“খিল” এই দুই অক্ষরের শব্দটির পরিধি বাক্যবিন্যাসে স্বল্প হলেও এর গূঢ়তম অর্থ সুবিস্তৃত। খিল বলতে আমরা সাধারণত দরজার আগল বুঝলেও বাস্তবে এর দায়িত্ব অপরিসীম। বাহ্যিক ঘাত প্রতিঘাত, অবাঞ্ছিত আগন্তুক, প্রবল ঝঞ্ঝা থেকে ঘরের আভ্যন্তরীণ আসবাব, মানুষজনকে রক্ষা করার দায়িত্ব থাকে খিলের উপর। এককথায় গৃহের যান্ত্রিক দ্বাররক্ষক তথা রক্ষাকর্তা রূপে খিলের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু সেই দ্বার যদি মনের দ্বার হয় তখন কী হবে? যদি কেউ আজীবন মনের ভেতরে থাকা ভয়, সংশয়, ভালোবাসা, ভালো লাগার অনুভূতিকে মনের গোপন কুটিরে অবরুদ্ধ করে দরজায় খিল তুলে দিয়ে বসে তাহলে কেমন হবে? সে কি পারবে ভবিষ্যতে সেই খিল নামিয়ে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আবার আলোর জগতে ফিরে আসতে? নাকি আজীবন আবদ্ধ হয়ে থাকবে মনের অন্ধকার কুটিরে? সমস্ত প্রশ্নের উত্তর থাকবে এই উপন্যাসে।
✪ পাঠ অনুভূতি ✪ ------------------------------- ✪ 'খিল' উপন্যাসের প্রথম পাঠ অনুভূতি আমি লিখেছিলাম। সেইসময় যে'হেতু উপন্যাসের প্রথম পাঠ অনুভূতি ছিল সেইজন্য আমাকে অনেকটাই হেঁয়ালির মধ্যে পাঠ অনুভূতিটিকে রেখে দিতে হয়েছিল। বর্তমানে এই উপন্যাসটির অনেকগুলো পাঠ অনুভূতি প্রকাশিত হয়ে যাবার পর আমার মনে হয়েছে এবার বোধহয় একটু বিশদভাবেই উপন্যাসটি সম্পর্কে লেখা যায়। পাঠ অনুভূতিটি সেইজন্য আমি দ্বিতীয়বার নতুনভাবে পোস্ট করছি।
★ উপন্যাস : খিল ★ লেখিকা : সাথী দাস ★ প্রকাশক : লালমাটি ★ মুদ্রিত মূল্য : ৬০০/- টাকা (প্রথম প্রকাশ - ২০২৪ খ্রীষ্টাব্দ) ★ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৫২৮
✪ বীণার তার যদি সঠিকভাবে বাঁধা না হয় তাহ'লে যেমন বেসুরো আওয়াজ বের হয়, এই উপন্যাসটি পড়ে আমার মনেরও ঠিক সেইরকম অবস্থা হয়েছে। আমার মনবীণার সমস্ত তারগুলো ছিঁড়ে গেছে আর বাঁধতে পারছিনা। আমি একদম Scattered হয়ে গেছি, দেখতে পাচ্ছি সবকিছু আমার সামনেই আছে, কিন্তু সেগুলোকে গুছিয়ে রাখার মতো ক্ষমতাও আমি হারিয়ে ফেলেছি। কোনো মানুষের মানসিক স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট করে দেবার ক্ষেত্রে মাননীয়া লেখিকার এমনিতেই জুড়ি নেই, এই উপন্যাসে তিনি সেই ক্ষমতারই আরো পরিণত রূপ দেখিয়েছেন। যত দিন যাচ্ছে লেখিকা মহোদয়ার কলম হয়ে উঠছে শাণিত আর পাঠকের মন হচ্ছে ছিন্নভিন্ন। পাঠক মনকে ছিন্নভিন্ন করে দেবার জন্যই তিনি বোধহয় এই উপন্যাসটি লিখেছেন! কিন্তু পাঠকদের হৃদয়কে রক্তাক্ত করার কোনও ব্যখ্যা কোথাও কোনোদিন প্রকাশিত হবে না। কোনো পাঠক হৃদয়কে জ্বালানোর জন্য কেউ লেখিকাকে দায়ী ক'রবেন না! সেইজন্য লেখিকা মহোদয়াকে দায়ী করার গুরুদায়িত্ব আমি নিজেই নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। এই পাঠক হৃদয়কে নিংড়ে রক্তাক্ত করার সম্পূর্ণ দায়ভার একমাত্র মাননীয়া লেখিকা সাথী দাস মহাশয়ার। মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে লেখিকা এই উপন্যাসে কেবল এবং কেবলমাত্র খেলা করে গেছেন, পাঠক মনকে নিরন্তর কাঁদিয়ে গেছেন। তাঁর এই ক্ষুরধার লেখার প্রতিটি ছত্রে পাঠকমন অবশ্যই জ্বলবে, জ্বলবেই। হয়তো কেউ স্বীকার ক'রবেন, কেউ ক'রবেন না। কিন্তু রাবণের চিতাগ্নিও বোধহয় এই উপন্যাসের থেকে কম দাহিকা শক্তি বহন করে বলেই আমার ধারণা!
