নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরাজিত পূর্ব কমান্ড ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় বিজয়ী ভারতীয় সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। দু:খে অপমানে জর্জরিত পাকিস্তানের জনগণ জানতে চান, পূর্ব পাকিস্তানে কী হয়েছিল? কেন হয়েছিল? তদন্তের দাবি এমন প্রচন্ড হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর পক্ষে তা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। নাহলে ভুট্টো এসব জিনিস চাপা রাখতে চেয়েছিলেন। জনগণকে ঠান্ডা ও শান্ত করতে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিশন নিয়োগ করেন। পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি জাস্টিস হামুদুর রহমানের অধিনায়কত্বে এ কমিশন নিযুক্ত হয়। কমিশন ১৯৭২ এর ফেব্রুয়ারিতে কাজ শুরু করে জুলাইতে রিপোর্ট জমা দেয়। কমিশন এ রিপোর্ট কে সাময়িক বা টেনটেটিভ রিপোর্ট বলে। কারণ ইস্টার্ন কমান্ডের জেষ্ঠ্য অফিসাররা তখনো ভারতে যুদ্ধবন্দী রুপে অবস্থান করছিলেন। ১৯৭৪ সালে তারা পাকিস্তানে ফিরে এলে কমিশন সম্পূরক রিপোর্ট প্রদান করে। কিন্তু তা কোথাও প্রকাশ করা হলো না। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন রিপোর্টে বিভিন্ন সময় খন্ড খন্ড আকারে রিপোর্টের উপর অনেকের ইন্টারভিউ প্রকাশ পাচ্ছিল। এক সময় মহা চাঞ্চল্য জাগিয়ে দিল্লি থেকে প্রকাশিত ভারতের পাক্ষিক "ইন্ডিয়া টুডে" পত্রিকায় হামুদুর রহমান কমিশনের সম্পূরক রিপোর্ট বেরিয়ে গেলো। যা থেকে প্রমাণ পাওয়া গেলো যে বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশিত দলিলগুলো সত্য এবং বাস্তব। সেইসব দলিলের বাংলা অনুবাদ এই বই।
বশীর আল-হেলালের জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামের মীর পাড়ায় ১৯৩৬ সালের ৬ জানুয়ারি। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি করতেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বাংলায় এম এ পাস করেন। তাঁর প্রথম গল্পের বই 'স্বপ্নের কুশীলব' কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে তিনি মাকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। তারপর ১৯৬৯ সালের শুরুতে সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন বাংলা একাডেমিতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আর চব্বিশ বছর বাংলা একাডেমিতে কাজ করার পর ১৯৯৩ সালে পরিচালক পদে থেকে অবসর নেন।
গ্রামীণ ও শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে আরও অর্থবহ করতে জীবনধর্মী ও সমাজ সচেতনতামূলক অসংখ্য ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেন বশীর আল-হেলাল। প্রায় চল্লিশটি প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে বাংলাভাষার ওপরেই তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ছয়টি। তাঁর আটশো পৃষ্ঠার ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস (১৯৮৫) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গবেষণালব্ধ গ্রন্থ। তাঁর প্রকাশিত গল্পের বইগুলো হলো-'প্রথম কৃষ্ণচূড়া', 'আনারসের হাসি', 'বিপরীত মানুষ', 'ক্ষুধার দেশের রাজা', 'গল্পসমগ্র-প্রথম খণ্ড'। প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- 'কালো ইলিশ', 'ঘৃতকুমারী', 'শেষ পানপাত্র', 'নূরজাহানদের মধুমাস', 'শিশিরের দেশে অভিযান' ও 'যে পথে বুলবুলিরা যায়'।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বশীর আল-হেলাল পেয়েছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
২০২১ সালের ৩১ আগস্ট জীবনাবসান ঘটে বশীর আল-হেলালের।