শ্রীপান্থের জন্ম ১৯৩২ সালে, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে | লেখাপড়া ময়মনসিংহ এবং কলকাতায় | শ্রীপান্থ তরুণ বয়স থেকেই পেশায় সাংবাদিক | আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত | সাংবাদিকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণামূলক রচনাদি লিখে যাচ্ছেন তিনি | তাঁর চর্চার বিষয় সামাজিক ইতিহাস | বিশেষত কলকাতার সমাজ ও সংকৃতি | তিনি সতীদাহ,দেবদাসী,ঠগী,হারেম-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনিই কলকাতার পটভূমিতে লিখেছেন একাধিক রচনা | তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আজব নগরী, শ্রীপান্থেরকলকতা, যখন ছাপাখানা এল, এলোকেশী মোহন্ত সম্বাদ, কেয়াবাৎ মেয়ে, মেটিয়াবুরুজের নবাব, দায় ইত্যাদি | বটতলা তাঁর সর্বশেষ বই | কলকাতার শিল্পী সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর বেশি কিছু প্রবন্ধ ইংরেজিতেও প্রকাশিত হয়েছে | বাংলা মুলুকে প্রথম ধাতব হরফে ছাপা বই হালেদের 'আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ'-এর দীর্ঘ ভূমিকা তার মধ্যে অন্যতম | পঞ্চাশের মন্বন্তরের দিনগুলোতে বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক কবিদের মধ্যে নব সৃষ্টির যে অভুতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে তা নিয়ে লেখা তাঁর 'দায়'বইটির ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশিত হতে চলেছে |
আমরা কাজের সূত্রে প্রচুর পড়াশোনা করি। ছোটবেলা থেকেই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, তারপর চাকরির জন্য পড়ালেখা, গবেষণা-চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য আমরা জীবনের বড় একটা সময় পড়ে কাটাই। এমনকি যাঁরা লেখক তাঁরাও লেখার প্রয়োজনে যে পড়া পড়েন, সেটাও তাঁদের কাজেরই পড়া। এই বইয়ের লেখক সেসব কাজের পড়া থেকে বেরিয়ে এসে অবসর সময়ের নানান পড়া নিয়ে সাজিয়েছেন তাঁর এই বইটি আর আমিও আমার কাজের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে পড়ে নিলাম 'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া।' অনেকদিন ধরেই বইটি পড়ব পড়ব করছিলাম, কারণ আগেই বইটির বিষয়বস্তু এবং ছবির প্রশংসা শুনেছিলাম। কিন্তু হাতে আসা মাত্রই পড়তে বসিনি, মনে হচ্ছিল একটু থাক হাতে, একটু রয়েসয়ে পড়ি। পড়লেই তো শেষ! 'ঠগী' পড়েই শ্রীপান্থের গুণগ্রাহী হয়ে গিয়েছিলাম, আরো অন্যান্য বই পড়ে তা আগেই হয়েছে পাকাপোক্ত। আর এই বইটি পড়ে তাঁর স্থানটা আরো অনেকটা উঁচু হয়ে গেলো আমার মনে। কী তুলে আনেন নি তিনি? প্রথম অধ্যায়টাই আলবার্তো মাঙ্গোয়েলের 'আ হিস্ট্রি অব রিডিং' নিয়ে। