মফস্বলের তরুণ তুর্য চাকরি নেয় পাহাড়ি রূপাং বস্তির সংলগ্ন এক কাঠ চেরাই কারখানায়। কিন্তু কাছাকাছি ঘর ভাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেয় মল্লিক কুঠিতে।
একটু একটু করে তূর্য আবিষ্কার করে, মল্লিক কুঠির অন্ধকারে লুকিয়ে আছে অনেক অজানা রহস্য। রাত গভীর হলে বাড়ির আনাচে-কানাচে অনুভূত হয় এক অগ্নিদগ্ধ কিশোরীর অস্তিত্ব! হঠাৎ তূর্যর কারখানার শ্রমিকেরা মারা পড়তে থাকে লেপার্ডজাতীয় হিংস্র প্রাণীর আক্রমণে। কিন্তু যদি সত্যিই লেপার্ড আক্রমণ করে, তবে ঘটনাস্থলে কেন তার পদচিহ্ন দেখা যায় না? স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই মৃত্যুর পেছনে কাজ করছে আরও ভয়ঙ্কর কিছু!
অতৃপ্ত পিশাচ ‘লাখে’।
কিন্তু কে জাগাল সেই ভয়ংকর 'লাখে'-কে? এর পিছনে কি মল্লিক কুঠির কোনও যোগসূত্র রয়েছে? নাকি আছে আরও গভীর ষড়যন্ত্র?... তূর্য কি পারবে এই রহস্যের কিনারা করতে?
অনেকদিন পর লেখক রনদীপ নন্দীর লেখা বেশ টান টান উত্তেজনায় পূর্ণ কোন উপন্যাস পড়লাম। শহরের ছেলে তূর্য চাকরি করতে আছে পাহাড়ে। পাহাড়ে এসে রহস্যময় ঘটনা ও পাহাড়ি বস্তিতে একের পর এক মৃত্যুর সম্মুখীন হয় সে। সেখানকার মানুষের বিশ্বাস লাখে নামে এক পিশাচ জেগে উঠেছে। সেই একের পর এক হত্যা করে চলেছে। এগুলো কি সত্যিই কোন পিশাচের কাজ নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোন রহস্য? জানতে হলে আপনাকে পড়ে দেখতে হবে এই বই। লেখক পাহাড়ের পরিবেশ বেশ সুন্দর বর্ণনা করেছেন। সাথে মাঝে মাঝে যে ভয়ের আবহ গুলো তুলে ধরেছেন তা দুর্দান্ত। বেশ ভালো লাগলো পড়ে। ধন্যবাদ লেখক Ranadip Nandy
এক অলৌকিক এবং নৃশংস খুন। নিজের অপরাধের দোষ এক নিরপরাধ মানুষের ওপর চাপিয়ে এক পিশাচ খুন করে এক ডাক্তারকে। এর সঙ্গে মূল গল্পের কি যোগাযোগ আছে? এরপর এই পিশাচের শিকার আর কে কে হয় এবং সে আসলে কে বা কী সেই নিয়েই লেখা উপন্যাস 'নিশিচর'।
উত্তরবঙ্গের এক পাহাড়ি বস্তি রূপাং ছাড়িয়ে পাহাড়ের চূড়ায় এক ভগ্নপ্রায় বাংলো মল্লিককুঠিতে ভাড়া নিয়েছে তূর্য। কাঠ চেড়াই কারখানার ম্যানেজার সে। বাংলোর মালিক নীলকান্ত মল্লিক। রাত হলেই সেই বাংলোতে শোনা যায় অদ্ভূত সব শব্দ। সেই শব্দ প্রথম শুনতে পায় ঋত্বিক, তূর্যের একমাত্র বন্ধু; তারা একই বাংলার বাসিন্দা। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় তূর্যের ঘরের আগের বাসিন্দা ডাক্তারটির মৃত্যু হয় এক রহস্যময় কারণে। তবে সেই রহস্যের সঙ্গে কি মল্লিককুঠির কোনো যোগাযোগ আছে তা জানতে তূর্য ও ঋত্বিক যায় বাংলোর আগের চাকর রুবেনের কাছে। তারা জানতে পারে বাংলোতে ঘটে যাওয়া এক নির্মম ঘটনার কথা।
গল্প এগিয়ে চলে। এবার হয় তূর্যের সেই অভিজ্ঞতা যার কথা ঋত্বিক তাকে বলত। এরপরেই তার কারখানায় ঘটে যেতে থাকে একের পর এক খুন। সবাই সন্দেহ করে কোনো হিংস্র পশুর ওপর। কিন্তু তারপরেই আসে 'লাখে' নামক এক পিশাচের প্রসঙ্গ। সে কী বা কে এবং কেনই বা করছে এতো খুন?
