এই মহাবিশ্বের যেকোনো সৃষ্টি সুন্দর। স্রষ্টা তার নিজস্ব হাতে অতি যত্নে এই বিশ্বের সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন। যাকে আমরা কুৎসিত বলি, কদাকার হিসেবে অভিহিত করি, তাও এই সৌন্দর্যের একটা অংশ। অথচ মানুষের মন, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এতটাই বিস্ময়কর; নিজের কাছে যা সুন্দর না, তাকে উপহাস করতেই যেন আনন্দ।
আমার কাছে জীবন মানে একটি যাত্রা। এক অনন্ত পথে এগিয়ে যাওয়া। এই এগিয়ে যাওয়ার পথে টুকরো টুকরো কিছু গল্প ছড়িয়ে যায়। সেসব গল্প এক অপরের সাথে জুড়ে তৈরি হয় উপন্যাস। উপন্যাসের পাতায় যেমন গল্পেরা ডানা মেলে, জীবন তার পথ খুঁজে পায়, কিংবা ধরে নেওয়া যায় সে তার গন্তব্য হারিয়েছে! আমাদের জীবনটাও ঠিক তেমনই। ছোটো থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ক্ষণে যে গল্পের বিচরণ, পরিজাদ যেন তারই সাক্ষী হয়েছে প্রতিনিয়ত। উত্থান-পতনের নানান রোমহর্ষক ঘটনা, ভালোবাসার মহাপ্লাবন, হারিয়ে যাওয়ার একান্ত বাসনা, সবই যেন পরিজাদকে এক অনন্য মানুষে পরিণত করেছে। এ যাত্রা ভয়ংকর। নানান ঘাত প্রতিঘাত যেখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তবুও জীবন যেহেতু থেমে থাকে না, এগিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু কোন পথে? তা হয়তো সময়ের ঘূর্ণিতেই নির্ধারণ হবে।
পরিজাদ শব্দের অর্থ পরির বাচ্চা। মানুষের একটি নাম থাকে। যে নাম নিজেকে জানান দেওয়ার একটা উপকরণ মাত্র। এর সাথে বাস্তবের মিল থাকতেও পারেজ আবার নাও ঝাকিয়ে পারে। নামে পরির বাচ্চা হলেও পরিজাদের যেদিন জন্ম হলো, পৃথিবীর সব আলো সেদিন অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো। কদাকার এই রূপ হলো উপহাসের বস্তু। খালার উপহাস শুনে মা জেদ করে নাম রাখলেন পরিজাদ। এই জেদের বসে রাখা নামটাই পরিজাদের কষ্টের উপলক্ষ্য হয়ে ধরা দিলো। নামের সাথে চেহারা সুরতের মিল নেই। তাই যতই বড়ো হতে থাকল পরিজাদ, ততই মানুষের হাসি তামাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে শুরু করল।
বোঝার সুবিধার্থে এই উপন্যাসকে তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। প্রথম অংশ পরিজাদের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার একটা যাত্রা। যে যাত্রা কখনোই সুখকর ছিল না। মানুষ তার নাম নিয়ে উপহাস করত। চেহারা দেখে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকাত। কেননা নামের সাথে চেহারার কোনো মিল নেই। ফলে যে অবজ্ঞা সহ্য করতে হয়েছিল, তার সাথে একসময় মানিয়ে নেওয়া সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবেই ধরা দেয়।
পরিজাদ মানুষের সাথে কথা বলতে স্বচ্ছন্দবোধ করে না। তার কাছে একাকীত্বই সবচেয়ে কাছের। এমনকি পরিবারের থেকেও দূরে দূরে। এলাকায় কিছু বন্ধু থাকলেও ঠিক গুরুত্ব পাওয়া হয় না। এর মধ্যে তার একটা গুণ প্রবল হিসেবে ধরা দেয়। সে উর্দুতে ভালো। ফলে স্কুলে থাকাকালেই এক শ্রেণী নিচে এলাকার সবচেয়ে সুন্দরীকে পড়ানোর সুযোগ হয়। কিন্তু প্রেম মনে বাসা বাঁধার আগেই সব শেষ।
