বক্সা টাইগার রিজার্ভের একটি ছোট অঞ্চল ‘হরিণভূমি বিট্’। সেখানে নদী, অরণ্য আর পাহাড়ের ভয়াল ও বিশাল পটভূমি জুড়ে হঠাৎই শুরু হল এক নারকীয় নাটক। হরিণডুবির এলাকায় রয়েছে একটি ভাঙা দূর্গ, নাম ‘শিরোমণির গড়’। জঙ্গলের আদিবাসীদের বিশ্বাস একদিন ঐ ভাঙ্গা গড়ে আবার ফিরে আসবে তাদের বহুদিন আগে মৃত রাজা – রাজা শিরোমণি। সেইদিনই তারা শহুরে লোকেদের হাত থেকে আবার ফিরে পাবে অরণ্যের অধিকার। শিরোমণির গড়ের দখল পাওয়ার জন্য কোটিপতি মক্ষিরাণি বিনতা মেহরা তার শরীর এবং টাকার থলি পুরোমাত্রায় কাজে লাগালেন। সেখানে তিনি গরে তুলবেন পর্যটনশিল্প। তার সঙ্গে হাত মেলাল মধু বর্মণ, আরণ্যক মানুষদের বিশ্বাসঘাতক নেতা। হরিণডুবির দায়িত্বে থাকা ফরেস্ট অফিসার প্রমিত কিছুতেই বুঝতে পারে না কীভাবে নদীর ওপারে, ভূটানপাহাড়ের মাথায় লুকিয়ে থাকা টেররিস্ট চোরাশিকারিদের বুলেট অন্ধকারেও নিখুঁত লক্ষ্যে বিঁধে যাচ্ছে হরিণডুবির ফরেস্ট গার্ডদের বুকে। নিজের ভুল চালে বিনতা মেহরা নিজেই নগ্ন শরীরে পরে রইলেন জয়ন্তী নদীর ধারে ? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে শরীরে মনে রক্তাক্ত হয় প্রমিত। বিভ্রান্ত প্রমিতের সঙ্গে মনের টানে জড়িয়ে পড়ে জঙ্গলে নৃতত্বের ফিল্ডওয়ার্ক করতে আসা এক পড়ুয়া মেয়ে – দ্যুতি। উত্তর খোঁজার কাজে দ্যুতিও প্রমিতের সাথে হাত মেলায়। শেষ অবধি কি প্রমিত আর দ্যুতি খুঁজে পাবে এই সমস্ত হত্যার নায়ককে ? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আদিম অরণ্য আর আদিম প্রবৃত্তিতে বোনা এই টান-টান কাহিনিতে।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
বাংলায় রহস্য উপন্যাস/গল্প যে পরিমাণে লেখা হয়, তা দেখে এটাই মনে হয় যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের মালিন্য আর হতাশা থেকে একটু অন্যরকম একটা পৃথিবীকে দেখার জন্যে এই বিশেষ জানালাটা আমাদের বড় প্রিয়| কিন্তু বাজারের অমোঘ শর্ত মেনে এক্ষেত্রেও আমাদের সচলের বদলে অচল টাকা নিয়েই বেশি লেনদেন করতে হয়| সত্যিকারের ভালো লেখকেরা প্রকাশক পান না, অন্যদিকে কিছু নেহাতই দুর্বল লেখকদের পাঠের-অযোগ্য লেখাকে গিলতে আমরা বাধ্য হই তাঁদের লেখা তথাকথিত বড় পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত হয় বলে| সৌভাগ্যক্রমে, বর্তমান বইটি এই ধারায় ব্যতিক্রমী|
এই উপন্যাসের লেখকের সঙ্গে আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, এবং আরও একাধিক শিশু-কিশোর পত্রিকার মাধমে আমার পরিচয় ঘটেছিলো| সেই সুবাদে, কিছু প্রত্যাশা নিয়েই আমি, ক্লান্ত ও প্রায় ঘুম-ঘুম অবস্থায় বইটি পড়া শুরু করেছিলাম| একবারে, এবং প্রায় গোল-গোল চোখে বইটি শেষ করেছি, বোধহয় এতেই বইটির পাঠ-যোগ্যতা স্পষ্ট হবে| এবার আসি বই-এর বিষয়ে|
