মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন জীবনের রোজনামচা লিপিবদ্ধ করার সময় খরচ হয় একাধিক শব্দ। কথারা পরিণত হয় সংলাপে, মুহূর্তেরা রূপ নেয় ঘটনাক্রমের, কল্পনা করে বাস্তবকে নিস্তব্ধ। জীবনের না বলা কথা, কামনাদের শব্দের রূপ দিতে গিয়ে কেটে যায় অনন্ত, অলস প্রহর। তবুও শব্দশ্রমিকের কলম লিখে চলে অক্লান্তভাবে। ফুটিয়ে তোলে সাদা পাতায় ভালোবাসার আখর। কথায় আছে জীবনের দগদগে ক্ষতগুলো শুকিয়ে গেলেও ক্ষতচিহ্ন বা আঘাতের দাগ থেকে যায় আজীবন। কেউ সেই দাগটাকে জীবনের অঙ্গ ভেবে সব ভুলে এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। আবার কেউ সেই ক্ষতচিহ্ন লুকোতেই কাটিয়ে দেয় একটা গোটা জীবন। আবার কিছু মানুষ আছে বাইরে থেকে যাদের ক্ষত শুকিয়ে গেছে মনে হলেও, বাস্তবে তারা অভিমানের বিষাক্ত সংক্রমণে আক্রান্ত। কেমন হবে এরকম একজন মানুষের জীবনে যদি আগমন হয় এক আগন্তুকের? পুরোনো সব হিসেব ভুলিয়ে আগন্তুক কি সূচনা করবে এক নতুন অধ্যায়ের? নাকি বহুকাল আগে শুকিয়ে যাওয়া দগ্ধচিহ্ন পুনরায় পরিণত হবে দাবানলে? সকল প্রশ্নের উত্তর রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস “দূরের পাখি”-তে।
সদ্য পড়ে শেষ করলাম প্রিয় লেখিকা সাথী দাসের নতুন বই "দূরের পাখি" বইটি। গতকাল বইটি প্রকাশিত হয়েছে লালমাটি প্রকাশনী থেকে, বইটি হাতে পাওয়ার পর আর নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি। রাতে শুরু করে সবেমাত্র শেষ করেই রিভিউ লিখছি। ১৬০ পেজের উপন্যাস তারাতারি শেষ হয়ে গেলো! লেখিকার লেখা সমস্ত উপন্যাস ই আমার পড়া, তবে এখন আর খুব বেশি রিভিউ লেখা হয় না! দূরের পাখি বইটি বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে। বইমেলার আগে বইটি হাতে পেয়ে পড়ার পর রিভিউ না লিখলে কি আর চলে, তাই এই লেখা...... আসুন দেখেনি কি আছে এই বইতে ~ সাথী দাস এর লেখা মানেই সমাজের বিভিন্ন দিক, আর সেই সঙ্গে কিছু চরিত্র যা পড়ার পর স্থান নেয় মনের মণিকোঠায়। আমরা যারা সাথী দাস এর লেখা পড়ি তারা সকলেই জানি যে উনি সামাজিক প্রেমের উপন্যাস লিখে থাকেন। এই উপন্যাসে লেখিকা তুলে ধরেছেন কল্পনাকে......... উপন্যাসের শুরুতেই দেখা যায় দুটি চরিত্রকে পাখি আর ধ্রুব, প্রথমটা বুঝতে অসুবিধা হলেও বেশ কিছু পেজ পড়ার পর বোঝা যায় কোনটা কল্পনা আর কোনটা বাস্তব। আর সেই বাস্তবে রয়েছে অনন্ত অপেক্ষা....... এই উপন্যাসের গল্প ছোট, তাই বিস্তারিত আলোচনা করে স্পয়েল করবো না! কোনটা কল্পনা আর কোনটা বাস্তব তা জানতে হলে অবশ্যই উপন্যাসটি পড়তে হবে! লেখিকাকে ধন্যবাদ 😊 🙏🏻 আপনার লেখা পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থাকবেন।
📌স্বার্থের পৃথিবীতে প্রয়োজন শেষে প্রিয়জনও হারায় গুরুত্ব...