তার এই উর্দুর প্রতি জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তার কবি সত্তাকে জাগ্রত করে। এলোমেলো কিছু শব্দের আলোড়ন কবিতা হয়ে ধরা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যা তার একমাত্র পরিচয় হয়ে ধরা দেয়। সেই কবিতার মুগ্ধতা, শেক্সপিয়রের ওথেলোর উর্দু ভাষান্তরে মঞ্চনাটক তাকে আর লুবনাকে কাছাকাছি এনে দেয়। কিন্তু দিন শেষে ব্যক্তিত্ব কিংবা চেহারায় কোনো আকর্ষণ নেই। নেই অর্থের প্রাচুর্য। তখন প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী আবারও সামনে এসে হাজির হয়। পরিজাদ সেদিন বুঝেছিল, এই দুনিয়ায় টাকা ছাড়া কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। তাই নিজের কবি সত্তাকে বিক্রি করে সে পাড়ি জমায় অন্য বিভুঁইয়ে। শুরু হয় তার জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।
বইটির দ্বিতীয় অংশ তার দুবাই জীবন। অর্থের অন্বেষণে, প্রচুর টাকা কামাই করার লক্ষ্যে যখন সে দুবাই আসে, তখন নির্দিষ্ট কোনো কাজ ছিল না। টুকটাক কাজ এই হাড়ভাঙা খাটুনি করেই চলে যেত। এরপর পরিচয় মেলে দুবাইয়ের অন্যতম মাফিয়া বেহেরোজ করীমের সাথে। তার বিশ্বস্ততা অর্জন থেকে শুরু করে একান্ত ভালোবাসার উপর নজরদারির জন্য আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। লায়লা সাবাকে বেহেরোজ করীম ভালোবাসে সবচেয়ে বেশি, তার সবগুলো স্ত্রীর চেয়েও বেশি। তাই নজরবন্দী রাখতেও পছন্দ করে। এই দায়িত্ব যখন পরিজাদকে দেওয়া হয়, সে কি সামাল দিতে পারবে?
রূপে অনন্য লায়লা সাবাকে নিয়ন্ত্রন করা পরিজাদের নাগালের বাইরে। উল্টো সে-ই নিয়ন্ত্রিত হতে লাগল। ফলে যা হবার তা-ই হলো! বেহেরোজ লায়লার বিশ্বাসঘাতকতা ধরে ফেলল। আর একজন মাফিয়ার কাছে বিশ্বাস ভঙ্গের পরিণতি….
ভালোবাসা একজন মানুষকে যেমন শক্তিশালী করে তোলে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়; অন্যদিকে সে ভালোবাসার জন্য জীবনের সবকিছু হারিয়ে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। বেহেরোজ সবকিছুই হারিয়েছে। প্রবল প্রতিপত্তি, অর্থের ঝনঝনানি সব যেন দূরের অতীত। শেষবেলায় তাই তার সকল সম্পত্তি বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাঝে বিলিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে এই আলোর পৃথিবী থেকে। হারিয়ে যাচ্ছে গহীন অন্ধকারে। তার আগে ভাগ্য খুলে দিয়ে গেছে পরিজাদের।
একজন অবহেলা, অবজ্ঞা পাওয়া মানুষ যখন রাতারাতি মানুষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় তখন সে কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। সেই বাঁধা অতিক্রম করে পরিজাদ এগিয়ে যেতে থাকে। তবে নিজ দেশ তো বারবার টানে। তাই একদিন সিদ্ধান্ত নেয় দেশে ফিরে যাবে। সেখানে ব্যবসা শুরু করবে নতুন করে।