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে বই এবং পাঠকদের ইতিহাসই এই রচনার উপজীব্য। এছাড়াও চলে এসেছে সেই প্রথম ইংরেজি, ফরাসি, বাংলা ব্যাকরণের কথা। কীভাবে কত পরিশ্রমে আর কত সাধনায় রচিত হয়েছে অভিধান! স্যামুয়েল জনসন, হ্যালেদ, ওয়েবস্টার এঁদের আমরা চিনি তো এসব অভিধানের বদৌলতেই। উঠে এসেছে মানচিত্রের নানাবিধ ইতিহাস আর বিবর্তন। যে ইতিহাস থেকে জানা যায় পৃথিবীর নানান সময়ের পরিক্রমা। আছে রোগ আর মহামারীর কারণ, প্রতিক্রিয়া, বিবরণ। আছে নারীর স্তন নিয়ে এমন এক আলোচনা প্রকারান্তরে যা বুঝতে সাহায্য করে নারীশক্তিকে। নীরদ সি চৌধুরীর সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানা থাকলেও কোন বই পড়া হয়নি এখনো তাঁর। এই বইতে আছে লেখকের সাথে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর আলাপ এবং তাঁর নানান ভাবনার বিশ্লেষণ, যা আগ্রহী করে তোলে পাঠককে। আরো নানান ব্যাপারে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় চমকপ্রদ আলোচনা করেছেন শ্রীপান্থ। নানান অজানা তথ্য, অচেনা স্থানে অবলীলায় নিয়ে গেছেন তাঁর কলমের মাধ্যমে। আর বইয়ের একটি অত্যন্ত বড় আকর্ষণ এর সাথে জুড়ে দেওয়া অসাধারণ ছবিগুলো। সেই প্রথম বাংলা ব্যাকরণের কাভার পেইজ, কিংবা পেতলের ম্যাপ, সাথে নানান দিকপালের প্রতিকৃতি বইটিকে করেছে সমৃদ্ধ। বইটির 'আধি-ব্যাধির ইতিবৃত্ত' প্রবন্ধটি বর্তমান পরিস্থিতির সাথে ভীষণ মানানসই। তাই শ্রীপান্থের কথাতেই শেষ করছি আমার এই লেখা-
"মানুষ ইতিহাসের প্রতি অধ্যায়ে জানিয়ে দিয়েছে তার সিদ্ধান্ত। সুখ, সম্পদ এবং প্রাচুর্যের জন্য যদি দাম দিতে হয়, জীবাণুরা যদি কখনও কখনও আদায় করে নেয় চড়া দাম, তবু আর পিছু ফেরা নয়। কারণ, এই আধুনিক সভ্যতা অনন্য- অমূল্য। কোন মূল্যেই তাকে হাতছাড়া করা যায় না।"
বইটির শুরুতেই একটি জবাবদিহি মূলক নোট চোখে পড়বে পাঠকের। "কাজের পড়া'র ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই লেখক হাতে তুলে নিয়েছেন আপাত 'অকাজ' এর কোনও বই। সে পড়া শুধু পড়ার আনন্দেই। এক অর্থে, নিছক ছুটির পড়া। সেই আনন্দ পাঠের যৎসামান্য নিয়ে এই বই। এ বইয়ের কোনও মূল পরিকল্পনা নেই। নেই কোনও বিষয় কেন্দ্রিকতা। এখানে পুস্পিত উদ্যানে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে শুধু উড়ে বেড়ানো।"
অনেক পাঠকই হয়ত বুঝে ফেলেছেন আমি শ্রীপান্থের, 'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া' বইটি নিয়েই কিছু বলার চেষ্টা চালাচ্ছি। পরিক্ষা পাশের ইঁদুর দৌঁড়ে টিকে থাকবার জন্য আমরা যেসব বই পড়ে থাকি, সেসব অনেক সময়ই কেমন নিরস কাঠখোট্টা লাগে। কথায় বলে না আসলের চেয়ে সুদ মিষ্টি লাগে। অবস্হা খানিকটা তেমনই। ক্লাসের বই তখন খোদ ভিলেন যেন। আউট বই সুপারম্যানের ইমেজে হাতছানিতে ডাকে আয়রে আয় পড়া ফেলে। ক্লাসের পাঠে তখন মন বসে কী আউট বইয়ের গন্ধে? এমন নিষিদ্ধ অভিজ্ঞতায় আমাদের অনেকেরই ছাত্র জীবন ঋদ্ধ। তাই শ্রীপান্থের বইটি যখন হাতে পাই ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি জমতে সময় নেয় না মোটেও। নিজেদের অভিজ্ঞতার সাথে লেখকের অভিজ্ঞতা কতটুকু মিলেঝুলে যায় সেটা দেখবারও একটা ছেলে মানুষি আগ্রহ বইটির ব্যাপারে বাড়তি উৎসাহ দেয় যেন।