পত্র ভারতী-কে ধন্যবাদ দিতেই হচ্ছে এই বয়স্ক-পাঠ্য থ্রিলারটি আমাদের কাছে উপহার দেওয়ার জন্যে| এই সুমুদ্রিত বইটিতে রয়েছে একটিই উপন্যাস, যা এর আগে অনেক ছোট আকারে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয়েছিলো| অরণ্য-পাহাড়-প্রান্তিক জনজাতি-র পটভূমিতে, ষড়রিপুর বশে আবিল মানুষের সঙ্গে নীতিবোধ-সম্পন্ন মানুষের সংঘাতের কাহিনি এর আগেও বহুবার লেখা হয়েছে, এর পরেও হবে| কিন্তু লেখকের মুনশিয়ানা-র বিশেষভাবে কদর করতে হচ্ছে দুটি কারণে: (১) লেখার গতি, যা একবার উপন্যাসটি শুরু করার পর থামবার কোনো সুযোগ দেয় না; (২) উপন্যাসের মূল রহস্যের টান, যা নায়কের সঙ্গে আমাদেরও ভাবাতে থাকে এই নিয়ে যে ঠিক কীভাবে রাতের অন্ধকারে ও কুয়াশাতেও ......| আর কিছু লেখা ঠিক হবে না| বরং, আমি আন্তরিক ভাবেই চাইবো যে পরের হাতে ঝাল না খেয়ে এই চমত্কার থ্রিলারটি আপনি নিজেই পড়ুন ও পড়ান, কারণ ভালো লেখা শুধু নিজের কাছে চেপে রাখা ঠিক হবে না|
বইটা পড়ি ২০১৪ সালের শেষের দিকে, তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ার। আজ এগারো বছর বাদে যখন নিজের মুগ্ধতা জানাতে বসেছি ততদিনে আরও বার কয়েক পড়া হয়ে গেছে। তাই ‘মরণবিভা’ যে আমার অন্যতম প্রিয় উপন্যাস আশা করি সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘মরণবিভা’ দিয়েই আমার লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখনীর সাথে পরিচয়। সেই যে মুগ্ধতার রেশ আমায় ছুঁয়ে গেল তা গত এক দশকেও কাটেনি, আর কোনোদিন যে কাটবেও না, একথা হলফ করে বলতে পারি। সঠিক বাংলা ভাষার প্রয়োগ, বাক্য বিন্যাস, চরিত্র চিত্রণ ইত্যাদি আমি তাঁর লেখা থেকেই অনেকখানি আত্মস্থ করেছি যখন নিজে লিখতে শুরু করেছি। কিন্তু আমায় সবচেয়ে অবাক করে তিনি একের পর এক এমন সব অদ্ভুত প্লট লিখে চলেছেন কিভাবে। মানুষটার যে কি বিশাল পড়াশোনা ও জ্ঞানের ভাণ্ডার রয়েছে তা ওঁর বিভিন্ন জঁরের লেখা পড়লেই বোঝা যায়। প্রণাম স্যার 🙏
এবার ‘মরণবিভা’য় ফিরি। দীর্ঘদিন বাংলা সাহিত্যে কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকারই রাজত্ব ছিল।
প্রেক্ষাপট সেই অনুযায়ী আবর্তিত হত। কিন্তু ‘মরণবিভা’য় আমি প্রথম বক্সা টাইগার রিজার্ভের কথা পেলাম। নিজে আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দা হওয়ায় সে যে কি আনন্দ পেয়েছিলাম এবং ঠিক করেছিলাম কোনোদিন আমার নিজের বই লিখলে তাতে আমাদের ডুয়ার্সের রূপমাধুর্য ব্যবহার করবোই, সৈকত স্যার ‘রুদ্রাক্ষ’ তে সেকথা রেখেছি। আপনিই ইন্সপিরেশন 🙏
মরণবিভা বেসিক্যালি একটি বায়ো থ্রিলার। সঙ্গে জুড়েছে মানুষের লোভ, স্বার্থান্বেষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার। আর কাহিনীর প্রধান চরিত্র দ্যুতিকে তো রীতিমতো ভালোবেসে ফেলেছিলাম! কিন্তু সে কপাল কি আর আছে, দ্যুতি তো প্রমিতের!
