কম্বোডিয়ার খামের সাম্রাজ্যের প্রাচীন মন্দির নগরী ইতিহাস প্রসিদ্ধ আঙ্করভাট। বহু শতাব্দী নিভৃতে ঘুমিয়ে থাকার পর গত শতকে যা আবার আত্মপ্রকাশ করেছে পৃথিবীর মানুষের কাছে। আঙ্করভাটের বিষ্ণু মন্দির এক সময় পরিচিত ছিল 'বিষ্ণুলোক' নামে। মৃত্যুর পর পুণ্যবান ব্যক্তিদের আত্মারা নাকি স্থান পেত বিষ্ণুলোকে।
মন্দির নগরীর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু পরিচয়হীন প্রাচীন মন্দির। নানা লোককথা শোনা যায় সেই সব মন্দিরকে ঘিরে। স্থানীয় মানুষরা মনে করেন এসব নামহীন মন্দির নাকি দুষ্ট-ভয়ঙ্কর প্রেতাত্মাদের আশ্রয়স্থল। নিজেদের পাপ কর্মের কারণে যারা এক সময় বঞ্চিত হয়েছিল বিষ্ণুলোকের প্রবেশাধিকার থেকে। তারা নাকি শত শত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছে বিষ্ণুলোকের দখল নেওয়ার জন্য। আবার কেউ কেউ মনে করেন এসব মন্দিরের কোনো একটিতে নাকি আজও লুকিয়ে রাখা আছে খামের সম্রাটের গুপ্তধন।
এমনই এক মন্দিরের সংস্কার সাধনের জন্য ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগে কর্মরত একদল যুবক যুবতী সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। তারপর তাদেরকে ঘিরে শুরু হয় নানান রহস্যময় ঘটনা। ইতিহাস আর বর্তমান কখন যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় তাদের চারপাশে। শেষ পর্যন্ত কি সেই প্রাচীন মন্দিরের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারবে কী তারা?
প্রাচীন রহস্যময় মন্দির নগরী আঙ্করভাটের পটভূমিতে রচিত ভয়াল রোমাঞ্চকর সুদীর্ঘ রহস্য কাহিনি 'বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে'।
"বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে" হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্তের কলমে রচিত এমনই এক গভীর রহস্যময় এবং একইসাথে মোহময় কাহিনী, যা সময়ের সুদূর অতল গহ্বর পেরিয়ে ইতিহাস আর অলৌকিকতার এক রহস্যঘন সন্ধিক্ষণে নিয়ে যায়।
এই কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কম্বোডিয়ার প্রাচীন মন্দির নগরী আঙ্কারভাট, যাকে চিরকাল ঘিরে থেকেছে বিস্ময়, পবিত্রতা এবং এক অমোঘ আকর্ষণ। তবে লেখক শুধুমাত্র এর স্থাপত্য বা ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেননি, বরং তার রক্তমাংসের আবরণে, শ্বাসপ্রশ্বাসের উষ্ণতায় তিনি নির্মাণ করেছেন এক গভীর, কল্পনাবিষ্ট জগত - যেখানে অতীত আর বর্তমানের রেখা ক্রমশঃ মিশে যায় রহস্যের অপার্থিব কুয়াশায়।
গল্প শুরু হয়, একটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক দলের আঙ্কারভাট আগমনের মধ্য দিয়ে। তাদের কাজ সেখানে একটি পুরোনো, অচেনা মন্দিরের সংস্কার। কিন্তু সংস্কারের নিরীহ কাজের আড়ালে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে এক অজানা, অলক্ষিত কিছুর অস্তিত্ব। স্থানীয় কিংবদন্তি, ভাঙাচোরা প্রতীক, অদ্ভুত অনুরণন আর নিশীথ রাতের নিস্তব্ধতা মিলেমিশে গড়ে তোলে এক অদ্ভুত পরিবেশ। আঙ্কারভাটের সুবৃহৎ বিষ্ণু মন্দির যা "বিষ্ণুলোক" নামে পরিচিত তা বহন করে এমন এক বিশ্বাস, যেখানে বলা হয়, মৃত্যুর পর পুণ্যবান আত্মাদের পারলৌকিক কাজ সম্পন্ন হবার পর তারা এই বিষ্ণুলোকেই স্থান পেতো। কিন্তু, যে সকল দুষ্টু আত্মারা বিষ্ণুলোকে স্থান পেতো না, তারা চেষ্টা করত বিষ্ণুলোক দখল নেওয়ার। বিষ্ণুলোকের আশেপাশের অজানা মন্দিরেই তাদের বাস। আবার কেউ কেউ এও বিশ্বাস করত যে, হারিয়ে যাওয়া কোনো খামের সম্রাটের গুপ্তধন লুকানো আছে এইসব মন্দিরেই। স্বাগত, নাতাশা, প্রফেসর রামমূর্তি, নারেং খাম, গাইড ফং - সবাই অদ্ভুতভাবে জড়িয়ে পড়ে এই রহস্যের সাথে এবং তাদের হাত ধরেই ইতিহাস অনুরণন তোলে বর্তমানের দরজায়।
এই উপন্যাসে ইতিহাস প্রেক্ষাপটের বদলে এক জীবন্ত চরিত্র হয়ে ওঠে যে চরিত্র, সময়ের প্রবাহে মানুষের হৃদয়ে তার অনিবার্য ছাপ রেখে চলে। স্থান, কাল ও মানবমন তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা এই কাহিনী পড়তে পড়তে আচ্ছন্ন করে তোলে। এই উপন্যাসে আরও একটি ভালো লাগার জায়গা হলো, লেখক যেভাবে চরিত্র নির্মাণ করেছেন। প্রত্যেকটি চরিত্রের অন্তরের ভয়, দ্বন্দ্ব, কৌতুহল আর অজানা তাড়না - লেখক দেখিয়েছেন দারুন ভাবে।
শেষ পর্বেও কাহিনী মোড় নেয় এমন এক জায়গায় যেখানে শুধু মাত্র উত্তরের সন্ধান নয় বরং এক প্রকার আত্মসমর্পণের অনুভব আসে - অনিবার্য অথচ মধুর। একটু কষ্টও লাগে।
"বিষ্ণুলোকে সন্ধ্যা নামে" থ্রিলারের পাশাপাশি অনুভবের যাত্রাও করায়। অনুভূতির নরম ছায়া, অতীতের ব্যাথাতুর স্পর্শ, কিছু আবছা স্মৃতি এবং মানবমনের গভীর ঘূর্ণির সঙ্গে সাক্ষাৎ করায় আর পোঁছে দেয় সেই দিগন্তরেখায় যেখানে যেনো সত্যিই সন্ধ্যা নেমে আসছে বিষ্ণুলোকের আকাশ ছুঁয়ে...উজ্জ্বল, অপার্থিব, নিস্তরঙ্গ সন্ধ্যা।