তবে পড়ার বইয়ের আড়ালে আউট বইটি রেখে নিতান্ত মনোযোগী ছাত্রের অভিনয় কৌশল শ্রীপান্থকে এখানে প্রয়োগ করতে হয়নি। নিজেদের সেসব কীর্তি কাহিনির কলেবরে আরেকটি নাম যুক্ত হলে আনন্দ বাড়তো সন্দেহ নেই। তবে পাঠক যখন আস্তে আস্তে বইটির মধ্যে ডুবে যাবেন, টুপ করে কখন সে হতাশার ভাসান ঘটে গেছে জানতেই পারবেন না।
'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া'তে শ্রীপান্থ তাঁর পঠিত নানান রকমের বেশ কয়েকটি বই নিয়ে বলেছেন। বলার ভঙ্গিটি বেশ জমাটি। মন গুটি গুটি পায়ে এসে বসে সেসব শুনবে বলে। মোট আঠারোটি পর্বে নানান স্বাদের বইয়ের কথা এসেছে এখানে। পর্বগুলোতে চট করে চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।
১. বইয়ের ভূবন। ২. শব্দের মায়াজালে। ৩. আল ওস্তাদ। ৪. ছাপা বইয়ের আগে যে বই। ৫. প্রথম যখন। ৬. অর্ধকথানক ৭. নিজেদের পৃথিবীর খোঁজে ৮. মানচিত্র, না মন-চিত্র। ৯.মানচিত্রে কাশ্মীরি শাল। ১০.দরিয়ায় দ্রাঘিমার সন্ধানে। ১১. আধিব্যাধির ইতিবৃত্ত। ১২. নারীর স্তন: উথ্থান-পতন। ১৩. ঔপনিবেশিক লালসার আগুনে। ১৪. মঞ্জুশ্রীর তলোয়ার। ১৫.ভারতীয় কণ্যা আর পরদেশি প্রেমিক। ১৬. বিদেশিনীর বাঁকা চোখে। ১৭. কথায় ও আত্মকথায় নীরদচন্দ্র। ১৮. বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব ও বই।
বেশ কিছু চমৎকার বইয়ের সলুক-সন্ধান পাঠকের ঝুলিতে এসে যায় এই বইয়ের হাত ধরে। যেখানে শুধু ইতিহাসই নয় আছে নানান জাতের বইয়ের সমাবেশ। তবে শ্রীপান্থ ইতিহাসের প্রতিই বেশি মনোযোগী, পাঠক মাত্রই সেটা বুঝে যাবেন। এহেন ইতিহাস প্রেমী লেখকের সাথে একটি পর্বে গিয়ে এই অর্বাচিন পাঠকের মতের গরমিল ঘটে যায়। কেননা এই অর্বাচিন মনে করে, এমন কিছু বিষয় আছে যা নিজের ব্যক্তিগত মনগড়া মতামতের তোয়াক্কা করে না। সেটি হচ্ছে একটি জাতির/দেশের জন্মের সঠিক (ধারাবাহিক) ইতিহাস। এখানে ইতিহাস নিয়ে কাউকে ছেলেখেলা করতে দেখেও উদারপন্থী মনোভাব দেখিয়ে বাহবা নিতে নিতান্তই অক্ষম। যেকারণে ১৬ নং পর্বে 'রোজা হাজনোকজির(Rozsa Hajnoczy) লেখা 'বেঙ্গল অব ফায়ার' নামের বিশাল বইটি নিয়ে ভারতে সমালোচনার ঝড়কে আমি সঙ্গতই ভাবছি। নইলে আমার নিজের বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতকরার প্রয়াসে তেড়িয়া হবার বিষয়টি দ্বিচারিতা হয়ে যায় যে! ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ একান্ত আলাপচারিতায় এক বিদেশিনীকে কতটুকু কি বলেছেন না বলেছেন সেটার চেয়েও তাই আমার কাছে সেপাহী বিপ্লব কিংবা বৃটিশ খেদানোর আন্দোলনের ইতিহাসের তারিখ বা পাত্রপাত্রীর নাম ভুলভাল উল্লেখ করাটা একটি জরুরী বিষয় হয়ে ওঠে; এবং সেকারণেই রোজা হাজনোকজির খামখেয়ালিপণাকে অপরাধ হিসেবেই বিবেচনায় করি। হতেই পারে তিনি ইতিহাস বিকৃত করার মন নিয়ে বইটি লিখেননি। কিন্তু এমন বিষয়ে লিখতে গেলে ইতিহাসের প্রতি যে সর্ববিচারেই সৎ এবং সর্তক থাকতে হয়, সেটি ভুলে গেলে চলবে কেন! শর্মিলা বোসের মত ইতিহাস বিকৃতকারীরা সে বিশ্বাসের মাথা খেয়েছেন বলেই না তাদের নাম আমাদের ঘৃণার তালিকায় তোলা আছে।
দাঁড়ান পাঠক। ভাবছেন, নাহ্! এই বই তবে পড়বোই না? বড্ড ভুল করবেন এমন সিদ্ধান্ত নিলে। হ্যাঁ ঠিকই পড়ছেন বাক্যটি। আবারও বলবো কী? আমার এই একটি মতের গড়মিলকে ���াক্ষ্যি মেনে 'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া' থেকে বিরত থাকলে অনেক কিছু মিস করবেন। বিলক্ষণ করবেন। আপনি যদি ইতিহাসের সেইরাম প্রেমি হয়ে থাকেন তবে ���ো কথাই নেই। বইটি পড়ুন। এমনও হতে পারে অতি আবেগে আমিও কিছু ভুল বুঝেছি। হতেই পারে। কারণ বইটি আমি ঘোড়ায় রাশটেনেই পড়েছি যে! নিজের ভুল শুধরে নিতে আমার কোন লজ্জা নেই, দ্বিধাও না।
বইটির প্রতিটি পর্বই উপভোগ্য। তবে সবচে' বেশি উপভোগ করেছি, ১,৩,৬,৮,১২,১৩,১৪,১৫,১৬,১৭,এবং ১৮ পর্ব। সবগুলো পর্ব নিয়ে খানিকটা বলার লোভ থাকলেও রাশ টানছি। নইলে বিশাল কাহিনি হয়ে যাবে। আগ্রহী পাঠককে বিরক্ত করা যেহেতু লক্ষ্য না তাই ও পথে যাচ্ছিনা। প্রথম পর্বটি দারুণ মজারু কিছু বিষয় নিয়ে। বই কখন কিভাবে এলো। কাগজের আবিস্কার ইত্যাদিসহ একজন পাঠক ঠিক কোন কায়দায় বই পাঠ করবেন, বসে না শুয়ে ইত্যাদি নিয়ে মজারু কথাবার্তা। আছে বই পাঠের নানান অপরিহার্য সামগ্রীর কথা এবং ইতিহাস। প্রথম উপন্যাস লেখিয়ের কথাসহ আরো অজানা সব তথ্য। এ পর্বটিতে শ্রীপান্থ আলবার্তো মাঙ্গোয়েল(Alberto Manguel) রচিত, ' আ হিস্ট্রি অব রিডিং' বইটি নিয়ে আলোচনা করেই ক্ষ্যান্ত হননি। কোথায় কিভাবে মাঙ্গোয়েল ভুল করে বসেছেন; কোথায় সঠিক আরো তথ্য চেপে গেছেন সেসব খোলা মনেই বলেছেন।
'শব্দের মায়াজালে' অর্থাৎ ২নং পর্বে জানা যাবে ইংরেজি অভিধান জন্মের আদ্য প্রান্ত ইতিহাস। অভিধান রচনাকে ঘিরে দেশে দেশে আত্মগরিমা আর আত্মশ্লাঘার কাহিনি। এপর্বে শ্রীপান্থের এক বর্ণনায় ইতিহাস সচেতন পাঠক খাটকায় পড়তে পারেন "I hate all bainters and boets" এ উক্তিটির কার সেটি নিয়ে। শ্রীপান্থ জানাচ্ছেন এটি রাজা প্রথম জেমসের(১৫৬৬-১৬২৫)। আদতে এটি রাজা দ্বিতীয় জর্জ(১৬৮৩-১৭৬০)এর। যিনি বলতেন "I hate bainting, and poetry too! Neither the one nor the other ever did any good." রাজা প্রথম জেমস একজন উন্নত মানের লেখিয়ে এবং শিল্প সাহিত্যের সমঝদার ছিলেন। তিনি বেশ ক'টি পুস্তকও রচনা করেন। যার মধ্যে "Daemonologie" "True law of free Monarchies" "Basilikon Doron" উল্লেখযোগ্য।