এখান থেকেই বইয়ের তৃতীয় অংশের শুরু। পুরো উপন্যাসজুড়ে পরিজাদের একাকীত্বের গল্প লেখা আছে। মানুষ কখন সবচেয়ে বেশি এক হয় জানেন? যখন প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করে। এত মানুষ চারিপাশে, কিন্তু কখনোই নিজের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তখনই মানুষ সবচেয়ে বেশি একা হয়ে যায়। তার এই একাকীত্ব কখনোই দূর হয় না। মানুষ টাকার সুবাস পেলে মৌমাছির মতো চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে। এদের কেউ আপন হয় না। সুসময়ের বন্ধু হিসেবে আসে, প্রয়োজন শেষে একবারের জন্যও খোঁজ রাখার চেষ্টা করে না।
এই উপন্যাস পাকিস্তানের সমাজ ব্যবস্থার এক অন্যতম নিদর্শন হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। শুধু পাকিস্তান কেন, পুরো পৃথিবীতে মানুষের একই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান। যেখানে সবাই বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই গুরুত্ব দেয়। আমাদের নিজস্ব জীবন আর জীবন থাকে না। আমাদের জীবনের গতিপথ ঠিক করে দেয় আমাদের সমাজ। সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে কিংবা সমাজের মন মতো চলতে না পারলে আমাদের জীবনকে এমনভাবে দুর্বিষহ করে তোলে, এরচেয়ে জীবনের শেষ হয়ে যাওয়ায় ভালো মনে হয়। লোকে কী বলবে, সমাজ কী ভাববে! তাই ভাবতে ভাবতে কেটে যায় আমাদের জীবনের অধিকাংশ সময়। এই ভাবনা চিন্তাতে নিজের মতো করে বেঁচে থাকা হয় না।
এই উপন্যাসের পুরোটা আমরা পরিজাদের বয়ানে জানতে পারি। নিজের জীবনের গল্প এক অদ্ভুত বিষন্ন উপায়ে বলে গিয়েছে সে। ফলে পরিজাদ ব্যতীত কোনো কিছুই ঠিকঠাক প্রস্ফুটিত হয়নি। অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা ছিল বইটিতে। প্রতিটি চরিত্র এসেছে পরিজাদকে কেন্দ্র করে। আর সময় মানুষের জীবনকে এমনভাবে পরিচালিত করে, কখনো কাছের মানুষ হয়ে যায় দূরের। আবার কখনও দূরের মানুষ কাছের হিসেবে ধরা দেয়। সম্পর্ক ভাঙে, গড়ে, হারিয়ে যায়। আবার ফিরেও আসে। চরিত্রগুলোর এই খেলা উপন্যাসকে করে তুলেছিল প্রাণবন্ত।
যেসব মানুষের অঢেল টাকা পয়সা, তারা সেই অর্থ ব্যয় করার জায়গা খুঁজে পায় না। তাই অপচয়, অপাত্রে দান করে টাকার শ্রাদ্ধ করে। অথচ কত জায়গা আছে, যেখানে একটি খরচ করলে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো যায়। পরিজাদের এই মানবিক গুণাবলী ভালো লেগেছে। সে কোনো অপাত্রে নিজের সম্পদ ব্যয় করে না। যেখানে খুব বেশি প্রয়োজন, মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টাতেই তার এই অর্থের ব্যবহার। কাছের মানুষের কাছে নিবেদিত প্রাণ। দিন শেষে অর্থ দিয়ে সব কেনা যায়, কিন্তু জীবন নয়। তাই শত-কোটি টাকা দিয়েও প্রিয়জনকে কি বাঁচানো যায়? চেষ্টার ত্রুটি না রাখলেও একসময় হেরে যেতে হয়।
এই উপন্যাসের মূল উপাদান ছিল ভালোবাসা। যে একাকীত্বের জীবন কাটিয়ে দেয়, তার কাছে ভালোবাসা যেন অমুল্য সম্পদ। মানুষ ভালোবাসার কাঙাল। একটু ভালোবাসার জন্য কত কী না করতে পারে! কিন্তু দিনশেষে এই ভালোবাসা হয়তো কাছে এসেও দূরে হারিয়ে যায়। ভালোবাসার প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে হেরে যেতে হয়। কখনো তীব্র আক্রোশ মনের মধ্যে ক্রোধের জন্ম দেয়, যাতে ছাইভস্ম হয়ে যায় সবকিছু।