✪ যাঁরা সুগন্ধি ভালোবাসেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন যে একটি দীর্ঘস্থায়ী সুগন্ধিতে তিনটি স্তর থাকে। (০১) টপ নোটস্ (০২) হার্ট নোটস্ (০৩) বেস নোটস্ একটি উপন্যাসেও ঠিক তেমনই কিছু স্তর থাকে, যে স্তরগুলো আমাদের কখনও আনন্দ আবার কখনও বিষাদ প্রদান করে ঠিক সুগন্ধির মতো।
★ আজকের আলোচ্য উপন্যাসটিও ঠিক এইরকম ত্রিস্তর বিশিষ্ট একটি উপন্যাস।
★ এই উপন্যাসের একদম মুখ্য স্তর বা টপ নোটসে্ আছেন হেমাঙ্গিনী, আলোচ্য উপন্যাসে তাঁকে একজন লেখিকা হিসেবে আমরা পাই। কোনো কথা বলার থেকে সেই শব্দগুলোকে কলমের আঁচড়ে, অথবা বলা যায় ল্যাপটপে বন্দী করতেই তিনি বেশী ভালোবাসেন। উপন্যাসের শুরুতেই তাঁর আলোতে বাদবাকি নোটস্গুলো কিছু সময়ের জন্য হারিয়ে যায়। এর পরবর্তী নোটস্ বা হার্ট নোটসে্ আসেন ‘ধ্রুব’ এবং ‘পাখি’।
• উপন্যাসটি পড়ে আমার যেটা মনে হয়েছে তা হ’ল – এই ‘ধ্রুব এবং পাখি’, দু’জনেই হেমাঙ্গিনীর সৃষ্টি এবং এঁরা রূপকের আড়ালে লুকিয়ে আছেন, যাঁর শেষ কোথায় আমরা কেউই জানিনা। এখানে সেই টপ নোটস্ ঢেকে রেখেছে মিড্ল নোটস্ বা হার্ট নোটস্কে। এই মিড্ল নোটস্ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে এবং তারপর আমরা পৌঁছে যাব সেই স্তরে যেখানে গিয়ে আমাদের থিতু হ’তে বা মস্তিষ্ককে স্থিরতা প্রদান ক’রতে বেশ কিছুটা সময় দিতে হ’বে।
• রাজনীতি, এমনই একটি নীতি যার কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ তার ঠিকানা পাওয়া যায়না। আবার রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা চিরকালীন মিত্র বলেও কিছু নেই, কিন্তু সেই নীতি যদি পারিবারিক জীবনে প্রযুক্ত হয় তার ফল হয় সুদূরপ্রসারী। এর ফলে যেটা পাওয়া যায় সেইটা হ'ল একটি সংসার ভাঙার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন তথা রাজনীতির ঘাড়ে দোষ আরোপ করা, যেটা তখন একেবারেই মূল্যহীন। এই উপন্যাস আমাদের ঠিক সেইরকম একটি মিডল নোটস্ বা হার্ট নোটস্ দেয়। যে নোটস্ হয়তো আর কিছুক্ষনের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে বেস নোটসে্। এবার আসি বেস নোটসে্ - সুগন্ধির ক্ষেত্রে বেস নোটসে্র গন্ধ হয় দীর্ঘস্থায়ী। এই উপন্যাসে বেস নোটস্ হ'ল হেমাঙ্গিনীকে তাঁর সম্পূর্ণ সত্তা সহ পাওয়া।
★ ঠিক এইখানে এসে একজন পাঠক হিসেবে আমার সবথেকে ভালো লেগেছে, কিন্তু কেন এইখানে এসেই আমার সবথেকে ভালো লাগলো?
• আচ্ছা, একজন মানুষের জীবনে বয়সটাই কী তাঁর জীবনশৈলীর মাপকাঠি?
• তাঁর নিজস্ব কোনো ভালোলাগা বা ভালোবাসার মানুষ থাকতে পারেন না?