'আল ওস্তাদ' রায়হান মুহাম্মদ বিন আহামদ আল বেরুনী নামের অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষটিকে নিয়ে আছে অতি চমৎকার কাহিনি। আমাদের অনেকেরই জানা এই প্রতিভাধর মানুষটি সুলতান মাহমুদের বন্দী হিসেবে বেশ কয়েকবারই ভারতে আসেন এবং নির্বাসিত জীবনের একটা অংশ ভারতে কাটান। তাঁর রচিত "কিতাব আল হিন্দ" বা "আলবেরুণীস্ ইণ্ডিয়া" মধ্য এশিয়ার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে সমাদর পায় আজো। এটির বাংলা "আলবেরুনীর ভারততত্ত্ব" অনুবাদ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ। বইটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত জানাচ্ছেন শ্রীপান্থ। কিন্তু আমি যে বইটি দেখেছি সেখানে 'দিব্য প্রকাশনীর' নাম পেয়েছি। হতে পারে এটি দ্বিতীয় সংস্করণ। তাছাড়া তিনি বইটির প্রকাশকাল ১৮৯২ বলেছেন, ওই সময়ে তো বাংলা একাডেমি ছিল না। হতে পারে মুদ্রন প্রমাদ।
ছাপানো বইয়ের আগে 'পুথি'ই ছিল এক সময়ে পাঠকের হাতের বই। সেসব বইয়ের ছিল কত জৌলুশ। হাতে লিখা, ছাপানো। কবে কখন পুথি প্রথম সেলাই করা হয় সে তথ্যও আছে এতে। গাছের বাকল, পশুর চামড়া, কাগজ, পাথর, ধাতব ইত্যাদিতেও লিখিত হতো পুথি। এগুলো আবার লুন্ঠিনকারীদের লক্ষ্য বস্তুও হতো অনেক সময়ে। তাই হাতে লেখা পুথির ভাগ্যে ঘোড়া কিংবা গাধায় চড়ে ভ্রমণ করার ঘটনাও ঘটতো। পুথি নিয়ে আরো সব অজানা মজার কাহিনি জানা যায় বইটি পড়ে।এসব পুথির যেমন জাঁকজমক তেমনই সেসবের মনলোভা ইতিহাস।
'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া' এমন একটি বই এর সবগুলো পর্ব নিয়েই কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এতটা বলে দেয়া কী ঠিক হবে? হবে না। কয়েকটি পর্বের বুড়ি ছুঁয়েই লেখা শেষ করবো তাই। ১২ নং পর্বটিতে আসবার পর সত্যি বলছি খানিকটা জড়তা যে কাজ করেনি তা নয়। এম্মা! এসব কী! তারপরও নিজে নারী বলেই হয়ত অস্বস্তিকর একটা কৌতুহল নিয়েই পর্বটি পড়া শুরু করি। বলতে দ্বিধা নেই, যা ভেবেছিলাম তারচে' শতগুণ ভালো একটি অধ্যায় এটি! নারীর এই অতি স্পর্শকাতর অঙ্গটি নিয়ে এত সমৃদ্ধ একটি বই আছে, এবং সেটি নিয়ে এত চমৎকার আলোচনা হতে পারে জানাই হতো না যদি 'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া' না পড়তাম। লেখকের প্রতি সেজন্য কৃতজ্ঞতা। এ পর্বে ফরাসী লেখিকা, গবেষক ম্যারিলিন ইয়ালুম(Marilyn yalom)এর " এ হিস্ট্রি অব দ্য ব্রেস্ট" বইটিতে বর্ণিত নারীর স্তনের পঁচিশ হাজার বছরের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যার শুরুটা ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাত