বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র, আইকাওয়া মামোরু, রহস্য আর অজানার প্রতি রয়েছে তার দুর্নিবার এক আকর্ষণ। কৌতূহলী মন তাকে প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যায় অচেনা পথে, যেখানে প্রতিটি মোড়ে লুকিয়ে থাকে নতুন রহস্য। তেমনই এক সন্ধ্যায়, ছোট বোন তামাকো আর শিক্ষিকা কিয়োকো তেনোমুরার সঙ্গে এক রেস্তোরাঁয় খেতে বসে মামোরু এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়।
কিয়োকো খেয়াল করেন, রেস্তোরাঁর এক কোণে বসা নীল চশমা পরা এক ব্যক্তির আচরণ কেমন যেন অস্বাভাবিক। লিপরিডিং বা ঠোঁট নড়াচড়া দেখে ভাষা বুঝতে পারার বিরল দক্ষতার বলে কিয়োকো আবিষ্কার করে ওই ব্যক্তি ভয়ংকর এক ষড়যন্ত্রের নীলনকশা আঁকছে।
কিয়োকোর এই পর্যবেক্ষণ মামোরুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। অদম্য কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে যায় এক পরিত্যক্ত বাড়ির সামনে। ওখানে গিয়ে সে এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হয় যা তার মনের গভীরে অদৃশ্য এক গভীর দাগ কেটে যায়। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর মামোরু ছুটে যায় পুলিশের কাছে। কিন্তু যখন পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন সেখানে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নেই।
পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে শুরু করে, যখন তাদের নিজেদের বাড়িতেই ঘটতে থাকে রহস্যময় সব ঘটনা। মামোরু বুঝতে পারে, সে এবং তার বোন এখন এক ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে। পরিবারকে রক্ষা করার দায়িত্ববোধ আর সত্য উদ্ঘাটনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে ঠেলে দেয় এমন এক অভিযানের দিকে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে অপেক্ষা করছে অজানা বিপদ, অচেনা রোমাঞ্চ।
অন্ধকারের সাথে শুরু হয় তার লড়াই। কে এই রহস্যময় নীল চশমাধারী? কী তার পরিচয়? কী তার উদ্দেশ্য? হিংসা, লোভ আর প্রতিশোধের এই ভয়ানক খেলার শেষ কোথায়?
Hirai Tarō (平井 太郎), better known by the pseudonym Rampo Edogawa ( 江戸川 乱歩), sometimes romanized as "Ranpo Edogawa", was a Japanese author and critic who played a major role in the development of Japanese mystery fiction.
আইকাওয়া মামোরু একজন অনুসন্ধিৎসু স্বভাবের যুবক। একদিন তার একমাত্র ছোট বোন সোইচি তামাকো আর তার গৃহশিক্ষক কিয়োকো তোনোমুরাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলো মামোরু। সেখানে খেতে খেতে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলো তিনজনই। ব্যাপারটা প্রথমে মূলত গৃহশিক্ষিকা তোনোমুরাই ধরতে পারলেন। ওই রেস্টুরেন্টেরই এক টেবিলে নীল চশমা পরা অদ্ভুত এক লোক তার এক সঙ্গীর সাথে ভয়ঙ্কর একটা পরিকল্পনা করছিলো। তোনোমুরা যেহেতু লিপ রিডিং জানতেন, তাই সহজেই সেই নীল চশমাধারীর পরিকল্পনাটা বুঝে ফেলেন তিনি৷ ব্যাপারটা তিনি শেয়ার করেন মামোরু আর তার ছোট বোন তামাকোর সাথে। আর ঠিক এখান থেকেই সূচনা ঘটে মেরুদণ্ড শীতল করে দেয়া এক গল্পের।