কাঠের তৈরি করিডর, ভ্যাপসা গন্ধ, অন্ধকার, কাঠের দুর্বল সিঁড়ি ভগ্নপ্রায় বাংলোর মধ্যে এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরী করে।
রহস্য বুননে লেখকের দক্ষতা প্রকাশ পায়। উপন্যাস জুড়ে টানটান উত্তেজনা এবং একের পর এক মোড় এমন আসতে থাকে যে আমার একটানা উপন্যাস পড়ে শেষ করতে সময় লেগেছে ২-২.৫ ঘন্টা। আরও একটা জিনিস যেটা আমায় অবাক করেছে এবং ভীষণ ভালো লেগেছে সেটা হলো আমি এই উপন্যাসে বানান ভুল পাইনি।
রহস্য উন্মোচনে গল্পের মূল চরিত্র তূর্যের ভূমিকাই সবথেকে বড়ো। এছাড়া নীলকান্ত মল্লিক, রুবেন, ঋত্বিক এদের চরিত্র গঠন ভারী নিপুণ। এদের আসল পরিচয় কী এবং কার কী গল্প তা জানতে হলে উপন্যাস পড়তে হবে কারণ গল্পের প্লট দারুণ হলেও তার ইঙ্গিত একেবারেই দেওয়া যাবেনা। আর এক পছন্দের চরিত্র লিমা গুরুং। তার মধ্যে সাহসী এবং আন্তরিক এক পাহাড়ির পরিচয় পাওয়া যায়।
উত্তরবঙ্গের এক পাহাড়ি এলাকায় গল্প। কুয়াশা ঘেরা সবুজ পাহাড়, ঢালু পাথুরে রাস্তা, পাহাড়ের মাথায় সোনালী সূর্যোদয়, মিহি কুয়াশা ঢাকা সন্ধ্যা, পাইন বন, হিমেল হাওয়া ইত্যাদি সবকিছুই আমার পাহাড়প্রেমী মনকে বড়ই আরাম দিয়েছে উপন্যাস জুড়ে।
উপন্যাসে রহস্য ও ভয় ছাড়াও আছে এক মানসিক রোগের উল্লেখ এবং সেটাকে লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। এছাড়াও আছে রাগ এবং প্রতিশোধপরায়ণতার চরম প্রভাব। সাবলীল লেখনী এবং অপ্রত্যাশিত সব ঘটনার মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা এই উপন্যাস রাত জেগে পড়ার জন্য এক দারুণ অভিজ্ঞতা। তবে শেষটা বেশ ভালো। তাই সব খারাপের মধ্যেও এক আলোর রেশ দেখায় এই উপন্যাস।
এই উপন্যাস লেটার মার্কস-এর যোগ্য এর প্লটের জন্য। আপাতদৃষ্টিতে যেটিকে আমি অলৌকিক উপন্যাস ভেবে পড়তে শুরু করেছিলাম, তা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল একটা রহস্যকাহিনীতে। এবং সেই কাহিনী বেশ আকর্ষক।
কিন্তু, পড়তে গিয়ে যাতে বারবার হোঁচট খেয়েছি তা হল-- যাকে সহজ সরল ভাষায় উপস্থাপনা করা যায়, তার জায়গায় বারংবার রূপক এবং বর্ণনামূলক বিস্তারের আতিশয্য। যেমন ধরুন আপনি লিখতে চাইছেন, 'সে খুব ভয় পেল'। তার বদলে আপনি লিখলেন, 'একটা ভয়ের কালো ছায়া তাকে ধীরে ধীরে আষ্ঠে পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরতে লাগল।' পড়তে ভালো লাগবে। কিন্তু তা যদি বারবার একঘেয়েভাবে করা হয়, তাহলে একটা সময়ের পর পড়তে বিরক্তি আসে, অন্তত আমার। তেমনই, 'অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা আলো আঁধারি মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে চুপচাপ।', 'অদ্ভুত একটা বিষণ্ণতা কেমন যেন গ্রাস করেছে গোটা জঙ্গলটাকে।', 'সেই রাস্তার লাল ধুলো অদ্ভুত একটা ধূসর বিষণ্ণতায় ঘিরে রেখেছে' -- এই রকম একই প্রকার বর্ণনা ঘুরে ফিরে আসছে সমগ্র বইয়ে প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশবার। ফিরে ফিরে আসছে বস্তি থেকে মল্লিক কুঠি যাওয়ার একই সরু অসমান রাস্তার হাজার বার একই রকম বর্ণনা। এই একই সমস্যা দেখেছিলাম খুবই জনপ্রিয় এক রহস্য উপন্যাস, শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যর লেখা 'শেষ মৃত পাখি' পড়তে গিয়ে।
তারপর অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে কিছু লাইনের ব্যবধানে বৈপরীত্যমূলক বর্ণনা। যেমন ধরুন, এক জায়গায় লেখক লিখেছেন, 'রোদের ওম বেশ লাগছে'। তার দু'লাইন পরেই লিখছেন, 'এই মুহূর্তে তার মন চঞ্চল হয়ে আছে আতঙ্ক, বিস্ময়ে'। হয়ত সরাসরি বৈপরীত্য বলা চলে না। কিন্তু সেই ব্যক্তির মানসিক ভাব যে ঠিক কী, তা কল্পনায় বুনতে পাঠকের অসুবিধে হতে বাধ্য। আমি একটা উদাহরণ দিলাম। কিন্তু পড়তে গিয়ে বেশ কয়েকবার এহেন হোঁচট খেতে হয়েছে।
এইসব মেদ বাদ দিতে পারলে, এই উপন্যাস পাঁচতারার উপযোগী হতে পারত।