• সেই মানুষটি, যাঁকে কখনও ভালোবাসা যায় কেবলমাত্র দূরত্বের কারণে তাঁকে ভুলে যেতে হবে? এটাই কী প্রকৃতির নিয়ম?
• আমরা অনেক সময় "বৈধ", "অবৈধ" শব্দগুলো ব্যবহার করি, সত্যিই কী এই পৃথিবীতে বৈধ বা অবৈধের কোনো সঠিক সংজ্ঞা আছে? সাংবিধানিক অপরাধমূলক কাজ বাদে যে কাজটা আমার মনের কাছে ঠিক, সেই কাজটা অন্য কারোর কাছে ভুল মনে হ'তেই পারে! তাহ'লে সেই কাজটা কী অবৈধ হয়ে যাবে? যদি তাই হয়, তাহ'লে আমাদের মতো মনুষ্যপদবাচ্য প্রাণীদের কাছে মনের মূল্য ঠিক কতটুকু?
• 'মন' সে তো আকাশের সঙ্গে তুলনীয়। আকাশই তো পাখিদের উড়বার স্থান! উড়লই না হয় কোন পাখি আকাশে! দূর থেকে তাকে দেখার মধ্যেও কিন্তু একটা অনবদ্য আনন্দ পাওয়া যায়, তাইনা? থাক না সেই পাখি রূপকের অন্তরালে, ক্ষতি কী? হেমাঙ্গিনীর মনের মুক্ত আকাশে যদি কোনো উড়ন্ত বিহঙ্গকে "দিশাহারা ধ্রুবতারা" দিক নির্দেশ করে, আর আমরা পাঠকরা সেই অনুভূতিটা সুগন্ধির বেস নোটসে্র মতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতে পারি তাহ'লে কিন্তু বেশ হয়! আসলে আমাদের প্রত্যেকটি মানুষের মনের মধ্যেই একটি উচ্ছ্বল মনের মানুষ বাস করে। আমরা বয়সের দোষ দিয়ে সেই উচ্ছ্বল তরঙ্গায়িত মনটিকে বেঁধে রাখি। কিন্তু বয়স কী? দুটো সংখ্যা ছাড়া আর তো কিছু নয়! হেমাঙ্গিনীর নীরব সরবতার মধ্যেই ফুটে উঠেছে উপন্যাসের সবথেকে সুন্দর অভিব্যক্তি, যা একজন পাঠকমনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে।
• নিজের জীবনের হিসাবের খাতায় হেমাঙ্গিনী কতটা পেয়েছেন, অথবা পেয়েও হারিয়েছেন, তারপর আবারও পেতে চেয়েছেন! সেই হিসেবের না মেলা শূন্যের হিসেব লেখা আছে, নাকি হিসেবের শূন্য মিলে যাবার হিসেব লেখা আছে এই উপন্যাসে? বড় জটিল প্রশ্ন! কিন্তু এর উত্তর যে পেতেই হবে! মানুষের মন বড্ড জটিল, হেমাঙ্গিনী কী পারলেন সেই জটিলতার আবর্ত থেকে বেড়িয়ে আসতে?
★ অনেক না বলা কথা, কখনও না পাওয়া উত্তর, যা এই উপন্যাসকে করে তুলেছে প্রেমিকার দেহের সুগন্ধি অলিগলির মতো সুরভিত এবং প্রেমিকার নীরবতার মতোই ভীষণভাবে বাঙ্ময়। একজন পাঠক হিসেবে নিজেকেই বোধহয় খুঁজে পেলাম এই উপন্যাসে। খুব ছোট্ট একটি উপন্যাস যা অনেক না বলা কথা বলে যায়। লেখিকা এখানে কেবলমাত্র হিমশৈলের চূড়া ধরে একটু নাড়া দিয়েছেন, আর সেই কম্পনে দুলে উঠেছে আমার পাঠকসত্তা।
One of the best reads. This is my first book by Sathi Das, and after reading it, I became a fan of her extraordinary writing. For me, she is one of the best contemporary authors.