প্রৌঢ়া মায়ের অতীতজীবনে কিছু একটা রহস্যের আঁচ পায় দিব্যেন্দু। কিন্তু সেই না জানা কাহিনির খোঁজ পাওয়ার আগেই কর্মসূত্রে সে বদলি হয়ে যায় হারিতপুর গ্রামে।
হারিতপুরে তার সঙ্গে আলাপ হয় আশ্চর্য কিছু মানুষের। তাদের কেউ আত্মভোলা সন্ন্যাসী, কেউ ভিতু প্রেমিক, কেউ বা লোভী রাজনীতিবিদ কিংবা দুদে পুলিশ অফিসার।...
হারিতপুরের দ্রুত বদলাতে থাকা সমাজ ও রাজনীতির অভিঘাতে আচমকাই জড়িয়ে পড়ে দিব্যেন্দু। তার নিজের জীবনও এসে দাঁড়ায় অদ্ভুত এক সন্ধিক্ষণে। সেই টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে দিব্যেন্দু কি মায়ের জীবনের গোপন রহস্যটুকু খুঁজে পায় শেষ পর্যন্ত?
অসংখ্য বিপ্রতীপ চরিত্রের সমাবেশে এই বহুস্তরীয় উপন্যাস একদিকে নিবিড় প্রেমের আখ্যান, অন্যদিকে বর্ধিষ্ণু একটি গ্রামের ক্রমশ ধ্বস্ত হয়ে যাওয়া সমাজ।
জয়দীপ চক্রবর্তী-র জন্ম ১৯৭৪ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার দক্ষিণ রামনগর, কালীবাড়িতে। এখন তিনি বারুইপুরের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে বারুইপুর হাই স্কুলে কর্মরত। ছোটবেলায় স্কুল ম্যাগাজিনের পাতায় লেখালেখির হাতেখড়ি হলেও মূলত বিগত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই বাংলা ভাষার জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকাগুলির পাতায় তাঁর নিয়মিত উপস্থিতির সূত্রপাত। ছোট, বড় দু’ ধরনের পাঠকের কাছেই সমান জনপ্রিয় জয়দীপ নিজে ছোটদের জন্যে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন। তাঁর ছোটদের জন্যে লেখা প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ‘কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান’ পত্রিকায়। ছোটদের প্রথম উপন্যাস ‘আনন্দমেলা’-র পাতায়। কবিতা এবং গদ্যের জন্যে তিনি পেয়েছেন ‘কবিতা পাক্ষিক সম্মান’, ‘দেবযান সাহিত্য পুরস্কার’ এবং ‘অদ্রীশ বর্ধন স্মারক পুরস্কার’। লেখালেখি ছাড়া জয়দীপ চক্রবর্তী ভালবাসেন গল্পের বই, রবীন্দ্রগান এবং নিখাদ আড্ডা।
গল্পের কেন্দ্রস্থল হারিতপুর গ্রাম।। গল্পের শুরু এক আত্মভোলা সন্ন্যাসীকে নিয়ে যিনি হারিতপুরের পরিত্যক্ত শ্মশানের কালীমন্দির সংলগ্ন একটি ছোট্ট ঘরে অনাড়ম্বর জীবনযাপন করেন। কালীমার প্রতি তাঁর ভক্তি অগাধ কিন্তু তিনি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তাঁর খেয়াল নেওয়ার কেউ নেই শুধুমাত্র গ্রামের এক যুবতী, গার্গী ছাড়া। গার্গী এই উপন্যাসের এক শক্তিশালী নারী চরিত্র। জীবনে বড়ো ধাক্কা খাওয়ার পরেও সে কোনো জিনিসকে ভয় পায়না। আর এক চরিত্র - দিব্যেন্দু। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে সে এবং এখন সে চায় তার মা, অতসী নতুন করে জীবন শুরু করুন। তাঁর অতীত জীবনের রহস্য উদঘাটন করতে তৎপর দিব্যেন্দু। কর্মস্হল হারিতপুরে পরিবর্তিত হওয়ার দরুন সে এই জায়গা এবং এখানকার মানুষজনকে সবে চিনতে শুরু করেছে। এছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কীভাবে মোড় নিতে চলেছে তাদের জীবনের গল্প?