লেখকের লেখার ধরন ভালো লাগলেও একটু একঘেয়ে লাগছিল মাঝে মধ্যে। তার কারণ লেখক সংলাপের চেয়ে বর্ণনায় জোর বেশি দিয়েছেন। ফলে গতিও ধীর হয়ে উঠেছিল বইয়ের। অবশ্য এ জাতীয় বই, যেখানে জীবন দর্শন প্রাধান্য পেয়েছে, সমাজের একাধিক দিক উন্মুক্ত হয়েছে, জীবনের কত পথ, কত বাঁক যে লেখক তার লেখায় দেখিয়েছেন তার ইয়াত্তা নেই। এমন গল্পের উপাখ্যান মস্তিষ্কে ঠাঁই দিতেও সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই এই ধীর গতির জীবনবোধের উপন্যাস দারুণ এক অনুভূতি দিয়ে যায়।
উপন্যাসের শেষটা প্রত্যাশিত। জন্ম দিয়ে শুরু হলে শেষটা কেমন হওয়া উচিত, পাঠকমাত্রই টা বুঝতে পারবে। তবুও ভিন্ন কিছু চাওয়া পাঠকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। পরিজাদকে পছন্দ হওয়ার কারণ, তার ধীরস্থির চিন্তাশক্তি। জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানোর শেষ প্রয়াসে তিনি কতটুকু পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন? না-কি জীবনের কাছেই শেষে এসে ধরা দিতে হয়েছিল? ভালোবাসার কাছে হার মানতে হয়েছিল? না-কি জিতে গিয়েছিল সে? গল্পের শেষটা বিষাদের। এ বিষাদের গল্পে এক ঘোর লাগা অভিব্যক্তি কাজ করে। পরিজাদের জীবনে জড়িয়ে থাকা নাহীদ, লুবনা, লায়লা সাবা কিংবা অ্যানি! প্রত্যেকের কোনো না কোনো ভূমিকা আছে। একজন পুরুষ যতই একাকীত্বে জীবন কাটিয়ে যাক না কেন, নারীর প্রভাব অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। জীবনের শুরু থেকে শেষ — মা, বোন, প্রেমিকা, স্ত্রী বা অন্যকেউ। তাদের জন্যই ভালোবাসার তাজমহল, তাদের জন্যই সাধু সন্যাসী হয়ে জীবনের কতকগুলো বছর পার করে দেওয়া!
অনুবাদ খুবই দুর্দান্ত হয়েছে। এই জাতীয় বইয়ের ক্ষেত্রে যেমন অনুবাদ প্রয়োজন ঠিক, তেমনই অনুবাদ হয়েছে। আমার দ্বিতীয় উর্দু বইয়ের অনুবাদ পড়া। বেশ ভালোই লেগেছে। বিশেষ করে বিষন্নতায় ভরা, আবেগের সাথে জড়িয়ে রাখা এমন অনুবাদ না হলে বইটা উপভোগ করা যেত না। তবে অনুবাদকের বেশ কিছু শব্দ বেশি ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করেছি। ক্ষণিক, একাত-ওকাত জাতীয় শব্দের আধিক্য ছিল। অনুবাদক চাইলে প্রতিশব্দ ব্যবহার করতে পারতেন। তাহলে একই শব্দ বারবার পড়তে গিয়ে বিরক্তি আসত না।
পরিশেষে, “পরিজাদ” এমন এক জীবনের গল্প, যে জীবন ভাগ্যের হাতে বন্দী ছিল। ভাগ্যই তাকে পরিচালনা করেছে। উত্থান পতনের সাক্ষী হতে হয়েছে। মানুষের জীবনটা এমনই, যেখানে সে না চাইতেও অনেক কিছু চলে আসে। আবার শত চাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত বস্তুর দেখা মেলে না। তখন নিজের কাছে নিজের হেরে যাওয়া, নিজেকেও হারিয়ে ফেলা! কোনো এক অন্ধকার কূপে ডুবে যাওয়া অচিরেই।
▪️বই : পরিজাদ
▪️লেখক : হাশিম নাদিম
▪️তরজমা : ইসহাক নাজির
▪️প্রকাশনী : ঐতিহ্য
▪️প্রকাশ সাল : ফেব্রুয়ারি ২০২৩
▪️ব্যক্তিগত সামগ্রী : ৪.৫/৫