রেস্টুরেন্টের এই ঘটনাটার পরদিন গোয়েন্দা গল্পের পোকা মামোরু এমন কিছু দেখতে পায় যা তার চিন্তাচেতনাকে চিরদিনের মতো পাল্টে দেয়। টোকিওর এক নির্জন লাল ইটের পরিত্যক্ত বাড়িতে মামোরুর চোখের সামনে ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। এই ঘটনা টোকিও পুলিশেরও টনক নড়িয়ে দেয়। আর এই ঘটনার সাক্ষী হওয়ার অপরাধেই যেন মামোরুর ওপর নেমে আসে এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ। রেস্টুরেন্টে দেখা সেই নীল চশমা পরা লোকটা তাকে বলে যে শীঘ্রই তারা তার একমাত্র আদরের ছোট বোন তামাকোকে খুন করতে চলেছে। আর তাদের হাত থেকে মেয়েটার বাঁচার কোন সম্ভাবনাও নেই, এমন কথাও লোকটা মামোরুকে জানায়। এই চরম বেপরোয়া আর চালাক অপরাধীদল পুরো টোকিও জুড়ে লাল বিচ্ছু নামে পরিচিত। কারণ তারা তাদের অপরাধের স্থানে ফেলে রেখে যায় রক্তাভ লাল বিচ্ছু।
মামোরুর পুরো পরিবারে নেমে আসে আতঙ্কের এক কালো ছায়া। বাবা সোইচির সাথে পরামর্শ করে মামোরু সাহায্য চাইতে যায় টোকিওর বিখ্যাত গোয়েন্দা মিকাসা রিউসুকের কাছে৷ কিন্তু সব জায়গাতেই যেন লাল বিচ্ছু গ্যাং তাদের থেকে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে থাকছে। বয়স্ক ও অভিজ্ঞ গোয়েন্দা মিকাসা রিউসুকেকেও যেন তারা ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আর এই কারণেই লাল বিচ্ছু গ্যাংয়ের এই দৌরাত্ম্যের ব্যাপারটাকে ব্যক্তিগতভাবে নিলেন মিকাসা। একটা ভয়ঙ্কর অপরাধী চক্র, যাদের মূল টার্গেট সুন্দরী মেয়েদের খুন করা আর একজন বৃদ্ধ গোয়েন্দা, যিনি এই নিষ্পাপ মেয়েদেরকে যেকোন মূল্যে রক্ষা করতে চান - এই দুই পক্ষের মধ্যে জমে উঠলো এক তুমুল লড়াই। যে লড়াইয়ে বুদ্ধির খেলার পাশাপাশি আছে নৃশংসতা আর প্রতিশোধের এক অদ্ভুত ছোঁয়া।
গোয়েন্দা হতে চাওয়া যুবক মামোরু আর অভিজ্ঞ গোয়েন্দা মিকাসা কি শেষ পর্যন্ত লাল বিচ্ছু গ্যাংকে পরাস্ত করতে পারবেন? নাকি টোকিও জুড়ে এই গ্যাংয়ের কায়েম করা ভয় আর ত্রাসের রাজত্বকাল আরো দীর্ঘায়িত হবে?
এদোগাওয়া রাম্পোকে বলা হয় আধুনিক জাপানিজ থ্রিলারের পথপ্রদর্শক। ভদ্রলোকের আসল নাম হিরাই তারো। লেখালেখির দিক থেকে এদোগাওয়া রাম্পো সবসময়ই অনুসরণ করেছেন তাঁর প্রিয় লেখক এডগার অ্যালান পো-কে। আর এই কারণেই তিনি হিরাই তারো নামে না লিখে এদোগাওয়া রাম্পো ছদ্মনামেই লিখে গেছেন। আমি এর আগে তাঁর কোন লেখা পড়িনি। 'রক্তবিছা' দিয়ে এদোগাওয়া রাম্পোর লেখার সাথে পরিচয় ঘটলো আমার। জাপানিজে বইটার নাম 'Yochu'। ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ার পর এর নাম হয় 'The Phantom Insect'। আর বাংলায় বইটার নাম রাখা হলো 'রক্তবিছা'। বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে আমার কাছে নামকরণটা। বইটা শেষ করার পর এই নামকরণ আমার কাছে দারুণ সার্থক মনে হয়েছে।
