নিকোলাও মানুচি ছিলেন মহান এক পর্যটক। ১৬৫৩ সালে নিকোলাও মানুচি ১৪ বছর বয়সে তাঁর ভেনিসের বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। সকলের চোখ এড়িয়ে তিনি স্মার্নাগামী একটি জাহাজে উঠে পড়েন এবং সৌভাগ্যক্রমে এক ইংরেজ অভিজাত ভিসকাউন্ট বেলোমন্টকে পান তাঁর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে, যিনি সেই জাহাজে পারস্য ও ভারতে যাচ্ছিলেন। বেলোমন্টের সঙ্গে তিনি এশিয়া মাইনর হয়ে প্রথমে পারস্য এবং সেখান থেকে ভারতে আসেন। মানুচি ছিলেন অদ্ভুত মেধাসম্পন্ন যুবক। ভাগ্য তাঁর অনুকূলে ছিল। শিগগির তিনি ভারতের সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা দারা শুকোহর সেনাবাহিনীতে গোলন্দাজ হিসেবে চাকরি গ্রহণ করেন। পরে গোলন্দাজের চাকরি বাদ দিয়ে চিকিৎসক হিসেবে পেশা গ্রহণ করেন। রাজা জয় সিং তাঁকে গোলন্দাজ বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দিলে কয়েক বছরের জন্য মানুচি আবার সৈনিকের জীবনে ফিরে এসেছিলেন। দৃশ্যত এ পেশায় ক্লান্ত হয়ে তিনি পদত্যাগ করেন এবং আবার চিকিৎসক পেশায় ফিরে আসেন। রাজ দরবারের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে তিনি অনেক কিছু জানতে পেরেছেন। রাজনীতি প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়াও একজন বিদেশি পর্যটক হিসেবে স্থানীয় অনেক বিষয়ে তার ছিল দারুণ সব পর্যবেক্ষণ। তাঁর লেখা এই বইতে সেইসব অজানা বিষয় উঠে এসেছে। ইতিহাসপ্রেমী যেকোনো পাঠকের নিকট বইটি নিঃসন্দেহে সমাদৃত হবে।
ইতালির মানুচির অভিজ্ঞতায় তুরস্ক, পারস্য ও প্রধানত মোগল ভারত নিয়ে আড়াই শ পাতার বইটির অনুবাদক আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু ও প্রকাশক ঐতিহ্য।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভেনিসের সন্তান মানুচি বাড়ি থেকে পালিয়ে আশ্রয় নেন এক বিদেশগামী জাহাজে। সেখানে তার পরিচয় হয় বিলাতের ভাইকাউন্ট বেলমন্টের সঙ্গে। রাজাপন্থি এই অভিজাত ইংরেজ ক্রমওয়েলের হাত থেকে জান বাঁচাতে ভারতবর্ষের দিকে যাচ্ছিলেন। কিশোর মানুচিকে তিনি নিজের সঙ্গী হিসেবে নেন ও অনেকটা সন্তানস্নেহে পালন করেন।
ইংরেজ ভাইকাউন্ট বেলমন্ট মানুচির জীবনপথকে বদলে দেন। তার সফরসঙ্গী হয়ে প্রথমে ওসমানীয় সালতানাতে নামেন। তুর্কিদের নিয়ে কাবিলে তারিফ কিছুই লেখেননি মানুচি। বরং বিদেশিদের সঙ্গে তুর্কিদের অসদাচরণ, পদে পদে হেনস্তা ও ধোঁকাবাজির স্বভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। মানুচি লিখেছেন, তুর্কি ভূখণ্ডে কোনো অমুসলিমের সবুজ রঙের পোশাক পরা নাজায়েজ। কারণ তিনি নবিজির প্রিয় রং। তাই অমুসলিমরা তা পরতে পারবে না। সবুজ পোশাক পরা সেখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তুরস্কের পর পারস্যে পৌঁছান মানুচি। সেখানকার অধিবাসীদের রুচিশীল খাদ্যাভাস, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যপ্রীতির উচ্চ প্রশংসা করেছেন মানুচি। ভাইকাউন্ট বেলমন্ট সেখানে পদচ্যুত ব্রিটিশ রাজার পক্ষে গিয়েছিলেন। কিন্তু পারস্য সম্রাট তাকে মিষ্টি কথায় সাহায্য করতে রাজি হননি। এরপর বেলমন্ট রওনা হন মোগল ভারতের দিকে। সমুদ্রপথের সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন মানুচি।
