব্য এবং তাদের সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন লেখক।
চতুর্থত, লেখক কোনো খলনায়ক (বা খল সংগঠন/রাষ্ট্র)-কে নন্দ ঘোষ বানিয়ে সব দায় তার ওপর চাপাননি। বরং সব তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে নিজের ধারণাটিকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি সেটির বিপক্ষে কয়েকটি যুক্তিও দিয়েছেন তিনি। এই ধরনের নিরপেক্ষ আলোচনা যেমন প্রশংসনীয়, তেমনই বিরল।
সব মিলিয়ে বলব, এ এক অসাধারণ বই। স্থানে-স্থানে এর বর্ণনা এমনই শ্বাসরুদ্ধকর যে সেই অংশগুলো পড়ার সময় ঘরে হওয়া টুকরো শব্দও রীতিমতো চমকে দিয়েছে আমাকে। তারই পাশাপাশি এ বই দেখিয়েছে, প্রকৃতির বুকে আজও কত রহস্য, কত বিপদ লুকিয়ে রয়েছে হয়তো কল্পনারও অতীত, অথচ ঘোর বাস্তবিক সম্ভাবনা হয়ে।
সাড়ে ছয় দশক আগের কয়েকটি মৃত্যুর তদন্তই শুধু নয়; এই বই সত্যান্বেষণের এক চমৎকার নিদর্শন— যেমনটি আমরা পড়তে চাই, কিন্তু বিশেষ পাই না।
সুযোগ পেলে অতি অবশ্যই বইটি পড়ুন। আপনাদের অনুগ্রহ পেলে হয়তো লেখক ও প্রকাশকের জুটি আমাদের আরও কিছু সত্যানুসন্ধান এভাবেই পরিবেশন করবেন। তেমন কিছুর আশাতেই রইলাম।