এদোগাওয়া রাম্পো তাঁর 'রক্তবিছা' উপন্যাসটা লিখেছেন ১৯৩০-এর দশকের জাপানের প্রেক্ষাপটে। লাল বিচ্ছু নামের এক ভয়ঙ্কর ক্রাইম সিন্ডিকেট আর এক বৃদ্ধ গোয়েন্দার মধ্যেকার দ্বৈরথের গল্প উঠে এসেছে তাঁর এই উপন্যাসে৷ কাহিনিটা বেশ উপভোগ্য। একটা আদর্শ ক্লাসিক মিস্ট্রি থ্রিলারের প্রায় সব গুণই 'রক্তবিছা'-তে উপস্থিত। যদিও বইটা পড়ার সময় ফার্স্ট হাফের কিছুটা আগেই আমি মূল কালপ্রিট কে সেটা ধরে ফেলেছিলাম। এই কারণে বইটা শেষ করার আগ্রহ একটু কমে গেছিলো। কিন্তু সেকেন্ড হাফের পর থেকে লেখক এদোগাওয়া রাম্পোর লেখার গুণে সেই হারিয়ে ফেলা আগ্রহটা আবারও ফিরে পেয়েছিলাম। তখন আমার জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছিলো অ্যান্টাগনিস্টের মোটিভ আর তার প্ল্যান এক্সিকিউশনের পদ্ধতিগুলোর ব্যাপারে।
এই কথা মানতে আমার কোন দ্বিধা নেই যে 'রক্তবিছা'-এর অ্যান্টাগনিস্ট হিসেবে ভূমিকা পালন করা লাল বিচ্ছু গ্যাংয়ের বুদ্ধিদীপ্ত কর্মকাণ্ড আমি ভালোই উপভোগ করেছি। পুরো কাহিনি জুড়েই এই গ্যাং একটা টেনশন আর ভয়ের আবহ তৈরি করে রেখেছিলো। এই উপন্যাসের মেইন প্রোটাগনিস্ট বৃদ্ধ গোয়েন্দা মিকাসা রিউসুকে ও প্রবল কৌতূহলী স্বভাবের যুবক মামোরুকেও আমার দারুণ লেগেছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা মিকাসার দারুণ অভিনয় দক্ষতা আর রহস্য সমাধানের পদ্ধতি বেশ স্মার্ট লেগেছে আমার কাছে। 'রক্তবিছা'-এর কিছু সিকোয়েন্স লেখক এদোগাওয়া রাম্পো এমনভাবে বিল্ড করেছেন যে পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো কোন মঞ্চনাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ছি। অবশ্য ১৯৩০-এর প্রেক্ষাপটে লেখা একটা মিস্ট্রি থ্রিলার উপন্যাসের আদি ও অকৃত্রিম ক্লাসিক ভাইবটা নিয়ে আসার জন্য এই ব্যাপারটা আমার কাছে খারাপ লাগেনি।
'রক্তবিছা'-এর শেষটা হয়েছে যেমনটা অনুমান করেছিলাম, তেমন ভাবেই। মোটিভ সহ অনেক কিছুই নিজের আন্দাজের সাথে মিলে গেছে। তবে বইটা শেষ করে আমি এদোগাওয়া রাম্পোর অন্যান্য বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছি। তাঁর গল্প বলার ধরণ আমার কাছে বেশ ক্লাসিক মনে হয়েছে। ধীরে ধীরে তাঁর অন্যান্য বইগুলোও পড়ে ফেলবো। এই সময়ের অন্যতম পাঠকপ্রিয় অনুবাদক কাবিদ হাসান শিবলী। তিনি 'রক্তবিছা' বইটা সরাসরি জাপানিজ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। বইটার অনুবাদ অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল লেগেছে আমার কাছে। ওভারঅল 'রক্তবিছা' সুখপাঠ্য লেগেছে আমার। আরেকটা ব্যাপার বেশ ভালো লেগেছে। সেটা হলো, উপন্যাসটার প্রত্যেকটা অধ্যায় শুরু হয়েছে চমকপ্রদ কিছু শিরোনাম দিয়ে। এই ব্যাপারটা পুরো উপন্যাসে একটা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
'রক্তবিছা'-এর সম্পাদনা ভালো হয়েছে। একটা/দুইটা মাইনর টাইপো পেয়েছি শুধু। আর একটা ভুল একটু চোখে লেগেছে। সেটা হলো বইয়ের ভেতরে অনুবাদকের নাম ভুল বানানে 'শিবলি' লেখা হয়েছে। যদিও প্রচ্ছদ আর ডাস্ট কভারে তাঁর নাম 'শিবলী'-ই ছিলো। পরবর্তী এডিশনে এই ভুলটা শুধরে নেয়া হবে আশা করি। পরাগ ওয়াহিদের করা প্রচ্ছদটাও বেশ ভালো লেগেছে আমার। নটিলাস-এর প্রোডাকশন নিয়েও কোন অভিযোগ নেই। ক্লাসিক জাপানিজ মিস্ট্রি থ্রিলার পড়তে চাইলে 'রক্তবিছা' পড়ে ফেলতে পারেন।