ধরে। আলোচনার খানিকটা তুলে দিচ্ছি আগ্রহী পাঠকদের জন্য। "প্রাচীনযুগে নারী সামান্য নারী নন, দেবী। বৃক্ষের মতোই প্রাকৃতিক এক অস্তিত্ব। তিনি রহস্যময়। তিনি সৃষ্টির আদি, মানবের ধাত্রী। তাঁর বুকে জীবনদায়ী অমৃতধারার উৎস। স্বভাবতই তাঁর স্তন পবিত্র এবং পূজ্য। প্রাচীন পৃথিবীর নারীর স্তন সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার উপলক্ষ। সেকারণে তার এ অঙ্গটিকে কামের বস্তু হিসাবে না দেখে দেখা হয়েছে পূজিত শ্রদ্ধার বস্তু হিসাবে। লৌহযুগে পবিত্র পানপাত্র গড়া হয়েছে স্তনের আদলে। একালে অবশ্য হলিউডে একই বস্তু কখনও কখনও দেখা যায় যৌন্যতার প্রতীক হিসেবে, পুরুষের কামনার বার্তাবহ তৈজস হিসাবে। নারী যতদিন পূজার বেদিতে অধিস্ঠিত ছিলেন ততদিন তাঁর অবস্হান ছিল শ্রদ্ধার। কিন্তু পরিস্হিতির পরিবর্তন ঘটে নারীকে স্হান চ্যূত করে বেদিতে পুরুষ দেবতাদের অধিস্ঠানের পর।" যে নারী ছিলেন শক্তির, শ্রদ্ধার অস্তিত্ব, রেনেসাঁসে তাদের পিছিয়ে পড়বার কারণটিও হয়ত ওর ভেতরেই সুপ্ত রয়েছে। চমকপ্রদ আরো অনেক ইতিহাসের অজানা কাহিনির হাতছানি আছে এ পর্বে।
'পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া'র পরতে পরতে ইতিহাসের নানান চমকদার কাহিনি। আছে বাঙ্গালি ছেলে অমিতাভ ঘোষের গবেষণার কাজে অক্সফোর্ডের লাইব্রেরিতে বই খুঁজতে গিয়ে হাতে এসে যাওয়া অন্য রকম এক ইতিহাসের সূত্রের কথা। যার পেছনে তিনি ১০টি বছর ব্যয় করেন এবং এটি নিয়ে লিখেন ফেলেন তাঁর বিখ্যাত বই, "ইন অ্যান অ্যান্টিক ল্যাণ্ড"। আছে মোঘলদের আত্মকথার মোড়কে নিজেদের একচেটিয়া শৈয্য বীর্যের গালগল্পকে পেছনে ফেলে প্রথম নিজের সম্পূর্ণ আত্মজীবনী লেখিয়ে একজন অতি সাধারণ বানারসীদাস জৈনের কাহিনি। যাঁকে আড়ালে অনেকেই 'কালা সাহেব' বলে ব্যঙ্গ করেন সেই ক্ষ্যাপাটে মানুষ নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মিঠেকড়া কথা পাবেন পাঠক'কথায় ও আত্মকথায় নীরদচন্দ্র' পর্বে। ঔপনিবেশিকদের শাসনের আড়ালে থাকা নারী লোভী মানুষগুলো কথা এসেছে বইটির 'ঔপনিবেশিক লালসার আগুনে' পর্বে। লেখকের অসাধারণ হিউমার সমৃদ্ধ'মানচিত্র না মন-চিত্র' পর্বটির প্রথম ভাগ পড়ে পাঠক যেমন হাসিতে ফেটে পড়বেন একইভাবে ম্যাপের ইতিবৃত্ত জেনে হবেন চমৎকৃত। প্রথম প্রকাশিত বাংলা ব্যাকরণের প্রকাশনা এবং তার পেছনের পৃস্ঠপোষকতার ইতিহাস আছে 'প্রথম যখন' অধ্যায়ে।
কত যে অজানা সব তথ্যের এক বিশাল সমাবেশ এই বইটি। না পড়লে বেশ ঠকে যেতাম বলতেই হচ্ছে! দ্রুত শেষ করবার তাগিদে খানিকটা ঘোড়া ছুটিয়ে নেবার মত করেই পড়তে হয়েছে বইটি। যেকারণে কিছুটা অতৃপ্তি যেন রয়েই গেল। তাই সময় সুযোগ মত "পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া" আবার পড়বার আকাঙ্খা নিয়ে শেষ করছি এর আনন্দপাঠ কাহিনি!