মোগল ভারতে বদনসিবি এন্তেজার করছিল মানুচির। তার মহৎ আশ্রয়দাতা বেলমন্ট হঠাৎ মারা যাওয়ার পর বিপদে পড়েন মানুচি। মৃত বেলমন্টের রেখে যাওয়া সম্পদ দখলে নেওয়ার কোশিশ করে দুই ইংরেজ। এই ঘটনার সূত্রেই আরও একবার জীবনের বাঁক বদলের মুখোমুখি হন মানুচি। তিনি পরিচিত সাক্ষাৎ পান বাদশাহ শাজাহানের পুত্র দারাশিকোর। নৈকট্য তৈরি দারাশিকোর সঙ্গে। মোগল তখতের লড়াইয়ে দারাশিকোর গোলান্দাজবাহিনীতে ছিলেন মানুচি। যুদ্ধে দারাশিকোর পদে পদে কৌশলে ভুল, নির্বুদ্ধিতা, তার সেনাপতি খলিল খানের প্রতারণা - সবকিছু মিলেই পরাজিত হন দারাশিকো। পুরো সময়টি মানুচি দারাশিকোর সঙ্গে ছিলেন।
মানুচি লিখেছেন, দারার পুত্র সোলায়মান শুকো যদি দারার পক্ষে সৈন্যসমেত যোগ দিতে পারতেন, তাহলে যুদ্ধের গতিপথ ভিন্ন হতে পারত।
ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার দারার সঙ্গে তার সমর্থকরাও বিপদে পড়েন৷ মোগল রাজত্বে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতির বর্ণনা বারবার এসেছে মানুচির লেখায়। ডাকাতদের ভয়ে লোকজন তটস্থ থাকত। তারা যখন-তখন এসে হামলা করে সবকিছু লুট করে নিয়ে যেত। মানুচি নিজেও একাধিকবার ডাকাতদের হাতে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন৷
ভারতবর্ষের চিকিৎসাব্যবস্থা কতখানি আদিম ছিল তার একটি দৃষ্টান্ত খোদ মানুচি। দারাশিকোর মৃত্যুর পর তিনি আওরঙ্গজেবের অধীনে কাজ করতে রাজি হননি। এটিকে নিজের ঈমানদারি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু এরপরই জীবিকার্জনের জন্য চিকিৎসাপেশা বেছে নেন। অথচ চিকিৎসা নিয়ে তার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ছিল না। মানুচি ইউরোপীয় হিসেবে বেশ সুবিধা পান। শ্বেতাঙ্গদের প্রতি এখানকার লোকের মুগ্ধতার শেষ নেই। তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থার করুণ চিত্রের সাক্ষ্য দেয়।
দুই পর্তুগিজের সঙ্গে বাংলায় এসেছিলেন মানুচি। এখানে ইংরেজ ছাড়াও ডাচ ও পর্তুগিজদের বাণিজ্যকুঠি দেখেছেন।
রাজনীতি মানুচির পিছু ছাড়েনি কিংবা মানুচি রাজনীতিকে ছাড়েনি। তাই বারবার দেশীয় রাজনীতিতে মানুচির অংশগ্রহণ দেখতে পাই।
মানুচি একজন ইউরোপীয় ছিলেন। তিনি মোগল ভারতকে শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকায় ভোগা এক শ্বেতাঙ্গের চোখে দেখেছেন। তাই তার বয়ানকে কতটুকু কী ভরসা করা যায় তা নিয়ে দ্বিধা থাকা সত্ত্বেও মানুচির বয়ান প্রায় সাড়ে তিন শ বছর আগের মোগলশাসিত অবিভক্ত ভারতকে বুঝতে সহায়তা করবে। আনোয়ার হোসেইন মঞ্জুর অনুবাদ যুতসই হয়নি। পাঠকের উচিত ইংরেজি অনুবাদটি পড়া। কিছুক্ষেত্রে মনে হচ্ছিল গুগল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করে অনুবাদ করা হয়েছে।
যাহোক, ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী পাঠকের জন্য মানুচির বয়ান পড়া অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক পাঠ হতে পারে। যদিও তাভেরনিয়ের, বার্নিয়েরের মতো সমকালীন পর্যটকদের মতো মানুচির লেখা তত বর্ণনাসমৃদ্ধ নয়।