✪ 'পিডোফাইল' শব্দটির সাথে এখন আমরা সকলেই মোটামুটি পরিচিত। এই শব্দটি হঠাৎ এখানে তুলে নিয়ে এলাম কারণ আজকে যে উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা ক'রতে চলেছি সেই উপন্যাসের বীজ হচ্ছে এই "পেডোফাইল" বা "পিডোফাইল" শব্দটি। একটি মানবশিশু যখন শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করে তখন তাঁর শরীরের সাথে সাথে কিছু মানসিক পরিবর্তনও হয়। এবার সেই মানবশিশুটি যদি কন্যা সন্তান হয়, তাহ'লে তাঁর শারিরীক পরিবর্তন সহজেই লোকচক্ষুর সামনে চলে আসে। বাস্তবে কিন্তু সে সেই শিশুসুলভ মানসিকতা থেকে সামান্যই বেরিয়ে আসতে পেরেছে এই উপন্যাসে এই শৈশব আর কৈশোরের মধ্যবর্তী শিশুটি একটি কন্যা সন্তান, যে আবার তাঁর বাবা মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একদম অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই পৃথিবীতে এসে পড়েছে। এইরকম একটি শিশুর উপর যখন কোনো কামুক পুরুষের হাতের ছোঁয়া পড়ে তখন সেই শিশুমন হয়তো বিদ্রোহ করে ওঠে। কিন্তু সবসময়ই যে সবাই বিদ্রোহ করবেই এমন কোনও মানে নেই, কোনো কোনো শিশু আবার এটাকে ফ্যান্টাসী হিসেবেও দেখতে শুরু করে। তাঁরা যে ব্যবহৃত হচ্ছে এটা বুঝতে বুঝতেই তাঁরা কৈশোর থেকে যৌবনে অবতীর্ন হয়। অনেকটা সেইসব পথশিশুদের মতো যাঁরা অল্পবয়সেই বিভিন্ন নেশায় আসক্ত হয়ে যায়। এখানেও ঠিক তাই হয়েছে, সেই ছোট্ট মেয়েটি যে প্রথম রজস্বলা হবার পরপরই পিতৃতুল্য কোনো একজনের যৌনক্ষুধার শিকার হয়েছে, কিন্তু সে এটা বুঝতে পারেনি যে- সে এখানে একজন লালসার শিকার। সে এই যৌনতার প্রথম পাঠটিকে বেশ উপভোগ করেছে। ফলে তাঁর জীবনের একটি দিক রঙীন হয়ে উঠলেও অন্যান্য দিকগুলো থেকে গেছে সাদাকালো হয়েই। লুপ্ত হয়েছে তাঁর জীবনের অন্যান্য চেতনা। ফলে বারংবার সে ঘর ছেড়েছে তাঁর এই যৌন আকাঙ্খাকে ভালোবাসা মনে করে। প্রহৃত হয়েছে বারংবার, কখনও ঘরে কখনও বা বাইরে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর পরিচয় হয়েছে চরিত্রহীন হিসেবে। বাস্তব জীবনেও সে বুঝতে পারেনি সঠিক আর বেঠিকের পার্থক্য, বুঝতে পারেনি কোন কথাটা কোথায় বলা উচিৎ আর কোথায় বলা উচিৎ নয়। সে বড় হয়েছে এমন একটা পরিবেশে যেখানে কেউ তাঁকে বলে দেয়নি ঠিক ভুলের সঠিক সংজ্ঞা। এইভাবেই একদিন সে খুঁজে পায় তাঁর জীবনের পরম হিতৈষী একজন মানুষকে, যে সম্পর্কের দিক থেকে তাঁর বৌদি। এই বৌদির আছে একটি সহানুভূতিশীল মন, যে মন প্রথম বুঝতে পারে যে ঐ মানুষটি আসলে মানসিকভাবে খুব অসুস্থ। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে বৌদি তাঁকে ন্যূনতম সাহায্যটুকুও ক'রতে পারেননি।
★ চারদিকে আলো ঝলমল করছে। আজকে নাগ বাড়ির কনিষ্ঠা কন্যা মনিকঙ্কনা ওরফে আহ্লাদীর বিয়ে। এই আলো ঝলমলে উৎসব মুখরতা কী বার্তা বয়ে নিয়ে আসছে আহ্লাদীর জীবনে? একজন সেক্স অ্যাডিক্টেড লেডির জীবনে কতটা ছাপ ফেলতে পারবে নির্ঝরের আন্তরিক ভালোবাসা? আহ্লাদী কী বুঝতে পারবে ভালোবাসার প্রকৃত সংজ্ঞা?