শুধু 'শিল্পমানসম্পন্ন' বলে চলে যাওয়াটা অপরাধ মনে করছি। বই অনেকেই পড়ে, তবে তারা শুধুই 'পড়ে', এর বাইরে আর কিছু নয়। বই পড়াটা যে একটা উপলব্ধির বিষয়, শুধুই 'পাঠ'-ই তার একমাত্র প্রাপ্য নয়, সে ধারণা থেকে আমরা অনেকেই বঞ্চিত। আসলে, শুধুই দুই মলাটে জড়ানো কালো কালিতে ছাপা কয়েকটি অক্ষর মানেই তো বই নয়, সাথে জড়িয়ে থাকে আরও অনেক শাখা-প্রশাখা, সেসব পথে লেখকের পাশাপাশি চলতে হয় পাঠককেও। এ বই শেখায় পাঠক হবার পাঠ।
শ্রীপান্থ, এই নামটি আমি আগে কখনোই শুনি নি। আর তাঁর লেখা পড়া তো দূরের কথা! বরাবরের মতই গুডরিডসের কল্যাণে এই বই খুঁজে পাওয়া। বইয়ের নামটা ভীষণ মনে ধরেছিল বলেই পড়তে শুরু করা। সেই ছোটবেলা থেকে তো পড়ার বইয়ের বাইরের বই-ই বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম! তাই এই বই পড়তে আগ্রহী হওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু খুব স্বাভাবিক!পড়া শুরু করার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ভেবেছিলাম যে দিব্যি হাল্কা মেজাজে, পাতার পর পাতা পড়ে ফেলবার মতই কোন বই হবে এটি। কি ভুল চিন্তা ভাবনা ছিল আমার! এরকম তথ্যবহুল বই শেষ কবে পড়েছিলাম ঠিক মনে করতে পারি না! লেখক বইয়ের দুনিয়ার নানা রকম তথ্য সুন্দরভাবে, এক এক করে সাজিয়েছেন এই বইয়ে। এতে উল্লেখ আছে সেই সিরিয়ায় খুঁজে পাওয়া পৃথিবীর প্রথম পুস্তক থেকে লেলিনের বিপ্লবী সাহিত্যের। আছে প্রথম ছাপা-বইয়ের কথা, আছে প্রথম মানচিত্র তৈরির গল্প, আরও কত কি! বইয়ের বিভিন্ন পাতাকে রঙিন করেছে নানা মানুষের, নানা রকমের ছবি। ন্যাথানিয়েল হালেদের রচিত বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণের বইয়ের পাতার ছবি আছে, আলবেরুণীর জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক বইয়ের ছবি আছে, ছবি আছে পেতলের তৈরি ভূগোলকের! এসব কিছু একত্র করে এই বই লিখতে না জানি লেখকের কত সময় লেগেছে! এক বইয়ে জানার জন্য এত এত নতুন জিনিস! নিছক সময় কাটানোর জন্য এই বই হাতে নিলে ভুল হবে। বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে এই চমৎকার বইটি। বইপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি আনন্দের বিষয় হবে।
The author, an acclaimed journalist, has curated some paradigm-shifting books from all across the world and broken them down in his impeccably flavoured Bengali, like a sure-wizened storyteller. Book buffs will have some juicy mind meat.
কাগজ আবিষ্কার ইতিহাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা ব্যাকরণ ও সাহিত্যের ইতিবৃত্ত তুলে এনেছেন লেখক তার দীর্ঘ এই পুস্তকে।বই পাঠের পাশাপাশি তা উপলব্ধিও কত গুরুত্বপূর্ণ তার পূর্ণ উপলব্ধি জাগিয়ে দিয়েছেন, দিয়েছেন কিছু বইয়ের সন্ধান, জানিয়েছেন সাহিত্য পাঠের গুরুত্ব। পরিচিত করছেন সাহিত্যের সাথে জড়িত বিভিন্ন অতীত স্মৃতির সাথ।
ভিন্ন ভিন্ন পরিচ্ছেদে করেছেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, সাথে নিয়েছেল বর্তমানকে অতীতের সাথে গল্পাকারে। ইতিহাস বোধহয় এমনই নিকট অতীত। সাথে যুক্ত করেছেন মূল্যবান অ্যালবাম।