তবে সবচেয়ে খুশি হয়েছিলাম বিনতা মেহরার অন্তিম পরিণতি দেখে। আমাদের হিউম্যান ফিজিওলজির সিলেবাসে ‘বায়োলুমিনিসেন্স’ পড়েছিলাম ততদিনে, ফলে বিনতার সঙ্গে ঠিক কি ঘটেছিল বুঝতে সামান্যও অসুবিধা হয়নি!
আপনার কলম অক্ষয় হোক, বাংলা ভাষা ও আমরা আরও সমৃদ্ধ হই। প্রণাম নেবেন 🙏
আপনার এক গুণমুগ্ধ, তন্ময় দেব ১১.০২.২৫
🔴 "মরণবিভা" এখন "মৃত্যুর আলো" শিরোনামে সংকলিত হয়েছে পত্র ভারতী প্রকাশিত "থ্রিলার অমনিবাস" গ্রন্থে।
এই উপন্যাসের প্লট কিন্তু ইউনিক। বায়োলুমিনিসেন্স(জৈবপ্রভা) সম্পর্কিত কোনো উপন্যাস আগে পড়িনি। সিরিয়াস টাইপ বই, পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে একটু হাঁপিয়ে উঠছিলাম। তবে শেষপর্যন্ত পড়ে খারাপ লাগেনি।
বক্সা টাইগার রিজার্ভের একটি ছোট অঞ্চল হরিণডুবি বিট। নদী, অরণ্য ও পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চল। এখানেই পর পর খুন হতে থাকে রাতে অন্ধকারে। একসাথে তিনজন হরিণ ডুবির ফরেস্ট গার্ড খুন হয়। কিন্তু প্রশ্ন একটাই কিভাবে টেরোরিস্ট রা রাতের অন্ধকারে দুর থেকে নিখুঁত লক্ষ্যে নিশানা লাগাচ্ছে।এরফলে ফরেস্ট গার্ড দের নাইট পেট্রলিং স্থগিত রাখতে হয়, আর এর জন্য চোরাশিকারিদের উৎপাত জোরদার হয়। হরিণ ডুবির দায়িত্বে থাকা ফরেস্ট অফিসার প্রমিত তৎপর হয়ে ওঠে এই খুনের রহস্যের ব্যাপারে।অন্যদিকে জঙ্গলের নৃতত্ত্বের ফিল্ড ওয়ার্ক করতে আসা পড়ুয়া মেয়ে দ্যুতির সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে প্রমিত।তারা দুজন কি খুঁজে বের করতে পারবে এই সব খুনের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা সেই খুনিকে ?