★ উপন্যাসের নাম 'খিল' প্রকৃতই একটি গভীর অর্থ বহন করছে। এই উপন্যাসে উত্তরা বাদে প্রতিটি চরিত্র নিজের নিজের মনের দরজায় খিল এঁটে দিয়ে বসে আছে, কেউ একটু এগিয়ে এসে আহ্লাদীর মাথায় একটা স্নেহের স্পর্শ দিয়ে একবারও জানতে চায়নি মেয়েটির জীবনের আসল সমস্যাটা কী বা কোথায়?
★ মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে এইরকম টানাপোড়েনের উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল। মাননীয়া লেখিকা অসাধারণ লিখেছেন উপন্যাসটি।
★ সত্যি ব'লতে কী, এই উপন্যাসে মাননীয়া লেখিকা তাঁর লেখার জাত চিনিয়েছেন। মানুষের মনের আনাচকানাচের সুপ্ত বাসনা গুলোকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। একজন মানুষ যেইভাবেই পৃথিবীতে আসুন না কেন, সেই দায় তাঁর নিজের নয়। সে পৃথিবীতে আসার পর তাঁর প্রতি যে কর্তব্য বা দায়িত্ব তাঁর "মা" বা "বাবা" এঁদের থাকে, সেখানে যদি গাফিলতি থেকে যায় তাহ'লে সেই গাফিলতির ফল ভোগ করতে হয় সেই অনাকাঙ্খিত শিশুটিকে। অনেক সময় মনে হয় শিশুটির ডাকনামও যেন তাঁকে ঠাট্টা করছে! তাঁর শিশুমনের সমস্যাগুলোর যদি সঠিক সমাধান সঠিকভাবে না হয়, তখন তাঁর মধ্যে জাগ্রত প্রশ্নগুলোরও সমাধান হয়না। আর আমরা এটা ভালোভাবেই জানি আমাদের আজকের সমাজ কাউকেই রেহাই দেয়না। 'শিশু' - (সে কন্যা হ'ক বা পুরুষ) থেকে 'বৃদ্ধ' বা 'বৃদ্ধা' প্রায় সকলেই বিভিন্ন রকম সামাজিক ব্যাধির শিকার। ফলে সেই শিশু যখন বড় হতে থাকে তখন সে বিভিন্ন ভাবে ঐ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। উত্তরের খোঁজে সে তখন তলিয়ে যেতে থাকে এই সমাজের পাঁকে। ঠিক এইরকমই একটি বিষয় নিয়ে এই উপন্যাস। যে উপন্যাস পড়তে গিয়ে একজন পাঠক হিসেবে বলছি সত্যি সত্যিই এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে একদম ভিন্ন ঘরানার স্বাদ এনে দিয়েছে। সাথী ম্যাডামের প্রতিটি উপন্যাসেই আমাদের সমাজের প্রতি একটি লুক্কায়িত বার্তা থাকে, ঠিক বীজগণিতের মতো! সঠিক Formula খুঁজে পেলেই প্রবলেম Solved. কিন্তু সেই সঠিক Formula খুঁজে পেতে গিয়ে পাঠক X আর Y এর হিসেব মেলাতে হিমসিম খায়, যেমন আমি খাচ্ছি! আমরা জানি তরবারির থেকে কলমের জোর বেশি, আর সাথী ম্যাডামের কলম? সে তো অগ্নিস্রাবী! তাঁর লেখা উপন্যাস শুরু তো হয় খুব হাল্কা ভাবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঠক ঐ উপন্যাসের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েন যে তখন সে আর ঐ উপন্যাসটি হাত থেকে নামিয়ে রাখতে পারেন না। তাঁর কয়েকটি রাতের ঘুমের দফারফা হবেই হবে। যদিও সকল ব্যক্তির পছন্দ একরকম নয়, কিন্তু এই উ���ন্যাসটি আমার ভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে। শ্রদ্ধেয়া লেখিকার সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় উপন্যাস 'ত্রিভুজ', কিন্তু এই উপন্যাসটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে লেখিকা ম্যাডাম যেন নিজেই নিজের রেকর্ড ভাঙতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠছেন।
This is my second book after finishing দূরের পাখি, and it was too much for someone who had just started getting to know the author. As I turned the pages one by one, I kept wiping my eyes. The last four pages just broke me into pieces. I was sobbing. But it was a wonderful read, and I became an OG fan of hers.