উপন্যাসে সমান্তরালে চলতে থাকে দুটি গল্প। দিব্যেন্দু - গার্গীর মধ্যে প্রেমের সূচনা এবং অতসীর অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন। দিব্যেন্দু - গার্গীর প্রেমে নেই কোনো জটিলতা, নেই কোনো চাকচিক্য। সহজ সাবলীল তাদের গল্প। কিন্তু অতসীর জীবনে আসবে কি নতুনত্বের ছোঁয়া?
বইটিকে দেখে শুধুমাত্র প্রেমের উপন্যাস মনে হলেও রয়েছে আরও অনেক উপাদান। অন্ধবিশ্বাস এবং সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এক অমানুষিক, ঘৃণ্য কর্মসাধন। সন্দেহের বশে ভুল মানুষকে বিশ্বাস করার পরিণতি যে কী চরম হতে পারে তা দেখিয়েছেন লেখক।
হিংসাপূর্ণ রাজনীতি এই উপন্যাসের অনেকটা বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে - নিজের পসার বাড়ানোর জন্য নির্দোষ এক মানুষের বিরুদ্ধে এক স্বার্থপর, লোভী মানুষের নির্মম পরিকল্পনা। আমাদের চারপাশে ঘটতে থাকা ঘটনার সঙ্গে যেন অনেকটাই মিল পাই।
উপন্যাসে গ্রাম্য পরিবেশের সুন্দর বর্ণনা আমায় মুগ্ধ করেছে। ধানের খেত, লতানে ঝোপ, ফড়িং, পেঁচার ডাক, ভাঙা মন্দির, আদি গঙ্গার ঘাট, গ্রামের ভিন্ন প্রকৃতির মানুষজন - স্পষ্ট পরিচয় দেয় হারিতপুরের।
কালিকানন্দ - দিব্যেন্দু - গার্গী - অতসী এদের জীবন যেভাবে লেখক একসূত্রে বেঁধেছেন তা প্রশংসনীয়। গল্পটি শুরু সন্ন্যাসী কালিকানন্দকে নিয়ে এবং শেষটাও তাঁকে দিয়েই। গল্পের একাধিক মোড়ের মধ্যে তাঁর আসল পরিচয় নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ। গল্পের শেষটা নাড়িয়ে দিয়ে যায়। আমরা যা চাই তা কি সবসময় পাই? তার বদলে কি আমাদের জন্য থাকে আরও ভালো কিছু? মুক্তির সুখের থেকে বড়ো আর কি কিছু আছে? প্রেম, রাজনীতি, অন্ধবিশ্বাস, গ্রাম্য জীবন ইত্যাদি নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি অবশ্যই পড়ে দেখার মতো।
📍তবে বেশ কিছু ভুল আছে বইটিতে। প্রথম ভুল - একটি চরিত্রের পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও পরের পৃষ্ঠাতেই আবার জিজ্ঞাসা করা হয়েছে সেটা কে। দ্বিতীয় ভুল - একটি চরিত্রের নাম এক জায়গায় ভুল দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় ভুল - একটি বাক্যের মধ্যে একটি শব্দ মিসিং। এছাড়াও কিছু বানান ভুল আছে। আশা করি, প্রকাশনী ভুলগুলি ঠিক করে নেবেন।
প্রচ্ছদ বেশ নজরকাড়া। গল্পে একটা আকর্ষণ আছে। কাল্পনিক শহুরে গ্রাম হারিতপুর ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমান আর অতীত লেখনীর দ্বারা পরিচালিত এবং পরিশেষে মিলিত। কিঞ্জল চরিত্র বহুমুখী। লেখক গুছিয়েছেন প্লট স্বাভাবিকভাবেই। ভালো লেখা। পড়ে ফেলুন।