বক্সা টাইগার রিজার্ভের একটি ছোট অঞ্চল হরিণডুবি। এখানে একটি প্রাচীন দূর্গ ' শিরোমণি গড় ' কে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন বিশ্বাস ও লোককথা। মার্মেড গ্রুপের কর্ত্রী বিনতা মেহরা চাইলেন এই গড়ের জায়গায় হোটেল খুলে ব্যবসা করতে। এই নিয়ে ফরেস্ট অফিসার প্রমিতের সঙ্গে বিনতার মতানৈক্য দেখা দেয়। এদিকে আদিবাসী সরল মানুষজন ও গাছপালা ঘেরা সুন্দর জায়গাটিতে হঠাৎ ঘটতে থাকে একের পর এক নারকীয় ঘটনা। প্রথমে খুন হন জঙ্গলের তিন অত্যন্ত দক্ষ ফরেস্ট গার্ড। পোস্টমর্টেম থেকে জানা যায় যে তাঁদের গুলি করা হয়েছে অনেক দূরে অবস্থিত পাহাড়ের ওপর থেকে।
পুলিশ হিমশিম খান এই ভেবে যে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে জঙ্গলে এরকম কুয়াশার মধ্যে এই তিনজনকে পাহাড়ে বসে কেউ দেখতে পাবে কিভাবে? কেউ দেখতে পাচ্ছে এবং এত ভালো দেখতে পাচ্ছে যে এক গুলিতেই লক্ষ্যভেদ হচ্ছে। এরপর ওই জঙ্গলে খুন হন আরো দুই মহিলা। গ্রামের মানুষ উত্তেজিত হয়ে আক্রমণ করে ফরেস্ট অফিসে। চোরাশিকারীরা নির্মমভাবে হত্যা করতে থাকে জঙ্গলের পশুদের।
ঘটনাচক্রে জড়িয়ে পড়েন ব্যাবসায়ী বিনতা মেহরা, প্রকৃতিপ্রেমী রূপন সৈকিয়া ও রিসার্চ স্কলার দ্যুতি। কে করে সেই রহস্যের সমাধান?
--- অনেকদিন পর একটা দুর্ধর্ষ থ্রিলার পড়লাম যেটা ছেড়ে ওঠা যায় না। এই গল্পে কোনো পুলিশ বা তদন্তকারী গোয়েন্দা নেই। তবে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে ফরেস্ট অফিসার প্রমিতকে বলা যেতে পারে। লেখনী খুব ছিমছাম, কোনো একস্ট্রা কথা বা বর্ণনা নেই, আবার কখনো কোনো অংশ অবাস্তব বা অতিরঞ্জিত বলেও মনে হয়নি।
ছোট উপন্যাস, কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ করা যায়, বরং বলা ভালো পাঠক একদিনে বইটি শেষ করতে বাধ্য। কেউ যদি রিডার্স ব্লক কাটিয়ে ওঠার জন্য বই খোঁজেন তাহলে এই উপন্যাস আপনার সেই উপকার করতে সক্ষম। বাড়ির বাইরে সময় কাটানোর জন্য সঙ্গে একটি বই নিয়ে যেতে চান তবে ব্যাগে ভরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই বইটি আদর্শ বই।
বায়োলুমিনিসেন্সের সমন্ধে অনেক তথ্যবহুল একটি উপন্যাস। ★বায়োলুমিনিসেন্স বা জৈবপ্রভা জীবজগতের এক আশ্চর্য ঘটনা।এই পৃথিবীতে প্রায় এগারোশো প্রাণী এবং উদ্ভিদ নিজেদের শরীর থেকে আলো বিচ্ছুরণ করতে পারে,সবচেয়ে পরিচিত হল "জোনাকি" এই ধরনের জীবদের মধ্যে সংখ্যায় যারা সবচেয়ে বেশি তাদের নাম "পেরিডিনিয়ান" সমুদ্রে বসবাসকারী খুব ছোট এক ধরনের উদ্ভিদ। উত্তেজিত হলে পেরিডিনিয়ানের শরীর থেকে উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরিত হয়।
রহস্য কাহিনী হলেও এর মধ্যে বিজ্ঞানের ছোঁয়া আছে। সৈকত বাবুর কলমের মধ্যে এমন কিছু আছে যার কারণে পুরো গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামা যায় না। মূলত জঙ্গল কেন্দ্রিক উপন্যাস, মৃত রাজা জাগোর মত একটা থিম কাজ করছে। গল্পের শেষকালে সিক্যুয়েল এর একটা আভাস পাওয়া গেছে। ভালো লেগেছে।